ত্রিমোহনা

লিখেছেনঃ হোসেন মাহমুদ

কয়েকদিন ধরে আকাশ সূর্যের সাথে ঝগড়া করে মুখ গোমরা করে কাল রং দিয়ে ঢেকে রেখেছে তার সারা শরীর। অবিরত বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছে পুরো ঢাকা শহরটা। মিশুকদের ফ্ল্যাট বাড়ীর ছাদটা সে কালের রাজাদের প্রাসাদের মত। বিশাল যায়গা মুখে করে দানবের মত দাঁড়ীয়ে আছে বাড়ীটা। বাহারি ফুল আর সবুজ গাছের টবে ঘেরা ছাদের চারদিক। মিশুক নেভি ব্লু রঙের টিশার্ট পরে বসে আছে ছাদের মাঝখান বরাবর। সবুজের মাঝে ব্লু সাথে মোটা ফ্রেমের ভারী চশমার নিছে থাকা অতিরিক্ত ফর্সা গোলাকার একটা মুখ আর বৃষ্টির টপ টপ ফোঁটা পড়ছে মিশুকের গায়ে। দেখার মত দৃশ্য। কোন ভালো ফটোগ্রাফার দেখলে লুফে নিয়ে ক্যামেরা বন্ধী করতো দৃশ্যটা। ছোটবেলা থেকে মিশুক বৃষ্টি পাগল একটা ছেলে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বৃষ্টিতে ভেজা তার অভ্যাস। শুধু যে ভালোলাগার জন্য বৃষ্টি স্নানে নিজেকে বাসিয়ে দেয় মিশুক তা কিন্তু নয়। আরেকটা ব্যাপার সে লক্ষ্য করেছে বেশ কিছুদিন যাবত তার পিছনে সে এক ছায়া সঙ্গী দেখতে পায়। একটু আগেও একবার দেখেছিলো এক গুচ্ছ কদম হাতে কারো জন্য অপেক্ষায় আছে। গায়ে একটা সাদা ১০০% পিউর কটনের সুতি শার্টে তার শরীরের অনেকটাই দেখা যায়। নেশা ধরবার জন্য ঐ টুকুনই যথেষ্ট। মিশুক এত চেষ্টা করেও তার চেহারাটা আজ পর্যন্ত দেখতে পারলো না। চেহারার দিকে তাকাতেই অস্পষ্ট ধোঁয়ার মত লাগে সবকিছু।
-কু হু কু হু । ধূতেরই ছাই এই বৃষ্টির মাঝে কোকিল আসলো কোথায় থেকে!!
মিশুক চোখ কচলাতে কচলাতে বিছানায় উঠে বসে। বালিশের পাশে ফোনটার দিকে তাকাতেই মনে পড়ে একটু আগে সে স্বপ্ন দেখছিল। কোথায় গেল তার অস্পষ্ট ছায়া মানব? আর এত সকালে ফোন ই বা কে করলো?
মিশুক ফোন না দেখেই বুঝতে পারে এইটা আনিকার ফোন। ঐ বজ্জাত মেয়েটা তার ঘুমের কূলখানি না খেলে তার পেটে সকালের নাস্তা হজম হয় না। ফোনটা কানে ধরে মিশুক,
-ঐ গাধা এখনো ঘুমচ্ছিস?
-দেখ আনিকা কতবার বলেছি আমাকে গাধা ডাকবি না।
-ওহ সরি দোস্ত ভুল হয়ে গেছে। যা তোরে এখন থেকে অনন্ত জলিল ডাকবো। হি হি হি।
-ঐ গাধী হাসবি নাতো। কি জন্য ফোন দিয়েছিস?
-তোর ঘুমের গুষ্টি বেঁছে মিষ্টি খাবার জন্য।
-আবার?
-দোস্ত চেতিশ কেন? ঐ আজ পেজেন্টেশন ভুলে গেছিস?
মিশুকের মনে পড়লো কাল রাতে সব কিছু রেডি করে ঘুমোতে গিয়েছিলো। শুধু টাইটা এখনো আরন করা হয়নি। কোন বেআক্কেলে যে এই পেজেন্টেশনে টাই এর প্রচলন করলো কে জানে। বিরক্তিকর একটা জিনিষ, মিশুকের মনে হয় নিজের গলায় ফাঁস নিয়ে মানুষকে দেখানোর প্রচেষ্টা। এর চেয়ে তার ঢিলে ঢালা গোল গলার গেঞ্জিই ঢের ভালো।
-হা দোস্ত মনে আছে সব কিছু রেডি। শান্ত তোর প্রিপারেসন শেষ তো?
-আরে বাবা জলিল তুই বুঝলি কি ভাবে শান্ত আমাদের সাথে কনফারেন্সে আছে।
-দোস্ত ঢং করিস না তো। এ আবার নতুন কি? তুই সকালে ফোন দিলে দুইজনকে এক সাথেই দিস।
শান্ত টেলিফোনের ও পাশ থেকে বলে উঠলো,
-হাঁ মিশুক আমি রেডি।
লাইনের কন্ট্রোল আবার আনিকার হাতে।
-ঐ তোদের দুজনের যে কোন একজন আমাকে হেল্প করতে পারবি? আর বলিস না সকাল থেকে বৃষ্টি তারপর ও মা গাড়ীটা নিয়ে বেরিয়ে গেল। উপ এখন এই বৃষ্টিতে ট্যাক্সি পাওয়ার সম্ভাবনা ও নাই। তোরা যদি কেউ আমাকে তুলে নিতি। তাহলে তোদের কাছে অনেক কৃতজ্ঞ থাকবে এই অবাগি।

-কথাটা শেষ করার আগেই শান্ত বলে উঠলো ওকে নো প্রবলেম ম্যায় হু না?
শান্তর সাহায্যের তোয়াক্কা করেনি আনিকা। সে মনে মনে আশা করেছিল, মিশুকই তাকে তুলে নিবে। আসলে আনিকার মা গাড়ী নিয়ে বের হয়নি। সে ইচ্ছা করে মিথ্যা বলেছে। সে চাচ্ছিল কিছুটা সময় ধরে মিশুকের পাশে বসে থাকতে একাকী। আর এই চাওয়ার মাঝে কোন অবলা নারীর প্রথম দর্শনের প্রেম কাহিনীর অন্তর্নিহিত কোন রহস্য নেই। হাঁ ব্যাপারটাকে ভালো লাগা বলে চালিয়ে দেয়া যায় কিংবা খানিকটা বেশি। এখন তার মনটাই খারাপ হয়ে গেল মিশুক চুপ করে আছে বলে। সে আবার বলতে লাগলো।
-আরে আমি মজা করছিলাম। গাড়ি বাসার নিছেই আছে। আমি আসছি তোরা জলদি চলে আয়।
খপ করে আনিকা লাইন কেটে দিল। কারণ সে এখন কাঁদবে। তার আবার অন্যের সামনে কান্না করতে লজ্জা লাগে। হুমায়ূন স্যার এ বলে গিয়েছিলেন মেয়েরা কান্না করলে যে কি পরিমাণ বিচ্রি দেখায় তা যদি তারা একবার আয়নায় দেখত তাহলে জীবনে ও আর কান্না করতো না। তাই আনিকা কান্না করার সময় ডেসিং টেবিলের সামনে বসে কাঁদে। আর মনে মনে বলে না হুমায়ূন স্যার আপনার সব কথা সঠিক নয় আমাকে কান্নারত অবস্থায় দেখতে মোটেও খারাপ লাগে না।

মিশুক, আনিকা আর শান্ত স্কুল জীবন থেকে ঘনিষ্ঠ ফ্রেন্ড। এক সাথে খাওয়া, ঘুরতে যাওয়া মারামারি করা সবই চলে তাদের মাঝে। কি করে যে তারা এত গুলো বছর ভালো বন্ধু এ নিয়ে মন মালিন্য আছে সবার। তাদের এক এক জনের চরিত্র এক এক রকম। কেউ কারো ধারে কাছে নেই। শান্ত তার নামের অপরদিকে চলে। মানে পুরাপুরি অশান্ত যাকে বলে। তার দুষ্টামি, পাগলামি আর অতিরিক্ত ফাজলামি সবার সহ্য ক্ষমতার ২” উপরে থাকে। আর আনিকা দেখতে মোটামুটি ধরনের সুন্দরি, কিন্তু নিজেকে আ হা মরি কিছু ভাবে। তার অতিরিক্ত কথা বলার স্বভাব সবার কানে জ্বালা ধরায়। আর মিশুক হল সবচে শান্ত শিষ্ট ভদ্র আর দেখতে ও বেশ। গোলগাল চেহারা অতিরিক্ত ফর্সা আর কোঁকড়ানো চুলের অস্বাভাবিক সুপুরুষ সে। কথায় আছে না বিধাতা সবার মাঝে একটা খুঁত দিয়ে রাখে। মিশুক ও তার ব্যতিক্রম নয়। সে আট দশ জনের মত নয়। তার ভালো লাগে কোন ছেলের হেঁটে যাওয়া দেখতে। তার ভালো লাগে কোন অজানা পরিবেশে তার স্বপ্নের অস্পষ্ট মানবের হাত ধরে রাস্তায় চলতে। কিন্তু তার পরিবার আর সমাজের জন্য নিজেকে প্রকাশ না করে ধুমরে মুচড়ে পার করে দিচ্ছে জীবনটা।

তারা তিন জনেই জানতো তারা এক জন আরেকজন কে ভালোবাসে তবে সেইটা বন্ধুত্বের চেয়ে বেশি কিছু নয়। কিন্তু অঘটনটা ঘটলো গত বন্ধু দিবসে ইউনিভার্সিটির রম্য বিতর্ক অনুষ্ঠানে। বিষয় ছিল “একজন ভালো বন্ধু কি একজন ভালো জীবনসঙ্গী হতে পারে” তাদের তিন বন্ধুর অবস্থান ছিল বিতর্কের পক্ষে। তারা কথায় আর যুক্তি দিয়ে বুঝিয়েছে একজন ভালো বন্ধুই হতে পারে একজন ভালো জীবনসঙ্গী। তাদের যুক্তি গুলো ছিল এমন,

আপনি যদি কাউকে প্রথমেই ভালোবেসে ফেলেন তাহলে তার শুধু একটা দিক আপনার সামনে উন্মোচিত হবে। সেইটা হল ভালো দিক। কিন্তু মানুষের ভালো দিকের সাথে আরও একটা খারাপ দিক থাকে। সেইটার সাথে আপনি সম্পর্কের শেষ দিন ছাড়া পরিচিত হতে পারবেন না। অপর দিকে একজন যখন আপনার বন্ধু হবে তার ভালো খারাপ দিক দুইটাই আপনার চোখের সামনে দিয়ে ঘটবে। আপনি তাকে বুঝতে পারবেন। তাকে জানতে পারবেন সে খারাপ হলেও কতটা খারাপ হতে পারে। একটা সম্পর্কের প্রধান ভিত্তি হল একজন আরেকজনকে বুঝতে পারা আর বিশ্বাস। তাই আপনি যদি বন্ধুকে জীবনসঙ্গী হিসাবে বেঁচে নেন তাতে আপনার প্রত্যাশার চেয়ে প্রাপ্তিটাই বেশী থাকবে।

সেই থেকে শুরু আস্তে আস্তে তাদের মুখ থেকে বের হয়ে যাওয়া কথা গুলা বার বার মনে আসতে লাগলো। এ দিকে তিন জনেই ভিতর ভিতর তাদের ভালবাসার মানুষটিকে নিজের মনের তুলি দিয়ে রাঙিয়ে তুলেছে খুব গোপনে। কিন্তু কেউ কাউকে বলার সাহস পাচ্ছে না। আর ব্যাপারটা হঠাৎ করে হয়ে যাওয়াতে তারা নিজেরাই দ্বিধা ধন্ধে আছে।

মিশুক আর আনিকা ইউনিভার্সিটিতে চলে আসে। দুজনে দোতলার রেলিং ধরে অপেক্ষা করছে শান্তর জন্য। এ দিকে বৃষ্টি ও প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করে বাসিয়ে দিচ্ছে সব কিছু। মিশুক আর আনিকা প্রায় ভিজতে ভিজতে উপরে উঠলো। আনিকা মিশুকের দিকে বার বার তাকাচ্ছে। মেরুন কালারের ফুল হাতার শার্টের সাথে কালো ট্যাঁই খুব মানিয়েছে মিশুকে। গায়ে হাল্কা বৃষ্টির পানি পড়ে মেদহীন শরীরের সাথে শার্টটা মিশে আছে। যে কেউ তার দিকে দুই বার তাকাবেই। বৃষ্টির ফোঁটাতে মিশুকের মোটা গ্লাস অন্ধকার হয়ে গেছে। আনিকা সেইটা খুলে তার উডনা দিয়ে পরিষ্কার করে আবার পরিয়ে দিয়েছে মিশুকে। এখন দুজনেই মাঠের দিকে তাকিয়ে আছে শান্তর জন্য। অবশেষে শান্ত গাড়ী থেকে নামলো। হাতে এক গুচ্ছ বর্ষার কদম ফুল। শান্ত পরে আছে একটা সুতি সাদা শার্ট। আধ ভিজা হয়ে গাড়ী থেকে নেমে এলো শান্ত। সে যখন হাতে কদম নিয়ে সামনে আগাচ্ছিল, ঠিক তখন মিশুকের মনে পড়তে লাগলো তার কল্পনার অস্পষ্ট ছায়া মানবের মুখখানির কথা। হা শান্তর মত তার শরীর। সেই একই রকম চুল। তার মানে তার অবচেতন মন তার ভিতরে শান্তকে তৈরি করেছে এক অস্পষ্ট ছায়া মানবে। তাহলে সে শান্তকেই ভালবাসে? মিশুক কিচ্ছু ভাবতে পারছে না। এইটা কি করে সম্ভব তার বেষ্ট ফ্রেন্ড যে কিনা মেয়েদের পাছায় পাছায় ঘুরে সে আবার তার মনের রাজপুত্র হতে যাবে কেন?

শান্ত উঠে এসেছে দ্বিতীয় তলায়। দুইজনকে এক সাথে পেয়ে বলে,
-কিরে মামরা তোরা এত তাড়াতাড়ি?
মিশুকের মুখে কথা বেরচ্ছিল না। আনিকা বলে,
-চান্দু ঘড়ি কাটা কি তোর বাপ দাদার সম্পত্তি নাকি। তোর কথা মত ঘুরবে। আর কদম চুরি করেছিস কোথায় থেকে?
শান্ত মিশুকের দিকে হাত বাড়িয়ে বলে কিরে দোস্ত আছিস কেমন? ঐ গাধী আমি চোর না। রাস্তায় পেলাম তাই গাড়ী থামিয়ে নিয়ে আসলাম। তুই আবার ভেবে বসিস না যে তোর জন্য কিনলাম।
মিশুকের হাত কাঁপছে। সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিল না। কোন রকমে বলল।
-ভালো। তুমি কেমন আছো?
কথাটা বলেই সে জিব্বাহ কামড় দেয়। দেরীতে হলে ও আনিকা অ্যান্ড মিশুক বুঝতে পেরেছে। মুখ ফোঁসকে বিরিয়ে গেছে তুমি। এত বছরের তুই বলা আজ খানিকক্ষণের আগের দৃশটায় পরিবর্তন করে বানিয়েছে তুমি। প্রেম আসলেই এমন।

শান্ত আনিকার দিকে বার বার তাকাচ্ছে। প্রতিদিনের চেয়ে তাকে আজ বেশি সুন্দরী লাগছে। আজকাল আনিকা যাই পরে শান্তর চোখে ভালো ঠেকে। কারণটা এখনো সে বুঝতে পারছে না। কিছুদিন আগে হলে শান্ত এসে আনিকার জামা নিয়া কটাক্ষ করতো না তা সূর্য পশ্চিমে উদয় হবার ঘটনার মত।

তার কিছুদিন পরে, তারা সবাই ইউনিভার্সিটির ক্যাফেতে বসে আছে। মিশুকের পছন্দের সিঙরা আর চা অর্ডার করছে আনিকা।
আড্ডাটা জমে উঠেছে সবে। শান্ত বলে,
-আর কইস না মামা। কাল রাতে এক ফ্লিম দেখতে দেখতে টাইম শেষ। কি ভালোবাসা যদি দেখতি মামা।
-মুভির নাম নাকি?
-ইফ অনলি।
আনিকা বলে,
-অহ দেখেছিলাম। ওটাতো অনেক পুরানো মুভি। তা শান্ত হঠাৎ করে ভালবাসার মুভির দিকে তোর ঝোঁক গেল কেমন করে রে?
-কেন দেখলে সমস্যা আছে নাকি তোর? মানুষ পরিবর্তন শীল আমি তার ব্যতিক্রম হই কেমনে বল?
-আচ্ছা তো আপনার এই হঠাৎ পরিবর্তনের পিছের কাহিনীটা কি? শান্ত তুই কি কারো প্রেমে পড়েছিস নাকি?
মিশুক ও আনিকার সাথে কণ্ঠ মিলেয়ে বলে, হা শান্ত তোর পছন্দের কেউ আছে নাকি?
-থাকতে ও পারে।
-তা কোন সেই হত বাগি? যার কপালে শুধু বাঁশ আর সাথে সর্বনাশ।
-দেখ আনিকা এ ভাবে বলিস না। আমি কি সত্যি এতই খারাপ একজন মানুষ?
-আরে তুই দেখি সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছিস। মজা করছিলাম দোস্ত। আচ্ছা কি নাম মেয়েটার আমরা চিনি নাকি?
শান্ত চুপ করে থাকে। মিশুক বলে হা শান্ত বল তো কাকে ভালবাসিস তুই?
-না বলবো না আগে তোরা বল? তোরা কাউকে ভালবাসিস কিনা?
কথাটা শুনে আনিকা আর মিশুক লজ্জায় নিচের দিকে তাকিয়ে থাকে। আনিকা আস্তে আস্তে চোখ তুলে মিশুকের দিকে তাকাচ্ছে। মিশুক তাকাচ্ছে শান্তর দিকে।
শান্ত বলে উঠে। হুম এইতো ধরা খাইছো মামা। এই বার বল তোমাদের মাঝে কার ভালবাসার পরশ পড়েছে?
কেউ কোন কথা বলছে না। শান্ত আবার বলতে শুরু করে,
-দেখ আমরা তিন জন এক জন আরেকজনের সব কিছু জানি। শুধু ঐ ব্যাপারটা জানি না। এইটা কেমন কথা। আমাদের তিনজনের ভিতরের কথা গুলো শেয়ার করা উচিৎ। আমি চাই সবাই সবার কথা বলবে।
মিশুক ভয় আর লজ্জায় লাল হয়ে উঠে। কি ভাবে সেই বলবে তার ভালবাসার মানুষ আর কেউ নয় শান্ত নিজে। এ দিকে আনিকার অবস্থা ও আরও খারাপ সে ভাবছে না মিশুকে কথাটা বলতেই হবে। কিন্তু এ ভাবে নয়। তিনজনের ভালবাসার মানুষ কে এক সাথে জানলে কেমন হয়। আনিকার ধারণা মিশুক ও আনিকাকে ভালোবাসে। তাই বুকে সাহস নিয়ে আনিকা বলে,
-আচ্ছা এক কাজ করলে কেমন হয়। কাল তিনজনেই সবার মনের কথা বলবো। তবে সরাসরি নয়। যে যার ভালোবাসার মানুষের নাম লিখে আনবে চিরকুটে। সেইটা সবার সামনে খোলা হবে। একজন আরেক জনেরটা খুলবে।
সবাই একমত কিন্তু মিশুক আছে এক দোটানায় যদি শান্ত তাকে না ভালবাসে তাহলে আনিকা ও জেনে যাবে সে সমকামী। আর তাদের বন্ধুত্বটা থাকবে বলে মনে হয় না। মিশুক বলে,
-কিন্তু আমার একটা শর্ত আছে। আগে আমাদের সবাইকে প্রমিস করতে হবে যে, আমরা একে অপরের কথা জানার পরে আমাদের সম্পর্ক আগের মত থাকবে। আর যদি কেউ অন্য কোন পথের যাত্রী ও হয় তা মেনে নিতে হবে। আর ব্যাপারটা শুধু আমাদের তিনজনের মধ্য সীমাবদ্ধ থাকবে।

শান্ত আর আনিকা মেনে নিলো। কারণ তারাও ভয়ে আছে। যদি কথাটা জানার পরে বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যায়?

পর দিন কাগজের ভাঁজে ছাপা পড়ে আছে তিনজনের নাম। সবাই একজন আরেকজনের দিকে তাকাচ্ছে। অবশেষে আনিকা একটা কাগজ তুলে নিলো, কারণ লেডিস ফাস্ট। সে তুলল মিশুকের চিরকুট। মিশুক নিলো শান্তরটা আর শান্ত নিলো আনিকার চিরকুট। এক দুই তিন বলে সবাই এক সাথে কাগজ খুলে কেউ কোন কথা বলতে পারছে না। শর্ত অনুযায়ী সবাই কাগজ দেখাতে হবে। তিনজনে কেউ কারো দিকে তাকাতে পারছে না। আনিকা চোখের পানি ধরে রাখতে পারলো না। এই প্রথম সে কারো সামনে ফেল ফেল করে কেঁদে দিল। শান্ত আর মিশুকের অবস্থা উপরওয়ালা জানে। তিন জনে কাগজটা টেবিলে রাখল। চিরকুট গুলো ছিল,
শান্ত-আনিকা
আনিকা-মিশুক
মিশুক-শান্ত
কাগজে গুলো টেবিলে রেখে প্রথমে আনিকা দৌড় মারে। মিশুক বসে আছে চেয়ারে। শান্ত কোন কথা না বলে উঠে যায়। শেষে মিশুক ও উঠে বাসায় চলে যায়।

কর্ম ব্যস্ত ঢাকা শহর এখন এক প্রশান্তিতে ঘুমিয়ে আছে। শুধু তিনজনের চোখে ঘুম নেই। কেউ কিচ্ছু ভাবতে পারছে না। শক্ত পোক্ত শান্ত ও ফেল ফেল করে কেঁদে চলছে। মিশুক তার নিয়তিকে দোহাই দিয়ে বসে আছে। আর আনিকা! আনিকা কিছুতেই মানতে পারছে না। মিশুক সমকামী। আর সে একজন সমকামীকে পাগলের মত ভালোবাসে। এখন ভোর চারটা, আনিকা জানে তাদের দুইজনের কেউ এখনো ঘুমাতে পারেনি। তাই একটা গ্রুপ ম্যাসেজ আসে শান্ত আর মিশুকের ফোনে। কাল বিকেল ৫ টায় জিয়া উদ্যানের ব্রিজের উপরে থাকবি।

বিকেল ৫টা। আনিকা কাল রাতে না ঘুমিয়ে কেঁদে কেঁদে চোখ ফুলিয়ে ফেলছে। আজ সত্যি তাকে বিচ্রি লাগছে। মিশুক আর শান্ত ও আসলো। আনিকা মাঝখানে দাঁড়িয়ে। তিনজনে পানির দিকে তাকিয়ে আছে। খুব শান্ত ভাবে আনিকা মুখ খুলে,
-আমরা মানুষরা চাইলেও বিধাতার তৈরি চক্রাকার বৃত্তের বাহীরে যেতে পারি না। এক কঠিন চরম সত্যর বাস্তবতা আমাদের চারদিকে বিদ্যমান। বাস্তবতাকে যেমনি মাঝে মাঝে আপ্যায়ন করে হাসি মুখে গ্রহণ করটা অস্বাভাবিক কষ্টের তেমনি তাকে অবহেলার পাত্রে অগ্রাহ্য করাটা ও অসম্ভব। তাই বলে বলছি না মানুষের দোষ, কষ্টটা অবধারিত যেনও কেন মানুষ বার বার প্রেমে পড়ে? তার সূক্ষ্ম সমাধানের সমতা মিলানো এই কাঁচের তৈরি হৃদয় আর মাটির তৈরি শরীরের পক্ষে সম্ভবপর নয়। আসল কথা হল ভালবাসতে পারা। হাঁ মন আছে বলে ভালোবাসি আবার বাসবো বার বার প্রেমে পড়বো তাই বলে হৃদয়ের খুব গভীরের তৈরি কিছু সম্পর্কের কপালে ঝাঁটা মেরে সীমাহীন দুঃখ বুকে ছাপা দিয়ে ছোট এই জীবন অতিবাহিত করার কোন মানে হয়? তোরাই বল, আমি কি ভুল কিছু বলেছি?

মিশুক এখনো চুপ করেই আছে। শান্ত বলে,
-আনিকা আমি তোকে অনেক ভালোবাসি কথাটা সত্যি আর এই ভালোবাসা এক দিনের নয় যে আম কুড়ানোর মত কুড়িয়ে পেয়েছি ধরে খেয়েছি। তাই তোকে ভুলে যাওয়া কষ্টকর কিন্তু হয়তো অসম্ভব নয়। নিজের ভিতরে কথাটা ছেপে ছেপে কষ্ট পাওয়ার ছেয়ে একবারেই নাহয় পেলাম। আর জানতে ও পারলাম তোর ভিতরে আমার অবস্থান নয় সব টুকুই মিশুকের। আর ভালো না বাসবিই বা কেন। মিশুক তো ভালবাসার মতই একটা ছেলে। হাঁ মিশুক আমি তোকে একটি বারের জন্য ও ছোট করে দেখছি না। তুই সমকামী হস আর যাই হস তুই একজন মানুষ। তোর ভিতরে আমার অবস্থান। আমি আনিকাকে দিয়ে বুঝেছি সত্যিকারের ভালোবাসার প্রতিধ্বনি কতটা মধুর আর বিরহের। তাই তোর ভালবাসাকে অসম্মান করার সাহস আমার নাই। হয়তো তোকে ভালবাসতে পারবো না কারণ আমি সমকামী নয়। কিন্তু তোর ভালবাসার প্রখরতা আমি উপলব্ধি করতে পারি। এইটা সত্যি ভাগ্যর ব্যাপার কেউ কাউকে মন থেকে ভালবাসতে পারাটা। তুই পেরেছিস। তাই আমি তোর কাছে কৃতজ্ঞ দোস্তো।

এইবার কথা বলল মিশুক,
-ভালোবাসা জীবনের একটা অংশ, কিন্তু শুধু ভালোবাসাই জীবন নয়। কাউকে ভালবাসতে পারাটাই বড় কথা শান্ত যেমনটি বললি। হা আমরা একজন আরেকজনকে ভালোবাসি। খারাপ তো কিছু করিনি। ভালবাসা মানুষকে মহান হতে শিখায়। জানি না তোরা কি শিখেছিস তবে আমি বুঝতে পেরেছি পৃথিবীর সব ভালবাসার এই যে একটা পরিণতি পেতে হবে তা কিন্তু নয়। কারো ভালোবাসা পরিপূর্ণ হয়ে শোভা পাবে ঘরের সোন্দজ্জ বৃদ্ধির জন্য রাখা ফুলদানিটার মত। আর কারো ভালোবাসা ব্যর্থ হয়ে উড়ে বেড়াবে মুক্ত আকাশের বুকে। দুটাই ভালোবাসা। ভালোবাসা কে ছোটো করে দেখা ভালোবাসা বাসীদের কাজ নয়। জানি আজ আমরা নদীর তিন মুখের মিলনস্থল ত্রিমোহনায় দাড়িয়ে। তাই বলে নিজেদের পরাজিত ভেবে দুঃখ ভরাকান্ত মন নিয়ে নিজেদের মাঝে কাঁদা চিঁটা ছিটি করার কোন মানে হয় না। আমাদের সম্পর্কে ভালোবাসা ঐ অর্থের না হোক ভালোবাসা তো একটা আছেই। তাই আমি বলতে ছাই নিজেদের ভালোবাসার জন্য যুদ্ধ করে বন্ধুত্বের বলি দিতে ছাই না। হোক না আমাদের থেকেই শুরু, ভালবাসার উপরে বন্ধুত্বের জয়।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.