আমি এবং কিছু প্রশ্ন

লিখেছেনঃ হোসেন মাহমুদ

আমার নাম জাহিদ (ছদ্ম নাম), একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরী করছি গত ২ বছর ধরে ।
আমার জীবনের একটি অন্ধকার অধ্যায় আছে যা কেউ জানে না ।
আজ আপনাদের তা বলব।
তার আগে জেনে রাখা ভালো যে, আমি সমকামী না । সমকামী ছিলাম না, কিন্তু এখন??
এখন আমি কি জানতে হলে পড়তে হবে আমার জীবনের গল্পটা……।।

তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স ৩য় বর্ষে পড়ি ।
টিউশনি করে নিজের পড়ার খরচ চালাই।
ধানমণ্ডির ২৭ এ একটা বাড়ীতে পাপন নামে ইংলিশ মিডিয়াম এর এক ছাত্রকে পড়াতাম ।
১৭ বছর হবে তার বয়স ।
পাপন দেখতে চমৎকার ছিল, লম্বা ছিল বেশ । গায়ের রঙটাও বেশ ফরসা ।
একদম চিকন তার শরীর।
ওর স্বভাব ছিল একটু অন্য রকম, বোম মারলেও মনে হয় মুখ থেকে কথা বের হবে না।
প্রথম প্রথম ভাবতাম বোধহয় ছেলেটা হাসতেই জানে না।
১ম দুই দিন পড়িয়ে ভাবলাম এই নিরামিষ ছেলে পড়িয়ে কোন লাভ নেই। কিন্তু ওর করুণ চোখের চাউনিতে স্পষ্ট দেখতাম ও কত একা আর দুখী ।
খুব মায়া হল । ছেলেটার জন্য ।
তাই ভাবলাম কি করে তাকে স্বাভাবিক করা যায়।
একদিন খুব তাড়াতাড়ি পড়াতে গেলাম তাকে ।
সামনে বসিয়ে বললাম, পাপন । তুমি কি জানো আমি কতটা একা এই দুনিয়াতে ? আমার কাছের কোন মানুষ নেই। তুমি বোধহয় আমার চেয়ে বেশি কষ্টে নেই।
পাপন বলে, স্যার । আপনার বোধহয় কষ্টের সংজ্ঞাটা জানা নাই।
আমি মৃদু হাসলাম ।
বললাম, বোধহয় তাই ।
শোন তাহলে, আমি ছোট বেলায় কখনো পেট ভরে ভাত খেতে পারিনি, ২ বছরেও একটা পুরান জামা পরিবর্তন করতে পারিনি, মার আদর বাবার শাসন কি জানি না। পরিবার বলতে কিছু আমার জীবনে নাই। হ্যাঁ । আমি একটা এতিমখানায় বড় হয়েছি। আমার বাবা মাকে আমি জানি না। হয়তো কোন পতিতালয়ে দুইজন মানুষ এর ১০ মিনিট এর লালসার ফসল আমি, কিন্তু দেখ এখনো জীবন এর হাল ছাড়িনি আমি। এক হৃদয়বান ব্যক্তির জন্য আমি ঢাকায় পড়তে পারছি ।

পাপন এর চোখে পানি ।
পানি লুকানোর চেষ্টা করে ও বলে, স্যার আপনার কষ্টের সাথে আমার কষ্টের তুলনা করতে চাই না ।
আপনার জীবনে কিছু না পাওয়ার কষ্ট আর আমার সবকিছু পেয়ে আমি অসুখী ।
বাবা বিশাল বিজনেসম্যান এবং রাজনীতিবিদ । মা ডাক্তার । সমাজসেবার গুরু দায়িত্ব নিয়ে ব্যস্ত ।
দামী গাড়ি, পকেটে অনেক টাকা, নতুন জামা কিছুরই কমতি নেই ছোট বেলা থেকে।
কিন্তু আমি বড় হই কাজের মেয়ের কোলে কোলে ।
আমি অসুস্থতা আর মনখারাপ নিয়ে তাদের কোন মাথা ব্যথা নেই ।
তাই নিজেকে কম্পিউটার আর পড়াশুনার মাঝে ডুবিয়ে রাখি ।
আমার পৃথিবী আমার ঐ ঘর, বই আর ইন্টারনেটে সীমাবদ্ধ ।
বাইরের দুনিয়ায় সাথে আমার কোন পরিচয় নেই। তাই আমি একটু অন্যরকম।
পাপন চুপ করে রইল।
আমি তাকে বললাম , তুমি আজ থেকে একা না, আমি তোমার বন্ধু ।
তুমি সব কিছু আমার সাথে শেয়ার করতে পার। আমি শুনব তোমাকে । আর আমি তোমার স্যার হলেও তুমি আমাকে নাম ধরে ডাকতে পার, আমার নাম জাহিদ।

আমি লক্ষ্য করলাম কিছুদিন এর মধ্য ওর একটা আমুল পরিবর্তন ঘটেছে ।
আজকাল ও হাসতে শিখেছে দেখে অন্যরকম একটা ভালোলাগা কাজ করে।
আমরা পড়ার ফাঁকে গল্প করতাম, রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রেম ভালোবাসাও বাদ পড়তো না আমাদের আলোচনা থেকে।
একদিন সে আমাকে প্রশ্ন করে, জাহিদ ভাই । আপনার কোন গার্ল ফ্রেন্ড নাই ?
উত্তরে বললাম, না রে ভাই। জীবনের সাথে যুদ্ধ করে পথ চলতে চলতে প্রেম করার সময়ই পেলাম কই? আমার মত যাযাবরকে বিয়েই বা কে করবে ?
পাপন বলে, কি বলেন জাহিদ ভাই!
আপনার মত হ্যান্ডসাম ছেলের মেয়ের অভাব পরবে না। আমি মেয়ে হলে আমি আপনাকেই বিয়ে করতাম।
ওর কথায় হেসে বললাম, তা তোমার গার্ল ফ্রেন্ড আছে নাকি?
পাপন বলে, সত্যি কথা বলতে কি আমি এখন পর্যন্ত কোন মেয়ের হাতও স্পর্শ করেনি।
জাহিদ ভাই । আমার কোন বন্ধু নাই । তুমি ছাড়া ।
তোমার সাথে সবকিছু শেয়ার করতে ভালো লাগে। আমি যে জীবিত একজন প্রাণী যখন তুমি আমার সাথে থাকো তখন মনে হয়। আমি ওযে হাসতে পারি তোমার সাথে পরিচয় না হলে জানতামই না কোনদিন।

এই ভাবে গল্প আর পড়ায় চলতে লাগল আমাদের সময়।
এর মাঝে এক রাতে পাপন আমার হলে এসে দরজায় দাঁড়িয়ে।
আমি অবাক ।
তখন আমি মহসিন হলে থাকতাম।
ভূত দেখার মত বললাম, পাপন তুমি ! এত রাতে !
পাপন বলে, মা বাবা ঝগড়া করছে বাড়ীতে । ভীষণ একা একা লাগছিলো । তাই পালিয়ে তোমার কাছে চলে আসছি।
আমি বললাম, পাপন তুমি বড় লোকের ছেলে ।তোমাকে কোথায় থাকতে দিবো ? আমি নিজেই আছি একটা সিঙ্গেল চকিতে পাশে আর একজন রুমমেট ।
আমি বললাম, এই চকিতে থাকতে পারবে আমার সাথে ?
পাপন বলে, আমার কোন সমস্যা নাই জাহিদ ভাই। তোমার কোন কষ্ট না হলেই হয়।
আমি বললাম, আরে না না আমার কোন কষ্ট হবে না । সারা জীবন এই ভাবেই বিছানা শেয়ার করে কাটিয়েছি।

রাতে পাশাপাশি শুয়ে আছি আমি আর পাপন ।
আমি তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পরলাম ।
বিছানায় পিঠ লাগাইলেই ঘুম চলে আসে আমার । ছোটবেলা থেকেই আমি এই রকম ।
আমার চিন্তা কম, পয়সা নাই, সংসার এর কোন ঝামেলা নাই এই জন্যই বোধহয়।
মাঝ রাতে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায় ।
খেয়াল করলাম পাপন আমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাচ্ছে । যেন একটা বাচ্চা আমার বুকের মাঝে মুখ গুজে শুয়ে আছে।
আমার খুব মায়া লাগল । কতদিন এমন নিশ্চিন্তে ঘুমায়নি কে জানে।
আমি আরও বুকের মাঝে আগলে ধরি তাকে।
কিন্তু একটু পর বুঝতেপারলাম আমার অনুভুতি অন্যদিকে যাচ্ছে ।
কারন এই প্রথম কোন মানুষ আমার এতটা কাছাকাছি । তার নিঃশ্বাস আমার গায়ে এসে লাগছে ।
বুজতে পারছিলাম আমার পেনিস দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছি । পারছি না।
পাপন এর পুরুষাঙ্গটাও আমার শরীর সাথে লাগছে সুতরাং সেও উত্তেজিত।
পাপন বুঝতে পারে আমি জেগে আছি ।
কিছু বুঝে উঠার আগেই সে আমাকে কিস করে আমার ঠোটে ।
আমি আরও উত্তেজিত হয়ে উঠি। সামলাতে পারিনি নিজেকে ।
তাকে কিস ব্যাক করি তার মত করে।
যদি ও কোন মানুষকে এইটা আমার প্রথম কিস, বুজতে পারছিলাম না কি করব?
এই পাপন কি হচ্ছে বলে সতর্ক করে দিলাম তাকে।
সে বলল, জাহিদ ভাই । আমি কোনদিনও কাউকে কিস করিনি ।আগে শুধু মুভিতে দেখছিলাম। আজ করলাম তোমাকে, আমার সবচেয়ে পছন্দের মানুষটিকে।
পাপনকে হাত টিপে সতর্ক করে দিলাম রুমমেট আছে পাশে।
বললাম পাপন, এই বিষয় নিয়ে পরে কথা হবে । এখন ঘুমাও।
ও বাচ্চাছেলের মত ঘুমিয়ে গেছে আমার বুকের মাঝে।
আমার ঘুম আসছে না ।
আমার পেনিস তখনো দাঁড়ানোই ছিল । কিন্তু আমার মাঝে তখন এমন কোন কিছু কাজ করেনি যে পাপন এর সাথে সেক্স করতে হবে।
আমি তখন পর্যন্ত কারো সাথে কিছু করিনি শুধু আমার হাত ছাড়া।

সকালে পাপনকে ক্যান্টিন থেকে চা আর পরোটা খাইয়ে বাসায় দিয়ে আসতে গেলাম।
তখনো জানতাম না যে আমার জন্য বড় একটা সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে।
পাপন এর বাবা মা দুইজন এই বসার ঘরে অপেক্ষা করছে।
আমি ওকে নিয়ে ঘরের ভিতরে গেলাম।
ওর বাবাকে বললাম, ও কাল রাতে আমার সাথে হলে ছিল।
ওর বাবার চেহারা আর ব্যাবহার যা ছিল তা মনে রাখার মত।
আজও ভুলিনি আমি।
উনি আমাকে বললেন, আপনার বেতন যা পাবেন আজ বিকেলে এসে নিয়ে যাবেন। পাপনকে আর পড়াতে হবে না আপনার। আমরা ওকে বিদেশে পাঠিয়ে দিচ্ছি। আপনি এখন আসতে পারেন।

পাপন আমার দিকে অপরাধীর মত তাকিয়ে আছে।
আমি ওর দিকে শেষবারের মত তাকিয়ে চলে আসলাম।
ঐ দিন বিকেলে আর গেলাম না নিজেকে অনেক ছোট ছোট মনে হচ্ছিল।
কিন্তু হলে আসার পর বুঝলাম আমি পাপন কে মিস করছি । ওর কষ্ট গুলো আমায় ছুঁয়ে যাচ্ছিল ।
হয়তো তার বাবা আরও খারাপ ব্যাবহার করবে তার সাথে।
৩ দিন এর মাথায় আর থাকতে পারছিলাম না ।
তাই তার বাসায় না গিয়ে স্কুলে দেখা করতে গেলাম।
স্কুল মাঠে অপেক্ষা করছিলাম ।
দেখলাম পাপন আসছে, আমার কি যে ভালো লাগছিলো বলে বুঝাতে পারব না, একটা ছেলে আমার মনের এতোটা জায়গায় জুড়ে আছে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।
কাছে এসে ও আমাকে জড়িয়ে ধরে বাচ্চাদের মত কান্না শুরু করলো ।
সবাই তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে । লজ্জা পাচ্ছিলাম ।
কিন্তু তাকে সান্ত্বনা দিয়ে ক্যান্টিনে নিয়ে গেলাম।
পাপন বলে, জাহিদ ভাই । আপনি আমাকে নিয়ে দূরে কোথাও চলে যান। বাড়ী নামের কারাগারে ফিরে যাবো না আর । আমি নিশ্চিত আমাকে তারা বিদেশে পাঠিয়ে দিবে ।
জাহিদ ভাই । দয়া করে আমাকে বাঁচান।
আমি কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না ।
শুধু বললাম, দেখি ! কি করতে পারি ।
আমি আবার পরে আসবো বলে চলে এলাম।
তাকে কিভাবে বুঝাব যে আমার সিমাবদ্ধতা ।
আমি চাল চুলোহীন এক যাযাবর ।
নিজেই খাইতে পারিনা ঠিক মত, তার চেয়ে বড় কথা হল তার পরিবার।
যখন জানতে পারবে তাদের ছেলেকে নিয়ে পালিয়ে গেছি তখন কি হাল হবে আমার।
ভাবতে ভাবতে নীলক্ষেত দিয়ে হল এ ফিরে আসলাম।
মন খারাপ করে বসে আছি।
কিছুই করতে পারছি না এই দুঃখী ছেলেটার জন্য।
৫ দিন পর আবার গেলাম তার স্কুলে ।
কিন্তু খোঁজ করে জানলাম গত ২ দিন ধরে সে স্কুলে আসে না।
ভাবলাম অসুখ করেনিতো ?
অনিচ্ছা সত্ত্বেও পাপনের বাড়ীর দিকে গেলাম ।
দারয়ানের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম গতকাল রাতে পাপনকে বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে।
কথাটা শুনে কি পরিমান খারাপ লাগছিল বুঝাতে পারবনা।
হেঁটে হেঁটে ধানমণ্ডি লেকে বসে আছি ।
চোখ থেকে পানি আসবে আসবে করছে ।
সামলানোর চেষ্টা করে হলে ফিরলাম।
অনেক কষ্ট পেয়েছি জীবনে । এজন্য হয়তো অন্যের কষ্ট খুব বেশি বুঝতে পারি।
কিন্তু সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না ।
দিন যায় বছর যায় ।
আমি যেখানের মানুষ সেখানেই রয়ে গেলাম।
আবার রাজপথ ধরে চলতে থাকলাম এক অজানা গন্তব্যে।
কিন্তু মাঝে মাঝে ঐ মুখটা চোখের সামনে ভাসতো।
কষ্ট হলেও মনকে সান্ত্বনা দিতাম ।
একটা ছেলের জন্য আমার ভিতরে এত ভালোলাগাটা অস্বাভাবিক নয় কি?

গল্পটা এইখানে শেষ করতে পারলে ভালো লাগতো।
কিন্তু কাকতালীয়ভাবে আমার জীবনের গল্পের শেষ এখানে হয়নি ।

২০১০ এর মার্চের কথা ।
তখন আমি একটা চাকরি করতাম । থাকতাম মোহাম্মদপুর ।
একদিন সন্ধ্যায় অফিস শেষে গেলাম শিয়া মসজিদ এর পাশের বাজারটায়।
বাজারে দেখা হল পাপনদের কাজের বুয়ার সাথে ।
দেখেই চিনতে পারলাম ।
বললাম,খালা কেমন আছেন ? আমাকে চিনতে পেরেছেন? এখনো কি ঐ বাসায় কাজ করেন?
খালা বলল, জী করি।
আমি এবার বললাম,পাপন এর কি খবর? বিদেশ থেকে কি আসছে?
তারপর খালার কাছে যা শুনলাম তা আমি আশা করিনি।
বিদেশ যাবার জন্য তার বাবা মা তাকে বাধ্য করলেও পাপন কিছুতেই রাজি হয় নি ।
এই নিয়ে ঝগড়ার এক পর্যায়ে তার বাবা তাকে রাগ করে একটা চড় মারে ।
পাপন পাশে রাখা টি টেবিল উপরে পড়ে যায় ।
টেবিলের উপরে ছিল পানির গ্লাস ।
সাথে সাথে কাঁচের পানির গ্লাস এর কাঁচ ভেঙে ওর মাথায় লাগে।
ওকে স্কয়ার হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয় সাথে সাথে ।
কিন্তু ডাক্তার বলে তাদের পক্ষে সম্ভব না চিকিৎসা করা কারন ওর মস্তিস্ক থেকে অনেক রক্ত ক্ষরণ হয়।
২ দিন পর তাকে সিঙ্গাপুর নিয়ে যাওয়া হয়।
ওখানে ৩ মাস চিকিৎসা করে দেশে আনা হয় ।
কিন্তু ততদিনে ও মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। কাউকে চিনতে পারে না। কারো সাথে কথা বলে না।
মাঝে মাঝে বাড়ী থেকে পালিয়ে যায়।
তার বাবা মা মান সম্মান রক্ষা করতে তাকে ঢাকার বাইরে একটা ক্লিনিকে রেখে আসছে ।
সেখানেই এখন আছে সে ।
মাঝে মাঝে তার বাবা মা তাকে দেখতে যায়। কিন্তু পাপন দেখা করে না।
বুয়াকে বললাম,সেই জায়গাটা কোথায়?
বুয়া বলে সে জানে না। বাসার কাউকে বলা হয়নি। আমি বুয়া কে ১০০ টাকার একটা নোট ধরিয়ে দিয়ে বললাম খালা আপনাকে আরও টাকা দিব আপনি শুধু আমাকে ঠিকানাটা এনে দেন।
খালা বলল কাল এইসময় শিয়া মসজিদ এর সামনে আইসেন চেষ্টা কইরা দেখুমনি ।
পরদিন তাড়াতাড়ি গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম বুয়ার অপেক্ষায় ।
কথামত বুয়া আসলো আর আমার হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বলল,ভাইজান । আমি যাই । আমার কতা কিছু কইয়েন না ।
ঐ খালার থেকে ঠিকানা নিয়ে একদিন সেই ক্লিনিকে গিয়ে হাজির হলাম ।
অনেক কষ্টে ভিতরে প্রবেশ করতে দিল।
ওখানে বললাম যে আমি পাপনের আত্মীয় ।
পাপনকে দেখে আমার চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না।
শুকিয়ে একবারে কাঠ হয়ে গিয়েছে । চিনতে ও পারছিলাম না।
আমি ভয়ে ছিলাম । ও আমাকে চিনতে পারবে কিনা ।
কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে ও বলল, তোমাকে আমি চিনি । তুমি আমাকে পড়াতে তাই না ?
আমি বললাম, হা, আমি তোমার বন্ধু ছিলাম, তোমাকে দেখতে এসেছি আমি।
পাপন বলে, আমারতো কোন বন্ধু ছিল না । আমার কেউ নেই । কিচ্ছু নেই।
চোখের পানি সামলে পাপনকে দেখতে লাগলাম আর ভাবতে লাগলাম, পাপন তোমার এই অবস্থার জন্য আমি দায়ী ।
যদি তোমার সাথে আমার পরিচয় না হত। তুমি হয়ত এখন বিদেশের কোন ইউনিভার্সিটি থেকে পড়ালেখা শেষ করে বের হতে। আমার জন্ম যেন এক আজন্মের পাপ। কোন মানুষকে সুখী করতে পারিনি, যেমনটি নিজেও সুখি হতে পারিনি কোন দিন।
ঐদিন তার সাথে সারা দিন থেকে বিকালে চলে আসি।
আসার আগে তাকে বলে এসেছিলাম এখন থেকে মাঝে মাঝে আমি আসব । তার পাশে থাকব সারা দিন।
১ম বার মিথ্যে বললেও এখন কিন্তু আমি তাই করি ।
প্রতি মাসের শেষ শুক্রবার আমি পাপনকে দেখতে যাই । সারা দিন তাকে সময় দেই।
এখন সে আমাকে চিনতে পারে।
আমার কোলে বাচ্চাদের মত শুয়ে থাকে। মাঝে মাঝে বলে, বন্ধু । একটা গান শুনাও না ।
আমি গান ধরি, পাগল তোর জন্য রে পাগল এই মন পাগল………

সামনের শুক্রবার নয় শনিবার আবার যাবো পাপনকে দেখতে।
কারন ৬ই এপ্রিল পাপন এর জন্মদিন ।
সাথে নিয়ে যাব ওর পছন্দের চকলেট আর রজনীগন্ধা।।

মনের ভেতর কিছু প্রশ্ন ঘুরপাক খায় । এসব উত্তর আমার জানা নাই । আপনারা কেউ যদি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জেনে থাকেন । প্লিজ জানাবেন ।
১)পাপন এর এই অবস্থার জন্য কি আমিই দায়ী ?
২)আগে কখনো ছেলেদের সাথে সেক্স করিনি এমন কি তার সাথেও না। তাহলে কি জন্য ওর প্রতি আকৃষ্ট আমি?
৩)আমি কি পাপনকে ভালোবাসি ? হয়তো ভালোবাসি ! কিন্তু আমাদের সমাজ তার পরিবার কি এইটা মেনে নিবে কোন দিন?
৪)সবচেয়ে বড় কথা হল, সে কি আদৌ সুস্থ হবে কোন দিন????
এই প্রশ্ন গুলো আমার ছায়া সঙ্গী হয়ে ঘুরে বেড়ায়, জানি না উত্তর আজো পাবো কিনা। কিংবা কোন মেয়ের আঁচল তলে সুখ খুঁজতে গিয়ে পাপনকে এক দিন ভুলে যাব কি না !!!!

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.