শূন্যতায় পরিপূর্ণ এই আমি

লিখেছেনঃ হোসেন মাহমুদ

বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান হওয়াতে, দুনিয়াতে আসার সময় উপরওয়ালা একটা বিশেষ লাইসেন্স দিয়ে পাঠিয়েছিলেন আমায়। সেটা হল আদর আর ভালোবাসার লাইসেন্স। প্রাইমারী স্কুল পর্যন্ত তার ফায়দা খুব ভালো ভাবে লুফে নিয়েছিলাম। কিন্তু হাই স্কুলে এসে বুঝতে পারলাম দুনিয়ার সকল অত্যাচারের চেয়ে বড় অত্যাচার হল ভালোবাসার। কারণ সব অত্যাচারের প্রতীবাদ করা যায়। শুধু এই ভালোবাসার অত্যাচারের প্রতীবাদ তো দুরের কথা, শুধু মুখে একটা লাগামহীন হাঁসি দিয়ে সহ্য করা ছাড়া উপায় থাকে না।

এইতো গেল শৈশবের কথা। কলেজে উঠার পর আস্তে আস্তে আবিষ্কার করতে লাগলাম আমার ভিতরের আমি টাকে। মা ব্যস্ত আছেন জনপ্রতিনিধি হয়ে। আর বাবা আছেন তার নিজস্ব জগত নিয়ে। মাঝখানে একা পড়ে রইলাম এই আমি। ক্লাস আর বাসা এই মিলেয়ে আমার পৃথিবী। পরে অবশ্য কম্পিউটার নামক বস্তুটার সাথে পরিচয় হয়। কিন্তু তারপর ও সময় আমার কিছুতেই কাটে না। পরিশেষে আপন করে নিলাম কাগজের বুকে কালির আঁচড়ে সাজানো সভ্যতার সাক্ষী বইকে। মাদকাসক্তের মত আসক্ত হয়ে যাই বইয়ের প্রতি। সমরেশ, সুনীল, মাইকেল, বুদ্ধদেব বসু, রবি ঠাকুর সবার সাথে ভালই গনিষ্ঠ ভাবে বন্ধুত্ব হয়ে যায় আমার। কিন্তু হুমায়ূন আমেদ নামে এক ডাকাত এসে সব লেখকদের হটিয়ে দখল করে নেয় আমার পুরোটা সময়। পাগলের মত রাত নেই, দিন নেই পড়তে থাকলাম হুমায়ূনকে। তার কল্পিত চরিত্র হিমু, মিসির আলী, শুভ্র, মিরা সবাই আমার কাছে জীবন্ত হয়ে উঠতে লাগলো।

এখন আমি টগবগে এক যুবক। পড়ছি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বই আর ইউনিভার্সিটি নিয়ে ভালোই যাচ্ছিল আমার দিন গুলো। কিন্তু নিজের ভিতরে খুব নীরবে লালন পালন করে আসছিলাম সমকামিতার বীজ। ইন্টারনেটের কল্যাণে যখন কিছু মানুষের সাথে পরিচিত হই, তখন ব্যাপারটা পুরোপুরি মাথা চ্যাটা দিয়ে উঠে আমার মাঝে। কিন্তু তারপর ও নিজেকে নিয়ন্তন করে আসছিলাম বরবর। মাঝখানে জড়িয়ে পড়লাম এক তথাকথিত নামহীন জারজ ভালোবাসার সম্পর্কের বাঁধনে। সেই গল্প ইতিমধ্যে এই পেইজের পাঠকরা জেনেছে। কথায় আছে না প্রথম ভালোবাসা হয় সত্যি ভালোবাসা। যা চিরদীন ভুলা যায় না। হাঁ আমি আজ ও ভুলতে পারিনি সেই রেড বার্ড কে। রেড বার্ডের পাট তো চুকিয়ে আসলাম কিন্তু আমি যেখানটার, সেইখানেই পড়ে রইলাম। আবার সেই একা একা কষ্টের গ্লানিময় জীবন। কিছু মানুষ যখন খুব একা থাকে, তখন সে তার ভিতরের একটা সত্তা কে বাহিরে বের করে এনে কথা বলতে পারে। সেই মানুষদের আমি এক জন। মাঝে মাঝে আমি অবচেতন মনে যে কোন একটা চরিত্রকে সামনে বসিয়ে অবলিল ভাবে গল্প করে যেতে পারি। তবে মজার ব্যাপার হল। আমি সব সময় হুমায়ূন আহমদের চরিত্র গুলো তৈরি করে কথা বলতাম। ইদানীং শুধু রেড বার্ডকে তৈরি করতে পারি। হুমায়ূন সাহেব মারা যাবার সময় মিসির আলি, হিমুকে ও কবরে নিয়ে মাটি ছাপা দিলেন নুহাশ পল্লীতে। রেড বার্ড কে তৈরি করার কারণ বোধহয় তার কথা সারাক্ষণ চিন্তা করি। কিংবা অবহেলিত মনে তাকে তেরি করছে কারণ, পূর্ণতা পায়নি বলে। কয়েকদিন আগে মধ্য রাতে আমি বই পড়ছিলাম। দেখলাম সে এসে পাশে বসছে, একটা শুকনা কাশি দিয়ে জানান দিল আমি এসেছি। তাকে দেখে মটেও উল্লাসিত বা অবাক হয়নি। কারণ সে আমাকে খুব উঁচুতে তুলে যত্ন করে মাটিতে ফেলে শান্তি পায়নি। তাই এখন আমার কল্পনার ভীতরে এসে মড়ার উপর খাঁ দিয়ে মনকে বেশী করে জয়ের আনন্দ দিতে চায়। জিজ্ঞাস করলাম কি চাও?
-কিছু চাই না।
-তাহলে আমার কাছে কেন?
-এমনি।
-এমনি কেন? নতুন কোন প্রজেক্ট হাতে নাই বুজি।
-আরে না ফেসবুকে পোলাপানের অভাব আছে নাকি। এখনো আমার হাতে ১৭ খানা পোলা আছে। তাদের ঝুলিয়ে রাখছি। দেখি একটা রুটিন বানীয়ে নিয়ম মাফিক তাদের বাঁশ ডলা দিতে হবে তোমার মত।
-বাহ কথা গুলো তো ভালই বলেছ। তা এমন করে কয়দিন খাবে শুনি।
-যত দিন খাওয়া যায়। তোমার মত খাঁটি আর নরম মনের পোলা গুলানরে ছেঁকা দিয়া মনে বড়ই আনন্দ পাই।
রেড বার্ড কথা গুলো বলে একটা হাঁসি দিয়ে ঢক গিলে আবার বলা শুরু করলো।
-শুনো আকাশ তোমার সাথে গেইমটা খেল্লা মজা পাই নাই তেমন। তাই আবার আসছি তোমারে আরেকটু কষ্ট দিতে।
-আচ্ছা রেড বার্ড একটা সত্যি কথা বলবে আমাকে?
-কি কথা?
-এই যে আমার মত সাদা সিদা ছেলে গুলোকে কষ্ট দিয়ে কি মজা পাও তুমি?
-মজার কি আছে। আমার ভালো লাগে তাই নতুন নতুন পোলা ধরে প্রেমের অভিনয় করে ছেঁকা দেই। বলতে পারো এইটা আমার স্বভাব কিংবা নিশা।
-কিন্তু এক বার ও কি ভেবে দেখো নি। এই সব ছেলে গুলোর মনের অবস্থা কি হয়? তারা তো আস্তে আস্তে সত্যিকার ভালোবাসাকে অপমানিত করে, দেহের চাহিদাকে প্রাধান্য দিতে ব্যস্ত হয়ে উঠবে। বিশ্বাস উঠে যাবে ভালোবাসার প্রতি।
-দূর এই সব কি বল? তোমার সাথে যে গেইমটা গেল্লাম। তারপর ও তো তুমি ভালোবাসায় বিশ্বাস কর। এখনো ভালোবাসো আমাকে।
তার কথাটা শুনে নিজের ভিতরে জড় বয়ে যেতে লাগলো। আমার মত সহজ সরল ছেলে গুলাকে বলীর পাঠা বানিয়ে সে মহা আনন্দ নিয়ে ঘুরে বেড়াবে। আর আমরা কষ্ট নিয়ে রাত্রি যাপন করবো। না তা হতে দেয়া যাবে না। আমাকে আমার ভিতর থেকে বের হয়ে আসতে হবে। কোঠর হয়ে মোকাবিলা করতে হবে এই সব তথাকথিত বাণিজ্য প্রেমিকদের। এক জনে আমাকে কষ্ট দেয়ার মানে এই নয় যে আমার পৃথিবীর সমাপ্তি এইখানে। তাই এইবার নিজের কণ্ঠের রুডতার আওয়াজ এনে তাকে একটা ধমক দিলাম।
-ধূর্তেরই ছাই, তোর ভালোবাসার গুষ্টি কিলাই। পেয়েছিসটা কি হারামজাদা। তোদের মত জানোয়ার আমাদের নাচাবে আর আমরা নাচবো? ভালোবাসায় ব্যর্থ হয়ে নাকের ঝোল চোখের ঝোল ফেলবো? তা কি করে হয়। আর না। তুই এক্ষণই আমার চক্ষের সামনে থেকে দূর হয়ে যা।

আমার ধমক খেয়ে রেড বার্ডের অবস্থা ঐ রকম হল, ছাইড়া দে মা কান্দিয়া বাঁচি।

আমরা সমকামীরা নিজেদের নিয়ে একটা সোজা হিসাব কষে ফেলি। সে সমকামী তার মানে সে দেহ পূজারী।
তা আমার ক্ষেত্রে ঠিক নয়। আমি দেহের চেয়ে মনকে প্রাধান্য দিয়ে আসছি সেই গোঁড়া থেকে। কিন্তু তারপর ও ভালো একটা মন আজ ও পেলাম না। আসলে পেলে ও চেনার উপায় নাই। এই ইন্টারনেটের মুখোশ আর নকলের মাঝে সত্যিকার মানুষ চেনা বড়ই দুষ্কর। তার পর ও আমি হাল ছাড়িনি, আশায় আছি থাকবো একটা ভালো মনের।

এই সব ব্যাপার গুলো নিয়ে কেটে যাচ্ছে জীবনটা। কিন্তু ঐ একাকীত্ব আজ ও আমার পিছু ছাড়ে না। আসলে আমি শুধু আমাকে নিয়ে ভাবছি। তাই অন্যর একা থাকা কিংবা কষ্টটা আমার চোখে পড়ছে না।

আসলে আমরা সবাই একা। সব কিছু থাকার পর ও দিনের শেষে নিজেকে অনেক একা মনে হয়। আর আমার ক্ষেতে হয়তো খানিকটা বেশী। কারণ আমি একটু অন্য রকম। কিছুটা আবেগি, কিছুটা জেদি, খুব অল্পতে মানুষকে বিশ্বাস করি। অন্যর কান্না দেখে নিজেকে কান্নায় ভাসিয়ে দেই। খুব অল্পতে সুখী হতে পারি। আসলে আমি ও রকমই।

এই যে আজ আমার জন্মদিন। সবার কাছে দিনটা অনেক স্পেশাল হয়ে থাকে। আমার কাছে মটেও না। রাত ১২টায় মা উইশ করে গেছে, বন্ধু বান্ধবরাও টেক্সট পাঠিয়েছে। কিন্তু তাতে আমি আনন্দে বিহ্বল হইনি। কারণ আমার ভিতরের শূন্যতা আমি হাড়ে হাড়ে উপলদ্দি করছি। তাই অন্যর মাঝে আনন্দ খুঁজে বেড়াই। আজ সকালে ইউনিভার্সিটিতে গেলাম। সবাই জানে আমার জন্মদিন তাই উইশ করেছে, সবাই ধরল পার্টি দেয়ার জন্য। ক্যান্টিনে সবাইকে খাইয়ে দিলাম। ক্যান্টিনে কর্মরত ১২ বছরের এক পথ বালক কাজ করে সেখানটাই। বন্ধু বান্ধবের আনন্দের সময় সে আমাদের খাবার পরিবেশন করে যাচ্ছে। আর আমার দিকে বার বার তাকাচ্ছে। সবাই চলে যাবার পর তাকে কাছে ডেকে জিজ্ঞাস করলাম, সে কি বলতে চাইছে, সে বলে,
-মামা আজ আফনার জনম দিন?
-হা, আজ আমার জন্ম দিন।

খেয়াল করলাম তার পিছনে হাতের মাঝে কিছু একটা লুকানো আছে। জিজ্ঞাস করলাম হাতে কি?
সে হাত সামনে এনে ধরল, দেখলাম কাগজ দিয়ে বানানো একটা ফুল।
তার ঐ ফুল দেখে আমি কেন যেন ভিতর থেকে আনন্দ অনুভব করছি। মনে হচ্ছে সবচে দামী গিফট ওইটাই। মানুষের ভালোবাসা। আর সেই ভালোবাসা শুধু বিশেষ ব্যক্তির সাথেই হতে হবে এমন কোন কথা নেই। নিজেকে অন্য মানুষের মাঝে শেয়ার করে ও আনন্দে থাকা যায়। ঐ ছেলেটাকে বাহিরে নিয়ে একটা ভালো হোটেলে কাচ্চি বিরিয়ানি খাইয়ে দিলাম। আর মনে মনে একটা আনন্দ নিয়ে বাসায় ফিরলাম।

হা এই হচ্ছি আমি। মাঝে মাঝে হিমুর মত মাঝ রাতে খালি পায়ে রাস্তায় হাঁটতে ইচ্ছে করে। কিন্তু মিসির আলীর যুক্তির কাছে পরাজিত হয়ে আশা হত হয়ে নিজের রুমে বসে থাকি। আর ভাবতে থাকি আমি কত একা। আমার সব চেয়ে বড় বন্ধু আমার একাকীত্ব, আমার নিঃসঙ্গতা। আমার শূন্যতায় আমাকে আমার ভিতরটার সাথে মিতালী করিয়ে দেয়। তাই সব মিলেয়ে আমার এই শূন্যতা কে নিয়েই, আজ আমি পরিপূর্ণ…।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.