পথ যদি না শেষ হয়

লেখক একলা পথিক

বর্ষার বিকাল । আকাশে ঘন কালো মেঘ। হঠাৎ করেই ঝুম বৃষ্টি শুরু হল। সাথে ভীষণ বজ্রপাত এবং ক্ষণ ক্ষণ বাদে বিদ্যুৎচমকের তীব্র আলোকচ্ছটায় পুরো এলাকা যেন ক্যামেরার ফ্লাশ বাতির নিচে পতিত । অবস্থা এমনই যেন স্বয়ং বিধাতাই আজ ক্যামেরা হাতে নিয়ে গোটা মর্তবাসির চালচিত্র ধারণ করতে ব্যতিব্যস্ত । এমনিতেই আচমকা বৃষ্টিতে অফিস ফেরত ঘরমুখো মানুষগুলোর ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। এরই মধ্যে অতিরিক্ত উটকো ঝামেলা হিসেবে যোগ হয়েছে ঢাকা শহরের রাস্তার চিরাচরিত তীব্র যানজট । রাস্তার গাড়িগুলো সব স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে । ঘটনা খানা তাদের নিকট যেন গোঁদের উপর বিষফোঁড়া হবার মতন বেগতিক শারীরিক করুণ দশার সদৃশ । যানজটের তীব্রতা এতোটাই প্রখর যে প্রায় ১৫/২০ মিনিট পরপর গাড়িগুলো হালকা সামান্য কয়েক গজ পথ করে করে দূরত্ব অতিক্রম করছে । বাসের ভেতর যাত্রীদের ভিড় এমনই ভয়াবহ যে একজনের নিঃশ্বাস অন্যজনের গাঁয়ে গিয়ে লাগতেছে । এমনি এক বিকালে সেইদিন আমি বাসের মাঝখানে ভিড়ের মধ্যে উপরের হাতল ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম । মাত্রাতিরিক্ত লোকজনের গাদাগাদিতে বাসের ভেতর কেমন জানি ভ্যাপসা গরম বিরাজ করতে লাগলো। হঠাৎ করেই মাথা থেকে একফোঁটা ঘাম কপাল গড়িয়ে চোখের উপর পড়তেই ঘামের তীব্র লোনা ঝাঁঝে চোখটা জ্বলে উঠলো। বামহাতে বাসের হাতল ধরে ডানহাত দিয়ে চোখ মুছতে গিয়েই আচমকা তাঁর দিকে আমার চোখ পড়লো। সে বাসের পেছনের দিকে্র একটা সিটে জানালার ঠিক পাশেই বসে ছিল। অভাবিত ভাবে তৎক্ষণাৎই তাঁর চোখও আমার চোখে উপর পড়লো। তাঁর চোখে চোখ পড়াতে মনে হচ্ছিলো প্রচণ্ড তাপদাহের মাঝে এক চিলতে বরফ শীতল হিম বাতাস এসে আমার শরীরটাকে আলতো করে ছুঁয়ে গেলো। তীব্র গরমেও হিমবাহের উপস্থিতি অনুভব করলাম। কিন্তু দুইজনের একই সময়ে একজনের সাথে আরেকজনের চোখাচোখিতে তাঁর চোখে কিঞ্চিৎ লজ্জার রেখা দেখতে পেলাম আর আমিও দ্রুত তাঁর চোখ থেকে আমার চোখ সরিয়ে নিলাম।

কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি, এমন মায়াবী একজোড়া চোখ দ্বিতীয়বার দেখার লোভ আমি সামলাইতে পারলাম না। এক পলকেই কারো চিত্তকে খণ্ড বিখণ্ড করে ফেলার মত আসলেই কি এক অজানা রহস্য যেন লুকায়িত ছিল তাঁর সেই অপূর্ব চোখের বাঁকা চাহনিতে। তাই দ্বিতীয়বার নিজেই নির্লজ্জের মত একটু আড় চোখে তাঁর দিকে তাকানোর চেষ্টা করলাম কিন্তু হায় এবারও দেখি সে আমার দিকে তাকিয়ে পড়লো। আবারো দুইজন দুইজনকে সুকৌশলে এড়িয়ে গেলাম; কেউই কাউকে বুঝতেই দিলাম না যে আমরা একে অন্যের দিকে চোখাচোখি খেলায় মত্ত হতে চলেছি। এমন একটা ভাব ধরলাম যেন আমি আসলে অন্যদিকে তাকিয়ে ছিলাম। তবে ভাব দেখাতে সেও একেবারে কম যায় না, পকেট থেকে মোবাইল বের করে এমনভাবে আমাকে দেখিয়ে ভাবভঙ্গি মেরে মোবাইল টিপতে লাগলো যেন আমাকে বোঝাতে চাইছিল পৃথিবীতে মোবাইল সে একাই টিপতে জানে। এভাবে কিছুক্ষণ চলার পর লক্ষ্য করলাম মোবাইল টিপার ছলে সেও বাঁকা চোখে আমার দিকে তাকাচ্ছে। এবার সুযোগ পেয়ে সাহস করে আমিও তাঁর চোখে চোখ রাখলাম, তাঁকেও বুঝাতে দিলাম যে তাঁর চোখাচোখির অভিনয় আমি ধরতে পেরেছি । তাই সে দ্রুত আমার চোখ থেকে চোখ সরিয়ে অন্যমনস্ক হবার ভান করে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে কিছুক্ষণ বৃষ্টি দেখার নাটক করতে লাগলো।

বাইরে তখনও অজস্র ধারায় বৃষ্টি ঝরছে । তাঁর জানালা দিয়ে বাইরে তাকানোর সুযোগ টাকে আমি কাজে লাগালাম তাঁকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষণ করার জন্য । তাকে আরো সুচালু ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে উপভোগ করার নিমিত্তে লোকলজ্জার মাথা খেয়ে একনাগাড়ে তাকিয়ে কিছুক্ষণ দেখতে লাগলাম । দুধসাদা গাঁয়ের রঙ, লম্বাও হবে বেশ খানিকটা । মাথায় একঝাক এলোমেলো উষ্কখুষ্ক চুল দেখে মনে হল কয়েক বছর যাবত তাঁতে কোন চিরুনির আঁচড় লাগেনি কিন্তু এতে যেন তাঁকে আরও বেশি আকর্ষণীয় ও সুদর্শন দেখাচ্ছিল, অদ্ভুত সুন্দর দুইটি কালো চোখ যে কাউকে পাগল করার জন্য যথেষ্ট ছিল , পূর্ণিমার চাঁদের মত বাঁকা ঠোঁট দুটি ক্যাডবেরি কিংবা ডেইরী মিল্ক চকোলেটের মত এক নিমিষেই খেয়ে ফেলা যায়, মুখের স্মিত হাসির রেখা বহু বছরের পুরনো শত্রুকেও মুহূর্তেই বুকে টেনে নেয়ার অসীম ক্ষমতা রাখে, বলিষ্ঠ লম্বা গলা, সুপ্রসস্থ বক্ষ এবং অপূর্ব সুন্দর তার দেহসৌষ্ঠব । আর এসবের সাথে সৌন্দর্যের অতিরঞ্জিত মাখামাখি করছিল তাঁর গাঁয়ে জড়ানো হালকা সবুজ রঙের টি-শার্ট টা। যা মুহূর্তের মধ্যাই আমার অশান্ত হৃদয়কে অজানা আবেগে ব্যাকুল করে তুলল; ভাবলাম এমন সুন্দর একখানা মুখ পেলে শুধু এই মুখটির দিকেই চেয়েই অনন্তকাল পার করে দেয়াও সম্ভব । অতঃপর আমি মনে মনে অনেকদিন পর সৃষ্টিকর্তার অসাধারণ সৃষ্টির প্রশংসায় আবারো নিজেকে নিয়োজিত করতে ব্যস্ত হলাম । আর কোন মানুষও যে এতটা সুন্দর হতে পারে সেটাও এই প্রথম অনুধাবন করলাম। ঠিক যেন আমার দেখা স্বপ্নের সেই অচিন দেশের কোন রাজপুত্রের মতন। মনে মনে অনেক ভেবে চিনতে রাজপুত্রের একটা দারুন নাম আবিষ্কার করলাম । তার নাম দিলাম স্বপ্নকুমার । আমার স্বপ্নে দেখা স্বপ্নকুমার ।

অনেকদিন আগে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের লেখা “শকুন্তলা” নামক একটা উপন্যাসে পড়েছিলাম কোন স্থানে দক্ষিণবাহু (ডানহাত) স্পন্দিত হওয়া নাকি প্রেম আবির্ভাবের পূর্বলক্ষণ। হুট করেই কথাটা মনে পড়া মাত্রই আনন্দে মন কিছুটা উদ্বেলিত হইলো এই ভেবে যে আজকে আমার দক্ষিনবাহু শুধুমাত্র স্পন্দিতই হয় নাই; চোখে গড়িয়ে পড়া ঘাম মুছতে গিয়ে রীতিমত দক্ষিনবাহু খানা তো স্পন্দিতও হয়েছিল বেশ খানিকটা । তবে ঘটনা কি সত্যি হতে চলেছে । আজ আমার প্রেম কি সত্যি তাঁর আবির্ভাবের মাত্রা অতিক্রম করে প্রেমের ভরা নদীতেই হাবুডুবু খেতে আরম্ভ করবে নাতো আবার। তবে কি আমি সত্যি সত্যিই স্বপ্নকুমারের প্রেমে মজতে চলেছি। এহেন যতসব অবাস্তব ও কাল্পনিক চিন্তাভাবনায় মন যখন গভীর ভাবে মোহাচ্ছন্ন হতে লাগলো ঠিক তৎক্ষণাতই আবারো স্বপ্নকুমারের দিকে চোখ পড়ায় নিজের সংবিৎ ফিরে পেয়ে বুঝলাম যে তখনো আমি জনাকীর্ণ বাসের ভেতোরেই বর্তমান। কারণ ততক্ষনে স্বপ্নকুমারও নিজেও জানালা থেকে তার চোখ ফিরিয়ে এনেছে এবং তৃতীয় বারের মতই আমার চোখেই চোখ রাখল।

এবার কিন্তু আমিও তাঁর চোখে চোখ রেখে সাহস করে নির্ভয়েই চোখের পলক না ফেলে একনাগাড়ে তার চোখের উপর চোখ রেখে চেয়ে রইলাম। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, স্বপ্নকুমার কিন্তু এবার আর আমার চোখকে আর এড়িয়ে গেলো না। এমনকি তাকে নিজেকে আড়াল করার কোন প্রয়াসও তার ভেতোর দেখলাম না। তখন কিছুটা উপলব্ধি করতে পারলাম অলৌকিক কোন কারনেই হোক নতুবা প্রাকৃতিক কারণেই হোক না কেন স্বপ্নকুমারও নিজেও হয়তোবা আমার প্রতি কিছুটা মনোযোগী এবং কোন কারনে আকর্ষণ বোধ করছে । আমার প্রতি স্বপ্নকুমারের প্রদর্শিত এই মহান বদান্যতায় নিজেকে কিছুটা সৌভাগ্যবান ভেবে পুলকিত হলাম। যাইহোক এবার শুরু হল দুইজনের চোখেচোখে চোখাচোখির এক অপূর্ব খেলা । যেখানে খেলোয়াড় কিনা আমরা মাত্র দুইজন পক্ষান্তরে খেলার মাঠ হচ্ছে লোকে লোকারণ্য এক পাবলিক বাস। স্বপ্নকুমারের অদ্ভুত আবেশ আমাকে এতটাই বিমোহিত করে ফেললো যেন শুধুমাত্র বাসই নয় সারা পৃথিবীটাই যেন আমাদের দুইজনের কল্পনার হাতেই বন্দী আর বাকীসব অদৃশ্য ছায়া। লোকভিড়ে দাড়িয়েও কল্পনা থেকে বাস্তবে ফিরলাম বাসের কনডাক্টরের আঞ্চলিক ভাষায় প্রদানকৃত “ঐ ব্যাটা ভোঁদাই বোবাকালা কোনহান কার, কানে শুনে না নাকি” মার্কা একটা ছোট্ট গালি এবং শরীরে কয়েকবার সজোরে ধাক্কা দিয়ে বাসের ভাড়া চাইবার ফলে। আসলে তার মোহে আমি নিজেই এতো বেশি আবিষ্ট ছিলাম যে বুঝতেই পারিনি সেই কখন থেকেই বাসের কনডাক্টর আমার কাছে, “এই ভাইজান ভাড়া দেন ভাড়া দেন” বলে চিৎকার করেও যখন আমাকে স্বপ্নকুমারের মায়াবী রহস্যময় আবেশ থেকে নিবৃত করতে না পেরে অবশেষে শ্রুতিকটু একটা গালি ও গায়ে হাত দেয়ার মত দুঃসাহস দেখানোর শরণাপন্ন হতে বাধ্য হয়েছিল। তবে খেয়াল করলাম এতো লোকের মধ্যে কন্ডাক্টরের মুখনিঃসৃত ছোট্ট গালি এবং গায়ে হাত দেবার বিষয়টা আমার কাছে কিছুটা বিব্রতকর ও লজ্জাস্কর ঠেকলেও আমার এই অনিচ্ছাকৃত বোকামির ঘটনায় স্বপ্নকুমার অনেকটাই পুলকিত হল। আমাকে দেয়া বাসের কন্ডাক্টরের গালি ও ভর্তশোনা তাকে কিছুটা হাসির খোরাক যোগাল। যেন মনে হল আমার খুব কাছের আপন কেউ একজন আমার ভুলকৃত বোকামি ও খামখেয়ালীপনা দেখে আমার সাথে মধুর রসিকতা ও ঠাট্টা করতেছে । আর এই প্রথমবার তাঁর বাঁকা ঠোঁটের দাঁত বের করা মিষ্টি হাসিটা দেখলাম বিঁধায় আমার প্রতি কনডাক্টরের এমন বাজে আচরণের ফলে তার কানের চিপায় সজোরে একটা চপেটাঘাত করতে গিয়েও অবশেষে নিজেকে নিবৃত করলাম শুধুমাত্র তাঁর অদ্ভুত সুন্দর হাসিটা উপভোগ করার জন্য। এভাবে বেশ ভালোই চলতে লাগলো বাসের ভেতর আমাদের দুইজনের চোখাচোখি খেলা। একবার আমি তাঁর দিকে তাকাই তো একবার সে আমার দিকে। আমি দাঁত দিতে ঠোঁট কামড়ালে; সেও ঠোঁট কামড়ায়, আমি মাথা চুলকাতে থাকলে সেও মাথা চুলকায়, দেখা গেলো আমি পকেট থেকে মোবাইল বের করে কারো সাথে কথা বলতেছি তো সেও আমার মত করে অভিনয় করতে লাগলো । আমি একটু ভাব নিয়ে এদিক ওদিক দেখি সেও আমার মত আমাকে অনুকরন করে আমাকে ব্যঙ্গ করতে ব্যস্ত থাকে । বুঝলাম দুষ্টামি-ফাজলামি আমার চেয়ে সেও কম জানে না। এভাবে দুষ্টু মিষ্টি খেলা খেলতে খেলতে মনের অজান্তেই কখন যেন তাঁর প্রতি কি এক গভীর মায়া-আবেগে বাধা পড়ে গেলাম; জানিনা তাঁর ভেতরও এমন কিছু হয়েছিল কিনা।

রাস্তায় সেইদিনকার জ্যামটাও যেন কোনভাবেই শেষই হচ্ছিলো না। অবশ্য আমিও মনে মনে চাইছিলাম শেষ হবার দরকার কি। চলেতছে যেমন চলুক না। ভালোই তো লাগতেছে চোখাচোখি খেলা। এরই মধ্যে কয়েকটি স্থানে বেশকিছু যাত্রী নেমে গিয়ে বাসে বেশ কয়েকটা আসন ফাঁকা হওয়ার দরুন পাশের এক যাত্রী আমাকে তাঁর পাশের আসনে বসতে বললেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমি কোন আসনেই বসলাম না শুধুমাত্র চোখাচোখি খেলার সুবিধার্থে; এবং স্বপ্নকুমার বিষয়টা বুঝতে পেরেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। তাঁর ভুবন ভোলানো হাঁসি দেখে বুঝলাম আজকের চোখাচোখি খেলার বিজয়ী তাহলে আমিই হলাম, আর তার এই অদ্ভুত হাঁসিটাই আমার আজকের খেলার পুরষ্কার। যা জীবনেও ভুলতে পারবোনা। মনে মনে সেই বিখ্যাত গানের কয়েকটা লাইনও গাইতে লাগলাম “এই পথ যদি না শেষ হয় তবে কেমন হত তুমি বলতো, যদি পৃথিবীটা স্বপ্নের দেশ হয় তবে কেমন হত তুমি বলতো”।

কিছুক্ষণ পর পথিমধ্যে তার পাশে বসা লোকটি উঠে গেলে একবার ভাবলাম স্বপ্নকুমারের পাশে গিয়ে বসি, কথা বলি; আবার ভাবী ধুর কিনা কি মনে করে। আগ বাড়িয়ে কথা বলতে গিয়ে যদি হিতে বিপরীত হয়। মনের ভেতর তাঁকে নিয়ে যখন বিভিন্ন ভাবনা আর দ্বিধাদন্দের অবতারণা করছি এমন সময়ই আচমকাই সে নিজের আসন থেকে উঠে দাঁড়ালো। আর দেখলাম আমাকে পাঁশ কাঁটিয়ে সোজা দরজা দিয়ে বাসের বাইরে নেমে গেলো । আর আমিও অবাক হয়ে শুধু দেখছিলাম আর মনে হচ্ছিলো ধীরে ধীরে আমি কি যেন একটা হারাতে চলেছি। বুকের ভেতোরে একটা পাথরসম কি একটা চেপে বসতে লাগলো। আমাকে পাঁশ কাটানোর সময় আমার শরীরে তাঁর হাতের হালকা ছোঁয়াও অবশ্য লাগলো; জানিনা ছোঁয়াটা কি তাঁর ইচ্ছাকৃত না অনিচ্ছাকৃত ছিল। বাস থেকে নেমে যাবার পর খেয়াল করলাম কোন এক অদ্ভুত কারনে সে বাইরে থেকে জানালা দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল, তাই আমিও মুহূর্তেই মাথা নিচু করে জানালা দিয়ে বাইরে মুখ বাড়ালাম; আমি আর সে একদমই সামনাসামনি। সে আমার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাকিয়ে আবারো সেই অদ্ভুত হাঁসিটা দিলো ; ঠোঁট দেখে মনে হল সে আমাকে কিছু একটা বলতে চাইছে, অব্যক্ত কোন কথা আমাকে শোনাতে চাইছে। কিন্তু আচমকাই বেরসিক বাস যাত্রা আরম্ভ করলে সে আর বলার চেষ্টা করলো না; শুধুমাত্র হাত নাড়িয়ে আমাকে বিদায় জানালো। আমি দ্রুত দৌড়ে বাস থেকে নামতে গিয়েও নামতে পারলাম না কারণ ততক্ষণ বাস সম্পূর্ণ গতিতে যাত্রা শুরু করেছে। তখন আমি আর আমার নিজের চোখকে সংবরণ করতে পারলাম না; অজান্তেই দুফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। আমি বাসের পেছনের কাঁচ দিয়ে তাঁর দিকে চেয়ে রইলাম যতক্ষণ পর্যন্ত দৃষ্টি সীমানার মধ্যে সে ছিল। জানিনা কেন জানি মনে হল সেও ততক্ষণই দাঁড়িয়ে ছিল যতক্ষণ পর্যন্ত বাসটাও তার দৃষ্টি গোচরে ছিল। আমি তাঁর নেমে যাওয়ার কয়েকটা স্টপেজ পর বাস থেকে আমার গন্তব্যে নামলাম। বাসটা যখন আমাকে রেখে সামনের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করলো মনে হচ্ছিলো পাষাণ যান্ত্রিক বাস আমার কোন আপনজনকে আমার থেকে কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে ঐ দূর দুরান্তে। আর কোনদিনও হয়তো ফেরত আসবে না। স্বপ্নকুমার ও বাস দুইটাই আমাকে একা ফেলে চলে যাবার পর অনেকক্ষণ একা একাই বাস স্ট্যান্ডে দাড়িয়ে রইলাম। পেছনে ফেলে আসা রাস্তার দিকে অপলক চেয়ে রইলাম। যদি দূরের মরীচিকা হয়েও স্বপ্নকুমার একবারের জন্য হলেও আমার কাছে ফিরে আসে।

ডায়রি লেখার অভ্যাস আমার অনেক দিন আগে থেকেই ছিল। প্রাত্যহিক ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোকে ডায়রিতে লিপিবদ্ধ করে রাখতে বরাবরই আমার বেশ ভালো লাগে । সেই দিনের ঘটে যাওয়া গল্পটা আজকে ডায়রিতে লেখা শেষ করলাম। কিন্তু আসলে গল্পটির কোন উপযুক্ত শিরোনাম খুঁজে পাচ্ছি না। কি নাম দেয়া যায় গল্পটার। গল্পের নামকরণ করতে গিয়ে হাজারো প্রশ্ন মাথায় এসে ভিড় করছে কিন্তু কোন সদুত্তর খুঁজে পাচ্ছি না । কে ই বা ছিলে তুমি স্বপ্নকুমার ? কেনই বা এসেছিলে হঠাৎ করে ?? কেনই বা চলে গেলে কিছু না বলে ?? আর পথগুলো কেন এমন হয়?? কেন এতোটা পথ এক মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায়। কেন পথের কিছু মানুষকে এতোটা বেশি মনে পড়ে, ভোলা যায় না কেন সহজেই ??

আরে আমি এসব কি ভাবছি ? সময়ের হয়তো কোন অন্ত আছে কিন্তু পথের তো কোন অন্ত নেই, নেই কোন শেষ; কারণ পথ তো অন্তহীন। হয়তো আমার সময় শেষ হলে আমি একদিন হারিয়ে যাবো পৃথিবী থেকে কিন্তু পথ তো থেকেই যাবে পথের মত করে। তাই যতদিন আমার সময় আছে সারাটা জীবন ধরে পথ চললেও তো পথ ফুরাবে না। আর পৃথিবীটাও গোল অতঃএব পথে চলতে চলতে তোমার সাথে আমার আবারও কোথাও না কোথাও দেখা হবেই। হতে পারে সেটা কোন পাবলিক বাসে অথবা ট্রেনে কিংবা সীমাহীন কোন পথের মাঝখানে। আর হ্যাঁ এটা আমার কল্পনাপ্রসূত কোন ধ্যান ধারনা নয়… এটা আমার আত্মবিশ্বাস। তাই গল্পের নামটা দিলাম
*পথ যদি না শেষ হয়* ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.