মুখোশের অন্তরালে

লেখকঃ শাহরিয়ার সুমন

উৎসর্গঃ ব্রাক্ষ্মনবাড়িয়া শহরের জনৈক ফজলুর রহমান। এই গল্পের হাসান নামের মানুষটি তারই প্রতিচ্ছবি।

১।

ঢাকা শহরের ব্যাস্ততম এক সকাল। সকালের এই সময়টা হাসানকে কিছুটা দৌড়ের উপর থাকতে হয়। বাচ্চাদের স্কুলে নামিয়ে দিয়ে তাকেও সময়মত অফিসে পৌছাতে হবে। যদিও নিজের অফিস, তবুও সে প্রতিদিন ঠিক সময়ে অফিসে যায়। সময়ের খেলাপ সে একদম পছন্দ করে না। হাসানের বয়স চল্লিশ। রুপবতী স্ত্রী, দুই সন্তানের পিতা, শহরের একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, সবকিছু মিলিয়ে সে নিজেকে একজন সফল মানুষ মনে করে।
হাসান নাস্তা সেরে অফিসে যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছে, এরই মধ্যে কল এসে গেল দুই তিনটা। শীত গ্রীষ্ম সবসময়ই তাকে কোট টাই পরতে হয়। হাসানের স্ত্রী সীমা তার প্রতিটি বিষয়ে খেয়াল রাখে। কোন শার্টের সাথে কোন রঙের টাই, জুতার সাথে মিলিয়ে বেল্ট। সীমা কোট হাতে এগিয়ে এলো, হাসান দুই হাত প্রসারিত করে কোট পরে নিলো। তারপর সীমার কপালে একটা চুমু খেয়ে বললো, থ্যাংক ইউ।
– গতকাল এত রাত পর্যন্ত কোথায় ছিলে?
-আর বলো না, একটা বিজনেস পার্টি ছিল। আমার যাওয়ার কোনো ইচ্ছা ছিল না, শুধু ব্যাবসার খাতিরেই যেতে হল।
-আমাকেও সাথে করে নিয়ে যেতে?
– তোমার ওখানে ভাল লাগত না, শুধু শুধু বিরক্ত হতে।
– আচ্ছা, তোমার মানিব্যাগ আর ঘড়ি কোথায়? সেগুলো কি পার্টিতেই ফেলে এসেছ?
-কি বল তুমি! কোথায় ফেলে আসব? এখানেই আছে কোথাও।
-আমি পুরো ঘর খুজে দেখেছি, কোথাও নেই। তুমি ভাল করে মনে করে দেখো।
-আমার তো কিছুই মনে পড়ছে না।
-আচ্ছা বাদ দাও তাহলে, পরে হয়তো পাওয়া যাবে। আজ বিকালে পার্টির কথা মনে আছে?
-মনে থাকবে না কেন? আমার একমাত্র ছেলের জন্মদিন, আমি কি ভুলে যেতে পারি?
-মনে থাকলেই ভাল, তুমি বিকেলে পাচঁটার মধ্যেই ফিরে এসো। আর এখন যাওয়ার সময় শুভকে উইশ করো, না হলে বেচারা মন খারাপ করবে।
-ওকে রানীসাহেবা, আর কিছু?
সীমা হেসে বললো, আপাতত এটুকু করলেই চলবে।

২।

এখন সন্ধ্যা সাতটা, শুভর জন্মদিনের পার্টি ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। আমন্ত্রিত অতিথিরা সবাই চলে এসেছেন। কিছুক্ষণ পরেই কেক কাটা হবে। শুভ তার বন্ধুদের সাথে খুব মজা করছে। সে জানে আজ সে যতই শয়তানী করুক না কেন, আম্মু তাকে কিছুই বলবে, কারণ আজ তার জন্মদিন।
কলিংবেল বাজছে, সীমা দরজা খুলতে এগিয়ে গেল। সে ভেবেছে, নিশ্চয় আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে কেউ এসেছেন। কিন্ত দরজায় দাড়ানো ছেলেটিকে দেখে সে কিছুটা অবাক হল। বাইশ তেইশ বছরের একজন যুবক, হাতে গিফটের বাক্স নিয়ে কিছুটা নার্ভাস ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটি ফর্সা, হ্যাংলা পাতলা গড়ন, পাতলা ঠোট, চোখে চশমা, চেহারা কিছুটা মেয়েলী, কিশোরীদের মত ছোট্ট চিবুক।
– আমি অমিত। আপনি নিশ্চয় হাসান স্যারের স্ত্রী?
-হ্যা, কিন্ত তোমাকে আগে কখনো দেখেছি বলে তো মনে পড়ছে না।
– আপনার সাথে আমার আগে দেখা হয়নি। কিন্ত হাসান স্যারের সাথে আমার অনেকদিনের পরিচয়, তিনি আজ আমাকে তার ছেলের জন্মদিনে আসতে বলেছেন।
সীমা কিছুটা অবাক হল, কারণ আজকের পার্টিতে শুধু কিছু ঘনিষ্ঠ বন্ধু বান্ধব, নিকট আত্মীয়দের দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। হাসান কেন একটা সম্পুর্ণ বাইরের ছেলেকে দাওয়াত করতে গেল!
– ঠিক আছে, তুমি একটু দাঁড়াও, আমি হাসানকে ডেকে দিচ্ছি।
সীমা অমিতকে বাইরে রেখেই ভেতরে চলে এলো। হাসানকে এসে বলল, বাইরে একটি ছেলে দাঁড়িয়ে আছে, দেখো তো চেন কিনা, তুমি নাকি পার্টিতে দাওয়াত দিয়েছ।

অমিতকে দেখেই হাসানের চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
– তুমি এখানে কি করছ?
-তুমিই তো আমাকে আসতে বললে।
-আমি! মাথা খারাপ নাকি?
-তুমি না বললে আমি নিশ্চয় নিজে থেকে আসতাম না।
হাসান কিছুটা অপ্রস্তুত বোধ করছে, সিড়ির মধ্যে দাঁড়িয়ে এভাবে হাসানের সাথে কথা বলাটা ঠিক হচ্ছে না। সিড়ি দিয়ে নানান লোকজন উঠা নামা করছে। তার সাথে অমিতকে দেখে কেউ যদি কিছু মনে করে! এই ভেবে হাসান অমিতের হাত ধরে টেনে ছাদে নিয়ে আসলো। তারপর রাগে ক্রুদ্ধ হয়ে বললো, তোমার সাহস দেখে আমি অবাক হচ্ছি।
– কেন, আমি কি করলাম! অমিত কিছুটা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
-তোমার এখানে আসার কি দরকার ছিল?
-তুমি এমন করছ কেন? তুমি নিজেই তো আমাকে বলেছিলে শুভর জন্মদিনে আসতে।
-আমি আসতে বললেই তুমি আসবে নাকি! তোমার নিজের কোন কান্ডজ্ঞান নাই?
-তুমি নিজে আমাকে দাওয়াত দিয়ে এখন এভাবে অপমান করছ কেন?
হাসান রাগে অমিতের হাত থেকে উপহারের বাক্সটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে বললো,
ঐসব দুর্বল মুহুর্তে মানুষ কত কথাই বলে, সেসব মাথায় রাখলে চলে না।
-কাল রাতে তো তুমি আমাকে অনেকবার আই লাভ ইউ বলেছ, সেটাও কি তাহলে মিথ্যে ছিল?
-এসব বাজে কথা রাখ, তুমি এখন এখান থেকে যাও।
– যাব মানে! অমিতের মাথায় রাগ চড়ে গেল।
-তোমাকে কেউ আমার সাথে এখানে দেখে ফেললে বিশ্রি ব্যাপার হবে।
-কেন, আমি পার্টিতে গেলে কি হবে?
– আজকের পার্টিতে সবাই আমাদের নিজেদের মানুষ, সবার সামনে আমি তোমাকে কি বলে পরিচয় দেব? সীমাকে কি বলব আমি?
– কেন, বলবে আমি তোমার বন্ধু।
– তোমার বয়সী একটা ছেলে আমার বন্ধু! কেউ বিশ্বাস করবে এই কথা? তাছাড়া আয়নায় একবার দেখেছ নিজের চেহারা? তোমার কণ্ঠস্বর, কথা বলার ভঙ্গী, মেয়েলী চেহারা এসব দেখেই তো মানুষ সন্দেহ করবে।
-ও আচ্ছা, এতদিন তো আমার চেহারা নিয়ে তোমার সমস্যা ছিল না, বরং কাল রাতেও তো তুমি আমার প্রসংসা করলে। একদিনের মধ্যেই সবকিছু এত বদলে গেল!
– প্লিজ অমিত, আল্লাহর দোহাই লাগে, তুমি এখন যাও এখান থেকে।
অমিত রাগে চিৎকার করে বললো, কেন যাব আমি? মাসের পর মাস আমার সাথে রাত কাটাতে পার, আমাকে বুকে নিয়ে সুখের আশ্রয় খুজো, আর এখন কেন আমাকে সবার সামনে পরিচয় করিয়ে দিতে পার না? কি পেয়েছ তুমি? আমি কি তোমার রক্ষিতা?
হাসান সজোড়ে চড় বসালো অমিতের গালে। চড়ের আঘাতে অমিতের ফর্সা গাল লাল হয়ে গেল।
– তুমি আমাকে চড় মারলে!
-হ্যা মেরেছি, দরকার হলে আরো মারব।
-তোমার স্ত্রী যদি জানে, তুমি একটা ছেলের সাথে রাত কাটাও, কোথায় থাকবে তোমার এই মান সম্মান?
হাসান অমিতের শার্টের কলার ধরে বললো, ভয় দেখাচ্ছিস আমাকে? কি ভেবেছিস তুই বললেই আমার বউ তোর কথা বিশ্বাস করবে? তোর মত একটা হিজড়ার কথা কেউ বিশ্বাস করবে না, কেউ না।
– তারমানে তুমি আমাকে কখনোই ভালোবাসনি, সব মিথ্যে, অভিনয়? কেন তুমি আমার সাথে এভাবে প্রতারণা করলে?
– কিসের প্রতারণা? তুই আমাকে শরীর দিয়ে সুখ দিয়েছিস, তার প্রতিদানে আমি তোর ভার্সিটির সেমিস্টার ফি দিয়েছি, তোর বাসা ভাড়া, দামী মোবাইল, ল্যাপ্টপ কোন কিছুর কমতি রাখিনি আমি
– তুমি টাকা দিয়ে আমার ভালবাসাও কিনে নিয়েছো?
-হ্যা, নিয়েছি। টাকা দিয়ে সবকিছু কেনা যায়। তাছাড়া তোর মত একটা হাফ লেডিস ছেলেকে দিয়ে শুধু শরীরের জ্বালা মেটানো যায়, কখনো নিজের বাড়িতে আনা যায় না।
– আমি তো কখনো তোমার কাছে টাকা পয়সা চাইনি, যা দিয়েছ তুমি নিজে ইচ্ছে করে দিয়েছ। আমি তো কখনো তোমার কাছে আমার ভালোবাসা বিক্রি করতে আসিনি। তুমি আমাকে তোমার জীবনে টেনে এনেছ। আমাকে তোমার কামনার প্রসাধন বানিয়েছ।
-একদম চুপ, আর একটা কথা বললে সিকিউরিটি ডেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে তোকে বের করে দেব। তুই এক্ষুণী এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবি, তোর সাথে আমার সব বোঝাপড়া পরে হবে।
এই বলে হাসান ছাদ থেকে নীচে নেমে এল।
সীমা এসে জিজ্ঞেস করল, কোথায় গিয়েছিলে তুমি? শুভ সেই কখন থেকে কেক কাটার জন্য অস্থির হয়ে আছে।
– চলো সবাই মিলে কেক কাটি।
– ছেলেটা কে?
– আর বলো না, চাকরীর জন্য এসেছিল, বিদায় করে দিয়েছি.
-বিদায় করলে কেন? জন্মদিনে এসেছে যখন কেক খেয়ে যেত।
– ধুর, এইসব ছেলেদের এত পশ্রয় দিতে নেই। সুযোগ পেলে মাথায় উঠে বসবে।

জন্মদিনের কেক কাটা হচ্ছে, সবাই সজোড়ে করতালি দিল। শুভ কেক কেটে প্রথমে হাসানকে খাইয়ে দিলো, হাসানও ছেলের মুখে কেক তুলে দিলো। চারদিকে হইচই শোরগোল, শুধু অমিত একা বসে কাদঁছে অন্ধকার ছাদের এক কোণায়। বিশ্বাসভঙ্গের যন্ত্রণায় আজ সে ছটফট করছে। সে এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না যে হাসান তার সাথে এতটা খারাপ ব্যবহার করেছে। মানুষ কিভাবে এত সহজে বদলে যেতে পারে! পৃথিবীতে ভালবাসা শব্দটাই কি তাহলে মিথ্যে? ভালবাসা মানেই কি শুধু ক্ষণিকের মোহ, ছলনা আর বিশ্বাস ভঙ্গের খেলা? গতকাল রাতেও তো হাসান নামের মানুষটি অমিতের কত আপন ছিল! তাকে জড়িয়ে ধরে আদর করার সময় অসংখ্যবার বলেছে ভালোবাসি। সারাজীবন তার পাশে থাকার স্বপ্ন দেখিয়েছে। অথচ আজকের এই হাসান কত ভিন্ন! এই হাসানকে তো অমিত চেনে না। সে চিনত মুখোশপরা হাসানের ভালোমানুষি রুপকে, যাকে সে সর্বস্ব উজাড় করে ভালোবেসেছিল। কিন্ত মুখোশের অন্তরালে হাসানের সত্যিকার চেহারা যে এতটা কদর্য, অমিত তা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারে নি। ভালোই হল, আজকের এই পার্টিতে না এলে হাসান নামের মুখোশধারী জানোয়ারটাকে তো অমিতের কখনো চেনাই হত না। বরং তার সরলতার সুযোগ নিয়ে দিনের পর দিন তার শরীরটাকে ভোগ করে যেত। হায়রে শরীর! সবাই শুধু শরীরের ক্ষিধে মেটাতেই ব্যস্ত, মন নামক বস্তুটার অস্তিত্ব কোথায়? জটিল অস্পৃশ্য মনের খোঁজ করার এত সময় কোথায় শহুরে ব্যস্ত মানুষদের? শরীর বন্দনার উন্মত্ততায় চিরকাল চাপা পড়ে অসহায় মনের দীর্ঘশ্বাস।

৩।

সাত মাস পূর্বেঃ
অমিত হাসান সাহেবের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিসে চুপচাপ বসে আছে।
-প্লিজ অমিত, বুঝতে চেষ্টা কর, আমি সত্যি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।
-কিন্তু স্যার, আপনার স্ত্রী আছে, দুটো ছেলে মেয়ে আছে। তাদের সবাইকে এভাবে ঠকানো উচিত হবে না।
-অমিত, আমি কাউকে ঠকাচ্ছি না। তাদের প্রতি আমার যতটুকু দায়িত্ব, আমি সেটা খুব ভালভাবেই পালন করছি। কিন্তু তুমি বলো, আমার নিজের কি জীবনে সুখী হওয়ার অধিকার নেই?
-কিন্তু স্যার
-কোনো কিন্তু না অমিত। আমার বাড়ি গাড়ি, ব্যবসা, সংসার সবকিছু আছে। কিন্তু বিশ্বাস কর, আমি একটুও সুখী নই, একমাত্র তুমিই পার আমাকে সুখী করতে! জানো, আজ পর্যন্ত কখনো নিজের সুখের কথা চিন্তাও করিনি। কিন্তু তোমাকে দেখার পর আমার মনে হচ্ছে, আমার জীবন অসম্পূর্ণ, তোমাকে নিয়ে আমি আবার নতুন করে বাচঁতে চাই।
– কিন্তু আমি কখনো এসব নিয়ে ভাবিনি
– তুমি হয়তো বিশ্বাস করবে না, আমিও জীবনে আজ় পর্যন্ত কোন ছেলের সাথে কিছু করিনি। তোমার আগে অন্য কোন ছেলের প্রতি আমার কখনো এমন কিছু অনুভুতিও হয়নি।
– স্যার, আমাকে একটু ভাবার সময় দিন।
-তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করতে পারছ না?
– ঠিক তা নয়, তবে আমি নিজেকে নিয়েই কিছুটা বিভ্রান্ত।
– ওকে, আমি তোমাকে জো্র করছি না। তবে প্লিজ অমিত, তুমি আমাকে ফিরিয়ে দিয়ো না।

৪।

জন্মদিনের পার্টি শেষ। অতিথিরা যার যার ঘরে ফিরে গেছে। বাচ্চারা না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে। সীমা বাসায় একা, হাসান কি যেন একটা কাজে বাহিরে গেছে। অবশ্য হাসান থাকলেই বা কি? সে তো সবসময় নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। সীমাও ভাল আছে, তার সংসার আর সন্তানদের নিয়ে। হাসানের সাথে সীমার সম্পর্কটা তাদের রুটিনমাফিক জীবনের মাঝেই সীমাবদ্ধ। ভালবাসা নামক কোনকিছু কি এখনো তাদের দুজনের মাঝে অবশিষ্ট আছে? সীমা জানে না, সে অবশ্য এসব নিয়ে তেমন মাথাও ঘামায় না। তবে তার যখন নিজেকে খুব একা মনে হয়, সে ছাদে এসে দাঁড়ায়। তাকিয়ে থাকে দূর আকাশের অসীম শূন্যতার মাঝে। সীমার কাছে নিজের অস্তিত্বকেই তখন বড় আপেক্ষিক মনে হয়। সুবিশাল এই সৃষ্টির মাঝে ক্ষুদ্র এক ব্যাক্তিসত্ত্বার দুঃখ, কষ্ট অনেক তুচ্ছ।
ঘরের কাজ শেষ করে সীমা ছাদে উঠে আসে। অন্ধকারে ছাদে হাটতে গিয়ে সীমা হঠাৎ ভুত দেখার মত চমকে উঠে। সে অবাক হয়ে দেখে সন্ধ্যার সেই ছেলেটি ছাদের এক কোণে চুপচাপ মাথা নীচু করে বসে আছে।
– তুমি এখনো যাওনি? এখানে কি করছ?
-হাসান সাহেবের কিছু জিনিস আমার কাছে আছে। সেগুলো দেওয়ার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। ভেবেছিলাম পার্টি শেষ হলে তিনি হয়তো একবার ছাদে আসবেন।
– হাসান তো বাসায় নেই, কোথায় যেন গেছে।
-তাহলে আপনার কাছেই এগুলো রেখে যাই।
অমিত সীমার হাতে হাসানের ঘড়ি ও মানিব্যাগ এগিয়ে দিল।
-এগুলো তোমার কাছে কিভাবে এলো?
-কাল রাতে হাসান সাহেব এগুলো আমার বাসায় ফেলে এসেছিলেন।
-হাসান তোমার বাসায় কেন গিয়েছিল?
অমিত হেসে বললো, ওহ! আপনি তাহলে জানেন না, তিনি মাঝে মাঝে আমার বাসায় রাত কাটায়।
সীমা কিছুটা রেগে গিয়ে বললো, কি সব বলছ তুমি? মাথা ঠিক আছে?
-আসলে কি জানেন ম্যাডাম, হাসান সাহেব মাসের প্রতিদিন আপনার সাথে ঘুমাতে ঘুমাতে ক্লান্ত হয়ে যান। তাই মাঝে মাঝে রুচি বদলানোর জন্য আমার মত ছেলেদের সাথে ঘুমাতে আসেন।
সীমা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, তার মুখ দিয়ে যেন কোন কথা আসছে না। অমিতও সীমাকে আর কিছু বলার সু্যোগ না দিয়ে সিড়ি দিয়ে নেমে গেল।
৫।

অমিত একা একা রাস্তায় হাটছে। অন্ধকার নীরব রাস্তা। ঢাকা শহরের মানুষেরা নিজ নিজ ঘরে ফিরে গেছে। শহরের এদিকটাতে মানুষজন এম্নিতেও কিছুটা কম। অমিত হাটছে গন্তব্যহীন পায়ে, কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে সে নিজেও জানে না। আজ তার কোন ঠিকানা নেই, নেই কোন গন্তব্য। হাটতে হাটতে অমিত হঠাৎ খেয়াল করলো, সে রেললাইনের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে। এমন সময় দূর থেকে ট্রেনের ঝিকঝিক শব্দ শোনা গেল। ট্রেন আসছে।

পরিশিষ্টঃ
এক বছর পর
হাসান সাহেব এখনো তার মানিব্যাগ আর ঘড়ি ফেরত পায়নি। সীমা সবকিছু বুঝেও হাসানকে কিছুই জিজ্ঞাসা করেনি। কি হবে জিজ্ঞাসা করে? হাসান কি কখনো সত্যিটা স্বীকার করবে? তাছাড়া সত্যিটা জেনেই বা সীমার কি লাভ? আমাদের দেশের সীমারা স্বামীর সব অন্যায় মুখ বুঝে সহ্য করে প্রতিনিয়ত সুখের অভিনয় করে যায়। কারণ তাদের কোথাও যাওয়ার কোন জায়গা নেই। বিধাতার সৃষ্ট বিশাল এই পৃথিবীতে ছোট্ট এই সংসারটাই তাদের একমাত্র আশ্রয়স্থল।
হাসান তার নিজের জন্য একজন নতুন শয্যাসঙ্গী খূজে নিয়েছে। হাসানের এই নতুন সঙ্গী টাকা আর দামী উপহার পেয়েই খুশী, অমিতের মত ভালোবাসার তার প্রয়োজন নেই।

আর অমিত? কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। সেই রাতের পর ঢাকা শহরের ইট পাথরের ভীড়ে তাকে কেউ আর খুজ়ে পায়নি।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.