মুখোশ

লিখেছেনঃ হোসেন মাহমুদ

আমার নাম অভি, চট্টগ্রামে থাকি।
সমকামিতার জগতে আমি কবে প্রবেশ করেছি তা মনে নেই।
কিন্তু নিজেকে সমকামী হিসাবে পরিচয় দিলেও, সম্পর্কে কিংবা সেক্স বিষয়ে ছিলাম সন্দিহান।
তাই অনিচ্ছার সত্ত্বেও শামুকের মত গুটিয়ে রাখতাম নিজেকে।
রেখেছিলাম ও বেশ কয়েকটা বছর। এইতো অনার্স পর্যন্ত ঠেকাতে পেরেছিলাম।
অবশেষে ইন্টারনেট এর কল্যাণে অবস্থান নিলাম ফেসবুকে।
মিথ্যা আর ভণ্ডামির ভিড়ে সত্যিকারের মানুষ খুঁজতে, ব্যস্ত রেখেছিলাম নিজেকে।
একদিন পেয়ে গেলাম আমার সত্যিকারের রাজপুত্রের দেখা।

তার নাম পাপন, থাকে ঢাকাতে।
পাপনের সাথে পরিচয় হবার পর চিনতে পারলাম, আমার ভিতরের সত্যিকার মানুষটাকে।
আমার সমস্ত মন উজাড় করে দিলাম তার প্রতি।
যেখানে যাই, বাসায় কিংবা ইউনিভার্সিটিতে সব যায়গায় তার উপস্থিতি অনুভব করি।
সম্পর্কটা কথায় কথায় বন্ধু থেকে নেমে আসে ভালোবাসাতে।
রাতের পর রাত কথা বলতে থাকি দুজনে। জানতে চেষ্টা করি নিজেদের।
রাত জেগে, সকালে ঠিক মত ক্লাসে যেতে পারতাম না।
তার কণ্ঠে অন্যরকম একটা মাধুর্যটা আছে। যা মানুষকে খুব সহজে আকর্ষণ করে।
তার কথা বলার আলাদা একটা স্টাইল, যা আমি ঘুমের মাঝে ও শুনতে পাই।
আমি যেমনটি পাপনকে ভালোবাসি, পাপন ও আমাকে তেমনি করে ভালোবাসে।
তার চেহারা কিংবা টাকা পয়সা নিয়ে, আমার কোন মাথা ব্যথা ছিল না।
আমি সবসময় তার ভিতরের মানুষটাকে খুঁজে বেড়াতাম।
তার ছবি দেখে অবাক হয়ে গেলাম। একটা মানুষ এত সুন্দর হয় কি ভাবে।
যেন বিধাতা নিজের হাতে , ঢেলে সাজিয়েছেন পাপনকে।
কি অপূর্ব চোখ দুইটি। যেন আমাকে হাতছানি দিয়ে কাছে টানে।
এক দিন ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে এসে আমাকে চমকে দিল।
আমি তাকে দেখে বেহুশ হয়ে যাবার মত অবস্থা।
তাকে ছবিতে যতটা সুন্দর মনে হয়েছে, সে তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশী সুন্দর।
আমরা এক সাথে কাটিয়েছি কিছুটা সময়।
পাপনকে পেয়ে, নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে হতে লাগলো।
তার হাতে হাত রেখে, চোখে চোখ রেখে, কেটেছিল সেই দিন গুলো।
পাপন আর আমি আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ও ভাবতে লাগলাম।
পাপন বলে, সে আমাকে ঢাকা নিয়ে যাবে।
আমরা এক সাথে একই ছাঁদের নীচে, বানাবো আমাদের সুখের নীড়।
আমি বললাম, আমার তো পড়া এখনো শেষ হয়নি।
শুধু ইন্টার পাস করা একটা ছেলেকে, কেউ চাকরী দিবে নাকি?
আর আমার বাবা মা। তাঁদের কি হবে?
পাপন বলে, আমি চাকুরী করবো। আর তুমি বসে বসে খাবে।
আর তোমার বাবা মার কথা, ভাবতে হবে না।
তারা আমারও বাবা মা। আমাদের সাথেই থাকবেন তারা।
আমি মনে মনে বলি, তারা কি আমাদের কোন দিন ও মেনে নিবে পাপন।
তারপর ও পাপনকে এই সত্যি কথাটা বলিনি ঐ দিন।
যখন সময় আসবে তখন দেখা যাবে। ঐ বাস্তবটাকে টেনে এনে,
এই সুখের সময়টা নষ্ট করার কোন মানে হয় না।
আমার জীবনে প্রথম ভালোবাসার পরশ। চোখ বুঝে উপভোগ করি আমি।
পাপন আমার একাকী কষ্টের জীবন থেকে রেহাই দিয়েছে।
সে যে দিন চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা ফিরছিল, বলে বুঝাতে পারবো না কতটা কষ্ট পেয়েছি।
যেন কলিজাটা কেউ টান মেরে চিড়ে নিচ্ছে।

ঢাকা গিয়ে পাপন আমাকে ফোন দেয়। সম্পর্কটা আগের মতই চলতে থাকে।
হঠাৎ এক দিন পাপন আমাকে বলে, সে নাকি কি সমস্যায় পড়েছে , তার টাকার দরকার।
তার কথা শুনে নিজেকে খুব চোট মনে হতে লাগলো।
তার এই দুঃসময়ে, আমি যদি তার পাশে দাঁড়াতে পারতাম।
কিন্তু আমি মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান। বেশি টাকা এক সাথে চোখে ও দেখিনি কোন দিন।
পাপন আমাকে বলে, আমি যেন তাকে সাহায্য করি।
বুঝতে পারছিলাম না কি বলবো পাপনকে।
আমার সীমাবদ্ধতার কথা কি ভাবে তার মুখের উপর বলে দেই।
তাই সরাসরি না করতে পারলাম না। যদি ও আমি জানি টাকা দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
আর যদি সামান্য কিছু হত তাহলে কোন সমস্যা ছিল না।
বেশ মোটা অংকের টাকা। আমি ছাত্র মানুষ কি ভাবে জোগাড় করবো?
ভেবে কোন সমাধান খুঁজে পারছিলাম না।
তাই বাধ্য হয়ে তাকে জানিয়ে দিলাম। পাপন আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

তার পর থেকে দেখলাম পাপন বদলে যেতে লাগলো।
আগের মত অনলাইনে পাওয়া যায় না তাকে।
ফোন ধরে না। বুঝে উঠতে পারছিলাম না, আমি কি করবো।
আমি অনেক কষ্টে দিন গুলী পার করছিলাম। তাকে ভুলতে পারছিলাম না কিছুতেই।
একটা সাজানো সম্পর্কের ফাটল, মেনে নিতে পারছিলাম না খুব সহজে।
জীবনের প্রথম ভালোবাসা। আমার নিজের ভুলের কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
এইটা চিন্তা করে কষ্টটা বেশী লাগছিল।
কিন্তু পরে নিজেকে প্রশ্ন করতে লাগলাম, আচ্ছা আমি কি ভুল করেছি।
আমি বাস্তবে যা, কিংবা যা করতে পারি,
আমার সীমাবদ্ধতা যদি ভালোবাসার মানুষ না বুঝতে পারে,
তাহলে সে আমাকে সত্যি ভালবেসেছে কিনা?
বিষয়টায় সন্দিহান হয়ে উঠলাম।
যদিও তার অবহেলা দেখে, হাল ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলাম।
কিন্তু তবুও আশা ছাড়ি নি।
পাপনকে ভুলতে পারছিলাম না আমি।
কারণ পাপন আমার প্রথম ভালোবাসা।
অনেক দিন ইউনিভার্সিটিতে যায়নি, ঠিক করে খাওয়া দাওয়া ও করতাম না।
মা এসে জিজ্ঞাস করতো, তোর কি হয়েছে অভি?
মাকে বলতে পারতাম না, মা আমি একজনের প্রেমে অন্ধ হয়ে দ্বিখণ্ডিত এক জীবনের,
স্বপ্নে বিভোর হয়ে খুব উঁচু থেকে নীচে পড়ে গেছি।
ইচ্ছা হত চিৎকার দিয়ে কাঁদি, কিন্তু পারতাম না। আমি আজও পারি না।
কারণ আমি ও রকমই। সব দুঃখ নিজের ভিতরে ছেপে পথ চলা আমার অভ্যাস।

হঠাৎ এক দিন তাকে অনলাইনে পেয়ে কিছু প্রশ্ন করলাম।
অনেক গুলা প্রশ্নের জবাব সে দেয়নি।
কিন্তু যেটা দিইয়েছিল তা দিয়ে পার করে দিত পারবো বাকীটা জীবন।
কারণ ঐ কথা গুলো আমি প্রতিটি মুহুত্তে শুনতে পাই।
কথা গুলো ছিল এমন,
“দেখ অভি আমার পিছনে লেখে থেকো না। তুমি আমার চাহিদা পূরণ করতে কোন দিন ও পারবে না। আমি যাকে চাই সে তুমি নও। আমি অনেক বড় হতে চাই। আমার অনেক টাকার দরকার।
যার টাকা আছে আমি তার সাথে সম্পর্ক করবো। উপরের সিঁড়িতে উঠার জন্য আমি সব করতে পারি। সুতরাং বুঝতে পারছ আমি কি বুজাতে চাচ্ছি”।
তার কথা গুলো যেন আমার কানে হিরোশিমার বোমার মত শোনাল।
হায়রে, কাকে ভালোবেসে এতটা কষ্ট আমি পেয়েছি।
এক লোভী কুকুর ও তার ছেয়ে ভালো।
আমার দোষ তো ঐ একটাই, আমার অর্থ নেই।
কারণ অর্থের কাছে ভালোবাসা মূল্যহীন।
কিন্তু আমি গরীব কিংবা মধ্যবিত্ত যাই হই না কেন।
পাপনের কাছে নিজেকে আর ছোট করতে পারলাম না।
তাই প্রথম ভালোবাসাকে বুকে মাটি ছাপা দিয়ে,
ফিরে আসলাম, নিজের খুব একান্ত আপন। আমার নিঃস্ব জীবনে।

গল্পটা এইখানে শেষ করতে পারতাম।
যেহেতু আমার প্রথম ভালোবাসার কবর তো আগেই দিয়ে দিয়েছি।
কিন্তু কুলখানিটা খাওয়া হয়নি। সেই দিন অনলাইনে এক ফ্রেন্ডের কথা শুনে বুঝলাম।
শুধু আমি একাই ভালোবাসার সমাধিতে ফুল দিচ্ছি না। আমার মত আরও অনেকই আছে।
যারা নিজেকে, পাপনের কাছে ভালোবাসায় বলি দিয়েছে।
সে জানালো, পাপন তার সাথে একই রকম ভালোবাসার কাহিনী করে,তার বাসায় যায়।
সেক্স করার পর ঐ ফ্রেন্ডটা যখন বাথরুমে যায়, সেই ফাঁকে পাপন তার,
ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন আর মানি ব্যাগ নিয়ে ফালিয়ে যায়।
সে অনেক খুঁজেছে পাপনকে, তার বাসায় পর্যন্ত গিয়েছে। কিন্তু পেলো না পাপনের খোঁজ।
সে আরও জানালো শুধু সে নয়, আর ও অনেকেই পাপনের রূপের জ্বালে,
ভালোবাসার সাথে সাথে তার টাকা পয়সা ল্যাপটপ, মানি ব্যাগ, ঘড়ি,
এমন কি ক্যালকুলেটরটা পর্যন্ত কোরবানি দিইয়েছে।

পাপনের এই ভদ্র বেশী মুখোশ টা যদি একবার টেনে আনতে পারতাম।
আমার মত অনেক মানুষই রক্ষা পেত সর্বস্ব হানারও হাত থেকে।
এই সব মুখোশ পরা লোভী ভণ্ডদের জন্য,
সমকামী জীবনে, অনেক মানুষ ভালোবাসাকে বিসর্জন দিয়ে, কষ্টের সাথে মিতালী করে দিন কাটাচ্ছে।
আর আমার প্রথম ভালোবাসা পাপনের মুখোশের আড়ালে নিমজ্জিত হয়ে।
এক অন্তহীন গন্তব্যের নিশানায় বর্তমান।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.