তৃতীয় ছায়া

লিখেছেনঃ হোসেন মাহমুদ

বাংলা ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টিয়ে সে দিন মা বলেছিল এখন শীতকাল।শীত না ছাই, রাতে ঘুমাতে যাই হালকা গরম নিয়ে, মাঝরাতে কাল বৈশাখীর ঝড় আর সকালে সূর্যের তুমুল বাড়াবাড়ি। এইযে এখন আমি দাড়িয়ে আছি বসুন্ধরা সিটির সামনে। আদরের সূর্য মামা আমাকে তাপ দিয়ে আধা লিটার পানি নির্গত করছে শরীর থেকে। এই রোদের মধ্যে দাড়িয়ে কোন মিছিল জনসভা কিংবা ক্যাদ্দানি গ্যাস খাবার জন্য হরতালের উদ্দেশ্য নয়। একজনের সাথে দেখা করার কথা। ৬ মাস আগের এক বন্ধুর মাধ্যমে তার সাথে পরিচয়। আমার সেই বন্ধু আমার সাথেই পড়ে। আমাকে ভালোবেসে তলে তলে অনেক দিন ডুবু জল খেয়ে পায়ে খিল ধরিয়েছে। এক দিন জানতে পারলো আমি তাকে শ্রেপ বন্ধু হিসাবেই দেখি। তারপর ও সে আমার পিছু ছাড়েনি। বলে তুই সমকামী হয়ে ও কেন নিজেকে এত একঘরে করে রাখবি। একটা সম্পর্ক কর। দেখবি তোর সবকিছু পরিবর্তন হয়ে যাবে। হাঁ এখন সেই পরিবর্তনের অঙ্গীকার নিয়ে দাড়িয়ে আছি বেসরকারি টিভি চ্যানেল একুশে টিভির সামনে। যাদের স্লোগান “পরিবর্তনের অঙ্গীকারবদ্ধ” তবে তারা কতটা পরিবর্তিত হয়েছে জানি না। এখন দেখার পালা সেই সুদর্শনকে, যার জন্য এত গুলো ঘাম বিসর্জন দিচ্ছি এই রাস্তায় দাঁড়ীয়ে।

অবশেষে মাত্র ৪৫ মিনিট লেট করে হাজির হল সেই সুদর্শন। এসেই ৪৫ মিনিট সময়কে ট্রাফিক জ্যামের দোহাই দিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা। অকপটে সেই প্রার্থনা কবুল করে নিলাম আমি। শত হোক এসেছে সেইটাই বা কম কিসের? অবশ্য আরও একটা কারণ আছে। শিহাবকে এক দেখাতেই ভালো লেগে গেল আমার। প্রথম দেখায় ভালো লাগা একটা বস্তুগত বিশেষ কারণ বহন করে। এক ঝলকেই যদি পছন্দ না হয়, তাহলে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সৌন্দর্য আবিষ্কার করেও কোন লাভ নেই। শিহাব দেখতে খারাপ না। মুখের গডনটি ডিমের মত। গায়ের রঙ কাঁচা হলুদ বা দুধে আলতা, কিংবা পাকা সোনার মত না হলেও গৌরবর্ণই, তবে ফ্যাঁকাসে নয়। আমি ও যে দেখতে আহামরি কিছু তা কিন্তু নয়। তবে বন্ধু মহলে হ্যান্ড সাম বলে একটা খ্যাতি আছে। মডেল না হলেও তাদের বন্ধু বান্ধব বলে চালান যাবে অনায়াসে। যাক যেচে এসে মুখটা আগে সে খুলল।
-আমি শিহাব।
-আমি ফাহিম।
-তোমাকে দেখেই বুঝা যায় তুমি ফাহিম।
-ফাহিম নামের কোন বিখ্যাত ব্রান্ড কিংবা সিম্বল আছে বলে তো মনে হয় না।
-ওভাবে নিচ্ছ কেন। জাস্ট বলার জন্য বলা।
-অহ।
-চল ফুড কোটের দিকে যাই।
-না ওদিকে যাবো না। আগে একটা সময় খুব যেতাম। কিন্তু আসিফ ভাইয়ার চুলকানি আছে ঐ লেভেল এইটে।
-আসিফ?
-ওহ তোমাকে তো বলা হয়নি। আমার একটা ভাইয়া আছে। খুব ভালো। দুনিয়ার সব কিছুর সমাধান তার কাছে আছে। আমাকে খুব আদর করে। আর তাকে ফোন না করে একদিন ও থাকতে পারি না। সে দেখতে ও বেশ। একদিন তোমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিবো। এখন চল মালঞ্চতে যাই। দুপুরের খাওয়া তো তোমার ও হয়নি।
-আসিফ! তোমার ভাই না ফ্রেন্ড?
-আরে বললাম তো শুধুই ভালো ফ্রেন্ড অ্যান্ড বড়ভাই।

শিহাবের কথা শুনে আশ্বস্ত হলাম কিন্তু একটা অস্বস্তির কাঁটা মনে বিঁধে রইল। তারপর নিজের মনকে শাসনের সুরে নিয়ন্ত্রণ করে বাটা সিগন্যাল পর্যন্ত ভাড়ায় একটা রিকশা করে নিলাম। ঐ দিন খাওয়া দাওয়ার ফাকে ফাঁকে একজন আরেকজনকে জানতে চেষ্টা করলাম। প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় ভালোই বলা চলে। শুধু ঐ আসিফ নামের আগাছাটা ছাড়া। তার কথার কোন না কোন ভাবে আসিফ ভাইকে টেনে আনা তার অভ্যাস না স্বভাব বুঝতে পারলাম না। আমি ব্যাপারটাকে খুব খারাপ ভাবে নিতে গিয়ে ও ঐ ভাইরাস নামক ফাইলে একটা পাসওয়ার্ড দিয়ে মিনি মাইজ করে দিলাম। ঐ দেখার পর থেকেই মোবাইল কোম্পানিদের রেমিটেন্সে দারুণ ভূমিকা রাখতে শুরু করলাম আমি। রাত বিরাতে তাকে কল করা অভ্যাসে পরিণত হয়ে উঠেছে আমার। এক দিন কল না করলেই শিহাব রেগে মেগে আগুন। তার সেই আগুন ফায়ার সার্ভিসের পক্ষে ও নিবানো কষ্টসাধ্য। আমি তার মানঅভিমান ভাঙ্গানোর বিশেষ প্রক্রিয়া আয়ত্ব করতে নিজেকে ব্যস্ত রাখলাম প্রতিনিয়ত। ভাবতাম এখনো বয়স কম আসতে আসতে সব বুঝতে শিখবে। এরেই মাঝে আমাদের ভালোবাসার আদান প্রদান হয়ে গেছে। শিহাব বাস্তবিক ভাবে অতটা চালু না হলে ও বিছানায় জানু খেলোয়াড়। আমি সেখানে এক সদ্য নবজাত শিশু মাত্র। কি ভাবে কি করতে হয় খুব ভালো ভাবে সে আমাকে শিখিয়ে দিয়েছে। তাই সুযোগ পেলেই আমি তার কাছ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা তাকে উপহার দিতে লাগলাম। মাঝে মাঝে দুজন মিলে ঘুরতে বের হই। এক দিন বিকেলে দুজনে হাঁটতে হাঁটতে চারুকলায় গেলাম। সেখানে একটা প্রদর্শনী হচ্ছিল, দুজনে ছবি গুলো দেখে হাতে হাত রেখে পানি শূন্য ডোবার পাঁশে বসে রইলাম। শিহাব আমাকে বলে,
-ফাহিম তুমি আগের মত আমাকে ভালোবাসো না এখন?
-হঠাৎ এ কথা বলছ কেন?
-না মনে হল তাই বললাম।
-এমন মনে হবার কারণ একটা তো অবশ্যই আছে।
-কি সেইটা? ঝেড়ে কাশতো শিহাব।
-কাল রাতে ২টায় তোমাকে ফোন দিয়েছিলাম। দেখলাম তুমি বিজি। অথচ তার ঘণ্টা খানিক আগে তুমি বলেছিলে তুমি ঘুমবে, তাই তাড়াতাড়ি আমাকে বাই বলে দিয়েছ। আমার মনে হচ্ছে তুমি অন্য কাউকে পছন্দ কর। তাই আমার সাথে কথা না বলে রাত জেগে অন্য একজনের সাথে ফোনে কথা বলছিলে। জানো কাল সারা রাত আমি না ঘুমিয়ে ছিলাম। ভোর ৫ টায় আসিফ ভাইয়াকে ফোন করে বললাম আমার মন খারাপ। তখন সে আমাকে মন ভালো করে দিয়ে ঘুম পাইয়ে দিইয়েছিল ফোনে।
-শিহাব আমি তোমাকে এমনটি আশা করিনি। তুমি আমাকে দোষারোপ করার আগে ফোনে কে ছিল সেইটা জিজ্ঞাস করতে পারতে। যাইহোক তোমার মাথায় যা ধরেছে তাই বলেছ। কাল রাতে হঠাৎ করে আমার ভাগ্নি অসুস্থ হয়ে পড়ে। তুমি তো জানো আমার বোন দুলাভাই চিটাগাং থাকে। এত রাতে তো যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। তাই ফোনে আপু দুলাভাইকে ধরে রেখেছিলাম। শুধু আমি নয় আমার বাসার কেউই কাল রাতে টেনশনে ঘুমাতে পারেনি। তোমার সাথে কথা বলে সত্যি আমি শুয়ে পড়েছিলাম। দুলাভাইয়ের ফোনে জেগে গেলাম। আর তুমি আমাকে বলছ? শিট আমার ভাবতেই খারাপ লাগছে।
-ফাহিম আমি সরি। না জেনে শুনে তোমাকে কষ্ট দিলাম। প্লিজ মাপ করে দাও। আর এমনটি কক্ষনো করবো না।
-হাঁ তা না হয় বুঝলাম। কিন্তু আসিফ। আচ্ছা আমি কি জানতে পারি তুমি সবসময় সবকিছুর মাঝে আসিফকে টেনে আনো কেন? ব্যাপারটা আমার কাছে খারাপ লাগে। স্বামী স্ত্রীর মাঝে যেমনটি অনেক কিছু হতে পারে জগরা ঝাঁটি তাই বলে ঢাক ডোল বাজীয়ে মানুষকে বলা কোন বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তেমনি যে কোন সম্পর্কের মাঝে তৃতীয় ছায়াকে টেনে আনা উচিৎ নয়।
-ফাহিম তুমি আসিফ ভাইয়াকে বাহিরের কেউ বলতে পারো না। সে আমার কে তুমি সেইটা জানো। আচ্ছা তার জন্য ও আমি সরি। চল এখন একটু হাঁস।

আমি শীতের ফাটা ঠোঁটে যেমনটি হাসে ঐ রকম একটা হাঁসি দিলাম। ঐ দিন তাকে ক্ষমা করে দিলাম। যাকে এতোটা ভালোবাসি যদি ক্ষমাই না করতে পারি তাহলে কেমনই বা ভালবাসলাম। তারপরে কয়েকদিন সে কথায় বার্তায় আসিফকে দাওয়াত করে আনে নি। আরেকদিন গেলাম রাইফেল স্কয়ারে দুজনে খেলাম আর কিছু শপিং করলাম। কিন্তু ফিরার পথেই আবার আসিফ ভাই। তার আসিফ ভাইয়া থাকলে নাকি রঙ নিয়ে কোন সমস্যাই ছিল না। আসিফ ভাইয়ার রঙের প্রশংসায় সে পঞ্চমুখ। আমি ভীতর ভীতর বিরক্তই হচ্ছিলাম না রীতিমত রেগে যাচ্ছিলাম। তারপর ও ঐ দিন কিছু বললাম না। কারণ তার জন্মদিন ছিল। রাতেই সে ফোন দিয়ে বলে জেকব কে? তার সাথে আমার কিসের সম্পর্ক? আমি তাকে ভালোবাসি কিনা। তার কথা শুনে আমার মেজাজ উঠে গেছে চরমে। তাকে বললাম, জেকব আমার বেষ্ট ফ্রেন্ড সেই ছেলেবেলা থেকেই। আমরা এক সাথে একই ক্লাসে পড়া শুনা করেছি। কিন্তু তার ঐ সব প্রশ্নে তাকে নয় বড়জোর নিজেকে অনেক ছোট মনে হতে লাগলো। এমন একজনকেই ভালবাসলাম যে গাই ও চেনে না, না চিনে গাধা। ইচ্ছা করেই তাকে কড়া করে কয়েকটা কথা বললাম। সে ফোনে কান্না কাটি করে অস্থির। পরে তাকে বুঝিয়ে বললাম সে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। তাকে আরও বুঝালাম সন্দেহ সম্পর্কের জন্য একটা ভাইরাস। যতটা সম্ভব সম্পর্ক থেকে এই ভাইরাসকে দূরে রাখা উচিৎ। জানি না আমার কথা তার কানে ঢুকেছে কিনা। তারপর ও আশার আলো নিয়ে ঐ দিন আর কথা বাড়ালাম না।

আবার সেই বসুন্ধরায় স্টার সিনেফেলেক্সে আসলাম শিহাবকে নিয়ে। কাল রাতে বলে দিয়েছিলাম। আমি দুজনের টিকেট কিনে রেখেছি। অনেকদিন এক সাথে ঘুরতে যাই না। মুস্তফা সরায়ার ফারুকির টেলিভিশন মুভিটা দেখার ইচ্ছা ছিল। তাই শিহাব কে নিয়ে প্লান করলাম। বিকেল ৪ টায় লেভেল এইটে থাকার কথা আমার। কিন্তু রাস্তায় প্রচণ্ড ট্রাফিক জ্যাম থাকায় খানিকটা দেরি হয়ে গেল। সে অপেক্ষা করছিলো সিনেফেলেক্সের সামনে। আমাকে দেখে তার চোখ বড় বড় করে বলে,
-তুমি এত দেরী? নিশ্চয় অন্য কারো সাথে ছিলা? ছেলেটা কে? আমার থেকে বেশী সুন্দর নাকি?
তার ঐ কুৎসিত কথা আর রাগান্বিত চেহারা দেখে ইচ্ছা করছিল ঐ সিনেফেলেক্সের সামনেই কষে একটা থাপ্পড় লাগাই শিহাবের গালে। এ ধরনের কিছু তথাকথিত প্রেমিক গুলোর জন্যই কিছু সাধারণ ভালোবাসা সমৃদ্ধ মন খুব নীরবে ভালোবাসার অযত্নের শিকার হয়ে, অকালেই সমকামী সম্পর্ক গুলো থেকে আস্থা হারায়। এইতো আমার এখন শিহাবকে খুব কঠিন ভাষায় বলতে ইচ্ছে করছে তোর ভালোবাসার গুষ্টি কিলাই। থাক তোর এমন সন্দেহ যুক্ত ভালোবাসা তোর কাছে। আমি চললাম। তারপর ও বললাম না। এত গুলো মানুষের সামনে সিন ক্রিয়েট করার কোন ইচ্ছা আমার নাই।
-সরি রাস্তায় প্রচণ্ড ট্রাফিক। তাই একটু দেরী হয়ে গেল। চল ভীতরে যাই। মুভি শুরু হল বলে।
-আমি এখন যাবো না। একজনের জন্য অপেক্ষা করছি। আসিফ ভাইয়াকে আসতে বলেছি সে নাকি এই মুভিটা দেখবে।
আগের কথাটা যা তা এইবার আমার রাগান্বিত রূপটা আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না। তার দিকে কঠিন চোখে তাকিয়ে বললাম,
-কাল বলেছিলাম সিনেমাটা শুধু আমরা দুইজন মিলে দেখবো। তারপর ও তুমি আমাদের মাঝখানে তৃতীয় ছায়া অ্যাই মেন আসিফ ভাইকে টেনে নিয়ে আসলে। যত দিন তোমার সাথে পরিচয় একটা দিন ও বোধহয় ভুল করোনি আসিফ ভাইকে ঢেকে আনতে। এতই যখন আসিফ ভাই প্রীতি তোমার, আমার কি দরকার ছিল? থাকো তুমি তোমার আসিফ ভাইকে নিয়ে। আর কোন দিন ও আমাকে কল করবে না। কন্সিডার এভেরিথিং ইজ ওভার। ভালো থেকো সবসময়।

কথা গুলো শেষ করে বুক ভরে একটা স্বস্তির নিশ্বাস নিয়ে হাঁটতে লাগলাম আমি। একটি বারের জন্য ও পিছন ফিরে তাকাতে ইচ্ছা করছে না আমার। বলি আমি ও তো মানুষ, ধৈর্যের একটা নির্দিষ্ট সীমারেখা আমারও আছে। এলটন জনের “সেক্রিপ্রাইস” গানটার মূলনীতি মাথায় রেখে শিহাবকে ক্ষমা কম করিনি। তারপর ও সে ঐ একটা ভুল বার বার করেই যাবে, আর আমি ও নিজেকে শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হুক বানিয়ে তাকে ক্ষমা করেই যাবো তা ঠিক নয়। মানুষ একটা সম্পর্ক করে মনের প্রশান্তির জন্য মানসিক অশান্তির জন্য নয়।

হপ্তা খানিক পর এক দিন বিকেলে বারান্দায় বসে শেষ বিকেলের আলো গায়ে লাগিয়ে কালো রঙের কফির মগে চুমুক দিচ্ছিলাম আমি। কাজের মেয়েটা এসে বলল এক ভদ্রলোক আমার সাথে দেখা করতে চান। তাকে বললাম বসার ঘরে বসতে দিতে। একটু পর ফ্রেস হয়ে তার কাছে গিয়ে চিনতে পারলাম না তাকে। আমি সামনে গিয়ে দাড়াতেই উঠে দারিয়ে সালাম দিল,
-আমি আসিফ।
-দুঃখিত কোন আসিফ?
-শিহাবের কাছে বোধহয় বার বার শুনেছিলেন আমার নামটা।
শিহাবের নামটা আসতেই বুঝতে পারলাম তুমিই সেই মীরজাফর যার জন্য আমার কিছু সময় মাঝ গঙ্গায় বিসর্জন দিতে হয়েছে। তারপর ও নিজে যেচে বাসায় আসলো বলে মুখে একটা ভদ্রতার হাসি ঠেকিয়ে বললাম,
-দাঁড়ীয়ে কেন বসুন। কি খাবেন? চা না কফি?
-মাপ করবেন আমি কিছুই খাবো না। যদি কিছু মনে না করেন আমি কি আপনার মূল্যবান সময় থেকে ১০টা মিনিট ধার নিতে পারি?
-বলুন।
-আসলে কথা গুলো এইখানে বলা বোধয় ঠিক হবে না। চলুন বাহিরে যাই।
-আচ্ছা একটু অপেক্ষা করুণ। আমি জামা পাল্টে আসছি।

জিয়া উদ্যানের সামনে ব্রিজের উপরে দাঁড়িয়ে আছি আমি আর শিহাবের বিখ্যাত মহাপুরুষ আসিফ ভাই। আমি লেকের পানির দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছি আসিফ ভাইয়ের ঝুলি থেকে থলের বিড়াল বাহীর হওয়ার। আসিফ ভাই উকালতি শুরু করলেন শিহাবের হয়ে,
-ফাহিম ভাই রাজনীতিবিদের মত লম্বা ভাষণ দিয়ে আমার প্রতি আপনার তীব্র রাগ সপ্তম আসমানে তোলার বিন্দু মাত্র ইচ্ছা আমার নাই। এমনিতেই আমাকে নিয়ে শিহাব একটা মহাজোট পাকীয়ে ফেলেছে। আমি এসেছি শিহাবের হয়ে আপনার কাছে ক্ষমা চাইতে। ফাহিম ভাই আমি সেই প্রথম থেকে বলে এসেছি তাকে, তোদের দুইজনের মাঝে আমাকে বার বার টানিস না ব্যাপারটা কোন বয় ফ্রেন্ড এই মেনে নেবে না। তারপর ও আপনি বলে তাকে অনেক সহ্য করেছেন অকপটে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখেছেন। এই জন্য অবশ্যই আপনি সাধুবাদ পাবার যোগ্যতা রাখেন। জানেন ভাই, আমি তাকে অনেক বুঝিয়েছি, ভালোবাসা হবে দুজনে দুজনাতে। যেখানে থাকবে চারটি কান আর দুইটি হৃদয়ের খোলা মেলা বিচরণ। সেই বিচরণের মাঝখানে বাঁধার দেয়াল নির্মাণের জন্য কোন অদৃশ্য ছায়া মানবকে নিমন্ত্রণ করার কোন মানেই হয় না। কারণ প্রতিটা মানুষ চায় তার ভালোবাসার মানুষটি শুধু তাকে নিয়ে ভাবুক, তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখুক, তাকে নিয়ে রচনা করুক সামনের দিন গুলো। এই সব কিছু জানার পর ও কিছু মানুষ হরহামেশাই ভুল করে যায়। শিহাব তাদের দলে। এত করে তাকে বুঝিয়েছিলাম সম্পর্কে সন্দেহ জিনিষটা একটা সম্পর্ক পচন সংক্রামণ রোগ। এইটাকে যত পারা যায় সম্পর্ক থেকে দুরে রাখা উচিৎ। সে আপনার সাথে করেছে তার উল্টো। সব কথাতে টেনে এনেছে আমাকে। আর মাঝখানে আমি হয়ে গেলাম ব্যাটের বল। সত্যি কথা বলতে কি, সে আমাকে বড় ভাইয়ের মত ভালোবাসে। আমি তাকে ছোট ভাই হিসাবেই দেখি। সে সব কিছু শেয়ার করে আমার সাথে। আর গত কয়েকদিনে আপনার সাথে কথা বলতে পারেনি। তার কান্না দেখে আমার খুব খারাপ লেগেছে। তাই বাধ্য হয়ে আপনার সম্মুখে হাজীর হলাম। আমি আপনাকে অনুরোধ করবো, তাকে আরেকটা চান্স দিন।
আসিফ ভাইয়ের কথা গুলো শুনতে খুব একটা খারাপ লাগেনি। আমি জানি শিহাব এখন আসে পাশেই আছে। আসিফ ভাইয়ের গ্রিন সিগন্যালের জন্য অপেক্ষা করছে। আমি আসিফ ভাইয়ের কণ্ঠে হা মিলালেই তীর বেগে এসে হাজির হবে। তারপর বহুল ব্যবহিত শব্দ সরি বলে সব কিছু মিটিয়ে নিতে চেষ্টা করবে। হয়তো এ ধাক্কায় সে কয়েকদিন ঠিক থাকবে তারপর আবার ঐ একই রকম কিচ্ছার সূচনা হবে। এর চেয়ে ঢের ভালো টেনে হেঁচড়ে জোড়া তালি দিয়ে সম্পর্কটা এগিয়ে নেয়ার চেয়ে এইখানেই ইতি টানা। কারণ ঐ সামান্য একটা ঠেলায় এই ধরনের মানুষদের সহজে পরিবর্তন হয় না। প্রয়োজন বড় একটা ধাক্কা। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, আসিফ কে বাই বলে সোজা হাটা ধরবো। লোভ করে বেশী কষ্ট পাওয়ার চেয়ে আমার ছোট খাটো কষ্টই অনেক ভালো। তাকে আরেকটা চান্স হয়তো দেয়া যায় কিন্তু যারা বার বার চান্স পেয়ে মাথায় উঠে তাদের একটা শাস্তি পাওয়া উচিৎ। তাই আদর করে ঝামেলা দিয়ে নিজের হৃদয় পরিপূর্ণ করার চেয়ে একাকীত্বটাকেই বেঁচে নিলাম।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.