অন্ধকার ঘরে

লিখেছেনঃ হোসেন মাহমুদ

-দোস্ত দেখেছিস মালটা! ঈশ মাইরি একরাতের জন্য কাছে ফেলে চিবিয়ে খেতাম।
-হুম দেখলাম। আচ্ছা নাবিল সারাজীবন কি এ রকম মেয়ে খেকো হয়েই থাকবি?
-দেখো মামা তুমি আমার সামনে সতী সাবেত্রি সাঁজতে এস না। এই বয়সে পোলাপান মেয়ে খাইব না তো পোলা খাইব নাকি? হা হা হা।

পোলা খাইব নাকি?
নাবিলের কথাটা পলাশের বুকের মাঝখান দিয়ে বুলেটের মত খোঁচা দিল। তার দুইটা কারণ থাকতে পারে। এক, যার মনে যা ফাল দিয়ে উঠে তা। দুই, নাবিলকে নিয়ে পলাশের আছে নিজস্ব এক পৃথিবী। আরে না, এইটা কাগজের বানানো কোন খেলনা পৃথিবীর ডায়াগ্রাম নয়। নাবিলের জন্য পলাশের মনের গভীরে ধীরে ধীরে গড়ে উঠা শক্ত প্রাচীরে ঘেরা ভালবাসার পাহাড়ের কথা বলছি। খেলনা না হলে ও খেলনা দিয়ে খেলার বয়স থেকেই এই ভালোবাসার ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেছে পলাশ। পলাশ আর নাবিল এক সাথেই বড় হয়েছে, থেকেছে ও এক বাড়ীতে। তারা দুইজন সম্পর্কে চাচাতো ভাই। নাবিল পলাশের চেয়ে বছর খানিকের বড়। একই স্কুলে একই ক্লাসে অধ্যায়ণ করেছে দুইজনে। এক সাথে খেলা দুলা, মারামারি করা। অবশ্য মারামারিটা নাবিলই করত বেশী। পলাশ ছিল শান্ত শিষ্ট। নাবিলের গায়ে হাত তুলতে তার খারাপ লাগতো। নাবিল দিনে পলাশকে মেরে রাতে বুকে জড়িয়ে ধরে ঘুমত। পলাশ তখন সেই মার খাবার কথাটা ভুলে যেত। পলাশের বাম চোখের উপরে দুইটা সেলাই এর দাগ এখনো স্পষ্ট। একবার পলাশ নাবিলের একটা ফুটবল ফাটিয়ে দিয়েছিল। নাবিল রাগ করে পলাশকে ধাক্কা মেরে মাটিতে ফেলে দেয়। মাটিতে পড়ে থাকা ইটের সাথে আঘাত লেগে কেটে যায় পলাশের বাম চোখের উপরের বেশ খানিকটা জায়গা। ওতে ২টা সেলাই পড়েছে। বাড়ীতে সেইদিন ঘটনার ভয়াবহতার আকার খুব মারাত্মক হয়ে উঠেছিল। নাবিলের বাবা মানে পলাশের বড় চাচা বেত নিয়ে সারা দিন নাবিলকে খুঁজে বেড়িয়েছে। নাবিল জানতে পেরে সারাদিন ঘর মুখো হয়নি। রাতের বেলা চুপি চুপি পলাশের জানালার উপরে টোকা দিয়ে জানান দিল, আমি এসেছি। পলাশের বুঝতে দেরী হয়নি। সে শব্দ না করে দরজা খুলে দিল নাবিলের জন্য। নাবিল ঘরে ঢুকে অপরাধীর মত পলাশের সামনে দাঁড়ালো।
-খুব ব্যথা পেয়েছিস না রে?
-হু। তবে এখন কম ব্যথা লাগছে। টেবিলের উপরে তোর ভাত রাখা আছে খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়।
নাবিল বাধ্য ছেলের মত খেয়ে নিয়ে পলাশের পাশে শুয়ে পড়ল। পলাশ বালিশটা টেনে নিয়ে অন্য পাশে মুখ করে ঘুমের বান ধরে আছে। নাবিল পলাশকে আস্তে করে কাছে টেনে নেয়। তাকে জড়িয়ে ধরে তার কাঁটা যায়গায় চুমু খেয়ে বলে, আমি আর কোন দিন ও তোকে মারবো না পলাশ।

নাবিলের সেইদিনের সেই কথায় পলাশ আশ্বস্ত হয়ে সব দুঃখ কষ্ট ভুলে যায়। কিন্তু নাবিল কি সত্যি সেই কথা রেখেছিল। মোটেও না, আরও অনেক বার পলাশ নাবিলের হাতে মার খেয়েছে। তারপর ও পলাশ নাবিলকে দুরে সরিয়ে দেয়নি। স্কুল শেষ করে দুজনে ঢাকার ধানমণ্ডি আইডিয়াল কলেজে ভর্তি হয়। দুজনে থাকার জন্য ভূতের গলিতে একটা রুম নেয়। ছোট বেলার খেলার সাথী, চাচাত ভাই কিংবা ভালোবাসার মানুষ এই সব কিছু চিন্তা করে পলাশ নাবিলের পিছনে ছায়ার মত লেগে থাকতো। কিন্তু নাবিলের মেয়ে আসক্তিটা মারাত্মক রোগে পরিণীত হয়। যে কোন সুন্দরী মেয়ে দেখলে তার কাম বাসনা জেগে উঠত। দাঁত কেলিয়ে নাবিল যখন পলাশকে মেয়ে হরণের কাহিনী শুনত, তখন পলাশ ভিতর ভিতর কষ্ট পেত। তারপর ও কোন দিন তাকে মুখ ফুটে বলেনি যে আমি তোকে ভালোবাসি নাবিল। একটা অজানা ভয় কাজ করত পলাশের মাঝে বন্ধুত্ব হারানোর ভয়। কিংবা নাবিল সমকামীর ধারে কাছে নেই সেই জন্য ও হতে পারে। ভালোবাসি কথাটা কোন দিন ও বলা হত না যদি সেই দিন পলাশ জ্বরে না পড়ত।
একরাতে পলাশ জ্বরে পাগলের প্রলাপ বকতে থাকে। নাবিল পলাশের মাথায় জ্বল পট্টি দিয়ে যাচ্ছিল। পলাশ অস্পষ্ট স্বরে বলে, নাবিল আমি তোকে সেই ছোটবেলা থেকে ভালোবাসি। কোন দিন বলতে পারিনি। বোধহয় বলতে পারবো ও না কোন দিন। আমি জানি তুই আমাকে ভালবাসিস না। তাতে কি তারপর ও আমি তোকে সারাজীবন ভালোবেসে যাবো। আমার জীবন থাকতে তোর যায়গায় অন্য কাউকে বসাতে পারবো না কোন দিন। পলাশের কথা শুনে নাবিলের ভিতরে অন্য রকম এক অনুভূতি কাজ করতে লাগলো। খুব ইচ্ছা করছিল পলাশকে বুকের মধ্যে নিয়ে আদর করতে। না নাবিল তা করেনি। সে ভাবতে পারছে না একজন মেয়ের যায়গা একজন পুরুষ নিতে পারে।
পলাশের সে প্রলাপ শুনার পর থেকে নাবিল মাঝে মাঝে ইচ্ছা করেই পলাশকে জড়িয়ে ধরে। একদিন ঘুমের বান করে পলাশকে বুকে টেনে নিলো ছোট বেলার মত। তার কপালে চুমু খেল। কিন্তু ইচ্ছা অনিচ্ছার বাঁধ ভেঙ্গে পলাশের ঠোঁটে কিস করতে পারল না নাবিল। পলাশ বুঝতে পারে নাবিল ধীরে ধীরে তার প্রতি দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। আগের মত বাহিরে থাকে না। কিংবা পলাশের সামনে কোন মেয়ে নিয়ে তক্ক করে না। থার্টি ফার্স্ট রাতে তারা দুজনে বন্ধু বান্ধবদের সাথে মদ গিলে বাসায় ফিরে। পলাশের চেয়ে নাবিল পরিমাণে একটু বেশী গিলে ফেলেছে। ঐ রাতে নাবিলের ভিতরের সব কথা পলাশ জেনে যায়। নাবিল ও পলাশকে ভালোবাসে। তারপর নাবিল পলাশকে বুকে জড়িয়ে কিস করতে থাকে পলাশ বাঁধা দিতে চেষ্টা করে। সে ভেবেছে মাতাল অবস্থায় কতজনেই তো কত কিছু বলে। যখন মাতলামি চলে যাবে সব কিছু ভুলে যাবে। কিন্তু অবাক করার বিষয় হল, নাবিল কিচ্ছু ভুলেনি। ঐ রাতের পর থেকে নাবিল পলাশের সাথে বয় ফ্রেন্ডের মতই আচরণ করা শুরু করে। পলাশ বিশ্বাস করতে পারছিল না, কি ভাবে নাবিল এতটা বদলে গেল। মেয়েদের ধারে কাছে ও মাড়ায় না সে। শুধু কলেজ বাসা আর পলাশের সাথে সার্বক্ষণিক আঠার মত লেগে থাকা। নাবিলের এই আমূল পরিবর্তন দেখে পলাশের একটা কথা মনে পড়ে গেল। কোন একটা লেখকের বইতে পড়েছিল, অতিরিক্ত শক্ত আর কঠিন মানুষ গুলোর ব্যক্তিত্বের পিছনে একটা বাঁধ থাকে যদি কোন কারণে সে বাঁধ ভেঙ্গে যায় তাহলে সে তার চরিত্রের বিপরীত আচরণ করতে শুরু করে।

হাসি আনন্দের মাঝে কেটে গেল ৪টি বছর। নাবিল আর পলাশ এখন একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। এর মাঝে বন্ধু বান্ধবদের কাছে মানিক জোড় হিসাবে খ্যাতি পেয়ে গেছে। যেখানেই যাবে তারা দুজন এক সাথে। গ্রামের বাড়িতে গেলে ও তারা একজন আরকজনের পিছু ছাড়ে না। তাদের এই অসম্ভব ভালবাসার মাঝে কাঁটা হয়ে হাজির হয় ইরিনা। এ বছর প্রথম সেমিস্টারে ভর্তি হওয়া মেয়ে ইরিনা। ইতোমধ্যে ইউনিভার্সিটির সব পোলাপানের মাথা গুলে খেয়েছে। শেষে এসে দোস্তির ঝাল ফেল্ল নাবিলর উপর। পলাশ নাবিলকে অনেক বার বলেছে ইরিনা মেয়ে হিসাবে ভালো না। তার সাথে বন্ধুত্ব রাখিস না। কিন্তু নাবিল পলাশকে আশ্বস্ত করত, ভয় পাস না আমি তোকে ছেড়ে কোথাও যাচ্ছি না। একমাত্র মরণই আমাদের আলাদা করতে পারে। পলাশ নাবিলের কথায় বিশ্বাস করলেও মনে মনে একটা ভয়ের কাঁটা ফুটে থাকত। কারণ নাবিল আগে সমকামী ছিল না। মেয়েদের প্রতি তার দারুণ আসক্তি ছিল। যদিও ইরিনার প্রলোভনে সেই আসক্তিটা আমার জেগে উঠে।
বাস্তবে ও হল তাই। নাবিল দিন দিন বদলে যেতে লাগলো। পলাশের সাথে মাঝে মাঝে কথা কাটাকাটি শুরু হল। একটা সুন্দর সম্পর্কের মাঝে সন্দেহ প্রবণতা বাড়তে লাগলো দিন দিন। পলাশ বিশ্বাস করতে পারছে না সেই ছোট বেলার তিল তিল করে গড়ে তোলা ভালোবাসা এক নিমিষে ধ্বংস হয়ে যাবে। মাঝে মাঝে নাবিল বাসায় আসা বন্ধ করে দিল। পলাশ খোঁজ নিয়ে জানতে পারে ইরিনাকে নিয়ে কোন বন্ধুর খালি মেসে রাত কাটায়। পলাশ নাবিলকে যত বার ইরিনার কথা বলেছে নাবিল ততবার তুলকালাম কাণ্ড বাঁধিয়েছে। পলাশ নাবিলকে হারানোর চিন্তায় দিন দিন শুকনা আর রোগা হয়ে উঠছিল। নাবিল সে ব্যাপারে কর্ণপাত করতে ও নারাজ। সে আছে মাস্তিতে, ইরিনাকে নিয়ে বাহিরে ঘুরতে যাওয়া, হোটেলে খাওয়া, বন্ধুর ফাঁকা মেসে রাত্রি যাপন। এই সব যখনি পলাশ চিন্তা করে সে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারে না। পলাশ নাবিলকে এখন ও আগের মতই ভালোবাসে। আর তার বিশ্বাস শেষ নিশাস অবধি শুধু মাত্র তাকেই ভালোবেসে যাবে। পলাশ মনে মনে ভাবে এই ভাবে তার ভালোবাসা হারিয়ে সে বাঁচতে পারবে না। তাই সে নাবিলের ফেসবুক থেকে ইরিনার আইডি নিয়ে তাকে একটা মেইল লিখে। সে খুব স্বাভাবিক ভাবে ভদ্রতা বলাই রেখে কিছু কথা ইরিনাকে জানালো।
“প্রিয় ইরিনা,
আমি পলাশ। নাবিলের চাচাতো ভাই। তুমি হয়তো নাবিলের কাছে আমার নাম শুনে থাকবে। তোমার কিছু কথা জানার দরকার। আশা করি ব্যাপার গুলো বুঝতে পারবে। তুমি আধুনিক মেয়ে, নিশ্চয় সমকামী ব্যাপার গুলোতে তোমার নাক সিটকানোর রোগ নেই। হা আমি সমকামী। আমি একজনকে সেই ছোটবেলা থেকে ভালোবাসি। বলতে পারো ভালোবাসি কি তাকে দিয়ে জেনেছি। আমার বর্তমান অতীত সবকিছু সে। নিশ্চয় বুঝতে পারছ আমি কার কথা বলছি। হা সত্যি বলছি সে নাবিল। নাবিল ও আমাকে ভালোবাসে। তোমার সাথে তার কি ধরনের সম্পর্ক আমি জানি না। কিন্তু একটা কথা তোমাকে বলতে চাই, নাবিল আমার জীবনে না থাকলে আমার এই জীবন হয়তো পরিপূর্ণ হবে না। কিংবা কোন ভুল সিদ্ধান্ত ক্রমে আত্ম ঘাতী ও হয়ে যেতে পারি। তাই তোমার কাছে আমার অনুরোধ নাবিলকে নিয়ে অন্য কিছু ভেবো না। নাবিল আমার অর্ধেক নয়, পরিপূর্ণ জীবন। যদি তুমি তাকে ভালোবাসো আমি সেই ভালোবাসাকে ছোট করে দেখবো না। বড়জোর সম্মান জানিয়ে বলবো, তোমার ভালবাসার বয়স হয়তো মাস ছয়েকের আর আমার গত ১৯ বছরের। তাই বোন হিসাবে বিচারক তোমাকে নির্ধারণ করলাম। দয়া করে সিদ্ধান্তটা ভেবে চিন্তে নিবে।
“পলাশ”
তার এক দিন পর নাবিলের জন্মদিন। পলাশ তার জন্য একটা স্মার্ট ফোন আর ছোট একটা কেক কিনে আনে। রাতে তার জন্য রান্না ও করে পলাশ। ক্ষুদ্র একটা জন্মদিনের আয়োজন, সাথে এক বুক নিঃস্বার্থ ভালোবাসা নিয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনছিল পলাশ। নাবিল ঐ রাতে ও ইরিনাকে নিয়ে আশুলিয়ার কোন রেস্টুরেন্টে খেতে যায়। রাত পৌনে দুইটার সময় বাসায় আসে নাবিল। পলাশকে দেখে নাবিল এমন ভাবে তাকাল মনে হল কোন অপরিচিত মানুষ তার সামনে দাড়িয়ে। পলাশ নাবিলকে বলে,
-কি রে আজ তোর জন্মদিন। আমি তোর জন্য রান্না করে অপেক্ষা করছি। এতক্ষণ বাহীরে ছিলি কেন?
-কেন ছিলাম তোর কাছে জবাবদিহি করতে হবে নাকি।
-না আমি তা মিন করিনি নাবিল। শুধু বলছিলাম জীবনের এই ২২টা বছর এক সাথেই তোর জন্মদিন পালন করে আসছিলাম।
-সারাজীবন এক সাথে পালন করেছি বলে সামনে ও করবো এমন কোন কথা আছে নাকি? আর তোর ঐ ন্যাকামি মেয়েলী স্বভাবটা একটু ছেঁড়ে পুরুষ মানুষের মত আচরণ করতে চেষ্টা কর।
-কি!আমি মেয়েলী?
-অবশ্যই তুই মেয়েলী। আর তোর স্বভাবটা ও মেয়েদের মত। প্যাচ লাগানো আর কথা ছিটানো তোর অভ্যাস। শালা কুটনি কোথাকার।
পলাশ নিজের কান কে বিশ্বাস করতে পারছে না, নাবিল এই ভাবে তার সাথে কথা বলতে পারল? সে আবার বলল,
-নাবিল আমি কি কুটনামি করেছিলাম বল?
-ন্যাকা। তুই ইরিনাকে ইমেল পাঠিয়েছিস কেন? আমি তোর বয় ফ্রেন্ড নাহ? শালা কুত্তা, মারবো এক লাথি তোর পাছায়।
-নাবিল তুই আমাকে মারতে পারবি?
-ঢং আর ভালো লাগে না। কেন তোকে মারলে মহা ভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে নাকি?
-তুই যদি আমাকে একদিনের জন্য ও ভালবাসতি তাহলে এত ছোট করে আমার সাথে কথা বলতি না।
-কি আমি ছোট লোক?
পলাশ চোখে জ্বল নিয়ে উত্তর দিল,
-আমি তা বলিনি নাবিল। বলেছি ছোট কথা বলছিস।
নাবিল দুহাত এগিয়ে গিয়ে পলাশের শাটের বোতাম ধরে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বলল,
-শালা হিজড়া তোর জন্য আমি কোন মেয়ের সাথে প্রেম ও করতে পারবো না। থাক তুই তোর ন্যাকামো নিয়ে। শালা তোর সাথে আর থাকবোই না।
কথা গুলো বলেই নাবিল বাসা থেকে বেরিয়ে গেল। পলাশ তার জন্মদিনের জন্য কেনা কেক সামনে নিয়ে চোখের জ্বল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পলাশ চারদিকে অন্ধকার দেখতে লাগলো। এই সেই নাবিল যার জন্য তার হৃদয়ে এত ভালোবাসা? যাকে সে কোন দিন ও আলাদা স্বত্বা হিসাবে দেখেনি। সেই নাবিল আজ একটা মেয়ের জন্য তার ভালোবাসা আর তাকে চূড়ান্ত অপমান করে বেরিয়ে গেল।

রাত সাড়ে তিনটে। পলাশের হাতে এক খণ্ড সাদা কাগজ আর কলম। কেকের উপরে রাখা মোমের আলোয় সে কি যেন লিখছে। রাত সাড়ে চারটায় সে চেয়ার ছেঁড়ে বারান্দায় গেল। ওখানে কাপড় শুকাতে দেয়া দড়িটা টেনে খুলে নিলো। রুমে এসে দড়িটা চেয়ারে রেখে তার প্রিয় একষ্টিক গীটারটা হাতে নিয়ে গাইতে লাগলো একটা গান। যেটা একটু আগে সে নিজে লিখেছে। তার সামনেই নাবিলের জন্য কেনা নূতন স্মার্ট ফোনটার ভয়েস রেকর্ডার অপশন ওপেন করে নিলো। চোখে জ্বল নিয়ে সে গাইতে লাগলো,

“অন্ধকার ঘরে কাগজের
টুকরো ছিঁড়ে
কেটে যায় আমার সময়
তুমি গেছো চলে
যাওনি বিস্মৃতির অতলে
যেমন শুকনো ফুল বইয়ের ভাঁজে রয়ে যায়,
রেখেছিলাম তোমায় আমার
হৃদয় গভীরে
তবু চলে গেলে
এই সাজানো বাগান ছেড়ে
আমি রয়েছি তোমার অপেক্ষায়।

নিকষ কালো এই আঁধারে
স্মৃতিরা সব খেলা করে
রয় শুধু নির্জনতা
নির্জনতায় আমি একা,
একবার শুধু চোখ মেলো
দেখো আজও পথে জ্বালি আলো তুমি আবার
আসবে ফিরে
বিশ্বাস টুকু দু’ হাতে আঁকড়ে ধরে”

কক্সবাজার থেকে ইরিনার সাথে আনন্দ করে তিন দিন পর নাবিল বাসায় আসলো। দরজায় নক করেছে অনেকবার কিন্তু ভিতর থেকে বন্ধ। পলাশের মোবাইলে কল দিয়েছে কিন্তু ফোন অফ। ঘণ্টা খানিক অপেক্ষা করে সে বারান্দার রেলিং ধরে পিছনের রুমের কাঁচের জানালা দিয়ে ভিতরে উঁকি মারল। যা দেখল তার জন্য নাবিল প্রস্তুত ছিল না। দরজা ভেঙ্গে সে ভিতরে ঢুকল। রুমের ভিতরে গন্ধে প্রবেশ করা কষ্টকর হয়ে যাচ্ছিল। তিন দিনের পচা গলা লাশ, সাথে মাছির উড়া-উড়ি মনে হয় কোন শ্মশান। নাবিল রুমের দরজা খুলে ও খানেই দাঁড়িয়ে ছিল কতক্ষণ সে মনে করতে পারছে না। পরে গন্ধ পেয়ে পাশের বাসার লোক জন জমায়েত হয়ে পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ এসে লাশ মর্গে নিয়ে যায়। সাথে নাবিলকে ও ধরে নিয়ে যায়। পলাশ আত্মহত্যার আগে একটা সাদা কাগজে লেখে গিয়েছিল।“ আমার এই অপকর্মের জন্য অন্য কেউ দায়ী নয়” নাবিলকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ ছেঁড়ে দেয়। তার কয়েকদিন পর নাবিল অন্যরকম হয়ে যায়। বাসা থেকে বের হয় না। যে দিকে যায় পলাশ যেন তার চারদিকে ঘিরে রেখেছে। আলমারি খুলতে গিয়ে একটা স্মার্ট ফোনের বক্স খুঁজে পায় নাবিল। সেটটা খোলাই ছিল, তবে চার্জ একদম নেই বললেই চলে, নাবিল চার্জে লাগিয়ে ফোনের লক খুলে ভিতরে ঢুকল, তখন সে ভয়েস রেকর্ডটা বেজে উঠল। গানটা শোনার পর চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো নাবিল। বার বার নিজেকে দোষী করছিল সে। একটা মানুষ জীবন দিয়ে বুঝিয়ে দিয়ে গেল তাকে, সত্যিকার ভালোবাসা কাকে বলে।
মাস খানিক পর নাবিল মানসিক রোগীর মত আচরণ করতে লাগলো। ইরিনার সাথে কিংবা ইউনিভার্সিটির ধারে কাছে ও যায় না। গ্রাম থেকে তার বাবা, চাচা তাকে নিতে এসেছিল, সে যায়নি। সে পলাশকে ছেঁড়ে কোথাও যাবে না। তার দুইদিন পরেই পলাশের জন্মদিন। নাবিল অনুশোচনায় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করল। শুধু পলাশের মত সে শুধু নিজেকে নয় ইরিনাকে ও দায়ী করে একটা সাদা কাগজে লিখে গেল। আমার আত্মহত্যার জন্য আমি নিজে দায়ী, সাথে ইরিনা। সে ১২ পৃষ্ঠার এক বিশাল পত্রের মাধ্যমে তার আর পলাশের ছেলে বেলার থেকে শেষ পর্যন্ত সবই লিখে দিল।

তার দুইদিন পর বাংলাদেশের পত্রিকা গুলো লাল কালি দিয়ে বিশাল হেডলাইন ছাপল। “সমকামী ভালোবাসার নির্মম পরিণতি, দুই যুবক আত্মঘাতী”
সবাই নিউজটা দেখলে ও একজন দেখতে পারল না। ইরিনা তার পরদিন ও সব জানতে পারে। দুইজনের মানুষের খুনি হিসাবে নিজেকে দেখতে খুব কষ্ট হচ্ছিল তার। তাই আত্মহত্যা নয় মস্তিষ্কের বিকৃতি ঘটিয়ে হসপিটালে ভর্তি হল সে। অবশ্য এ ধরনের খারাপ মানুষ গুলোর মনের জোর হয় খুব ক্ষীণ। আত্মহত্যার মত কঠিন কাজ তাদের দিয়ে হয় না। তারা শুধু জানে নিষ্পাপ মানুষ গুলীর অশান্তির কারণ হতে। এই ইরিনার জন্য দুইজন তাজা যুবকের অকালে আত্মহনন এবং একটি অক্ষয় ভালোবাসার পরিসমাপ্তি।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.