আমাকে আমার মত থাকতে দাও

লেখকঃ হোসেন মাহমুদ

-এক্সকিউজ মি।
-ইয়েস প্লিজ।
– ইলেকট্রিকাল ডিপার্টমেন্টা কোন দিকে?
-সামনে গিয়ে (বা মে মে মে)

কোন ফ্লিমের সিন হলে ঐ বামে যায়গাটা বলার সাথে সাথে আচার্য জনক কিংবা হতবাক, অবাক অথবা নির্বাক বলে চালানোর জন্য ইকো ব্যাবহার করতো। কোন ফ্লিমের সেট এ দাঁড়ীয়ে নয় আমেরিকার বিখ্যাত একটা ইউনিভার্সিটির বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি আমি। ইউনিভার্সিটিতে সবে মাত্র আমার পদার্পণ। ক্যাম্পাসটা এখনো পুরোপুরি চেনা হয়নি। তারপর ও নির্দ্বিধায় ও একজন আগন্তুকে হাত তুলে হাই কোট দেখিয়ে দিলাম। আমার কি দোষ বলুন, ঐ রকম একটা রাজপুত্রের মত ছেলে এসে চোখের সামনে দাঁড়ালে কারই বা কণ্ঠস্বর ঠিক থাকবে। আমি যে কোন কালে পুরুষ খেকো ছিলাম তাও না। আসলে এই ইউনিভার্সিটির মত একটা যায়গায় উঠে আসার জন্য আমার মত মধ্যবিত্ত একটা ছেলের অনেক চড়াই উৎরাই পোহাতে হয়েছে। তাই নিজের ভিতরে ঘুমিয়ে থাকা সুপ্ত বাসনা কে প্রাধান্য দিবার মত সময় কোন দিন ও আমার ছিল না।

দুইদিন পরের ঘটনা, আমি ক্লাস শেষ করে রুমে ফিরছিলাম। আমার রুমের উল্টো দিকের বারান্দায় তাকাতেই চোখ দুখানা আটকে গেল। আরে সেই দিনের ঐ ছেলেটা না। যাকে না জেনে হাই কোর্ট দেখিয়েছিলাম। আরে হাঁ আজকে তো ঐ দিনের চেয়ে বেশী সুন্দর লাগছে তাকে। হাই গোলার নেভি ব্লু সোয়েটার, লম্বা চুলের মাঝখানে গায়ের মেঠো পথের মত এঁকে বেঁকে হেঁটে গেছে একখানা সিঁথি। বাম কানে মোবাইল চেপে শব্দ করে হাসছে সে। সব মিলিয়ে কি অপূর্ব তাকে লাগছে, যদি সে একবার দর্পণে দেখত তাহলে লিবার্টি স্ট্যাচুর মত ওখানটায় সারাজীবন দাঁড়ীয়ে থাকতো। আমার রুমমেট এন্ড ফ্রেন্ড নাফিসের ডাকে ফিরে এলাম বাস্তবে।
-কি রে মূর্তির মত রুমের সামনে দাড়িয়ে আছিস কেন?
-এমনি দোস্ত।
-ঐ দিকে তাকিয়ে কি দেখছিলি?
-দোস্ত ঐ মোবাইলে কথা বলা ছেলেটাকে পরিচিত মনে হচ্ছে।
-আরে তার সাথে তোর কি ভাবে পরিচয় হবে? সে তো পাকিস্তানের রাওলপিন্ডির। আমার ব্যাচম্যাট। ইলেকট্রিকাল নিয়ে পড়ছে।
-ওহ তাই?

নাফিসকে কলা দেখিয়ে ঐ দিন নিজের ভিতর গোপনে যত্ন করে তুলে রাখলাম শহীদের মেমোরি। কিন্তু বেশী দিনের জন্য নয়। এইতো তার একদিন বাদেই সাপ্তাহিক ছুটির দিনে নাফিস আমাকে মাঠে নিয়ে গেল মাইন্ড রিফ্রেশ করতে। মাঠে নেমে দেখি শহীদ ও আছে সেখানে তার সাথে তার রুমমেট সারাফাত। পরে জানতে পারি তার বাড়ি পেশোয়ারে। সবাই খেলতে মাঠে নেমে গেছে এমনকি আমার বন্ধু নাফিস ও। শুধু মাঠের এক কোনায় দাঁড়ীয়ে আছি আমি আর আমার সাথে যোগ দিল শহীদ। তাকে দাঁড়ীয়ে থাকতে দেখে বুঝলাম আমার মত তারও খেলা দুলায় ইন্টারেস্ট কম। তার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে বুঝতে পারলাম। সে আমার মত স্বল্পভাষী আর শান্তিপ্রিয়। খুব কম কথা বলে, কথা বলে মনে হল সে প্রতিটা কথা বলে গোনে গোনে, আর পা ফেলে মেপে মেপে। যখনই আমাদের দুজনের বাক্যালাপ মাঝ রাস্তায়, ঠিক তক্ষনি তার বন্ধুরা এসে তাকে এক প্রকার টেনে হেঁচড়ে মাঠে নিয়ে যায়। তার চলে যাওয়া দেখে ভিতর ভিতর খারাপ লাগছিল, কিন্তু মুখে এক অজানা কৌতূহলের আশা নিয়ে তাকিয়ে আছি মাঠের দিকে। একটুপর শহীদের স্থানে এসে দাঁড়ালো তার বন্ধু সারাফাত। একাকীত্ব গছানোর দায় থেকে মুক্তি লাভে তার সাথেই সখ্যতা গড়ার চেষ্টায় ব্যস্ত হয়ে গেলাম। আমারা হাঁটতে হাঁটতে কথা বলতে লাগলাম। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে আমরা একে অপরের হাত ধতে হাঁটছিলাম এটা আমরা কেউ খেয়াল করিনি। হাটার মাঝখানে সারাফাত আমাকে একটা রিষ্ট ব্যান্ড দেয়। ওটা ছিল আমাদের বন্ধুত্বের সূচনার জন্য। দেয়। আমারা নিজেদের সম্পর্কে, আমাদের পরিবার বন্ধু বান্ধব সম্পর্কে বলতে লাগলাম।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতেই ঐ দিন সবাই হল মুখে যাত্রা করি। আর ঐ দিনেই শহীদ আর সাফাতের মাঝে বন্ধুত্ব আহবানের পতাকা গেঁড়ে দিয়ে আসলাম আমি। সময়ের চাকা চলতে লাগলো। কারণে অকারণে শহীদের সাথে দেখা করা, তার সাথে কুশলাদি বিনিময় ছাড়া ও আমার মনের ভিতরে, তাকে ঘিরে একটা ভাবনার জাহাজ তীর খুঁজতে লাগলো। হাঁ সেইটাই, শহীদ আমার জীবনে প্রথম ক্রাশ। তাকে ভালো লাগতে শুরু করল আমার। নিজের ভিতরে এত দিন লুকিয়ে রাখা সব ভালোবাসার জোয়ার ভেসে যেতে লাগলো তার দিকে। সময় পেলেই ঝোপ বোঝে কোপ মেরে শোয়ার হয়ে যেতাম শহীদের রুমে। তার দিকে অপলক দৃষ্টিতে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকা আমার জীবনের সুসময় বলে চালিয়ে নিতাম। কিন্তু মজার বিষয় হল, শহীদ নিজে ও আমার দিকে ঐ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো। তার ঐ ক্ষণিকের দৃষ্টি বিনিময় আমাকে তার প্রতি আসক্তটা হিমালয় চূড়ায় পোঁছে দিত। তার কথাতে ছিল প্রচয় দেয়ার হাত ছানি। সোজা হিসাব মিলাতে আমার ও কষ্ট হয়নি সেদিন, শহীদ আমার মতই একজন। তারপর ও ছিল তাকে কিংবা তার ভালোবাসা আমার খাঁচায় ধরা দিবার এক রাজ্যর অপেক্ষা।
ঐ যে বলছিলাম না সময় ফেলেই শহীদ কিংবা সারাফাত শিরোনাম নিয়ে তাদের রুমে যাবার ছুতো। এক রাতে তার রুমমেট সহ আড্ডায় মুখরিত আমরা। আমার কর্ম উদ্ধারে এক নিদারুণ ভূমিকা রাখল কারেন্ট। ঐ রাতে কালে ভদ্রে যাওয়া কারেন্টা ক্ষণিকের জন্য গেল উধাও হয়ে। ভাগ্যক্রমে আমি আর শহীদ দাঁড়ীয়ে আছি পাশাপাশি। কারেন্ট যাবার কয়েক মিনিট পর মেশিনে নিয়ন্ত্রিত হাতের মত আমার হাতটা তার হাতের উপরে গিয়ে ঠেকল। বুঝতে পারলাম এই কর্মের জন্য একক ভাবে শুধু আমিই দোষী নয়। শহীদ নিজে ও অন্ধকারে আমার হাতে আশ্রয় প্রত্যাশী ছিল। ঐ দিনের পর বুঝতে পারি শহিদ আমাকে পছন্দ করে।
কিছু দিন যাবার পর আমাদের রুমমেট’রা বুঝতে পারে যে আমরা একে অপরকে পছন্দ করি। আসলে আমারা দুই জনেই ছিলাম লাজুক প্রকৃতির। আমারা খুব বেশী কথা বলতাম না। কিন্তু দুই জনই আমাদের মধ্যে যে গভীর আবেগ ছিল সেটা অনুভব করতাম। আমারা একে অপরের খুব কাছা কাছি চলে আসছিলাম। ধীরে ধীরে আমাদের পড়াশুনার চাপ বাড়তে লাগলো। অনেক এসাইনমেন্ট করতে হত। তাই ওর সাথে সময় কাটানোর বেশী সময় পাওয়া যেত না। কিন্তু আমরা এক সাথে খেতাম। নির্জন জায়গায় এক সাথে পড়তে বসতাম। এক মাস পর শহীদ এর এক রুম মেট পাকিস্তান চলে যায়। তার পর থেকে শহীদ ও সারাফাত এক সাথে থাকতে লাগলো। তখন ভাবলাম এই বুঝি সুযোগ শহীদের সাথে আমার সম্পর্ক টা আরও এক ধাপ এগিয়ে নেবার। ও চলে যাওয়াতে শহীদের রুমে আমার যাতায়াত বেড়ে গেল। শহিদ ও চাচ্ছিল আমি তার রুমে যাই। শহিদের একটা অভ্যাস ছিল দীর্ঘ সময় ঘুমানোর। এবং সকালে ঘুম থেকে উঠতে পারতো না। শহিদ আমাকে বলতো তাকে সকালে ঘুম থেকে ডেকে তোলার জন্য। আমার ও সকালে ক্লাস থাকত তাই আমারও কোন সমস্যা ছিল না তাকে সকালে ঘুম থেকে ডেকে তোলার। প্রথম সপ্তাহ আমি খুব সাবধানে রুম থেকে বের হতাম শহিদকে ডাকার জন্য। যাতে আমার রুমে মেট’রা কিছু বুঝতে না পারে। কিন্তু এভাবে বেশী দিন নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারলাম না। আমার এক রুম মেট বুঝে যায় আমি কি করছি। শহিদ কে ঘুম থেকে উঠানোর ব্যাপারটা আমার কাছে বেশ মজা লাগত। আমি শহিদ এর কাছে যেয়ে দীর্ঘ সময় নিয়ে বলতাম শহিদ! শহিদ! উঠো!! উঠো!! কারণ আমার তার সদ্য ঘুম থেকে উঠা মায়া মায়া চেহারা দেখতে খুব ভাল লাগতো।

এক দিনের ঘটনা। আমি শহিদ কে ডাকতে ডাকতে ক্লান্ত হয়ে গেছি। কিন্তু তার উঠার নাম নেই। আমি তার বিছানায় বসে পড়লাম। ভাবলাম একটু পর আবার ডাকবো। কিন্তু কখন যে আমি তার বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি আমি নিজেও জানি না। আমাদের দুই জনেরই ঘুম ভাঙল সারাফাতের ডাকে। সারাফাত আমাদের দুই জন কে একি বিছানার দেখে মজা করতে লাগলো। আমারা নাকি হাসবেন্ড ওয়াইফ এর মত শুয়ে আছি। শহিদ ও আমার উপর হাঁসতে লাগলো। আমি বুঝতে পারলাম সে কিছুই জানে না এমন টা বুঝানোর জন্য অভিনয় করে যাচ্ছে। কিন্তু সত্যি কথা সারাফাতের এই মজা করার ব্যাপারটা আমি একটু ও লজ্জা পাইনি। এই ঘটনা আমার রুম মেট রাও জেনে যায়। এবং তারা আমাদের নিয়ে কথা বলা শুরু করে। এমনকি ক্লাস এ পর্যন্ত আমাদের নিয়ে আলোচনা হত। এটা আমার জন্য সামান্য অসস্থিরকর হলে ও বিরক্তিকর ছিল না।

এদিকে লোকমুখে শুনতে পাই সারাফাত সবাইকে বলে বেড়াচ্ছে আমি মেয়ে নয় ছেলে লাইক করি। কিন্তু কেউ সেইটা বিশ্বাস করত না। কারণ আমার ব্যাবহার কিংবা চাল চলনে মেয়েলি ভাবটা বরাবরই অনুপস্থিত ছিল। তাই আমি ঐসব বাজে কথায় নাক গলাতাম না। একদিন শহীদ আমকে তার একটি পাকিস্তানি ড্রেস উপহার দেয়। ওদের ঐ খানে এই ড্রেস কে বলে সেলোওয়ার-কামিজ। যাই হোক গোলাপি কালারের ড্রেসটি আমি পরি। এবং বুঝতে পারি আমকে খুবি সুন্দর লাগছে। এই ড্রেসে দেখার পর শহীদশহিদ আমাকে আগের থেকে আরও বেশী পছন্দ করতে শুরু করে। কিন্তু আমি বুঝতে পারি ও পুরপুরি আমার প্রেমে পড়ে গেছে। শহীদ আমার প্রথম ভালবাসা। এই ভাবে আমাদের কখন দুই সেমিস্টার শেষ হয়ে ১ বছর পার হয়ে যায় আমি টের ও পারিনি। এরই মধ্যে শহীদ আমার সাথে একদিন খারাপ ব্যাবহার করে। আমার সাথে অন্য এক জনের সম্পর্ক নিয়ে সন্দেহের ব্যাপারে। তাই কয়েক সপ্তাহ তার সাথে কথা বলিনি। আমি কল্পনা করতে পারি সেই সময় টা। আমি শহীদকে কখনো বলিনি শহীদ শুধু মাত্র আমার। আমি শহীদ কে ছাড়া বাঁচবো না। কিন্তু তারপরেও আমার জীবন পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ শহীদের কাছে। আমার এই সাময়িক নিস্তব্ধতা শহীদের খারাপ লাগা শুরু হয়। সে আমাকে মিস করতে থাকে। তাই সে সারাফাত কে অনুরোধ করে আমাদের মিউচুয়াল করে দেবার জন্য। একদিন সারাফাত আমাকে ও শহীদকে নিয়ে ডিনারে যায়। আমাদের ডিনার মাঝা-মাঝি অবস্থায়ও আমারা একে অপরের সাথে কোন কথা বলিনি। কিন্তু আমি আড় চোখে শহীদ কে লক্ষ করছিলাম। তার চেহারায় স্পষ্ট ভাবে বিষণ্ণতার ছাপ দেখা যাচ্ছিল। হঠাৎ সারাফাত আমাদের দুই জনের হাত ধরে মিলিয়ে দেয়। এই প্রথম আমি শহীদের জন্য কান্না করি। শহীদ ও কান্না করে দেয়। তারপর আমরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরি প্রথম বারের মত। এই প্রথম আমারা একে অপরের এতো কাছা কাছি আসা। সেই অদ্ভুত অনুভূতি বর্ণনা করা যাবে না।

ঐ দিনের পর থেকে শহীদ সিদ্ধান্ত নেয় আমারা এক সাথে থাকব। যাতে করে আমরাও একে অপরের আরও কাছাকাছি থাকতে পারি। আমি শহীদ ও সারাফাতের এক সাথে থাকার জন্য নতুন রুমের অ্যাপ্লাই করি। এবং সৌভাগ্য বসত আমরা নতুন একটি রুম পেয়ে যাই। কিন্তু এরই মধ্যে শহীদ কে কিছুদিনের জন্য পাকিস্তান যেতে হবে। তার উপায় ছিল না। সে খুবি ধনী পরিবারের এক মাত্র ছেলে। তার পাকিস্তান যাবার আগের দিন ছিল তার পুড়নো রুমের শেষ দিন। ঐ দিন আমি তার সাথে এক বিছানায় থাকার অনুমতি পেয়ে যাই। আসলে অনেক দিন শহীদ কে দেখবো না তাই ঐ রাতটা আমার জন্য খুবি গুরুত্ব পূর্ণ ছিল। আমরা রুমে একা ছিলাম। কারণ সারাফাত এক পাকিস্তানি ফ্যামিলি বাসার গিয়েছে দাওয়াত খেতে। আমি ও শহিদ এক খাটে শুয়ে আছি।যদিও আমাদের চিন্তায় সেক্স ছিল না। কিন্তু যেহেতু আমারা এডাল্ট তাই স্বাভাবিক ভাবে একে অপরের শারীরিক উষ্ণতায় উত্তেজিত হয়ে উঠছিলাম। কিন্তু আমরা কেউ জানি না কিভাবে শুরু করবো। কোথা থেকে শুরু করবো। এক পর্যায় আমি শহিদকে কিস করা শুরু করি। যেহেতু গোপনে সবাই এডাল্ট ফ্লিম দেখি তাই ব্যাপার টা খুব একটা অপরিচিত ও না। আমাদের অন্তরঙ্গ অবস্থায় আমি বুঝতে পারি শহিদের মাঝে টপ ভাব প্রবল। কিন্তু হায় আমি ও যে একজন টপ!! কি করবো কিছু বুঝে উঠতে না পেরে, নিজেকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করে শহিদকে সুযোগ করে দেই। আমাদের মাঝে শারীরিক সম্পর্কটা প্রাকৃতিক ভাবে শুরু হয় এবং প্রাকৃতিক ভাবেই শেষ হয়। আমরা একে অপরের সাথে এই নিয়ে কোন কথা বলি নাই। ঐ দিনের ঐ রাতটি আমাদের জন্য যথেষ্ট ছিল না। ঐ রাতে আমরা এক অপরকে জড়িয়ে শুয়ে পরি। পরদিন সকালে আমি ঘুম থেকে উঠে আগে সাওয়ার নেই। তারপর শহিদ কে ডেকে তুলি। আমরা দুই জনই এমন এমন ভাব করতে লাগলাম যে গত রাতে আমাদের মাঝে কিছু হয় নি। নাস্তা করে তৈরি হতে লাগলাম বের হওয়ার জন্য। ঐ দিন দুপুরে সে পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। আমার জন্য রেখে যায় তার টি- শার্ট ও ভেজা আন্ডার ওয়্যার। আমি জানি না কেন কিন্তু আমি বার বার তার টি-শার্ট ও ভেজা আন্ডার ওয়্যারের গন্ধ শুঁকতে থাকি। এবং সারা দিন এই কাজ টাই করতে থাকি। তার অনুপস্থিতি হয়তো আমকে ভয়ংকর ভাবে গ্রাস করেছিল। তাই তার ফেলে যাওয়া জিনিসের মাঝে তাকে খুঁজে ফিরি।

কয়েকদিন পর আমার স্বপ্নের রাজপুত্র শহীদ চলে আসে। সাথে করে নিজের জন্য প্রচুর কাপড় ও তার কিছু পাকিস্তানি ফ্রেন্ড এর জন্য সালওয়ার কামিজ। কিন্তু আমার জন্য কিছু না। এই ব্যাপাটায় আমি কিছুটা কষ্ট পাই। কিন্ত তাকে কখনো বলিনি। আমি আড়ং থেকে একটা সাদা কালারের পাঞ্জাবি কিনে শহীদকে উপহার দেই। কিন্তু কখনো তাকে সেটা পরতে দেখিনি। এবং সে কখনো বলে নি পাঞ্জাবি টা কেমন। যাই হোক আগের মত যাচ্ছিল আমাদের দিন, এক সাথে থাকা, খাওয়া, ঘুরা। কিন্তু কিছু দিন পর থেকে শহীদ কেমন যেন চেঞ্জ হয়ে যাচ্ছে। আমাকে আগের মত অতটা পাত্তা দেয় না। কথা বলতে গেলে উত্তর দেয় না। আমি ভেবে পাই না তার এমন করার কারণ কি। আমি সারাফাত কে জিজ্ঞাসা করলাম শহীদ আমার সাথে এমন করছে কেন, সে ও আমাকে কিছু বলল না।
আমাদের সেমিস্টার শুরু হয়ে গেল। যথারীতি সবাই বিজি হয়ে গেলাম। শহিদের ক্লাসে এক ইন্ডিয়ান ছেলে আসে। তার সাথে সে খুব ভাল ভাব জমায়। ইন্ডিয়ান ছেলে তার সাথে তাই করতে লাগলো যা সে শুরুতে আমার সাথে করেছে। সারাফাত আমাকে এক দিন বলল সে নাকি ঐ ইন্ডিয়ান ছেলেটার সাথে শহীদ কে খুব ক্লোজলি দেখেছে। মনে হয়েছে তারা বয় ফ্রেন্ড। এই কথা শুনে আমি আকাশ থেকে পড়ি। একদিন শহীদ ও সারাফাত কে বলতে শুনলাম ঐ ইন্ডিয়ান ছেলেটার ব্যাক সাইড অনেক সুন্দর। সে নাকি ওর ব্যাক সাইড টাচ করেছে। এই কথা শুনে আমার রীতিমত মরে যাবার অবস্থা। ঐ দিন রাতে আমি শহীদ কে কিছু বলিনি । আমি আসলে দেখতে চাচ্ছিলাম সে ঐ ইন্ডিয়ান ছেলেটার সাথে কি করতে চাচ্ছে।
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভালোলাগা গুলোকে সমবেত করে আমি আমার ভিতরে যে ভালোবাসার পাহাড় বানিয়েছিলাম শহীদের জন্য। তার অকাল অবসান দেখে আমি বদলে যেতে লাগলাম। আমার পড়া লেখার অবস্থা খুবি খারাপ হয়ে যায়। ঠিক মত ঘুমাতে পারি না। খেতে পারি না। নিয়মিত ক্লাসে যাই না। একদিন শহীদ সাথে করে এক বাঙ্গালি ছেলেকে নিয়ে আসে রুমে। এবং আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলে আমাকে তার রুম থেকে বের করে দিবে। আমি কিছুই বলি না। শুধু বিছানার শুয়ে শুয়ে কাঁদি। আর চিন্তা করি এখন আমি কি করবো? কারণ কোন বাঙালীর সাথে আমি ভাল সম্পর্ক রাখিনি শহিদের কারণে। তারা কেউ আমাকে তাদের রুমে নিবে না। অন্য কেউ আমাকে তাদের রুমে জায়গা দিবে না কারণ শহীদ ইতি মধ্যে আমার নামে অনেক বাজে বাজে কথা ছড়িয়েছে। এই দিকে শহীদ উঠে পড়ে লাগলো আমাকে তার রুম থেকে বের করে দেয়ার জন্য। এক সময় মনে হল আমি সুইসাইড করি। তারপর আমার সমস্যার কথা এক বড় ভাই কে বললাম। সে আমাকে এক ইরানি ছেলের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। তারা দুই জন থাকতো রুমে। আমার সব কথা শুনার পর আমাকে সাহায্য করারা জন্য এগিয়ে আসলো। আমি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নতুন রুমে চলে আসি। কয়েক সপ্তাহ আমার খুবি খারাপ কাটল। শহীদ এক বার ও আমার খোঁজ নিতে আসেনি আমি কেমন আছি, কি খাচ্ছি। আমিও তার দেখা পেতাম না কারণ তার ও আমার ডিপার্টমেন্ট আলাদা।
আমার রেজাল্ট খুব খারাপ হল। আমি চিন্তা করলাম এটা যেভাবেই হোক আমার ওভারকাম করতে হবে। আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। পড়ালেখাই আমার সব। আমাকে পড়ালেখার করতে হবে আমার ফ্যামিলির জন্য। ৪র্থ সেমিস্টার শুরু হয়ে গেল। আমি এবার পড়া লেখা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলাম। কিন্তু ঐ পড়ালেখার দোহাই দিয়ে আমার অশান্ত মনকে শান্ত করতে পারছিলাম না। হলের সব মানুষ যখন ঘুমের ঘোরে বিভোর তখন আমার চোখের কোনের জ্বল গড়িয়ে এসে পড়ত বইয়ের পাতাতে। শুধু একটা প্রশ্ন নিয়ে শহীদের সামনে দাঁড়াতে ইচ্ছা করত বার বার, কি দোষ ছিল আমার? কেন সে আমাকে খুব যত্ন করে অযত্নের অবহেলায় ভাসিয়ে দিল। কেন সে আমার ভালোবাসার চূড়ান্ত অপচয় করল? সে যদি সমকামী নাইবা হয়, তাহলে ঐ রাতে কেন নিজেকে শরীর কামনার দাস বানিয়ে উপভোগ করেছিল আমাকে? আর ঐ ইন্ডিয়ান ছেলে? তার মানে সে একজনে তৃপ্ত নয়। সে যাই হোক তার দাবার গুটি হয়ে আমি বুঝতে পারলাম, আমি এক মরীচিকার পিছনে গা ভাসিয়ে ছুটে বেড়িয়েছি। তারপর ও তার প্রতি বিন্দু মাত্র অভিযোগ করেনি আমি। ভালোবাসার অধিকার নিয়ে তার সামনে গিয়ে ও দাড়াইনি কোন দিন। আমি সত্যি বোকা, শুধু বে হিসাবে অকাতরে অপাত্রে ভালোবাসা দান করেই গেছি। কিন্তু ভালোবাসা ফিরিয়ে নিবার বাণিজ্য আজ আমার শিখা হয়নি আর বোধহয় হবে ও না কোন দিন।
গল্পটা এইখানে শেষ করতে পারলে ভালো কিন্তু না তার পর ও শেষ হল না কাহিনী। শহীদ আমার জীবনের প্রথম ভালোবাসা। তাই তাকে একদিনের জন্য ও আমি ভুলতে পারিনি। হয়তো আমার অযাচিত মন তাকে ভুলতে দেয়নি। কিন্তু আমার মনে একটা বিশ্বাস ছিল, আমার ভালোবাসা যদি সত্যি হয় তাকে একদিন না একদিন আমার কাছে ফিরে আসতেই হবে। হ্যাঁ সে একদিন এসে ও ছিল আমার কাছে।

আমি সবকিছু ভুলে থাকার অভিনয়ের পাট নিয়ে নিজেকে ব্যস্ত রেখে পড়া লেখায় আমার ঝাঁপিয়ে পড়লাম। তার পরের সেমিস্টার গুলোর রেজাল্ট ও ভালো আসতে লাগলো। বসন্তের এক পড়ন্ত বিকেলে দাঁড়িয়ে আছি আমার ঝুলবারান্দার রেলিং ধরে। একজনের ডাকে পিছন ফিরে তাকিয়ে হতবাক হয়ে গেলাম আমি। দেখলাম শহীদ দাঁড়িয়ে আছে তার চোখে মুখে অনুশোচনার আগুন। আর আমাকে ফিরে পাওয়ার ব্যাকুলতা তার করুণ কণ্ঠে। আমি তার দিকে অপলক ভাবে তাকিয়েই আছি। আমার মুখ দিয়ে কোন শব্দ বের হচ্ছে না। আমার ভিতরটা আমাকে জানান দিতে লাগলো, ইয়েস আমার ভালোবাসা সত্যি। শহীদকে আমার কাছে ফিরে আসতেই হল, কিন্তু হায় এখন আমার তার প্রতি আর কোন অনুভূতি বোধ নেই। মনে হচ্ছে আমি পাথর হয়ে দারিয়ে আছি। চিৎকার দিয়ে তাকে বলতে ইচ্ছা করছিল, শহীদ সেই রাত গুলোর কথা তোমার মনে আছে। আমার সেই একটা কষ্টের রাত তোমার হাতে তুলে দিলে, বুঝতে তুমি কষ্ট কাকে বলে।

আমি কোন জবাব দেয়নি। আমি আবার প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে মনে মনে গাইতে লাগলাম অনুপম রায়ের গানটি:
আমাকে আমার মতো থাকতে দাও,
আমি নিজেকে নিজের মতো গুছিয়ে নিয়েছি।
যেটা ছিলনা ছিলনা সেটা না পাওয়াই থাক,
সব পেলে নষ্ট জীবন।

তোমার এই দুনিয়ার ঝাপসা আলোয়,
কিছু সন্ধ্যের গুড়ো হওয়া কাচের মতো।
যদি উড়ে যেতে চাও তবে গা ভাসিয়ে দাও,
দূরবীনে চোখ রাখবো না।

এই জাহাজ মাস্তুল ছারখার,
তবু গল্প লিখছি বাঁচবার।
আমি রাখতে চাইনা আর তার,
কোন রাত-দুপুরের আবদার।
তাই চেষ্টা করছি বারবার,
সাঁতরে পাড় খোঁজার।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.