শব

লেখকঃ এক্সট্রিম নয়েজ

বিঃদ্রঃ এই গল্পের পটভূমি, কাহিনী ও প্রতিটি চরিত্রই সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও অবাস্তব। বাস্তবতার সাথে এর সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া কাকতালীয় ও অনাকাঙ্ক্ষিত।

পর্বঃ এক

সস্তা হলদেছটা কাঁচের গ্লাসে কড়া ঝাঁঝের এ্যালকোহলিক পানীয় ঢালতে ঢালতে কবির বলল, “আজকে একটু বেশী হয়ে যাচ্ছে না!”
“আরে নাহ…” ধরা গলায় জবাব দিল দেলু। “এতদিন পরে তুমি দাওয়াত দিয়ে আনছো, পুরোটা শেষ না করে উঠছি না আজ। তাছাড়া এমন ভাল জিনিস তো আর রোজ রোজ মিলবে না।” বলেই বোকার মত হে হে করে হাসল দেলু মিয়া। সেই সাথে তাল মিলালো কবির।

এক ধাক্কায় গ্লাসের তলা পর্যন্ত গলায় ঢেলে দিয়ে একবার দম নিলো দেলু।
-আচ্ছা কবির। একটা সত্যি কথা কও তো মিয়া। বোতলটা তো দেখতে ভালই। লাগে তো বিদেশী মাল। দামও মনে হয় কম হইবো না। পরের বাড়ির গাড়ি চালাও তুমি। তার উপরে ভরা সংসার। বেতনও তো তেমন ঘটা করে বলার মত না। তুমি এত দামি বোতল কিনলা কোন হাউশে! নাকি তলের ধান্দা আজকাল ভালই চলতেছে!…… বলেই ঠাট্টার হাসি হাসল দেলু।
-আরে না মিয়া। আমার কি এতই ঠেকা পড়ছে নাকি যে এইসবের পিছে এত টাকা ঢালতে যামু! (গ্লাস থেকে কিছুটা মদ গলায় ঢেলে নিলো কবির) মালিকের পোলা একটা আছে নতুন নতুন কলেজ পাশ কইরা বাইর হইছে। প্রায় প্রায়ই আমারে নিয়া বারিধারা, বনানী এলাকায় যায়। একেক সময় একেক জায়গায়। আমারে রাস্তায় রাইখা কখনো কোন বাড়ির ভেতর নইলে কোন হোটেলের ভিতরে যায়। আবার ঘণ্টা খানিক পরে আইসা পড়ে। কখনো ৫০০ কখনো ১০০০ টাকা দিয়া বলে কাউরে যাতে না বলি যে তারে নিয়া এইখানে আসছিলাম। আমার আর কি! নিজের যখন লাভ হইতাছে তো চুপ থাকতে সমস্যা কি! আজকে বিকালে নিয়া গেছিলাম গুলশানে বিরাট এক হোটেলে। প্রায় ৩ ঘণ্টা উপরে আছিল। বাহির হইয়া আসল হাতে বড়সড় একটা হাতব্যাগ নিয়া। সে আবার জানত যে আমার একটু শরাবের অভ্যাস আছে। ওই ব্যাগের থেকে এই বোতলটা বাহির কইরা আমারে দিলো। আর কইলো যেকোনো সময় কোন কিছুর দরকার হইলে তারে যেন জানাই। বুঝলা রে ভাই, বড়োলোকের বিরাট কারবার।

দেলু মিয়া কিছুটা কৌতূহলী হল।
-তা তো বুঝলাম। কিন্তু কোনোদিন জিগাও নাই এত এত জায়গায় সে কি করতে যায়? আর তোমারেই বা এগুলা গোপন রাখতে বলে ক্যান!
-আরে ধুর মিয়া। আমার কোন ঠ্যাকাটা পড়ছে বলতো। যার যা খুশি করুক গিয়া। আমার ফায়দা যখন হইতাছে তো আমি আওয়াজ দেই কোন আক্কেলে। বড় লোকের বড় বড় প্যাচ রে ভাই, এত কিছু বুইঝা আমাগো কোন লাভ নাই। …… বলেই হা হা করে বিজয়ের হাসি হাসল কবির।

বোতলের নিম্নাংশের বাকি মদটুকু দুজনের গ্লাসে ভাগ করে ঢেলে নিতে নিতে কবির বলল,
-আচ্ছা দেলু, তোমারে একটা কথা অনেক দিন ধইরা জিজ্ঞাস করি করি করে করা হয় নাই। তুমি তো হাসপাতালের লাশ ঘরের পাহারাদারের চাকরি করো। সব সময় কতগুলা ছেঁড়া ফাড়া মরা লাশ পইড়া থাকে ওইখানে। তোমার ডর লাগে না?
-কি যে কও মিয়া। ডর লাগোনের কি আছে। নিরীহ মরা লাশ ওইগুলা। এদের ভয় পাওয়ার কি আছে? এর চাইতে জীবিত মানুষ আরো বেশি ভয়ঙ্কর! হাহাহা… তয় প্রথম প্রথম একটু ডর ভয় লাগতো। বিশেষ কইরা যখন রাত্রের ডিউটি থাকতো। তয় এখন অভ্যাস হইয়া গেছে। তাছাড়া হাসপাতালে সব সময় মানুষ দিয়া ভরপুর থাকে। এর মধ্যে আর ভয় লাগে না।
-তোমার ভাই সাহস অনেক। আমি হইলে তো একদিন পরেই চাকরি ফালাইয়া ভাগতাম! হেহেহে… এই যাহ্! কথায় কথায় কখন যে বোতলটা খালি কইরা ফালাইলাম টেরই পাইলাম না। যাউক গা… তয় মালটা কিন্তু চমৎকার। কি কও?
-আসলেই। খুব ভাল জিনিস। আমারে তো খুব ভাল ভাবেই পাইছে মনে হইতাছে। রাইত অনেক হইয়া গেছে। এখন তাইলে যাই। কালকে আবার নাইট ডিউটি আছে। সারাদিন ভাল কইরা ঘুমাইতে হইবো।
-ঠিক আছে তাইলে যাও। ভাল থাইকো। দেখি আবার যদি ভাল কিছুর ব্যবস্থা হয় খবর দিমুনে।

দাঁত বের করে একটা হাসির সাথে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বিদায় হল দেলু মিয়া।

**
রাত প্রায় আড়াইটা। লাশঘরের দরজার বাহিরে টুল পেতে বসে আছে দেলু। তর্জনী দাঁতের সাথে ঘসে চুন নিয়ে গাল ফুলিয়ে পান চিবুচ্ছে। একবার ঘাড় বাড়িয়ে করিডোরে নজর ঘুরালো। একেবারে নির্জন হয়ে আছে। কয়েকটা লাইট বন্ধ হয়ে আছে। সম্ভবত ভোল্টেজ আপ-ডাউনের সময় কেটে গেছে। যে কয়টা জ্বলছে তার আলো এত লম্বা করিডোরের জন্য যথেষ্ট না। শেষ মাথায় আবার একটা সেকেন্ডে সেকেন্ডে জ্বলছে আর নিভছে। দেলু লক্ষ্য করল, পুরো করিডোরে সে ছাড়া আর একটা প্রাণীও নেই। একেবারে শুনশান নীরব আর কেমন গুমোট হয়ে আছে। সাধারণত হাসপাতালে কখনো এমন নীরবতা দেখা যায় না। সব সময়ই রোগী আর তার স্বজনদের দৌড়া-দৌড়ী লেগেই থাকে। আর কোন বেডের কেউ মারা গেলে তো কোন কথাই নাই। কয়েক ঘণ্টা চলবে সেখানে আহাজারি। সেটা এখানকার নিয়মিত চিত্র। কিন্তু আজকের ব্যাপার টা একেবারের তার উল্টো। চারিদিকে তাকালে মনে হয় যেন এটা হাসপাতাল নয়, কবরস্থান। পাশে রাখা পটে পানের পিক ফেলে ছোট করে একটা নিঃশ্বাস ফেললো দেলু মিয়া।

এমন সময় কারো কান্নার শব্দ শুনতে পেল সে। ভাল করে লক্ষ্য করল। উপরের তলা থেকে আসছে। ছত্রিশ নাম্বার বেডের চাচা মিয়া মনে হয় চলেই গেল। আহহারে… বেচারার একটা মাত্র পোলা। তাও এখনো নাবালক। মা ও নাই। চোখের সামনে বাপের লাশ। সামনে ধু ধু অন্ধকার। হায়রে দুনিয়া… এসব ভাবতে ভাবতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল দেলু। উদাস মনে বিড়বিড় করে গান ধরল,

হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস, দম ফুরাইলেই ঠুস…
তবু তো ভাই কারোর ই নাই, একটু খানি হুস…
হায়রে মানুষ… রঙিন ফানুস…

গানের পরবর্তী চরণে যাওয়ার আগ মুহূর্তে হঠাৎ করে লাশ-ঘরের দরজার নিচ দিয়ে কয়েকটা তেলাপোকা ছুটোছুটি করে বেরিয়ে এসে দেলু মিয়ার পায়ের উপর দিয়ে দৌড়ে গেল। পা ঝাড়তে ঝাড়তে দেলু কিছুটা রসিকতা করেই বলে উঠল, “হালার পুতেরা, ওষুধ দিয়া তোমগো খেদাইতে পারি না, এহন লাশের দৌড়ানি খাইয়া পলাও নাকি!”

হঠাৎ আবার কান্নার শব্দ শুনতে পেল দেলু। এবার উপর থেকে না। মনে হচ্ছে তার আসে-পাশে কোথাও থেকে আসছে শব্দটা। দেলু এদিক ওদিক তাকিয়ে কাউকেই দেখতে পেল না। তবে কান্নার শব্দ খুব স্পষ্ট। ছেলে না মেয়ে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। মাঝে মাঝে কয়েক সেকেন্ডের জন্য থামছে। তারপর আবার নাক টেনে টেনে কাঁদছে। দেলুর হঠাৎ মনে হল শব্দটা লাশ ঘরের ভেতর থেকে আসছে। ওর কিছুটা ভয় ভয় লাগছিল। আবারো এদিকে ওদিকে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেল না। সাহস করে দাঁড়িয়ে লাশ-ঘরের দরজার হাতলটা ধরল। কান্নার শব্দটা তখন আরো সন্নিকটে মনে হল। দরজার হাতলটা ধাক্কা দিয়ে দুই ইঞ্চির মত খুলতেই অস্বাভাবিক একটা গন্ধ অনুভব করল সে। লাশ ঘরে সাধারণত নানা ধরনের মেডিসিন আর ন্যাপথলিনের কড়া গন্ধ থাকে। কিন্তু এই গন্ধটা পুরোপুরি অন্যরকম। এটা কি আসলে দুর্গন্ধ নাকি সুগন্ধ তা ঠিক করতে পারছিল না দেলু। কারণ এই গন্ধের সাথে সে সম্পূর্ণ অপরিচিত। কেমন একটা ভিন্ন জাগতিক গন্ধ…

দেলু মিয়ার বুকটা দুরু দুরু কাঁপছিল। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল সে। স্বাভাবিক দৃশ্য। তিনটে লাইনে সারি সারি পড়ে আছে মরদেহগুলো। মাঝে মাঝে কয়েকটা স্ট্রেচার খালি। হঠাৎ থার্ড লাইনের শেষ স্ট্রেচারটার দিকে চোখ পড়তেই রক্ত হিম হয়ে গেল দেলুর। ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। এদিক ওদিক তাকিয়ে একবার ঢোক গিললো দেলু। আস্তে আস্তে সাবধানে সামনে এগিয়ে গেল। কিছুটা যেতেই থমকে গেল। চোখ গুলো বড় বড় হয়ে গেল তার। তৃতীয় সারির শেষ স্ট্রেচারের নিচে দেয়ালের কোণ ঘেঁসে জড়সড় হয়ে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে একটা ছেলে। দুই হাত দিয়ে পেটের বাম পাশে চেপে ধরে আছে। সেখান থেকে প্রচুর রক্ত ঝরছে। পাশেই একটা রক্তমাখা ছুরি। সাদা এক টুকরো কাপড় কোমরে আর বুকে আলতো করে পেঁচিয়ে রেখেছে। পাশের স্ট্রেচারের চাদর সেটা। এক পা, দুপা করে এগোতে লাগল দেলু। হঠাৎ ছেলেটা মুখ তুলে তাকালো দেলু মিয়ার দিকে। ভয় পেয়ে থমকে গেল সে। লাশ-ঘরের মৃদু আলোয় ছেলেটার চেহারা দেখা যাচ্ছিল। সেই চেহারার বর্ণনা করা কঠিন। মনে হচ্ছিল যেন শত কোটি রেডিয়াম লাইট বসিয়ে দেয়া হয়েছে তাতে। অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরেও উজ্জ্বল হয়ে জ্বল জ্বল করছিল ওর মুখ। যেন এর জন্ম এই ইট পাথরের জগতে নয়, অন্য কোথাও…! তার দুচোখে অশ্রু ধারা। মুখমণ্ডলের ব্যাকুলতা তার কষ্ট, ভয় ও আতঙ্কের জানান দিচ্ছিল।

দেলুকে এগিয়ে আসতে দেখে ছেলেটা পাশে রাখা ছুরিটা হাতে নিয়ে নিজের পেটের উপর ধরে কাঁদো কাঁদো স্বরে বলতে লাগল, “প্লীজ ডোন্ট কাম টু মি। আমি আর পারবনা। প্লীজ আমাকে যেতে দাও। আমি কাউকে কিছু বলবনা। প্লীজ… ডোন্ট ডু দিস!”
কথা গুলোর রহস্য বুঝতে পারলনা দেলু মিয়া। কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে বলতে লাগল, “কে তুমি? এখানে কিভাবে এলে? দেখো, তোমার কি হয়েছে আমাকে বলো। আমি তোমাকে সাহায্য করব। ভয় পেও না। আমি তোমার ক্ষতি করবোনা। ছুরিটা নামিয়ে রাখো। এখানে এসো তোমাকে ট্রিটমেন্ট করাতে হবে। দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে। এদিকে এসো।”

ছেলেটার বয়স অল্প। সতেরো আঠারোর বেশী হবে না। দেলু ভেবেছিল ভুলিয়ে ভালিয়ে ওর হাত থেকে ছুরিটা নামাতে পারবে। কিন্তু তা হল না। বরং তার কথা শুনে ছেলেটা যেন রেগে গেল। তার চোখদুটো বড় বড় আর রক্তবর্ণ হয়ে উঠল। অতিমাত্রায় রাগ আর উত্তেজনায় সে গড়গড় করছিল। ভয়ঙ্কর দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল দেলু মিয়ার দিকে। এ দৃশ্য দেখে দেলু বিচলিত হয়ে দ্রুত গতিতে কাছে গিয়ে তাকে থামাতে চাইলেই মুহূর্তের মধ্যে সে ছুরিটা খুপে দিল নিজের পেটে। সাথে এক ভয়ঙ্কর চিৎকার। ভয়াবহ এ দৃশ্য দেখে ঘাবড়ে গেল দেলু মিয়া। মনে হচ্ছিল যেন ছেলেটার পেট থেকে রক্তের একটা স্তূপ তার দিকে ছুটে আসছে। চোখ বন্ধ করে দুহাতে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করল দেলু মিয়া।

এভাবে কিছু মুহূর্ত কেটে গেল। সবকিছু একদম নীরব হয়ে গেছে। চোখ খোলার সাহস পাচ্ছিলনা দেলু। বুঝতে পারছিল সে ঘামছে। ঘামে তার জামা কাপড় ভিজে যাচ্ছে। তবুও আতঙ্ক তাকে চোখ মেলে দেখতে দিচ্ছেনা।

হঠাৎ সে একটা শব্দ শুনতে পেল। কেউ একজন কথা বলছে। এরপর আরেকজন। অনেকগুলো কণ্ঠস্বর। কেউ কেউ হাসছে। মনে হচ্ছে তার আশেপাশে এখন অনেকগুলো মানুষের সমারোহ। ভয়ে ভয়ে খুবই সাবধানে একটু একটু করে চোখ খুলল দেলু। চোখ মেলে তাকাতেই সে চমকে গেল। এ কোথায় সে! চারপাশে অনেক গুলো ছেলে। সবাই একই রকমের পোশাক পরা। স্কুল ড্রেসের মত। কিন্তু জায়গাটা দেলু মিয়ার অপরিচিত। একটা ছোট খাট কম্পাউন্ড। চারিদিকে উঁচু দেয়াল। সামনে প্রসস্থ একটা দালান। দালানের সামনে বড় একটা সাইনবোর্ডে ইংরেজিতে কিছু লেখা। কিন্তু লেখাটা ঝাপসা। পড়তে পারলনা দেলু। ভয় আর আতঙ্কে তখন দেলু মিয়ার বুকের ভেতর ড্রাম-সেট বাজছিল। সে কিছুতেই বুঝতে পারছেনা হাসপাতালের লাশঘর থেকে সে এখানে কিভাবে এলো!

সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে এদিক সেদিক হাঁটছিল সে। তখন তার চোখ পড়ল সাত আটজন ছেলের একটা গ্রুপের দিকে। সবাই সমবয়সী। একজন তার মোবাইলে কিছু একটা দেখাচ্ছে সবাইকে। আর বাকিরা হাহা , হোহো করে হাসতে হাসতে বেকে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন খুবই হাস্যকর কিছু একটার প্রদর্শনী হচ্ছে সেখানে। এর মধ্যে একজনের পকেটে মিষ্টি সুরে মোবাইল বেজে উঠল। সে ফোন কানের কাছে নিয়ে জটলা থেকে বেরিয়ে এলো। ওকে তখন পরিষ্কার ভাবে দেখামাত্র দেলু মিয়ার প্রতিটি শিরা উপশিরা চমকে উঠল। লোমকূপ গুলো কঠিন হয়ে গেল। এটাও অবিশ্বাস্য একটা ব্যাপার। যে ছেলে লাশঘরে ছুরি দিয়ে নিজেকে কুপিয়ে মারলো, সে এখানে এলো কিভাবে! দেলু খুব মনোযোগ দিয়ে দেখল ছেলেটাকে। তার মধ্যে কোন জড়তা নেই। নির্দ্বিধায় হাসিমুখে কথা বলছে। সেই গোলগাল ভরাট মুখমণ্ডল। সুন্দর শারীরিক গঠন। একে মোটা বলা যায়না, আবার চিকন বললেও সাজে না। এই সেই ছেলে। কোন সন্দেহ নেই।

ফোনটা রাখতেই ছুটে গিয়ে তার সামনে দাঁড়ালো দেলু মিয়া। উদ্দেশ্য, তার কাছে জানতে চাওয়া কে সে? আর সে এখানে এলো কিভাবে? তার ধারনা দেলুকে দেখলে ছেলেটা নিশ্চয়ই চিনতে পারবে। কিন্তু এর বিপরীতে যা হল তা ছিল আসলেই অপ্রত্যাশিত।

সামনে গিয়ে দাঁড়ানো সত্ত্বেও ছেলেটা এমন ভাবে পাশ কেটে চলে গেল যেন সে কিছুই দেখেনি। এক সুতো এদিক সেদিক হলেই যে একে অপরের সাথে ধাক্কা খেত সেটাও বোধহয় সে লক্ষ্য করেনি। দেলু মিয়ার উপস্থিতিকে না দেখার মত করেই গিয়ে দাঁড়ালো তার বন্ধুদের সাথে। আশ্চর্যান্বিত হয়ে দেলু হা করে রইলো। কিছুটা উত্তেজিত হয়ে দেলু তখন তাদের সব বন্ধুদের সামনেই গিয়ে দাঁড়ালো। কি আশ্চর্য! এখানেও সেই একই ঘটনা। তার দিকে কেউ ফিরেও তাকাচ্ছে না। দেলু তাদের সাথে কথা বলতে চেষ্টা করতে গিয়েই সে লক্ষ্য করল যে তার শব্দ গুলো নিজের ভেতরেই আটকে যাচ্ছে। সে শত চেষ্টা করেও যেন কোন আওয়াজ বের করতে পারছেনা। এদিকে ছেলেগুলো নিজেদের মধ্যেই হাসি ঠাট্টা আর গল্পে মশগুল। দেলু মিয়ার উপস্থিতি যেন সেখানে কারোই দৃষ্টিগোচর হচ্ছেনা।

ভড়কে গিয়ে আসে পাশের সকলের দিকেই লক্ষ্য করল দেলু মিয়া। তখন সে বুঝতে পারলো যে সে এক অন্য ভুবনে চলে এসেছে। এখানে তার উপস্থিতি অনুপস্থিতির মতই। কেউ তাকে দেখছেনা। কেউ তাকে শুনতে পাচ্ছেনা। এখানে সে শুধু একজন নীরব দর্শক। মা আর ছোট বোন রোজিনার কথা মনে পড়ছিল। এতক্ষণে সবাই নিশ্চয়ই খুঁজে বেড়াচ্ছে তাকে। এসব ভাবতে ভাবতেই কান্না চলে এলো দেলুর। দুইহাত দিয়ে মাথার চুল খামচে ধরে মাটিতে বসে পড়ল সে। বুঝতে পারছিলনা এখন সে কি করবে। প্রাণপণে সৃষ্টিকর্তাকে ডাকতে লাগলো দেলু মিয়া। এ কোন পরীক্ষায় ফেললেন তিনি তাকে। কোন পাপের সাজা এটা…

প্রাণপণে সৃষ্টিকর্তাকে ডাকছিল দেলু মিয়া। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছিল। তখন দেখল সেই ছেলেটি বন্ধুদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাচ্ছিল। ইন্দ্রিয় সজাগ হল দেলুর। নিজেকে সামলে নিয়ে তাৎক্ষণিক ভাবে ওই ছেলের পিছু নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো সে। হাসপাতালের মর্গে এই ছেলেই ছিল। তাই এখান থেকে ফিরে যাবার রাস্তাও নিশ্চয়ই এর কাছেই হবে। ছেলেটার পেছনে পেছনে হাটতে লাগলো দেলু মিয়া। বিশাল একটা দরজা দিয়ে বেরিয়ে এলো ওরা। রাস্তায় নামতেই দেখল অনেক মানুষের ভিড়। এতক্ষণে সে নিশ্চিত হল এটা কোন স্কুল বা কলেজ। দামী দামী গাড়িতে করে ছেলেদের চলে যাওয়ার দৃশ্যই বলে এখানে বিত্তশালীদের সন্তানরাই পড়াশোনা করে।

দেলু দেখল সেই ছেলেটা গেটের এক পাশে দাড়িয়ে এদিক ওদিক দেখছে। কিছুক্ষণ পর পর হাতঘড়িতে সময় দেখছে। মনে হচ্ছে কারো অপেক্ষায় আছে সে। কয়েক মিনিট পরে হঠাৎ কারো ডাক শুনে ঘুরে তাকালো ছেলেটা। কয়েক ফুট দূরে মটর সাইকেলে বসে একটা ছেলে হাত তুলে “কাব্য-কাব্য” করে ডাকছে। হাসিমুখে তার কাছে গিয়ে বাইকের পেছনে চেপে বসল ছেলেটা। তখন দেলুর কাছে স্পষ্ট হল যে ছেলেটার নাম কাব্য।

বাইকে চড়ে ওরা দুজন চলে গেল। দেলু মিয়ার চারপাশ হঠাৎ কেমন যেন ঝাপসা হয়ে আসলো। কোন কিছুই পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল না। মাথাটা ঘুরছে। যেন সে অজ্ঞান হতে চলেছে। কিছু মুহূর্ত পরেই আবার সব স্বাভাবিক হয়ে গেল। কিন্তু দৃশ্যপট এখন ভিন্ন। সে এখন কোথায় আছে তা আন্দাজ করা গেল না। মনে হচ্ছে যেন তার চোখের সামনে বিশাল একটা পর্দা আর তাতে সে দেখতে পেলো কাব্য ও তার বাইকার বন্ধুটাকে। বড় একটা রাস্তা ধরে তারা মোটরসাইকেল নিয়ে যাচ্ছে। সেই ছেলেটা এক মনে বাইক চালাচ্ছে আর কাব্য পেছনে বসে তার কোমর ধরে আছে। সব কিছুই যেন একটা সিনেমার মত লাগছে দেলু মিয়ার কাছে। আর এই সিনেমার পরিচালক রিমোট হাতে আড়ালে কোথাও বসে আছে।

কিছুক্ষণ পর ওরা একটা রেস্টুরেন্টের সামনে এসে থামল। ভেতরে গিয়ে বসে তারা কিছুক্ষণ আড্ডা দিলো। তখন ওদের মধ্যকার আন্তরিকতা আর একে অপরের সাথে দুষ্টামি করার ভঙ্গি দেখে দেলু ভ্রু কুচকে রইলো। ব্যাপার টা কেমন যেন স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল না। এদের মধ্যকার সখ্যতাটা আসলেই কেমন যেন অন্য রকম। বাইকার ছেলেটা কাব্যর তুলনায় বয়সে কিছুটা বড় হবে। জিম করা সবল দেহ। হঠাৎ সে তার জ্যাকেটের ভেতর পকেট থেকে রঙিন কাগজে মোড়ানো ছোট কিছু একটা বের করে কাব্য কে দিলো। হাসি মুখে কাব্য সেটাকে নিয়ে খুলতে গেলেই ছেলেটা তাকে থামিয়ে দিলো। কাব্য তখন হাসতে হাসতে সেটাকে তার ব্যাগের ভেতর রেখে দিলো। সেখান থেকে বের হয়ে ওই ছেলেটা কাব্যকে একটা বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল।

দেলু মিয়া কিছুতেই বুঝতে পারছিলনা, সে এতক্ষণ কি দেখল! তার শরীর যেন ভারী হয়ে আসছিল। তার মনে এখন অসংখ্য প্রশ্নের বাহার। কে এই কাব্য? কে ওই ছেলে? আর সবচেয়ে বড় ও ভয়ঙ্কর প্রশ্ন, সে কিভাবে এবং কেন এ সব কিছু দেখতে পাচ্ছে!

রাতের সবকাজ শেষে কাব্য সেই ছেলের দেওয়া উপহারটা নিয়ে বিছানায় বসল। প্যাকেটটা খুলতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো ছোট্ট একটা কৌটা। আস্তে আস্তে সেটাকে খুলেই হা করে রইলো কাব্য। অসাধারণ সুন্দর একটা আঙটি। সাথে ছোট এক টুকরো কাগজ। সেটাতে লেখা, ফর মাই লাভ…

এটা দেখে খুশিতে আত্মহারা হয়ে উঠল কাব্য। কিন্তু এদিকে চোখ মুখ বাঁকা করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দেলু মিয়া। একটা ছেলে আরেকটা ছেলেকে উপহার দিচ্ছে আঙটি আর লিখেছে ফর মাই লাভ! আর এটা পেয়ে এই ছেলে আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মত খুশি হচ্ছে! দাঁত দিয়ে জিহ্বা চেপে ধরল দেলু মিয়া।

প্রায় অনেকক্ষণ হল ফোনে কথা বলছে কাব্য। দেলু মিয়ার এতক্ষণে বুঝতে বাকি নেই যে সে ওই ছেলেটার সাথেই কথা বলছে। কথা বলতে বলতে সে বিছানার এপাশ ওপাশ গড়াগড়ি খাচ্ছিল। মাঝে মাঝে ঘরের জানালায় হেলান দিয়ে মিষ্টি হেসে কথা বলছিল। কখনো আবার কানের নিচে ফোন চেপে রেখে কোলবালিশ জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে গভীর ভাবে কিছু অনুভব করার চেষ্টা করছিল। এদিকে এসব দেখে দাঁত কিড়মিড় করছিল দেলু মিয়ার। একটা ছেলে আরেকটা ছেলের সাথে! ছিঃ ছিঃ ছিঃ ভাবতেই গা ঘিনঘিন করছিল তার। দীর্ঘ ফোনালাপের পর ফোনের উপর আলতো করে চুমু খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল কাব্য।

চোখের সামনে ব্ল্যাংক আউট হয়ে গেল দেলু মিয়ার। এবার সে তেমন ভয় পেল না। সে জানে কেউ একজন আছে যে আড়ালে বসে এসব করছে। রিমোট দিয়ে টেনে টেনে শুধুমাত্র কিছু দৃশ্য দেখাচ্ছে তাকে। সেও চুপচাপ অপেক্ষা করছে পরবর্তী দৃশ্যের জন্য।

ঢাকা শহরের কোন একটা ব্যস্ত রাস্তার পাশে দাড়িয়ে আছে কাব্য। চারিদিকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। কাব্যকে এখন খুবই টিপটপ আর গোছানো লাগছে। যেন কোন বিশেষ উদ্দেশেই এখানে এসেছে সে। চোখে মুখে আনন্দের হাসি। পরমুহুর্তেই সেই ছেলেটা এসে শব্দ করে বাইক থামালো কাব্যর ঠিক সামনে। চমকে উঠে কাব্য তাকিয়ে রইলো ছেলেটার দিকে। ছেলেটাকেও খুব সুন্দর দেখাচ্ছিল। শার্টের খোলা বোতামের ফাকে তার ব্যায়াম করা বুক স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিলো। তাড়া খেয়ে ওর পেছনে চেপে বসলো কাব্য। এদিকে দেলুর খুব অসহ্য লাগছিল এসব দেখতে। দুটি ছেলের এসব সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না।

নিরিবিলি একটা এলাকায় অনেক বড় এক বিল্ডিঙয়ের নিচে এসে থামল ওরা। বাইকটা লক করে ভেতরে ঢুকল। লিফটে চড়ে অনেক গুলো ফ্লোর উপরে চলে এলো ওরা। লিফটের ভেতরে কয়েকবার কাব্যকে জড়িয়ে ধরতে চেয়েছিল ছেলেটা। কাব্য তাকে ঠেলে দিয়ে কিছু একটা বলতেই দুজনে মিটিমিটি হাসছিল। লিফট থেকে বের হয়ে একটা ফ্ল্যাটের দরজা খুলে সিনেমার নায়কদের মত দুহাত ঝুলিয়ে ঘাড় বাকিয়ে কাব্যকে ভেতরে ঢোকার জন্য বলল ছেলেটা। হাসতে হাসতে ভেতরে ঢুকল কাব্য। পেছনে ছেলেটা ঢুকে দরজা লক করে দিল। আর সাথে সাথেই কাব্যকে একেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল ছেলেটা। কিন্তু এবার আর কাব্য বাধা দিল না। সেও তাতে সায় দিয়ে দুহাতে পেঁচিয়ে ধরল ছেলেটাকে। আর তখনই শুরু হল দুজনের গভীর চুম্বন। যেন একে অপরকে গিলে খেতে চাইছে। দেলু মিয়া তখন দুহাতের মুঠি শক্ত করে চেপে ধরে রাগে গড়গড় করতে লাগলো।

ফ্ল্যাটের ভেতরের সব গুলো লাইট বন্ধ। শুধু শেষ মাথায় একটা বিছানার পাশে ছোট একটা টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে। সেই ক্ষীণ আলোতেই বোঝা যাচ্ছিল ফ্যাটের আয়তন খুব বড়। ছেলেটা তখন কাব্যকে পাজা কোলে করে সেই বিছানায় নিয়ে গেল। আর তারপর যা হল তা দেখে ঘৃণায় চোখ বন্ধ হয়ে আসছিলো দেলুর। তার মেনে নিতেই কষ্ট হচ্ছিলো। একটি ছেলে কিভাবে আরেকটি ছেলের সাথে এসব করতে পারে। ছিঃ ছিঃ ছিঃ

ওদের দুজনের উত্তেজনা যখন চরম পর্যায়ে ঠিক তখন ঘটল একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনা। ঘরের অন্ধকারাচ্ছন্ন অংশ থেকে ছুটে বেরিয়ে এলো চারজন যুবক। এসেই তারা মোবাইলে কাব্য আর তার বন্ধুর উত্তেজনাকর মুহূর্তের ছবি তুলতে লাগল। হঠাৎ এই ঘটনায় চমকে উঠে দুজনেই তড়িঘড়ি করে নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করল। ভয় ও আতঙ্কে দুজনেই তখন ঘাবড়ে গেলো। কাব্য শক্ত করে ধরে রেখে ছিল তার বন্ধুর হাত। তাৎক্ষণিক এই ঘটনায় চমকে গেল দেলু মিয়াও। সেও তখন মনোযোগের সাথে দেখতে লাগল। দেলু লক্ষ্য করল হঠাৎ তার হার্ট-বিট যেন বেড়ে গেলো।

ছেলেগুলো একের পর এক ছবি তুলেই যাচ্ছে আর কাব্য ও তার বন্ধু ভয়ে চুপসে আছে। কাব্য তখনও তার হাত চেপে ধরে আছে। হঠাৎ কাব্যর বন্ধুটি কিভাবে যেন স্বাভাবিক হয়ে গেল। নিজের হাত থেকে কাব্যর হাতটা ছাড়িয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। কাব্য আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে রইলো। আর ছেলেটা উঠে বাকি চারজনের পাশে দাঁড়িয়ে সবাই মিলে হাহাহাহা করে শয়তানী হাসি হাসতে লাগল। কাব্য হয়ত তখন বুঝতেই পেরেছিল যে এদের সাথে তার বন্ধুটিও জড়িত। সবকিছু তারা পূর্ব নির্ধারিত প্লান মতই করছে। কেঁদে ফেলল কাব্য। বিছানার চাদর দিয়ে সে নিজের শরীর ঢেকে রেখেছিল। একজন একটানে সেটাকে ফেলে দিলো। আর মুহূর্তের মধ্যেই কাব্যর সামনে চারজন অচেনা পুরুষ আর তার সেই বন্ধুটি নগ্ন হয়ে উপস্থিত। কাব্য চিৎকার করতে গেলেই একজন এসে তার মুখ চেপে ধরল। তার হাত পা চেপে ধরে তাকে বিছানার সাথে আড়ষ্ট করে ফেলল। আর তারপর…

একের পর এক কাব্যর উপর অমানুষিক নির্যাতন চালাতে লাগল। ক্ষণে ক্ষণে কাব্যর চিৎকার কিছুটা শোনা গেলেও এই বন্ধ ঘরে কেউ ছিলনা তাকে সাহায্য করার মত। পাঁচজন মানুষ একে একে নরপশুর মত কাব্যর দেহকে ভোগ করে চলছিলো আর উচ্চস্বরে উল্লাস করছিল। এদিকে চোখের জলে ভিজে একাকার হচ্ছিলো কাব্য। ঠিক সেই মুহূর্তে কাব্যর জন্য খুব মায়া হচ্ছিলো দেলু মিয়ার। যেন সে কাব্যর কষ্টটা অনুভব করতে পারছিল। তার চোখ থেকেও তখন দু’ফোটা জল গড়িয়ে পড়ল।

একজন থেকে যখন একজন পালাবদল হচ্ছিলো ঠিক সেই ফাকেই হঠাৎ ওদের ভেতর থেকে ছুটে পালাতে সক্ষম হল কাব্য। সে তখন যথেষ্ট দুর্বল হয়ে পড়েছিল। হোঁচট খেয়ে পড়ল একটা ডাইনিং টেবিলের উপর। তার পেছনেই ছুটে এলো সেই পাঁচজন। সাথে সাথে টেবিল থেকে ফল কাটার ছুরি তুলে নিলো সে। কাব্যর হাতে ছুরি দেখে থমকে গেল ওরা। কাব্য বুঝতে পারছিলনা সে কি করবে। এদিকে চোখ বড়বড় করে নিঃশ্বাস আটকে রেখে তাকিয়ে আছে দেলু মিয়া। ঘেমে সে চুপচুপে হয়ে গেছে। তবুও একবারের জন্য চোখের পলক ফেলতে পারছেনা।

ছেলেগুলো একপা দুপা করে কাব্যর দিকে এগিয়ে আসছে। আর একটু একটু করে কাব্য পেছনে যাচ্ছে। হঠাৎ কাব্যর পিঠ ঠেকে গেল দেয়ালে। তার এখন পালানোর কোন রাস্তা নেই। সবদিক ঘিরে আছে ওরা পাঁচজন। কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়ল কাব্য। কাঁদতে কাঁদতে সে বলল, “প্লীজ ডোন্ট কাম টু মি। আমি আর পারবনা। প্লীজ আমাকে যেতে দাও। আমি কাউকে কিছু বলবনা। প্লীজ… ডোন্ট ডু দিস!” কিন্তু এতে ওই ছেলেগুলোর মন নরম হল না। বরং তারা খুব কটু ভঙ্গিতে খিটখিট করে হাসতে লাগল। এদিকে থরথর করে কাপতে লাগল দেলু মিয়া। কারণ সে জানে এরপর কি হতে চলেছে। এই কথাগুলোই তখন কাব্য বলছিল লাশঘরে। ছেলেগুলোর হাসি দেখে চোখ বড়বড় হয়ে গেল কাব্যর। রাগে আর উত্তেজনায় সে গড়গড় করতে লাগল। আর হঠাৎ করেই সে ছুরিটা দিয়ে নিজের পেটে আঘাত করে বসল। সাথে এক তীব্র চিৎকার। সেই চিৎকারের তীব্রতা এতই বেশী ছিল যে তা সহ্য করতে কষ্ট হচ্ছিল দেলুর। দুহাতে কান চেপে ধরে রাখার পরেও যেন কাব্যর চিৎকারের শব্দে তার মস্তিষ্কের প্রতিটা অংশ ফেটে যাচ্ছিলো। সহ্য করতে না পেরে সে নিজেও চিৎকার করে উঠল।

হঠাৎ কেউ একজন এসে তার গায়ে হাত রাখল। তাকে দুহাতে ধরে ঝাঁকাতে লাগল। তাকে ডাকছিল, “দেলোয়ার, ও দেলোয়ার কি হইছে তোর!” চোখ মেলে দেখল উদ্বিগ্ন হয়ে তার মা বসে আছে পাশে। স্বাভাবিক হতে কিছুটা সময় নিল দেলু মিয়া। চারিদিকে তাকিয়ে দেখল সে তার ঘরেই নিজের বিছানায় হাত পা ছড়িয়ে বসে আছে। ঘেমে তার পুরো শরীর ভিজে আছে। তার ছোটবোন রোজিনা ছুটে গিয়ে এক-গ্লাস পানি নিয়ে এলো। ঢকঢক করে পানি খেলো দেলু। তার মা জিজ্ঞেস করল, “কি হইছে বাবা? স্বপ্ন দেখছস নাকি?
জবাবে দেলু শুধু বলল, “না কিছুনা। এমনেই।”

দেলু দেখল তখন দুপুর বারোটা বেজেছে। তার মানে কবিরের বাসা থেকে মদ খেয়ে ফিরে সে ঘুমিয়ে ছিল এতক্ষণ পর্যন্ত। আর এতক্ষণ তার সাথে যা হয়েছে তা ছিল শুধুই স্বপ্ন। এখনো সে বিশ্বাস করতে পারছিলনা সবকিছু। এ কেমন স্বপ্ন ছিল! যেন সে হারিয়ে গিয়েছিল অন্য কোন ভুবনে। বাকি দিনটা দেলুর এসব ভাবতে ভাবতেই কেটে গেলো। এসব কথা সে কারো কাছে বলতেও পারছিলনা। তার ধারনা কাল রাতে অতিরিক্ত নেশার কারণেই এসব দেখেছে সে। তার পরেও কেন যেন তার সব কিছুকে বাস্তব আর জীবন্ত মনে হচ্ছিলো।

সন্ধ্যার পরে হাসপাতালে গেলো সে। হাসপাতালের সবকিছুই স্বাভাবিক ছিল। তখন দেলু কিছুটা সাহস পেল। ধরেই নিলো এসব শুধু একটা স্বপ্নই ছিল। একটা বিশ্রী স্বপ্ন। সেগুলো ভাবতেই তখন খুব লজ্জা লাগছিল। রাতে যখন সে মর্গের সামনে বসেছিল তখন সে হাসপাতালের পরিবেশটা ভাল করে দেখে নিলো। সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল। ডাক্তার, রোগী আর নার্স দিয়ে ভরপুর। বিশেষ করে করিডোরের লাইট গুলোতে কোন সমস্যা ছিলনা। নিজেকে তখন নিজের কাছেই হাসির পাত্র মনে হচ্ছিল দেলু মিয়ার কাছে।

মধ্যরাতের দিকে দেলু তার উল্টো পাশের দেয়ালে একটা তেলাপোকা দেখল। উঠে দাঁড়িয়ে নিজে নিজেই বলল, “হাসপাতালে তেলাপোকা খুবই খারাপ জিনিস।” সাথে সাথে পায়ের জুতো খুলে একটা বাড়ি দিয়ে মেরে ফেলল তেলাপোকাটাকে। পা দিয়ে সেটার থেঁতলে যাওয়া দেহটাকে এক কোনায় চাপিয়ে রেখে ফিরে এসে বসল নিজের স্থানে। তখনি তার মনে পড়ল স্বপ্নের সেই তেলাপোকা গুলোর কথা। তার হঠাৎ ইচ্ছে হল গিয়ে লাশ-ঘরের ভেতরটা একবার দেখে আসার। একবার ভাবল সত্যি সত্যিই যদি সেখানে কেউ থাকে! আবার ভাবল ধুর স্বপ্ন তো স্বপ্নই। এভাবেই নিজের সাথেই মনে মনে তর্ক করতে লাগল সে। আর এক পর্যায়ে সে তার কল্পনা আর বাস্তবতার মধ্যকার সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে ঢুকল লাশ-ঘরের ভেতরে।

হুম। অস্বাভাবিক কিছুই নেই। গন্ধ থেকে শুরু করে মর্গের পরিবেশ, সব কিছুই ঠিকঠাক। কোথাও কারো কোন আনাগোনা নেই। অর্থাৎ এখানে বাস্তবতাই বিজয়ী। কাব্যর ঘটনাটা ছিল শুধু একটা বাজে স্বপ্ন। ফিরে আসার সময় হঠাৎ কি মনে করে যেন দেলু মিয়া ঘুরে দাঁড়ালো। এগিয়ে গেলো থার্ড লাইনের সর্বশেষ কোনার স্ট্রেচারটার দিকে। সেখানে একটা লাশ আছে। চাদর দিয়ে ঢাকা। কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে চাদরটা তুলল দেলু মিয়া। আর সাথে সাথে সে পাথরের মূর্তির মত জমে গেল। চোখদুটো বড়বড় হয়ে গেল। মুখ থেকে শুধু একটা শব্দই বের হল, “কাব্য!” !!!!

(সমাপ্ত)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.