অঙ্কুরে নিরবে

লেখকঃ অলিখিত কাব্য

“ক্যাম্পাস থেকে মাত্র ফিরলাম। শার্ট প্যান্ট ছারছি। হঠাত শিশু কান্নার আওয়াজ। মনে হল আমার ফ্লোর এর মধ্যে থেকেই কান্নাটা আসছে। কিন্তু আমিতো ফ্লোরে একাই থাকি। তাহলে কাঁদছে কে? হইত দরজার বাইরে হবে। প্যান্টটা আর না খুলে আবার ফিটিং করে দরজা খুলতে গেলাম। দেখি,আমাদের নিচ তলার আংকেলের ছোট ছেলেটা (৭ বছর বয়স)। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। বললাম,
-কি হয়েছে শুভ? কাঁদছো কেন?
-ভা…..ই…য়া….য়া.…ভা…ই…য়া…য়া… উ..পরে….য়্যা য়্যা য়্যা।।।।
আমি তার কথার কিচ্ছুই বুঝলাম না। আবার বললাম,
-কি হয়েছে ভাইয়া,আমি ত তোমার কথা কিচ্ছুই বুঝতে পারছি না। আন্টি(ওর আম্মা) বকেছে?
শুভ আমার কথার উত্তর না দিয়েই কাঁদতে কাঁদতে আমার হাতটা ধরে নিচে যাবার জন্য টানতে লাগল। আমি কিছুই না বুঝতে পেরে উদ্দেশ্যহীন ভাবে তার পিছন পিছন যেতে লাগলাম। ঢুকলাম তাদের ফ্লোরে। দেখলাম কেউ নেই। আংকেল ব্যাংকে জব করে আর আন্টি হাই স্কুলের টিচার। সেই জন্য হইত বাড়িটা ফাঁকা।
বললাম,
-কি ব্যাপার শুভ তোমাদের বাড়িতেতো কেউ নেই। তাহলে কি হয়েছে তোমার?
সে আমাকে তার ভাইয়ার রুমের দিকে নিয়ে টানছে। গেলাম সেদিকে। তার ভাইয়ার রুমে ঢুকতেই আমি আচমকা চমকে উঠলাম। অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে আসল,
-শান্ত তুমি এইটা কি করলে!!!!
কাপড়ের (বিছানার চাদর) সাথে গলা পেচিয়ে ঝুলন্ত ফ্যানের সাথে শান্তকে দেখেই আমার নিজের মাথায় যেন ঘুরপাক খেতে লাগল। এই আমি কি দেখছি? তাড়াহুড়া করে উল্টে পরা চেয়ারটাকে সোজা করলাম। চেয়ারের উপর উঠে শান্তর গলা থেকে কাপড়ের ফাসটা খুললাম। নিচে নামালাম। নার্ভ চেক করলাম। নিজের অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে আসল,ইন্নালিল্লা হি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন। এখন আমি কি করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। শুভকে কিছু বলেও তো কাজ হবেনা। সেতো ছোট। কি থেকে কি হল? এক্ষনি আংকেল আন্টিকে ফোন দিতে হবে। ওহহ সীট,ফোনটাও তো রুমে। দোড় দিলাম আমার রুমে। কিন্তু আর যাওয়া হলনা। দেখি শান্তর পড়ার টেবিলে তার ফোন। এইটা থেকেই ফোন দিতে হবে। ফোনটা নিলাম। আংকেল আন্টিকে ফোন দিলাম। বললাম,
-সর্বনাশ হয়ে গেছে আপনারা এক্ষনি বাড়ি চলে আসেন।
তারা কারন জানতে চাইলে আমি কারন টা না বলেই ফোনটা কেটে দেই। ফোনটা টেবিলে রাখতে গিয়ে হঠাত চোখ পরল,একটা খোলা ডায়েরির উপর। তাতে শেষ পাতায় লিখা আছে-
*তুমি কাওকে ছাড়বেনা বাবা!*
আমার মনের ভীতর কেমন একটা খটকা লাগল। নিশ্চয় শান্ত কারো উপর জেদ করে আত্মহত্যা করেছে। কিন্তু এইটা আমাকে পড়তে হবে। শুভকে বললাম,
-তুমি দাড়াও আমি আসছি।
এই বলে ডায়েরিটা আমার রুমে আনলাম। রুমে রেখে আবার সেখানে গেলাম। কিছুক্ষন পর শান্তর বাবা মা চলে আসল। পুলিশকে খবর দেওয়া হল। কিন্তু আংকেল আনটি তার ছেলেকে পুলিশের হাতে না তুলে দিয়েই কারো উপর কোনও দাবি না রেখেই ছেলেকে কবর দেবার ব্যাবস্থা করলেন। সেই দিন রাত্রে আমি শান্তর
ডায়েরিটা নিয়ে বসলাম, তাতে লিখা আছে,

***আজ ১৮জানুয়ারি,২০১০***
“আমি নতুন ফোর এ ভর্তি হলাম। ছুটিতে নানুর বাড়ি গ্রামে গেলাম। লোকটার নাম কালাম। বয়স ২৫+হবে। আমরা মামা ডাকতাম। সেদিন সে আমাকে মাঠে ধান খেত দেখাতে নিয়ে গেল। খেত আইলের পাসে সে আমাকে পাজাকোলা করে তার কোলে বসাল। বুঝতে পারলাম,আমার পিঠের নিচে নরম মাংসে কি যেন গুতা দিচ্ছে। লম্বা সাইজের কি যেন শক্ত শক্ত মনে হল। ব্যাপারটা বুঝলাম না। সেখানকার এক বন্ধুকে ব্যাপারটা বললে,সে বলে খবরদার শান্ত তুই আর কখনো ভুলেও ওর সাথে যাবিনা। ও এই রকমি। আমাদের সাথেও এইরকম করেছে বেশ কয়েকবার। কিন্তু বুঝিনা কালাম মামা এই রকম করে কেন?

***আজ ১০মে,২০১১***
“সেদিন আব্বু আম্মু ঢাকা গেলেন। মায়ের নিবন্ধনের জন্য। বাড়িতে রেখে গেলেন আমাকে। পাশের বাসার আন্টিকে বলে গেলেন তার ছেলে জাহিদ (আমার থেকে দুই বছরের বড় হবে) যেন আমার সাথে খেলে। বিকেল হল। জাহিদ আমাদের বাসায় এল। কম্পিউটারে কার্টুন দেখতে লাগলাম। খুব হাসছিলাম দুজন। হাসির ছলে সে আমাকে বারবার জড়িয়ে ধরতো। তার হাত দুইটা বারবার আমার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় চেপে ধরতো। আমার খুব বিরক্ত লাগত। কিন্তু বুঝতাম না কেন এইটা করতো। পরদিন আম্মু আসলে তার সাথে আর খেলবনা বলে বলি!

***আজ ০৯জুন,২০১২***
“রানা আমার স্যার।বাসায় পড়িয়ে যান আমাকে।আজ পড়াতে বসে তাকে কেমন কেমন যেনো দেখছি। কড়া কড়া প্রশ্ন করছে,আর যদি না পারছি তো তিনি আমার গাল টিপে দিচ্ছেন। মনে হচ্ছে তিনি রাগের মাথায় টিপছেন,এই রকম একটা ভাব নিয়ে আছেন। মাঝে মাঝে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় হাত দিচ্ছেন। বুঝতাম না স্যার এইরকম কেন করতো? কিন্তু এই কথা আমি কাওকে বলতাম না। তবে স্যারের ব্যাবহার ধিরে ধিরে আর ও খারাপ হওয়াতে তার কাছে আর পড়বনা বলে বাবাকে বলি।

***আজ ১০ফেব্রুয়ারি,২০১৪***
“বাসে করে স্কুল থেকে ফিরছি। আজ বাসে অনেক ভীড়। বসতে জায়গা পাইনি। তাই দাড়িয়ে আছি বাসের মধ্যে। আমি সহ অনেক লোক দাড়িয়ে আছে। যত লোক বসে আছে তার চেয়ে বেশি দাড়িয়ে। একেবারে ঠেসাঠেসি করে। চলতে থাকল বাস। এক সময় বুঝতে পারলাম, পিছন থেকে কার যেন একটা হাত এসে আমার সামনে পিছে কি খোঁজা খুঁজি করছে। আমি যেভাবে দাড়িয়ে ছিলাম সেভাবেই দাড়িয়ে আছি। একটু এদিক ওদিক হব যে তার কোনও সুযোগ নেই। এক সময় দেখলাম,সেই হাতখানা এসে আমার পিঠের নিচের মাংসকে খামচে ধরল। নিজের অজান্তেই চিতকার দিয়ে উঠলাম। কিন্তু কেউ শুনতে পেলনা আমার কথা। হাতটাকে যে সরাবো তার কোনও সুযোগ নেই। এক সময় কাঁদতে লাগলাম। চোখের জলে তার হাত পর্যন্ত ভিজে গেল তবুও সে হাত সরাল না। সারা রাস্তা সেই নির্জাতন সহ্য করতে করতে বাসা আসলাম। কিন্তু চক্ষু লজ্জায় তার প্রতিবাদ করতে পারলাম না।কেনো জানি আমি অন্য ছেলে গুলোর মত কঠোর হতে পারিনা!

***আজ ০২জুন,২০১৪***
“বাবা গেছেন অফিস এবং মা স্কুলে। বাড়িতে আমি আর ছোট ভাই শুধু। চতুর্থ তলা মুন্নি আন্টিদের বাসা গেলাম আমি আর আমার ভাই। একা একা ভাল লাগছিলনা তাই তার ছেলে দ্বীপের সাথে একটু গল্প করতে গেলাম। মাঝে মাঝেই যায় তার কাছে। আমরা একি ক্লাশে পড়ি। আজ ও গেলাম তাদের বাসা। দেখি বাসায় শুধু আংকেল। দ্বীপ তার মায়ের সাথে মার্কেট গেছে। আমাদের দেখে আংকেল বসতে দিলেন। আমরা বসলাম টিভির রুমে। দেখি আংকেল এক সময় উঠে তার রুমে চলে গেলেন। একটু পর আবার আসলেন। আংকেল কে বললাম, আমরা চলে গেলাম আংকেল। আংকেল বললেন, শান্ত তুমি একটু পর আইসোতো।।। তোমাকে একটা জিনিস দিব। বুঝলাম না আংকেল কি দিবে। কিন্তু পরে বুঝতে পারলাম,যখন আংকেলের রুমে আবার আসি। এক সময় যখন দেখি আমার জ্ঞান ফিরেছে তখন আংকেল আমার মাথায় পানি ঢালছে। সুস্থ্য হলে পাজাকোলা করে আমাদের বাসায় রেখে গেলেন তিনি। শেষ মুহুর্তে একটা কথায় বলে গেলেন, শুনো শান্ত,তুমি যদি এইসব কাওকে বলেছ তো মরেছ। কারন এইটা আমি ভিডিও করে রেখেছি। ভিডিওর বেপারটা কতটুকু সত্য তা জানি না।তবে উনি আমাকে রীতিমত শাসিয়ে গেলেন!
****
বাবা আমি আর বাঁচতে পারলাম না,শেষ পর্যন্ত কিনা নিজের বাবার বয়েসি একজন? তাই আজ চলে গেলাম তোমাদের ছেড়ে অনেক দুরে। যেখানে অন্তত এইসব মানুষ গুলা থাকবেনা। আমি বড়ই ভুল করে দিয়েছি,ছেলে হয়েও জন্মগতভাবে অপ্রত্যাশিত কিছু মেয়েলি আচরন নিয়ে জন্মগ্রহন করে।যার কারনে পৃথিবীর মানুষ গুলো সবাই এমন করে গেলো আমার সাথে!মেয়েদের মত আচরন নিয়ে জন্মালেও তোমাদের লালন পালন আর আমার বিবেক তা কখনই আমায় শিক্ষা দেয়নি ওই পশুগুলোর মত জঘন্যভাবে রক্ত মাংস ছিড়ে খেতে!বিপথগামি হয়ে শুধু শরীরের স্বাদ নিতে!আমিও তো সবার মতই একই স্রষ্টার সৃষ্টি!তবে আমার সাথেই কেনো এমন হয়ে আসল ছোট থেকেই!আমিতো ইচ্ছে করে এমন হইনি বাবা! আমাদের মত ছেলেদের কোনও দাম নেই বাবা এই সমাজে। সরি বাবা, শেষ মুহুর্তে তোমাদের সাথে দেখাও করে যেতে পারলাম না। তুমিও ভাল থেক মা। আল্লাহ বোধায় এই দুনিয়ায় আমাকে আর চায়না। কারন এইসব থেকে বাঁচার জন্য,তাদের শাস্তির জন্য আমি অনেকবার আল্লাহর কাছে কেঁদেছি। কিন্তু আল্লাহ আমার কথা শুনেনি বাবা।কিন্তু আমি এমনটা চাইনি! বিশ্বাস করো বাবা,আমি সত্যি এমনটা চাইনি! তুমি ওদের ছাড়বেনা বাবা। সব্বাইকে উচিত শিক্ষা দিবে!

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.