হিয়ার মাঝে লুকীয়ে ছিলে

লিখেছেনঃ হোসেন মাহমুদ

কাল ২২ এ শ্রাবণ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরলোকগমন দিবস। রবীন্দ্রনাথ কে নিয়ে শাহবাগ মোড়ে বসে আড্ডা মারছিলাম আমি, সীমান্ত, সাদেক ভাই, প্রিতম আর রফিক।
রবীন্দ্রনাথ সাহেবের যদি তার ভক্তদের প্রতি, বিন্দু মাত্র দয়া মায়া থাকতো। মরার জন্য তাহলে, বেছে বেছে ও রকম ছিপ ছিপে বৃষ্টি আর কর্দমাক্ত একটা দিন বেঁচে নিতেন না।
সাদেকের এই কথাটার প্রতিবাদ করে উঠলো প্রিতম।
প্রিতম: সাদেক ভাই, কথাটার মান একটু বেশি মানহীন হয়ে গেল না?
সাদেকঃ প্রিতম তুমি হাই কোটের কাজ ছেড়ে, রবি ঠাকুরের ব্যক্তিগত উকিল হলে কবে থেকে? তার কোন কুঠি বাড়ির অসৎ কর্মে জড়িত ছিলে? নাকি, তার বউদির কূল গাছে ঢিল তুমি মেরেছিলে তার সাথে।
প্রিতম: দেখেন সাদেক ভাই, আপনি বড় বিধায় কিছু বললাম না। কিন্তু ঐ বিশ্ব কবি রবি ঠাকুরকে নিয়ে একদম বাজে কথা বলবেন না।
সাদেকঃ ভাই তুমি এত জ্বলে উঠলা কেন? সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের “প্রথম আলো” পড় নি বুঝি?
বেচারা ঠাকুর। আধ তোলা ইজ্জত ও বাকি রাখল না সুনীল। একেই বারে ঘেঁটে রোঁদে ছিটিয়ে দিইয়েছিল।
এইবার মুখ খুলল সবচেয়ে শান্ত ছেলেটি সীমান্ত।
সীমান্ত: সাদেক ভাই, আপনার কথাটা মানতে পারলাম না। সুনীল কোন দিন থেকে দুধে ধোয়া তুলসী পাতা ছিল? তার “অর্ধেক জীবন” আর “৭০ বছর” আত্ম জীবনী মূলক দুইটা উপন্যাসের কোন যায়গায় কি, লিখেছিলেন, তার কত গুলো বাজে অভ্যাস ছিল। কিন্তু অন্য কবিদের ভালো ভাবে ঘাটা ঘাটির কোশল ভালোই উপস্থাপনা করেছিলেন।
তার “সেই সময়” উপন্যাসে মাইকেল মধুসূদন দত্তকে সমকামী বানীয়ে দিলেন। কি জানি নাম ছিল ছেলেটার?
ওহ, গোর দাশ, তাকে দিয়ে ঠেশে চুমু খাইয়ে দিলেন মাইকেলকে। বলি, অন্যর দোষ এতই যদি আপনার চোখে পড়ে, তাহলে নিজেরটা লুঙ্গির নিচে ছেপে রেখে গেলেন কেন?
পরিস্থিতি অন্য দিকে চলে যাচ্ছে দেখে আমি বললাম, মিছে মিছে আমরা কেন নিজেদের মাঝে কথা চালা চালি করছি। যার যাকে ইচ্ছা পছন্দ করার স্বাধীনতা, সবার আছে।
রফিক: জীবনের সাথে আমি একমত। আচ্ছা এই অপ্রীতিকর অবস্থার ব্যবস্থা আমি নিচ্ছি। সীমান্ত একটা গানে টান মার তো দেখি। দেখবি সবাই বোবা হয়ে যাবে তোর গান শুনে।
রফিক কথাটা খারাপ বলেনি। সীমান্তের কণ্ঠটাই এমন, যে এক বার শুনবে দ্বিতীয় বার শুনার জন্য অস্থির হয়ে থাকবে। অবশ্য আমার কাছে তার কণ্ঠ বেশিই ভালো লাগে। কারণ ঐ একটা মানুষ, যে আমার জীবনের সাফল্যর কারিগর। আবার একই সাথে দুঃখের একটা দীর্ঘশ্বাস।

সীমান্ত সমকামী আমি তা জানি। সে ও জানে আমি কি? কিন্তু সব জানার পর ও প্যাচটা লেগে আছে অন্য জায়গায়। বন্ধু হিসাবে সে অতুলনীয় কিন্তু যত অনীহা, ঘৃণা আর অবিশাপ ভালোবাসার উপর। কলেজে থাকা কালে কোন একটা ছেলে তার ভালোবাসা নিয়ে তবলা বাজিয়েছে। খুব উঁচুতে তুলে আস্তে করে নিছে ফেলে দেয় সীমান্তকে। নীচে পড়তে পড়তে হারীয়ে যায় ভালোবাসা নামক শব্দটা তার জীবন থেকে। এখন কেউ যদি প্রেমের অফার নিয়ে তার সামনে দাঁড়ায়, বুঝে নিতে হবে তার সাথে ওইটাই সীমান্তের শেষ কথা। দেখতে অনেক সুন্দর না হলে ও তার চেহারা, আচার ব্যাবহার দিয়ে একটা মানুষকে খুন করে ফেলতে পারবে সে। আর গানের কথা কি বলবো।
যখন রবীন্দ্র সঙ্গীত ধরে মনে হয়, রবি ঠাকুর বেঁছে থাকলে একটা গোল্ড মেডেল ধরিয়ে দিতেন সীমান্তের হাতে। আমি ও কোন এক সময় গাইতাম। কিন্তু তার সামনে আমি কিছু না। ইউনিভার্সিটিতে থাকা কালে সা রে গা মা নিয়ে বসতাম মাঝে মাঝে। কিন্তু এখন চাকুরী বাঁচাতে বসের গুঁতা খেয়ে সা রে গা মার, স টা তলিয়ে গেছে সার্বজনীন ভাবে। তার পর ও একটু আধটু গাই মাঝে মধ্য। সীমান্ত, খালাতো ভাই রফিকের কথা মেনে নিয়ে গান ধরল।
“সখী ভাবনা কাহারে বলে, সখী যাতনা কাহারে বলে।
তোমরা যে বল, দিবস ও রজনী।
ভালোবাসা ভালোবাসা।
সখী ভালোবাসা কারে কয়?
সে কি কেবলই যাতনাময়?
সে কি কেবলই চোখের জ্বল, সে কি কেবলই দুখের শ্বাস”?

আমি মনে মনে বলি, সীমান্ত ভালোবাসা শুধু দুঃখই দেয় না, সাথে থাকে কিছু অবিশ্বাস্য মুহূর্ত। কিন্তু তুমি হয়তো কোন নর্দমার কাঁদায়, নিজের মনকে চুবিয়ে নিয়ে, সত্যিকার ভালোবাসার অমর্যাদা লিপ্ত। কিন্তু এমন একটা সময় হয়ত আসবে, তুমি আবার নিজেকে সঁপে দিবে এই ভালোবাসার মায়া জ্বালে। যত দিন লাগে, লাগুক। আমি তোমার পিছনে ছায়া হয়ে আছি, থাকবো। অন্ধকারে হয়তো, তোমার ছায়া তোমাকে একা ফেলে চলে যাবে। কিন্তু এই আমি, কিছুতেই তোমাকে হাত ছাড়া করবো না। কারণ সত্যি ভালোবাসি তোমাকে।

বুয়েটে ৩য় বর্ষে থাকা অবস্থায় তুমি ভর্তি হলে সমাজ কল্যাণে। আমার বন্ধু রফিক এক দিন সেন্টাল লাইব্রেরীর সামনে, তোমাকে এনে পরিচয় করিয়ে দিল আমার সাথে। কি সরল আর নিষ্পাপ একটা চেহারা আমার দিকে তাকিয়ে বলে, ভাইয়া আমি সীমান্ত।
সে দিন থেকে আজ অবধি কোন ছেলেকে আমার মনের সীমানার সীমান্তে আসতে দেয়নি। আর কারো দিকে তাকাবোই বা কেমন করে। সেই দিন থেকে নিজেকে তোমার মাঝে খুইয়ে বসে আছি।

খুব গরিব ঘরের সন্তান তুমি। বাবা অসুস্থ মা অন্যর বাড়িতে কাজ করে সংসার চালাতে হিম সিম খায়। তোমার নিজের আগ্রহ আর পরিশ্রম দিয়ে আজ ঢাকা ভার্সিটির আঙ্গিয়া মাড়িয়েছ তুমি। টিউশনি করে নিজের পকেট, পড়ার খরচ চালিয়ে বাড়িতে মাকে টাকা পাঠাও প্রতি মাসে। তোমার সম্মান বোধ এত বেশি যে, অন্য কোন মানুষের অনুগ্রহ কিংবা দয়ার পাত্র হতে দেয় না তোমাকে। যার জন্য তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা আর সম্মান বোধটা আরও দ্বিগুণ হয়ে উঠলো। কত চেষ্টা করেছি তোমাকে বুঝাতে, তোমাকে ভালোবাসি। তোমার পৃথিবীর সাথে অভাব অনটনের যুদ্ধে নিজেকে সহযাত্রী হিসাবে এগিয়ে আসতে। কিন্তু তুমি না বুঝার ভান করে ফিরিয়ে দিইয়েছ আমায়। আমি আর স্টুডেন্ট নয়। ভালো একটা চাকুরী করছি, মাইনে ও কম পাই না। আমার পরিবারের হাল এখনো বাবার হাতে। আমার বেতনে তুমি, তোমার পরিবার খুব অনায়াসে চলে যেতে পারে। কিন্তু না, কিছুতেই নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিবে না তুমি। আর মাঝখানে আমি আছি দোটানায়। প্রতিদিন একটা ছেড়া গেঞ্জি পরে ভার্সিটিতে আসতে তুমি। আমার নিজের প্রতি লজ্জা হত তখন, যখন আমার গায়ে সুগন্ধি দামি ফারফিউম আর নিত্য নতুন জামা থাকতো। ভালোবাসার দাবী নিয়ে তোমার সামনে দাঁড়ানোর সাহস কোন দিন ও হয়তো আমার হবে না। কিন্তু তোমাকে ভুলে ও থাকতে পারবো না। বাধ্য হয়ে একটা মিথ্যার আশ্রয় নিলাম। আমার রিয়েল আইডিতে তুমি এড আছো। নিশ্চয় আমার কোন সাহায্য কিংবা ভালোবাসার কথা তোমাকে জানাতে পারবো না। তাই একটা ফেইক আইডি বানালাম, নাম দিলাম অবাঞ্ছিত। তোমার সাথে ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেল। কিন্তু তুমি বুঝতে পারলে না অবাঞ্ছিত এর আড়ালে আমার অবস্থান।
তোমার কষ্ট গুলো কোন দিন ও শেয়ার করতে না আমার সাথে। কিন্তু আমি বুঝতে পারতাম। তোমার প্রয়োজন। তাই তোমার ঠিকানায় কুরিয়ার করে তোমার জন্য জামা আর কিছু টাকা পাঠাতাম প্রতি মাসে। কিন্তু একটা দিন ও দেখলাম না তুমি সে জামা পরেছ। জানি না টাকা গুলো ব্যাবহার করছ কিনা। এক দিন তোমার মুখে শুনতে পেলাম, তোমার বাবা অনেক বেশি অসুস্থ অনেক টাকা লাগবে চিকিৎসার জন্য। আমি যদি বলতাম তুমি নিতে না। তাই তোমার গ্রামের ঠিকানায় বেশ কিছু টাকা পাঠালাম। তুমি বুঝতে পেরেছিলে ঐ টাকা আমি পাঠিয়েছি। আমার অবাঞ্ছিত আইডিতে আমাকে জানালে, তুমি কেন আমার দুঃখের জীবনের সাথে নিজেকে জোড়াচ্ছ। জানি ঐ টাকাটা তুমি পাঠিয়েছ। কিন্তু আমিতো তোমাকে ঐ টাকা এই জন্মে পরিষদ করতে পারবো বলে মনে হয় না। দেখ আমি গরীব, সমাজে মাথা উঁচু করে দেয়ার মত কোন পরিচয় আমার নেই। কিন্তু একটা ব্যক্তিত্ব আর আত্মসম্মান বোধ আছে। তাই বাবার জন্য দেয়া টাকা গুলো আমি যে ভাবে পারি, শোধ দিয়ে দিব। যদি কিছু মনে না কর, আমি তোমার সাথে দেখা করতে ছাই।
আমি তার মুখের উপরে না করতে পারলাম না। কিন্তু দেখা করবো কি ভাবে। তার সাথে প্রতিদিন কথা হয় অবাঞ্ছিত এর ব্যাপারে। তার কথা শুনে বুঝতে পারলাম। অবাঞ্ছিতকে সে বন্ধু হিসাবে দেখে, আর আমাকে দেখে ভাই হিসাবে। কি ভাবে তার সামনে দাঁড়াবো। সীমান্ত বলে দিয়েছে কাল বিকেলে শাহবাগ জাদুঘরের গেইটে আমার জন্য অপেক্ষা করবে। সারারাত চিন্তায় আমার ঘুম আসলো না। একবার ভাবলাম যা হয় হবে, অন্তত নিজেকে মুখোশের আড়াল থেকে তো বাহির করতে পারবো।

বিকেল সাড়ে পাঁচটায় অফিস শেষ করে শাহবাগ আসলাম। দুর থেকে দাঁড়ীয়ে দেখলাম, তুমি বসে আছো জাদুঘরের মেইন গেইটের সামনে। মুখে বিষণ্ণতায় ভরা। কাঁধে একটা ব্যাগ ঝুলে আছে। মানে বুঝতে পারলাম না। যদিও তুমি কোন দিন ক্লাস ছাড়া ব্যাগ নিয়ে বের হউ না। আমার বুকের মাঝে কাটার মত বিঁধতে লাগলো। ফুল দোকান গুলোর পাশে বসে দেখছিলাম তোমাকে। এক বার ইচ্ছা করছিলো, কিছু ফুল নিয়ে তোমার সামনে গিয়ে দাঁড়াই। কিন্তু শেষে দেখা যাবে, আমার সাথে সম্পর্কের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে দিবে তুমি। দুই ঘণ্টা ও ভাবে কাঁটিয়ে মুখে বিরক্তির ভাব নিয়ে উঠে চারুকলার দিকে হেঁটে চলেছ তুমি। আমি ও তোমার পিছু নিলাম। তোমার হলের কাছা কাছি আসতেই ঢেকে বসলাম পিছন থেকে।
-এই সীমান্ত।
-জীবন ভাইয়া। তুমি এ সময়?
-এইতো অফিস থেকে এ দিকে চলে এলাম। তোমাকে অনেক বার ঢাকলাম শুনতে পাওনি?
-না ভাইয়া আমি একটা বিপদে পড়েছি। তোমাকে তো বলেছিলাম অবাঞ্ছিতের ব্যাপারে। সে আমার মাথায় ঋণের বোঝা ছাপিয়ে এক কঠিন খেলা খেলে যাচ্ছে। বাবার অসুস্থতার সময় টাকা পাঠিয়েছে, আজ তার সাথে দেখে করতে চাইছিলাম কিন্তু সে আসলো না।
-তা তোমার কাঁধে ব্যাগ কেন?
-এমনি, আচ্ছা জীবন ভাইয়া আমি এখন যাই। খুব ভোরে গ্রামে গিয়েছিলাম। ফিরতে ফিরতে বিকেল হয়ে গেল। আমি কিছুক্ষণ রেস্ট নিবো।
সীমান্ত থেকে বিদায় নিয়ে বাসায় চলে এলাম। রাতে অবঞ্ছিত আইডি ওপেন করতে দেখলাম অনেক গুলা মেসেজ সীমান্ত থেকে।
তার মেসেজ গুলা পড়ে আমি চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না।
আমার জন্য আমি তাকে আজ পথে বসিয়ে দিলাম। একটা মানুষের এত আত্মসম্মান বোধ কেন?
কেন সে তার শেষ অবলম্বন বশত ভিটা বন্ধক রেখে, তার বাবার দায় মুক্ত হতে চায়।
কেন সে নিজের ভবিষ্যৎ, তার ছোট বোনটার ভবিষ্যৎ এর দিকে না তাকিয়ে, নিঃশেষ হয়ে গেল পায়ের নীচের মাটি গুলো সরিয়ে।
সাথে সাথে অবাঞ্ছিত আইডিটা রিমুভ করে দিলাম।
এক সপ্তাহ পরে ক্যাম্পাসের দিকে গেলাম। দেখলাম সবার সাথে বসে আছে সীমান্ত।
আমি যাবার সাথে সাথে সবাই চিৎকার দিয়া উঠলো কি রে মামা?
তুমি বিয়া টিয়া করছ নাকি? আমগোরে ভুইলা গেছো। ঘটনা কি?
আমি সীমান্তের দিকে তাকিয়ে আছি। মনে হচ্ছে অনেক দিন থেকে ঘুমায় নি সে। অনেকটা শুকিয়ে গেছে আর আজকে নীরব শ্রোতা হয়ে বসে আছে এক কোনে।
প্রিতম বলে, মামা একটা গান ধর না। অনেক দিন গান শুনা হয় না।
আমি বললাম কেন সীমান্ত আছে না।
প্রিতম একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, সীমান্তর যেন কি হয়েছে আজকাল কথা বার্তা বলে না। আর সে নাকি গান ছেঁড়ে দিয়েছে।
কথা গুলো শুনে নিজেকে আরও বেশী অপরাধী মনে হচ্ছিল।তাকিয়ে আছি সীমান্তর দিকে, কি নির্লিপ্ত চোখের চাহুনি তাতে একটু রাগ অভিমান নেই। আছে অনেকখানি হতাশা।
সবাই ছাপাছাপিতে একটা গান ধরলাম। যদিও আমি আধুনিক গান করতাম, কিন্তু আজ আইয়ুব বাচ্চুর ঐ গানটা মনে পড়তে লাগলো বার বার…।
“ চোখের জ্বলের কোন রঙ হয় না।
তাইতো বুকে ধরা সাগর, দেখাতে পারি না।
আমার ভিতরের ছাপা জন্তনা অব্যক্ত রয়ে যায়।
তুমি তা দেখ না, এই আমাকে দেখ, সেই আমি, আমি নয়ই।
এর কিছুটা আমি আর কিছু অভিনয়”।

গান শেষে সবাইকে জানালাম, আগামী শুক্রবার আমি চট্টগ্রাম চলে যাচ্ছি। অফিস থেকে ছাপ দিচ্ছে। তাই যেতে বাদ্য হলাম। সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি কোন কথা না বাড়িয়ে সবার সাথে কোলাকুলি করে চলে আসলাম। যে ভালোবাসার শেষ শুধু আমার আর সীমান্তের কষ্টের কারণ, সে ভালোবাসাকে বুকে ধরে সীমান্ত থেকে দুরে চলে যাচ্ছি। জানি হয়তো তাকে ভুলতে পারবো না। কিন্তু আমার জন্য তাকে নতুন করে সমস্যায় পড়তে হবে না।

শুক্রবার সকালে ব্যাগ গুছিয়ে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলাম। দেখালাম সীমান্ত বাসায় এসে সোজা আমার রুমে চলে আসলো। কোন কথা না বলে চুপচাপ আমার পাশে বসলো। আমার মুখ থেকে কোন কথা বের হচ্ছে না। আমি তাকিয়ে আছি তার দিকে। সীমান্ত মুখ খুলল,
-তোমার জন্ম দিন ৯ ই ডিসেম্বর। তোমার উচ্চতা ৫.১০”। তোমার পছন্দের মুভি, পছন্দের রঙ, পছন্দের খাবার। সব গুলো ফেসবুকে দেয়া আছে। তাই না?
আমি বুঝতে পারছিলাম না সীমান্ত কি বুঝাতে চাচ্ছে। বললাম হা। কিন্তু কেন?
তোমার এই সব জিনিষ গুলোর সাথে অবাঞ্ছিতর মিল।
আমার গ্রামের বাড়ির ঠিকানা তুমি আর রফিক ভাই ছাড়া আর কেউ জানে না। এমনকি অবাঞ্ছিত ও জানে না। সুতরাং রফিক ভাই অপরিচিতের পরিচয় দিয়ে আমাদের টাকা পাঠাবে না।
তাহলে বাকি রইলে তুমি।
আমি বুঝতে পারছি সীমান্ত বুঝে গেছে সব। ধরা পড়ে চুপ করে রইলাম।
-কি কথা বলছ না কেন? জীবন ভাইয়া আমার দিকে তাকাও। কেন এমনটা করেছো আমার সাথে। কেন তুমি আমার সব বিপদে দূর থেকে আমার হাত ধরে থাকতে। আর আজ কেনই বা দূরে ঠেলে দিয়ে চলে যাচ্ছ?
-আমার চোখে পানি টলমল করছে, বললাম, কারণটা তুমি নাই বা জানলে। তোমার দুখের দিনে তোমার যতটা উপকার করেছি, তার চেয়ে অপকার করেছি বেশি। আর কেন করেছি কোন দিন ও বলতে চাই না। শুধু একটা কথা বলার আছে, তুমি সারা জীবন ভালো থেকো। আর এক দিন তোমাকে অনেক বড় মানুষ হিসাবে দেখতে চাই।
-দুঃখে যাদের জীবন গড়া তাদের আবার দুঃখ কিসের। তাই সুখের লোভের আশায় নিজেকে কোন দিন ব্যস্ত রাখার প্রত্যয় ছিল না, আজ ও নেই।
জীবন ভাইয়া আমি আসি। তুমি ভালো থেকো।
আচ্ছা যাবার আগে একটি বারের জন্য আমি কি তোমাকে জড়িয়ে ধরতে পারি?
আমি কিছু না বলে হাত দুইটা বাড়ীয়ে দিলাম সীমান্তর দিকে। সে আমাকে জড়িয়ে ধরে আছে। এই প্রথম বারের মত তাকে জড়িয়ে ধরলাম। বুঝতে পারলাম তার শরীর কাঁপছে, চোখের পানি আমার জামা ভেদ করে গায়ে লাগছে। আমার চোখের পানি ও আর ধরে রাখতে পারলাম না। দুজনে কাঁদছি, পাওয়া না পাওয়ার হাহাকার যেন দুজনকে ভাসিয়ে দিচ্ছে চোখের জ্বলে।
সীমান্ত বলল, আমাকে এত ভালবাসতে তারপর ও কেন বলতে পারলে না?
-কারণ তুমি ভালোবাসায় বিশ্বাস করতে না তাই। আর আমি বললে যদি তুমি আমাকে দূরে সরিয়ে দাও। সেই ভয় কাজ করতো সব সময়।
-আরে আমি ও তো তাই জানতাম। কিন্তু তুমি তোমার ভালোবাসা দিয়ে, আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছ। সত্যিকার ভালোবাসা কাকে বলে।
আজ বুঝতে পারলাম আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি।
কথাটা শুনে আর স্থির থাকতে পারলাম না। তার কান্না জড়ানো মুখটা আমার মুখের সামনে ধরে, চুমুতে ভরিয়ে দিলাম তাকে। সে আমাকে সায় দিচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছি যেন অন্য কোন ভুবনে।
দরজায় শব্দ শুনতে পেয়ে ছিটকে পড়লাম দুজন দু দিকে। মা বলল কি রে তোর গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। কখন বের হবি? মাকে বললাম, ড্রাইভারকে চলে যেতে বল। আমি আজ যাচ্ছি না।
মা রুম থেকে বের হয়ে যাবার পর, দরজা লাগিয়ে দিলাম। সীমান্তকে জড়িয়ে ধরে বিছানায় পড়লাম।
সে আমার কোলে ভীতর বাচ্চাদের মত মাথা গুঁজে আছে। বললাম,
একটা গান ধরো না।
-সে গাইতে লাগলো…।
“আমার হিয়ার মাঝে লুকীয়ে ছিলে, দেখতে আমি পাইনি,
তোমায়, দেখতে আমি পাইনি”।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.