লিভিং টুগেদার

লেখকঃ হোসেন মাহমুদ


মাঝে মাঝে প্রতিদিনকার গণ্ডির ভিতরের নিয়ম ভেঙ্গে বের হয়ে আসা উচিৎ। তাহলে মুক্ত বিহঙ্গের মত খোলা আকাশে উড়ার স্বাধীনতার সুখ উপভোগ করা যায়। কথা গুলো কয়দিন দরে ইফাদের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। তার জীবনটা যেন একটা ফ্রেমে বাঁধানো সাদা কালো ফ্লিম। প্রতিদিন সেই ঘুম থেকে উঠে অফিস, দুপরে বাহিরে খাওয়া, রাতে বাসায় ফিরে নীরবের সাথে কিছুক্ষণ গল্প করা। আসলে গল্প নয়, কিছুদিন ধরে তার মনে হচ্ছে নীরবের কথা গুলো যেন রবি ঠাকুরের শেষের কবিতা। কবিতা মনে করে অনেকেই শেষের কবিতা পড়তে শুরু করে কিন্তু ভিতরে গিয়ে টের প্রায় শেষের কবিতা তো শুধু মাত্র কবিতা নয় একটা আস্ত উপন্যাস আর কিছু কবিতা সমষ্টি। প্রথম প্রথম ভালোই কেটেছিল ইফাদ আর নীরবের সময় গুলো। খুব বেশী যে সময় পার হয়েছে তা ও না। এইতো বছর দেড়েক হবে। এরেই মাঝে ইফাদের মনে হতে লাগলো নুন পান্তা খেয়ে ছেঁড়া কাপড়ে তালি মেরে সংসার চালানোর মত চলছে তাদের সম্পর্কটা। তাই বলে যে তাদের সম্পর্কে ভালোবাসা চিটে ফোঁটা নেই তাও নয়। ইফাদ নীরবকে সত্যি ভালোবাসে। এত দিন একই ছাঁদের নিচে থাকার বরাত দিয়ে অনায়াসে বলা যায় নীরব ও ভালোবাসে ইফাদ কে। কিন্তু কোথায় যেন একটা গ্যাপ তৈরি হয়েছে তা ইফাদ বুঝতে পারছে না।


পুরুষরা প্রাকৃতিক ভাবেই বহুগামি। এক ফুলের মধুতে পেট ভরলে ও মন ভরে না। নীরবের মাথায় এই কথা কোন কথা সাহিত্যিক এসে না ঢুকিয়ে দিলে ও মাঝে মাঝে সে অনুভব করে। এত চেনা ইফাদকে অনেক সময় তার অচেনা লাগে। এই তো সেই দিন রাতে ইফাদের বুকে মাথা রেখে চিন্তা করছিল এই সেই পরিচিত শরীর যার উপর মাথা রেখে স্বর্গের সুখ অনুভব করত। আর এখন সুখ তো দুরের কথা ইফাদ তার শরীরে উঠলে মনে হয় মাল ভর্তি ট্রাক চড়ে আছে। তারপর ও মুখ ফোটে কিছু বলতে পারে না কিংবা বলতে চায় না ইফাদকে। “লিভিং টুগেদার” ইংরেজির বহুল ব্যবহিত শব্দটার অর্থ যতই মধুর শোনা যায় বাস্তবে কিন্তু তার স্বাদ কতটা মিষ্টি তা টের পায় যারা লিভিং টুগেদারে থাকে। তাই বলে সব লিভিং টুগেদারের কবুতর গুলোর বেহাল দশা হয় তা ঠিক নয়। “ছাইড়া দে মা, কাইন্দা বাঁচি” কথাটা অনেক কাঁপলের মনে ফাল দিয়া উঠে মাঝে সাঁজে। নীরবের মনে তাই হচ্ছে আজকাল। কিন্তু কোন এক অজানা সুতোর টানে ছেড়ে যেতে পারেনা ইফাদ কে।


ইফাদ লক্ষ্য করেছে নীরব আজকাল দেরী করে বাসায় ফীরে। তার ক্লাস ৫ টা অবধি, তারপর লাইব্রেরীতে গিয়ে কিচ্ছুক্ষণ বই ঘাটা ঘাটি, সব মিলিয়ে রাত ৮টা নাগাদ বাসায় ফেরার কথা। ইফাদ অফিস সেরে সাড়ে ৬ টায় বাসার চৌকাঠ মাড়ায়, তারপর টিভির রিমোট কিংবা কম্পিউটারের কীবোর্ড টিপে ঘড়ির কাটা থেকে সময় চিনিয়ে নেয়। ইফাদের মনে হচ্ছে নীরব আজকাল অন্যকিছু নিয়ে ব্যস্ততার পরশা খুলেছ। তৃতীয় কোন মানুষের ছায়া এসে পড়েনি তো নীরবের উপর? ইফাদ বুঝতে পারছে তার মনে সন্দেহর বীজ ফেটে চারা গজাতে শুরু করেছে। কিন্তু সন্দেহ নিয়ে কোন সম্পর্ক টিকে থাকতে পারে না। তারচেয়ে সরাসরি নীরবকে জিজ্ঞাস করলে কেমন হয়? আবার মনে হল নীরব যদি এমন কিছু করে তাহলে কি নিজের অপকর্ম বিনাবাক্যে স্বীকার করবে। এরচেয়ে ঢের ভাল ইফাদ তার পিছনে স্পাই লাগিয়ে সত্যতার মোড়ক উন্মোচন করবে। হয়তো নীরব তার প্রতি বিশ্বত, হয়তো তার অযাচিত মটাই যত নষ্টের মূল, তারপর ক্লিয়ার হতে সমস্যা কোথায়?

ইফাদ আগের মত নীরবকে ভালবাসে না। যদি বাসত তাহলে যে মানুষ সকাল বিকেল কম করে হলে ও ২০ বার ফোন করে খবর নিত তার, আর এখন দিনে একটা কল করলে ও ইফাদের কণ্ঠে দায় পড়ে কল করার সুর বাজে। নীরব ভাবছে আচ্ছা ইফাদ অন্য কোন পুরুষের প্রেমে পড়েনি তো? আগে বাসায় আসার সাথে সাথে ইফাদ নীরবকে একটা ওয়েলকাম কিস, বাসা থেকে বের হবার সময় গুডবাই কিস করত আর এখন অনিচ্ছার স্বত্বে ঘুমানোর সময় এক আধটা কিসের জন্য ঠোঁট বাড়িয়ে দেয়।
ইফাদ নীরবের চেয়ে বছর চারেকের বড়। ভাল বেতনের চাকরি করে, অবিবাহিত। দেড় বছর ধরে বনানীর একটা ফ্লাট ভাড়া করে দুজনে সংসার পেতেছে। খুব ভাল সম্পর্ক তাদের অন্তত দুইজনে তাই ভাবতো কিন্তু সম্পর্কের বয়স বাড়ার সাথে সাথে ধ্যান ধারণা বদলাতে লাগলো দুজনের। প্রতিদিন রুটি আর ভাঁজি দিয়ে নাস্তা সারলে যেমন একঘেয়েমি লাগে তেমনি দৈনিক একটা শরীর একটা কণ্ঠ যেন দিন দিন বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ নীরব ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবার পর পর অনেকে ছেলেই তার শরীর ঘেঁষতে চেয়েছিল। সে পাত্তা দেয়নি। গোঁড়া থেকে নীরব লিভিং টুগেদারে বিশ্বাসী। যে সব বন্ধুরা নিত্য নূতন ফুলের মধু খাওয়াতে অভ্যস্ত, তাদের থেকে নিজেকে গুটিয়ে চলত। কিন্তু এখন সে লিভিং টুগেদারে থেকে বুঝতে পারছে কোথায় একটা ভুল করছে সে। তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ফারদিন কে বিষয় গুলো জানালো। নীরবের কথা শুনে ফারদিন নাক দিয়ে আওয়াজ তুলে শ্যালক হোমসের ভাব মুখে এনে নীরবকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, সব সমস্যার সমাধান সে করবে। তাই ইফাদের ফোন নাম্বার আর তার গতি বিধি সম্পর্কে ভালো করে অবগত হল ফারদিন।

ইফাদ সাধারণত অফিস টাইমে অন্য কাজ করা থেকে নিজেকে বিরত রাখতো। কিন্তু ইদানীং তার মন ভাল নেই। কিংবা কোন এক অজানা সন্দেহ তার মনের সমস্ত সুখ জেটে নিয়ে গঙ্গা পার করে দিয়েছে। তাই এখন অফিস আওয়ারে ফোন পিক করা, ফেইসবুক খুলে সময় অতিবাহিত করা দৈনিক রুটিনের আওতাভুক্ত হয়েছে। আসলে মানুষের মানসিক অশান্তি থাকলে স্বস্তির স্বাদ পেতে অনুচিত জেনে ও অনেক কর্মে পদার্পণ করে। গত কয়েক দিন ধরে ইফাদের একজনের সাথে চ্যাট চলছে। অবশ্য কোন খারাপ কথার আদান প্রদানে নয়, মার্জিত আর সীমাবদ্ধতার মোড়কে থেকে এগুচ্ছে ইফাদের নূতন সম্পর্ক। নীরবের মতই তার বয়স কিন্তু অনেক মেচিউর, ইফাদকে দারুণ বুঝতে পারে সে। কিন্তু ইফাদ নীরবের সাথে বিশ্বাস ঘাতকটা করতে চায় না বিধায় অর্কের সাথে ভাল বন্ধুত্ব রাখার বদ্ধপরিকর। কারণ ইফাদ খুব ভাল করেই জানে নীরব তাকে তার মত করেই ভালোবাসে। হয়তো সম্পর্কে একটা ক্ষণিকের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তার জন্য নূতন পোশাকে নিজেকে মুড়িয়ে নূতন কারো সঙ্গে নূতন করে মনের আদান প্রদান করার মানসিকতা ইফাদের নয়।

সেইদিন ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরীতে “দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্যা সী বাই আর্নেস্ট হেমিনগওয়ে” বইটা খুঁজে পাচ্ছিল না নীরব। তাই পাবলিক লাইব্রেরীতে গিয়ে খোঁজ করছে সে। ওখানে পরিচয় হয় মবিনের সাথে। প্রথম পরিচয়ে ভাল ঠেকেছে নীরবের কাছে। বয়সে তার চেয়ে বড় হলে ও সম্মান সূচক বাচনভঙ্গি তাকে মুগ্ধ করেছে বার বার। তাই লাইব্রেরীর সামনের সিঁড়িতে বসে পুরো বিকেলটা কাটিয়ে বাসায় ফেরে নীরব। আসার সময় সাথে করে নব পরিচিতের নাম্বারটা মোবাইলে সেভ করতে ভুলেনি। তার একদিন পরেই মবিন তাকে কল দেয়। দুজনে প্রাথমিক পরিচিতির পর্ব পেরিয়ে জানা শুনার দিকে দৌড়চ্ছে। কয়েকদিনের মাথায় বন্ধুত্বটা অনেক গাড় রঙে রঞ্জিত হতে লাগলো। ইফাদের প্রতি তার ডিপ্রেশন যখন চরমে তখন তার মনে তিল থেকে তালে রূপান্তরিত হতে লাগল মবিন। সময় পেলেই দুজনে ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে ঘুরাঘুরি করে। দিন দিন যদি ও সম্পর্কের ভিত্তি মজবুত হচ্ছে কিন্তু নীরব তার সীমালঙ্ঘন করেনি। সে জানে এবং মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে তার ভালোবাসার মানুষ একমাত্র ইফাদই।


মুখে মন ভোলানো হাসি আর ভিতরে অন্য কারো সাথে ঘেঁষাঘেঁষি এই নিয়ে চলছে ইফাদ আর নীরবের সংসার। নীরব চায়ের তৃষ্ণার ছুতোয় কিচিনে গিয়ে ইফাদ ল্যাপটপে ওয়্যারলেসে প্রবলেম হচ্ছে বলে বারান্দায় গিয়ে চালিয়ে যায় গোপন সম্পর্ক। তারা দুজনেই বুঝতে পারে তাদের সম্পর্কটা নাটাইর সুতো চিড়ে অনেক আগেই উড়ে গেছে কিন্তু উড়তে উড়তে ও সুতোটা আটকে আছে ছাঁদের জং ধরা রডের সাথে। তার কিছু দিন পর ইফাদ অর্কের সাথে দেখা করার জন্য বনানীর ধাবাতে যাচ্ছে। আর কাকতালীয় ভাবে নীরব আর মবিন সেইদিন রিকশা করে গুলশান যাচ্ছে। ইফাদ তার গাড়ীতে অর্ককে তুলে সবে সিগন্যাল পার হবে বিপরীত রোডের প্রথম রিকশায় চোখ যেতেই কষে গাড়ীর ব্রেকে ছাপ দেয়। তাদের গাড়ীটা এমন জায়গায় দাঁড়ীয়ে পিছনে শ খানিক গাড়ী, ইচ্ছে করলে ও পিছনে সরতে পারবে না। নীরব মবিনের সাথে গল্পে মজে আছে তাই প্রথমে খেয়াল করেনি, তার সামনের ব্লু কালারের কারটা তার অতি পরিচিত। এরই মধ্যে সিগন্যালে সবুজ বাতি জ্বলে উঠল, ইফাদ কোন রকমে মাথা গুঁজে রোড ক্রস করছিল। নীরবদের পিছনের গাড়ির কর্কশ হর্নে নীরব আসে পাশে তাকায়। ব্লু কারটা তাদের ক্রস করতেই নীরবের চোখ পড়ে ড্রাইভারে সীটে বসা থাকা নত মাথার লোকটার উপরে। তাকে একবার দেখেই সে চোখ নুনে মাথা নিচু করে ফেলে। নীরব নিজেও অপরাধী আর ইফাদের পাশের সিটে ও বসে আছে অন্য কেউ। কাক খাবার ছিনিয়ে খাওয়ার সময় চোখ বন্ধ করে খায়, কাক ভাবে সে যেহেতু কিছু দেখতে পারছে না তাহলে দুনিয়ার কোন প্রাণী তাকে ও দেখতে পারছে না। সত্যি কি তাই? মাথা লুকীয়ে দুজনে চুপিসারে রাতে বাসায় ফীরে।

রাত দুটো বেজে কুড়ি মিনিট ইফাদ নীরব দুজনে বিছানায় পড়ে ঘুমাচ্ছে। রাতে বাসায় ফীরে অপরাধী ভেবে দুজনের কারো মুখে কথা ফুটেনি। তাই প্রয়োজনীয় কাজ সেরে দুজনে ঘুমাতে গেল। রাত গড়িয়ে ভোরের দিকে দুজনের চোখে ঘুম নেই। দুদিকে মুখ করে শুয়ে আছে তারা। রাত তিনটার দিকে ইফাদ উঠে রুমের লাইট অন করে বিছানায় বসে। নীরবের দিকে তাকিয়ে বলে,
-আমি জানি আমার মত তুমি ও ঘুমাওনি।
স্বাভাবিক ভাবে নীরব চোখ খুলে বিছানায় উঠে বসে।
ইফাদ আবার বলতে লাগল,
-একটা জিনিষ খেয়াল করেছ, আমরা কোন দিকে এগুচ্ছি? কোথায় নিয়ে যাচ্ছি আমাদের সম্পর্কটা কে?
-হুম জানি। কিন্তু আমার প্রশ্ন হল, তুমি আমাতে সুখী না সেইটা মুখ ফুটিয়ে বলতে পারতে?
-তুমি বলনি কেন?
নীরব চুপ থাকে ইফাদের কথা শুনে। ইফাদ আবার বলে,
-আচ্ছা যাই হয়েছে আমরা বুঝতে পারছি দুজনের মাঝে সীমাবদ্ধ সম্পর্ক থাকার পর ও অন্য কারো ছায়া খুঁজে বেড়াচ্ছি আমরা। তারমানে আমরা দুজনের কেউ হ্যাপি নয় এই সম্পর্কে। যে সম্পর্কে মিথ্যা আর অভিনয় মূলধন হয় সেই সম্পর্ক অচিরেই দেউলিয়া হয়ে যায়।
-আমি ও একমত ইফাদ। এইটার সমাধান কি?
-সমাধান হচ্ছে আমাদের ভিন্ন পথে হাঁটতে হবে।
-যেমন?
-যেমন আমাদের ক্লিয়ার হতে হবে আমরা আসলে কি চাই?
রাত বাড়তে থাকে এই দিকে দুজনের শান্তিপূর্ণ আলোচনা ও চলতে থাকে সম্পর্ক নিয়ে। অবশেষে দুজনে একটা সিদ্ধান্তে এসে উপনীত হয়েছে যে, তারা দুজনে দুজন থেকে আলাদা থাকবে কয়েকদিন। এবং তারা ইচ্ছে করলে তাদের পছন্দের যে কাউকে বাসায় আনতে পারবে। তবে শর্ত হল এক রাতের জন্য। একই রাতে দুজনে অন্য দুজনের সাথে রাত কাটাবে। যদি তারা ওই দুই মানুষের সঙ্গে মনের প্রশান্তি নিয়ে রাত্রি যাপন করতে পারে তাহলে দুজনে ক্লিয়ার হয়ে যাবে তাদের সম্পর্ক টেনে হেঁচড়ে আগানোর দরকার নেই।

আজ রাতে ইফাদ নীরবের সেই মহেন্দক্ষন। রাত ১০ টার দিকে নীরব একজনকে নিয়ে গেস্টরুমে ডুকে। তার কিচ্ছুক্ষণ পর ইফাদ আসে অন্য একজনকে নিয়ে। রাতে চারজনে বসে কিচ্ছুক্ষণ গল্প করল। তারপর দুই রুমে দুই গ্রুপ বিভক্ত হয়ে গেল। ভোর চারটা বাজে ফ্রিজ খুলে ঠাণ্ডা পানি খুঁজছে ইফাদ। পানি নিয়ে বান্দায় গেল সে। বান্দায় প্রবেশের মুখেই আবছা আলোয় একজন ছায়া মানব দেখতে পেল ইফাদ। নীরব বসে আছে ইজি চেয়ারে। ইফাদকে দেখে নীরব একটু হেসে বলে,
-কি এখনো ঘুমাওনি?
-তুমি ঘুমাওনি কেন?
নীরব চুপ করে থাকে। বুঝতে পারছে না সে কি বলবে। তার ঘুম আসছে না। সত্যি কথা হল, তার অস্বস্তি লাগছে অন্য কাউকে নিজদের ফ্লাটে দেখে। সে নিজের রুমের অন্য মানবকে যেমন নিতে পারছে না তেমনি ইফাদের রুমের ভদ্রলোককে ও সহ্য করতে পারছে না। নীরব রাতে রুমে ঢুকে দরজা লাগানোর সাথে সাথে ঝাঁপিয়ে পড়ে ছেলেটার উপর। কিন্তু মিনিট দুয়েকের মাথায় যখন ছেলেটা তার কাপড় খুলতে লাগলো তখনি তার অস্বস্তি লাগা শুরু হল। অনেক চেষ্টা করে ও সে শরীর মাখামাখি উপভোগ করতে পারছে না। একবারের জন্য ও ঐ ছেলেটার দিকে নিজের উলঙ্গ ঠোঁট গুলো এগিয়ে দেয়নি। নীরব নিস্তেজ হয়ে গেছে দেখে ঐ ছেলে জিজ্ঞাস করছিল কি হয়েছে? নীরব তার জবাব দিতে পারেনি। দুই ঘণ্টার মত চেয়ারে বসে রুম ছেড়ে বেরিয়ে আসে নীরব। তারপর কিচিনে গিয়ে চা বানিয়ে বান্দায় বসে। বান্দায় যাওয়ার আগে ইচ্ছে করছিল ইফাদকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে যাবে। মাঝে মাঝে তার ঘুম না আসলে কাঁচা ঘুম থেকে ইফাদকে তুলে ফেলত নীরব। তারপর ভোর অবধি চা আর গল্প হত সময় কাটানোর হাতিয়ার। বান্দায় গিয়ে নীরব ভাবতে লাগলো তার এমন হচ্ছে কেন? তারা দুইজনে ইচ্ছা করে অন্য কারো সাথে রাত্রি যাপনে সায় দেয়। কিন্তু কিসের পিছুটানে তাকে শরীর খেলায় অগ্রসর হতে দিচ্ছে না।

১০

নীরবকে দেখে ইফাদ বুঝতে পারল তার মনের ভাবনার রেল গাড়ীর একটা ভোগী তার ভীতরে ও চলছে। ইফাদ রাতে দরজা বন্ধ করেই চুপচাপ বসে পড়ে বিছানায়। শরীর সায় দেয় তো মন আগায় না। তার পাশে বসা ছেলেটা সুন্দর। রমনা থেকে তুলে এনেছে রাতে। নীরবের বয়সী হবে বোধহয়। কিন্তু তার মাঝে সে নীরবের ছায়া দেখতে পারছিল। কেন যেন মনে হচ্ছিল সে কোন ভুল করছে। মনের সাথে যুদ্ধ করে কিছু না করেই একটু আগে রুম থেকে বেড়িয়ে যায় ইফাদ। বান্দায় এসে নীরবকে দেখে তার মানসিক অবস্থা আরও চরম হয়ে যায়। তার মানে তারা দুজনে ভুল করতে যাচ্ছিল?
ইফাদ নীরবের কাছে গিয়ে ইজি চেয়ারে নীচে বসে নীরবের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে,
-তুমি ঠিক আছো নীরব?
-তুমি কি ঠিক ছিলে ইফাদ?
দুজনে আবার চুপ হয়ে যায়। একটু পর নীরব ইজি চেয়ার থেকে নেমে ইফাদের মুখোমুখি বসে। ইফাদ বুঝতে পারছে নীরব ফুফিয়ে ফুফিয়ে কাঁদছে। ইফাদ তাকে এক হাতে জড়িয়ে ধরে তার মুখ টা আরও কাছে নিয়ে বলে,
-নীরব আমি কিংবা আমরা দুজনে ভুল করেছি। আসলে আমরা দুজনে ভালোবাসার সুতোয় বন্ধী। তোমাকে ছাড়া আমি অপূর্ণ তা আজ রাতে খুব ভাল করে বুঝতে পারছি। আমি ঐ ছেলের হাতটা ছুঁয়ে দেখিনি। যখন তার দিকে তাকিয়েছি বিছানায় তোমাকে দেখতে পেয়েছি। আমাদের গত দেড় বছরের রাত গুলী বার বার ঘুরে ফিরে আমার চোখের সামনে ভেসেছে। আর তোমাকে এই অবস্থায় দেখে বুঝতে পারলাম আমার ভিতরে যে ঝড় বয়ে যাচ্ছে তা তোমাকে ঘ্রাস করেছে। আমারা আসলে দুজন দুইজন ভালোবাসি।

ইফাদের কথা গুলো শুনে নীরবের কান্নার শব্দ আরও তীব্র হতে লাগলো, ইফাদ ও খেয়াল করেনি কথা গুলো বলতে বলতে কখন যে তার চোখের কোনে দু ফোঁটা জল এসে থেমেছে। নীরব কান্না জড়ানো কণ্ঠে বলে,
-ইফাদ আমি সেই প্রথম থেকেই একজনে বিশ্বাসী সেইটা তুমি জানো। কিন্তু মাঝখানে আমার কি হল আমি জানি না। সেই তুমি আমার ভালোবাসাকে আমার অচেনা লাগতে শুরু করল। তোমার উপর একধরনের বিতৃষ্ণা জন্মাতে লাগল আমার মনে। এইটা হয়তো একাধারে একই ছাঁদের নিচে একই ছকে দিন কাটানোর জন্য হতে পারে। তোমার উপরে আমার সন্দেহর ঘোর লাগতে আরম্ভ করল তাই তোমার পিছনে আমার বন্ধুর কাজিনকে লাগিয়ে দিলাম। হাঁ ইফাদ অর্ক আমার পরিচিত। ওকে আমি আর ফারদিন তোমার পিছনে স্পাই হিসাবে লাগিয়েছিলাম। কিন্তু মজার কথা হল তুমি তার সাথে বন্ধুর মতই ছিলে। কোন দিন ও লিমিট ক্রস করনি। তখন থেকেই আমার ভিতর সন্দেহর রেশ কাটতে লাগলো।
ইফাদ মুচকি হেসে উত্তর দিল,
-নীরব তোমার সাথে যাকে রিকসায় দেখেছিলাম সে আমার ফ্রেন্ড মবিন। তাকে আমিই লাগিয়েছিলাম তোমার পিছে। কিন্তু তুমি ও তার সাথে বন্ধু হিসাবেই ছিলে। তোমার কোন খারাপ দিক সে দেখেনি। আমি ও তখন ক্লিয়ার হতে শুরু করেছিলাম তুমি শুধু আমার প্রতি বিশ্বস্ত। আর আজ রাতে ব্যাপারটা চাঁদ সুরুজের মত পরিষ্কার হয়ে গেল।
ইফাদের কথা শুনে দুজনে এক চট হেসে নিলো।
তারপর দুজনে বুঝতে পারে আসলে লিভিং টুগেদারে থাকতে গেলে এমন সমস্যা আসতেই পারে। দুজনের মাঝে একঘেয়ামিতা কিংবা খানিকটা বিষণ্ণতা আসা মানে এই নয় যে সে বিশ্বাসঘাতক। কিংবা পর পুরুষের সান্নিধ্য পেয়ে আমাকে আগের মত ভালবাসছে না। আসলে একটা সম্পর্ক যদি সত্যিকার ভালোবাসার বাঁধনে বন্ধী থাকে, শত বাঁধা বিপত্তিতে ও সহজে তা ভাঙে না হয়তো ইফাদ নীরবের মত খানিকটা মচকায়। তবে সম্পর্কে এই বোরিংনেসটা কাটাতে দুজনকেই এগিয়ে আসা উচিৎ। মাঝে মধ্যে বাহিরে ঘুরতে যাওয়া, যে কোন দিবস উপলক্ষে গিফট দেয়া। আর সবচেয়ে বড় কথা একজন আরেকজনের প্রতি সম্মান ও ভালোবাসায় আস্থা রেখে প্রতিদিন নিত্য নূতন ভাবে আবিষ্কার করা।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.