ছেঁড়া টি-শার্ট

লেখকঃ অলিখিত কাব্য

-উফফ! প্রাঞ্জল?
বড্ড বেশি বিরক্ত লাগছে এখন। চলো আজ ফিরে যাই,অনেক ক্লান্ত হয়ে গিয়েছি। কাল না হয় আবার আসব!
-চুপ করো! কথাই বলোনা তুমি। প্রতিদিন এসে কি শুধু ঘুরেই যাবো? কিছুই তো পছন্দ করে দিতে পারো না,তারউপর চলে যাই চলে যাই করে খামাখা চিল্লাচিল্লি শুরু করে দাও।আসছ কেন তবে? হুহ!
(মনে মনে একগাদা গালাগালি করতে থাকে প্রাঞ্জল ইশাদ কে!)
ঈদের বাজারে শপিং করতে করতে এইভাবেই খুনসুটি চলে প্রাঞ্জল আর ইশাদের মাঝে। প্রাঞ্জল এমনিতেও একটু খিটখিটে স্বভাবের!একটুতেই চটে যায়!ইশাদ যে তাতে বিরক্ত হয়,তা নয়।বরং প্রাঞ্জল কে ক্ষেপিয়েই ও বেশি মজা পায়।প্রাঞ্জল রেগে গিয়ে যখন দাঁত কিরমির করে চেপে চেপে ইশাদকে বকা দিতে থাকে,ইশাদ তখন মুখ লুকিয়ে হাসে!প্রাঞ্জল ছেলেটা এত বেশি খুতখুতে স্বভাবের যে সহজে কোনো কিছু পছন্দ হয় না তার।আড়ং, ইয়েলো,এস্টাসি,আর এম,ব্লু,দর্জিবাড়ি ছাড়াও বাকি সব কয়টা বড় বড় ব্র্যন্ডের ওয়ার হাউজ গুলো ঘুরেও যে ছেলে এখনও একটা টি শার্ট পর্যন্ত পছন্দ করতে পারল না,সেই ছেলে কি করে ইশাদের মত একজন মধ্যবিত্ত আর এত সাধারন একটা ছেলেকে পছন্দ করতে পারে,তাই ভেবে প্রতিবারের মত ইশাদ আবারও কনফিউসড হয়ে যায়।তবু প্রাঞ্জল যে তাকে অসম্ভব ভালোবাসে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।এর প্রমান সে বেশ কয়েকবার পেয়েছে।

আর ওর ভালোবাসার টানেই ইশাদ ছুটি পেয়েও এখনও তাদের বাড়িতে না গিয়ে ঢাকাতেই পড়ে আছে।প্রাঞ্জল জেদ ধরেছে,ঈদটা যেনো ঢাকাতেই করে ওর সাথে!তবে যাই হোক না কেনো,ঈদের আগের দিন হলেও ইশাদকে যে কোনো ভাবে দৌড় দিতে হবে,বাড়িতে মা আর একমাত্র আদরের ছোট ভাইটির কাছে।ওরা যে অপেক্ষায় থাকবে!

-আজ বড্ড বেশি দেরি করিয়ে দিলে আমায়!
বাসার গেইটে এতক্ষনে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে নিশ্চিত!ভাড়া থাকি মশাই! আজ বাসায় ঢুকব কি করে?হুম?সব তোমার দোষ।যেনো আর কোনো ঈদ আসবে না,সব শপিং এইবারেই করে ফেলতে হবে!আর ইচ্ছে করেই যেনো আমায় আটকে রাখো তুমি! আমায় পেলে কি আর যেতে দিতে ইচ্ছে হয়না?

ইশাদ কে দেরি করিয়ে দেয়ার জন্যে, প্রাঞ্জলের সঙ্গে রাগ করে ইশাদ!প্রাঞ্জল তো মহা খুশি,যেনো এটাই চেয়েছিল।কতদিন ইশাদকে কাছে পাওয়া হয়না তার,এই সুযোগটাই যেনো প্রাঞ্জল প্রয়াস করেছিল।কোনো কথা না বলে ইশাদকে নিয়ে গাড়িতে বসিয়ে গাড়ি চালাতে শুরু করল।ইশাদ একটু অবাক হল।

-কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?
-শ্বশুড় বাড়ি। আজ রাতটা ওখানেই থাকবেন!বুঝলেন চান্দু?আর কোনো প্রশ্ন করবেন না!
প্রাঞ্জলের চোখে মুখে দুষ্টমির হাসি।ইশাদ আমতা আমতা করে আবার বলল,
-কিন্তু তোমার মা বাবা? এত রাতে আমি তোমাদের বাসায় গেলে যদি খারাপ ভাবেন?
-এই রামগরু? এত প্যাঁচাল পারো কেন শুনি?আমি একবার বলছি বুঝো নাই?আর এত রাতে আমাদের বাসায় কে জেগে আছে তোমায় দেখার জন্যে? আর দেখলেই বা কি?নিজের শ্বশুড় বাড়িতে যাচ্ছো।এত আনইজি ফিল করার কি আছে?
-বাপরে! বেশ সাহস দেখছি তোমার! সত্যি কি বলতে পারবে তোমার ফ্যামেলি কে আমাদের কথা?
-সময় যদি কোনোদিন সেই পথে দাড় করিয়ে দেয়,তবে তাই করব।নিজেদের লুকিয়ে আর কতদিন?তবু তোমায় হারাতে পারব না!
(কথাটা শুনে ইশাদের চোখে যেনো পানি চলে আসে!কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকে প্রাঞ্জলের দিকে।)
.
সারাদিনের কেনাকাটা আর দৌড়া দৌড়িতে দুজনেই ক্লান্ত।বাসায় ঢুকেই তাই দুজনে গোসল করে ফ্রেস হয়ে নিল।আজ ইশাদ প্রাঞ্জলের বাসা-ই থাকবে।এত রাতে ডাইনিং এ না গিয়ে প্রাঞ্জল তার রুমেই খাবার নিয়ে আসল।
-এ কি! একটা প্লেটে খাবার নিয়ে আসলে যে?তুমি খাবে না? নাকি জাহাপনা এই অধম ক্ষুধার্তকে না খাইয়ে শশ্মানবাসী করতে চাচ্ছেন?
-হুরররর! মোটেও funny নয়!দেখি বসতে দাও আমায়!আমি খাবো!
(এই বলে প্রাঞ্জল খেতে লাগল, আর ইশাদ অসহায় বাচ্চা ছেলের মত ওর দিকে তাকিয়ে রইল।)

-তুমি এমন কেনো গো?
-কেমন গো?
-নিষ্ঠুর!
-থিংকু!
-ওয়ে!তোর মাথার নাট বল্টু সব ঢিলা হয়ে গেছে নাকি?আমি খাবো না?খাবার দিবি?নাকি তোরে খাবো বল?
-আমারেই খা!কেও না করছে?
-গররররররররররররররররর!!!!!!!!!
-হুহ! হা করেন!
-হুহ !খাবো না!
-ওলে!অভিমান করেছে!
-করলে করছি,তাতে আপনার কি?আপনি খান।
-ঢং করো না তো!আমি ইচ্ছে করেই এক প্লেটে খাবার নিয়ে এসেছি,দুজনে এক প্লেটে খাবো আজ।আমি তোমায় খাইয়ে দিব,আর তুমি আমাকে।এতক্ষন মজা করছিলাম।এখন নাও হা কর,খেয়ে নাও।
-কিন্তু চামচ কোথায়?
-আজ চামচ ছাড়াই খাবো,তোমার হাতে।তোমার হাতে খাবার স্বাদ নিব আজ!
-তুমি এমন কেন?
-কেমন?
-একটু বেশিই সুইট!একটা সুইট বাদর!
-হা হা হা. . . .থাক আর সোহাগ করতে হবে না,খেয়ে নিন এইবার।
(দুজন দুজনকে পরম ভালোবাসায় মুখে তুলে খাইয়ে দেয়।ছোট ছোট দুষ্টমি,খুনসুটি,রাগ-ঝগড়া,মান-অভিমান আর ভালোবাসা।)
.
খাওয়া শেষে ইশাদের মনে পরে গেলো তার ব্যাগে রাখা টি-শার্ট দুটির কথা।যার একটি ও প্রাঞ্জলকে গিফট করবে।দুটো টি-শার্ট-ই একই রকম।প্রাঞ্জলের ইচ্ছে ছিল ওরা দুজন একই রকম টি-শার্ট কিনবে।তাই ইশাদ নিজেই করে নিয়েছে একই রকম দুটি টি-শার্ট।একজন ফ্যাশন ডিজাইনিং এর স্টুডেন্ট বলে কথা!আর প্রাঞ্জলকে এর চেয়ে দামি উপহার দেয়ার সামর্থ্যও ওর নেই।বাবা ছাড়া সংসারে হাল ধরেছেন তার মা।স্বামীর রেখে যাওয়া ডি.পি.এস এর কিছু টাকা আর জমিজমা থেকেই সংসার আর দুই ছেলের পড়ালেখার খরচ চালাচ্ছেন তিনি।তাই অনেক হিসেব করে চলতে হয় ইশাদ কে।পড়ালেখার পাশাপাশি দুটো টিউশনি করেও হিমসিম খেতে হয় মাঝে মধ্যে।সেই দিক থেকে প্রাঞ্জল অনেক ধনীর দুলাল।বাবার বিশাল অবস্থা।একমাত্র ছেলে প্রাঞ্জল কে মাথায় চড়িয়ে রাখেন।চাওয়ার আগে সব হাজির করে দেন সামনে।দুই হাতে টাকা খরচ করে প্রাঞ্জল।দুদিন পরপরই ইশাদকে এটা সেটা গিফট দেয় ও।ইশাদের অনিচ্ছা থাকা সত্তেও, বাধ্য ছেলের মত তা গ্রহন করতে হয়।নইলে লংকা কান্ড শুরু করে দিবে প্রাঞ্জল।আর ইশাদ চাইলেও প্রাঞ্জলকে তেমন কিছু দিতে পারেনা।এটা নিয়ে মাঝে মাঝে ওর মন খারাপ হয়।প্রাঞ্জল তখন ওকে বলে,আমার কিছু চাই না।শুধু তুমি থাকলেই হবে।কখনো এইসবের বিনিময়ে কিছু দিতে চাইলে,কোনো জিনিস দিয়ে নয়। তোমার ভালোবাসা দিয়ে তা পুরন করে দিও।

ব্যাগ থেকে টি-শার্টটি বের করে,পেছন থেকে এক হাতে প্রাঞ্জলের চোখ ধরে অন্য হাতে টি-শার্টটি দিয়ে অবাক করে দেয় ইশাদ প্রাঞ্জল কে।একই রকম দুটি টি-শার্ট দেখে প্রাঞ্জল খুশি হয়ে যায়।অরেঞ্জ কালারের টি-শার্ট। ইশাদের নিজের হাতে ডিজাইন করা,এক ভালোবাসার গন্ধ মিশে ছিল ওটাতে। প্রাঞ্জল টি-শার্ট টি পেয়ে এতটাই খুশি হয় যে,খুশিতে ইশাদকে জড়িয়ে ধরে ঠোটে চুমু খেয়ে বসে।ইশাদও জড়িয়ে ধরে প্রাঞ্জলকে সাড়া দেয়।অনেকদিনের সুপ্ত আদিম কামনা নাড়া দিয়ে উঠে দুজনের মাঝে!ভালবাসার স্পর্শকাতর ছোঁয়ার আলিঙ্গনে বেঁধে নেয় একে অন্যেকে!সে যেন স্বয়ং স্বর্গীয় দেবদূত নিজে ঘোষনা করে দেন তাদের স্বর্গীয় ভালবাসার মিলনের!যেন দেবদূতের উপহার সেই অমৃত সুধা পান করে নিচ্ছে দুজন দুজনের থেকে!

মাথার উপর ছাদ না থাকলে,ওই খোলা আকাশের তারা গুলোও আজ সপ্তস্তরে খবর পাঠিয়ে দিত,বাতাসের কানাকানিতে ঝিঁ ঝিঁ রাও ওদের চারপাশে স্বর্গলোকের অবয়ব ধারন করত!দুরের কোনো পাখি হঠাত ডেকে উঠে দুর দুরান্তে সকলকে জানিয়ে দিত এই ভালবাসার কথা! পুর্নতার সমাপ্তিতে,ঘামে ভেজা নগ্ন ক্লান্ত যুগল তখনও একে অন্যের আস্টে পিস্টে জড়িয়ে থাকে,কামের শেষ হলেও,স্থায়ী রয় ভালবাসা!তারপর চুমুর আদরে তলিয়ে যায় নিদ্রলোকে!যেখানে কল্পলোকেও খুজে পায় নিজেদের একই সাথে!

তিনদিন পর-
ফোন বাজছে. . .
বেজে বেজে কেটে গিয়ে আবার বেজে যাচ্ছে. . .
এত সকালে বেঘোরে ঘুমন্ত প্রাঞ্জলের মাথায় যেনো কেও দুটো ইলেক্ট্রিক তার দিয়ে বারবার শক দিচ্ছে!এই শকের যন্ত্রনা এতটাই বেশি যে ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই প্রাঞ্জলের মনে হচ্ছিল যে ও কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ব্রেইন স্ট্রোক করে পটল তুলবে।আলালের ঘরের দুলাল আবার সকালে ঘুমিয়ে অভ্যস্ত!বাপের জন্মেও হয়ত সকালে ঘুম ভেঙ্গে উঠেন না তিনি! তা যাই হোক,বাধ্য হয়েই ফোনটা পিক করল।চোখ মেলে কলারের নামটাও দেখেনি।ফোন ধরতেই,
-এক তালাক!
(প্রাঞ্জল থতমত খেয়ে উঠে বসে পড়ল।ফোনে কলারের নামটা দেখল)
-What!
-দুই তালাক!
-আরে কি হইছে?কি বল এইসব?সাত সকালে কি পেট খারাপ হইছে তোমার?
-তিন তালাক!
-একদম চুপ!এর পরেরটা বললে একদম মাইরাই ফেলব!কি হইছে তাই বল?এত সকালে কি ঘটল??
-কি হইছে মানে?আবার জিগাও কি হইছে?তুমি জানো না?
-না তো!কেন কি হইছে?কেও মারা গেছে নাকি?
-হ্যাঁ!আমি!আমি মরছি!কুলখানি খাইতে আসবা না?
-মানে কি?এইসব কি বলছ ইশাদ?এত রেগে আছো কেনো তুমি? আমার কুটুসের কি হইছে?হুমমম????
-এই খবরদার!একদম ঢং করবানা!সেই কখন থেকে কল করছি আমি?ফোন ধর না কেন?
-আমি ঘুমোচ্ছিলাম ইশাদ!তুমিতো জানই আমি সকালে ঘুমিয়ে থাকি!
-তাই বলে আজকেও?তুমি জানো আমি সেই কখন থেকে অপেক্ষা করছি?আজ না সারাদিন আমরা একসাথে বাইরে ঘুরব?
-oh shitttttt!!!!!! Sorry কুটুস!আমি ভুলেই গিয়েছিলাম!রাতে এলার্ম ও দেয়া হয়নি।আমি এক্ষনি আসতেছি!আর একটু অপেক্ষা কর প্লিজ!
-ok ok. এই শোন!
-হুম বল!
-আমার দেয়া টি-শার্ট টা পড়ে এসো!আমি ওটাই পড়ে এসেছি!তোমার না ইচ্ছে ছিল একই টি-শার্ট পড়ে ঘুরে বেরাব একদিন?আজ তাই হবে!
-okey বাবা!তাই আসছি!now bye
-bye

আবহাওয়াটা সুন্দর আজকের! পরিবেশটাও খুব সুন্দর লাগছে কেনো জানি! দুষ্ট বাতাস খেলা করছে ইশাদের চুলে।প্রাঞ্জল আড় চোখে বারবার ওকে দেখছে।বৈরী বাতাসে ছুটে চলা রিক্সায় মাঝে মধ্যেই দুজনের চোখা-চোখি হয়ে যাচ্ছে! ইশাদের দেয়া টি-শার্টে প্রাঞ্জল কে অনেক বেশি সুন্দর লাগছিল।বাতাসের কারনে ইশাদের নাকে প্রাঞ্জলের গায়ের গন্ধ এসে লাগছিল!ভালবাসার মানুষটির গায়ের চেনা গন্ধ।তবে আজ তা একটু বেশীই তীব্র আর বেশি ভাল লাগছিল!ভালবাসার পাগল করা মৌ মৌ গন্ধ!

ইশাদ আলত করে প্রাঞ্জলের হাতটি ধরে বলে তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে আজ! প্রাঞ্জল তার মুখে চির চেনা মুগ্ধ করা হাসি খানা ফুটিয়ে বলে-তোমাকেও অনেক ভাল লাগছে! তবে প্রাঞ্জলের মনটা একটু খারাপ!ইশাদ আজ সন্ধায় বাড়ি চলে যাবে তার মা আর ভাইয়ের কাছে।আসবে ঈদের পাঁচদিন পর।কয়েকদিন ওদের দেখা হবে না।তাই আজ সারাদিন ইশাদ ওর সাথে কাটিয়ে সন্ধায় বাড়ির উদ্দেশ্যে লঞ্চে উঠবে!

প্রাঞ্জল গাড়ি নিয়ে আসলেও,ইশাদের ইচ্ছা আজ ওকে নিয়ে রিক্সায় চড়ে ঘুরে বেড়াবে সারাদিন।গাড়িতে ওর জার্নি ব্যাগ রেখে এক জায়গায় পার্ক করে এসেছে।রিক্সায় চড়ে ঘুরে বেরাতে ইশাদের নাকি অনেক ভাল লাগে।তারপর সাথে যদি আবার বিশেষ কেও থাকে! সারাটাদিন পানকৌড়ির মত দুজন উড়ে বেড়াল।একসঙ্গে বেশ খানেক সেলফিও ক্যামেরা বন্দি করেছে! একপর্যায়ে ইশাদ তার টি-শার্ট খুলে ফেলল,প্রাঞ্জলকেও খুলে ফেলতে বলল। প্রাঞ্জল তো অবাক!কি করছে ইশাদ এইসব!চারপাশে কত মানুষ!তবু ইশাদের ঝারিতে খুলে ফেলল।প্রাঞ্জল এক পলক ওকে দেখে নিল।ভালবাসার মানুষটি যদি সামনে খালি গায়ে দাড়িয়ে থাকে তবে যেকোন প্রেমিক ই হয়ত কিছু সময়ের জন্যে হলেও অন্যমনস্ক হয়ে যাবে।

ইশাদ নিজের টি শার্টটি প্রাঞ্জলকে দিয়ে,প্রাঞ্জলের টি শার্টটি নিয়ে নিজে পড়ে ফেলল!প্রাঞ্জলকেও তাই করতে বলল!এমন পাগলামীর কারন জানতে চাইলে ইশাদ বলল-‘টি-শার্ট দুটিতে একই ভালবাসায় আবদ্ধ দুটো মানুষের গন্ধ মিশে আছে।একটিতে তোমার,অন্যটিতে আমার্।যখন আমি লঞ্চে করে সারারাত জার্নি করে বাড়ি যাব,তখন এই টি-শার্টে লেগে থাকা তোমার গায়ের গন্ধ আমায় অনুভব করাবে যে তুমি আমার সাথেই আছো।মনে হবে তুমি আমার সাথেই মিশে রয়েছ।আর যখন বাড়িতে গিয়ে তোমায় খুব মনে পড়বে,তখন এর গন্ধ থেকে তোমায় অনুভব করব।ঠিক তেমনি আমার কথা তোমার মনে পড়লে,টি-শার্টটি জড়িয়ে ধরো,মনে হবে তুমি আমাকেই জড়িয়ে আছো!তাই টি-শার্ট দুটি অদল বদল করে নিলাম!ভালবাসার মানুষটিকে সাথে নিতে না পারলেও তার গন্ধ নিয়ে গেলাম!”

ইশাদের এমন অদ্ভুদ সব কথা শুনে প্রাঞ্জল হাসিতে ফেটে পড়ে আর বলে-“এও আমার ভাগ্যে ছিল!শেষমেস তুমি আমায় টি-শার্টের সঙ্গে ই-এ করিয়ে ছাড়লে!হা হা হা . . . .”
-ই-এ মানে?
-নেকু! ই-এ মানে বুঝে না!হা হা হা . . .
(প্রাঞ্জলের কথা শুনে ইশাদ হা হয়ে তাকিয়ে থেকে পরে নিজেও হেসে ফেলে)

রাস্তায় আজ অনেক জ্যাম। বাসায় ফিরতে আজ একটু দেরিই হয়ে যাবে!
সিগনালে বসে আছে প্রাঞ্জল,মনটা ভিষন খারাপ!ইশাদকে মাত্র বিদেয় দিয়ে আসল।যাবার সময় ইশাদ বারবার প্রাঞ্জলের দিকে ফিরে তাকাচ্ছিল।বোঝা যাচ্ছিল ইশাদের খুব খারাপ লাগছে।প্রাঞ্জল অনেক সময় দাড়িয়ে ছিল ওখানে,লঞ্চ ছেড়ে যাওয়া পর্যন্ত।এত মানুষের ভীড়ে ইশাদ মিলিয়ে গেল।অগনিত মানুষ যাচ্ছে যে যার বাড়িতে,আপনজনদের সাথে ঈদ করতে!লঞ্চগুলোর অবস্থা দেখলে ভয় লাগার মত।

প্রাঞ্জলের কেমন যেনো অস্থির লাগছিল,তার উপর ইশাদ কে বিদেয় দিয়ে গাড়িতে উঠার সময় পাশেই দাড়িয়ে থাকা এক রিক্সার সঙ্গে লেগে গিয়ে প্রাঞ্জলের গায়ে পড়ে থাকা ইশাদের টি-শার্টের এক পাশটায় খানিক ছিড়ে গেল।মনটা আরো খারাপ হয়ে গেল।এইসব কুসংস্কার বলে এতদিন মেনে আসলেও,আজ যেনো প্রাঞ্জলের কিছুতেই মন শান্ত হচ্ছে না।
কোন রকমে বাসায় ঢুকেই প্রাঞ্জল কল দিল ইশাদের ফোনে,কিন্তু ইশাদ ফোনটা ধরছে না।কয়েকবার কলের পর ইশাদ ফোনটা ধরল,কিন্তু ওর কোন কথাই বোঝা যাচ্ছিল না।লঞ্চের শব্দ,মানুষের ভীড় আর নেটওয়ার্কের ঝামেলার জন্যে।প্রাঞ্জল মেসেজ দিয়ে দিল যেনো লঞ্চ থেকে নেমেই ইশাদ কল করে,ইশাদও ‘ok, miss u’ লিখে রিপ্লে দিল।
প্রাঞ্জল নিজেকে স্থির করে ফ্রেস হয়ে,খাওয়া দাওয়া করে ঘুমিয়ে গেল, সারাদিন ঘোরাফেরা করে ও অনেক ক্লান্ত আজ!

ঘুম ভাংল দুপুর বারটায়। ফোনটা হাতে নিয়ে চেক করল।কোন কল বা মেসেজ কিছুই আসেনি ইশাদের ওখান থেকে। কিন্তু আরো সকালেই ইশাদের বাড়ি পৌছে যাবার কথা!প্রাঞ্জল সাথে সাথে কল দিল।ইশাদের ফোনটা সুইচ অফ দেখাচ্ছে।অনেকবার চেষ্টা করেও কল গেল না।প্রাঞ্জল ভাবল হয়ত ইশাদের ফোনে চার্জ নেই।অথবা ক্লান্ত ইশাদ বাবু বাড়ি গিয়ে মা’র আদর পেয়ে প্রাঞ্জলকে ভুলে নাক ডেকে ঘুম দিয়েছে।পরে হয়ত কল দিবে।

বিছানা ছেড়ে প্রাঞ্জল ওয়াস রুমে গিয়ে ফ্রেস হয়ে খাওয়া দাওয়া করে নেয়।পত্রিকা হাতে নিয়ে কিছুক্ষন নাড়াচাড়া করে টিভি রুমে গিয়ে দুপুরের খবর দেখতে থাকে,এমন সময় দেখাতে থাকে শেষ রাতে ঘটে যাওয়া লঞ্চ দুর্ঘটনার চিত্র।স্বজনদের কান্নার আহাজারি প্রতিটি খবরের মুল কেন্দ্র আজ।প্রাঞ্জল ভয়ে চুপসে যেতে থাকে। পাসের রুম থেকে প্রাঞ্জলের ফোনের শব্দ শোনা যাচ্ছে,ইশাদ ফোন দিয়েছে ভেবে প্রাঞ্জল দৌড়ে গিয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল ইশাদের ছোট ভাইয়ের নাম্বার থেকে ফোন এসেছে,প্রাঞ্জল ভাবল-হয়ত ইশাদের ফোনে চার্জ না থাকায় ওর ছোট ভাইয়েরটার থেকে কল দিয়েছে।

ফোন পিক করে প্রাঞ্জল হ্যালো বলতেই ওপাস থেকে ইশাদের ভাই কথা বলল। খুব উতকন্ঠা নিয়ে জানতে চাইল ইশাদের সাথে প্রাঞ্জলের শেষবার কখন কথা হয়েছে! ইশাদ এখনও বাড়ি পৌছায়নি।ফোন বন্ধ।টিভি চ্যানেল গুলোতে লঞ্চ দুর্ঘটনার সংবাদ।ইশাদের মা ভাই দুজনেই কাঁদছে। প্রাঞ্জল কিছু সময়ের জন্যে থমকে গেল। কয়েকদিন ধরেই মৃতের লাশ উদ্ধারের কাজ চালাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।স্বজনদের আর্তনাদ আর হাহাকার হৃদস্পন্দন কম্পিত করে।সহমর্মিতা বা আর্থিক কোন সাহায্য তারা চায় না।চায় আপনজনকে। কারো ভাই/বোন,কারো বাবা,কারো মা,কারো সন্তান,হয়ত কারো ভালাবাসার মানুষটি আজ নিরুদ্দেশ।ঈদের খুশি মনে নিয়ে যারা এত দুরের পথ পাড়ি দিয়ে স্বজনদের কাছে ছুটে যাচ্ছিল,তাদের আর বাড়ি ফেরা হয়নি,ঈদের খুশি রুপ নিয়েছে স্বজনহারা কান্নার আর্তনাদে! প্রাঞ্জল নিথর প্রায় পাথরের মুর্তি।এক বুক আশা তবু জীবিত!ইশাদ আজ বা কাল ঠিক চলে আসবে,ও এততা নিষ্ঠুর হতে পারে না কখনও যে তার প্রাঞ্জলকে ছেড়ে থাকতে পারে!

এক মাস পর!
তেঁতুল তলায় বসে আছে প্রাঞ্জল আর ইশাদের ছোট ভাই ইস্তি। এই নিয়ে তিনবার প্রাঞ্জল ইশাদদের বাড়িতে এসেছে।ইশাদের অবর্তমানে নিজেই যেনো তার ভালবাসার মানুষটির অভাব পুরন করার চেষ্টা করছে।ইশাদের বেস্ট ফ্রেন্ড হিসেবে ইশাদের মা প্রাঞ্জলকে নিজের বড় ছেলের মতই আপন করে পেয়েছে।বড় ভাইয়ের মত প্রাঞ্জল হয়েছে ইস্তির সব চেয়ে ভাল বন্ধু। সেইদিন পাওয়া যায়নি ইশাদের লাশ,তাই আজো প্রাঞ্জল অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। ইশাদকে নিয়ে গল্প করছিল ইস্তির সাথে।এমন সময় পেছন থেকে তার কাধে চেনা হাতের ছোয়া অনুভব করতে পারল প্রাঞ্জল।মাথা ঘুরিয়ে দেখল তার ভালবাসা,ইশাদ বাবু মুখে মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে।চোখ দুটো ছলছল করছে ইশাদের,তবু হাসির এক ঝিলিক প্রোটন চোখের জল ভেদ করে বিচ্ছুরিত হচ্ছে। প্রাঞ্জলের চোখ ভিজে এল।অবাক বিস্মিত আনন্দের ধারায় নির্বাক প্রাঞ্জল শুধু ইশাদকেই দেখে যাচ্ছে।

আরে!
গায়ে ঠিক তেমনি অরেঞ্জ কালারের টি-শার্ট দেখা যাচ্ছে।শরীরের গঠনটাও ঠিক তেমন।সেই রকম ভঙ্গিতেই হেটে যাচ্ছে ছেলেটি। নিরিবিলি নির্জন এই খোলা মাঠের এক পাশে প্রাঞ্জল বসে পেছন থেকে দেখে যাচ্ছে ছেলেটিকে।কি ভেবে প্রাঞ্জল উঠে ছেলেটির দিকে দৌড়ে গিয়ে ইশাদ ইশাদ বলে ডাক দিল।ছেলেটি ডাক শুনে ঘুরে দাড়ালেও সে প্রাঞ্জলের ইশাদ নয়। প্রাঞ্জল হতাস হয়ে Sorry বলে চলে আসল।মাথা নিচু করে বসে রইল সেই জায়গায়।ইশাদ প্রাঞ্জল এই জায়গাটাতেই বেশি আসত একসময়। ইশাদের হারিয়ে যাবার পর,কেটে যাওয়া এই দুই বছরে প্রাঞ্জল যতবারই কোন অরেঞ্জ কালারের টি-শার্ট পড়া ছেলেকে দেখে,এক বুক আশা নিয়ে অসহায়ের মত তার দিকে তাকিয়ে থাকে,এই বুঝি তার ইশাদ ফিরে এল!

ইশাদের দেয়া ছিঁড়ে যাওয়া সেই টি-শার্ট পড়ে প্রাঞ্জল রোজ সেই জায়গায় অপেক্ষা করে।ময়লা টি-শার্ট আজো ধোয়া হয়নি।টি-শার্টে মিশে থাকা ইশাদের গায়ের গন্ধে প্রাঞ্জল আজো খুজে নেয় ভালবাসার আদর। সেইদিন ইশাদের এমন পাগলামির জন্যে প্রাঞ্জল অনেক হাসলেও,আজ তাই হয়েছে ওর অন্ধকার ঘরে হাতরে খুজে পাওয়া একটুখানি বেঁচে থাকার আশা।টি-শার্টটি জড়িয়ে ধরে রাত জাগা কান্নার জল ক্লান্তিতে শুকিয়ে যায়!ইশাদের প্রতিটি ছোঁয়ার আদলে যে মায়া জমেছে,টি-শার্টের প্রতিটি সূতোর পরতে পরতে তা ভালবাসার মমতায় জড়িয়ে রাখে! অন্ধকার ঘর,সেই একসাথে তোলা সেলফি গুলো আর এই টি-শার্টটিই আজ প্রাঞ্জলের সংগী।

ওদের ভালবাসায় এমন মোড় কোনদিন আসবে,তা ভাবার মত ছিল না।আনন্দ,খুশি,হাসি আর দুষ্টমিতে ওদের জীবন ছিল রংধনুর মতই রঙ্গিন।বেস্ট ফ্রেন্ডের মত ছিল তাদের বোঝাপড়া!ভালবাসি ভালবাসি বলে কখনো তারা ভালবাসাকে বাসি হতে দেয়নি।প্রকাশ নয়,উপলব্ধি ছিল বেশি।কেননা,প্রকৃত ভালবাসায় প্রকাশ থাকে কম,গভীরতা থাকে বেশি। প্রাঞ্জল কি আজ তবে সত্যি উম্মাদ হয়ে যাচ্ছে!ওর চলাফেরা,কথাবার্ তা,অগোছালো হাবভাব,একা একা কাওকে ইশারা করে কথা বলা,ঝগড়া করা আর গায়ের ওই ময়লা ছেঁড়া টি-শার্টটি দেখে যে কেউ তাই মনে করে নিবে।হয়ত সত্যিই তাই!হয়ত আজ সত্যি প্রাঞ্জল উম্মাদ!

একা একা মাথা নিচু করে বসে থাকা প্রাঞ্জলকে অনেকেই পাশ কেটে এড়িয়ে চলে যেতে থাকে!আর ওদের ভীড়ে প্রাঞ্জল অপেক্ষায় থাকে তার ইশাদের ফিরে আসার!মাঝে মাঝে সেই পরিচিত ঘ্রান বাতাসে যেন ভেসে আসতে থাকে,যেন হঠাত করেই পরিচিত সেই পায়ের শব্দ প্রাঞ্জলের পেছন দিকে মিলিয়ে যায়!প্রাঞ্জল পেছন ফিরে দেখে কেও নেই,শুধু বাতাসে রাস্তার ধুলোয় লুটিয়ে যাওয়া একটা লিফলেট পেপার উড়ে যাচ্ছে!প্রাঞ্জল মুচকি হেসে দেয়!নিজেকে তার সেই লিফলেট পেপারের মতই মনে হয়,ইশাদকে ছাড়া আজ ও একটি লিফলেট পেপারের মতই বেঁচে আছে।হাজারো সুখি মানুষের ভীড়ে একা হয়ে যাওয়া এক দীর্ঘশ্বাস হয়ে! নিস্পলক চোখ থেকে শুধু গড়িয়ে পড়ে দু ফোটা নি:শব্দ কান্নার জল। আবারো বইতে থাকে বৈরী বাতাস।

ঘাস গুলো বাতাসে দুলতে থাকে।লিফলেট পেপারটি উড়ে যেতে থাকে।হয়ত কারো পায়ের তলায় পিস্ট হয়ে আবার বাতাসে ধুলোয় ধুসরিত হতে হতে দুরে কোথাও মিলিয়ে যাবে! ইশাদহীন প্রাঞ্জলের শূণ্য পৃথিবীটা আরো শূণ্যতায় ভরে যেতে থাকে। ঝুম বৃষ্টিতে মিশে যায় এক উম্মাদ প্রেমিকের চোখের জল।মেঘের গর্জন হারিয়ে দেয় তার বুক থেকে বেরিয়ে আসা কষ্ট আর হাহাকারকে! বৃষ্টিতে ভিজে সিক্ত প্রাঞ্জল আবারও তার কাঁধে অনুভব করে সেই ভালবাসার হাতের ছোয়া। কিন্তু আজ আর সে পেছনে ফিরে তাকায় না,বসা থেকে উঠে গিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে হেটে চলে যেতে থাকে! এ তার বদলে যাওয়া নয়,এএক চাপা কষ্টের অভিমান তার ভালবাসার মানুষটির প্রতি!

বারবার শুধু পেছন থেকে ডেকে যায় প্রাঞ্জলকে,কিন্তু ধরা দেয় না!সামনে এসে জড়িয়ে ধরে না!আগের মত প্রাঞ্জলকে আদর করে না!বাচ্চাদের মত ওর সাথে দুষ্টমি করে না!ভালবাসার পরম মমতায় বুকের মাঝে আগলে নেয় না! ময়লা ছেঁড়া টি-শার্ট থেকে আজ হয়ত বৃষ্টিতে ভিজে ধুয়ে যাবে ইশাদের গায়ের গন্ধ।কিন্তু প্রাঞ্জলের মনে ভালাবাসার ঘরে যে ইশাদ পুরোটা জুড়ে আছে,তা কি পারবে এই বৃষ্টির জল ধুয়ে মুছে দিতে? যে হারিয়ে যাওয়া,যে দুরত্ব প্রাঞ্জলের মাঝে ইশাদকে চিরন্তন করেছে,পারবে কি তা পুরন করে দিতে?

সময় চলে যায়! বদলে যায় অনেক কিছু! কিন্তু প্রাঞ্জলের মত উম্মাদ প্রেমিকেরা জীবিত রাখে ইশাদের মত হারিয়ে যাওয়া ভালবাসাকে ফিরে পাওয়ার আশা!

Dedicated To: কোনও এক প্রেমিককে,যে হয়ত এমন করেই হারিয়েছে তার ভালাবাসা কে, যে হয়ত আজো রয়েছে তার ভালবাসাকে ফিরে পাওয়ার প্রতিক্ষায়!

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.