অসমাপ্ত সমীকরণ

লিখেছেনঃ হোসেন মাহমুদ

(১)

আজ আকাশটা অনেক মেঘলা। যে কোন সময় চারদিক কালো করে নামতে পারে অঝর বৃষ্টি।
অনেক দিন বৃষ্টিতে ভেজা হয়নি মামুনের। সেই কলেজর গণ্ডি পার হতেই চলে যায় দেশের বাহিরে।
৯ বছর পর তার দেশের সীমানায় পদার্পণ। তাও এক প্রকার বাধ্য হয়ে আসা। মায়ের হার্ট অ্যাটাকের কথা শুনে এক দিনের মাঝে দেশে আসে মামুন। এখন মামুন আর তার নেংটা কালের দোস্ত ফায়সাল মিলে তূর্ণা নিশিথা করে চট্টগ্রাম যাচ্ছে।

-আচ্ছা মামুন এত বছর পর দেশে আসলি। কোথায় মায়ের পাশে বসে একটু সময় দিবি তা না আমাকে টেনে নিয়ে চলে যাচ্ছিস চট্টগ্রামে। তোর মতলবটা কি?
-মতলব হচ্ছে একজনকে খুঁজে বের করা।
-মনে হচ্ছে নাক দিয়ে প্রেমের গন্ধ পাচ্ছি। তা মালটা কে দোস্ত। সুন্দরী তো? নাকি কোন অ্যান্টির সাথে লাইন দিয়ে বসে আছিস?
-কুকুরের নাকটা বিধাতা বোধহয় ভুল করে তোকে দিয়ে দিয়েছে। তা না হলে প্রেমের ও গন্ধ পায় নাকি কেউ? আর শোন যাকে খুঁজতে যাচ্ছি সে অ্যান্টির হবার সম্ভাবনা নেই। কারণ সে পুরুষ।
-কি? তুই একটা পোলারে খোঁজার জন্য আমাকে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে এলি। আর তোর চোখে মুখের বিষণ্ণতা দেখে মনে হচ্ছে তুই তার প্রেয়ে মজে গেছিস। ঐ মামা ঘটনা কি খুলে বলতো।
-তোর কাছে লুকানোর কিছু নাই ফায়সাল। ছোট বেলা থেকে তুই জানতিস আমি কোন মেয়ে কে নয়, ছেলে কে পছন্দ করি।
-হাঁ তা জানতাম। কিন্তু ভাবলাম এত গুলো বছর পর বোধহয় তুই ও সব ভুলে গেছিস। আচ্ছা বাদ দেয়। তোর সেই মিসিং রাজ পুত্রের কথা বল।

কোথায় থেকে শুরু করবো বুঝতে পারছি না। কিন্তু মজার বিষয় হল আমরা কেউ কাউকে দেখিনি। এমন কি ছবিতে ও না। আচ্ছা হাতে যেহেতু সময় আছে তোকে খুলেই বলি সব।

আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে ফোন করতে আমরা কলিং কার্ড ব্যাবহার করি। কিন্তু মাঝে মাঝে ক্রস লাইনে অন্য নাম্বারে চলে যায়। আমার বেলায় অনেক বার হয়েছে ওটা। সেই দিন আমি তোকেই ফোন করছিলাম।
অনেক বার রিং হবার পর ওপাশ থেকে কেউ একজন ফোনটা ধরল। আমি বলতে লাগলাম,
-কি রে ন্যাংটা বাবা ফোন ধরিস না কেন? এখনো কি বিছানায় পেস্রাব করছিস নাকি?
-হ্যালো কে আপনি?
-ঐ হাফপ্যান্ট ডং করিস না। আচ্ছা যা ছোটো বেলার কথা দিয়ে তোকে আর পচাবো না। বল কেমন আছিস তুই।
-হ্যালো আপনি কার সাথে কথা বলছেন?
-কেন তুই ফায়সাল নাহ?(কলিং কার্ড থেকে ফোন করলে ভয়েসটা কিছুটা অন্যরকম লাগে)
-জি না আমি ফায়সাল না।
-সরি ভাই রং নাম্বার।
আমি কলটা কেটে আরও তিন বার কল করি। কিন্তু কাকতালীয় ভাবে তিন বারই কল চলে যায় রাতুলের কাছে।
হা ঠিকই ধরেছিস তার নাম রাতুল। যদি ও সে বলেছে এইটা তার রিয়েল নাম না। তারপর ও আমি তাকে ঐ একটা নামেই চিনি।
তার নাম্বারটা মোবাইলে রং নাম্বার নামে সেভ করে রাখি। প্রতিদিন আমাদের কথা হত। নানা বিষয়ে আমাদের কথা চলতে থাকতো। বিশেষ করে তার কবিতা। রাতুল যখন কথা বলে আমার কাছে কবিতার মত মনে হয়। সে আবার গান ও গাইতে পারে। আধুনিক ছেলে হয়ে ও কি সুন্দর করে লালন গায়, দোস্ত যদি একবার শুনতি তাহলে তাকে ফরিদা পারভিনের ছোট ভাই বানিয়ে দিতি।
আর তুই তো জানতিস আমার ছোট বেলা থেকে গল্প কবিতার প্রীতি ছিল। কিন্তু আমি ঐ রবীন্দ্র নজরুলের মাঝে আঁটকে ছিলাম দোস্ত। কিন্তু এই ছেলে মেরিন সাইন্সের ছাত্র হয়ে ও সে কালের সুকুমার রায় থেকে শুরু করে এ কালের নির্মূলূানন্দ গুণ পর্যন্ত তার মুখস্থ।
তাকে মুগ্ধ করার জন্য আমি অফিসে বসে বসে কবিতা মুখস্থ করতাম। এক দিন একটা নতুন লেখকের কবিতা বেশ পছন্দ হয়ে গেল আমার। সাথে সাথে নেট থেকে নামিয়ে মুখস্থ করে নিলাম সাড়ে ৩২ লাইনে কবিতা খানা। ভাবলাম এই বার তুমি আমার কাছে ধরা খাবে চান্দু। কিন্তু হল তার উল্টো আমি মাত্র শুরু করলাম আবৃতি। আমাকে মাঝখানে থামিয়ে দিয়ে কবিতার বাকি টুকু সে বলতে লাগলো। আমি অবাক হয়ে ভাবতে থাকি। এ কি মানুষ, নাকি কোন কবিতা পাগল এলিয়েন।

আমাদের কথোপকথনে কোন চাহিদার সমাবর্তনে পদার্পণ করতো না। কারণ সে সব সময় আমার মাঝে একটা ভালো বন্ধুর ছায়া খুঁজে বেড়াতো। আমি ও তাই করতাম। তার কথাবার্তার মাঝে আমি সরল স্বাভাবিকতা খুঁজে পেতাম। কিন্তু দুজন দুজনকে খুব মিস করতাম। এক দিন কথা না হলে মনে হত দিনটা মাটি হয়ে কাটল। দুজনের কেউই আমাদের বাহিরের রূপ কিংবা তথাকথিত পরিচয় নিয়ে মাথা ঘামাতাম না। সেই জন্য কেউ কারো ফেসবুক আইডি টা পর্যন্ত নেই নি। কারণ সে বলতো আমাকে চিনতে হলে আমার মাঝে প্রবেশ কর, আমার কথার মাঝে আমার ভিতরটা তুমি যদি উপলদ্দি করতে পারো তাহলে বুঝতে পারবে। আমি কে। তাই সবার মত নাম পরিচয় কিংবা ফেসবুক আইডি দেয়া নেয়া হয়নি।
এক রাতে ভালোবাসার কথা আসে আমাদের কথোপকথনে, সেই রাতে রাতুল একটা কবিতা আবৃতি করে। আমার কাছে আজ ও মনে হয় এই জীবনে যত আবৃতি আমি শুনেছি ওটাই সর্ব উত্তম। কবিতাটা ছিল এ রকম…
“জানতাম এই দিনটা এক দিন আসবেই।
বুক ধর পর, কপালের বিন্দু বিন্দু ঘাম।
আমাকে জানান দিত, আর যাই কর, সত্যি সত্যি কাউকে ভালবেসো না।
ভাবতাম ভালোবাসা আবার সত্যি সত্যি আর মিছে মিছে হয় নাকি? ভালোবাসা তো শ্চেপ ভালোবাসাই হয়।
যেটুকু ভালো তোমাকে বেসেছি। তা তো কষ্টি পাথরে যাচাই করা, সোনার ছাইতে ও খাটি।
মানতাম, তুমিও হয়তো আমার জন্য পাগল। দুচোখে অনেক অনেক স্বপ্ন মেখে, নিশি দিন নীল আকাশে রঙিন ডানা মেলে উড়তাম।
তোমায় কাছে পেলে স্বর্গ পেতাম। দূরে গেলেই দুনিয়াটা যেন জাহান্নাম।
বুঝতাম, সম্পর্ক ভীষণ স্বার্থপর হয়। যে কোন মূল্যে সে পরিণীতি চায়।
দিন দেখে না, সময় মানে না, জোড়া তালি দিয়ে হলে ও পরিণতি হলেই হল”।

সে দিন থেকে আমি ভালোবাসার কথা মুখে ও আনিনি। কারণ যদি তাকে বলতাম হয়তো সে বিশ্বাস করত না। অন্যথায় সেই কবিতার লাইনটা ঝুলিয়ে দিত, সম্পর্কের এক জারজ পরিণতি। ভালোই চলছিল আমাদের বোবা ভালোবাসার দিন গুলী। কিন্তু সেই দিন হঠাৎ করে মায়ের হার্ট অ্যাটাকে কথা শুনে তাড়াতাড়ি দেশে আসছিলাম এক দিনের ভিতরে। কোথায় যেন মোবাইলটা হারিয়ে ফেললাম। টের ও পাইনি।
আর রাতুলকে খুঁজে পাওয়ার এক মাত্র উপায় ঐ মোবাইল নাম্বার। যা ঐ মোবাইলে সেভ করা ছিল।

ফায়সাল বলে,
-তাহলে আমরা এখন তাকে কোথায় খুঁজতে যাচ্ছি? তুই তো তার বাসা কিংবা তার সত্যিকারের নাম টাও জানিস না।
-দোস্ত আমি জানি আমি এক অজানার উদ্দেশে পা বাড়াচ্ছি। কিন্তু কি করবো বল, বাড়ীতে আসার পর মা তো সেরে উঠলো। কিন্তু আমাকে বিয়ে করানোর জড় থামাবো কি করে? তাই রাতুলকে যদি খুঁজে পাই অন্তত তার মতামতটা জানতে পারতাম। আর যদি সে ও আমাকে ভালোবাসে তাহলে সবার বাঁধা অতিক্রম করে হলেও আমি তাকে আমেরিকা নিয়ে যাবো। কারণ জীবনটা আমার। আমি জানি আমার সুখ কোথায় আর কার মাঝে।
মামুন আর ফায়সাল দুপুর নাগাদ চট্টগ্রাম এসে পোঁচায়। তারা কদম তলীর রেল স্টেশনের দিকে যাচ্ছে চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটিতে যাবার জন্য। ফায়সাল মানুনকে অনেক বার বলছে একটা ট্যাক্সি করে চলে যাওয়ার জন্য। কিন্তু মামুন বলে ঐ ইউনিভার্সিটির সাঁটলে করেই যাবে। কারণ রাতুল সব সময় ঐ সাঁটলে করে যাওয়া আসা করে।


হাসান তার ইউনিভার্সিটির বন্ধুদের সাথে বেলা তিনটার সাঁটলে করে ক্লাসে যাচ্ছে। তাড়াহুড়া করে এক প্রকার ঠেলে ঠেলি করে একটা বগিতে উঠার সময় ধাক্কা লাগে এক ভদ্রলোকের গায়ে। ভদ্রলোক ধাক্কা খেয়ে মাটিতে পড়ে যায় তার পাশে থাকা আরেক জন এসে তাকে টেনে তুলে। বগিতে একটা সিট ও খালি নাই। তাই ঐ দুই ভদ্রলোক আর হাসান তার বন্ধুদের নিয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। হাসান ঐ ভদ্রলোকের কাছে এসে বলে দুঃখিত তখনকার ব্যাপাটার জন্য।
-না আমি কিছু মনে করি নি। কারণ আমি জানি ছাত্ররা ঐ ভাবেই ঠেলা ঠেলি করে ক্লাসে যায়। আসলে আমি এই প্রথম বার যাচ্ছি তো তাই।
-ওহ তাই বলুন। আমার ও তাই মনে হয়েছে। আপনি এই ভাবে যাতায়াতে অভ্যস্ত নয়। বাই দ্যা ওয়ে আমি হাসান।
-আমি মামুন। আর আমার সাথে আমার বন্ধু ফায়সাল।
-আচ্ছা ঠিক আছে আমি বন্ধুদের মাঝে যাই আপনারা কথা বলুন।

মামুন আর ফায়সাল মেরিন সাইন্সের ফ্যাকাল্টিতে ঘুর ঘুর করেছে অনেকবার। কিন্তু কাকে জিজ্ঞাস করবে। রাতুলের ওরিজিনাল নামটাও জানে না। মামুন ফায়সালকে বলে,
-দেখিস আমি তাকে এক বার দেখলেই চিনতে পারবো।
-হু ঘোড়ার ডিম পারবি। নাম পরিচয় ছাড়া শুধু ফোনের কণ্ঠে কাউকে খুঁজে পাওয়া অনেক মুস্কিল। মামুন সত্যি তুই বোকা। ফোনের কণ্ঠের সাথে বাস্তবে অনেকর কণ্ঠের মিল থাকে না। শুন মামুন অনেক ঘুরিয়েছিস আমাকে। এখন চল বাড়ি ফিরে যাই।
-দোস্ত প্লিজ কষ্টতো করেছিস আরেকটু কর। বাড়ি গেলেই মা কোন মেয়ে কে নিয়ে আসবে। আর কষ্ট করে যখন আসলামই আর কিছুক্ষণ দেখি না।

সেই দিন মামুন আর ফায়সাল অনেকক্ষন ধরে ইউনিভার্সিটির আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়িয়েছে। অনেক কে জিজ্ঞাসা করেছে। সবাই বলে ভাই রাতুল নামে কত জন আছে। আপনি তার বাসা কিংবা দেখেতে কেমন সেইটা বলতে পারেন। মামুন হা করে দাড়িয়ে থাকে। অনেক খুঁজা খুঁজি করে ও রাতুলের কোন ছায়া ও দেখেনি তারা ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে।
ফায়সালের অনেক গালা গালি খেয়ে রাতের গাড়ি করে বাড়ি ফিরে তারা।

মামুনের বাবা নেই শুধু মা আর এক বিবাহিত বড় বোন। তারা জোরাজোরির কমতি করেনি। মামুনকে মেয়ে দেখানোর জন্য। তারা জিজ্ঞাস করে তার কোন পছন্দ আছে কিনা। মামুন চুপ করে থাকে। কি ভাবে তাদের বলবে রাতুলের কথা। মা আর বোনের এই ছাপা ছাপিতে মামুন সিধান্ত নেয়। তাদের জানিয়ে দিবে যে সে কোন মেয়ে কে নিয়ে সুখী হতে পারবে না। কিন্তু ফায়সালের কথায় আর মায়ের অসুস্থতার কথা চিন্তা করে চুপ করে যায় মামুন। এক প্রকার বাধ্য হয়ে একটা মেয়ে দেখতে যায়। মেয়ের পক্ষ থেকে তারা রাজি। মামুনের পরিবার থেকে ও হা। দুই দিনের মাথায় মামুন কিছু বুঝে উঠার আগেই ফর্দ হয়ে গেল বিয়ের। মামুন ভাবছে ঐ মেয়ের জীবন নষ্ট করার মানে হয় না। তাকে সব খুলে বলে বিয়ে ভাঙার ব্যবস্থা করবে। মামুন জানে সে একটা মেয়েকে সেক্স দিয়ে সুখী করতে পারবে। আমেরিকায় অনেক মেয়ের সাথেই সেক্স হয়েছে। কিন্তু সে ভিতর থেকে কোন সুখ অনুভব করেনি। মামুনের বিয়ের মাত্র ২ দিন বাকি। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে পারে না সে। আবার সহ্য ও করতে পারছে না। তাই সে সিধান্ত নিলো। পালিয়ে চলে যাবে আমেরিকায়। যাবার আগেই আবার রাতুলের কথা মনে হল তার। আচ্ছা রাতুল কি তাকে ভালোবাসে? সে যেমনি করে তাকে চায় রাতুল ও কি তাকে ঐ ভাবে চায়? না তাকে রাতুলকে খুঁজে বের করতেই হবে। তাই মামুন এইবার একা একা রওয়ানা দিল ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে।


হাসান আগের মত তার বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয় না। গান কবিতা সব কিছুর প্রতি তার অনীহা চলে আসছে। সব সময় একা একা থাকে। তার বন্ধু বান্ধব এই পরিবর্তনকে স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারছে না। সবাই জিজ্ঞাস করছে হাসান কি হয়েছে তোর? হাসান চুপ করে থাকে। কোন কথা বলতে পারে না। কি করে তাদের বলবে সে এক জন কে মন দিয়ে বসে আছে। যাকে সে জানে না তার সাথে রং নাম্বারে পরিচয়। হাসান বুঝতে পারেনি যে মামুন তার ভিতরে এতটা জায়গা দখল করে আছে। হঠাৎ করে মামুনের মোবাইল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তার সাথে যোগাযোগ করার কোন উপায় নেই। কারণ তারা কেউ কারো পরিচয় নিয়ে মাতাল ছিল না। হাসান ভাবে মামুনের কি কোন অসুখ করেছে। নাকি অন্য কিছু। এ কয়দিন তার সাথে কথা না বলে বুঝতে পারছে সে আসলে কি চায়। হাসান জানে মামুন তার ৫ বছরের বড়। কিন্তু তার ভিতরের মানুষটাকে হাসানের বড় ভালো লাগে।

হাসানের আজকে মাত্র একটা ক্লাস ছিল। তাই সে সাঁটলে করে বাসায় যাচ্ছে। হাসান থাকে কদম তলীতে। তাই ঐ ইউনিভার্সিটির সাঁটলে করে আসা যাওয়া করতে সুবিধা হয়। একটা বগিতে উঠে তার বন্ধুদের সাথে বসে আছে হাসান। এক জন তাকে বলে হাসান তোর পায়ে পড়ি একটা গান ধর। আমরা প্রতিদিন আসা যাওয়াতে তোর গান শুনতে শুনতে অভ্যস্ত আর এখন তুই গান ছেড়ে কেমন যেন নিরামিষ হয়ে গেছিস। হাসান জানালার পাশে গিয়ে বসেছে। বন্ধুদের চাপা চাপিতে একটা গান ধরল। সবাই জানে হাসান লালন খুব ভালো গায়। কিন্তু আজকে গাইতে লাগলো ইয়াতি ব্রান্ডের একটা গোপন কথা।
“ একটা গোপন কথা ছিল বলবার বন্ধু সময় হবে কি তোমার?
একবার শুনে ভুলে যেও বার বার ভুলে ও কাউকে বল না আবার।
মুখে ভালোবাসি না বলে, মনেতে প্রেম নিয়ে চলে আছে অনেকেই।
এত দিন ছিল সাধারণ তার মাঝে এক জন যাকে আজ বড় আলাদা লাগে।
মন আঁধারের নীলিমায় তোমাকে আজ খুঁজতে চায়, জানি না কোথায় পাবো তোমায়।
এক বার এসে দেখ আমায়”।

ঐ বগির এক কোনায় বসে আছে মামুন গান শুনে ঐ বন্ধুদের জটলার দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু বুঝতে পারছে না গানের গায়ক কে। আর ট্রেনের আওয়াজের কারণে গানটাও পরিষ্কার করে শুনতে পারছে না সে।
কদম তলীর স্টেশনে নেমে মামুন একটা সিগারেট ধরিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মন খারাপ করে। কোন উপায়ে রাতুলকে সে খুঁজে বের করতে পারলো না। আজকে ও মেরিন সাইন্সের ফ্যাকাল্টিতে অনেক ঘুরা ঘুরি করেছে। লাভ হয়নি কিছু। তাই দাঁড়িয়ে দাঁড়ীয়ে চিন্তা করছে, সে এখন কি করবে। পালিয়ে যাবে? নাকি মা বোনের কথাতে একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করবে। কিছুই ভাবতে পারছে না সে। সিগারেট একটার পর একটা জ্বালিয়ে যাচ্ছে। পিছন থেকে এক জন তার কাছে এসে বলে,
-হ্যালো আপনি? আমাকে চিনতে পারছেন? ঐ যে সেই দিন ধাক্কা খেলেন আমার সাথে।
-হা ছিনতে পারছি। আপনি হাসান।
-বা ভালোই তো আমার নাম মনে রেখেছেন। তা আপনি মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? আর আপনার সেই রাগান্বিত বন্ধুটি কই।
-না এমনি আচ্ছা আমি যাই ভালো থাকবেন।
মামুনের কথা বলতে ইচ্ছা করছিলো না। মাথার মধ্যে একটাই চিন্তা এখন সে কি করবে?
ঐ দিন রাত হয়ে যাওয়ায় মামুন হোটেলে থেকে যায়। পর দিন ভোরের ট্রেনে করে ঢাকা চলে যাচ্ছে।

হাসানের এক বন্ধুর বোনের বিয়ে কাল। তাই তার অন্য বন্ধুরা মিলে এক প্রকার হাসান কে টেনেই নিয়ে যাচ্ছে। তারা ৪ বন্ধু মিলে একটা বগিতে উঠলো। সবাই হাসানকে দোষ দিচ্ছে তুই গ্রুপে থেকেও চুপ করে থাকলে সব কিছু মাটি মাটি লাগে দোস্ত। প্লিজ কিছু একটা কর। সবাই আনন্দ করতে করতে ঢাকায় যাই। হাসান বাধ্য হয়ে একটা কবিতা ধরল। কবিতাটা আবৃতি করার সময় বার বার মামুনের কথা মনে পড়ছে তার। কারণ মামুন এই কবিতাটা অনেক পছন্দ করতো। অনেক বার শুনিয়েছে তাকে। আজকে কেন যেন ঐ কবিতাটাই ধরল,
“জানতাম এই দিনটা এক দিন আসবেই।
বুক ধর পর, কপালের বিন্দু বিন্দু ঘাম।
আমাকে জানান দিত, আর যাই কর, সত্যি সত্যি কাউকে ভালবেসো না”।

মামুন ঐ একই ট্রেনের বগিতে করে ঢাকায় যাচ্ছে। সে হাসানের কবিতা শুনতে পারছে না। কারণ তার কানে হেড ফোন লাগানো। সে গান শুনছে।
হঠাৎ করে ট্রেনটা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠে, তার হাত থেকে মোবাইলটা নীচে পড়ে যায়।
তখন তার কানে ভেসে আসতে লাগলো হাসানের কবিতা।
মামুন প্রথমে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সে বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেল। কান দুটো খাড়া করে ভালো করে শুনার চেষ্টা করছে। না এইবার সে বুঝতে পারলো। সে ভুল শুনছে না। ঐ ট্রেনে দেখা হওয়া হাসানই তার রাতুল। মামুনের চোখে পানি চলে আসলো। সে যেন ওখানে আঁটকে গেছে সামনে এগুতে পারছে না। সে ভাবছে বন্ধুদের মাঝ থেকে রাতুল কে ঢেকে এক পাশে এনে সব বলবে। সে কে?
এক পা সামনে বাড়িয়ে দিতেই তার ফোন কল বেজে উঠলো। সিটের নিচে পড়ে থাকা মোবাইল সেটটায় একটা কবিতার রিং টিউন দেয়া আছে। “সুনীলের কেউ কথা রাখেনি” কবিতাটা শুনে হাসান তার কবিতা আবৃতি বন্ধ করে মামুনের দিকে তাকিয়ে রইল। মামুন ফোনটা তুলে কানে ধরল। তার মা ও পাশ থেকে বলছে,
-কি রে তুই কই? কাল তোর বিয়ে আর তুই কোথায় হারিয়ে গেলি। তাড়াতাড়ি বাসায় আয়। আজ রাতে তোর গায়ে হলুদ।
মামুন মায়ের কথা শুনে সিটে বসে পড়লো। হাসান এখনো তার দিকে তাকিয়ে আছে। কিছু বলতে গিয়ে ও চুপ করে আছে। মামুন মনে মনে বলল আচ্ছা রাতুল কি আমাকে চিনে ফেলছে? না চিনার কথা। মোবাইলে অনেকেই আজ কাল কবিতার রিং টিউন দেয়।
মামুনের মনে পড়ে গেল। সে কি করতে যাচ্ছে। কাল তার বিয়ে। একটি মেয়ে সারা জীবনের স্বপ্ন নিয়ে সুখের সংসারের সন্ধানে তার সাথে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু তার সামনে তার ভালোবাসার মানুষ, অন্য দিকে সেই মেয়েটি আর সবার মাথার উপরে তার পরিবার আর সমাজ।

মামুন চুপ করে বসে আছে ট্রেনে। জানালায় দিকে তাকিয়ে ভাবছে না সে রাতুলকে বলতে পারবে না। আর ঐ মেয়েটাকে ও কষ্ট দিতে পারবে না। সে একটা তিন রাস্তার মোড়ে দাড়িয়ে। সব মানুষের জীবনের খাতার সমীকরণ মিল্লে ও সমকামীদের জীবনের সমীকরণের সমতা কক্ষনোই মিলে না। সমকামীদের জীবনটাই যেন এক অসমাপ্ত সমীকরণ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.