অদ্ভুত সেই ছেলেটি

লিখেছেনঃ হোসেন মাহমুদ

অ্যাই প্যাড নিয়ে ক্যান্ডি ক্যাশ খেলছে মিহির। তার বছর খানিকের বড় বোন ইলা বাসায় নেই। তার ঘর থেকে সযত্নে হাত চালিয়ে বের করে নিয়ে আসলো তার অ্যাই প্যাড। এখন মনের আনন্দে গেমস খেলছে মিহির। টান টান উত্তেজনার মুহূর্তে বজ্রপাতের মত ইলা এসে মিহিরের সামনে দাঁড়ায়।
-মির তুই আবার আমার অ্যাই প্যাডে হাত দিয়েছিস? (মিহিরকে আদর করে বাসার সবাই মির ডাকে)
-আপু প্লিজ ৫টা মিনিট সময় দে। এই তো লেভেলটা শেষ হয়ে এলো বলে।
-ধূতেরই ছেমড়া গিভ মে ব্যাক মাই অ্যাই প্যাড। তুই তোর গীটার নিয়ে খেলা কর গিয়া।
কথাটা বলেই ইলা মিহিরের হাত থেকে জোর করে ছিনিয়ে নেয় অ্যাই প্যাড। মিহির রাগ করে দরজা বন্ধ করে বসে আছে। ছেলে বেলা থেকে তার মন খারাপ হলে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে থাকা তার স্বভাব। কিন্তু সেই স্বভাবের অভাব না থাকলে ও পরিবারের অন্য সবার অদীক্ষিতায় রাগ ভাংতে বাধ্য হয়ে মিহির। আজ ও তার ব্যতিক্রম হয়নি। রাত ১০.৩০ মিনিট মা, বাবা, ইলা আর তাদের বড় ভাই মাহফুজ সবাই টেবিলে বসে আছে তার জন্য। মিহির কিছুতেই দরজা খুলে না। একজনের পর একজন গিয়ে দরজার সামনে আকুতি মিনতি করে আসছে। এ দিকে তাকে শুনিয়ে শুনিয়ে মাহফুজ আর তার মা ইলা কে বকা দিচ্ছেন। ইলা কথা দিয়েছে সে আর কোন দিন ও মিহিরকে বকবে না। আর পরিবারের সবার সম্মতি ক্রমে কালকেই মিহিরকে একটা অ্যাই প্যাড কিনে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই কথা শুনে হুর হুর করে দরজা খুলে খাবার টেবিলে আসে মিহির। কেঁদে কেঁদে তার চোখ ফুলা স্পটই দেখা যাচ্ছে। পরিবারের সবাই জানে মিহির একটু নরম স্বভাবের। খুব অল্পতে মন খারাপ করে। খুব সামান্যতে প্রাণ খুলে হাসে। কারো খানিকটা দুঃখের কথা শুনার পর পারলে নিজের চটি খানা ও খুলে দিয়ে আসে। তার বন্ধু বান্ধব তেমন একটা নাই। একমাত্র জিসান ছাড়া। জিসান তার বেষ্ট ফ্রেন্ড তাকে প্রায়শই বাসায় আসতে দেখা যায়। উচ্চ শিক্ষিত পরিবারের মধ্যমণি হল মিহির। বাবা গার্মেন্টসের ব্যবসা ভালই মাল কামিয়েছেন। মিহিরের মা ধানমণ্ডির একটা বেসরকারি কলেজে ইংরেজিতে অধ্যাপনা করেন। মাহফুজ নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে বি.বি.এ তে শেষ সেমিস্টারে পড়ছে। ইলা ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে জার্নালইজম এ পড়ছে। তারা দুজনে মেধাবী। আর সবচেয়ে বেশী মেধাবী মিহির। ছেলেবেলা থেকে কখনো কোন ক্লাসে ২য় হয়নি সে। এ বছর ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল থেকে রেকর্ড সংখ্যক মার্ক নিয়ে A লেভেল শেষ করে সে। এখন দেশের বাহীরে যাবার জন্য আই ই এল টি এস করছে সে।

তার মেধার কারণে হোক কিংবা বিড়াল গোত্রীয় নরম স্বভাবের জন্য হোক পরিবারের সবাই তাকে মাথায় তুলে রাখে। তার সামান্য মন খারাপে বাড়ি শুদ্ধ নীরবতা পালন করে। দেখতে ও বেশ আপেল আকৃতির গোলাকার চেহারা, মাথা ভর্তি বাদামী চুল, দুধে আলতা গায়ের রঙ। দেখলে বিদেশী বিদেশী মনে হয় তাকে। যে একবার তার দিকে ভালো করে তাকাবে সে পুনরায় তার দিকে তাকাতে বাধ্য। এই সব কিছু নিয়ে হতে পারতো সে মহা সুখী মানুষদের একজন। কিন্তু দুধে লেবুর রস পড়ার মত তার ভিতরে সমকামিতা সে বাল্য কাল থেকে উপলব্ধি করে চলছে। তার বেষ্ট ফ্রেন্ড জিসান তার দলের অন্তর্ভুক্ত। তাই তার সাথে ভালই জমে মিহিরের। সব কথা শেয়ার করা হয় জিসানের সাথে। জিসান এই ক্ষুদ্র বয়সের সমষ্টিতে বার কয়েক প্রেম করে ছেঁকা খেয়ে ছেঁকা দিয়ে বেশ পাকা পোক্ত। অন্যদিকে মিহির এখন পর্যন্ত শরীর মিলনের স্বাদ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করে আসছে বরাবর। তার কথা হল আমি সমপ্রেমী সমকামিতায় চরিত্র বিসর্জন দিয়ে কোঁচ দিয়ে মাছ গাঁথা আমার কাজ নয়। মনের অকপটে তৈরি করা প্রেমের সমরাজ্যের সম্রাট একজনকেই বানাবো। রাতের রঙের সাথে পাল্লা দিয়ে শরীর কামনার দাসত্ব করার মাঝে কোন বাহাদুরি নেই। হোক না সেইটা সময় সাপেক্ষ, অপেক্ষায় ফল বরাবরই মধুর হয়।

টেবিলে বসে সবাই সামনে প্লেট, কেউ মুখে দিচ্ছে না খাবার। মিহির মুখ ফুলিয়ে বসে আছে। ইলা নিজের চেয়ার ছেঁড়ে উঠে চামচ দিয়ে মিহিরের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে। মিহির নাছোড় বান্দা যার জন্য তার এত গুলো চোখের জ্বল পড়লো তার হাতে সে খাবে না। সে খাচ্ছে না দেখে মাহফুজ আর তার মা ডানে বামে ঘিরে ধরে তার মুখে খাবার খুঁজে দিচ্ছে। মিহির এখন অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে খেতে লাগলো। তাদের পরিবার শিক্ষিত হওয়ার সবাই ফ্রি ভাবে যে কোন বিষয়ে আলোচনা করতে পারে। এই যেমন কেউ কোন ছেলে কিংবা মেয়ের প্রতি দুর্বল কিনা। তার পর কেউ বিড়ি সিগারেট খেলে ও ফর ফর করে বলে দেয় সবাই সামনে। কেউ কিচ্ছু মনে করে না। মিহির এই দিক দিয়ে জিসান থেকে সুখী। জিসানের পরিবার রক্ষণশীল। কাজের কথা ছাড়া কেউ কারো সাথে কথা বলে না। তাই মিহির মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তার ভিতরের ব্যাপারটা সবার সাথে শেয়ার করে দিবে। তবে এখন নয় দেশের বাহিরের ব্যাপারটা চূড়ান্ত হবার পর।

মিহিরের বাহীরে যাবার সময় ঘনিয়ে আসতে লাগলো। তাই তার বাবার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফ্যামিলি গেট টুগেদার করার জন্য তারা সুন্দর বন বেড়াতে এখন খুলনা তে। হোটেলে অবস্থান করেছে মিহিরদের পুরো পরিবার। রাতে সবাই ডিনার শেষ করে হোটেলের সামনে গোল টেবিলে বসে আড্ডা দিচ্ছে। হাসি আনন্দে অতিবাহিত করছিলো সময়। মিহিরের বাবা একটা কোকের বোতল টেবিলের উপর রেখে বলে, আসো সবাই মিলে একটা খেলা খেলি। কোকের বোতল টা এক বার ঘুরানো হবে। বোতলের মাথা যার দিকে পরবে তাকে তার গোপন কথা বলতে হবে। যেমন তার জীবনের প্রথম ক্যাশ। কিংবা পরিবারের সবার অমতে করা কোন অকাজ কে বৈধতা দিতে হবে আজ। সবাই হেঁসে উপভোগ করতে লাগলো ব্যাপারটা। বোতল প্রথমে মাফুজের দিকে গেল। মাহফুজ জানালো তার কৈশোর জীবনের প্রথম প্রেমে পড়ার ঘটনা। তারপর বোতল ঘুরলো মিহিরের মায়ের দিকে। তিনি বললেন তার খালাতো ভাই এর সাথে তার প্রথম ক্যাশের ঘটনা। এইবার বোতলের মুখ মিহিরের দিকে। মিহির ভাবতে লাগলো সে কি ঝেড়ে কাশবে তার জীবনের অন্ধকারের অধ্যায়। কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে সিদ্ধান্ত নিলো। যা হবার হবে, ভিতরে এক বাহিরে আরেক। এইভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে নিজের সত্যিকারের পরিচয় নিয়ে বাঁচা অনেক আনন্দের। তাই সে বলতে লাগলো তার জীবনের প্রথম ক্যাশ তার স্কুলের টিচার অমিত। তার কথা শুনে সবাই হেঁসে উঠলো। সবাই বলছে নিশ্চয় মিহির রসিকতা করছে। কিন্তু নাহ, মিহির সত্যি বলছে। তার প্রমাণ স্বরূপ বলতে লাগলো। সে ছোটবেলা থেকে ছেলেদের প্রতি আসক্ত। এবং ইংরেজি তে যাকে বলে গে। তার কথা শুনে সবার হাসি মুখ মলিন হয়ে গেলো। কেউ বিশ্বাস করতে পারছে না মিহির সমকামী। মিহির অবাক হয়ে সবার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। থম থমে একটা পরিবেশ বিরাজ করছে এখন। মিহির মনে করছে এইটাই স্বাভাবিক প্রথমে কেউই ব্যাপারটা মেনে নিতে পারবে না। পরে আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়ে যাবে। কিন্তু তার আশার কপালে কচু পড়া। সেই রাতেই চিনতে শুরু করলো তার অতি প্রিয় মানুষদের চেহারা। মাহফুজ আর মিহির একই হোটেল রুমে উঠেছে। সারা রাত দুই ভাই মিলে গল্প করেছে কত। কিন্তু আজ মাহফুজ রুমে ঢুঁকেই চুপ চাপ শুয়ে পড়ল। মিহির তাকে একবার ডাকল,
-ভাইয়া ঘুমিয়ে পড়েছ নাকি?
কোন জবাব দিলো না মাহফুজ। মিহির আবার ডাকল তাকে, এইবার তীব্র কণ্ঠে জবাব দিল মাহফুজ।
-কি বলবি বল?
-না কিছু না। তোমরা কি ব্যাপারটা স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারছ নাহ?
-না। কারণ ব্যাপারটা মোটেও স্বাভাবিক না ভাই। শুন তোর বয়স কম। তুই এখনো অনেক ছোট ঐ সব ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামাস না। বাবা বলেছে কাল ঢাকায় গেলে তোকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখাবে। দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। এইটা একটা অসুখ ছাড়া আর কিছুই নয়।
মিহির মাহফুজের কথায় জবাব দিতে ইচ্ছা করছে না। কোন শিক্ষিত মানুষ সমকামিতা কে রোগ বলে চালিয়ে দিবে এই ব্যাপারটা তার বোধগম্যে আসছে না।

ঢাকায় আসার দুইদিনের মাথায় তাকে নিয়ে তার মা বাবা এক জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞকে দেখান। তার অনিচ্ছার সত্ত্বে ও তাকে যেতে হয়। ঐ বুড়ো বয়সী ডাক্তারের প্রশ্ন শুনে তাকে অদ্য চদ্র দিতে ইচ্ছা করলো মিহিরের। তাকে জিজ্ঞাস করা হোল ছেলে বেলায় কোন ছেলের সঙ্ঘে মিলন হয়েছে কিনা? সে ইন্টারনেট এ কোন খারাপ ছেলের পাল্লায় পড়েছে কিনা? পরিশেষে ডাক্তার তার বাবা কে ডেকে বললেন। তার মানসিক অবস্থার হাল ভালো না। তাকে অনেক দিন চিকিৎসা করাতে হবে। প্রয়োজনে মাদক নিরাময় সেন্টারের মত কোথাও বন্ধী করে রাখতে হবে। আর তাকে নিয়মিত কিছু ওষুধ সেবন করতে হবে। সমকামিতার জন্য মিহিরকে ওষুধ সেবন করতে হবে ব্যাপারটা শুনার পর তার রাগ মাথায় উঠে এসেছে। কিন্তু বাবা মায়ের জন্য চুপ করে বাসায় ফিরল সে। আর ভাবতে লাগলো এই সব ডাক্তার কি ভাবে পাস করে ডাক্তার হয়েছে?

দিন দিন পরিবারের সবার ব্যাবহারের আমূল পরিবর্তন লক্ষ্য করতে লাগলো মিহির। যাদের মাথার মধ্যমণি হয়ে ছিল সে, শুধু মাত্র সমকামিতার অপরাধে এখন সবার চোখের শূল সে। এখন তার রাগ অভিমানে কারো কিচ্ছু যায় আসে না। আগের মত খাবার টেবিলে কথা বলে না কেউ। সবাই যেন রাত বীরাতে বদলে গেছে। সবাই তাকে মানসিক রোগী হিসাবে বিবেচনায় ফেলছে। মিহির সেইটা নিতে পারছে না। সে অপেক্ষা করছে বাহিরে যাবার জন্য। সে ভেবেই রেখেছে বাহিরে গেলে সে আর ব্যাক করবে না। পরিচিত জগতের কাছের মানুষ গুলোর দুই মুখো রূপ হজম করার মত মানসিকতা তার নেই।

ইলার সাথে তার খুনসুটি এখন মাত্রাতিরিক্ত। কিন্তু সবাই এখন ইলাকেই সাপোর্ট করে মিহির কে নয়। মাঝে মাঝে মিহিরের তার বাবার সাথে ও কথা কাটা হচ্ছে। এইটা কি সমাকিতার অপরাধ না নিয়তির অন্য কোন এক খেলা মিহির বুঝতে পারছে না। মিহির দুই বার এমব্যাসি ফেস করে ও ভিসা পেলো না। পরিবারের সবার মুখে এখন কিছুই আটকায় না। সবাই বলছে তার ঐ পাপের ফলে সে ভিসা পায়নি। মিহির মন খারাপ করে এখন নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে আর কাঁদে না। প্রকৃতির অবলিল এক খেলার খেলোয়াড় হয়ে সে তার স্বভাবের অনেক কিছু পরিবর্তন করেছে। এক দিন অনেক রাত করে সে বাসায় ফিরল। জিসানের সাথে কলাবাগান মাঠে বসে ছিল। তার জীবনে এই কঠিন ঝড়ের সামান্য কিছু শেয়ার করলো জিসানের সাথে। দরজা খোলার শব্দ পেয়ে তার বাবা তাকে তার রুমে ডেকে পাঠালেন। বললেন,
-কি রে তোর এত উন্নতি হল কবে থেকে? কোন ছেলের সাথে অকাজ করে বাসায় ফিরলি?
-বাবা আমাকে কি তোমার এত খারাপ মনে হয়?
-এত খারাপ মানে কি রে? হা? তোর যে চরিত্র খারাপ সেটা তো বলার বাহুল্য নেই। আমার নিজেরই ঘেন্না লাগে তোর সাথে কথা বলতে। আজ অবধি ব্যাপারটা ঘরের ভিতরে আছে। কাল আট দশ জনে নিশ্চয় জানবে। সবাই আমার মুখের উপরে আঙুল তুলে বলবে। দেখ দেখ হিজড়ার বাপ যায়। কোন পাপের ফলে তোর মত ছেলের বাপ হলাম কে জানে?

মিহিরের মা কথা বলে উঠলো। কি বলছ এই সব। মিহির তুই ঘরে যা। তার কথা শুনে মিহিরের বাপ রাগান্বিত কণ্ঠে জাড়ি মারল তাকে।
-ছেলেকে তো মাথায় তুলেছ তুমি নিজে। কি দরকার ছিল চাকরি করার? তোমার জন্য সে আজ বিপথে গেছে। আমার টাকা পয়সার কমতি ছিল নাকি?
-কি তুমি আমার চাকরি কথা বলছ? তোমার জন্য এই তো মিহিরের এই অবস্থা।

মিহির চোখের কনে জ্বল নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাবা মায়ের জগরা শুনছে। সে কিছু না বলে বের হয়ে গেল বাবার রুম থেকে। নিজের রুমে ফিরে দরজা লাগিয়ে বসে আছে। সারা দিন কিছু খায়নি। রাতে ও খাওয়া হবে না। সে এখন জানে সে সাত দিন না খেলে ও কেউ তার দরজার সামনে এসে খেতে বলবে না। সে ভাবতে লাগলো সমকামী হয়ে জন্মানো টা কি পাপ না অভিশাপ? মানুষের সেক্সুয়াল অরিয়েন্টেশন নিয়ে কেন এত মাথা ব্যথা। আমি সমকামী সেইটা তো আমার ইচ্ছাকৃত চয়েস নয়। নিশ্চয় জন্মানোর সময় নিজের ভীতরে সমকামিতার বীজ নিয়ে জন্মেছি। আমি অন্য রকম। আরে অন্য রকম বলতে সমকামী সেইটা জানার আগ পর্যন্ত আমি অতি ভালোমানুষদের একজন। কিন্তু পুরুষ প্রেমী জানার পর আমি হয়ে গেলাম পুরুষ খেকো হিংস্য দানব। আবার কারো কারো মতে মানসিক রোগী। হায় রে মানুষের গড়া ভুল পৃথিবী, কবে মূল্যায়ন করবি মানুষকে মানুষ হিসাবে। কথা গুলা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে গেল মিহির।

এক রাতে মিহিরের বাবার তুমুল ভালো মানুষী চেহারার বহিঃপ্রকাশ ঘটলো। মধ্যে রাতে মিহির বাসা থেকে বেরিয়ে আসলো এক কাপড়ে। নিষ্ঠুর পৃথিবীটাকে আরও কাছ থেকে চিনার জন্য তার অবস্থান এখন রাস্তায়। মিহির বুঝতে পারছে না সে কি করবে। অনেকক্ষণ কমলা পুর রেল স্টেশনে খেটে খাওয়া মানুষ গুলোর মাঝে বসে বসে নিজেকে আবিষ্কার করতে লাগলো সে। এক বার ভেবে নিয়েছে। এই যে সামনের রেল গাড়ীটার নিচে গলাটা বসিয়ে দিলেই সব ঝামেলার অবসান ঘটে যেত। একটুপর ঐ দিন মজুর মানুষ গুলোর বস্তির জীবন ধারার দিকে তাকিয়ে সে ভাবতে লাগলো। জীবন বিধাতার দেয়া একটা উপহার। তাকে এই ভাবে নষ্ট করার কোন মানেই হয় না। যে মানুষ গুলোর ছায়া তলে এত দিন নিজের আশ্রয় ছিল। হয়তো তারা তাকে চিনতে পারেনি কখনো। তাই বলে কেউই যে তাকে চিনতে পারবে না তাতো নয়। হয়তো এমন কেউ তার জন্য আছে যে তাকে তার মত করে গ্রহণ করবে। জীবন ধারণের জন্য হয়তো নতুন এক আশার আলো সে খুঁজে পাবে একদিন। আত্মহনন কোন সমস্যার সরল সমাধান নয়। কাপুরুষের শেষ অবলম্বন হল আত্মহত্যা। মিহির বাসা থেকে বের হবার সময় তার সবচেয়ে পছন্দের সেই গীটারটা কাঁধে করে নিয়ে এসেছে। তার পকেটে আছে ১০ টাকা। সারা দিন কিছুই খাওয়া হয়নি। খিধাটা যেন মাথা চ্যাটা দিয়ে উঠেছে। গীটারের একটা তারে হাত লেগে আওয়াজ হল। সে হাঁটতে লাগলো এক অজানা গন্তব্যের দিকে। মিহির জানে না সে অজানা গন্তব্যের সীমান্ত কোথায়। কিন্তু তারপর ও সে মাথা নত করবে না। হয়তো আট দশ জন এর মত খুব ভালো করে নয়, কিন্তু জীবন ধারণের জন্য কোন একটা পথ সে নিশ্চয় খুঁজে পাবে।

সোডিয়ামের আলোয় হাঁটতে হাঁটতে সুমনের বিখ্যাত গানটার কথা মনে পড়ে গেল মিহিরের।
“অদ্ভুত সেই ছেলেটি আবার শুরু করলো হাটা।
পকেটের টাকা শেষ খাওয়া হয়নি কিছু।
খিদে শুধু ছুটছে তার পিছু পিছু।
অদ্ভুত ছেলেটি শুরু করলো গাওয়া।
জোছনা অজানা পথে চলা,
যেখান আছে যে মোর ভালোবাসা”

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.