বিচার

লিখেছেনঃ হোসেন মাহমুদ

গ্রীষ্মকালের উষ্ণতা বাড়ার সাথে সাথে স্কুল কলেজ গুলোতে বনভোজনের একটা হিড়িক পড়ে যায়। রাস্তায় চলাচলের সময় মাইকে ইংরেজি কিংবা সদ্য শিখা হিন্দি গানের গালাগালি মুখরিত বাস গুলো দেখলেই বুঝা যায় ওরা পিকনিক পার্টি। কেউ কেউ আবার ফাটা গলায় মমতাজের ফ্যাইটটা যায় ও টান মারে। এক কথায় ওরা আজকালকার ডিজুস পোলাপান। একটা পাবলিক বাস থেকে মোটামুটি ধাঁচের পাতে দেয়ার মত একটা গান ভেসে আসছে। পাবলিক বাস হলেও তুলি, মুহিন, জীবন, ঊর্মি, সামির আর জোসেফ বেড়াতে যাচ্ছে কুষ্টিয়ায়। এই ৬ সদস্য বিশিষ্ট দলের মাঝে সামির ছাড়া অন্য সবাই ফার্মের মুরগী গোত্রীয় প্রাণী। বাবার টাকার ঠেলায় পড়ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু কঠিন বাস্তবতার কাছে তারা ডোবার পুঁটি মাছ ছাড়া আর কিছুই নয়। সবার নাড়ির ঠিকানা যদিও গ্রাম কিন্তু গ্রামের কথা শুনলে টিস্যু পেপার খুঁজে নাক সিটকানোর জন্য। সামিরের চাপা চাপিতে বাধ্য হয়ে যাচ্ছে তাদের গ্রামের বাড়ীতে। লালন আর রবি ঠাকুরের কুটি বাড়ির লোভ দেখাতে হয়েছে তাদের বারংবার। ৫ জনের তড় জোর দেখে মনে হচ্ছে গ্রাম নয় নেপাল যাচ্ছে মাউন্ট এভারেস্ট জয় করতে। প্রত্যেকের ব্যাগের গাম বুট সাথে টর্চ লাইট পারলে হাতে হারিকেন টাও নিয়ে নিতো। শুধু জোসেফ যাচ্ছে তলা বিহীন ঝুড়ির মত। তার স্বভাবটাই আট খোঁটে টাইফের। সভ্যতার কালযাত্রায় ঈসা খাঁ, শায়েস্তা খাঁর পাট তো চুকিয়ে গেছে সেই বহু কাল আগে। কিন্তু জোসেফের বাবার পুরাণ ঢাকার রাজকীয় হাল আর টাকার তেজ এখনো জমিদার শ্রেণীর মতই। কথায় আছে না আল্লাহ্‌ যাকে দেয় চপ্পল ফাট কে দেয়। জোসেফের বেলায় কথাটা শত ভাগ সত্য। মডেলদের মত দেখতে যেমন গায়ের রং তেমনি মেদহীন শরীর। যদি বাংলা সিনেমায় পাট করতো চোখ বন্ধ করে বলে দেয়া যেত অনন্ত জলিল থেকে ভালো করবে সে। তার সেই বাবার জমিদারী আর উপরবালার দান শরীরটার জন্য পা মাটিতে পড়ে না। এই দিকে ইউনিভার্সিটির মে গুলো যা, জোসেফ নামে রোমিওটা প্রতিদিন সকালে নাস্তা করে এক রমণীর সাথে আর রাতের বেলায় ডিনার করে পিৎজা হাটে অন্য এক ললনার সাথে। তারপর ও মেয়ে গুলা যেন হামা গুড়ি দিয়ে তার পিছনে লাইন দিয়ে থাকে। শুধু মেয়ে না ছেলেরা ও কম যায় না। নতুন এডমিশন নেয়া কোন মেয়েলি ছেলে ফেলে তার বুকে হাত নিয়ে ছাপ মারতে ও দ্বিধা করে না জোসেফ। এক দিন তুলি দেখে ফেলেছে জোসেফ ফুঁসলিয়ে এক ছেলেকে কিস করছিলো লাইব্রেরীর বুক সেলফের পিছনে। সেই থেকে জোসেফের ব্যাপারটা অনেকই জেনে যায় সে উভয় সেক্স লাইক করে। তাতে জোসেফের কিচ্ছু যায় আসে না। সে হল ডোন্ট কেয়ার টাইফের ভদ্রবেশী। তাই কুষ্টিয়ায় তাকে নিয়ে যাবার কোন ইচ্ছা ছিল না কারোরেই কিন্তু সমস্যা বাঁধে মুহিনকে নিয়ে। মুহিন জোসেফের ভালো ফ্রেন্ড। তাকে ছাড়া সে যাবে না। এ দিকে তুলির হল ঠোঁট কাঁটা স্বভাব। সত্য কথা বলতে তার জিব্বাহ মুখিয়ে থাকে সবসময়। এইতো একটু আগেও বেঁধে গেছে জোসেফের সাথে তুলির।
তুলির হাতে শরৎ চন্দ্রের “শ্রীকান্ত”। পুরনো সস্তা দামে নিউজপ্রিন্টে তৈরি মোটা কাগজের দুই দিস্তা সমান বইটা। জোসেফ তুলির সামনের সিটে বসা। মাঝ বয়সী এক লোক বসেছে তার পাশের সিটে। বন্ধু বান্ধব কেউই তার সাথে বসতে রাজী নয়, এমন কি মুহিন ও না। যে তার সাথে বসবে তাকে কানের ডাকতর এর কাছে যেতে হবে অতি তাড়াতাড়ি। তাই পাশে ঐ মাঝ বয়সী লোকটার জন্য সুবিধা করতে পারছে না জোসেফ। বার বার তাকাচ্ছে তুলির দিকে। তুলি আবার বই এর পোকা। বই পেলে জামাই লাগবে না টাইফের মেয়ে। এ দিকে পড়ছে আবার শরৎ, লাইন বাই লাইন ধরে না পড়লে কিছু বোঝা যাবে না। জোসেফ আর থাকতে পারলো না। ইরি মরিচের ঝালের স্বাদ নেয়ার সখ জেগেছে তার।
-এই চশমিশ বইতে যখন ডুবে থাকবি লাইব্রেরী ছেড়ে আসলি কেন?
-তাই তো আসলাম কেন? তাও আবার তোর মত গাধার সাথে।
-দেখ তুলি। মেজাজ খারাপ করবি না। পড়ছিস তো সেইকালের শরৎ এ কালের হুমায়নে তোর অভক্তি থাকবে এইটাই স্বাভাবিক। শুন, গ্লাসটা টেনে যদি ঐ সাধুভাষার কেটকেটানি টা ফেলে দিস তাহলে ঢাকায় গিয়ে পিৎজা হাটে তোর জন্য এক রাতের ডিনার ফ্রি।
এইবার তুলির মেজাজ গেছে চড়ে।
-ঐ গাধা যখন তখন শুনি শুধু পিৎজা হাট আর পিৎজা হাট করিস বলতো বিশ্বের প্রথম কোন দেশ পিৎজা বানায়।
-কে আবার অ্যামেরিকা।
-এই জন্যই তোরে গাধা বলি। ইটালি। আমেরিকা না। যদি আবার বিরক্ত করিস বইটা নয় জানালা দিয়ে তোকে ফেলে দিবো।
তুলির ধমক খেয়ে জোসেফ শান্ত ছেলের মত বসে আছে। কারণ সে জানে তুলি মাথা মোটা মেয়ে যা বলে তা করে ফেলে।
অবশেষে আরিচা ঘাঁটের ষ্টীমার আর বিশাল জার্নি করে তারা পোঁছালো কুষ্টিয়াতে।
সামিরদের বাড়ী কুমারখালীর ছেউড়িয়াতে। বাড়িটার চারপাশ ঘিরে সবুজ আর সবুজ। দেখে প্রাণ ভরে যায় সবার। তুলি সামির কে বলে, দোস্ত তোদের এলাকায় ভালো পুলা থাকলে জানাস তো। বিয়ে করে বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে প্রাণ ভরে নিশ্বাস নিবো এই সবুজের সমারোহে। সামির হেসে উঠে তুলির কথা শুনে বলে, দোস্ত রাতখানা আসতে দেয়, তারপর বুঝবি কত ধানে কত চাল। যখন বিদ্যুৎ থাকবে না আর হাতি সাইজের মশা বাহিনীর সামনে নিজের রক্ত উপটকোণ হিসাবে উপহার দিবি তখন টের পাবি।

সামিরের বাবা প্রবাসী। মা আর ছোট দুই বোনকে নিয়ে নির্জনজ্জাল পরিবার।
সামিরের মায়ের হাতে বাটা মসলার তরকারী খেয়ে সবাই প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
প্রথম দিন জার্নি করে সবাই টায়ার্ড। তাই বিছানায় পীঠ ঠেকাতেই গভীর ঘুমে তলীয়ে গেল। এ দিকে মশারা ও আরামচে তাদের কাজ সেরে চম্পট।

তারপর দিন সবাইকে নিয়ে গ্রাম দেখতে বের হল সামির। তার গ্রামের বন্ধু বান্ধবদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। তুলি আর ঊর্মি তো যা দেখেছে তাতেই অবাক। কি ভাবে ঢেঁকিতে পাড় দিতে হয়, কি ভাবে নকশি কাঁথা ভুনতে হয়। কি ভাবে এত সুন্দর আলপনা অ্যাঁকে গ্রামের মেয়েরা। সব কিছু ক্যামেরা বন্দী করতে ভুলছে না। শুধু গোমরা মুখে তাদের সঙ্ঘ দান করে যাচ্ছে জোসেফ। তার যেন সব কিছুতেই বিরক্তি। মনে হয় দুনিয়াতে আসাটাই তার প্রধান বিরক্তির কারণ। সামিরের সাথে তার হাই স্কুলে গেছে সবাই। স্যারদের সাথে দেখা করে ফিরছিল, পথে দেখা হল অয়নের সাথে। অয়ন হেডমাস্টারের ছেলে। এইবার উচ্চ মাধ্যমিকে A+ পেয়েছে। অয়ন কাছে এসে সবাইকে সালাম দিল।

-সামির ভাইয়া কেমন আছেন।
-এইতো অয়ন ভালো আছি ভাইয়া। তুমি কেমন আছো? তোমার রেজাল্টের কথা শুনে ভালো লাগলো।
অয়ন লজ্জা পেয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে বলে,
-এইতো ভাইয়া এ আবার এমন কি, এখন A+ পান্তা ভাতের মত। তো শুনলাম আপনার বন্ধুরা এসেছে ঢাকা থেকে। ইনারাই কি তারা?
-হুম। আসো পরিচয় করিয়ে দেই।
অয়ন হ্যান্ডসেক করতে চাইলো না সাথে বিশেষ করে মেয়ে দুটোর সাথে। অয়ন অনেক সহজ সরল এবং ভদ্র একটা ছেলে। এলাকার সবাই খুব পছন্দ করে অয়নকে। কিন্তু তার চাল চলনে কিছুটা মেয়েলী ভাব আছে। যার জন্য সে নিজেকে গুঁটিয়ে রাখতে বেশি পছন্দ করে। এদিকে জোসেফের সাথে হ্যান্ডসেক করতে গিয়ে যেন সুপার গুলুতে অ্যাটকে যায় তার হাত। জোসেফ বুঝতে পারে এইটা তার খাবার। জিনিষ খারাপ না, নাস্তা করা যায় মালটা দিয়ে। এই সব ভাবতে ভাবতে জোসেফ অয়নের হাতের মাঝে মধ্য-আঙ্গুল দিয়ে সুড়সুড়ি দিতে থাকে, চোখ টেপে জানান দিতে ও ভুল করেনি সে। অয়ন লজ্জায় লাল হয়ে নীচের দিকে তাকিয়ে থাকে। জোসেফ তাকে অফার করে তাদের সাথে যাওয়ার জন্য। অয়ন প্রথমে না বলেছিল। কিন্তু সামিরের জোরাজোরি তে আসতে বাধ্য হল।
সবাই আগে আগে হেঁটে যাচ্ছে জসেফ আর অয়ন পিছনে আস্তে আস্তে হাঁটছে আর সাথে চলছে জোসেফের ছেলে পটানোর ফর্মুলা।

তুলির ব্যাপারটা মোটেও ভালো ঠেকছিল না। সামিরকে ডেকে বলে,
-দেখ দোস্ত জোসেফের দিকে খেয়াল কর। ছেলেটার মুণ্ডু চিবিয়ে খাচ্ছে। দেখ তার ব্যাপারে আমরা সবাই জানি। গ্রামে আবার কোন অঘটন না ঘটিয়ে দেয় সে।
-না রে দোস্ত তেমন কিছু হবে না। অয়ন খুবই ভালো একটা ছেলে। সে ঐ ধরনের নয়।
-আরে ভালো ছেলে বিধায় তো বলছি। সে বুঝবে না জোসেফের মার পেঁচ।
-বাদ দে দোস্ত কিচ্ছু হবে না।
সবাইকে নিয়ে লালনের আখড়ায় ঘুরতে গেল সামির। সাথে জোসেফ টেনে নিয়ে এলো অয়নকে ও। মুহিন আর জীবন সাদা পোশাক কিনে বসে গেল গানের মজলিসে। মাঝে মাঝে টান মারছে লালন গীতিতে। ঊর্মির একটা ব্যাপার ভালো লাগলো না। লালনের কবর এর পাশেই গানের জলসা বসানো। একটা মানুষের কবরের পাশে গান বাজনা ভালো দেখায় না। তুলির ধমক খেয়ে অফ হয়ে গেল ঊর্মি। তারপর রবীন্দ্রনাথের কুটি বাড়ীর দিকে গেল সবাই। কুটি বাড়ীতে রবীন্দ্রনাথের ব্যাবহার করা কিছু জিনিষ আর গোঁটা কয়েক ছবি ছাড়া আর কিছুই নেই।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতেই বাড়ীর দিকে রওয়ানা দিল সবাই। জোসেফ এখনো অয়নকে কব্জা করতে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছে। রাতে জোসেফ অয়নকে বলল,
-তুমি জানো তুমি অনেক সুন্দর।
অয়ন লজ্জা পেয়ে নীচের দিকে তাকিয়ে বলল তুমি ও অনেক সুন্দর ভাইয়া।
-অয়ন তোমাকে আমার অনেক পছন্দ হয়েছে।
-আমার ও আপনাকে।
-আরে এ পছন্দ সে পছন্দ নয়।
-কোন পছন্দ?
-আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি অয়ন।
অয়ন ছেলে ছেলে ভালোবাসার ব্যাপারটা জানে না তেমন নয়। ইন্টারনেটের কল্যাণে আজকাল অজপাড়া গাঁয়ের মানুষ ও সারা বিশ্বের সাথে সম্পৃক্ত। অয়নের হাতে আছে চাইনিজদের বানানো এক মোবাইল নাম তার সিম্ফনি। সব আছে ঐ একটা যন্ত্রে। পারলে হলুদ বাটা, মরিচ বাটার কাজটা ঢুকিয়ে দিতো চাইনিজরা। অয়নের একটা ফেসবুক অ্যাকাউন্ট আছে। সেখানে গে দের নিয়ে নানান দিক সে দেখে। কিন্তু বাস্তবে কখনো কারো সান্নিধ্যে যায়নি সে। ছেলে বেলা থেকে সে জানে ছেলেদেরকে তার ভালো লাগে। কিন্তু আজকে জোসেফ তার নিজের পৃথিবীর সাথে নিজেকে পরিচয় করিয়ে দিল। যদিও সে মনে মনে অপেক্ষা করছে এমন একজন সুপুরুষের জন্য। তার কাছে মনে হল আকাশের চাঁদ আজ তার হাতের মুঠোয়। সে জোসেফকে কি বলবে বুঝতে পারছে না। সেই দিনের মত অয়ন রাত করে বাসায় ফিরল।

পরদিন সকালে অয়ন সামিরদের বাড়ীতে এসে হাজির। ব্যাপাটা সামির ভালো ভাবে নিতে পারছে না। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতে ও পারছে না। জোসেফ তাকে দেখে মহা খুশি। নাস্তা করেই বের হয়ে গেল দুইজন। সামিরদের বাড়ি থেকে মাইল খানিক দূরে এক বিশাল ফসলের মাঠ আছে। সবুজ পাট গাছে ভরে উঠেছে মাঠের পর মাঠ, যতদূর দৃষ্টি যায় ততোদূর সবুজ পাটের খেত। পাট কাটতে ব্যস্ত কয়েকজন কৃষক। মাঠেই গাদা করে রাখা হচ্ছে সেগুলো। জোসেফ আর অয়ন খেতের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। জোসেফের হাতে হাত রেখে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে অয়ন। মাঠের পাশে এক খাল ছিল, ওখানটায় বসলো দুজনে। সূর্য যদিও মাথার উপরে কিন্তু রোদের তেজ তেমন একটা নেই বললেই চলে। অয়ন মুখ খুলল,
-জোসেফ ভাই আমি ও তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি।
কথাটা শুনা মাত্রই জোসেফের আর তয় সইছে না। এ দিকে ও দিক তাকিয়ে কিস করতে লাগলো অয়নকে। অয়ন তাকে বাঁধা দিতে পারলো না। ভালোবাসার উপহার কষ্টের হলে ও তাকে অবহেলা করার ক্ষমতা সবার থাকে না। অয়নের ও নাই। তাই জীবনের প্রথম ভালোবাসার প্রথম উপর চোখ বুজে উপভোগ করছে সে। এক পর্যায়ে দুজনেই মাত্রাতিরিক্ত উত্তেজনার সম্মুখীন হয়ে যায়। আসে পাশে লোক জন তেমন একটা নাই। আছে কয়েকজন কৃষক সেতো বহু দূরে। তাই বাধ্য হয়ে পাশের পাট খেত বেঁছে নিলো তারা। অয়ন এত শান্ত একটা ছেলে কিন্তু তার আজকে নিজেকে নিজে বিশ্বাস করতে পারছে না। যৌন উত্তেজনায় মানুষ স্বাভাবিক থাকতে পারে না। যে ভাবে হোক কর্ম সাধনটাই লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। তাই বলে বলছি না সবাই পারে না। হা কেউ কেউ হয়তো পারে তারা হয়তো অন্য কোন ধাতু দিয়ে গড়া।

পাট ক্ষেতের মাঝখানে অয়নকে উপুড় করে শুইয়ে দিল জোসেফ। কোন দিকে তাকানোর সময় তার নাই। তাই প্যান্টটা হেঁচকা টান মেরে খুলে ফেলে জোসেফ। অয়ন ভিতর ভিতর ভয় পাচ্ছে। জীবনে প্রথম যৌন খেলায় লিপ্ত হতে যাচ্ছে সে। অয়ন জোসেফ কে বলে দিল প্লীজ টেক ইট ইজি। জোসেফ বলে সমস্যা নাই। অ্যাই লাভ ইয়উ নাহ। অয়ন নিজের বিশ্বাস ফিরে ফেলো।
কিন্তু জোসেফ হল দুনিয়ার বদ। এমন জিনিষ হাতে পেয়ে সে কি আবার শান্ত থাকতে পারে। কিছু বুঝে উঠার আগেই জোসেফ চরম সুখের আশায় শরীর এর সর্বচ্চ জোর দিনে আঘাত করে অয়ন কে। অয়ন চিৎকার দিয়ে উঠে।
রক্তে এসে বিঁধে জোসেফের জামায়। সেই দিকে তার কোন খেয়াল নেয়। কুকুরের মত সে তার কাজ সারা নিয়ে ব্যস্ত। অয়ন অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে।
এদিকে পাঠ ক্ষেতের পিছনে কাজ করছে কৃষক ফজর আলী। চিৎকারের আওয়াজ পেয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে পাট ক্ষেতে এসে ঢুকল সে। মাঝখান বরাবর এসে যেন তার মাথায় বাজ পড়লো। জোসেফের সেই দিকে কোন খেয়াল নেই। সে চালিয়ে যাচ্ছে তার কাজ। ফজর আলীর গলার আওয়াজে সামনে তাকায় জোসেফ। কিছু বুঝে উঠার আগেই প্যান্টটা হাতে নিয়ে দৌড় দেয় জোসেফ। তাকে আর পায় কে। সে লাফাত্তা। এ দিকে ফজর আলীর চিনতে ভুল হয়নি অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকা ছেলেটা হেডমাস্টারের। তার চিৎকার শুনে আশে পাশের আরও কৃষক এসে জড়ো হল সেইখানে।

জোসেফ আর কোন দিকে না তাকিয়ে ঢাকার বাস ধরল। এ দিকে গ্রামে খবরটা বিদ্যুৎ গতিতে ছড়াতে লাগলো। করিম মিয়ার চায়ের দোকানে বসে টিভি দেখছে কয়েকজন। রতন এসে ব্যাপারটা জানিয়ে দিল। সবাই ছি ছি করতে লাগলো মাস্টারের ছেলে এত খারাপ? না চেয়ারম্যানের কাছে নালিশ নিয়ে যাইতেই হইব। এর একটা বিহিত চাই। এ সব কাজের জন্য গ্রামে এত অঘটন ঘটে।
তালাক মিয়া বলে, এই পুলারে গ্রাম ছাড়া করতে হইব। না হলে আমাদের পোলাপান গুলাও যাইব।
কি কও মিয়রা?
সবাই মাথা নেড়ে তাকে সায় দিল।

সময় বিকেল ৫টা, ইতোমধ্যে গ্রামের প্রায় সব মানুষ চলে এসেছে হাই স্কুলের সামনে। মনে হচ্ছে রাজনিতিক দলের জনসভা। সামির আর তার বন্ধুরা ও এসেছে মাঠে। চেয়ারম্যান আর গ্রামের গণ্য মান্য লোকের উপস্থিতিতে বিচার হবে এই অপকর্মের।
অয়নের জ্ঞান ফিরেছে দুপুর নাগাদ। তার শরীরে এখনো রক্তমাখা সেই প্যান্ট। খালি গায়ে মাঠের সামনে আম গাছের সাথে বেঁধে রেখেছে গ্রামবাসী। এত জন এত কথা বলে তাকে গালি দিচ্ছে। অয়ন মাটি থেকে চোখ তুলতে পারছে না। লজ্জা না তার সাথে ঘটে যাওয়া এক নির্মম বাস্তবতার কারণে সে বুঝতে পারছে না। হেডমাস্টারকে বিচারে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিলো, তিনি আসেনি। তিনি বলেছেন অয়ন নামে তার কোন ছেলে নেই।
বিচারে সবাই অয়ন আর অয়নের পরিবারকে খারাপ কথার ঝুলি থেকে একটাও দিতে ভুল করেনি।
এক প্রভাবশালী নেতা বলে, তাকে ন্যাড়া করে জুতার মালা পরিয়ে গ্রামে চক্কর দেয়ান হক।
মতলব সাহেব বললেন, নাহ তাকে সবাইর সামনে মাঠে ফুঁতে ঢিল ছুঁড়ে মেরে ফেলা হক।
অয়নের এক চাচা বিচারে এসে এক কোনায় বসে আছেন। তিনি কোন কথা বলতে পারছেন না। শুধু চুপ করে শুনে যাচ্ছেন।
একজনে বলল, আরে তারে তার পরিবার সহ গ্রাম ছাড়া করা হোক।
এইবার সবাই হৈ হৈ করে উঠলো। না তারে আমাদের হাতে ছেঁড়ে দেন। মিনিট দশেকর মাঝে শেষ করে দেই।
এইবার চেয়ারম্যান বললেন ঐ মিয়ারা তোমরা কি শুধু জটলা পাকাইতেই থাকবা। একটা সমাধানে আসো মিয়া। আমি কইতে চাই। সবার সামনে না, কয়েকজন বয়স্ক লোক মিলে সিধান্ত নিক কি করা যায়।
সবাই সম্মতি দিল তাতে। ৫ জন বিচার কার্যালয় থেকে উঠে খানিকটা দূরে গোল হয়ে আলোচনা করছে।
পরিশেষে বিচারের রায় দেয়ার পালা।
বুড়া কিসিমের এক লোক দাঁড়িয়ে বলল, চেয়ারম্যান সাহেব সহ আমরা সিধান্ত নিলাম, এই ছেলে আমাদের গ্রামের কলঙ্ক। তাকে গ্রামে থাকতে দেয়া যায় না। আজ থেকে তার পরিবারকে এক ঘরে করে দেয়া হল। গ্রামের কোন মানুষ তাদের সাথে কথা বলতে পারবে না। হেডমাস্টারকে তার পদ থেকে সরে দাঁড়াতে হবে। আর তার সাথে যে ছেলে এই অপকর্ম ঘটিয়ে পালিয়েছে তাকে যে গ্রামে নিয়ে এসেছে তার পরিবারকে ও এক ঘরে করে রাখা হল। একটা বড় নিঃশ্বাস নিয়ে আবার শুরু করলো বুড়া মিয়া।
অয়নকে ২০০ বার বেতাঘাত করা হবে। ১০ টা বাঁশের কঞ্চি এক সাথ করে ২০ বার মারা হবে।
কথা গুলো বলে বসে পড়লো বুড়া মিয়া।

মাঠের শেষ প্রান্ত থেকে চিৎকার দিয়ে উঠলো তুলি। এইটা কোন বিচার নয়। দেশে আইন আছে। যদি সে এমন অন্যায় করে থাকে তাকে আইনের হাতে তুলে দিন। আর সে এমন কি করেছে। সে বাচ্চা একটা ছেলে একটা ভুল নাহয় করেছে। কিন্তু তার জন্য তো সে ক্ষমা পেতে পারে। আপনরা যারা এখানে উপস্থিত আছেন। সবাই বুকে হাত দিয়ে বলতে পারেন। তারা কেউ কোন দিন কোন অপকর্ম করেননি। কোন দিন ও বউ ছাড়া পরনারীর সাথে কিছু করেননি। আমি যতদূর শুনেছি এর আগে আপনাদের গ্রামে এক লোক একটা মেয়ের সাথে অসামাজিক কাজে ধরা খেয়েছে। আপনরা তার বিচার করেছেন কি? ছেলের সাথে মেয়েটির বিয়ে পড়িয়ে দিলেন। এইটাই কি শাস্তি? আর অয়ন ছেলে বলে অন্য ছেলের সাথে কিছু করছে বিঁধায় আপনারা তার জীবনটা হুমকির মুখে ঠেলে দিতে পারেন না। সে ছেলে কি মেয়ে। কার সাথে কি করেছে তা বিবেচনা করার আগে এক বার ভাবুন আমরা সবাই মানুষ। ভুল মানুষই করে। আপনারা যদি আজ বিচারের নামে অবিচার করেন, তবে ভুলে যাবেন না, আপনাদের ও ছেলে আছে, তারা ও এমন কিছু করতে পারে। সেই দিনের জন্য প্রস্তুত থাকুন।

তুলির কথা শুনে সবাই হই হই করে উঠলো আরেকবার।
একজনে বলল, বিচারের মাঝে মেয়ে ছেলে কেন? আর সে তো আমাদের কেউ না। তার এই উগ্রপন্থী কথাবার্তা জন্য তাকে ও শাস্তি দেয়া হক। সবাই হ্যাঁ বলে মাথা নাড়াল। সামির সামনে এসে বলে যদি কেউ তার দিকে এক পা আগান তাহলে বলে রাখছি পুরো গ্রাম কুরুক্ষেত্র হয়ে যাবে। তার বাবা কে আপনরা চিনেন না।
সামিরের কথা শুনে গ্রামের অশিক্ষিত লোক গুলা ভয় পেয়ে গেল। সামির সুযোগ বুঝে তুলি, ঊর্মিকে নিয়ে বিচার কার্যালয় ছেঁড়ে চলে আসতে লাগলো। তুলি আসতে চাচ্ছে না। তুলির একটাই কথা, এইটা কোন বিচার নয়। এইটা অন্যায়, এইটা অত্যাচার।
এই প্রথম অয়ন মাথা তুলে তাকিয়ে তুলির চলে যাওয়ার দিকে ছেয়ে রইলো। হয়তো সে বুঝতে পেরেছিল, সমাজের এই কঠিন মূর্খতার বেড়াজালে আবৃত মানুষ গুলার মাঝে একজন মানুষ তার জন্য ছিল। কিন্তু তার চলে যাওয়া দেখে অসহায় এর মাঝে আরও বেশী অসহায় হয়ে গেল।

যে কথা সেই কাজ। অয়নকে ২০০ বেতাঘাত করা হল। এত জোরে মারছিল মনে হচ্ছে মানুষ নয় কোন গুরুকে হাল দিতে নিয়ে গিয়ে পিঠানো হচ্ছে। তার চিৎকারে সন্ধ্যার নীড়ে ফীরা পাখি গুলো আম গাছ ছেঁড়ে পালাল। কয়েকজনের চোখে পানি এসেছিল কিন্তু নিজেকে অন্যর মুখে কাপুরুষ শুনার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য হাত তুলে মুছে ফেলে চোখের জল। সেই মানুষ কটা না হয় চোখের পানি মুছে খালাস। কিন্তু তার কি হবে যে এই ছেলেটিকে এত কষ্টে গর্ভে ধারণ করে অতি যত্নে মানুষ করেছিলেন। সেই পরিবারটির কথা একবার ও কেউ চিন্তা করলো না। কাল রাতে ও এই পরিবারটি একটা সম্মানীয় পরিবার ছিল গ্রামে। শুধু একটা ছেলের সামান্য ভুলের কারণে আজ সেই পরিবারটিকে সবাই জুতার নীচে নামিয়ে দিল।

বেতাঘাতের মাঝে অয়ন অজ্ঞান হয়ে পড়ে, তারপর ও সেই মানুষ গুলীর মনের ভিতরে সামান্য দয়া কাজ করেনি। অজ্ঞান অবস্থায় তাকে তার বাড়ীর সামনে ফেলে আসা হয়।

রাত ১০টা। তার পরিবার থেকে কেউ তাকে ঘরে তুলে নেয়নি। হেডমাস্টার পরিবারের সবাইকে হুকুম দিলেন, যদি কেউ দরজা খুলে ঘরের বাহিরে যাও সে আর ঘরে ঢুকতে পারবে না। অয়নের মা কেঁদে কেঁদে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে বিছানায়। বোন দুইটি বাবার ভয়ে চিৎকার দিয়ে কাঁদতে পারছে না। মুখে ওড়না ছেপে ফুফিয়ে ফুফিয়ে কেঁদে চলছে। অয়নের দাদি আর থাকতে পারলো না। সে হেড মাষ্টারকে বলে দিল, আমি যাচ্ছি আমার নাতিকে আনার জন্য। আমি বুড়া মানুষ আছি আর কয় দিন। ঘরে ঢুকতে না দিলে রাস্তায় থাকবো অয়নকে নিয়ে। তারপর ও তোর মত পাষণ্ডর মুখ দেখে মরতে ছাই না। অয়নের দাদী মরা পশুর মত টেনে হেঁচড়ে বাড়ির সামনে কাছারি ঘরে তুল্লেও অয়নকে। বুড়ি অয়নকে আলগাতে পারছিলো না। বার বার অয়নের বুকের কাছে ঝুঁকে এসে পরীক্ষা করছিলো ধম আছে না গেছে।

রাত ২ টা। অয়নের জ্ঞান ফিরে আসে। মুখে কোন কথা বলতে পারছিলো না সে। শুধু চেয়ে আছে বুড়ো দাদীর দিকে। চোখের কোন জ্বল নিয়ে হিসাব মিলাতে চেষ্টা করছিলো কি হয়েছিলো তার সাথে। কেন সে আধ মরা হয়ে শুয়ে আছে কাছারি ঘরে। আস্তে আস্তে তার চোখের পর্দা সরতে লাগলো। হা সে পৃথিবীর একটা ক্ষুদ্র দেশের এক অজপাডা গাঁয়ে আছে, যেখানে মানুষ নামে আছে কিছু পশু। যারা মানুষকে মানুষ হিসাবে বিবেচনার ধারার মুখে জুতা মেরে সভ্যতার সাক্ষী হয়ে চলে আসছে আবহমান কাল থেকে। সে পুরুষপ্রেমি, তাই নিয়েই মানুষ গুলোর যত মাথামাথি। মানুষ হিসাবে ভাবতে গেলেই তারা যোশ আর ক্ষমতা লড়াইতে ব্যস্ততার হামাগুড়ি খায়। কবে বুঝবে এই মানুষ গুলো, সমকামী হলেও তারা মানুষ। হ্যাঁ খুব নীরবে কষ্ট বয়ে জীবন কাটিয়ে দেবার রোবট বললে ভুল হবে না সমকামীদের।

ভোর ৪ টা। অয়ন ফিরে আসলও আরেকবার এই নিষ্ঠুর মানুষ গুলোর বসবাসের আবাস পৃথিবীতে। আর ধরে রাখতে পারলো না অয়ন, নিজের জান পাখিকে। হ্যাঁ এক নির্মম দুঃখ আর ক্ষোভ নিয়ে অয়ন চলে গেল পৃথিবী ছেঁড়ে। মরে গিয়ে বেঁছে গেল অয়ন। কিন্তু আমরা যারা এখনো আছি তারা কি বলতে পারবো, আমাদের কেউ আবার নতুন করে অয়ন হয়ে আরেকবার ভালোবাসার হাতছানিতে বিশ্বাস করে সমকামিতার জন্য সমাজের মানুষ গুলির সামনে অকালে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিবে না?

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.