এফএম ৯৭.৬

লিখেছেনঃ হোসেন মাহমুদ

ক্ষয় হয়ে যাওয়া সাবানের মত এক চিলতে চাঁদ উঁকি মেরে বেড়াচ্ছে রোমের আকাশে। রাত বোধয় অনেকখানি শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু এই শহরটার চার দিকে তাকালে দেখা যাবে রাস্তার ধারে মাথা তুলে দাঁড়ীয়ে থাকা ক্যাফে গুলো অবিরাম রমরমা ব্যবসা মুখর। এখানের সবাই যেন প্রয়োজনের অতিরিক্ত সুখী। আমাদের দেশের মহাসড়কের ট্রাক গুলোর পিছনে যেমনি লিখা থাকে “১০০ হাত দূরে থাকুন”। তেমনি এ শহরের মানুষ গুলোর থেকে যানবাহন নয়, দুঃখ যেন মাইলখানিক দূরে থাকে। কি প্রাণবন্ত চকচকে দাঁত গুলো বের করে একটা ক্লোজ আপ হাঁসি দিয়ে জিজ্ঞাস করে “ গুডেরে লা লাইফ” অর্থাৎ উপভোগ কর জীবনটা। হাঁ জীবনটাকে অনেকে উপভোগ করতে শিখে আর কেউ সারা জীবন চেষ্টায় লিপ্ত থাকে। আবার কেউ কেউ নিজের জীবন উপভোগ করতে গিয়ে অন্যর জীবনের চিতায় আগুন ধরিয়ে আলু পুড়া দিয়ে খায়।

আমি কি ভাবছি আবোল তাবোল। নেশা করলে মানুষ চোখের সামনে নাকি রঙিন পর্দা দেখতে পায়। দূর ছাই, আমি দেখছি সব কিছু সাদা কালোর ফ্রেমে ভরা জীবনের বাস্তবিক এক কঠিন জলছবি। আমার পায়ের নীচে কি যেন পড়ে চেপটা হয়ে গেছে। আরে এইটা তো বিয়ারের খালি ক্যান। নিশ্চয় আমার মত অন্য কোন মাতালের কাজ এইটা। ডান পা দিয়ে সজোরে দিলাম এক লাথি। কালো পিচ ঢালা রাস্তায় শব্দ করতে করতে ক্যানটা দূরে সরে যাচ্ছে। আমার বয়স যদিও ২৮ ছুঁই ছুঁই কিন্তু দুষ্টামি আর ফাজলামিতে বেশ পটু। যদিও এখন অনেকটা কমে গেছে তাও তুহিনের শাসনের ফসিলতে। হঠাৎ করে আমার বাম দিকের বাহুটা নড়ে উঠলো কে যেন বাহুতে হাত রেখে রাগী রাগী চোখ দিয়ে শাসনের সুরে বলছে, দ্বীপ তুমি আবার ছেলেমানুষি শুরু করলে?

তুহিনের সাথে পরিচয় ২০১০ সালের শেষের দিকে। আমি ব্যক্তিগত ভাবে নিয়তি আর ভাগ্যে দারুণ বিশ্বাসী। কথায় আছে না যদি কোন কিছু মন থেকে চাও, একদিন না একদিন তুমি সেই অসম্ভব জিনিষটিকে বাহু কব্জা করতে পারবে। আমি ও পেরেছিলাম আমার অসম্ভব ভালোবাসার সেই প্রিয় মানুষটিকে একান্ত আপন করে নিতে। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীগণ কোনরূপ ব্যাখ্যা ছাড়াই এক বাক্যে বলে দেয়, আর যাই হক ইন্টারনেট ফেসবুক করে কোন দিন মনের মানুষ বা জীবনসঙ্গী খুঁজে পাওয়া যায় না। কথাটা মানতে আমি একদম নারাজ। এইতো আমি যেমনি পেয়ে গেলাম তুহিনকে। অল্প বয়সী ছেলেদের উপরে আমার একধরণের অনীহা ছিল। অতিরিক্ত স্বপ্ন প্রবণ, আবেগি, অতিরিক্ত কথা, আহ্লাদ যেন বেয়ে বেয়ে পড়ে তাদের। তুহিনের বয়স যদিও বিশের কোঠায় কিন্তু তার মাঝে ঐ ন্যাকামো স্বভাব একধমই ছিল না। সরল স্বাভাবিক প্যাচ গোচ হীন একটা সম্পর্কের তরী নদীতে যেন আমাদের অজান্তেই ভেসে বেড়াতে লাগলো। রোমে বসে আমি যেন তার সাথে ধানমণ্ডিতে বসবাস করছি বরাবর। তার ভালোলাগা খারাপ লাগা গুলো আমাকে উৎসাহী করে তুলত তার ব্যাপারে। প্রচণ্ড মন খারাপ নিয়ে ও আমার সামনে হাস্য উজ্জল প্রাণবন্ত হাসি দেয়া তার স্বভাব। নির্লোভ চাহিদা হীন এক অল্পবয়সী মানুষ আস্তে আস্তে আমার ভিতরের রাজ্যে রাজত্ব করতে লাগলো। বুঝতে পারলাম এতদিন ধরে আমার অপেক্ষা এই তুহিনের জন্য। অলিখিত সংবিধানে টানা ৮ মাস চলতে লাগলো আমাদের সম্পর্ক। আমার প্রোফাইলে মেরুন কালারের টি শার্ট আর চোখে রেইবারের কালো সানগ্লাস পরা একটি ছবি ছিল। কোন দিন ও দেখলাম না আমি ঐ ছবি কিংবা আমার শরীরের ব্যাপারে তার কোন আগ্রহ। তার প্রোফাইলে কোন ছবি ছিল না। আমার ও দেখতে ইচ্ছা করেনি। শরীর আর চেহারা তো অনেক দেখলাম কাজের বেলায় ঠং ঠং। বুঝলাম শরীর মনের চাহিদার কাছে কিছুই না। রাতের পর রাত মোবাইলে কথা বলে পার করেছি তার সাথে। দুজন দুজনকে জানলাম বুঝলাম আর দিন দিন একজন আরেকজনের ভিতরে গভীর ভাবে প্রবেশ করতে লাগলাম। সাল ২০১১ অক্টোবরের ১৪ তারিখ সারাজীবন অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ৯ ঘণ্টা ৩৬ মিনিট জার্নি করে নামলাম ঢাকা এয়ারপোর্টে। আমাকে রিসিভ করার জন্য মা, বাবা আর ছোট ভাই দোলন আসলো। আমার ফ্লাইটের সময়, তারিখ সবই তুহিন জানে। আমার ধারণা ছিল তুহিন অবশ্যই বিমানবন্দরে আসবে আমাকে দেখার জন্য। হয়তো আমার ফ্যামিলির লোক জনের মাঝে সামনে এসে কথা বলবে না। এ দিক ও দিক তাকিয়ে আমি খুঁজতে থাকলাম একজনকে। কিন্তু তাকে চিনবো কেমন করে। তার তো কোন ছবি আমি দেখিনি। তারপরে আমার মনে ছিল অগাধ বিশ্বাস একবার যদি তার দিকে তাকাই আমার ভিতরেই আমাকে জানান দিবে এই আমার তুহিন। নাহ হল তার উল্টো আমার আশায় গুঁড়ে বালি। অনেক খোঁজা খুঁজি করে ও তুহিনের ছায়া মাড়াতে পারলাম না আমি। যখন গাড়িতে উঠতে যাচ্ছি এমন সময় গাড়ি পারকিং এর মেইন গেইটে দিকে দেখলাম ঐ ১৯ কুড়ি বছরের এক ছেলে দাঁড়িয়ে আছে কালো রঙের একটা টিশার্ট পরে। চোখে চিকন ফ্রেমের চশমা। চশমাটার কারণে আমার সন্দেহ আরও ঘনীভূত হতে লাগলো। কারণ তুহিন চশমা পড়তো। উজ্জ্বল শ্যাম বর্ণের এক তরুণ যুবক হাসি হাসি চেহারায় তাকিয়ে আছে আমাদের গাড়ির দিকে। বার কয়েক দেখলাম তাকে। আমাদের গাড়ি যখন তাকে ক্রস করছিলো আমি তার চোখে দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আমার মন বলছে এই নিশ্চয় তুহিন। পরে তুহিনকে দেখে বুঝতে পারলাম হাঁ আমি সঠিক ছিলাম সেই দিন।

তারপর দিন ধানমণ্ডির মেট্রো প্লাজায় দেখা করতে বললাম তুহিন কে। বিকেল ঠিক ৫ টা। নেভি ব্লু একটা টিশার্ট আর জিন্স পরে মেট্রো প্লাজার সামনে গাড়িতে বসে আছি আমি। তুহিন আজ উজ্জ্বল বাদামী রঙের শাট পরে আছে। পড়ন্ত বিকেলের শান্ত নিয়ন আলায় তাকে দেব শিশুর মত লাগছে। চিকন ছিম চাম তার শরীরের গঠন। গায়ের রং যদি ও বেশী ফর্সা না। কিন্তু চেহারা অন্যরকম এক মায়ার আদলে গড়া তার। ভালো করে তাকালেই যে কেউ তার দিকে আকর্ষিত হবে। তাকে চোখের ইশারায় গাড়িতে উঠতে বললাম। বাধ্য ছেলের মত গাড়িতে উঠে এলো তুহিন। জিজ্ঞাস করলাম,

-কেমন আছো তুহিন?
-ভালো।
-আমি দ্বীপ।
-আমি জানি তুমি দ্বীপ।
-কোথায় যাবে বল?
-জানি না। তুমি যেখানে নিয়ে যাও।
-আমি যেখানে নিয়ে যাই তুমি যাবে?
-এক কথায় উত্তর। ইয়েস।
-যদি তোমাকে নিয়ে কোন কষাই খানায় যাই। আর সেইখানে গিয়ে তোমাকে বলি দিয়ে দেই।
-আগেই বলেছি তুমি যেখানে নিয়ে যাও। তবে মরতে যেতে পারবো না। কারণ আমি আমার জীবনকে অনেক ভালোবাসি।
আমার ভালো লাগলো তুহিনের সৎ উত্তর পেয়ে। অন্য কোন ছেলে হলে বলতো, তুমি আমাকে মরার জন্য বললে আমি মরতে ও পারি। ভাগ্যিস তুহিনের মাঝে ঐ ন্যাকামো ছিল না। তাকে নিয়ে লং ড্রাইভের নেশা চেপে বসলো মাথায়। চলে গেলাম আশুলিয়ার দিকে। পুরো রাস্তায় তার কথা ঐ হা না এর মধ্যে সিমাবব্ধ ছিল। তাকে বার বার দেখতে ইচ্ছা করছিলো। কিন্তু প্রথম দিন বলে খানিক জড়তা এসে ভর করছিলো আমার চোখে। তাতে কি, লুকিং গ্লাসটা এমনভাবে সেট করলাম তুহিনের মুখটা স্পট দেখতে আমার অসুবিধা হচ্ছে না। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এখন রাত। রাস্তার পাশে গাড়ী দাড় করিয়ে, তার উপরে ঠেশ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি আমি আর তুহিন। আমার জীবনে যদি হাতে গোনা ৫ টা স্মরণীয় সন্ধ্যা থাকে তার মধ্যে অন্যতম এই সন্ধ্যাটা। তুহিনের দিকে তাকিয়ে দারিয়ে ছিলাম অনেকক্ষন। বর্ষাকাল না হলে ও আশুলিয়ার সড়কের দুইদিকে পানি এখনো থই থই করছে। সাথে আছে ফ্রেশ অক্সিজেন। আর বিশেষ করে আমার তুহিন আছে আমার সাথে। অজান্তেই আমার অবাধ্য ডানহাত খানা চলে গেলো তার হাতে। তাই ঐ হাত শক্ত করে ধরে রেখেছিলাম অনেকক্ষেন। অনেক কথা হল তার পর ও কিছু যেন কমতি ছিল। হিন্দি বিবাহ মুভির ঐ গানটার মত।
“মিলন আবি আধা আদুরা হে”

হাঁ সেই মিলনের জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছিলো আরও ১৭ দিন। তুহিনরা থাকে ধানমণ্ডির ৩২ নাম্বারে। আর আমাদের বাসা শংকরে। প্রতিবেশী বলা চলে, কিন্তু সময়, সুযোগ আর যায়গা এই তিনটার অভাবে ১৭ টা দিন আমার কাছে ১৭ বছর মনে হয়েছে। এত কাছাকাছি থেকে ও তুহিনকে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারছিলাম না আমি। আমার বাসায় নিয়ে আসা যেত, কিন্তু সমস্যা তার বয়স অনেক কম। আমার বন্ধু বললে বেমানান লাগতো। এ দিকে আমি যে সমকামী সেইটা মা ছোট বেলা থেকেই জানতো। আমার কোন মেয়ে বন্ধু ছিল না। আমার ঘরে সব হলিউড নায়কদের ছবি। আমার মাকে মহিলা শ্যালক হোমস বলা চলে। তাই মায়ের সামনে প্রশ্নের সম্মুখীন হবার ভয়ে তুহিনকে বাসায় আনতে পারছিলাম না। এ দিকে তুহিনের পরিবার আরও রক্ষণশীল। বাসায় কোন বন্ধুবান্ধব আনা সংবিধিবদ্ধ নিষিদ্ধ। তাই বাধ্য হয়ে হোটেল কক্ষ বেঁছে নিলাম আমি। পল্টনের হোটেল ভিক্টরির ৩১৭ নাম্বার রুম। আমি চোখ বন্ধ করলে এখনো দেখতে পাই সেই রাতের ইতি কথা। রাত ১১ টায় তুহিনকে নিয়ে হোটেল রুমে ঢুকলাম। দরজাটা বন্ধ করেতেই আমি উন্মাদ হতে গেলাম। হিংস্র বাঘের মত ঝাঁপিয়ে পড়লাম তুহিনের শরীরের উপরে। মাতালের মত চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দিতে লাগলাম তুহিনকে। আমি কাম বাসনায় যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে তুহিন আমাকে থামিয়ে দেয়। আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন ছুড়লাম তুহিনের দিকে। আমি কি কোন রং করে ফেলেছি তুহিন?
-না। কিন্তু আমি এই ভাবে তোমাকে পেতে চাই না। আমি এত গুলা রাত অপেক্ষা করেছি এই রাতটার জন্য। আমার সেই ভালোবাসার মানুষটির সংস্পর্শে থাকার জন্য আমার মনের সেই ব্যাকুলতাকে আমি প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাই না শরীর কামনার দাস হয়ে। দ্বীপ আমি তোমার। হাঁ পরিপূর্ণ রূপে আমি শুধু তোমারি। আমরা সব কিছু উপভোগ করবো তা ঠিক কিন্তু বেসামাল হয়ে সেক্সকে প্রাধান্য দিয়ে নয়।
তার কথায় আমি আমার ভুল বুঝতে পারলাম। তাকে আরও শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে রাখলাম। গল্প আর কথায় কথায় সব কিছু হল আমাদের মাঝে। দুজন দুজনকে প্রাণ ভরে উপভোগ করতে লাগলাম। আমি সিগারেট ধরালাম। ভাবলাম তুহিন আমাকে না করবে। কারণ আমি জানি সে সিগারেট খায় না। কিন্তু অবাক করা বিষয় হল, সে আমাকে কিচ্ছুতো বলেই নি। বড়জোর বিড়ালের মত উম খুঁজে তার মাথাটা গুঁজে দিলো আমার কোলে। জিজ্ঞাস করলাম,
-তুহিন আমার সিগারেট খাওয়াতে তোমার অসুবিধা হচ্ছে না?
-হচ্ছে। কিন্তু তারপর ও আমি তোমাকে বলছি না সিগারেট না খেতে। কারণ আমি তোমাকে জানি মাত্র ১ বছর। আর তুমি এই সিগারেটকে জানো ১৩ বছর ধরে। ঐ এক বছরের দাবি নিয়ে নিশ্চয় ঐ ১৩ বছরের বন্ধুকে এক দিনে লাথি মেরে বিদায় করতে পারবো না আমি। তবে আমি পাশে থাকলে কম সিগারেট খাবা।

তার এই সব যুক্তিগত কথা শুনে আমি অবাক হয়ে যাই। এইটুকুন একটা ছেলে কতটা বাস্তবিক হতে পারে। তারপর আর কি দুই মাস দেশে ছিলাম। এই দুইমাসে কক্সবাজার গিয়েছি দুইবার। ফ্যান্টাসি কিংডমে তুহিনকে নিয়ে অনেকবার গেলাম। কারণ তার ওয়াটার কিংডমের রাইডস গুলো অনেক পছন্দের। দেখতে দেখতে সময় চলে গেলো। আরও এক মাস তুহিনের কাছে থাকার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু মায়ের জন্য পারলাম না। মা বিয়ের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। বাধ্য দেশ ছাড়লাম সাথে সাহস করে মাকে এক চিরকুট লিখে দিলাম।
“মা আমি সমকামী। সেইটা তুমি ছেলেবেলা থেকে জানো। আমি বিয়ে করবো এইটা ঠিক। তবে কোন মেয়েকে নয়। একটা ছেলেকে। পারলে আমায় মাপ করে দিও। আর হাঁ প্রতি মাসে তোমাদের মাসিক টাকাটা তুলে নিও”

আসার আগের দিন নিউমার্কেট থেকে দুইটা রূপার রিং কিনলাম। সেইদিন রাতে ধানমণ্ডির ভূত রেস্টুরেন্ট থেকে খেয়ে দুজনে হাঁটা ধরলাম লেকের পাশ ধরে। প্রধানমন্ত্রীর বাড়ির বাম পাশটায় অন্ধকার যায়গা পেয়ে গেলাম। আমি এদিক ও দিক তাকিয়ে তুহিনকে অবাক করে দিয়ে হাঁটু গেঁড়ে বশে পরলাম তুহিনের সামনে। পকেট থেকে আংটিটা বের করে তার সামনে ধরলাম। তার একটা হাত ছেপে ধরে বললাম।
You are the man. That very long time I have been waiting. You are the man who showed to me what is love. You are the man who showed to me who I am. Tuhin I want to spend rest of my life with you. Would you please marry me?
অন্ধকারের জন্য আমি দেখতে পারছিলাম না তুহিন কাঁদছিল আমার কথা শুনে। আমি বুঝতে পারছিলাম। আমাকে টেনে তুলে নির্দ্বিধায় বলল।
Yes I will.

কেটে গেল ৮ মাস আমি রোমে কর্ম ব্যস্ত হয়ে একলা একার জীবন পার করছিলাম তুহিন বিহীন। প্রতিদিন মাইকেল বুবলের “হোম” গানটা শুনতাম বার বার। আর মিস করতাম তুহিনকে। আমরা আট দশটা কাপলের মত স্বপ্নে বিশ্বাসী ছিলাম না। তাই দেশে থাকা অবস্থায় আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোন পরিকল্পনা করিনি। তুহিন ও আমাকে কোন দিন ছাপ দেয়নি ঐ ব্যাপারে। কিন্তু তুহিনকে ছেঁড়ে আমি থাকতে পারছিলাম না। তাই ৯ মাসের মাথায় মানে ২০১২ সেপ্টেম্বরে তুহিনের পাসপোর্ট আনিয়ে নিলাম। অবিশ্বাস্য হলে ও মাত্র দুই মাসের মাথায় ভিসা পেয়ে গেলাম তুহিনের জন্য। ডিসেম্বরে তুহিন দেশ ছেড়ে রোমে আসলো। তার পরিবার তাকে আসতে দিবে না কিছুতেই। সে ও আমার মত বাধ্য হয়ে পালীয়ে আসতে হল। সাথে গুড বাই জানাতে হল তার পরিবার কে। তাতে কি আমি ও তো আমার পরিবারকে কচু দিখিয়ে বাই বলেছি। রোমে ফিরে আসার কিছুদিন পর অবশ্য আমার অফিসের ঠিকানায় মায়ের হাতে কাটা কাটা লিখার একখানা পত্র পেলাম এই মোবাইলের যুগে। মা লিখেছে আমাকে কিংবা আমার টাকা কোনটাই তাদের দরকার নাই। আমি কিছুটা কষ্ট পেলেও আশাহত হয়নি। আমি জানতাম আমাদের সমকামীদের জীবনে এর চেয়ে ভালো কিছু নাই। তাই তুহিনকে নিয়ে ছোট একটা ঘর বাঁধলাম রোমে।

ভালোই চলছিলো আমাদের দুজনের ছোট সংসার। তুহিন আর আমাদের নতুন জীবন। তাকে ইটালির ভাষা শিখচ্ছিলাম আমি। তার শিখার আগ্রহ অধিক। খুব অল্পতেই শিখে নিত সব কিছু। রাতে ভারতীয় টিভি চ্যানেল গুলো হটিয়ে ইটালিয়ান ভাষার চ্যানেল গুলো দেখত। গাড়ী করে কোথাও যাচ্ছি, তুহিন রেডিও তে আর জে দের কথা শুনত আর আমাকে তার অর্থ জিজ্ঞাস করতো। তার পছন্দের রেডিও ইষ্টেশণ ছিল রেডিও রাই ৯৭.৬ এফ এম। কেটে যাচ্ছিলো আমাদের আনন্দের সময় গুলো। তুহিনের সব কিছু শিখার আগ্রহ আমাকে অবাক করে তুলতো। এক দিন গাড়ী চালানো শিখিয়ে দিয়েছিলাম খানিকটা। তারপর সময় পেলেই বাসার সামনের রাস্তাটায় নেমে পড়তো গাড়ী নিয়ে। আমি তাকে মানা করেছিলাম গাড়ি চালানো পুরাপুরি না শিখে যেন গাড়ী নিয়ে মেইন রোডে না যায়।

২০১৩ সালের মার্চ। আজ সাপ্তাহিক ছুটির দিন। দুজনে রান্না করে খেয়ে টিভি দেখছিলাম। তুহিন আমাকে রেখে গাড়ী চালানো শিখছে। আমি নিষেধ করেছি এই ভর দুপুরে বের হবার দরকার নেই। তারপর ও সে বের হল। সোফায় বসে বসে আমার চোখ দুটা লেগে এলো। ল্যান্ড লাইনের একটা কলে ঘুম ভেঙ্গে গেল। স্থানীয় সময় বিকেল ৩ টা। তুহিন গাড়ী নিয়ে মেইন রোডে চলে গেছে। আরেকটা গাড়ি এসে তুহিনের গাড়ীটা কে রোড থেকে নীচে ফেলে দিয়েছে। পুলিশ জানালো আমাকে। আমি তার কথা কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। রিসিভারটা হাত থেকে ফেলে জানালায় বাহিরের দিকে তাকিয়ে খুঁজতে লাগলাম তুহিনকে। কিন্তু না তুহিনকে দেখলাম না। শুনতে পারলাম না তুহিনের শেষ কথা। শেষ বার তাকে হসপিটালের মর্গে দেখেছিলাম। সেই মুখটা এখনো আমি ভুলতে পারি না।

বিয়ারের ক্যান টার আওয়াজ কান থেকে সরে যেতে না যেতেই পিছন থেকে গাড়ীর হর্ন এ ফিরে এলাম বাস্তবে। ট্যাক্সি ড্রাইভার গ্লাস নামিয়ে জিজ্ঞাস করলো কোথায় যাবে? আমি কিছু না বলে ট্যাক্সি চেপে বসলাম। ঐ দিনের পর থেকে আমি গাড়ী চালান ছেড়ে দিয়েছি। আমার হাতে একটা ফার্মেসির ব্যাগ। ভাবছিলাম মাতাল যেহেতু এতক্ষণে এই প্যাকেটটা ফেলে দেয়ার কথা। নাহ। ফেলেনি। আমি বোধয় জাতে মাতাল তালে ঠিক। ট্যাক্সিতে চলছে এফ এম ৯৭.৬ রেডিও রাই ২। ইটালিয়ান ভাষায় এক আর জে বক বক করছিলো। শুনছিলাম এক শ্রোতা ফোন করে কথা বলছে আর জে এর সাথে। হঠাৎ করে মনে পড়ে গেল। এইটা তুহিনের ফেভারিট রেডিও ছিল। এক দিন সে গাড়ীতে বসে কথা ও বলতে ছেয়েছিল আর জে এর সাথে। কিন্তু ইটালিয়ান ভাষা ভালো করে বলতে পারতো না বিধায় লাইন কেটে দিয়েছিলো। আমি তাকে নিয়ে ঐ দিন অনেকক্ষণ হেঁসে ছিলাম। আজকে শুনলাম আর জে বলছে। প্রতিদিন আমি সবাইকে সারপ্রাইজ দেই। আজ স্রোতারা আমাকে কল করে সারপ্রাইজ করে দিন এমন কিছু বলে। পকেট থেকে ফোনটা বের করে আর জে এর দেয়া নাম্বারে ডায়াল করতে লাগলাম। আমি জানি এই নাম্বার গুলোতে সহজে লাইন মিলে না। কিন্তু কাকতালীয় হলে ও সত্যি লাইনটা একবার ডায়ালেই পেয়ে গেলাম। দুইবার রিং হবার পর রিসিভ করলো আর জে। আমি ইটালিয়ান ভাষায় বললাম, আর জে আমি একটা কথা বলবো জানি না তুমি সারপ্রাইজ হবে কিনা। কথাটা হল। আমার হাতে একটা প্যাকেট আছে ওতে ৫২ টা ঘুমের ওষুধ আছে। আজ রাতে আমি ঐ সব গুলো ওষুধ একসাথে খাবো। মানে আমি আত্মহত্যা করতে যাচ্ছি। আগামী ৩ ঘণ্টা পর। কথাটা বলেই লাইন কেটে দিলাম। ট্যাক্সি ড্রাইভার আমার দিকে বার বার তাকাচ্ছে। বুঝতে পারছে সে আমি জিনিষটা সুবিধার না। যে কোন মুহূর্তে তাকে বিপদে ফেলতে পারি। সে আমাকে জিজ্ঞাস করছিলো বার বার। কোথায় নামবে তুমি। আমি বাসার সামনে এসে তাকে বললাম এইখানে রাখো। আমাকে নামীয়ে দিয়ে ড্রাইভার ভূত দেখার মত ফালিয়ে বেঁচেছে।

বাসার দরজা খুলতে খুলতে ঐ আর জে কথা মনে পড়লো। বেচারা নিশ্চয় ভড়কে গেছে আমার কথা শুনে। আর দুঃখ প্রকাশ করছে এই জন্য যে, তার ধারাবাহিক কথামালার উপদেশ গুলো দিতে পারলো না বলে। ওষুধের প্যাকেটটা বালিশের পাশে রাখলাম। পা থেকে জুতা খুলছি এমন সময় মোবাইলে রিং। বিরক্তি নিয়ে ফোনটা রিসিভ করলাম। জীবনের শেষ ফোন নিশ্চয়।
-হ্যালো আমি এফ এম ৯৭.৬ থেকে আর জে বলছি।
দূরতেরই ফোন করে যে বিপদে পড়লাম। এই ব্যাটা তার উপদেশ নামা রেডি করে এখন মোবাইলে আমার কান জালা ফালা করবে। মনে মনে বললাম যতই উপদেশ দাও। আমার সিধান্তে আমি অটুট থাকবই।
-হা বলেন।
-দেখ তোমার নাম আমি জানি না। তুমি কল করেছিলেন তাই ফোন ডিরেক্টরি থেকে তোমার নাম্বার বের করে কল করলাম। আর আমি এখন অন এ আর এ নাই। পার্সোনালি কল দিয়েছি। তুমি আত্মহত্যা করতে যাচ্ছ দেখে তোমাকে অভিনন্দন জানাতে ফোন দিলাম। সত্যি বলছি কিছুই হবে না এই দুনিয়াতে বেঁচে থেকে। যত আগে মরতে পারবে ততই ভালো। দুঃখ কম কষ্ট কম। আর তাছাড়া আজ না হক কাল, একদিন না একদিন তো সবাইকে মরতেই হবে। কিন্তু তোমাকে আমার কিছু কথা শুনে তারপর মরতে হবে। কি শুনবে তো আমার কথা?
-হাঁ শুনছি।
-দেখ আমি রেডিও তে সুন্দর সুন্দর কথা বললে ও আমি কিন্তু সুস্থ একজন মানুষ নই। আমার একটা নেই। আমি যে বাবা মায়ের কাছে মানুষ হয়েছি অনাদরে অবহেলায় তাদের মুখ থেকেই একদিন শুনলাম আমি তাদের সন্তান নয়। হসপিটাল থেকে তারা আমাকে তুলে এনেছে। আমার একটা পা দুর্ঘটনায় হারিয়ে ফেলি যখন আমি ক্লাস ৬ এ পড়ি। আমার ঐ পা নেই এই জন্য আমি কারো বন্ধু হতে পারিনি কোন দিন। অনেক গুলা মেয়ে কে ভালবেসেছিলাম কেউ আমাকে পাত্তা দেয়নি কোন দিন। এক দিন আমার ঐ পালিত বাবা মা বাসা থেকে বের করে দিল। আমি কুকুরের মত রাস্তায় রাস্তায় বড় হয়েছি। অনেক কষ্টে কিছুটা পড়া লিখা চালিয়ে নিয়েছিলাম। তাই রেডিও তে বক বক করার চাকরিটা জুটে গেল। কিন্তু তারপর ও আমার ঘর নেই। নিজের বলতে কিছুই নেই। শুধু ইনকাম করছি বেচে আছি। তারপর ও আত্মহত্যা কথা ছিনটা ও করিনি। আমার মনে হয় না তুমি আমার চেয়ে বেশী দুঃখী। আমি ভুল না করলে, যতদূর মনে হয় তোমার বাবা মা আছে। একটা পরিবার আছে। হয়তো ভালবাসার মানুষ আছে। কোন কারণে কষ্ট পেয়ে আত্মহত্যার মত এমন একটা সিধান্ত নিয়েছ। একটি বার চোখ খুলে বাহিরের পৃথিবীটা দেখ। বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে চিন্তা কর। জীবনটা বিধাতার দেয়া এক উপহার। এই ভাবে নষ্ট করার কোন মানে হয় না। একটা দুঃখ পেয়েছ বলে তোমার পৃথিবীর সমাপ্তি হয়ে যায়নি। দেখবে সামনে হয়তো আরও ভালো কিছু তোমার অপেক্ষায় আছে।

আর জে কথা গুলো শুনে নিজেকে অপরাধী মত লাগলো। ঠিকই তো বলেছে সে। তুহিন নেই বলে আমি থাকবো না তা কেন হবে। তুহিনের ভালবাসা নিয়ে কেন আমি বেঁচে থাকার চেষ্টা করছিনা। তুহিন আমার জীবনের একটা অংশ ছিল, আছে এবং থাকবে। ভালবাসা জীবনের একটা অংশ কিন্তু শুধু ভালোবাসাই জীবন নয়। বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালাম। ওষুধের প্যাকেটটা হাতে নিয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। বুক ভরে একটা নিঃশ্বাস নিলাম। চোখ মেলে তাকিয়ে আছি রাতের শেষ দিগন্তকে। কি অপরূপ এই পৃথিবী এত কষ্ট পেয়ে ও মানুষ বেঁছে আছে এবং থাকবে। আত্মহত্যা কোন সমস্যার সমাধান নয়। বেঁচে থেকে বাস্তবতার সাথে যুদ্ধ করে সমস্যার সমাধান বের করাই বীরত্বের কর্ম।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.