এর কিছুটা আমি, আর কিছু অভিনয়

লিখেছেনঃ হোসেন মাহমুদ

সকালে অফিস। তাই রাত ১২ টার আগেই ঘুমিয়ে পড়লাম। পাশের বেড় এ শ্রীলংকান রুমমেট ইতিমধ্যে নাক দিয়ে ডোল বাজানো শুরু করেছে। হঠাৎ অ্যাই প্যাডের অ্যালার্মে ঘুম ছুটে গেল। কাঁচা ঘুমে কোন রকম উঠে কেবিনেট খুলে অন্ধের মত হাতিয়ে অ্যাই প্যাডটা হাতে নিলাম। ঐ কয়লার রাজপুত্র শ্রীলংকানটা জেগে উঠলো অ্যালার্মের শব্দে। উঠেই তার ভাষায় জাতীয় সংগীত গাইতে লাগলো। জানি সে আমাকে গালি দিচ্ছে। আমার প্রতিদিনের অভ্যাস, বাংলা ভাষার অবিধানে যত গুলো গালি লিপিবদ্ধ আছে সব গুলাই দিলাম। অ্যাই প্যাড খুলে দেখলাম রিমাইন্ডারে লেখা ৯ই জুলাই ডেনির জন্মদিন। লেখাটা দেখে মূর্তির মত ওখানটায় স্থবির হয়ে দাড়িয়ে রইলাম। এ দিকে কয়লার রাজপুত্রের এফ এম রেডিও এখনো বাজীয়ে যাচ্ছে। আমার সে দিকে খেয়াল নেই।

টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে এক কাপ ব্ল্যাক কফি বানিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসলাম। ৪৮ ডিগ্রী তাপমাত্রার মাঝে আমি গরম উপেক্ষা করে বসে আছি। ডেনির সাথে শেষ বার কথা হয় দু বছর আগে। ছাকনী দিয়ে ছেঁকে জেডে ফেলেছিলাম তার ছবি, মোবাইল নাম্বার, এমন কি তার দেয়া গিফট গুলা পর্যন্ত। এতদিনে হয়তো সে গুলা ডাস্টবিনের দুর্গন্ধের সাথে ভালোই মানীয়ে নিয়েছে নিজেদের। কেন যে ঐ অ্যাই প্যাডের রিমাইন্ডারটা চোখে পড়েনি।
হয়তো ল্যাপটপ আর সামসং ফোনের রাজত্বে অ্যাই প্যাডটা তেমন ব্যাবহার করা হয় না বলে।
পুরো এক প্যাকেট সিগারেটের মালিকানা কড়ায় গণ্ডায় অসুলের কাজে নিজেকে নিয়জিত রেখে চলছি, তার সাথে কফির মগটা শক্ত করে হাতে ধরে আছি।

হাঁ এরকম শক্ত করে ডেনিকে ও আঁকড়ে ধরে বাঁচতে ছেয়েছিলাম আমি। পেরেছি কি?
সে নিশ্চয় এখন তার অর্ধাঙ্গিনীর গরম বাহুর মাঝে মুখ গুঁজে শান্তির শিহরণের চুড়ায় অবস্থান করছে। আর আমি গরমের মাঝে কফি, সিগারেট আর শরীরের ঘামের মাঝে ডুব সাঁতার কাটছি। মনে মনে ভাবছি এইটাই বুঝি প্রত্যেক সমকামীর জীবনের ফ্রেমে আঁকা জ্বল ছবির শেষ পরিণতি।

কত আনন্দময় ছিল সেই দিন গুলী। তোমাতে আমাতে একাকার হয়ে রাত জাগা পাখীর মত চষে বেড়াতাম পার্ক আর ক্যাফে। এক দিন তুমি ধুবাই থেকে জার্নি করে আবুধাবি আসলে। তোমার ছাপাছাপিতে দেখা করতে বাধ্য হলাম আমি। সেই করনিসের নদীর দ্বারে, যেখানে তোমার আমার প্রথম দেখা। সকালে অফিস জেনে ও ক্ষুধার্ত বাঘের চাহনি নিয়ে বসে ছিলাম তোমার দিকে ছেয়ে। তুমি আমার কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছো। এ দিক ও দিক দেখে নিয়ে চোরের মত আমার ঠোঁট গুলো তোমার দখলে নেয়ার চেষ্টা করছ। সারাদিন বাহীরে থাকায়, তোমার গায়ে থেকে ভেপসা গন্ধ বেরচ্ছিল। সব কিছু সহ্য করতে পারতাম কিন্তু কারো শরীরের গন্ধে আমার নিশ্বাস অ্যাটকে যেত। কিন্তু তোমার ব্যাপারটা ছিল আলাদা। ঐ গন্ধ জড়ানো শরীরে অকপটে ঘেঁষা ঘেঁষি করে কিস করেছিলাম আমি। শুধু তোমায় সত্যিকার ভালোবাসি বলে। সেই দিন নিজের খারাপ লাগছে জেনে ও নিজের মনের বিরুদ্ধে ১৪৪ ধারা জারী করে বসে ছিলাম তোমার পাশে। সেই কয়েকটা মাসে নিজের সব খারাপ লাগা, ভালো লাগা গুলোকে কোরবানি করে মানীয়ে নিতে আপ্রাণ চেষ্টায় ব্যস্ত রেখেছিলাম নিজেকে। এখন বুঝতে পারছি ভুল করেছিলাম আমি। কারণ তুমি চলে যাবার পরে আমার চার দিকে তাকিয়ে দেখাতাম, সব জায়গায় আমার নিজের বলে কিছু নেই। মাথা উঁচু করে দাঁড়ীয়ে আছে তোমার সীমানা।

সুন্দরের পূজার প্রসাদ বানীয়ে নিজের ভালোবাসাকে বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তরিত করতে ও এত টুকু দ্বিধা করেনি আমি। সাদা চামড়া আর হ্যান্ড সাম বলে গৃহ পালিত কুকুরের মত লেজ নেড়ে তোমার পায়ের কাছে বসে ছিলাম। ব্যক্তিত্বের অবমাননার শেষ সীমা লঙ্ঘন, তখন আমার ভালোবাসার আবরণে ডাকা, ছানি পড়া চোখ ঠাহর করতে পারতো না। তখন বুঝতাম না, একটা মানুষ নীচে নামতে নামতে ৪০ ফুট পাতালে গেলেও, ভণ্ড হৃদয়ের ভণ্ডামি থেকে নিজের সত্যিকার ভালবাসার বলিদান ঠেকাতে পারে না। আমি ও পারিনি। হয়তো আমার মত অনেক আবেগময় মানুষের সত্যিকার হৃদয় নিংড়ানো ভুল ভালোবাসার মাশুল। ঐ চোখের জ্বল আর একাকীত্ব।

ঐ দিন গুলো এমন ছিল অফিসে কিংবা বাসায়, রাতে কিংবা দিনে, তোমার কণ্ঠস্বর কানে বাজত আমার। দূরবীন দিয়ে নয়, আমার খালি চোখ দুটো দিয়ে তোমার আমার জীবনের শেষ দিন গুলির ছবি স্পষ্ট দেখতে পেতাম আমি। এখন কথা গুলো মনে পড়লে সত্যি হাসি পায়। কতটা পাগল আর বোকা ছিলাম আমি। অবশ্য তুমি ও স্বপ্ন দেখাতে ওস্তাদ ছিলে।
আমার হাত দুটো ধরে, পার করে দিবে সারা জীবন।
এক জীবনে আমার মত একটা সঙ্গী থাকলে আর কিছু লাগবে না তোমার।
তুমি আমাকে তোমার দেশ জার্মানিতে নিয়ে যাবে। দুজনে বিয়ে করবো সেখানে।
ছোট একটা সংসার হবে আমাদের। দুই রুমের ছোট একটা বাসা।
আমি বলতাম, না আমি বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে। আমি আমার দেশ আর মাকে ছেড়ে থাকতে পারবো না। তখন তুমি বলেছিলে ঠিক আছে, আমরা দুজন বাংলাদেশে গিয়ে থাকবো। ঐ দিন তোমার কথা শুনে কত খুশী হয়েছিলাম আমি। ডেনি তোমার মনে আছে, একটু একটু করে তোমাকে বাংলা বলা শিখচ্ছিলাম। তবে একটা কথা খুব তাড়াতাড়ি শিখে নিয়েছিলে। “আ-ম-টমাকে বালবাসি”। হা হা। তোমার ঐ বাংলা কথা শুনে আমি হাসতাম। তুমি হাল ছাড়তে না। শিখার আপ্রাণ চেষ্টা করে যেতে। সত্যি বলছি ডেনি তোমার আমার দেখা স্বপ্ন গুলো তোমার কাছে স্বপ্ন হয়ে থাকলে ও, আমার কাছে ছিল বাস্তব। তুমি যদি আজ অবধি আমার হাত ধরে রাখতে, আমি তোমার সাথে পার করে দিতাম বাকি জীবনটা।

ঐ কয়েক মাসে নিশ্চয় বুঝে ছিলে আমি শরীর কামনার দাস নয়। মৌমাছির মত অনেক ফুলের মধু খাওয়া আমার চরিত্রের বাহীরে। খুব বেশি কিছু চাইনি আমি।
ছেয়েছিলাম ভরা জ্যোৎস্নার রাতের আকাশের তারা দেখবো তোমার কোলে শুয়ে।
শীতের সকালে সবুজ ঘাসের বুকে খালি পায়ে হেঁটে বেড়াবো তোমায় নিয়ে।
ঝুম বৃষ্টিতে দুজন মিলে উদোম গায়ে ভিজবো।
ঠাণ্ডা লেগে গেলে একই কাঁথার নিচে তোমার বুকে মাথা রেখে ঘুমবো।
সমকামীর সাইনবোর্ড জুলিয়ে রাখা দেহ পূজারী মানুষ গুলো থেকে, তোমাকে চুরি করে পালীয়ে যাবো সবুজে ডাকা কোন অজ পাড়া গায়ে। কারণ আমি শরীরকে খেলার সামগ্রী কোন দিন ও বানাই নি বানাতে পারবো ও না কোন দিন। তোমার সাথে সম্পর্কের মাঝে এক দিন ও আমাদের দেহের কাম বাসনার পূজা হয়নি। সেইটাই তার প্রমাণ। আমার একটা বিশাল টেক্সট ম্যাসেজের কথা নিশ্চয় তোমার মনে আছে।
“ডেনি এখন তোমার ভরা যৌবন। আকর্ষণীয় হ্যান্ডসামদের দলে তোমার অবস্থান অন্যতম হবে। পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। তোমার জাতীয়তা জার্মানির। তোমার চারদিক এখন রুপালী পর্দার মত রঙিন। কারণ তোমার টাকা আছে সাথে রূপ। তাই এখন কাছের মানুষের অভাব তোমার হবে না। কিন্তু যে দিন তোমার অবশিষ্ট আর কিছু থাকবে না। তোমার টাকা, যৌবন সব চলে যাবে। যে দিন তুমি খুব একা হয়ে যাবে। সেই দিন যদি তোমার হাত ধরার জন্য কেউ নাও থাকে। শুধু একজন তার হাত দুটো উন্মুক্ত করে দাড়িয়ে থাকবে তোমার দিকে চেয়ে। আর সেই হচ্ছি আমি। কারণ তোমার কোন কিছুর প্রতি আমার লোভ নেই। শুধু তোমার মন, আর তুমি ছাড়া”।

সেই দিন আমার ট্যাক্সটা দেখে রাতের ৩ টায় আমার সাথে দেখা করেছিলে তুমি। এখন মাঝে মাঝে ভাবি আচ্ছা ও গুলো কি তোমার মানুষ ফোটানোর সংবিধানের অংশ ছিল? তুমি কি আমাকে কোন দিন ও ভালবাসতে? যদি তাই করতে তাহলে নিজের চোখে দেখা সেই দৃশ্যকে কি ভাবে অস্বীকার করবো আমি। তোমার মাথা তিন জন সমকামীর পুরুষের কোমরে, চকলেটের মত কিছু চুষে যাচ্ছ আপন রুচিতে।
হায় আমার ভালোবাসা? সেই দিন নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছিলাম বার বার। ভালোবাসার কপালে ঝাঁটা মেরে কবর দিয়ে এসে ছিলাম সেই নদীতে। জোয়ারে ভেসে আসা নিজের মনের সব টুকু ভালোবাসা উজাড় করে দিয়েছিলাম তোমার পায়ে। আর তুমি সেই ভালোবাসার কূলখানি খেলে এক সাথে ৩ জন পুরুষের কাম বাসনায় নিজেকে বলি দিয়ে।

ডেনি তুমি জীবনে ও বুজতে পারবে না সত্যিকার ভালোবাসা কি? যদি তুমি একটি বার দেখতে ঐ রাত, আমার কি ভাবে কেটেছে? যদি তুমি একটি বার শুনতে আমার ভিতরের আর্ত চিৎকার। বাসায় এসে রুম মেটের সামনে অসহায় শিশুর মত কাঁদতে লাগলাম। ৩ দিন অফিস যেতে পারিনি আমি। রাতে ঘুমাতে পারতাম না। আদেলের ঐ গানটা বার বার শুনছিলাম। someone like you.. আর নিজের চোখের বন্যায় বাসীয়ে দিচ্ছিলাম নিজেকে।
দেখ তোমার ঐ মিথ্যা ভালোবাসার জন্য আমি আজ ও কষ্ট পেয়ে যাচ্ছি। তারপর ও তোমাকে ধন্যবাদ ডেনি। তোমার কারণে আমি সুন্দর মানুষ দেখলে ১০ হাত পিছিয়ে থাকি। ডেনি তোমার কারণে আমি বুঝতে পেরেছি, যদি কাউকে খুব বেশী ভালোবাসো তাকে সেইটা বুঝতে দিও না। যদি দাও তুমি এক দিন তার খেলার সামগ্রী হয়ে যাবে। হা আমি তাই হয়েছি। তারপর ও তোমাকে ধন্যবাদ ডেনি, তোমার কারণে আমি এখন ভালবাসাকে HIV ভাইরাস ভাবি। শুধু তোমার কারণে অনেক গুলা মানুষের কষ্টের কারণ আমি। তারপর ও তোমাকে ধন্যবাদ ডেনি, তোমার কারণে আমি মানুষ ছিনতে পারি এখন। খুব অল্পতে নিজেকে সুখের সমুদ্রে ভাসিয়ে দেই না। তোমার কারণে আমি ভালবাসায় ভয় পাই। তোমার কারণে আমি এখনো এক আছি।

দিন যায়, মাস ঘুরে বছর আসে, আমি যেখানটার সেখানে আছি। একটু বদলাতে পারিনি নিজেকে। আর বোধয় পারবো ও না কোন দিন। তুমি জানো ডেনি, আমি এখন খুব কষ্ট পেলে ও হাসতে পারি। জানি সেই হাসির মাধুর্যতা থাকে না। আমি এখনো ভিতর ভিতর কাঁদি কিন্তু চোখে পানি আসে না। আমি এখনো একলা একার জীবন নিয়ে রাস্তায় হেঁটে বেড়াই। কাউকে কাছে ঘেঁসতে দেই না। কারণ নতুন করে কষ্ট গুলো দাওয়াত দিয়ে বাসায় আনার কি দরকার? কিন্তু দেখ এমন একটা ভাব আমি মুখে ধরে রাখি মনে হয় আমি অনেক সুখী। হা আমি সত্যি অনেক সুখী। হোক না সেইটা অভিনয়। তারপর ও ভালবাসায় ব্যর্থ হবার আশঙ্কা তো নাই।
রোজ সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে এক বার দেখি আর মনে মনে ভাবি। আয়না তুই অনেক ভালো তুই আমার কান্না দেখে কোন দিন ও মুখ ভেঙ্গাস না। আচ্ছা তুই বলতো আয়নায় ঐ মানুষটা কে?
একটা আওয়াজ শুনেতে পাই কানে।
এর কিছুটা আমি আর কিছু অভিনয়…।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.