ভালোবাসায় অবরোধ

লিখেছেনঃ হোসেন মাহমুদ

শীতের মাত্র শুরু, এরই মাঝে কুয়াশা যেন পুরো শহরটাকে নিজের দখলে নিয়ে ফেলেছে। সকাল থেকে সূর্যের মুখ দেখা যায়নি। ১২ টার আগে মনে হচ্ছে না কুয়াশার ঘোমটার বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে সূর্য উঁকি মারবে আকাশে। ঘড়িতে সময় সকাল পৌনে ৮টা। নির্জন প্রতিদিন এই সময়টায় বাসা থেকে বের হয়। আজ রাস্তায় বের হয়ে সে টের পেলো বের হওয়ার আগে রেইন কোট অথবা ছাতা সাথে নেয়া উচিৎ ছিল। যে ভাবে উপর থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি পানি পড়ছে, বোঝাই যাচ্ছে না এইটা বৃষ্টি না কুয়াশা। ভাগ্যিস খেয়াল করে ৮৫০ টাকায় কেনা কান-টুপীসহ জ্যাকেট আজ পরে এসেছে নির্জন। কান-টুপীটা মাথায় ছেপে গলির মুখে পোঁছাল নির্জন, একটা নয় তিন ৩টা পুরুষ কণ্ঠের বেসুরা গানের আওয়াজ শুনতে পেলো সে। এই কুৎসিত গানের আওয়াজ নির্জন শুধু যে আজ শুনতে পাচ্ছে তা নয়। গত সাড়ে ছয় বছর প্রতিদিন সকালে কান ভারী করা এই গান তার শুনতে হয়। যত নষ্টের মুল ঐ সাদেক মামার চায়ের দোকানটা। রাত নেই দিন নেই আড্ডারত কিছু বখাটের জলসা অষ্টপ্রহর লেগেই থাকে দোকানটায়। ইভটিজিং কিংবা টিজ যত পারিস কর না তোরা, পাড়াতে তো অনেক মেয়েছেলে আছে ঢিলটা না হয় তাঁদের দুয়ারে গিয়ে মার। আমি ব্যাটাছেলের পিছনে লেগেছিস কেন? এইটা নির্জনের মনের প্রতিদিনকার প্রশ্ন। কিন্তু এই সাড়ে ছয় বছরে ও তাদের এই প্রশ্নটা করতে পারেনি নির্জন। নিজেকে সে আম জনতার কাতারে ফেলে একটা দীর্ঘশ্বাস আর লম্বা লম্বা পা ফেলে রাস্তা অতিক্রম করতে পারলেই হাঁপ ছেঁড়ে বাঁচে।

কিন্তু তারপর ও তাদের হাত থেকে নির্জনের নিস্তার নেই। মাঝে মধ্যে নির্জনের সামনে এসে দাঁড়ায় দুইজন চামচা। চামচা বলার পিছনে কারণ, এই দুই মানিকজোড় সবসময় লেগে থাকে বেঞ্চে বসা লিডারের লেজ কামড়ে ধরে। হরতাল, কিংবা অবরোধে গোটা দেশ ছাই হয়ে ধূলয় যাক চুলোয় যাক না কেন, সাত সকালে সাদেক মামার দোকানে পদধূলি না দিলে পেটের ভাত বোধয় হজম হয় না এই তিনজনের। এক দিন সকালে কাঞ্চন লঙ্কার মত দুইজন শোয়ার হল নির্জনের সম্মুখে,
জগাঃ ঐ তুমি সামনের ১৭ নাম্বারের তিন তলায় থাকো নাহ?
নির্জনঃ জি।
মিন্টুঃ এই এলাকায় আসছ অনেক দিন হয়ে গেছে। এখনো রাশেদ ভাইরে সালাম দাওনি কেন?
নির্জনঃ রাশেদ ভাই? কোন রাশেদ ভাই?
জগাঃ হায় হায় মালটায় কয় কি? রাশেদ ভাই রে চেনে না।
মিন্টুঃ বুঝেছি জিনিষটারে টাইট দিতে হইব।
নির্জনঃ দেখুন আমার ক্লাসের সময় হয়ে যাচ্ছে আমাকে যেতে দেন।
মিন্টুঃ ঐ কচি খোকা তোমার কলেজে যাওন হইব না। আগে রাশেদ ভাইয়ের কাছে গিয়া ক্ষমা চাও। এত দিন তার সামনে দিয়া চ্যাটাং চ্যাটাং করে হেঁটে গেছো, উনারে সেলাম কালাম দাওনি। এখন ভাইজানের সামনে গিয়া পা ধইরা ক্ষমা চাও।
নির্জনঃ আমি উনার কাছে ক্ষমা চাইবো কেন? আমার অপরাধ?
জগাঃ আদব লেহাজ তো কিছুই জানো না। উনি আমাদের গুরু জন। বলতে গেলে আমগো মা বাপ। এলাকার সবাই উনারে সম্মান দেয়। তুমি কোথাকার কোন কেরাসিন তৈল হইলা উনারে সেলাম কালাম দাও না।

তিনজনের কথোপকথনের মাঝখানে বাম হাত দিলেন রাশেদ ভাই নিজে। বসা অবস্থায় জিজ্ঞাস করলেন,
রাশেদ ভাই: ঐ কি হয়েছে রে। সকাল সকাল এত প্যাঁচাল পাড়ছিস কি জন্য?
জগাঃ ভাই দেহেন এই পুলা আপনারে সেলাম দেয় না। দিতে বললাম বলে রাশেদ ভাই কে? মেজাজ গেছে চরমে, তার কানের নীচে দুইডা মারার দরকার।

কথাটা শুনার পর রাশেদ ভাই বসা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। গুটি গুটি পা ফেলে জটলার দিকে আগাচ্ছেন। নির্জন এতদিন এই ৩ বস্তুর সামনে দিয়ে আসা যাওয়া করত ঠিকই কিন্তু কোন দিন ও ভালো করে তাকিয়ে দেখেনি এই রাশেদ ভাইয়ের দিকে। এই প্রথম তার দিকে তাকিয়ে নির্জন উদাসী হয়ে গেল খানিকক্ষণের জন্য। মুখ থেকে আপনাআপনি বের হয়ে গেল 0 M G. নব্বই দশকে ডলি সান্তনির তুমুল জনপ্রিয় একটা গান ছিল
“ রঙ চটা জিন্সের প্যান্ট পরা, জ্বলন্ত সিগারেট ঠোঁটে ধরা, লাল শাট গায়ে তার, বুক খোলা। সানগ্লাস কপালে আছে তোলা, রাখো না কেন ঢেকে ঐ দুইটি চোখ হে যুবক”
নির্জনের বার বার ঐ গানটার কথা মনে পড়ছে রাশেদ ভাইকে দেখে। এই সকাল বেলাতে ও তার মাথায় সানগ্লাস আছে। প্যান্টা ও ঐ গানের মত শুধু শাট টা লাল নয় কালো। এই যা তা না হলে কপি ক্যাট বলে চালিয়ে দিয়া যেত। আর সবচেয়ে বাজে কাজটা করল সে, কালো সানগ্লাসে না ঢেকে তার চোখ দুটো। একটা পরুষ মানুষের চোখ এত আকর্ষণীয় হবে কেন? কেন ঐ রুক্ষ মুখের গঢনের আদলে লুকিয়ে থাকবে রাজ্যের মায়া তার চোখে। নির্জন তার চোখের দিকে তাকিয়ে বেশীক্ষণ থাকতে পারল না। সে জানে তার পুরুষ প্রীতি আছে। তাই বলে পাড়ার বখাটে মাস্তানের উপরে ক্রাশ হোক সেইটা নির্জন চাচ্ছিল না।

কিন্তু পরিশেষে যে মাথা সেই মুণ্ড। নির্জন ঐ দিন কিছুতেই ঠেকাতে পারল না তার মনকে। সে অগোচরে বিরাজ করতে লাগল ঐ বখাটে ছোঁড়ার ভীতরে। রাশেদ ভাই তার দিকে এগিয়ে আসছে। হতে পারে তার শক্ত পোক্ত হাতের দুই খান চড় তার গালে পড়বে কিন্তু নির্জনের সেই দিকে কোন খেয়াল নেই। শুধু তাকিয়ে আছে ঐ অপূর্ব চোখ দুটোর দিকে। রাশেদ ভাই তার কাছে এসে বললেন,
রাশেদ ভাই: কি নাম?
নির্জনঃ আমার নাম নির্জন।
রাশেদ ভাই: তুমি ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের ছেলে নাহ?
নির্জনঃ জি।
রাশেদ ভাই: কিসে পড় তুমি?
নির্জনঃ ইন্টার মিডিয়েটে।
রাশেদ ভাই: আচ্ছা যাও কলেজের লেইট হয়ে যাচ্ছে। আর এদের কথায় কিছু মনে করো না। এরা আমাকে বেশী ভালোবাসে তাই আবোল তাবোল বকে। এলাকায় কোন সমস্যা হলে আমাকে বলবা।

নির্জন যা আশা করেছিল তার কিছুই হল না। রাশেদ ভাইের ব্যাবহারে সে রীতিমত মুগ্ধ। তার কথা শুনে মনেই হচ্ছিল না সে ভাড়াটে কিংবা চাঁদাবাজ মাস্তান। এর পর প্রতিদিন আসা যাওয়া তে কম করে হলে ও ২ বার রাশেদ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকত সে। তার চেহারা কিংবা শরীর দর্শনের উদ্দেশ্যে নয়। শুধু মাত্র তার ঐ মায়াবী চোখের প্রাণে চেয়ে থাকত নির্জন। কলেজের দুই বছর অনেক চেষ্টা চরিত্র করে ও রাশেদ ভাইয়ের ধারে কাছে ঘেঁষাতে পারলো না সে। এক অজানা ভয় কিংবা নির্জনের নিষিদ্ধ চাহিদার কোন প্রাধান্য তার কাছে থাকবে না বলে। দেখতে দেখতে কেটে গেলো কলেজের দুইটি বছর। নির্জন ইতোমধ্যে রাশেদ ভাইয়ের খোঁজ খবর অনেক কিছুই জেনেছে। রাশেদ ভাই এককালে ভালো ছাত্র আর ভদ্র ছেলে ছিল। তাদের পরিবারের সবাই উচ্চ শিক্ষিত। রাশেদ ভাইয়ের ইন্টার মিডিয়েটের রেজাল্ট শুনে নির্জন রীতিমত থ হয়ে যায়। কিছু খারাপ সঙ্ঘ আর নেশায় এই ভালমানুষটা কে রাস্তার কীট বানিয়ে দিয়েছে। তার এই অবস্থার বেগতিক দেখে পরিবারে তার যায়গা হল শূন্য। এখন এ বাসায় ও বাসায় কিংবা কারো মেসে গিয়ে রাত কাটায়। নির্জন রাশেদ ভাই থেকে বছর দুয়েকের ছোট। আগে নির্জন জরুরি কাজ ছাড়া বাসা থেকে বের হত না কারণ রাস্তায় মাথায় ৩ বস্তু বসে থাকবে। তাদের মুখের বানে নিজেকে বলি দিতে ইচ্ছা করত না তার। আর এখন কারণে অকারণে সাদেক মামার দোকানে গিয়ে চা খায় নির্জন। চা চুমুকের ফাঁকে ফাঁকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ঐ মানুষটার দিকে। তার অতি সুন্দর চোখের চাউনিতে কোন আবেগ কিংবা সফটনেস থাকত না। তারপর ও নির্জন তার সাথে ভাব জমানোর চেষ্টা করত।
একদিন রাশেদ ভাইয়ের কাছা কাছি আসার জন্য নির্জন একটা গল্প বানাল। তার এক ক্লাসমেট তাকে মারবে বলে হুমকি দিয়েছে। তাই অণুয় বিনয় করে রাশেদ ভাইকে নিয়ে গেল তার কলেজের মাঠে। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করিয়ে বলে ভাই ঐ ছেলে বোধহয় আজ কলেজে আসবে না। চলেন আমরা হাঁটতে হাঁটতে বাসায় ফিরে যাই। সেই দিন প্রথম নির্জন রাশেদ ভাইকে বন্ধুত্বের আহ্বান করে। অনিচ্ছার সত্ত্বেও রাশেদ ভাই তা কবুল করে। তারপর মাঝে মাঝে নির্জন রাশেদ ভাইকে ফোন করত। রাশেদ ভাই তাকে সবসময় অবহেলা করে কথা বলতো। এক দিন নির্জন সাহস করে রাশেদ ভাইকে বলে ফেলে তার মনের কথা। কিন্তু ঐ বলাটাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। রাশেদ ভাই ব্যাপারটা নিয়ে তাকে গরম গরম পরটা ভাঁজার ছাঁকনি দিয়ে খোঁচা দেয়। তার দুই চামচাকে ও কথা গুলো বলে দিয়েছে। তার পর থেকে তিন জন মিলে নির্জনকে গান গেয়ে টিজ করে। এইতো একটু আগে ও তাই করছিল।
নির্জন কান-টুপীটা আরও টেনে দিয়ে রাস্তা পার হয়ে রিকসা নিলো। রিক্সায় বসে বসে ভাবছে, এই ভাবে আর কত? গত সাড়ে ছয় বছর একটা মানুষকে ভালোবেসে পদে পদে অপমানিত হতে হয়েছে তাকে। রাশেদ ভাই এখন আর মানুষ নই। নেশা আক্রান্ত এক জানোয়ার। তার হৃদয়ে ভালোবাসার বৃষ্টি ঝরানো সহজ কাজ নয় নির্জন তা খুব ভালো ভাবে বুঝতে পারল। কলেজ শেষ করে এখন ইউনিভার্সিটি শেষ হবার পথে। এত গুলো বছরে নির্জন রাশেদ ভাইকে শূদ্রাতে পারেনি। আর পারবে বলে ও মনে হয় না। তাই আজ সে সিদ্ধান্ত নিলো, এই পাড়ায় আর নয়। যত দিন ঐ মানুষটার সামনে সে পড়বে ততদিন তাকে ভুলতে পারবে না।

গত এক মাস হল নির্জন এখন রাজা বাজারের একটা মেসে এক রুম ভাড়ায় থাকে। তার বাবা তাকে কিছুতেই মেসে আসতে দিচ্ছিল না অনেক কষ্টে রাজি করিয়ে মেসে চলে আসে নির্জন। রাশেদ ভাইকে না দেখে তার খুব খারাপ লাগছিল ঠিকই কিন্তু অপমান তো আর হচ্ছে না। একা একা দিন কাটতে লাগলো নির্জনের।

আজ নাকি অবরোধ, নির্জনের চলছে পরীক্ষা। তাই বাধ্য হয়ে ইউনিভার্সিটিতে গেল। ফেরার সময় কোন বাস পেল না। তাই রিকসা নিয়ে ফিরছিল সে। ধানমণ্ডি ৩২ নাম্বারে এসে রিকসাওলা বলল, আর যাবে না কারণ রাসেল স্কয়ারে নাকি পুলিশের সাথে মারা মারি হচ্ছে অবরোধ সমর্থকদের সাথে। নির্জন কাঁধে ব্যাগটা ঝুলিয়ে ভয়ে ভয়ে হাঁটা ধরল সামনের দিকে। ও দিক থেকে মানুষ ছুটাছুটি করতে লাগল। সাধারণ মানুষ গুলো যে যেখানে পারছে গুঁজে যাচ্ছে কারো দোকানে কিংবা কারো বাসার গেইটের ভিতরে। নির্জন একটা দোকানের বারান্দায় দাঁড়ীয়ে রইল। হঠাৎ করে একজন রক্তাক্ত মানুষ তার সামনে এসে দোকানের ভিতরে যাবার চেষ্টা করছিল। তার পুরো মাথায় রক্ত। বোধহয় পুলিশের লাঠির বাড়ি লোকটার মাথায় পড়েছে। বেচারা রক্তে লাল হয়ে গেছে। নির্জন তার দিকে একবার তাকাল তার পর আতংক নিয়ে সামনে পুলিশ এগিয়ে আসার দিকে তাকিয়ে রইল। ঐ রক্তাক্ত লোকটা বলল, ভাই আমাকে একটু ধরে ভিতরে নিয়ে যান। আমি দাঁড়াতে পারছি না। নির্জনের কানে গিয়ে বিঁধল কথাটা। সেই পরিচিত গলার আওয়াজ। ভালো করে তাকিয়ে দেখল সে, হা সে ভুল শুনেনি। ঐ রক্তাক্ত মানুষটাই রাশেদ ভাই। নির্জনের এই মুহূর্তে কি করা উচিৎ সে বুঝতে পারছে না। রাশেদ ভাইয়ের ফাটা মাথার দিকে তাকিয়ে রইল নির্জন। রাশেদ ভাই নিজেকে আর টিকিয়ে রাখতে পারল না। ধপাস করে পড়ে গেল মাটিতে। নির্জন আস পাশ না তাকিয়ে রাশেদ ভাইকে ধরতে এগিয়ে গেল।

রাশেদ ভাই এখন নির্জনের রুমে। রাশেদ ভাইকে নিয়ে নির্জন শমরিতা হসপিটালে গেল। ডিউটি ডাক্তার তাকে দেখে মাথার চুল খানিকটা কামিয়ে ব্যান্ডইজ করে দিল। মাথায় বাড়ি খাওয়াতে অনেক রক্ত ক্ষরণ হয়েছে। দুই দিন হসপিটালে ছিল রাশেদ ভাই। হসপিটালের বিল পরিশোধ করার জন্য নির্জন মায়ের কাছে গিয়ে হাত পেতেছে। তারপর রাশেদ ভাইকে নিয়ে তার মেসের রুমে উঠল। রাশেদ ভাইের জ্ঞান ফিরার পর শুধু তাকিয়ে ছিল নির্জনের দিকে। মুখে কিছু বলতে পারেনি। নির্জন তার বলার অপেক্ষায় তার সামনে বসে থাকেনি অবশ্য। সারাক্ষণই তার সেবা যত্নে ব্যস্ত রেখেছে নিজেকে। রাশেদ ভাই মনে মনে খুব কষ্ট পাচ্ছে। এই সেই নির্জন যার ভালোবাসা নিয়ে হার রোজ মজা করে এসেছে সে। আর এখন ভাগ্য তাকে নির্জনের দ্বারে এনে ফেলেছে। নির্জন যদিও এখনো রাশেদ ভাইকেই ভালোবাসে। তারপর ও সেই ভালোবাসার পূর্ণতা লাভের প্রত্যাশায় নয় বড়জোর ভালোবাসার মানুষটার অকাল পরলোক গমন চর্ম চক্ষু দিয়ে অবলোকন করতে পারবে না বলেই এত সেবা যত্ন করছে।
নির্জনের ঘরে শুধু মাত্র একটা খাট, ওটাতে রাশেদ ভাইকে ঘুমাতে দিয়ে সে মেঝেতে বিছানা পেতে শুয়। রাশেদ ভাই নিজেকে অপরাধী মনে করছে। আসলে রাশেদ ভাই নিজে ও নির্জনকে পছন্দ করত। কিন্তু তার ঐ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সাথে নির্জনের মত ভালো একটা ছেলেকে জড়িয়ে তার জীবনের বারটা বাজানোর কোন ইচ্ছা ছিল না বলে, নির্জনকে সে অবহেলা করে আসছিল। আর বন্ধুরাসহ তাকে নিয়ে হাসি তামাশা করত যদি এই কারণে নির্জন তাকে ভালোবাসা থেকে অব্যাহতি দেয়। কিন্তু তা হল না। নির্জন ঐ পাড়া ছেঁড়ে মেসে চলে আসার পরে রাশেদ ভাই তাকে অনেক মিস করেছে। মাঝে মাঝে লুকীয়ে ইউনিভার্সিটির সামনে দারিয়ে তাকে দেখে আসত। ভেবেছিল কোন দিন নির্জনের সামনে দাঁড়াবে না সে। কিন্তু আজ নিয়তি তাকে এক ঘরে এনে ফেলেছে। রাশেদ ভাই এখন মোটামুটি সুস্থ। তারপর ও নির্জন তাকে বলে দিয়েছে আপনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে তারপর বাসা ছাড়বেন তার আগে নয়। বাসায় থেকে সারা দিন বই পড়ে কাটায় রাশেদ ভাই। নির্জনের প্রতি রাশেদ ভাই এখন পুরোপুরি আসক্ত হয়ে গেছে। রাতে শুয়ে শুয়ে খেয়াল করল আজ কয়েকদিন সে নেশার কথা ভুলেই গিয়েছে। এই ছেলে তার নেশা ভুলিয়ে দিয়েছে। রাশেদ ভাইের মনে একরকম দ্বিধা কাজ করছে। সে বুঝতে পারছে নির্জনকে সে ভালোবাসে। কিন্তু এইটা কোন ধরণের ভালোবাসা। সে কোন দিন ছেলেদের সাথে কিছু করেনি। তাই নির্জনের ভালবাসায় এক কদম এগিয়ে আবার দুই কদম পিছু হটছে বার বার। সারা দিন যেমন তেমন রাত্রের বেলা নির্জন যখন ঘুমিয়ে থাকে রাশেদ ভাই বিছানায় বসে সোডিয়ামের আলোয় নির্জনের দিকে তাকিয়ে থাকে। যখন রাশেদ ভাই ঘুমিয়ে পড়ে তখন নির্জন উঠে রাশেদ ভাইকে দেখে। এই ভাবেই কেটে গেল হপ্তা খানিক।

রাশেদ ভাই এখন বুঝতে পেরেছে ভালোবাসা ভালোবাসাই। ছেলেতে মেয়েতে কোন মোক্ষম বিষয় না। সে চোখ বন্ধ করে নিজের মনকে প্রশ্ন করেছে বার বার সে কি চায়। একজনের চেহারা তার চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। আর সে হল নির্জন। এ দিকে দেশে হরতাল, অবরোধ লেগেই আছে। নির্জনের চলছে পরীক্ষা। ইউনিভার্সিটি গুলোর এই বা কি দোষ পরীক্ষার তারিখ অনেক বার পরিবর্তন করে ও দেশের অবস্থার উন্নতি হল না। তাই বাধ্য হয়েই পরীক্ষা নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তারা। নির্জন এ কয়দিন পড়া শুনা করতে পারেনি। কাল রাত জেগে পড়েছে। রাশেদ ভাই ও জেগে ছিল ডেল কারনিগির একটা বই নিয়ে। বার বার নির্জনের কাছে এসে বলেছে এইবার ঘুমাতে যাও। সারা রাত জেগে থেকে সকালে দেখবে কিছুই মনে নেই। রাশেদ ভাইয়ের অনেকখানি পরিবর্তন ঘটেছে। এই তো কাল রাতে নিজের হাতে চা করে খাওয়াল নির্জনকে। যতটা সম্ভব নির্জনের কাছাকাছি থাকতে চেষ্টা করছে সে। কিন্তু মুখে বলতে পারছে না যে ভালোবাসি তোমায়। আজকে নির্জন পরীক্ষা দিতে বাহিরে যাবে। বাসা থাকবে ফাঁকা। এই সুযোগটা কাজে লাগানোর জন্য রাশেদ ভাই বাহীরে গেল। তার দুই চামচের সাথে দেখা করেছে। এটিএম বুথ থেকে কিছু টাকা ও তুলে নিলো সে। আসার সময় এক গুচ্ছ গোলাপ ও হাতে করে নিয়ে বাসায় ফিরল রাশেদ ভাই। রাশেদ ভাইয়ের ইচ্ছা ছিল সে ও যাবে নির্জনের সাথে। কিন্তু আজকে ও অবরোধ দেখে নির্জন তাকে বের হতে দেয়নি। ঐ দিনের কথা মনে করিয়ে দিয়ে সে ইউনিভার্সিটিতে গেল।

বিকেল ৪ টা বাজে। নির্জনের এখনো আসার নাম নেই। তার মোবাইলে কল দিল রাশেদ ভাই। বলল সে শাহবাগ মোড়ে বাসে করে বাসায় ফিরছে। রাশেদ ভাই আজ উৎফুল্ল। মনে মনে এক অজানা আনন্দ কাজ করছে। আজকে তার ভালোবাসার মানুষ বাসায় ফিরলে সে তাকে মনে কথা খুলে বলবে। একটা চিরকুটে গোটা গোটা অক্ষরে লেখলো। “নির্জন আমি ও তোমাকে অনেক অনেক ভালোবাসি”
কিন্তু নির্জনের সেই চিরকুট আর কোন দিন ও দেখা হবে না। কোন দিন ও শুনতে পারবে না ভালোবাসি শব্দটা ভালোবাসার মানুষের মুখ থেকে। কারণ একটু আগে একদল লোক এসে বাসে আগুন ধরিয়ে দিয়ে গেল। নির্জন সে বাসে। খানিকক্ষণ আগে ও যে মানুষটা এক বুক ভালোবাসা নিয়ে ফিরছিল ভালোবাসার মানুষটার কাছে তার সেই ভালোবাসার অকাল অবসান হল এই অবরোধের আগুনে। নির্জন আর কোন দিন তার পরিবার কিংবা প্রিয় মানুষটির মুখ দেখতে পারবে না। আর তার প্রিয় মানুষটি ও শেষ বারের মত নির্জনের মুখ দেখতে পারবে না। ছাই হয়ে উড়ে গেল নির্জনের সাথে বসে থাকা সব গুলো মানুষের সব স্বপ্ন। হারিয়ে গেল অনেক গুলো মানুষের আশার আলো। কেন এই গণ হত্যা? কেন এই আগুন নিয়ে মানুষ মারার বলি খেলা? একজন সাধারণ মানুষ হিসাবে প্রশ্ন করি নিজেকে, মনুষ্যত্ব বোধ আদৌ কিছু অবশিষ্ট আছে কি? কেন নিজের মাতৃভূমিকে ধ্বংসের সর্বোচ্চ আসনের দিকে ঠেলে দিচ্ছি? আর কত মানুষের জান আর তাজা রক্ত চাস তোরা?

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.