একফোঁটা অশ্রুবিন্দু

লেখকঃ ভালবাসার শেষ প্রহর

তিল তিল করে গড়া ভালোবাসার দেয়াল কখন যে অবিশ্বাসের ঝড়োহাওয়ায় ভেঙেগেছে আমি বুঝতেও পারিনি । আজ বুকের ভেতরটা কোনো এক আজানা কারনেই হাহাকার করে । যখন একাকিত্বের সাগরে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম ঠিক তখনই হোসেইন এসেছিলো আমার পৃথিবীতে এক ঝড় তাড়িত বসন্তদূতের মতো । প্রায় এক বছর আগে হোসেইনের সাথে আমার ফেসবুকে পরিচয় । জানিনা কেন ওকে এতো ভালো লেগেছিলো আর সেই ভালো লাগা কখন যে ভালোবাসায় রূপ নিয়েছে জানিনা । ইট কাঠে ঘেরা এই যান্ত্রিক শহরে ভালোবাসা খুঁজে পেয়েছিলাম তাঁর মায়াবি চাহুনিতে । ভালোবাসাটা কেবল ফেসবুক ও মোবাইলেই সীমাবদ্ধ ছিলো আর রাত জেগে কথা বলাটা ছিলো আমাদের নিত্য দিনের রুটিন । এক মুহূর্ত হোসেইনের সাথে কথা না বলে থাকতে পারতাম না । আমি তখন এস এস সি পরীক্ষা শেষে ঢাকার এক প্রাইভেট কলেজে ভর্তি হয়েছি । আর হোসেইন দ্বাদশ শ্রেনীর মেধাবি ছাত্র । হোসেইনের সাথে আমার কখনই দেখা হয়নি আমাদের বাহ্যিক দূরত্ব ছিলো অনেক কিন্তু মনের টান ছিলো অসীম । টিফিনের টাকা জমিয়ে যখন ওর সাথে মোবাইলে কথা বলতাম মনে হতো সারাটি দিনের কান্তি মুহূর্তেই কোথায় যেনো মিলিয়ে যাচ্ছে । জানিনা কতটা ভালোবাসলে ভালোবাসা পরিপূর্নতা পায় তবে আমি হোসেইনকে ভালোবেসেছিলাম আমার হৃদয়ের সবটা উজাড় করে । দিনকে দিন যেনো ভালোবাসার গভীরতা বেড়েই চলেছে কিন্তু মাঝখানে দূরত্ব যেন সীমা অতিক্রম করে ফেলেছে । হোসেইন দেখা করতে চাইলো অথচ পরীক্ষার থাকার কারনে সেইবার আর দেখা হলো না । ঠিক তখনি মনের অজান্তেই হোসেইনকে নিয়ে একঝাঁক স্বপ্ন দেখেছি । যেদিন দেখা হবে ওর হাতটি ধরে গ্রামের মেঠো পথে হেটে বেড়াবো , যখন দূর আকাশে সন্ধা ঘনিয়ে আসবে তখন পদ্মার তীরে বসে ওর বুকে মাথা রেখে সুখের সাগরে ডুবে যাবো । এর মাঝেই ওর পরীক্ষা শুরু হয়েগেছে , এখন আর ঘন্টার পর ঘন্টার মুঠোফোনে কথা বলি না দিনে যেটুকু সময় কথা বলি তার অনেকটাই ওর পড়াশোনা সংক্রান্ত বিষয়েই বলা হয় । এর মাঝে একদিন জানালো পরীক্ষা শেষে ওরা ঢাকা চলে আসছে এবং এখন থেকে ঢাকাতেই থাকবে । কথাটা শোনার পর থেকেই কেনো যেনো মনের ভেতর একটা ভয় বাসা বাঁধলো । আচ্ছা ঢাকায় আসার পর হোসেইন বদলে যাবে না তো ! এর মাঝে ওর পরীক্ষা প্রায় শেষ ওরা ঢাকা একটি ফ্লাট কিনেছে তাই ঢাকা চলে আসলো । অল্প কিছু দিনের মধ্যেই ওর মাঝে এক আশ্চর্য রকমের পরিবতর্নন লক্ষ করলাম । এখন আর ও আমাকে আগের মতো কল করেনা , ফেসবুকেও এস এম এস করেনা । কারন জানতে চাইলে অকারনেই রেগে যায় । নিজেকে বারংবার বোঝানো চেষ্টা করি সব ঠিক হয়ে যাবে । কিন্তু কিছুই যেন আর আগের মতো নেই , আজ কাল ও অল্পতেই রেগে যায় আগের মতো আর কথাও বলে না । সবকিছুতেই যেন একটা দূরত্ব তৈরি করে নিয়েছে । ছাদে বসে সারাটা রাত কেবল চোখের জলে নিজেকে সামলানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে যাই । আজকাল আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজেকে ভিষন অপরিচিত মনে হয় । চোখের নিচে কালো দাগ পড়েছে , বয়সটা যেন হঠাৎ বেড়ে গেছে । সিদ্ধান্ত নিলাম খুব শিঘ্রই ওর সাথে দেখা করবো । কিছু দিন ধরে মুঠোফোনে ওর সাথে কথা হয়না । চেষ্টার কোনো কমতি রাখিনি , যদি সে একটি বার কথা বলে । না সব চেষ্টাই যেন ব্যর্থ হলো । সেদিন হঠাৎ ওকে ফেসবুকে পেয়ে ভিষন খুশি হয়েছিলাম মনে হল যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছি । সে কেন এতো দিন আমাকে ভুলে ছিলো জানতে চাইলে প্রতিউত্তরে জানালো সে নাকি আমাকে কখনো ভালোই বাসেনি । সবটাই ছিলো অভিনয় , সে এখন অন্য কাউকে ভালোবাসে , আমার প্রতি তার কখনই কোনো অনুভুতি কাজ করেনি । গ্রামে তার একাকী সময় কাটতো না তাই সে তার একাকিত্ব দূর করতে আমার সাথে ভালোবাসার মিথ্যে অভিনয় করেছে । কথাগুলো শোনার পর বুকের ভেতরটা কেমন যেনো ফাঁকা হয়ে গেলো , আজ যেনো ভালোবাসার সকল দেনাপাওনা চুকে গেছে । বুকের ভেতরে কেমন যেনো সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো তোলপাড় করছে । বেঁচে থাকার সকল প্রয়োজন আজ ফুড়িয়ে গেছে । ছাঁদের শেষ প্রান্তে দাড়িয়ে চিৎকার করে কাঁদলাম কিন্তু আমার এই বুক ফাটা অর্তনাদ হোসেইনের কান অবধি পৌছোলনা । ভালোবাসা নামের ঐ অদৃশ্য বস্তুটা আজ আমার হৃদয়টাকে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে । যে হৃদয়ে ভালোবাসা সপ্নজাল বুনেছি আজ চলছে সেই হৃদয়ে এক মিথ্য ভালোবাসার মিছিল । সেদিনের সেই একফোঁটা অশ্রুবিন্দু আজও আমার চোখকে আঁড়াল করতে পারেনি । আজ হয়তো হোসেইন অন্য কারোর বুকে ভালোবাসার স্বপ্নজাল বুনছে । অথচ একদিন এই হোসেইনকে নিয়ে আমিও গড়ে তুলেছিলাম একঝাঁক স্বপ্ন । অধরা স্বপ্নগুলো অধরাই থেকে গেলো শুধু মাঝখানে পড়ে রইল কিছু মর্মান্তিক স্মৃতি ও অন্ধকার ঘরে শূন্য হৃদয়ের ক্রন্দন ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.