বাজি

লেখক: হোসেন মাহমুদ

সংসদ ভবনের আস পাশটায় এখন পাখীর কলরবের মত মাতিয়ে রেখেছে কিছু মানুষ। তাদের মাঝে কেউ কেউ আবার গীটার বাজীয়ে সুরে কিংবা বেসুরে গানে টান মারে। অতুনু খুব একটা খারাপ গায় না। কণ্ঠ শুনলে মনে হয় রবীন্দ্র সংগীতের জন্য উপযুক্ত, কিন্তু তার গলার জোর এত বেশী যে ব্যান্ড ছাড়া গতি নাই। অতুনুর সাথে বাপ্পা মজুমদারের একটা গানে তাল দিয়ে যাচ্ছে বন্ধুরা।
“তুমি আমার বায়ান্ন তাস, শেষ দানে ও আছি। তোমার নামে ধরেছি আমার সর্বস্ব বাজি”
-কি রে গান থামালি কেন?
-সামনে তাকিয়ে দেখ। এরা কারা?
পলাশ সামনে দেখে বলে এই আবার নতুন কি? এরা তো আমাদের মানিক জোড় বন্ধুদ্বয় ইষাণ আর অক্ষর। পলাশ মুখটাকে ভেংচিয়ে বলে,
– ইষাণ যেখানে অক্ষরতো সেইখানে থাকবেই। এদের এক আচার্য রকম সম্পর্ক দেখলাম রে ভাই। মানুষে মানুষে এত মনের মিল হয় কেমনে?

সত্যি এক অবাক করা সম্পর্কের বাঁধনে আবদ্ধ অক্ষর অ্যান্ড ইষাণ। বন্ধুদের মতে তারা শুধু প্রাকৃতিক কাজে সাড়া দেয়ার সময় পাশা পাশী থাকে না। অন্যথায় তাদের আলাদা করার ক্ষমতা কারো নেই। গত এক বছর ধরে তাদের মাঝে মনমালিন্য তো দূরের কথা টু শব্দ ও হয়নি কোন দিন। যেন সুন্দর এক ছকে বাঁধা এদের জীবন। ইউনিভার্সিটিতে কিংবা বাসায়, গাড়ীতে কিংবা রাস্তায় এক জন আরেক জনের হাতে হাত রেখে চলা এদের অভ্যাস। দেখতে দুজনেই অতি আচার্য রকমের সুন্দর। অক্ষর ইষাণের চেয়ে বছর দুয়েকের বড়। অতি বিলাস বহুল জীবন যাপনে অভ্যস্ত সে। দামি গাড়ী করে প্রতিদিন ইউনিভার্সিটিতে আসে। সাথে নাক বন্ধ হয়ে যাবার মত অতি উচ্চমাত্রার কড়া দামি পারফিউম। নতুন নতুন জামা পরিবর্তন শখের মধ্যে অন্যতম। সবই ঠিক আছে সমস্যাটা শুধু সমকামী হওয়াতে নয়তোবা ক্যাম্পাসে মেয়েদের লাইন পড়ে যেত তার পিছনে। অন্যদিকে ইষাণ নিজে ও বড় লোকের ছেলে। তার বড় দুই ভাই পরিবার নিয়ে কানাডায় থাকে। কিন্তু সাধারণ জীবন যাপন তার পছন্দ। নিউমার্কেট থেকে ৫০ টাকা দামের টি শার্ট তার গায়ে কোন দিন ও খারাপ লাগে না। সে রিকশায় চড়ে ইউনিভার্সিটিতে আসে অনেক আনন্দের সাথে। অক্ষরের মত অতি বাক্যালাপে তার দারুণ অনীহা। শান্ত স্বভাব যাকে বলে। গত বছর বি বি এ তে ভর্তি হয় ইষাণ। হাতে গোনা দু একজন ছাড়া তার বন্ধু নেই বললেই চলে। কেমন করে যেন মিশে যায় অক্ষরদের দলে। যদি ও সমকামিতা ব্যাপারটা ইষাণ বরাবরই হাইলাইট করা থেকে বিরত থেকেছে। কিন্তু মানুষ ছাইলে ও বেশি দিন সত্য গোপন রাখতে পারে না। ইষাণের বেলায় ও তাই ঘটেছে। গ্রুপের অনেকেই তাকে প্রেমের অফার দিয়েছে। সে সব সময় প্রত্যাখ্যান করে আসছে সেই শুরু থেকে। সবাই বলা বলি করতো, ভাব মারা তার স্বভাব। তাদের কথা শুনে ইষাণ হাঁসতো, সে নিজে তো জানে সে আসলে কি? কেমন করে যে অক্ষরের সাথে সম্পর্কটা হয়ে গেল সে আজো তার সমাধান খুঁজে পায়নি। আর অক্ষরটা এমন তাকে ফেলে দেয়া সবার পক্ষে সম্ভবপর নয়। আর সেই দিন অক্ষর কাণ্ডটা করেছিল দেখার মত। টি এস সি তে বসে আড্ডা মারছিল সবাই। ইষাণ ও আছে তাদের মাঝে। হঠাৎ করে সবাই সামনে হাঁটু গেড়ে বসে অক্ষর। ইষাণকে উদ্দেশ্য করে হাতে এক গুচ্ছ অর্কিড নিয়ে বলে।
তুমি সেই মানব যার জন্য আমি অপেক্ষারত ছিলাম বহুকাল ধরে।
তুমি সেই হিরো যার জন্য একা একা অতিবাহিত করেছিলাম অনেক গুলো দিবস ও রজনী।
তোমার চোখের দিকে তাকালে আমার শরীরের সমস্ত পশম দাড়িয়ে আমাকে জানান দেয়,
ভালোবাসার এক উষ্ণ আমেজ। শরীরের সমস্ত ইন্দ্রিয় গুলো আমাকে বুঝিয়ে দেয় আমার জীবনের তরী তোমার তীরে নোঙ্গর ঠিকেয়ে বসে আছে।
তুমি সেই পুরুষ যার সাথে কাটবে আমার বাকি জীবনটা।
ইষাণ তুমিই সেই যার জন্য আমি অক্ষর আজ ভালবাসার কাঙ্গাল।
কি ফিরিয়ে দিবে আমায়?

ইষাণ বুঝতে পারছিল না এইটা কি ঘটেছে তার সাথে কোন ইংরেজি গে মুভির সিন। নাকি পুরাটাই বাস্তব। সে নিজেকে চিমটি কেটে বুঝতে পারে না, এইটাই প্রতিটি সমকামি মানুষের এক অধীর প্রত্যাশিত স্বপ্নময় বাস্তব। ইষাণ অক্ষরকে বলে আমি তোমাকে না করছি না। কিন্তু এখন হাঁ ও বলতে পারছি না। আমার কিছু সময়ের দরকার। সবাইর সম্মতিক্রমে সময় পেল ইষাণ। দু মাস পর নিজেকে আর লুকিয়ে রাখতে পারছিলো না। ইষাণ বুঝতে পারছিল তার ভিতরের অনেকটা যায়গা এখন অক্ষরের দখলে। অক্ষরের অতি নাটকীয় আবেদনের সমাপ্তি ঘটাল ইষাণ খুব সামান্য একটা বাক্য দিয়ে। অক্ষর তুমিই সেই মানুষ যার জন্য আজকে আমি ইষাণ। কথায় কথায় এক দিন ইষাণ অক্ষর কে বলে,
-আচ্ছা আমি যদি ঐ দিন তোমাকে সরাসরি না করে দিতাম। বন্ধু বান্ধবের সামনে তোমার অবস্থান কোথায় যেত সেইদিন?
-শুনো ইষাণ। আমি জানতাম তুমি না করতে পারবে না। কারণ বহুল ব্যবহিত ভালোবাসি শব্দটা খুব সহজ হলে ও তাকে অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা সবার থাকে না।
-এত বিশ্বাস ছিল তোমার।
-হুম। আর তাছাড়া অ্যাই এম টেকেন এ চান্স অন মাই লাভ।
কথাটা শুনে সেইদিন ইষাণ অনেকক্ষণ জড়িয়ে ধরে রেখেছিল অক্ষরকে।

তারপর থেকে তাদের প্রেমের যাত্রা শুরু। ইষাণের আকাশ খুব প্রিয়। আকাশের রংটা তার পছন্দের রং। রাতের পরিছন্ন আকাশের তারা দেখতে তার খুব ভালো লাগে। মাঝে মাঝে অক্ষর তাকে ছাঁদে নিয়ে যায়। তারপর অক্ষরের কোলে শুয়ে ইষাণ প্রাণ ভরে তারা দেখে। লং ড্রাইভে রাস্তার পাশে বেড়ে উঠা গাছের ফাঁকে রোদ এসে যখন গায়ে লাগে তখন ইষাণ মনে করে সে স্বর্গের সান্নিধ্যে আছে। তাই অক্ষর তাকে নিয়ে প্রায় লং ড্রাইভ এ যায়। একই জামা পরে রাস্তায় বের হয় দুজনে। এইতো আজকে ও এক ধরনের গেঞ্জি গায়ে দুজন। ইষাণের গায়ে আছে I am his. অক্ষরের গেঞ্জিতে লেখা He is mine।

এই ধরনের গেঞ্জি পরে সংসদ ভবনের মত একটা এলাকায় ঘুরতে আসাটা উচিৎ হয়নি মনে করছে সবাই। কারণ আর যাই হক এটা বাংলাদেশ। সমকামিতার হাতে খড়ি এখনো কাপড়ের তলে ঠিকিয়ে রেখেছে সবাই। সেই দেশে এ ধরণের গেঞ্জিতে যে কেউ ভ্রু কুছকে দুইবার দেখার কথা। আসলে অক্ষর ও রকমই। জেদ তার শরীরের রন্ধে রন্ধে অবস্থান করছে। যাই চেয়েছে তাই তার পেতেই হবে। যখন যা খুশী সে তাই করবে কে কি ভাবল তা নিয়ে তার কোন মাথা ব্যথা নেই।

অক্ষর ইষাণ কাছে আসতেই অতুনু গান থামিয়ে বলে।
-মামা তোরা তো বাংলাদেশে গে রাইট না পাইয়ে ছাড়ছিস না বোধয়।
অক্ষর: শুন মামা আজ না হয় কাল এক দিনতো আসবেই। হয়তো সেই দিন আমরা থাকবো না। আমাদের বাচ্চা কাঁচ্চারা সেইদিন উপভোগ করবে নিজের দেশের আবহাওয়ায় সমকামিতার সম্মান।
ইষাণঃ আচ্ছা ঐ সব বাদ দিয়ে আসল ব্যাপারটা বল না সবাইকে।
পলাশ: কি গো মানিক জোড় তোমাদের মাঝে কেউ কি গর্ভবতী নাকি?
অক্ষর: দেখ ফাজলামি রাখতো, শুন কাল আমাদের দুজনের ভালবাসার প্রথম বর্ষপূর্তি। তাই বাসায় ছোট খাটো একটা আয়োজন আর কিছু না। তোরা সবাই আসবি। আর হাঁ স্পেশালি তপু। তুমি আসতে ভুল কইরো না মামা। মনে থাকে যেন।

শীতের বিকেল ঠাণ্ডা যেন হুর হুর করে বাড়ছে। পারলে সবাই দুখানি জামা অতিরিক্ত গায়ে দিয়ে শীত নিবারণ করে। কিন্তু হায় এই শীতের মাঝে ও এক জন ঘামছে। সে হচ্ছে তপু। তপু এমন করে ঘামার কারণটা কি?

পরদিন সন্ধ্যা হতেই সবাই অক্ষর আর ইষাণের ফ্লাটে হাজীর। আয়োজন তেমন কিছু না। টেবিলে সাজানো কিছু বিয়ার সাথে পিরচে রাখা কয়েটা পুডিং আর একটা মাঝারি সাইজের কেক। সবাই মাস্তিতে আছে। কেক কাটার পর বিয়ার উপভোগের সময় এখন, সবার হাতে বিয়ারের গ্লাস। শুধু তপু শক্ত করে হাতে ধরে আছে তার অ্যাই ফোন। এক রাউন্ড হয়ে যাবার পর অক্ষর বিয়ারের গ্লাস উপরে তুলে সবাইকে চুপ করতে বলে।
হাতের গ্লাসটা টেবিলে রেখে তপুর দিকে তাকিয়ে বলে। মামা এইবার দাও তোমার অ্যাই ফোন খান।
তপু নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। সবাই একজন আরেকজনের মুখ দেখা দেখি করছে। তপু কিছু বলছে না। এইবার অক্ষর এক প্রকার চীৎকার দিয়ে বলল।
-কি রে এখনো সন্দেহ আছে নাকি?
ইষাণ তার পকেট থেকে মোবাইল বের করে বলে। এই নাও তোমার কল করার দরকার হলে আমারটা থেকে কল করো। তপুর মোবাইল নিয়ে টানা টানি করছ কেন?
অক্ষর: তুমি বুঝবে না সোনা। তুমি এইটার থেকে দূরে থাকো।
ইষাণ ঘটনার আগা মাথা কিছুই বুঝতে পারছে না। শুধু অক্ষরের দিকে ফেল ফেল করে তাকিয়ে আছে। এই বার এক প্রকার জোর করে তপুর হাত থেকে অ্যাই ফোনটা কেঁড়ে নিলো অক্ষর।
মোবাইলটা হাতে পেয়ে সে বাংলা ফ্লিমের ভিলেন ডিপজলের গলায় হাঁসতে লাগলো। আসতে আসতে অক্ষর চোখের সামনের সব পর্দা সরিয়ে দিল।
অক্ষর: কি মামারা বলেছিলাম না বাজিতে তোমরা হারবা। শুনো আমি যা চাই তাই পেয়ে থাকি। আর এইটা তো মাত্র এক জনের ভালোবাসা।
ইষাণ কিছুটা হকচকিয়ে গেল। সে অক্ষরকে উদ্দেশ্য করে বলে।
-মানে কি অক্ষর?
অক্ষর: মানে হল একটা বাজি। তুমি যখন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলে, তখন অনেকই তোমাকে প্রেমের অফার দিইয়েছিল। তুমি কাউকে পাত্তা দাওনি। একদিন সবাই এসে আমাকে বলল ব্যাপারটা সেই দিন বলেছিলাম সবাই না পারলে ও আমি পারবো ঐ ছেলেকে বসে আনতে। সবাই বলে পারবি না। বললাম হয়ে যাক বাজি। তখন তপু সাহেব তার সদ্য কেনা অ্যাই ফোনটা বাজি রেখেছিল। তারপর দিন থেকে ইষাণ সাহেব কে জয় করা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলাম আমি। তাকে অনেক জায়গায় অনুসরণ করেছি আমি। তার পছন্দের রং, তার পছন্দের খাবার। তার ভালোলাগা গুলো নিয়ে অধ্যয়ন করেছি অনেক দিন। তারপর মাঠে নেমে জয় করেছি ইষাণ সাহেব কে। আর এই জন্য গত এক বছর সময় দিয়েছি তোমার পিছনে। আমি দুই দিনের মাথায় খেলাটা শেষ করতে পারতাম। কিন্তু তোমার সাথে মিশে দেখলাম তুমি জিনিষ খাঁটি। তাই ভাবলাম মাঠে যেহেতু নেমেছি। এক ডিলে দুই পাখী মেরে যাই। ইয়েস ইষাণ বাবু এই হচ্ছে চোট একটা নাটকের সমাপ্তি।

ইষাণ থর থর করে কাঁপছে তার গলার আওয়াজ বের হচ্ছে না। মনে হচ্ছে এই দোতলা বিল্ডিংটা মাথার চার দিকে ঘুরছে। সে কল্পনা ও করেনি কোন দিন কিছু মানুষ নীরব ঘাতক হয়ে ভালবাসাকে পূঁজি করে খোলা বাজারের দুটাকার ধনিয়া পাতার মত নিলামে তুলে দিতে পারে। করুন এক চোখের চাউনি নিয়ে ইষাণ অক্ষরের দিকে তাকিয়ে বলে,
-তুমি কি সত্যি সেই আমার অক্ষর? সামান্য একটা অ্যাই ফোনের বাজিতে আমার মনটা নিয়ে হা ডু ডু না খেললে কি চলতো না তোমার?
ইষাণের চোখ আর পানির বাঁধা ঠেকাতে পারছিলো না। নিজের হাতে গড়া এই ফ্লাটের চার দেয়লের মাঝে সব সাজানো আছে এখনো আগের মত। শুধু একটা হিরোশিমায় অগোছালো করে দিয়ে গেল তার জীবনটা। ইষাণ আঁট দশ জনের মত নয়, যে ভালোবাসা ভিক্ষা খুঁজে জোড়া তালি দিয়ে টিকিয়ে রাখবে একটা সম্পর্ক। সে আর একটা কথা ও না বলে বেরিয়ে আসলো ঐ ফ্লাট ছেড়ে।

ঐ দিন এর পর থেকে সে ইউনিভার্সিটিতে আর আসেনি। কেউ কোথাও ইষাণের দেখা পায়নি। পলাশ তার বাসায় গিয়ে ও কোন হদীস ফেলো না। তলিয়ে গেল এক অস্বাভাবিক ভালোবাসার গল্প। কিন্তু কারো জন্য কারো জীবন থেমে থাকে না। জীবন তার আপন গতি তে চলে। দিন যায় বছর ঘুরে মাস আসে। যে যার মত ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিজের জীবন নিয়ে।

এক বছর পরের ঘটনা ইষাণ বিহীন সবাই আগের মত আড্ডারত। পলাশ সাথে করে নিয়ে আসে এক পুরুষ এঞ্জেলকে। একটা মানুষ এত সুন্দর হতে পারে তা এদের মাঝে অনেকই জানতো না। সেই পুরুষ আঞ্জেলটির নাম। প্রহর। দেশের বাহিরে থেকে এসেছে গত মাসে। পলাশের সাথে বন্ধুত্ব হয় ফেসবুকে। দুজনেই জানে তারা সমকামী। কিন্তু সম্পর্কটা ঐ বন্ধুত্ব থেকে আগাচ্ছে না কিছুতেই। প্রহর কে দেখে অনেকেই হা করে আছে। সবচেয়ে বেশী হা করেছে অক্ষর। মনে মনে বলছে সে জীবনে এত সুন্দর মানুষ স্বপ্নেও দেখেনি। এই ছেলে কে তার চাই এ চাই।

কিছুদিন যাবত প্রহর অক্ষরদের গ্রুপের এক জন হয়ে গেছে। প্রতিদিন বিকালে আড্ডা মারে সবার সাথে। আসতে আসতে অক্ষর প্রহরের প্রেমে পড়ে যায়। সে ইতোমধ্যে বলে দিয়েছে পলাশকে। প্রহরকে সে রিয়েল ভাবে চায়। তার লাইফ পাটনার হিসাবে। এক দিন বিকেলে আগের মত সবাই টি.এস.সির মোড়ে বসে আড্ডা দিচ্ছে। অক্ষর সেই এক গুচ্ছ অর্কিড দিয়ে আগের মত হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ে প্রহরের সামনে। একই কবিতা জুড়ি থেকে বের করে পড়তে থাকে প্রহরের জন্য। দলের অন্য সবাই চুপ করে মুখ বাঁকিয়ে অন্য দিকে ফিরে আছে। কারণ কেউই এখনো ভুলতে পারেনি ইষাণের সেই হাঁসি ভরা মুখখানি। প্রহর দাঁড়ীয়ে এক ধমক দেয় অক্ষরকে। শুনো মামা ফ্লিমের ডায়লগ মারবা মারো কিন্তু এইখানে কি করো তুমি। ফিল্মে যাও তারা ফেলে লুফে নেবে তোমায়। আর যদি কোন দিন এমন পাগলামি করো আমার সাথে ঐ দিন তোমার শেষ কথা হবে। প্রহর কথা গুলা বলে উঠে চলে যায়। অক্ষর ঐ ভাবে বসে থাকে কিছুক্ষণ। বন্ধু বান্ধব কেউ তাকে সান্ত্বনার বানি তো দূরে থাক মুখ দিয়ে আহারে ও উচ্চারণ করেনি।

এইবার সত্যি সত্যি অক্ষর প্রেমে পড়ে যায় প্রহরের। দুনিয়ার সব পাগলামি করা শুরু করে দেয় সে। প্রহরের বাসার সামনে দিন কে দিন পড়ে থাকে। প্রহরকে সব সময় তার দামি কার খানা ফলো করতে থাকে। কিন্তু প্রহরের মন কিছুতেই গলাতে পারে না অক্ষর। তার এই পাগলামি দেখে প্রহর অক্ষরের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। সেই গ্রুপের সাথে আর আড্ডা দিতে যায় না। শুধু মাঝে মাঝে পলাশের সাথে কথা হয় ফোন। এ দিকে অক্ষর দিন দিন প্রহরের প্রতি আকর্ষণ ফেল করতে থাকে। ছায়া সঙ্গীর মত লেগে থাকে প্রহরের পিছনে।

বেশ কিছুদিন পরের কথা। কয়েকদিন থেকে প্রহর অক্ষরকে দেখতে পাচ্ছে না তার পিছনে। প্রহর ভাবতে লাগলো যাক বাবা পাগল দূর হল। এক দিন পলাশ প্রহরদের বাড়িতে আসে। তখন কথায় কথায় অক্ষরের ব্যাপারে বলে সে তো এখন মানসিক রোগী হয়ে গেছে। বাসা থেকে বের হয় না। ক্লাসে ও আসে না। প্রহর সত্যি বোধহয় সে তোমাকে ভালোবাসে। তাকে ভালবাসতে না পারো এক বার গিয়েতো দেখে আসতে পারো নাকি?

পলাশের কথায় প্রহরের মন নরম হয়ে আসে। সে এক দিন বিকেলে হাতে কিছু ফুল নিয়ে যায় অক্ষরদের বাড়ীতে। বাড়ী বললে ভুল হবে প্রাসাদ বলা চলে। বিশাল ডুপ্লেক্স বাড়ীর দোতলায় শেষের রুমটার সামনে কাজের লোক নিয়ে যায় প্রহরকে। কাজের লোক প্রহরকে বলে ভাইজান। আমার ভীতরে ঢুকার পারমিশন নাই। আফনি দরজায় লক করেন। জানতে চাইলে আফনার নাম বইলেন। নয়তবা দরজা খুলবো না। বাড়ীর কাউকে ভাইজান তার রুমে ঢুকতে দেয় না। প্রহর দরজায় দুইবার নক করে। কোন সাড়া শব্দ মিলে না। ৩য় বার নক করার পর কর্কশ গলায় বলে কে?
-আমি প্রহর।
নামটা শুনার সাথে কেউ এক জন দরজায় ঝাঁপিয়ে পড়ার শব্দ পায় প্রহর।
অক্ষর দরজা খুলে তাকিয়ে থাকে প্রহরের দিকে। প্রহর চিনতে পারছে না অক্ষরকে। এই সেই অক্ষর যার শরীর ছিল হিরোদের মত। চেয়ারর দিকে তাকিয়ে তার নিজের কান্না পেয়ে গেল। মানুষ সত্যি অদ্ভুত হয়। প্রেমের জন্য মরতে ও পারে। অক্ষর তার প্রমাণ।

প্রহর অক্ষরের রুমে ঢুঁকে হতবাক। সারা দেয়াল জুড়ে প্রহরের ছবি। বেশীর ভাব ছবি ইউনিভার্সিটির আশে পাশে তোলা। প্রতিটা ছবির নীচে লেখা অ্যাই লাভ ইয়উ।
অক্ষরের দিকে তাকিয়ে প্রহর বলে,
-কেন এই পাগলামি করছ? আমি তো আগেই বলেছি তোমাকে ভালোবাসি না।
-আমাকে ভালবাসতে তোমাকে বলছি না। কিন্তু একটা ব্যাপার কি তোমার মনে হচ্ছে। আমি সত্যি তোমাকে ভালোবাসি।
-হাঁ তা হচ্ছে।
-তাতেই চলবে। আমি ভালবাসার প্রতিদানে ভালবাসা ছাই না। আমি ছাই তাকে যে মন প্রাণে আমার হবে। সত্যিকারের শুধুই আমার।

ঐ দিন কথা বলে প্রহরের মন গলতে থাকে অক্ষরের জন্য। প্রহর অক্ষরকে সময় দিচ্ছে এখন। অক্ষর এখন আগের মত স্বাভাবিক। এক দিন কোন আয়োজন ছাড়াই প্রহর অক্ষরের ভালবাসা কবুল করে নেয়। পরিশেষে অক্ষর খুঁজে পায় সত্যিকারের ভালোবাসা। এক পর্যায়ে তারা একটা ফ্লাট ভাড়া করে এক সাথে থাকা শুরু করে। তাদের নিখুঁত ভালোবাসা সবার নজর কাঁড়ে।
আজ বন্ধু বান্ধব সবাই অক্ষরদের ফ্লাটে। প্রহরের জন্মদিন তাই অক্ষর এক বিশাল আয়োজন করে সবার জন্য। সবাই আনন্দে মশগুল রয়েছে। ড্রিঙ্কের গ্লাস সবার হাতে। কিন্তু প্রহর বেড় রুমে দরজা আটকিয়ে কি যেন করছে। সবাই কানা কানি করছে কি হচ্ছে রুমে হা। অক্ষর হেসে বলে নিশ্চয় আমাকে অবাক করার জন্য কিছু একটা করছে। খানিকক্ষণ বাদে একটা ব্যাগ নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে আসলো প্রহর। হাতে পাসপোর্ট আর টিকেট। সবাই অবাক হয়ে দাঁড়ীয়ে গেল। কি রে তোরা হানি মুনে যাচ্ছিস বুজি?
প্রহর বলে।
-হাঁ যাচ্ছি। তবে আমি একা।
অক্ষর দৌড়ে আসে প্রহরের কাছে। কি বললে তুমি? আমি যাচ্ছি না তোমার সাথে? তুমি ফান করছ নাহ?
-না ফান করছি না। ফান আমি করতে পারি না। ফান করাতো তোমার অভ্যাস। অহ সরি সরি ফান নয় বাজি। কি অবাক হয়ে গেলে তো? এইবার শুনো আমি কে? আমি ইষাণের বেষ্ট ফ্রেন্ড। হাঁ ছোটবেলা থেকেই বলতে পারো। কিন্তু পড়ালেখার জন্য কানাডায় চলে যাই এস এস সির পরে। গত বছর অনেক দিন পর দেখা হয় ইষাণের সাথে। জানতে পারি সে এখন তার ভাই ভাবির সাথে আছে। আর সে আগের মত নাই। তার জীবনটা এলো মেলো হয়ে গেছে একজনের বাজির বলি হয়ে। এক দিন শুনতে পারি সব তার কাছে। আমি পড়াশুনার জন্য আসতে পারছিলাম না তখন। একটা সেমিস্টার গ্যাপ দিয়ে চলে আসি বাংলাদেশে। ইষাণ জানে না আমি কি জন্য আসছি বাংলাদেশে। ইষাণের ফেসবুক অ্যাই ডি থেকে পলাশের সাথে বন্ধুত্ব করি। জানতাম কান ধরলে মাথা আসবে। পলাশ কিন্তু কিছুই জানতো না। তারপর তো তোমরা সবই জানো। অক্ষর সাহেবের আমার প্রতি ভালবাসা। প্রেম নিবেদন, অহ হা তাও আবার একই স্টাইলে। আমি ভিতর ভিতর প্রস্তুত হচ্ছিলাম তোমাকে ঐ দিন যদি মেনে নিতাম। তুমি সত্যিকার ভালবাসা বুঝতে না। হয়তো দেখতাম দিনের শেষে আমার বন্ধুর মত আমি ও তোমার বাজির গুটি হয়ে গেছি। তাই ঐ দিন তোমার অফার প্রত্যাখ্যান করলাম। জাগিয়ে তুললাম তোমার ভিতরের সত্যিকার ভালোবাসা। হাঁ আমি জানি তুমি এখন আমাকে সত্যি ভালোবাসো। কিন্তু আফসোস আমি বাসি না। আমি ফিরে যাচ্ছি কানাডাতে। আর জ্বালিয়ে দিয়ে যাচ্ছি তোমার পৃথিবী এক সত্যিকার ভালবাসার অভিশাপের আগুনে। তুমি জ্বলবে আর উপ্লল্ধি করবে একজনের মন ভাঙ্গা কিংবা ভালোবাসা নিয়ে খেলা করার জ্বালা কি?

সবাই চুপ হয়ে শুনে যাচ্ছিল কথা গুলা। কেউ কোন উত্তর দিতে পারছে না। অক্ষর ও খানেই দাঁড়িয়ে রইল। প্রহর দরজার কাছে গিয়ে পিছন ফিরে আবার বলল, শুনো যদি পারো কাউকে সত্যিকারের ভালোবেসো। কারো ভালোবাসা নিয়ে বাণিজ্য করো না। কারণ মন ভাঙ্গা বিশাল পাপ। সেই পাপ কোন দিন বাপ কে ও ছাড়ে না।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.