খেলার পুতুল

লেখক: হোসেন মাহমুদ

আপনি ইচ্ছা করলে নিজের সব কথা পরিবারের সবার সাথে শেয়ার করতে পারবেন না। কিন্তু একজনের কাছে মন খুলে সব বলা যায়, সে হল আপনার ভালো এক জন বন্ধু। আমার জীবনে ও তেমন একজন ভালো বন্ধু আছে যার নাম আমিন। তার পরিবার আমাকে তাদের একজন মনে করে। আমার পরিবার ও আমিনকে তাই মনে করে। হর হামেশাই তাদের বাড়ীতে আমার যাওয়া আসা। তার ভাই বোন সবাই যেন আমার খুব কাছের। কিন্তু আমাদের এই ভালো বন্ধুত্বের কিছুটা অবনতি ঘতে ২০০৫ সালে। আমি আবুধাবিতে চলে আসার পর। তখন আমিন রয়ে যায় বাংলাদেশে। আসার ২ দিন আগে তাদের বাড়িতে যাই। সবার সাথে বিদায় নিয়ে ফিরছিলাম, ঠিক তখন আমিনের ছোট ভাই আশরাফুল আমার হাতটা টান মেরে বলে ভাইয়া তুমি আবুধাবি গেলে আমাকে ও নিয়ে যেও তোমার সাথে। আমি তার গাল দুটো টিপে দিয়ে বললাম, অবশ্যই নিয়ে যাবো। কিন্তু তার জন্য তোমাকে ভালো করে পড়া লেখা করতে হবে। সবে তো হাই স্কুলে পড়ছ। আমার কথা শুনে আশরাফুল হাসে। ছেলেদের হাঁসি কেমন যেন একটা রস কষ হীন রুক্ষ একটা ভাব থাকে। কিন্তু আশরাফুলের মাঝে তার বলাই নাই। কি প্রাণবন্ত তার হাসি। দূর আমি কি ভাবছি এ সব। পিচ্চি একটা ছেলে আমার বন্ধুর ভাই। তার উপরে আমার হাঁটুর বয়সে তার বয়স।

যাইহোক আমি আবুধাবিতে চলে এলাম তার দুইদিন পর। এখানে আসার ১ বছরের মাথায় আমার বেষ্ট ফ্রেন্ড আমিনকে নিয়ে আসলাম এখানে। যদি ও সে কাজ করতো অন্য একটা কোম্পানিতে তাই দুই জন এক সাথে থাকতে পারতাম না। সে থাকতো আবুধাবি শহরটা থেকে কয়েক মাইল ধুরে। রাতের পর দিন, সময় আমার যেতে লাগলো একা একা। দেশের বাহীরে থাকতে থাকতে মনটা হাঁপিয়ে উঠেছে, তাই দেশ থেকে এক বার ঘুরে আসার কথা ভাবছিলাম। হঠাৎ এক দিন আমার বন্ধু আমিন জানালো তার চোট ভাই আশরাফুল আসছে দেশে থেকে। সে নাকি এখন অনেক বড় হয়ে গেছে। এক দিন রাতে আমি আমিনের বাসায় গিয়ে হাজীর। দেখলাম আশরাফুল ঘরে বসে আছে। আমাকে দেখে একটা হাসি দিল। সেই পরিচিত বহু দিনের মিস করা হাসি। হা আমিন সত্যিই বলেছিল আশরাফুল অনেক বড় হয়ে গেছে। তার গায়ের রঙটা আগের চেয়ে বেশি ফর্সা লাগছে। আমাকে দেখার পরে আশরাফুল আমাকে জড়িয়ে ধরে শুরু করে রাজ্য সব অভিযোগ। আমি তাকে কেন ফোন করিনি। কেন আগের মত তাদের সাথে যোগাযোগ নাই। আমি কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না। তারপর বললাম সরি ভাই অনেক ব্যস্ত থাকি এখানে। তুমি তো মাত্র আসলে। থাকো কিছু দিন তারপর নিজেই টের পাবে।

কয়েকদিন পর আমি দেশে চলে যাই। তখন দেখতাম আমিনের চেয়ে আশরাফুল আমকে ফোন করতো বেশি। আমি যদি ও সেইটাকে অন্যভাবে নিতাম না নেহাত চোট ভাইর চেয়ে সামান্য বেশী বোধহয়। আর কথাতে ও যে সম্পর্কের ডাল পালা, কিংবা প্রেম বশীকরণের সাংবিধানিক সব শব্দ ব্যাবহার হত তাও না। এই কেমন আছি, কি করছি আর বেশী ঘনীভূত হলে ভাইয়া তোমাকে মিস করছি অবধি। আশরাফুলের কণ্ঠস্বরের উঠানামার তাৎপর্য প্রতিনিয়ত আমার কাছে দিক বিদিক পরিবর্তনের ছোঁয়ার গোলকধাঁধা মত ঠেকতে লাগলো। প্রেম ভালবাসার হাতেখড়ি তখন অবধি সিনেমা আর বইতে সীমাবদ্ধ ছিল। সে আমাকে খুব হাতে কলমে কোনরূপ কাটাকুটি ছাড়া পরিছন্ন ভাবে বুঝিয়েছে সে আমাকে চায়। কিন্তু সেই চাওয়ার সমষ্টির এক কঠিন বাস্তব রূপের প্রতিচ্ছবি আমার চোখের সামনে দাড়িয়ে। সে আমার বেষ্ট ফ্রেন্ডের ছোট ভাই আর যাই হক আমার বন্ধুত্বকে অপমান করে তাকে জয় করতে চাইনা। তাই রুমাল দিয়ে মুখ চাপা দিতাম তার ব্যাপার গুলো।

একমাস শেষে নাড়ীর টানে ছুটে যাওয়া দেশ থেকে পেটের টানে ফিরে আসি আবুধাবিতে। এক দিন বিনা নোটিশে উপস্থিত হলাম আমিনদের বাসায়। সেই রাতে আমিনের রাতে ডিউটি তাই বাসা পুরাটাই ফাঁকা। কিন্তু আমি ছিলাম বিপাকে ফাঁকে মাঠে গোল দেয়ার লোভ মানুষ আর সমকামী হিসাবে সামলানোর এক কঠিন চ্যালেঞ্জ উপস্থিত হল আমার সামনে। গল্প করছিলাম দুইজন মিলে। আমি বুঝতে পারছিলাম আমার অবচেতন মন আমাকে বার বার জানান দিচ্ছে, তার প্রতি আমার দুর্বলতা সীমাহীন। আশরাফুল পাশে বসার সাথে সাথে প্রকৃতি আমার নিয়ন্ত্রণের বাহীরে চলে গেল। যখন আমার শরীরে হাত রাখে আশরাফুল মনে হচ্ছিল ৩৬ ভোল্টের লাইট তখন মাথার উপরে টাঙ্গিয়ে দিলে নির্ঘাত জ্বলে উঠত। সেই দিন তার খোলা মেলা শরীরের ঘেঁষা ঘেঁষি আর ভিতর থেকে আসা ভালোবাসার বাঁধ রক্ষা করা আমার পক্ষে অসম্ভব ছিল। কারণ আমার ভিতরটাও তো তাই চায়। পরিশেষে কবুল করে নিতে বাধ্য হলাম আমি। সেই দিন আমাদের প্রথম ঠোঁটে ঠোঁট মিলে। এইটা ছিল আমার প্রথম ভালবাসার শুভসূচনা।

বৃহস্পতিবার রাতে আশরাফুল আমাকে ফোন দিয়ে বলে রাতে তোমার বাসায় থাকবো। আমি তাকে না করতে পারিনি। কাল শুক্রবার দুজনেরই ছুটির দিন। ভাবলাম তা আসুক না আসতে চাচ্ছে যখন। রাতে অন্তত কিছুটা সময় নিয়ে পাশাপাশি থাকা হবে। কথামত সে রাতে আমার বাসার দরজায় দাঁড়িয়ে। তাকে দেখে আমার অবাধ্য মন আনন্দে বাসীয়ে দিচ্ছিল আমাকে। সারারাত পাশাপাশি বসে গল্প করছিলাম। কখনো হাতে দুকাপ কফি নিয়ে বারান্দায়। কক্ষনো সে আমার কোলে শুয়ে ঋত্বিক ঘটকের মুভি দেখেছে, কখনো আমার মুখখানা কাছে টেনে নিয়ে ঠোঁট দুইটা মুখে পুরে ললিপপ চোষা শুরু করে। সে এক অন্যরকম রাত্রি যাপন। সেই রাতে আশরাফুল আমাকে হাড়ে হাড়ে বুঝিয়েছে ভালোবাসার পরশে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে কত আনন্দে বিহ্বল হতে পারে মানুষ। মজার কথা হল ঐ রাতে আমাদের অবস্থান ছিল চুড়ই পাখীর মত। কত বার যে নিজেকে আশরাফুলের ভীতরে নিয়ে তীব্র সুখের দোলা খেয়েছি মনে নেই।

চলতে লাগলো আমাদের সম্পর্কের চরম সুখের দিন গুলোর দুইটি বছর। দিনে ১০ বার তাকে ফোন করতাম। প্রতি বৃহস্পতিবার রাত ছিল তার জন্য বরাদ্দ। আশরাফুল আমাকে বুঝিয়েছে সত্যিকারের ভালোবাসা কি? যে ভাবে আমাদের দিন গুলো কাটছিল মনে হচ্ছিলো এই ভাবে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত থাকবো। কিন্তু মাঝখানে তার ভাই মানে আমার বন্ধু আমিনের পুলিশে ঝামেলা হয়। আমি আশরাফুল কে হাতে নিয়ে পুলিশ আর বাসায় দৌড়াদৌড়িতে ছিলাম। এক পর্যায়ে আমিনকে পুলিশের হাত থেকে ছাড়িয়ে আনার সব বন্দবস্ত করে ফেলি আমি। এত দৌড়াদৌড়িতে আমার আশরাফুলকে সময় দিতে পারছিলাম না একদমই। কিন্তু বরাবরই ফোন আছে কানের সাথে। আমার বিশ্বাস আমি তাকে কোন দিন ও ধোঁকা দিবো না। কারণ সে আমার প্রথম ভালোবাসা। কিন্তু আশরাফুল!

তারপর আমিনের জামিনের কাগজ পত্র গুলো তাকে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য আশরাফুলের সাথে দেখা করতে হবে আমাকে। এ দিকে তাকে মিস ও করছিলাম খুব। তার বাসার নীচে গিয়ে তাকে ফোন দিয়ে বললাম তুমি কই? সে বলল বাসায়। আমি তাকে বললাম তুমি অপেক্ষা কর। ঘণ্টা খানিকের মাঝে আমি আসছি। সে বলে ওকে আসো। তাকে চমকে দিবো বলে, সিঁড়ি বেঁয়ে দুই মিনিটের মাথায় তার দরজায় গিয়ে উপস্থিত হলাম। ভীতর ভীতর আমি উল্লাসিত তাকে চমকে দেয়ার পর তার চেহারাটা দেখতে কেমন হবে। এই ভেবে নিজের মনের ভুলে মুখে একটা হাসি ফুটিয়ে তার দরজার সামনে থেকে আবার কল দিলাম তার মোবাইলে। তার মোবাইলের রিং শুনছি। কিন্তু ফোন ধরেছে না। তার পায়ের স্যান্ডেল দেখছি দরজায়। বার কয়েক ফোন দিলাম ধরছে না। তারপর দরজায় হাত দিলাম। দেখলাম খোলা। আমি ভিতরে প্রবেশ করি। ঘরের ভিতরে আরেকটা রুম আছে যে খানে আরেকজন লোক ভাড়া থাকে। আমার বয়সী হবে লোকটা। একদিন আশরাফুল পরিচয় করিয়ে দিলো। আমি কল এর উপর কল করছি কিন্তু ঐ রুমের ভিতর থেকে ফোনের শব্দ শুনছি। ফোন ধরছে না কেন আশরাফুল। আমি ভিতরে আছি তা বুঝতে পারার কথা। কারণ ও ঘর থেকে এ দিকে জানালার দিকে তাকিয়ে বলা যায় কিন্তু এ ঘর থেকে ভিতরের কিছু দেখা জায় না গ্লাসের কারণে।

৩০ মিনিট পর আশরাফুল বেরিয়ে এলো দরজা খুলে। তার পরনে লুঙ্গি। আর লুঙ্গির উপরে স্পষ্টই দেখতে পারছিলাম ভিজে যাওয়া খানিকটা জায়গা। সে রুম থেকে বের হতে হতে মোবাইল কানে ধরে আছে। জিজ্ঞাস করলাম কি হোল। ফোন ধরলা না কেন? সে বলে দেশে ফোন করছিলাম। আমি তাকে বললাম আমি গত ৩০ মিনিট দাঁড়িয়ে আছি। তোমার মোবাইল যদি ওয়েটিং এ থাকতো নিশ্চয় রিং বাজত না। সে বলে সত্যি আমি দেশে ফোন করছিলাম বাবু। তার মিথ্যা কথা শুনে মাথায় রক্ত উঠে গেল আমার। সাথে সাথে তার বাবার মোবাইল কল করলাম। কারণ তার পরিবারের সবার নাম্বার আমার কাছে আছে। তার বাবাকে জিজ্ঞাস করলাম আশরাফুল আপনাকে ফোন করেছে? তিনি বললেন হা। জিজ্ঞাস করলাম কখন ফোন করেছে আর কতক্ষণ কথা বলেছে। তিনি যা বললেন আমার আর বুঝতে কিছু বাকি নেই আসল ঘটনা কি? তার দিকে তাকিয়ে বললাম এখন ও মিথ্যা বলবে আশরাফুল?

সে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। আমি বলতে লাগলাম আশরাফুল তুমি একজনে সুখী নয় সেটা আগে বললেই পারতে। আমাকে দাবার গুটি বানিয়ে তোমার কাম বাসনার সঙ্গী না বানালেই হত না? শুনো আমি জীবনে প্রথম তোমাকে ভালবেসেছি। তুমি আমাকে শিখিয়েছ ভালোবাসা কি? তাই তার সাথে হাতে কলমে এই ও শিখিয়েছ ভালবাসাকে পুঁজি করে হরহামেশা কি ভাবে নিজের শরীরের জ্বালা অন্যকে দিয়ে মিটাতে হয়। কি দরকার ছিল আমাকে খেলার পুতুল বানানোর?

আশরাফুল আমার ভালোবাসাকে সম্মান করি বিধায় তোমাকে ছোট করে দেখতে ইচ্ছা করছে না। কিন্তু তোমার চেহারাটা ও যেন আর না দেখি।

আমার চোখ বেয়ে দুই ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো হাতে রাখা কাগজ গুলোর উপরে। আমিনের কাগজ গুলো তার দিকে হাত বাড়ীয়ে দিয়ে বললাম। আশরাফুল আমাকে ছুঁড়ে দিয়ে যাকে কাছে টেনে নিলে দয়া করে তার সাথে এই খেলা খেলো না। আমি সহ্য করে মুখ বন্ধ রাখলাম। কারণ ছোটবেলা থেকে তোমাদের পরিবারের আমি এক জন। কিন্তু অন্য কেউ হয়তো তোমাকে ক্ষমা করবে না। ভালো থেকো।

আমি সিঁড়ি বেয়ে নিছে নামতে লাগলাম আশরাফুল আমার পিছন পিছন দৌড়াতে দৌড়াতে সিঁড়ি ভাঙছে। আমি পিছন না ফিরে হাঁটতে লাগলাম। শেষ বার তার কথা শুনছিলাম, ভাইয়া আমাকে মাপ করে দাও। আমি আর করবো না এ কাজ। আমি তার কথা না শুনে নিজের পথের দিকে এগুতে লাগলাম। পার্থ বড়ুয়ার গানটা বার বার মনে পড়ছিল আমার।

“তুমি খেলার পুতুল ভেবে আমাকে ছুঁড়ে দিয়ে কাছে টেনে নিলে যারে।
আমার মত করে দিও না দিও না এতটা যন্ত্রণা তারে”।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.