সমাপ্তি থেকে শুরু

লিখেছেনঃ হোসেন মাহমুদ

আমি আসছি । তোমার কাছে ।
আরও একবার তোমার মুখোমুখি হবো বলে ।
টানা ৫ বছরের সম্পর্কের ইতি টানতে আমি আসছি ।
আমি খুব ভালো করেই জানি তুমি নিজেকে খুব গুছিয়ে নিয়েছ ।
আমার নামে হাজারটা অভিযোগ নিয়ে বসে নেই তুমি ।
কাঠগড়ায় যেহেতু টেনে এনেছ পিছুপা হবনা আজ।

হাঁটতে হাঁটতে মনে পড়ে যায় সেই ফেলে আসা ৫ বছরের কথা ।
কতটা সুখের ছিল এই ৫ টি বছর!
প্রথম প্রথম আমি কথা বললেও কবিতার মত মনে হত তোমার কাছে ।
এখন আমি কথা বললে এমন ভাব নাও যেন দুনিয়ার সব বিরক্তির ভার বিধাতা তোমার ঘাড়ে চাপিয়েছে ।
এক দিনতো বলেই দিয়েছিলে, “তোমার এফ এম রেডিও টা বন্ধ করবে. ?”
একটু ও দেখলেনা কতটা কষ্ট পেয়েছিলাম সেইদিন ।
বিদেশে আমার প্রথম জন্মদিন এর কথা মনে আছে তোমার ?
কি অদ্ভুত কাণ্ডটাই না করেছিলে সেদিন ।
ঠিক রাত ১২ টায় কলিং বেলের শব্দে ঘুম ভাঙ্গে ।
মুখে বিরক্তি নিয়ে এগিয়ে গিয়ে দেখি তুমি বসে আছো গাড়িতে ।
পুরো গাড়ি বেলি আর গোলাপ দিয়ে ঢাকা ।
তুমি জানতে আমার পছন্দের ফুল বেলি আর গোলাপ ।
তোমার হাতে খাঁচায় রাখা আছে এক জোড়া সাদা খরগোশ।
আমি অবাক হয়ে ভাবছি এই ছেলে আমাকে এতোটা ভালবাসে কেন? ওকে হারালে আমি বাঁচবোনা বোধহয়।

অথচ আজ পরিস্থিতি কোথায় দাঁড় করিয়েছে আমাদের ?
আমার গত শেষ জন্মদিন এর কথাতো ভুলেই গিয়েছিলে তুমি ।
অভিমান করে বারান্দায় অন্ধকারে গান শুনে শুরু করেছিলাম জীবনের ২৭ তম বছর।
অনেক আশা, আর এক বুক স্বপ্ন নিয়ে এসে ছিলাম তোমার কাছে, মা বাবা ভাই বোন সবাইকে ছেড়ে এই আমেরিকাতে।
কোন দিনও ভাবিনি যে আমাকে এতটা কষ্ট পেতে হবে। তোমার বন্ধুরা সবাই আমাকে নিয়ে কম উপহাস করেনি ।
ইংরেজিতে ভালো কথা বলতে পারতাম না তখন ।
এখানকার মানুষদের সাথে তাল মিলাতে হিমশিম খাচ্ছিলাম ।
মনে আছে প্রথম যখন আসি আমাকে একটা পার্টিতে নিয়ে গিয়েছিলে তুমি ।
ওখানের সবাই আমার দিকে তাকাচ্ছিল বার বার ।
তুমি কাছে এসে সবার সামনে চুমো দিলে আমায় । বললে, চল । চলে যাই ।
আমি বললাম, এত তাড়াতাড়ি যাচ্ছি কেন আমরা ?
তুমি বলেছিলে, আমার ভালো লাগছিল না সবাই তোমার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে । তোমার দিকে আর কেউ তাকালে আমার খারাপ লাগে ।
কতটা আনন্দ লেগেছিল তোমার ঐ কথা শুনে বলে বুঝাতে পারব না ।
আমি চেয়েছিলামও তাই ।
তুমিই শুধু আমার দিকে তাকাবে । আমার ঠোঁট গুলো, আমার সারা শরীর সবই তোমার ।
কিন্তু দেখ কাল রাত ও আমি সেক্স করেছি এক সাদা চামড়ার বানরের এর সাথে ।
আমার শরীর নিয়ে কি খেলাটাই না খেললও সে ।
নিজের উপর অনেক অভিমান আমার । সেই সাথে তোমাকেও বুঝাতে যে আমি ও পারি । আমারও চাহিদা থাকতে পারে।

তোমার অফিসের একটা নতুন ছেলের সাথে তোমাকে আবেগময় মুহূর্তে দেখে ফেলেছিলাম আমি ।
আমি বুঝতে দিই নি তোমায় ।
তুমি বাসায় এসে কত সুন্দর করে আমাকে তোমার ধারাবাহিক কবিতার লাইন দিয়ে বুঝিয়েছিলে ।
তারপরেও চুপ করেছিলাম । শুধু তোমার ভালোবাসি বলে ।
একটা ছেলে হয়েও রাত পর রাত খাবার নিয়ে অপেক্ষা করেছি তোমার পথ চেয়ে।
বাহিরে কোন চাকরি করতে দাওনি আমাকে, তোমার ঘরের গৃহিণী বানাবে বলে ।
তাও মেনে নিয়েছিলাম তোমার জন্য ।
এইতো সেইদিন মদ খেয়ে রাতে বাসায় ফিরে আমাকে একটা চড় মেরে জানিয়েছিলে কতটা ভালোবাস তুমি আমাকে। গালাগালিতেও যে তোমার ভালো দখল আছে তাও বুঝিয়েছিলে খুব ভালো করে।
অসহায় একা আমি কোথাও যেতে পারিনি তোমার ছেড়ে ।
কত দিন চোখের পানি দিয়ে ভাত খেয়েছি আমি তুমি কি তা জানতে ?
রাত এ তোমাকে ঘুমে রেখে বারান্দায় বসে বসে রাত এর খোলা আকাশ এর সাথে কথা বলতাম আমি ।
তোমার জন্য আমার পরিবারকে বিসর্জন দিয়ে এসেছিলাম ।
বুঝতে পারছি কত বড় ভুল আমি করেছি ।
কিন্তু আমার কোন পথ খোলা নেই যাবার ।
আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছিলাম তোমায় নিয়ে, আর পারছিনা আমি… মুক্তি চাই। তোমার থেকে …হ্যাঁ তাই আসছি আমি আরও একবার তোমার মুখোমুখি হব বলে।
নিউইয়র্ক এর বাঙ্গালীরা আমায় দেখে প্রশ্ন করতো, ভাই তুমি কি খুব দুখী? সারাক্ষণ চুপচাপ থাকো কেন তুমি? তাদের বলতে পারতাম না যে আমার ভাগ্যই এই জন্য দায়ী ।
নিয়তি আমাকে নিয়ে কঠিন খেলায় মেতে আছে ।

এক বড় ভাই না থাকলে হয়তো আমি এখন পরপারে অবস্থান নিয়ে বসতাম ।
তোমার সাথে সেদিন ঝগড়া করে বাসা থেকে বের হয়ে নাইট ক্লাব এ গিয়ে পেট ভরতি মদ খেয়ে যাচ্ছিলাম বাস এর নিচে, কিন্তু এক ভাই আমাকে মরতে দিল না।
এখন উনার বাসায় আছি আমি।
বোধহয় এই ২ টি মাস একটি বার আর জন্য ও খোঁজ করনি আমায়, আছি কি বেঁচে আছি নাকি মরে গেছি একবার ও জানতে ইচ্ছা করেনি তোমার?
নিশ্চয় খালি বাসা পেয়ে কাউকে নিয়ে মেতে আছো সেক্স আর মদ নিয়ে… আচ্ছা একটি বারও কি মনে পড়ছে না তোমার? গত ৫ টি বছর একটা মানুষ কতটা কষ্ট আর অবহেলা সহ্য করে পড়ে ছিল তোমার ঐ চার দেওয়ালের মাঝে ।
আমার কান্নার শব্দ তোমার ঘরের আসবাবপত্রগুলোও ভুলেনি বোধহয় ।

আমি এখন তোমার সেই চিরচেনা ঘরের ভেতর ।
ঘড়িতে সময় ঠিক ৫ টা ।
দরজায় কলিং বেল চাপতেই আমি দরজা খুলে দিলাম ।
আমাকে দেখে যেন ভূত দেখলে কোন কথা বলছিলে না তুমি… বোধহয় আমাকে আশা করনি ।
আমাকে অবাক করে দিয়ে জড়িয়ে ধরলে আমায় । বাধা দিতে পারছিলাম না । আরও অবাক হচ্ছিলাম জীবনে প্রথম বার তোমায় কাঁদতে দেখে ।
আমার চোখ দিয়ে একটুও পানি আসছে না… কারন পানি বোধহয় শুকিয়ে গেছে অনেক আগে।
তুমি আমায় জড়িয়ে ধরেই জিজ্ঞেস করলে, কোথায় ছিলে তুমি ? আমি পাগল এর মত কোথায় খুজিনি তোমায় ! তুমি চলে যাবার পর আমি বুঝেছি তুমি আমার কি ছিলে। একটি রাত ও আমি ঠিক মত ঘুমাতে পারিনি…সারাক্ষণ তোমার কান্না ভরা করুন চেহারাটা আমার চোখে ভাসত, তুমি বারান্দায় যে চেয়ারটায় বসে আকাশের সাথে কথা বলতে ঠিক ওখানটায় বসে আমার এই দুই মাস কেটেছে । তুমি চলে গিয়ে বুঝিয়ে দিলে আমায়… তুমি আমার কি ছিলে…। আমি তোমায় অনেক ভালোবাসি অনেক অনেক… আমাকে ছেড়ে আর কোথাও যাবে না তো?

তোমার কান্না ভরা কণ্ঠে কথা গুলো শুনে অবাক হচ্ছিলাম ।
আমি নির্বাক । শুধু বললাম,আর কিছু বলবে ?

আমি কঠিন স্বরে বললাম,অনেক ভালবেসেছিলাম তোমায় , তোমার জন্য সব ছেড়ে আজ আমি এক প্রকার যাযাবর। শুধু তোমার জন্য আমার মায়ের মুখটা দেখি না গত ৫ বছর । শুধু তোমার জন্য আমার এক মাত্র বোন এর বিয়ে তে থাকতে পারিনি । শুধু তোমার জন্য আমার বাবার কবরে একটু মাটি দিতে পারিনি । শুধু তোমার জন্য এত ভালো ছাত্র হবার পর বি বি এ, করার পর ও এম বি এ টা করতে পারিনি… শুধু তোমার জন্য আমি আমার নিজের জীবনকে ঘৃণা করি। আর কি বাকি আছে তোমার ? বল ?
কথা গুলো বলে নিঃশ্বাস নিলাম … যেন নিজেকে হালকা লাগছিলো । অনেক দিন এর জমানো কষ্ট কিছুটা কম লাগছে ।
তুমি দাঁড়িয়ে হাত জোড় করে বসে পড়লে আমার সামনে । কাঁদতে লাগলে বাচ্চাদের মত ।
আমার একটুও কান্না পাচ্ছিলনা ।
তুমি এবার বললে, প্লিজ আমাকে মাফ করে দাও । সারাজীবন তোমার কাছে থাকবো । কোথাও যাব না তোমাকে ছেড়ে, শুধু একটি বার সুযোগ দাও । আমাকে দয়া কর ..তুমি না থাকলে আমি সত্যি আত্মহত্যা করব ।
আমি বললাম, দেখ তোমার নাটক অনেক দেখলাম । আর না… আমি এসেছি তোমার আমার নাটক এর শেষ দৃশ্যটা পরিপূর্ণতা দিতে… আমি যাই । ভালো থেকো তুমি ।

আমি এক পা দুই পা করে ঘর থেকে বের হলাম । গেইটের দিকে এগুচ্ছি ।
বুজতে পারছিলাম আমার ভিতরে প্রচণ্ড ঝড় হচ্ছে । বুকে খুব ব্যথা অনুভব করছিলাম।
তুমি পেছন থেকে বাচ্চাদের মত চিৎকার দিয়ে বললে,তুমি যদি চলে যাও রাতে এখানে আমার লাশ থাকবে ।
বুঝতে পারছিলাম না…। আমি দাঁড়িয়ে গেলাম । আর এগুতে পারছিলাম না… আমার মনে হচ্ছে তোমাকে আমি এখনো ভালোবাসি… তোমার গলার আওয়াজ কান থেকে আমার বুকে লাগছে…। বুঝতে পারিনা কি করব।
এত কষ্ট পাবার পর ও তোমাকে ভুলতে পারিনি।
হায় রে মানুষ এর মন।
কোথায় যেন পড়েছিলাম কথাটা । এখন মনে পড়ে গেল
“যদি তুমি কাউকে ভালোবাসো তবে তাকে ছেড়ে দাও, যদি সে ফিরে আসে তাহলে সে তোমার ছিল তোমার এই থাকবে…। আর যদি না আসে তাহলে সে কোন দিনও তোমার ছিল না … থাকবেও না কোন দিন… ।”

পারলাম না ।
পিছন ফিরলাম। এগিয়ে গেলাম তোমার দিকে, হাতটা বাড়িয়ে বুকে টেনে নিয়ে কাঁদতে লাগলাম দুই জনে ।
এটা কোন দুঃখের কান্না নয়। আনন্দের কান্না ।
মনে হচ্ছে আবার সমাপ্তি থেকে শুরু হল নতুন করে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.