যাপিতজীবন

লেখকঃ হোসেন মাহমুদ

ভরা পূর্ণিমায় চুরি চাট্টিখানি কথা নয়। চুরি করার মোক্ষম সময় ঘোর অমাবস্যা। রহিম মিয়ার মোরগ চোর গুলো মটেও পেশাদার নয়। কালে ভদ্রে পাটোয়ারী বাড়ীর কাঁঠাল নয়তো মাঝি বাড়ীর খেজুর রস ঠিকই চুরি করে তারা। তবে সেইটা বাজারে চালান করে পয়সা কামানোর ছুতোয় নয়। শখের বসে কিংবা কারো উপর রেগে গিয়ে উচিৎ শিক্ষার নিদর্শন হিসাবে এই চুরি। চোর দলের নেতৃত্বে আছে তুহিন। ৫ সদস্য বিশিষ্ট এই দলে আরও যারা আছে তমাল, মহিন, জিতু এবং রুমন। তারা সবাই একই স্কুলে নবম শ্রেণীতে পড়ে। ওরা ১১ জন ছবির মত ক্লাসের সবাই তাদের ডাকে ওরা ৫ জন। ঘুমানোর সময় ছাড়া সুপার গুলুর মত এক অন্যর লেজ ধরে সারাক্ষণ ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকা এদের স্বভাব। আজকে রহিম মিয়ার মোরগ চুরিটা সখের বশে নয়, রহিম মিয়াকে উচিৎ শিক্ষা দেয়াই তুহিন বাহিনীর মূল উদ্দেশ্য। কালকের কথা গুলো মনে পড়তেই রাগে তুহিনের শরীর জ্বলে উঠে। দাঁত দিয়ে নিচের পাটি ঠোঁট কামড়ে ধরে বলে, ব্যাটা বদের হাড্ডি বাড়ী বয়ে মায়ের কাছে নালিশ? এইবার মজা বুঝবা। যদিও মাকে সে বিন্দু মাত্র ভয় পায় না। মাঝে মধ্যে মা নারিকেল পাতার শলা নিয়ে তেড়ে আসে তুহিনকে মারার জন্য। মাকে কি ভাবে বশে আনতে হয় সেই বিদ্যা তুহিনের ভাল করেই জানা। একটা বাড়ি গাঁয়ে পড়ার সাথে সাথে মাকে সাপের মত পেঁচিয়ে ধরে তুহিন। মাকে জড়িয়ে ধরা মানে মায়ের রাগ পানি। তারপর তাকে আর পায় কে? এক দৌড়ে খালপাড়। কিন্তু যত ভয় তার শাকির ভাইয়াকে নিয়ে। মা নিজে না মারতে পেরে সুদে আসলে সব নালিশ তোলা রাখে শাকির ভাইয়ার জন্য। কলেজ ছুটিতে শাকির বাড়ীতে আসা মানে তুহিন রাতা রাতি মাওলানা মুন্সী। ভাইয়ার সামনে সে ভাঁজা মাছ উল্টে খাওয়ার মত ক্ষমতা রাখে না। তারপর ও ভাইয়ার মার থেকে পিঠ বাঁচাতে পারে না সে। এই যে এখন তারা মোরগ চুরি করছে, ঠিকই সকাল বেলায় এই নিয়ে বিচার যাবে তুহিনের মায়ের কাছে। এই জন্য সে মটেও চিন্তিত নয়, এই গ্রামে কারো গাছের পাতা খানিকটা জোরে নড়লেও এর দায়ভার তুহিনকেই নিতে হয়। গ্রামের মানুষকে জ্বালিয়ে খাওয়ার অতি সুনাম তুহিনের নামের সাথে পাকাপোক্ত ভাবেই মোহর এঁটে দিয়েছে গ্রামবাসী।

ঘড়িতে সকাল নয়টা বেজে ত্রিশ মিনিট। ঠিক এই সময়টায় তুহিনবাহিনী স্কুলে আসে। ক্লাস শুরু দশটা বাজে কিন্তু তাদের আসতে হয় আধাঘণ্টা হাতে রেখে। ক্লাসের প্রথম বেঞ্চে তাদের যায়গা বরাদ্দ থাকে সবসময়। ভুলেও কেউ সেই বেঞ্চে বসে না। যদি কেউ বসে পড়ে তাহলে তার কপালে শনির দশা অবধারিত। এই আধাঘণ্টা সময় জুড়ে সবাইকে ভয় ভৃতি দেখিয়ে তারা পুরো ক্লাস নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখে। যেমন কেউ ভাল কোন খাওয়ার নিয়ে এলে ওতে ময়লা হাতে চেখে দেখা, কোন মেয়ে নূতন জামা পড়েছে, তার জামায় কলমের কালি ঢেলে মজা নেয়া। আর একটা কাজ তুহিন কখনো করতে ভুলে না, মনিরকে খ্যাপানো।

পুরো নাম মনিরুল ইসলাম মনির। তুহিন বাহিনী তাকে মনিরা আপু বলে ডাকে। ফর্সা গোলাকার মুখ, চিকন সেফের শরীরী গঠন। আর কথা বার্তায় মেয়েলি হওয়ার তাকে ক্ষেপীয়ে মজা পায় তুহিন। মনির সবসময় তাদের অত্যাচার মুখ বুঝে সহ্য করে যায়। এখন অবধি কোনদিন স্যারদের কাছে নালিশ করেনি সে। সারাদিন অপমান সহ্য করে রাতে পড়ার টেবিলে বসে চোখের জলে বই গোসল করানো তার কাজ। কিন্তু যে যাই বলুক তার লক্ষ্য থেকে সে পিছু হটতে নারাজ। এই জন্য ক্লাসের সবচেয়ে ভালো ছাত্রের খেতাম মনিরের। আর সবচেয়ে খারাপ ছাত্রের খ্যাতিনামা কপালে জুটিয়েছে তুহিন। খারাপ ছাত্রের তকমা গায়ে ঝুলিয়ে ঘুরতে বিন্দু মাত্র লজ্জা লাগে না তার। তুহিনের কথা, সবাই যদি ভাল ছাত্র হয়, তাহলে খারাপ হবে কে? এই প্রসঙ্গে তার আরও একটা সুস্পষ্ট বক্তব্য আছে, এতো বিদ্যা দিয়ে হবেটা কি শুনি? যতই পড়াশুনা করে বিদ্বান কিংবা বিদ্যাসাগর হই না কেন সব কিছু রেখে এক দিন তো মরেই যাবো, তখন এই বিদ্যা মাটির সাথে মিশে যাবে। আর বিদ্বান না হয়েও মরতে হবে। তারমানে বিদ্বান আর বিদ্যাহীন সমান কথা। তার কথা শুনে সবাই হাসে কিন্তু তার যুক্তি খণ্ডন করতে কেউ সামনে এগিয়ে আসে না।

তুহিন বাহিনী মনির কে ঘিরে ধরেছে। তার ব্যাগ টেবিলের নিচে চলে গেছে ইতিমধ্যে। তমাল মনিরকে বলে,
-মনিরা আপু মনিরা আপু, তুমি দুধ ভাত খাবে নাকি সাগর কলা খাবে?
মনির চুপ করে থাকে। সে চুপ করে থাকতে দেখলে তুহিনের রাগ বেঁড়ে যায়। আর তখনই কলমের গুঁতা খেতে হয় মনিরকে। তুহিন মনিরের কাছে এসে প্রতিদিনের মত কলমের গুঁতা দিয়ে বলে, ঐ তুই কাল থেকে কামিজ পড়ে আসবি। ছেলেপেলের শার্টে তোকে বেমানান লাগে। মনির ছল ছল দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকে তুহিনের দিকে। তুহিন তার মুখের চিবানো চুইংগাম লেফটে দেয় মনিরের চুলে। চুইংগাম হাতে ধরে ভ্যাবাচেকা খাওয়ার মত তাকিয়ে থাকে মনির। এ দিকে তুহিন বাহিনী হা হা করে আসতে থাকে। ঠিক তখনি ক্লাসে স্যার ঢুকে।

স্যারকে দেখে ক্লাসের সবাই চিড়িয়াখানার জন্তুর মত পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখতে লাগল। এই স্যারের এইটাই প্রথম ক্লাস। কাল সবাই নূতন স্যার আসা নিয়ে কানা ঘষা করছিল। এই স্যার নাকি জাঁদরেল টাইপের, এই পর্যন্ত সাত সাতটি স্কুল তাকে ট্র্যান্সফার করেছে তার বদ স্বভাবের জন্য। তার মেজাজ নাকি রাজা বাদশাহদের মত যাকে বলে শাহী মেজাজ। সবার ফিসফিসানি শুনে তুহিন বলেছিল, আরে শিক্ষকের মেজাজ হবে নদীর পানির মত শান্ত কোমল, সমুদ্রের গর্জনের মত উত্তাল হবে কেন? এই নূতন স্যার নাকি আগে এক ছাত্রকে পিটিয়ে আধমরা করে ফেলেছিল। এই জন্য দুইদিন থানা হাজতে ও ছিল। তুহিন কথা গুলো ভাবতে ভাবতে চিন্তিত হয়ে উঠল। কারণ এই স্যার আবার ইংরেজি পড়াবেন। ক্লাসের সবাই জানে ইংরেজিতে সে ভীষণ দুর্বল। কত রকমের খেলার প্যাঁচ তার মাথায় ঢুকে শুধু এই ইংরেজির হরফ গুলো ছাড়া।

নূতন ইংরেজি স্যারকে দেখে হৈ হৈ করে উঠল বাম পাশে থাকা মেয়ে গুলো। অরুণা ইতিমধ্যে তার বেস্ট ফ্রেন্ড শাহেলা কে ফিস ফিস করে বলে দিয়েছে, এই রকম হ্যান্ডসাম মানুষ সে জীবনে দেখেনি। সিনেমার নায়ক দেবও তার কাছে চুনাপুঁটি ছাড়া আর কিছু নয়। আসলে ইংরেজি স্যার দেখতে সত্যি প্রিন্সের মত। লম্বায় পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চি। চওড়া বুক, মেদহীন পেটানো শরীর, চুল গুলো জেল দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে। ফর্সা তার গায়ের রঙ, কমলার কোষের মত লাল ঠোঁট। পরনে ব্লু ট্যাঁই ব্লেজার। চোখ দুটো হাস্য-উজ্জ্বল আকাশের নীল। তাকে দেখতে গ্রীক দেবতার মত লাগছে। যদি ও অরুণা এই ব্যাপারটা নিয়ে কিছুটা সন্দিহান আছে। গ্রীক দেবতা কেমন ছিল সে জানে না, গত ঈদে তার ছোট মামা একটা বই দিয়েছিল তাতে গ্রিক পুরাণ সম্পর্কে সে জেনেছে। অরুণা শাহেলা কে বলে, জীবনে বিয়ে আমি করবো না তবে এই ইংরেজি স্যারে প্রস্তাব দিলে ফেলবো না। অরুণার কথা শুনে শাহেলা মুখ বাঁকিয়ে বলে, ঈশ ঢং! এ দিকে তুহিন নূতন স্যারের দিকে তাকিয়ে থাকলেও তার শরীর দেখতে কেমন তা নিয়ে তার মাথা ব্যথা নাই। তার দাদীর ভাষ্য অনুযায়ী, ছেলে মানুষ ফর্সা কিংবা কালোতে কি? ব্যাটা ছেলে তো ব্যাটা ছেলেই। ছেলেদের শরীর নিয়ে খুঁটাখুঁটি করবে মেয়েরা। এইটাই তাদের স্বভাব। কিন্তু স্যারের চোখের উপরে বার বার দৃষ্টি যাচ্ছে তুহিনের। একটা মানুষের এত সুন্দর চোখ হয় কি করে? তাদের ইতিহাসের রফিক স্যার মিশর নিয়ে আলোচনার সময় বলেছিল, পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দর চোখ ছিল ক্লিওপেট্রার। তুহিনের মনে প্রশ্ন জাগে আচ্ছা ক্লিওপেট্রার চোখ কি এই স্যারের চোখের চেয়ে বেশী সুন্দর ছিল?

ক্লাসে পিনপড়া নীরবতা। সবাই স্যারকে আর স্যার সবাইকে দেখছে। স্যার নিজ থেকে তার পরিচয় দিলেন,

আমার নাম আরমান হোসেন খান
বাড়ী ঢাকার উত্তরায়
পড়াশুনা করেছি ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ইংলিশে।
আজ থেকে আমি তোমাদের ইংরেজি পরাবো।
প্রথমে একে একে সবাইর পরিচয় দাও।

কথা গুলো বলার সময় আরমানের নাক সাপের মত ফোঁস ফোঁস করে ফুলছিল। মনে হচ্ছে কারো সাথে জগরা করছিল সে। স্যারের নাক ফুলানো দেখে সবাই বুঝতে পেরেছে স্যারের ব্যাপারে আগে যা শুনছে সবই সত্যি। একে একে সবাই নাম আর রোল নাম্বার বলে যাচ্ছে আরমানের সামনে। শুধু অরুণা কিছু বলতে পারল না। তার মুখে কথা সরছে না। অনেক চেষ্টা করে ও সে তার নাম বলতে পারল না। অবশেষে শাহেলা তার নাম রোল নাম্বার বলে দেয়। অরুণার অবস্থা দেখে আরমানের ইচ্ছা করছিল বেত দিয়ে মুখের উপরে কয়েকটা বেতের বাড়ি বসিয়ে দিতে। আরে সে বাঘ না ভাল্লুক তাকে দেখে মুখের বোল চলে যাবে কেন? প্রথম দিন বলে সে ব্যাপারটা হজম করে নিল। মনির দাড়িয়ে নাম বলতে যাবে এমন সময় তুহিন ফিস ফিস করে বলে, নাম মনিরা বেগম। কথাটা জোরে না বললেও আরমানের কানে ঠিকই পৌঁছে। আরমান বলে, ফিস ফিস করে কে কথা বলেছে? আরমানের কথায় সবাই চুপ করে আছে। আরমান ওরা পাঁচ জনের দিকে তাকিয়ে বলে, যদি সাহস থাকে দাড়িয়ে বল যে আমি বলেছি। তা না হলে এই বেঞ্চের সবাই এর জন্য বেতাঘাত অবধারিত। তুহিন সিংহর মত বুক ফুলিয়ে বলে, আমি বলেছি। কি করবেন? তাকে আমরা সবাই মনিরা বেগম অথবা মনিরা আপু বলে ডাকি। তাই বললাম। পিচ্চি একটা ছেলের মুখে এত তেজ দেখে আরমান জ্বলে উঠল। তারপর ও সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইল। প্রথম দিন বলে কথা। তুহিনের দিকে তাকিয়ে আরমান বলে তোমার নাম কি? তুহিন জবাব দিল, আবিদুল ইসলাম তুহিন, রোল একশ আট, বাড়ী মোহন পুর। থানা… বলতে যাবে এমন সময় আরমান তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে, আমি শুধু তোমার নাম জিজ্ঞাস করেছিলাম তোমার ঠিকানা নয়। ভবিষ্যতে যা জিজ্ঞাস করবো শুধু তাই উত্তর দিবে। বেশী নয় কম ও নয়। এখন টেবিলে উঠে কান ধর। তুহিন অবাক হয়ে বলে, মানে?
আরমান বলে, মানে সোজা তুমি মনিরের নাম নিয়ে ব্যঙ্গ করেছ তাই তোমার শাস্তি পুরো ক্লাস কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকা।

যদিও কান ধরে দাড়িয়ে থাকার শাস্তি তুহিনের জন্য নিয়মিত ব্যাপার। কম বেশী সব স্যারই তাকে কান ধরিয়ে ক্লাস থেকে বের করে দেয়। কিন্তু তাই বলে নতুন একটা স্যার তাকে কান ধরতে বলছে। ব্যাপারটা সহজ ভাবে নিতে পারছে না তুহিন। মুখ থেকে আরও কিছু বলতে যাবে এমন সময় আরমান বলে, নো নো আর একটি শব্দ ও না। যা বলছি তাই কর। তুহিন কান ধরে দাঁড়িয়েছে ঠিকই কিন্তু ভিতর ভিতর রাগে জ্বলছে। আর চিন্তা করছে এই অপমানের প্রতিশোধ কি ভাবে নেয়া যায়।
সবার পরিচয় শেষে আরমান বলল, আজকে থেকে ক্লাসে কাউকে ব্যাঙ্গ নামে ডাকবে না। ডাকলে তাকে শাস্তি পেতে হবে। তুহিন দাঁড়ানো অবস্থায় বলে, স্যার আমাদের কি দোষ এই মনিরা বেগম মেয়েদের মত। কথা বার্তা, চালচলন, সে যে ভাবে হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলে আর কোমর দুলীয়ে হাটে, তাকে মেয়ে না বললে ছেলেদের অপমান হবে। তুহিনের কথা শুনে আগুনের ভীতর ঘি ঢালার মত অবস্থা আরমানের। হাতের কাছে ছক আর ডাস্টার ছিল, ইচ্ছা করছে দুইটাই ছুঁড়ে মারে তুহিনের গায়ে। রাগে সে হাত কচলাতে লাগলো, ডাস্টার নয় সাদা খৈ মাটিটাই মেরে দিল তুহিনের উপর। ওখান থেকেই দাঁড়িয়ে আরমান বলে,

তুমি যদি আরেকটা শব্দ উচ্চারণ কর তাহলে ক্লাস থেকে বের করে দিব। তারপর সবার উদ্দেশ্য বলে, তোমরা মনিরকে মনিরা বেগম বলবে না। কারণ সে তোমাদের মত স্বাভাবিক একজন মানুষ। তোমাদের ভীতরে এমন অনেক মেয়েও আছে যাদের আচার আচরণ ছেলেদের মত। তোমরা কি তখন তাকে ছেলে ছেলে বলে ক্ষ্যাপাও? বড়জোর তাকে নিয়ে গর্ব করে বল, বাহ পুরুষের শক্তি নিয়ে জন্মিয়াছে বাঘিনী একটা। কিন্তু ছেলের মাঝে মেয়েলী ভাব দেখেই সবাই তার পিছে পড় এইটা ঠিক না। তোমরা কি জানো সে যে মেয়েদের মত চলে এতে তার কোন দোষ নাই। এইটা হতে পারে হরমোন জনিত সমস্যা কিংবা ছোটবেলা থেকে সে মেয়েদের সঙ্গ পেয়ে নিজের অজান্তেই তাদের অনুকরণ করছে। তোমরা যখন তাকে মেয়ে বল কখনো কি চিন্তা করেছ ব্যাপারটা কতটা অপমানের? এতে করে তার মানসিকতার উপর প্রেশার পড়তে পারে। তাই আজকে থেকে কাউকে এই ধরনের কথা বলবে না। সবার নিজস্ব একটা নাম আছে তাকে সেই নামেই ডাকবে। কার চালচলন কেমন তা পর্যবেক্ষণ করা তোমাদের কাজ নয়। এইখানে এসেছ পড়াশোনা করতে, কাউকে কটাক্ষ করতে নয়। আশা করি বুঝতে পেরেছ। কথা গুলো বলেই কারো প্রতিক্রিয়ার উপরে নজর না দিয়ে আরমান বই খুলে বসে।

স্কুল কর্তৃপক্ষ থেকে আরমানকে থাকার যায়গা দেয়া হয়েছে। স্কুলের পাশেই একটা বাড়ীতে। স্কুল থেকে পায়ে হেঁটে দুইমিনিটে পৌঁছানো যায়। এই প্রথম আরমান ঢাকার বাহীরে আসছে। গ্রামের পরিবেশে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে কিনা তার সন্দেহ আছে। তার মা গ্রামে আসতে দিতে চায়নি, কিন্তু আরমানের বাবা দাঁড়িয়েছে তার পাশে। তিনি বলেন, এই বয়সে ছেলে চাকরী করবে, চাকরীর জন্য দেশ বিদেশ ঘুরবে এইটাই স্বাভাবিক, কেন তুমি ছেলেকে ঘরকুনো বানাতে চাঁচ্ছ? শেষে বাধ্য হয়ে মা রাজি হল। কিন্তু তার বাবা নিজেও জানে আরমানের ঘরকুনো স্বভাব আছে। এখন হয়তো সে এই ব্যাপারটা পরিহার করেছে। কিন্তু একটা সময় ছিল, আচ্ছা সেই ব্যাপার সময়মত পাঠকের সামনে তুলে ধরা হবে। এখন যাওয়া যাক আরমানের নূতন বাড়ীতে।

আরমান অভ্যাসগত ভাবে চায়ের দাশ। ভাত হোক না হোক চা তার চাই এ চাই। নূতন বাড়ীতে এসে জামা কাপড় খোলার আগে জয়নালকে বলল চায়ের পানি বসাতে। ও জয়নালের কথা তো বলা হয়নি। জয়নাল স্কুলের দপ্তরি। স্কুল ম্যানেজিং কমিটি থেকে আরমান কে সাহায্য করার জন্য তাকে পাঠিয়েছে। চা আর সিগারেট নিয়ে আরমান পুরো বাড়ীটা ঘুরে ঘুরে দেখছে। চারদিকে গাছগাছালিতে ঘেরা, মাঝখানে দুইরুমের ছোট্ট একটা আধপাকা ঘর। বাড়ীর সামনে একটা বিশাল পুকুর। পুকুরপাড় থেকে বাতাবী লেবুর ঘ্রাণ আরমানের নাকে ভেসে আসছে। আরমান পুকুরটা নিয়ে কিছুটা দ্বিধা দ্বন্দ্বে আছে এইটা দিঘি না পুকুর? এর আগে সে এত বড় পুকুর দেখেনি। পুরোবাড়ীটায় আরমানের সবচেয়ে বেশী পছন্দ হল পুকুর ঘাটটা। শানবাঁধানো পুকুর ঘাঁটে বসে দক্ষিণা হাওয়া, মাথার উপরে এক ফালি পূর্ণ চাঁদ, চাঁদের কিরণে দীঘির পানিতে বাতাসের ঢেউএ মুক্তোর নাচানাচি, আরমানের হাতে থাকবে গরম চায়ের মগ আর ঠোঁটে জ্বলবে সিগারেট। এমন দৃশ্য সে প্রতিনিয়ত চিন্তা করত। এইখানে এসে তার কল্পনার বাস্তবচিত্র চিত্রায়ন হবে ভেবে ঠোঁটের কণে এক ঝলক হাসি উপচে উঠল।

চার দিকে সন্ধ্যা মিলিয়ে গেছে অনেকক্ষণ আগেই। হেমন্তের মাতাল হাওয়া ও বইছে, শুধু একখানি চাঁদের অনুপস্থিতিতে আরমান পুকুর ঘাঁটে গিয়ে বসল। পুকুরটার তিন দিকে গাছ গাছালিতে পূর্ণ। অনেক গুলো বাঁশঝাঁট দেখা যাচ্ছে। বাঁশের হলদেটে চিকন পাতা হাওয়ায় উড়িয়ে নিয়ে পুকুরে ফেলছে। বাঁশঝাঁটের দিকে তাকাতেই আরমান চমকে উঠে।
একটা মানুষের ছায়া মূর্তি দেখা যাচ্ছে। কে হতে পারে এই রাতে বাঁশঝাঁটে? ভয় জিনিষটা আরমানকে ভয় পায়। তার মাঝে ভীতির বলাই নাই বললেই চলে। আরমান চায়ের কাপটা ঘাটে নামিয়ে রেখে সিগারেট হাতে এগিয়ে গেল বাঁশঝাঁটের দিকে। কাছে গিয়ে দেখল আজকের ক্লাসের ছেলেটা দাঁড়িয়ে আছে। কি যেন ছিল নামটা? আরমান মনিরের নাম মনে করতে চেষ্টা করল। মনে পড়ায় আরমান কিছুটা অবাক হয়ে যায়, এই রাতে মনির বাঁশঝাঁটে কি করে?

আরমানঃ মনির তুমি এইখানে কি কর?
মনির চুপ করে আছে। তার চোখে মুখে কৃতজ্ঞতার সুর। আবেগে সে কথা বলতে পারছে না। তার এই ১৫ বছর জীবনে প্রথমবারের মত কেউ তার জন্য প্রতিবাদ করেছে। ব্যাপারটা যতবার ভাবছে ততবারই মনির আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ছে। সবার সামনে স্যারকে ধন্যবাদ দিতে পারেনি, তাই এই সন্ধ্যাবেলায় ধন্যবাদ দেয়ার জন্য ছুটে আসে স্যারের বাড়ী।
আরমানঃ কথা বলছ না কেন?
মনিরঃ স্যার থ্যাংক ইয়উ সো মাচ।
আরমানঃ থ্যাংকস কেন?
মনিরঃ আজকে আমার ব্যাপারে সবার সামনে যা বললেন তার জন্য।
আরমানঃ ওহ আচ্ছা। যাইহোক এইটা ব্যাপার না। রাত হয়ে যাচ্ছে তুমি বাড়ী যাও কাল স্কুলে কথা হবে।
মনির থ্যাংকস বলে কয়েক পা এগিয়ে আবার দাঁড়িয়ে যায়। আরমান জিজ্ঞাস করে একা যেতে ভয় করছে?
মনিরঃ না স্যার ভয় করছে না। কিন্তু আপনাকে একটা কথা বলার ছিল। স্যার ওরা পাঁচজন সুবিধার নয়। আপনাকে যে কোন মুহূর্তে বিপদে ফেলতে পারে। আপনি এইখানে নূতন, তাই সচেতন করছি। প্লিজ কিছু মনে করবেন না।
আরমানঃ পাঁচজন বলতে?
মনিরঃ আপনি যাকে আজকে কানে ধরিয়েছেন সে এবং তার সাথে আরও চারজন আছে। তারা সবসময় এক সাথে থাকে আর সবার সাথে ফাজলামি করে। ভয় দেখায়।
আরমানঃ কি নাম যেন ছেলেটার।
মনির চুপ করে থাকে। তুহিনের নামে নালিশ করতে গেলে তার ভীতরে যেন কেমন লাগে। তুহিনের প্রতি মনিরের কোথায় যেন একটা দুর্বলতা আছে। কিন্তু সেইটা কি বা কেন? মনির জানে না। শুধু জানে তুহিন তাকে নিয়ে যত তামাশাই করুক না কেন তার উপরে মনির রাগ করতে পারে না। রাগ করলেও কিছুক্ষণ পর সেই রাগ মিলিয়ে যায়। মাঝে মাঝে সে নিজেকে প্রশ্ন করে কেন এমন হয়? মনির উত্তর খুঁজে পায় না। আরমানের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে মনির দেরী হয়ে যাচ্ছে বলে হাঁটা ধরল।

আরমান আবার ঘাঁটে গিয়ে বসে। দেরীতে হলেও অবশেষে চাঁদের দেখা মিল্লল। কিন্তু কালো মেঘের কারণে চাঁদের আলো ভিড়তে পারছে না। হিমশীতল হাওয়া এসে আরমানের শরীরে লাগছে। এই হাওয়ার একটা নিজস্ব গন্ধ আছে। একটা মাদকতার আসক্তি আরমানের ভিতরটা ছুঁয়ে যায়। সিগারেটের আগুন গোড়ালিতে ঠেকেছে সেই দিকে তার কোন খেয়াল নেই। আরমান শেষ টানটা মেরে আকাশের দিকে তাকিয়ে মেঘ দেখছে। এই মেঘমালার সাথে আরমান সব সময় নিজের জীবনের সাদৃশ্য খুঁজে বেড়ায়। মুখ থেকে ধোঁয়া বের করে আরমান বলে,
ঘৃণা করি কাঞ্চন, যেমন তোমরা ঘৃণা করো ভগবানকে।
বলো তবে, অদ্ভুত অচেনা মানুষ, কী ভালোবাসো তুমি?
আমি ভালোবাসি মেঘ, চলিঞ্চু মেঘ, ঐ উঁচুতে…ঐ উঁচুতে…
আমি ভালোবাসি আচার্য মেঘদল।

শার্ল বোদলেয়ারের লাইন কটা বলতে বলতে আরমানের শরীর শিহরিত হয়ে উঠল। যেন এক ছায়ামূর্তি এসে দাঁড়াল আরমানের পাশে। আরমান জানে এইটা পার্থিব নয়, কোন এক অপার্থিব ছায়ায় নিজের কল্পনার রঙ ছড়িয়ে প্রিয় কারো সান্নিধ্যে থাকার ক্ষুদ্র প্রয়াস। আরমান কাপ হাতে উঠে দাঁড়ায়।

জয়নাল ভালই রান্না করেছে। বড় কাতল মাছ ভুনা, শাজনা দিয়ে মসূরের ডাল আর পুঁই শাক ভাঁজি। লক্ষ্মী বউ যেমন স্বামীকে ভাত বেড়ে দিয়ে হাত পাখা নিয়ে বাতাস করে, জয়নালও তাই করছে। জয়নালের কাণ্ড দেখে আরমানের অস্বস্তি লাগছে। তাকে নিষেধ করার পর ও সে দাড়িয়ে দাড়িয়ে আরমানের খাওয়া দেখেছে। আরেকটা জিনিষ আরমানের নজরে পড়ল, জয়নাল কথা খুবই কম বলছে। এই গরীব শ্রেণীর মানুষ গুলো দুই রকম হয়। এক, অতিরিক্ত কথা বলে কান জ্বালা ফালা করে দেয়। দুই, অতিরিক্ত চুপচাপ। জয়নাল দ্বিতীয় শ্রেণীর। একদিনে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। পরে তার ব্যবস্থা নিতে হবে বলে আরমান খাওয়াতে মন দিল।

ঘুমাতে যাওয়ার আগে চা বা কফি খেলে অনেকের ঘুম বাড়ী ছেড়ে পালায়। আরমানের বেলায় তার উল্টো, ঘুমানোর আগে চা না খেলে তার ঘুম আসে না। জয়নাল চলে যাওয়ার আগে আরমানকে চা করে দিয়ে গেছে। জয়নাল এক বার বলছিল রাতে যদি একা থাকতে ভয় পান আমি থাকতে পারি আপনার সাথে। আরমান তাকে না করে দিয়েছে। চা নিয়ে আরমান আবার পুকুর ঘাটে গিয়ে বসল। এক বসায় দুইটা সিগারেট শেষ করে ঘরে ফিরল। মোবাইল ঘড়িতে সময় দেখল রাত এগারটা বিশ। সকাল ৮ টার দিকে রেডি হয়ে আরমানকে স্কুলে যেতে হবে। তাই বারটার আগে ঘুমানোর দরকার। আরমানের চায়ের যেমন অভ্যাস তেমনি ঘুমাতে যাওয়ার আগে বই পড়ারও অভ্যাস। কিছু একটা না পড়লে তার ঘুম আসতে কষ্ট হয়। ঢাকা থেকে আসার সময় বাসে বসে সমরেশ মজুমদারের “কালবেলা” পড়ছিল সে। আগেও কয়েকবার পড়েছিল বইটা, নূতন কোন বই হাতের কাছে না পাওয়ায় কালবেলা উঠিয়ে নিল আরমান। আর কিছু কিছু বই কখনো পুরাণ হয় না। কালবেলা তেমনই একটা বই। আরমান যতবার বইটা পড়ে ততবার অনিমেষকে নূতন ভাবে আবিষ্কার করে যেমন “সাতকাহন” পড়লে দীপাবলিকে।

বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে আরমানের চোখ লেগে এল। আরমান যে বাড়ীটায় আছে তার চার দিক পাকা দেয়ালে ঘেরা, উপরে টিনের ছানি দেয়া। উপরে টিন দেখে আরমান অনেক খুশী হয়েছে, টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ তার ভীষণ প্রিয়। তাই বলে টিনের ছালার জন্য এই মধ্যে রাতে ইট পাটকেলের শব্দে তার ঘুম ভাঙবে সে ভাবেনি। আরমান খরগোশের মত কান খাঁড়া করে শুনছে কেউ তার বাড়ীতে ঢিল মারছে। মাঝে মাঝে শিয়ালের মত ডাক আসছে। আরমান বুঝতে পারছে তাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা চলছে। যেহেতু আরমান ভুতে বিশ্বাস করে না সুতরাং যারা ভয় দেখাতে এসেছে তাদের জন্য অতি দুঃখের সংবাদ। আরমান হাতে টর্চ লাইট জ্বালিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে আসল। ভাগ্যিস আসার সময় মা লাইটটা ব্যাগে ভরে দিয়েছিল। আরমানের দরজা খোলার শব্দ শুনে কয়েকজন বাঁশঝাড়ের দিকে দৌড়ে পালিয়ে গেল। আরমান পুকুর ঘাট অবধি এসে কিচ্ছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ঘরে ফীরে গেল। সকালে ক্লাস তাই এই মধ্যরাতে তামাশা খাঁড়া করার ইচ্ছা ছিল না বলে ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে আরমান।

সকাল সাড়ে নয়টা।
প্রতিদিনের মত তুহিন তার দল বল নিয়ে ক্লাসে হাজীর। আজকে ও তাদের মুখ থেকে রেহাই পায়নি মনির। কেউ প্রতিবাদ না করলেও আজকে গলা ছাড়ার সাহস দেখায় অরুণা। সে বলে, কাল আরমান স্যার এত কিছু বলল তারপর ও তোদের আক্কেল হয়নি? মনিরকে ছেড়ে দেয় নয়তো স্যার আসলে আমি বিচার দিব। অরুণার সাহসিকতার তারীফ করতে হয়। এতদিন সবাই মুখ বুঝে তুহিনের অত্যাচার সহ্য করেছে কেউ মুখ তো দূরের কথা চোখ তুলার সাহস পর্যন্ত করেনি। আর আজকে অরুণা তো রীতিমতো দুঃসাহসিকতা দেখিয়ে দিল। তুহিন অরুণার কথা শুনে বাংলা ফ্লিমের ভিলেনর মত হা হা করে হেঁসে উঠে। তারপর অরুণার কাছে গিয়ে তার ওড়না ধরে টান দেয়। ঠিক তখনি আরমান স্যার ক্লাসে ঢুকে।

আরমান কে দেখে সবাই ভয়ে চোখ কপালে তুলে নেয়। শুধু তুহিনের মাঝে ভয়ের কোন চিহ্ন নেই। সে গিয়ে তার যায়গায় বসতে যাবে এমন সময় আরমান তুহিনকে দাড়িয়ে থাকতে বলে। তুহিনকে দাড়িয়ে থাকতে বলে আরমান রোল নাম্বার কাউন্ট করে খাতাটা টেবিলে রেখে তুহিনের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। খুব ঠাণ্ডা মাথায় জিজ্ঞাস করে, একটু আগে কি করছিলে?
তুহিন চুপ করে থাকে।
আরমান আবার প্রশ্ন করে, জবাব দেয়ার জন্য।
তুহিন তখনো চুপ, টেবিলের উপর রাখা বেত উঠিয়ে তুহিনের হাতে পর পর কয়েকটা বাড়ি দেয়। তুহিনকে মারার সময় আরমান খেয়াল করল এই ছেলে খুবই আজব। মার খাচ্ছে কিন্তু তারপর ও তার মুখে অনুশোচনার ছিটেফোঁটা ও নেই। আরমানের মারের চটে তুহিন অরুণার কাছে ক্ষমা চাইল। কাল রাতে ঘটনার জন্য আরমান কিছুই বল্লল না ক্লাসে। কিন্তু তুহিনকে ক্লাস থেকে চলে যেতে বলতে গিয়ে থেমে যায়। আগের দিনের মতই টেবিলের উপরে দাড় করিয়ে রাখে কান ধরিয়ে। এ দিকে আরমান স্যার তার জন্য তুহিনকে মেরেছে এই ভেবে আরমানের উপর আরও বেশী ইমপ্রেস অরুণা। আজকে ও শাহেলার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে, বইন তোর মাথার কিরা কেটে বলছি, এই স্যারকে তোর দুলাভাই বানাবোই। অরুণার কথা শুনে শাহেলা মুখ বাকিয়ে পড়ায় মনোযোগ দেয়। আরমান কালকে সবাইকে বাড়ীর কাজ দিয়েছিল। আজকে পড়া ধরবে বলে আগেই ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে সবার মাঝে। তাই সবাই মনোযোগ দিয়ে পড়া রিভাইস দিচ্ছে।

তুহিনের এই ব্যাপারে কোন মাথা ব্যথা নাই। এই পর্যন্ত কোন দিন ও সে ক্লাসে পড়া পারেনি। তাদের দলের মধ্যে রুমন কিছুটা মেধাবী। পরীক্ষার হলে তার খাতা দেখে দেখে বাকীরা কপি করে দেয়। তাই ক্লাস নাইন অব্ধি ভিড়তে পেরেছে। বন্ধুদের মধ্যে জিতুকে সবাই টেলি সামাদ ডাকে, দেখতে টেলি সামাদের মত লম্বা ছিপ ছিপে চিকন শরীরী গঠন। আর কথা বার্তাতেও জোকার জোকার ভাব আছে। একটু আগে তমালের কানে কানে বলল, দোস্ত তোর মনে হচ্ছে না এই খাটাশটা বেশী করছে তুহিনের সাথে। তমাল ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করল খাটাশটা আবার কে? জিতু দাঁত কেলীয়ে বলে, শালা এই নূতন স্যারের কথা বলছি। তমাল জিতুকে সম্মতি জানাল। সুযোগ পেয়ে তমালকে আবার বলে জিতু। আচ্ছা দোস্ত খাটাশের একটা ব্যবস্থা করলে কেমন হয়? তমাল প্রশ্নবোধক দৃষ্টি নিয়ে জিতুর দিকে তাকায়, শুন সন্ধ্যার সময় সে যখন বাসায় যায় তখন অন্ধকারে তাকে ঠেলে পানিতে পেলে দিলে কেমন হয়। তমাল ভাল হয় না বলে জানিয়ে দেয়। কি যেন চিন্তা করে জিতু হেসে উঠে তমালের কানে কানে বলে, দোস্ত জোস একটা আইডিয়া পাইছি। তমাল জিজ্ঞাস করে কি? জিতু বলে, প্রতিদিন সকালে কলাপাতায় করে স্যারের জন্য এক কেজি করে গু পাঠিয়ে দিলে কেমন হয়? সাথে একটা চিরকুট ও দিলাম, স্যার শুভ সকাল, আপনার জন্য সকালের নাস্তা রেডি, মেন্যু: মুতের সুপ, গুয়ের ভাঁজি, স্যার পরটা পাঠাতে ভুলে গিয়েছি। আপনি দয়া করে বানিয়ে খাবেন। ইতি আপনার অতিপ্রিয় ছাত্রবৃন্দ। আইডিয়াটা কেমন দোস্ত? একদম বাজে। স্যারের যে মেজাজ শেষে দেখবি পড়া না পারলে নিজের গু নিজকে খাওয়াবে। উত্তর দিল জিতু।

তমাল আর জিতুর কানা কানি দেখে আরমান প্রথমে তাদের পড়া ধরল। দুইজনের কেউ কিছু বলতে পারল না। তুহিন মনে মনে খুশী হল যাক, তাকে আর জিজ্ঞাস করবে না। কিন্তু তার খুশী কাল হয়ে দাড়ায় যখন আরমান রাগান্বিত হয়ে তাকে পড়া জিজ্ঞাস করে। বরাবরের মত তুহিন হা করে থাকে। আরমান এইবার তাকে ক্লাসের বাহিয়ে গিয়ে মাঠে রোদের মধ্যে কানে ধরে দাড়িয়ে থাকতে বলে। ব্যাপারটা তুহিনের ইগোতে লাগে। সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয় আজকে স্যারকে একটা শিক্ষা দিতেই হবে। এ দিকে অরুণার অবস্থা আগের মত, আরমান তার সামনে দাড়িয়ে পড়া জিজ্ঞাস করে। সে উত্তর দিতে পারে না। অথচ কাল খুব ভাল করে পড়া শিখেছে অরুণা। আরমানের সামনে আসলে কেন যে তার মুখ থেকে কথা বের হয় না সে বুঝতে পারে না। আরমান কয়েকবার জিজ্ঞাস করে কোন উত্তর না পেয়ে তাকে শাস্তি দিল কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকার।

রোদের তাপে তুহিনে শরীর যতটা না জ্বলছে তারচেয়ে বেশী জ্বলছে রাগে। তার রাগ সাধারণের চেয়ে এমনিতে কিছুটা বেশী। হয়তো শাসনের অভাব কিংবা অসৎ সঙ্গের কারণে তার মাঝে দস্যিপনা দিন দিন বেড়েই চলছে। এই যে সূর্যের তাপে এখন কান ধরে জ্বলছে এইটা অতি সাধারণ একটা ব্যাপার তার জন্য। তুহিনে গায়ের রঙ এমনিতেই তামাটে, সারাদিন রোদের মধ্যে হাঁটাহাঁটি করলে কার রঙটাই নিখুঁত থাকে? তুহিনের বাবা দেশের বাহীরে থাকে। বড় ভাই শাকির মা আর দাদীতে তাঁদের সংসার। তুহিনের মা ফাতেমার ভাষ্য মতে তুহিন এতটা বিগড়ে যাওয়ার পিছনে বড় অবদান তার দাদীর। তুহিন যত অন্যায় করে বাড়ী ফিরুক না কেন তার দাদীর কাছে সে সতী সাবেত্রি। সে কারো মাথা ফাটিয়ে এসে যদি বলে দাদী মানিকের মাথা ইটা দিয়ে থেঁতলে দিয়েছি, দাদী বলবে ভাল করেছিস। তোর লগে মারামারি করতে আসে কেন বান্দর গুলান। এক কথায় দাদীর চোখে সে নিষ্পাপ সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশু। দাদীর আস্কারা পেয়ে পেয়ে তুহিন মাথায় উঠেছে ফাতেমা বেগম এই বলে প্রতিদিন শাশুড়ির দিকে তাকায় বক্র চাউনিতে। শাশুড়ি মুখে পানের খিলি পূরে দিয়ে পিক ফেলতে ফেলতে মুচকি হাসে। আসলে দাদীর সাপোর্টে তুহিন খুব বড় অন্যায়তেও পিছু হটে না। এখন যেমন মনে মনে ফন্দি আঁটছে আজকে ইংরেজি স্যারকে শিক্ষা দেয়ার জন্য।

বিকেল পাঁচটা বাজে ঘড়ীতে, আরমান ফেয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে, এমন সময় স্কুল দফতরি জয়নাল এসে একটা খাম ধরিয়ে দিল আরমানের হাতে। চিঠিটা দেখে আরমানের ঠোঁটের কোনে এক চিলতে হাসি উপচে পড়ল। এই ইন্টারনেটের যুগে, ইমেইল মোবাইলের ভিড়ে রেজিস্ট্রি করা চিঠি কেন যেন বেমানান লাগে। আরমান মনে মনে বলে, রানা তুই আর আর বদলালি না। রানার চিঠি দেখতে দেখতে স্কুলের বারান্দায় এসে পড়ল আরমান। এমন সময় হঠাৎ করে আরমান পা পিছলে ফ্লোরে পড়ে যায়। আর মাথার সাথে বাড়ি খায় কয়েকটা মার্বেল। আরমানের মাথা থেকে রক্ত ঝরছে, চোখ বন্ধ করতে করতে সে ক্লাসরুমের দরজার দিকে তাকাল, ওখানে তুহিন দরজার আড়ালে উঁকি মেরে দেখছে।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে চারদিকে অন্ধকার ছড়িয়েছে বেশ খানিকক্ষণ আগে। তবুও আজকের আকাশটা বেশ উজ্জ্বল হয়ে আছে। গ্রামের গৃহস্থ বাড়ী গুলীতে গৃহবধূরা গলায় আঁচল পেঁচিয়ে সন্ধ্যাপ্রদীপ নিয়ে ব্যস্ত। ফাতেমা বেগম হারিকেন জ্বালাতে জ্বালাতে এদিক ওদিক তাকাচ্ছেন, তিনি জানেন তুহিন কোন গাছের আড়ালে ঘাপটি মেরে দাড়িয়ে আছে। শাকির বাড়িতে এসেছে খবরটা নিশ্চয় তার কানে পৌঁছে গেছে।

সারা বিকেল তুহিনের ছায়াও বাড়ীর চৌকাঠ মাড়ায়নি। বন্ধুদের সাথে মাঠে ক্রিকেট খেলা নিয়ে এতটা মজে ছিল যে গায়ে কাপড়ের কথাও ভুলে গিয়েছিল। তুহিন খালি গায়ে গাছের আড়ালে দাড়িয়ে দাড়িয়ে মশার কামড় খাচ্ছে। তুহিন জানে আজ তার কপালে শনির দশা অবধারিত। ঘরের দরজার দিকে তাকিয়ে আছে কখন দাদী গ্রিন সিগন্যাল দিবে আর তুহিন দুই লাফে ঘরে ধুকে পড়বে। তুহিনের সাথে দাদীর মোবাইল কিংবা টেলিপ্যাথির মাধ্যমে যোগাযোগ হয়নি, তারপরও তুহিন জানে দাদী ঠিকই তার জন্য গ্রিন সিগন্যাল দিবে।

বাড়ীতে কি নিয়ে যেন চেঁচাচেচি হচ্ছে। শাকিরের কণ্ঠ বেশ জোড়ালই শোনাচ্ছে। তুহিন খরগোশের মত দুই কান খাঁড়া করে বিষয়বস্তু জানার চেষ্টা করছে। শাকির বাড়ী এসে এখনো জামা কাপড় না ছেড়েই মা আর দাদীতে সংলাপে বসে পড়ে। বিষয়বস্তু ঐ একটাই তুহিনের দস্যিপনার চল্লিশা খাওয়া। বাড়ী আসার পথে সাদেক মিয়ার চায়ের দোকান পড়ে। গ্রামের চা দোকানগুলোতে চায়ের চেয়ে আলাপ, সমালোচনাই বেশী চলে। বিকেলবেলায় স্কুলের নতুন স্যারকে তুহিন ফ্লোরে মার্বেল ফেলে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে, চায়ের দোকানের আজ আলোচনার মূল বিষয়। আরমান ফ্লোরে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পায় আর এর নেপথ্যে যে তুহিনের হাত আছে, সেইটা আরমান আর তুহিন জানে। আরমান কাউকে বলেনি তুহিনের নাম তাহলে, বেলা না গড়াতেই সেই কথা দশ কান হল কি ভাবে? আগেই বলেছিলাম গ্রামে কারো মোরগ জোরে ডাক দিয়ে উঠলেও তুহিনের নামই কব্জাবে সবাই, এইটাই স্বাভাবিক।

চায়ের দোকানে বসা ছিল হাজী ছমির শেখ। শাকির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় হাতের ইশারায় তাকে ডাকে। শাকির সামনে আসতেই তুহিনের আজকের ঘটনাসহ গত কয়েক মাসের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের খতিয়ান খুলে বসেন তিনি। শাকির নিচের দিকে তাকিয়ে চামড়া কামড়ে সব সহ্য করে নেয়। বাসায় এসে মা আর দাদীর সামনে রাগে হন হন করে তুহিনের ব্যাপারে আলোচনায় বসে। শাকিরের সামনে ফাতেমা বেগম চুপ থাকে, শাকির যা বলে তার উপরেই সই, কিন্তু তুহিনের পক্ষে কিংবা বিপক্ষে যায় না। কিন্তু তুহিনের বাবাসুত্রে পাওয়া উকিল তার হয়ে জেরা শুরু করে তারই স্বপক্ষে।
শাকিরঃ তুহিন যদি এইভাবে অকাজ করতেই থাকে তাহলে বাবার নাম মাটিতে মিশতে সময় লাগবে না মা, এই আমি বলে দিলাম।
দাদীঃ রাখ তোর নামা-নামি, কি করছে তুহিন? বয়সকালে সবাই এরম একটু আধটু দুষ্টামি করে, বড় হইলে ভালা হইয়া যাইব।
শাকিরঃ দাদী এই তোমার জন্যই সে এত বিগড়েছে। সারাদিন আস্কারা দাও তুমি। আজ তার স্কুল স্যারের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে মার্বেল দিয়ে। কাল দেখবে কাউকে খুন করে বাড়ী এসে বলবে আমি কিছু করিনি।
দাদীঃ স্যার হাঁটতে পারে না এইজন্য পিছলাইয়া পইড়া গেছে এতে তুহিনের কি দোষ? আর কাউরে খুন করবে কি জন্য? আমার নাতি এত খারাপ না। আর তুই এখন ভালা হইয়া গেসস নাহ? তুই ছোডবেলায় কেমন আছিলি আমি জানি। এখন বড় হইয়া বুদ্ধির ঢেঁকি হইছ।

শাকির চুপ করে যায় সে জানে দাদীর সাথে তর্ক করে লাভ নাই। তবে আজকে তুহিন যে কাজ করেছে এর শাস্তি তাকে পেতেই হবে। শাকির জামা কাপড় ছেঁড়ে বাথরুমের দিকে যায়। এদিকে দাদী হাতের হারিকেন দিয়ে গ্রিন সিগন্যাল দেয়। অমনি তুহিন দৌড়ে ঘরে ঢুকে যায়। মা রান্না ঘরে, শাকির ভাইয়া বাথরুমে, এই সুযোগে সে জামা গায়ে দিয়ে পা না ধুয়েই, বই নিয়ে টেবিলে বসে পড়ে। খানিকক্ষণ পরে শাকির তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে রুমে প্রবেশ করে। তুহিন এমন ভাবে গলা ফাটিয়ে পড়া ধরেছে যে আজ রাতেই বালক ক্ষুদিরামকে ছেড়ে বিদ্যাসাগর হয়ে যাবে। শাকির তোয়ালেটা বিছানায় ফেলে এগিয়ে আসে তুহিনের দিকে। তুহিনে পিছনে না তাকিয়েও বুঝতে পারছে ঘূর্ণিঝড় ক্যাটরিনা তার দিকে তেড়ে আসছে। বাঁশের কঞ্চির আঘাতে তুহিন চেঁচিয়ে পুরো বাড়ী মাথায় তুলছে। ফাতেমা বেগম শুনেও না শুনার ভান করে রান্না করে যাচ্ছে। শুধু দাদী এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে শাকিরের উপরে। দাদির জন্য মাইর সব কটা গায়ে না পড়লেও বেশ ভালই খেয়েছে তুহিন। ঘণ্টা খানিক পরে শাকির টি-শার্ট আর লুঙ্গী পড়ে বেরিয়ে গেল। তুহিন এখনো হেঁচকি তুলে কাঁদছে। দাদী তার গায়ে হাত দিয়ে ম্যাসেজ করছে আর নাতিকে মারার অপরাধে শাকিরকে গালি দিচ্ছে।

মাথা যতটা ফাটার কথা ছিল ততোটা ফাটেনি আরমানের। জয়নাল তাকে রিক্সায় বসিয়ে ডাক্তারের চেম্বারে নিয়ে যায়। ডাক্তার মাথা ব্যান্ডেজ করে কয়েকটা এন্টিভাইটিক দিয়ে ছেড়ে দিল। জয়নাল তাকে বাড়ী অবধি নিয়ে আসে। আরমানকে চা করে দিয়ে জয়নাল চুলায় রান্না চড়িয়েছে। আরমানের শরীর কিছুটা দুর্বল ঠিকই কিন্তু অসুস্থ রোগী নয়। ঠিক যতটা অসুস্থ তার মন। রানার চিঠিটা এখনো টেবিলেই পড়ে আছে। আরমান মোবাইল টিপাটিপি করল কিচ্ছুক্ষণ, কিন্তু অস্থিরতা তার ভিতরে মাথা ছাঁটা দিয়ে উঠছে আজ। পাগলে কি না বলে, ছাগলে কি না খায় এর মত আরমানের বই পড়ার স্বভাব। আজকে বইতেও মন দিতে পারছে না। স্কুল লাইব্রেরী থেকে কাল একটা বই এনেছে সে সেলিনা হোসেনের “যমুনা নদীর মুশায়রা” এত করে চাইল বইতে মন দিতে পারল না সে। শেষে জয়নালকে বলে আরমান বেরিয়ে গেল। হাঁটাহাঁটি করলে অস্থিরতা কিছুটা কমে। আরমান শুনেছে এই গ্রামের উত্তর দিকটায় ছোট একটা নদী আছে। ঐ দিকটায় এখনো যাওয়া হয়নি। আরমান হাঁটা ধরল নদীর দিকে।

শাকির খুব বেশী যে সিগারেট টানে তা নয়। তবে বাড়ীতে এলে তার সিগারেট প্রীতিটা বেড়ে যায়। যদিও গ্রামের কারো সামনে সে সিগারেট খায় না। আর গ্রামে সিগারেট কিনতেও দুনিয়ার ঝামেলা। অনেক মুরব্বী দোকানে বসে চা সিগারেট টানে আর বাড়ীর গৃহবধূ কিংবা এর ওর কাপড়ের তলের খবর তুলে কানাঘুষা করে। বাড়ীতে এলে শাকির নদীর ধারেই সিগারেট টানে। একটু আগে নদীর ধারে হাঁটতে হাঁটতে অন্যময়ঙ্ক হয়ে যায় সে। প্রিয়তার সাথে তার সম্পর্কটা বোধহয় আর টিকল না। শাকির মনে মনে বলে, আসলে মেয়ে মানুষের মন বোঝা দুনিয়ার সবচেয়ে কঠিন কাজের একটি। স্বয়ং বিধাতা তাদের মন বুঝতে পারে কিনা এই নিয়ে তার মনে ক্ষীণ সন্দেহ আছে। অথচ এই মেয়েটির জন্য সে কিনা করেছে। রাত নেই, দিন নেই তার সনে পূজার প্রসাদ হয়ে ঘুরেছে শাকির। এই মেয়ের জন্য তার জীবনে সবচেয়ে গভীর একটি সম্পর্কের উপসংহার ঘটিয়েছে সে। তারপরও এই মেয়ে তাকে পাঠার বলি বানীয়ে ছেড়েছে। একটা দীর্ঘশ্বাস উপচে পড়ে শাকিরের।

আরমান নদীর ধারে পা রাখতেই শরীরটা জুড়িয়ে যায়। আজ আকাশে চাঁদ নেই। এমনও না যে ঘোর অমাবস্যা চলছে। চাঁদ উঠবে শেষ রাতের দিকে। অন্ধকারে হাঁটতে খারাপ লাগছে না আরমানের। এই অন্ধকার যদিও তাকে তার জীবনের ফ্ল্যাশব্যাকে টেনে নিয়ে যায়, তারপরও তার অন্ধকার আর একাকীত্ব ভীষণ প্রিয়। একটা সময় ছিল অন্ধকারে আরমান শিশুদের মত ভয় পেত। তখন সেই ভয়কে জয় করিয়ে দেয়ার লোক ছিল। এখন নাই। তাই সে নিজেই নিজের ভয় দূর করে সামনে এগিয়ে যায়। কিন্তু যতই সামনে যাক পিছনের কালো অধ্যায় তার গলা ধরে হেঁচকা টান মেরে তাকে স্তব্ধ করে দেয় মাঝে মাঝে। কি আনন্দেরই না ছিল দিন গুলো। সমকামী জীবনে ভালোবাসা নাকি সোনার হরিণ, আরমানের তা মনে হত না। ফায়সালের সাথে পরিচয়, তার কাছে যাওয়া, তার সাথে অতিবাহিত করা প্রত্যেকটা দিনই তার সুস্পষ্ট প্রমাণ। প্রতিটা সম্পর্কের ভিত্তি হয় বিশ্বাস আর, সেই বিশ্বাস যদি অবিশ্বাসে পরিণীত হয়, তাহলে সেই সম্পর্কের মূল্য দুটাকার ছেঁড়া নোটের মত। একজনের পক্ষে সেই বিশ্বাসহীন সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা সম্ভবপর নয়। আরমান ও তাই টিকিয়ে রাখতে পারেনি তার সম্পর্ক। সোনার দিন গুলো পিতলে পরিণীত হল।
বড় করে শ্বাস নিয়ে ভাবতে থাকে ইউনিভার্সিটিতে থাকা সময় গুলো। কত পরিচিত জন, চেনা মুখ, কাছের দূরের বন্ধুবান্ধবে ঘেরা সময় গুলো এখন আবহমান কালের অতীত। আর মানুষের জীবনে সব বন্ধুই বন্ধু হয় না। আজ আরমানের মনে ভালোবাসা আর সম্পর্কের উপর এত ঘৃণা জন্মানোর নায়ক তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তার মুখের উপরে হাঁসির পরিবর্তে রাগ ভাসার প্রধান কারণ তার বন্ধু। চড়াই উৎরাই শেষে জীবন যে দিকেই যাক না কেন ঐ লোকটিকে আরমান কখনোই ক্ষমা করতে পারবে না। মোবাইলের শব্দে আরমান সম্বিত পেরে পায়। জয়নাল বাড়ী চলে যাবে, তাই আরমানকে রাতের খাবার খাওয়ার জন্য ডাকছে। আরমান আস্তে আস্তে বাড়ীর দিকে পা বাড়াল। কিছুদূর এগিয়ে যেতেই দেখল, কেউ একজন তার দিকে এগিয়ে আসছে হাতে জ্বলত সিগারেট। আরমান ভাবছে হয়তো গ্রামের কেউ তার মত হাওয়া খাচ্ছে নদীরধারে। এ দিকে একই কথা মনে ঘুরপাক খাচ্ছে শাকিরেরও। কিন্তু তার সামনে আবছা ছায়ার মানুষের আয়বরটা অপরিচিত লাগছে।

আজ দশটা বাজার ১০ মিনিট আগে ক্লাসে ঢুকল তুহিন। চুপচাপ নত মাথা দেখে তার বন্ধুরা বুঝে গেল শাকির ভাইয়া বাড়ী এসেছে। তমাল তুহিনের দিকে এগিয়ে এসে জিজ্ঞাস করল, ‘কি রে কাল মাইর কেমন খেলি’ তুহিন জবাব না দিয়ে সাপের মত ফোঁস কর উঠে তমালের কথায়। জিতু কিছু বলতে গিয়ে ও থেমে যায়। সে বুঝতে পারে তুহিনের মনের অবস্থা বেগতিক। মনিরের চোখ এতক্ষণধরে ক্লাসরুমের দরজার উপরে ছিল। সে ভাবছিল আজ তুহিন ক্লাসেই আসবে না। তুহিনকে দেখে মনিরের চেহারায় উজ্জ্বলতা ফীরে পেল। সকালে তার মা বুনা খিচুড়ি রেঁধেছিল, খানিকটা বাটিতে ভরে সে তুহিনের জন্য নিয়ে এসেছে। মনির জানে তুহিন বুনা খিচুড়ি খেতে খুব পছন্দ করে। কিন্তু সে বুঝতে পারছে না কি ভাবে তুহিনকে ব্যাগের কোনে পড়ে থাকা বাটিটা ধরিয়ে দিবে। কেউ টের পেয়ে গেলে মহা কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। এমনিতে সবাই তাকে ক্ষ্যাপায়, তুহিনের প্রতি তার দুর্বলতার কথা শুনলে তো সেরেছে। মনির অনেক চেষ্টা চরিত্র করেও এই দুর্বলতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। যেমন কাল রাতে অংকের খাতায় তুহিনের ছবি এঁকে ফেলেছে নিজের অজান্তেই। কেন তার এমন হচ্ছে সে সত্যি বুঝতে পারছে না।

এদিকে অরুণা চোখ কাঁকের মত তীক্ষ্ণ করে অপেক্ষা করে আছে আরমান স্যারের। কিন্তু তাকে হতাশ করে দিয়ে রফিক স্যার ক্লাসে ঢুকল হাজীরা খাতা নিয়ে। এমনিতে সকাল থেকে তার মন ভাল নেই। সবাই বলাবলি করছিল কাল আরমানের স্যারের মাথা ফেটে গেছে। স্যারের এখন অবস্থা কেমন এই প্রশ্ন সকাল থেকে ১০ বার করে ফেলেছে শাহেলাকে। শাহেলা বিরক্ত হয়ে বলে, তুই যদি আরেকবার জিজ্ঞাস করিস এই কথা তোর মুখে এক লড়া ছেপ মারবো আমি। থু খাওয়ার ভয়ে অরুণা ঢোক গিলে চুপ মারে। এখন রফিক স্যারকে দেখে অরুণা বুঝতে পারছে আরমান স্যার সত্যি মারাক্তক আঘাত পেয়েছে। তাই তো আজ ক্লাসে আসলো না। চিন্তা আর উদ্বিগ্নে অরুণার মুখ কালো হয়ে আসে। রফিক স্যার নাম কল করা শেষে সবাইকে জানায় তাদের ক্লাস টিচার আজ অন্য ক্লাসে গেছেন, তাই তিনি আজ তাদের প্রথম ক্লাস নিবেন। কথাটা শুনে অরুণার মুখে পানি আসে। কিন্তু তুহিনের মুখ ভারী হয়ে যায়। সে মনে মনে ভাবতে থাকে এমন জঘন্য প্রতিশোধই সে নিল, স্যারকে অন্তত এক দিন বিছানায় শুইয়ে রাখতে পারল না। জিতু তুহিনের কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে, দোস্ত খাটাশটার তো কিছুই করতে পারলি না। তুহিন কিছু বলতে যাবে এমন সময় রফিক স্যার তুহিনকে বলে এই ক্লাস শেষে তাকে প্রধান শিক্ষকের অফিসে যেতে হবে। তুহিন আর ক্লাসের সবাই বুঝতে পারছে নতুন কোন বিচার তার জন্য অপেক্ষা করে আছে।

সকাল এগারোটা কুড়ি মিনিট। তুহিন হেডস্যারের অফিসে দাড়িয়ে আছে। আরমান আর তুহিনের মা চেয়ারে বসা। হেডস্যারের হাতে দুইটা শক্ত পোক্ত বেত। স্যারের চোখে মুখে রাগের ঘনঘটা। তুহিন ভীতর ভীতর ভয় পাচ্ছে। কাল রাতেও পিঠে গা পড়েছিল আর এখনও আবার বেতাঘাত। বরাবরের মতই হেডস্যার তুহিনকে উদ্দেশ্য করে ভাষণ দিল। আর সাথে শাসিয়ে দিল এমনটি করলে তারা তুহিনকে স্কুলথেকে বের করে দিবে। আরমান আর ফাতেমা বেগম চুপ। স্যার ভাষণ শেষ করে আরমানের দিকে তাকিয়ে বলে, এই দেখেন আপনার গুণধর ছেলের কাণ্ড। আজ এই স্যারের মাথা ফাটিয়েছে কাল এসে আমার মাথা ধরে টান দিবে, আপনিই বলেন আপনার ছেলের কি শাস্তি হওয়া উচিৎ। লজ্জা আর অপমানে ফাতেমা বেগমের চোখে পানি উপচে পড়ার মত অবস্থা। ফাতেমা বেগম ছলছল চোখে ক্ষমার দৃষ্টি নিয়ে তাকায় আরমানের দিকে। আরমান ফাতেমা বেগমের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। পরে হেডস্যারকে উদ্দেশ্য করে বলে, স্যার তুহিন যে আমাকে মেরেছে তার প্রমাণ কি? আমি তো কাউকে বলিনি যে তুহিনই মার্বেল বিছিয়েছিল ফ্লোরে। তার কথা শুনে হেডস্যার চোখ কপালে তুলে বলে, মিঃ আরমান আপনি নূতন এইখানে তাই তুহিনের ব্যাপারে কিছুই জানেন না। সবাই জানে এই কাজ তুহিন ছাড়া আর কেউ করেনি। দুই স্যারের কথোপকথন তুহিন অবাক হয়ে শুনছে। বিশেষ করে আরমানের কথা গুলো। সে বুঝতে পারছে না আরমান স্যার কেন মিথ্যা বলে তাকে মারের হাত থেকে বাঁচাতে চাইছে। অবশেষে আরমানের কথা মেনে নেয় হেডস্যার। তুহিনকে না মেরে ক্লাসে পাঠিয়ে দেয়। ফাতেমা বেগম আর আরমান হেডস্যারের রুম থেকে বেরিয়ে আসে। ফাতেমা বেগম কৃতজ্ঞতার মাথা নত করে আছে আরমানের সামনে। আরমান তাকে কথা বলার অবয় দেয়। তুহিন দেখতে পারছে তার মা আর আরমান স্যার বারান্দায় দাড়িয়ে কথা বলছে। তুহিন বুঝতে পারছে তাকে আরও বেশী করে মারার জন্য মা খাটাশ স্যারটার কাছে নালিশ দিচ্ছে। তুহিন ঐ দিকে ভ্রূক্ষেপ না করে ভাবতে থাকে খাটাশ স্যারটাকে কি ভাবে তাড়ানো যায়।

ফাতেমা বেগমের মুখে আজকে আরমানের ব্যাপারে সব শুনে শাকির। আর মনে মনে ভাবে নতুন স্যার বোধহয় তার বখাটে ছোট ভাইটাকে ঠিক করতে পারবে। তাই সে ভাবছে আজ বিকাল বেলায় আরমান স্যারের সাথে কথা বলবে তুহিনের ব্যাপারে।
বিকাল পাঁচটা।
আরমান সব ক্লাস শেষ করে স্কুল থেকে বেরিয়ে মাঠে নেমেছে মাত্র। পিছন থেকে কে যেন তাকে ডাকল এক্সকিউজ মি বলে।
আরমান পিছন ফীরে তাকিয়ে যাকে দেখল তাকে এই অবস্থায় এইখানে দেখবে স্বপ্নেও ভাবেনি। শাকিরকে দেখে আরমানের মাথা চক্কর দিতে লাগল…।

(চলবে)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.