কম্বিনেশন

লেখকঃ এক্সট্রিম নয়েজ

“একাকীত্বের মায়াজালে দুঃখ মোদের অপার,
তাইতো সবাই হন্যে হয়ে খুঁজছি সুখের লকার।

মন দিচ্ছি, জোর দিচ্ছি, করছি সাধন ভজন,
সব চেষ্টাই বৃথা মোদের, যদিনা মেলে কম্বিনেশন।”

* ক *

পকেটের ভেতর মোবাইলটা মিনিটে ৩ বার ভাইব্রেট করেই চলেছে। ভেতরে ভেতরে রাগে ফেটে পড়লেও বাহিরে দাঁত কেলানো হাসি নিয়ে সামনে বসে থাকা ভদ্রলোকের আষাঢ়ে গল্প শুনতে হচ্ছে তানভীর কে। মার্কেটিং লাইনের চাকরিতে চাহিদা মত বেতন পাওয়ার গ্যারান্টি না থাকলেও পাবলিকের কাছ থেকে হাবির মা’র কিচ্ছা শুনতে শুনতে দ্রব্যমূল্যের বেগে সাধারণ জ্ঞান ভাণ্ডারও যে ঊর্ধ্বগতিতে থাকবে তা পঞ্চাশ টাকার স্ট্যাম্পে নোটারী করে দেওয়া যায়। তিন টাকার মাল তিরিশ টাকায় বেচতে হলে যে এই সব কিছু হা করে গিলতেই হবে সে কথা সিনিয়ররা সপ্তাহে তিনবার গজ দিয়ে ঠেলে ব্রেইনে ভরে দেয়। আর এই দিকে পকেটের মধ্যে রাকিবের ম্যাসেজ গুলোর নাচন কোঁদন তানভীরের মেজাজটা আরো বেশী বিগড়ে দিচ্ছে।

-হা হা হা… বুঝলেন ছোট ভাই। কলেজে থাকতে আমারও খুব শখ ছিলো এমন একটা জিনিসের। তখন অনেক পাতলা ছিলাম তো তাই শরীরে তেমন বল পেতাম না। চিন্তা করে দেখেন, তখন যদি এই জিনিস থাকতো তো কত উপকার হত… হাহাহা…

বিরক্তি আর রাগ চেপে রাখার চেষ্টা করল তানভীর।
-জ্বী স্যার। তো আপনি কি তাহলে একটা এনার্জি প্যাকের অর্ডার দিচ্ছেন?
-হ্যাঁ তা তো অবশ্যই। তবে এখন না। আপনি আমাকে কালকে একবার ফোন করবেন।

অর্ডার হাতছাড়া হতে চলেছে বুঝতে পারলেও আর কথা বলার ইচ্ছে হল না তানভীরের। সেখান থেকে বের হয়েই রাকিবকে ফোন করল।
-আচ্ছা তোমার সমস্যা কি? তুমি জানো যে আমি মিটিং এ আছি, তার পরেও খালি ম্যাসেজ দিয়েই
যাচ্ছ!
-তোমার মিটিং মানেই যে হোটেলে বসে বসে সিঙ্গারা-সমুচা চিবানো আর মেয়াদউত্তীর্ন চারা গুলোকে বনসাই হবার স্বপ্ন দেখানো তা কি আমি জানি না ভাবছো! এর চেয়ে বরং ওই প্রোডাক্ট গুলা তুমি নিজেই ব্যাবহার করো। মাঝে মধ্যে তো মনে হয় তোমারই এটা বেশী দরকার… হাহাহা…
-দেখো মেজাজ খারাপ করবেনা বলে দিচ্ছি। এমনিতেই এই মাসের বাকি মাত্র কয়েক দিন আর টার্গেটের ধারে কাছেও যেতে পারিনি এখনো। এমন হলে এই খরার বাজারে আর চাকরী করে বাচা লাগবে না।

-থাক থাক আর আবেগ দেখাইতে হবে না। এখন শুনো, ছোট ফুপুর বিয়ে আগামী সপ্তাহে। তো কাল আমরা সবাই যাচ্ছি গ্রামের বাড়িতে। আম্মুকে বলেছি তোমার কথা, সে বলেছে তোমাকে সাথে নিয়ে নিতে। সো, আজকের মধ্যে তোমার প্যাকিং স্যাকিং যা করার করে ফেলো। কমপক্ষে দশ দিনের ট্রিপ তো হবেই। ওকে?
-লাগে যে আমি ওনার আন্ডারে চাকরী করি তাই ওনার অর্ডার শুনেই এখন প্যাকিং করা শুরু করে দিবো! কালকে আমাকে একটা ট্রেনিং আর একটা সেমিনারে এ্যাটেন্ড করতেই হবে। তাই আমি যাচ্ছি না। তুমিই যাও, আর তোমার ওই কাজিন গুলার সাথে টাঙ্কিবাজি করো। আমি গেলে তো আবার তোমার তাতে অসুবিধা হবে।

-আমি জানতাম তুমি এমন একটা বাহানা বানাবেই। আর তোমার এই খোঁচা মারার অভ্যাসটা কি যাবে না কখনো? একটু সুযোগ পেলেই হল, আর ছাড়বে না সেটা… আচ্ছা শুনো, কালকে না পারো বিয়ের আগের দিন চলে আসো না প্লীজ। বিক্রমপুর তো আর বেশী দূর না। তাছাড়া তুমি তো আমাদের বাড়ি ঘর সবই চেনো। প্লীজ প্লীজ… তোমাকে ছাড়া বিয়ে বাড়িতে আমার খুব অসহ্য লাগবে।
-আ…আচ্ছা। দেখি আমি যদি এর মধ্যে পেন্ডিং কাজগুলো শেষ করতে পারি তো চলে আসবো।

-না এত কিছু বুঝি না। তুমি আসছো এটাই ফাইনাল। আর কোন বাহানা চলবে না।
-আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে আসবো।

-আর শুনো, আসার সময় তোমার ওই এনার্জি প্যাক নিয়ে এসো কয়েকটা। বিয়ে বাড়ি তো, বুঝতেই পারছো। দু’জনে মিলে ক্যানভাসিং করে বিক্রি করে ফেলবোনে সব গুলা। হাহাহা…
-তুমি মনে হয় জীবনেও আর ফাজলামি ছাড়বে না! রাখলাম আমি, তুমিই করো গিয়ে তোমার ক্যানভাসিং।

* খ *

“সম্পর্কটা দিন দিন উত্তর দেয়ালে অবস্থানরত কবি নজরুলের ছবিটার মত হয়ে যাচ্ছে। যতই নতুন পেরেক গেঁথে সেটাকে সোজা করিনা কেন, দক্ষিণ জানালা থেকে একটু দমকা হাওয়া এলেই আবার এক দিকে ঝুলে পড়ে। কোন জ্যোৎস্না রাতে জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে আসা একটুখানি চাঁদের আলোতে ছবিটা দেখলে বুকের ভেতরটা মুচড়ে আসে। ভয় হয়… এই বুঝি ছবিটা ঝড়ে পড়বে… এই বুঝি আমার বাবুটা হারিয়ে যাবে…”

হয়ত আরো কিছু লেখার ছিল। কিন্তু আঙ্গুল জমে আসে রেহানের। নোটটা মিনি-মাইজ করতেই চোখে পড়ে পলকের এই মাত্র আপলোড করা ছবিটার উপর। কি সুন্দর মায়াবী দুষ্টু চোখে তাকিয়ে আছে রেহানের বাবুটা। ইচ্ছে হয় সেই সৌন্দর্য দেখেই জীবন কাটিয়ে দিতে। কিন্তু এতে যে শুধু দৃষ্টিই জুড়াবে, মনের যে তাকে আরো কাছে চাই।

রেহানের এতক্ষণ খুব রাগ হচ্ছিলো পলকের উপর। ও যে কেন এতটা গা ছাড়া স্বভাবের হল! রেহান না বললে কখনো নিজে থেকে খোঁজ নিবে না। আজ রেহানের ইচ্ছে ছিল দেখবে পলক কতক্ষণ পর্যন্ত নিজে থেকে ম্যাসেজ বা ফোন না করে থাকতে পারে। কিন্তু ছবিটা দেখার পর রেহানের মন এতক্ষণে মোমের মত গলে গেছে। সকল রাগ মেঝেতে ফেলে ম্যাসেজ করেই ফেললো।
-কেমন আছো?
-এইতো ভালো। তুমি কেমন আছো?

-আছি আগের মতই। সারাদিন কোথায় ছিলে?
-এইতো ক্লাস, প্রাইভেট এইসব নিয়ে খুব ব্যস্ত ছিলাম।

-অনেক বার ফোন করেছিলাম তোমাকে।
-বললাম না, আজকে অনেক ব্যস্ত ছিলাম। কথা বলার মত সিচুয়েশনই ছিল না।

-ওহ! আচ্ছা পলক, আমাদের সম্পর্কটা কত দিন হল?
-এইতো প্রায় চার মাসের মত হবে।

-না পলক। যেদিন তুমি আমাকে তোমার ভালবাসার কথা জানিয়েছিলে সেই দিনটা আজ থেকে ঠিক পাঁচ মাস সতেরো দিন আগে ছিলো।
-বাহ! তুমি তো দেখি একেবারে দিন গুনে গুনে হিসেব রেখেছো। এই জন্যেইতো তোমাকে আমি এত্তগুলো ভালবাসি। [কয়েকটা কিসিং ইমোটিকনস]

-জানো এই পাঁচ মাস সতেরো দিনে তোমার সাথে আমার ফোনে কতবার কথা হয়েছে? চার বার। এর মধ্যে শুধু দুই বার আমাদের পনেরো মিনিটের উপরে কথা হয়েছে। একবার তুমি আম্মুর সাথে বাহিরে, আরেকবার বাসায় অনেক মেহমান এসেছে পরে ফোন করবে বলে দুই মিনিটের মধ্যেই রেখে দিয়েছো। আর এর বাহিরে অগনিতবার আমার ফোন তুমি রিসিভই করোনি। কারণ, তুমি ব্যস্ত ছিলে…
-আচ্ছা তুমি এত ছোট ছোট ব্যাপারে মন খারাপ করো কেন বলতো। সব সময় তো আর ফোনে কথা বলার মত পরিস্থিতি থাকেনা। তাছাড়া আমি তো বেশীরভাগ সময়েই ফেসবুকে থাকি। এখানেই তো কথা হচ্ছে অনেক। শুধু শুধু ফোনে টাকা খরচ করারইবা কি দরকার এত। কথা কম হলেও আমি তো তোমারই আছি তাইনা!

-হয়তো তুমি ঠিকই বলেছো। এসব অনেক ছোট ছোট ব্যাপার। এ নিয়ে আমার এত মাথা ঘামানো ঠিক না। আচ্ছা তোমার না কলেজে কি সব ঝামেলা হচ্ছিলো বলেছিলে, সেটার কি হল?
-আরে ধুর! বাদ দাও তো ওসব। সেটা আব্বু আর ভাইয়াই দেখবে। তুমি তোমার কথা বলো।

-আমার আর কথা! তোমার আর আমার মাঝে তো এখনো তুমি আর আমি ছাড়া আর কিছুই নেই। আমি ভালই আছি। সব কিছুই চলছে নিয়ম মত। তুমি ভাল আছ তো?
-আমার শুধু তুমি আছো এতেই আমি খুশি। তাই খারাপ থাকার প্রশ্নই উঠে না।

-আমার খুব ঘুম পাচ্ছে পলক। অনেক ক্লান্ত আমি। এখন যাই। ভাল থেকো তুমি।
-আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি তাহলে ঘুমাও। শুভ রাত্রি…

যান্ত্রিকতা আসলেই দিন দিন আমাদের রোবটের মত করে দিচ্ছে। যেখানে কথা আছে, গান আছে, সুর আছে… কিন্তু নেই কোন অনুভূতি। ঠিক যেমন করে রেহানের শব্দহীন বাক্যগুলোর পেছনে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস কখনোই পলকের অনুভবের সীমারেখায় পা রাখতে পারে না…

* গ *

সেদিন রাকিবের ফুপুর বিয়েতে যায়নি তানভীর। আসলে যেতে পারেনি। পড়ালেখার পাশাপাশি একটা নেটওয়ার্ক মার্কেটিং কোম্পানিতে চাকরী করে নিজের হাত খরচ জুটাতে হয়। মধ্যবিত্ত ঘরে এই বয়সী একটা ছেলের সব খরচ পরিবার থেকে পাওয়া যায় না। একবার এমবিএ টা শেষ করে ভাল একটা চাকরী পেলেই নিজের পরিবার আর রাকিবকে নিয়ে দেখা স্বপ্নগুলোকে এক এক করে বাস্তবায়ন করতে হবে। এটাই ওর টার্গেট। তাই আপাতত চাকরী হারানোর ঝুঁকি এড়াতেই আর বিক্রমপুর যায়নি সে। রাকিব এই প্রতিটা ব্যাপারই বুঝে। যদিও কয়েক দিন যাবত রেগে আছে, তবুও তানভীর জানে যে রাকিবের এই অভিমানও তার ভালবাসার একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিক্রমপুর থেকে ফেরার পর থেকেই সে কথা বলছে না তানভীরের সাথে। ফোন করলেও রিসিভ করে না। তাই বাধ্য হয়েই তাকে রাকিবের কলেজের সামনে অবস্থান নিতে হল।

কলেজ ছুটির পর সেখান থেকে ওকে নিয়ে চলে এলো রবীন্দ্র সরোবরে। আর এতটা সময় ঠিক মূর্তির মতই ঠায় চুপ হয়ে আছে রাকিব। তানভীর ওর ফুপুর বিয়ের ব্যাপারে নানা কথা জিজ্ঞেস করলেও তার একটারও উত্তর দেয়নি সে। তানভীরও হাল ছাড়েনি। রবীন্দ্র সরোবরের পেছন দিকে লেকের পাড়ে বসে ননস্টপ বকবক করেই চলছে।
-আচ্ছা তোমার ওই নাক বোঁচা কাজিনটার কি খবর? কি যেন নাম! ওহ… মনে পড়েছে। রিফাত… রিফাত। ইসস… এমন কিউট একটা জিনিসের নাম কি আর ভোলা যায়! সব দিকে ঠিক আছে। একেবারে গাছ পাকা তেঁতুল। শুধু সমস্যা একটাই, নাকটা থ্যাঁতলানো…
(আড়চোখে তাকিয়ে রাকিবের ঠোঁট বাঁকানো মৃদু হাসি লক্ষ করলো তানভীর। তারপর মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে বলতে শুধু করলো।)
-শুধু তোমার জন্য, না হলে সেবার যখন তোমাদের বাড়িতে গিয়েছিলাম, যেভাবেই হোক তেঁতুলটাকে পটিয়ে…

কথাটা শেষ করতে পারেনি তানভীর, এরই মধ্যে একজোড়া তরুণ হাতে তার চুলগুলো খামচে ধরলো রাকিব।
-তুমি তো দিন দিন খুব বেশী বেড়ে যাচ্ছো! তুমি এমন কুমতলবি হলে কবে থেকে!!
-হাহাহা… তুমি ক’দিন পর পর যেভাবে রাগ করে বসে থাকো, এতে একটা সেকেন্ড অপশন হাতে রাখা ভালো।
-ইউ ব্লাডি ডগ…!!
বলেই দু’হাতে তানভীরের গলা চেপে ধরতে চেয়েছিল রাকিব। তানভীর ওর হাত ধরে ফেলতেই দুজনের মধ্যে হালকা ধ্বস্তাধস্তি শুরু হয়ে গেল। হঠাৎ দু’জনেই লক্ষ্য করল, খানিকটা দুরে দশ বারো বছর বয়সী একটা ছেলে ওদের দিকে বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ওরা দু’জনেই কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখল অন্য কারো নজরে ওরা পড়েনি এখনো। ছেলেটা বাদাম বিক্রি করে। ওকে কাছে ডেকে পাঁচ টাকার বাদাম নিয়ে দশ টাকা দিয়ে বাকিটা রেখে দিতে বলল। ছেলেটা অত্যন্ত আনন্দ মাখা একটি হাসি উপহার দিয়ে চলে গেল।

বাদাম চিবোতে চিবোতে তানভীর বলল…
-আচ্ছা ভ্যালেন্টাইন’স ডে তে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান করলে কেমন হয়?
-হোয়াট! প্ল্যান! তাও আবার তোমার সাথে! তুমি প্ল্যান করে কোনদিন সেটা বাস্তবায়ন করেছো? এমন রেকর্ড আছে তোমার?

-হাহাহা… তা অবশ্য নেই। বাট ইউ নো, দেয়ার ইজ এ ফার্স্ট টাইম ফর এভরিথিং… ভাবছি দুরে কোথাও যাবো। ঢাকার বাহিরে। শুধু তুমি আর আমি। কক্সবাজার গেলে কেমন হয়?
-ঢাকা থেকে বিশ মিনিটের পথ বিক্রমপুর, সেখানে যেতেই তোমার এই সমস্যা সেই সমস্যা। আর কক্সবাজার গেলে না জানি কোন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে। শুধু শুধু আষাঢ়ে গল্প করো না তো। শেষ সময়ে একটা না একটা অজুহাত তুমি পাকাবেই।

হালকা কাশি দিয়ে গলাটা পরিষ্কার করল তানভীর।
-তোমাকে তো একটা সুখবর দেয়া হয়নি। সেই লোকটা অবশেষে আমার কাছ থেকে দুটি প্রোডাক্ট কিনেছিল। শুধু তাই নয় সে তার আরো কিছু ফ্রেন্ডকেও রেফার করেছিল। সকলেই কিনেছে। এই সুবাদে আমার এই মাসের টার্গেট কমপ্লিট হয়েও অনেক বেশী এগিয়ে গেছে। আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল এই মাসে আমি Salesman of the Month নির্বাচিত হয়েছি। মোটামুটি ভাল অঙ্কের একটা বোনাস, আর ম্যানেজারকে বলে ভ্যালেন্টাইন’স ডে এর সময় তিন দিনের ছুটি এখন আমার পকেটে। সো, এবার আর কোন অজুহাত নয়।
-বিশ্বাস হয় না। চাপা মারছো না তো?

-যাই ভাবো। কিন্তু এবারের ভ্যালেন্টাইন আমরা কক্সবাজার বিচে পালন করছি, দ্যাটস ফাইনাল।
রাকিবকে মাথা নিচু করে মৃদু হাসতে দেখা গেল।
-ঠিক আছে। এই খুশিতে তোমার একটা কামড় পাওনা রইলো।

-হোয়াট! কামড়! ভাবছিলাম খুশি হয়ে এতোগুলা চুমু দিবে। আর তুমি কামড়াতে চাও!!
-এহ! আসছে উনি চুমু নিতে। আগে নিজের মুখটা ধুয়ে আসো। তারপর এসো চুমু খেতে। কি দুর্গন্ধ! ওয়াক!

-আচ্ছা! এখন আমার মুখে গন্ধ চলে এসেছে? তোমার কি মনে হয় আমি ভুলে গেছি সেদিনের কথা? এই গন্ধ ওয়ালা মুখেই তো…
-থাক থাক! আর ইতিহাস শোনাতে হবে না। অনেক দেরী হয়েছে। এখন বাসায় যেতে হবে। তোমার এত চুমু খাওয়ার শখ হলে এখানেই বসে থাকো। সন্ধ্যার পর অনেক লোক পাবে বিনা পয়সায় চুমু খাওয়ার।
-আমার ঠোঁটের তো আর দাম নাই, যেখানে সেখানে ব্যাবহার করি আর কি! চলো তোমাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আমাকে আবার একটু লাইব্রেরির দিকে যেতে হবে।

* ঘ *

পৃথিবীতে সবাই ভালবাসতে জানে। কিন্তু সবার ভালবাসা পূর্ণতা পায় না। ইতিহাসে ভালবাসার নিপুণ সাক্ষী রেখে গিয়েছিল খুব অল্প কিছু মানুষ। কিন্তু এমন অসংখ্য যুগল ছিল, যাদের কথা কেউ জানে না। সময়ের পদতলেই পিষ্ট হয়ে নিঃশেষ হয়ে গেছে তাদের ভালবাসা। কারণ তারা ভালবাসাকে শুধু ‘ভালবাসি’ শব্দটার মাঝেই সীমাবদ্ধ রেখেছিল। একে আত্মার সাথে মিলাতে পারেনি। ঠিক এমনি দু’জন আজকের রেহান আর পলক। যারা একে অপরকে ভালবাসে ঠিকই, কিন্তু কেউ কারো অনুভবের সাথী হতে পারেনি। কেন পারেনি, সেই প্রশ্ন অবান্তর। আবেগ তাদের ভালবাসার সূত্রপাত করলেও, বিবেক এখনো এই ভালবাসাকে গ্রহণ করেনি। রেহানের জন্য হয়ত পলকই সবকিছু। কিন্তু পলক কি তাকে সেই স্থানে রেখেছে! হাজার ব্যস্ততার মাঝে প্রিয়জনের জন্য এতটুকু সময় বের করার নাম ভালবাসা না। ভালবাসা হয় তখন, যখন একে অপরের সকল ব্যস্ত সময়েরও সাথী হতে পারে।

পলকের উদাসীনতায় দিন দিন বিমর্ষ হয়ে পড়ছে রেহান। সে চায় পলকের প্রতিটা খুঁটিনাটি বিষয়ের অংশীদার হতে। কিন্তু পলক কখনই তাকে সেই সুযোগ দেয় না। যেন ‘ভালবাসি’ শব্দটার বাহিরে তার আর কোন ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই রেহানের। একই শহরে থাকা সত্ত্বেও তারা এখনো দেখা করতে পারেনি। রেহান অনেক বার চেষ্টা করলেও নানা অজুহাত আর ব্যস্ততা দেখায় পলক। অবশেষে একদিন রাজি হল পলক। আনন্দে প্রায় আত্মহারা হয়েছিল সেদিন রেহান। ব্যস্ত নগরীর একটি নিরিবিলি রেস্তরায় সেদিন বসেছিল দুজন। রেহানের মুখ থেকে কথা ফুটছিল না। যাকে এতদিন ছবিতে দেখে নিজের স্বপ্নের সাথী বানিয়েছিল, সে আজ চোখের সামনে বর্তমান। প্রচণ্ড সুখানুভূতিতে চুপসে যাচ্ছিল রেহান। কিন্তু পলককে দেখে তেমন কিছু মনে হচ্ছিল না। তাকে তেমন আনন্দিত বা উচ্ছ্বসিত দেখাচ্ছিল না। বরং রেহানের চুপচাপ থাকা দেখে কিছুটা বিরক্ত হচ্ছিল সম্ভবত।
-রেহান। সমস্যা কি তোমার?
-কই না তো। কিছুনা।

-তাহলে চুপ করে আছো কেন? কিছু বলো…
-আসলে কি বলবো বুঝতে পারছি না।

রেহান আসলেই বলার কিছু খুঁজে পাচ্ছিল না। কি বলবে বুঝতে পারছিল না। কিভাবেই বা বলবে, আগে থেকেই তো সে পলকের সাথে কথোপকথনের গভীরে কখনো পৌছাতে পারেনি। তবে সে এই স্থানে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করতেই চুপ না থাকার চেষ্টা করল।
-আচ্ছা তোমার পড়ালেখা কেমন চলছে?
-হুম সবকিছু ভালই চলছে।

-ওহ। তোমার সেই সমস্যাটা সমাধান হয়েছে?
-সেটা অনেক আগেই মিটে গেছে।

-ভাল। তোমার বাসার সবাই কেমন আছে?
-সবাই ভাল। আচ্ছা রেহান, আমরা কি এখানে আমার পড়ালেখা আর ফ্যামিলির ব্যাপারে ডিসকাস করার জন্য বসেছি?

খানিকটা বিব্রত হয়ে গেল রেহান।
-না মানে… এসব ব্যাপারে কি জানতে পারি না আমি?
-অবশ্যই পারো। তাই বলে সেটারওতো একটা ওয়ে আছে তাইনা? প্রথম বারের মত দেখা করছি আমরা, আজ আমরা আমাদের নিয়ে কথা বলব। তা না, তুমি আমার পড়ালেখা, কলেজের প্রবলেম, আমার ফ্যামিলিকে টেনে নিয়ে আসছো এখানে।

কিছুক্ষণ নীরবতার পর ঠাণ্ডা গলায় পলক বলল,
-দেখো রেহান। আমি জানি তুমি খুবই ভাল একটা ছেলে। কিন্তু আমি মোটেই ডোমিনেটেড হতে পছন্দ করি না কারো দ্বারা। এখানেই তোমার সাথে আমার পার্থক্য। আমি স্বাধীন ভাবে থাকতে চাই। স্বাধীন ভাবে ভালবাসতে চাই।
-কি বলছ তুমি? আমি কি তোমার স্বাধীনতায় বাধা দিয়েছি? আমি কি তোমাকে ডমিনেট করছি বা করার চেষ্টা করছি? আমি তোমাকে ভালবাসি তাই তোমার ব্যক্তিগত ব্যাপার গুলো সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি। আমি চাই তুমি সব সময় ভাল থাকো। নিরাপদ থাকো। তাই তোমার খুঁটিনাটি বিষয়গুলো জানতে চাই। আই ডু ইট, বিকজ আই কেয়ার এবাউট ইউ। কিন্তু এর মানে এই না যে আমি তোমার উপর রুল করতে চাই।

-আই এ্যাম সরি রেহান। আই থিংক উই শুড এন্ড দিস হিয়ার।
-মানে?

-আসলে তোমার আর আমার মাঝে ব্যাপারটা ওই ভাবে এগোচ্ছে না। আমি তোমার দোষ দিচ্ছি না। কিন্তু আমরা আসলে একে অপরের জন্য যথাযোগ্য না।
প্রচণ্ড একটা ধাক্কা অনুভব করল রেহান মনে মনে।
-তাই যদি হয়, তাহলে সেদিন কেন আমার মনে ভালবাসা জাগিয়েছিলে? তখন কেন ভাবনি আমাদের ব্যাপার টা ওই ভাবে এগোবে না? কেন আমাকে এতদূর টেনে এনে এখন হাত ছেড়ে দিচ্ছো?

-দেখ রেহান, আমি তোমাকে টেনে আনিনি। তুমি নিজেই এতটা গভীরে নেমেছো। তুমি তোমার আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারো না, সেটা কি আমার অপরাধ? আর আমিই প্রথম তোমাকে ভালবাসার কথা বলেছিলাম সত্য। হয়ত সেটা আমারই একটা অসঙ্গায়িত ভুল ছিল। আই এ্যম সরি ফর দ্যাট।

-পলক, তুমি কি ঠিক আছো? তুমি কি বলছো তুমি কি বুঝতে পারছো? প্লীজ বোঝার চেষ্টা করো…
-রেহান আমি অবুঝ নই। আমি যেভাবে তোমাকে চাই সেভাবে কখনোই পাবো না, আর তুমিও আমাকে কখনো তোমার মত করে পাবে না। তাই শুধু শুধু এই সম্পর্কটাকে আর বয়ে বেড়ানোর বোকামি করা উচিত না। এই সম্পর্কটার আগে তুমি আমার বন্ধু ছিলে, এখন থেকেও ভাল একটা বন্ধু হয়েই থাকবে আজীবন। আর আমি তোমাকে যদি কোন কষ্ট দিয়ে থাকি, মাফ করে দিও প্লীজ। তোমার জন্য সবসময় আমার শুভকামনা থাকবে। ভাল থেকো, বাই…

হনহন করে চলে গেল পলক। এদিকে হতভম্ব হয়ে বসে রইলো রেহান। বিশ্বাস হচ্ছিল না, শুরুর আগেই সব কিছু শেষ হয়ে যাবে এভাবে। যে রেহানের হৃদয়ের সমস্ত জুড়ে ছিল পলকের রাজত্ব, সে আজ মুহূর্তের মধ্যেই সব হারিয়ে নিঃস্ব। হয়ত পলক ঠিকই বলেছিল। তাদের দুজনের মধ্যে ব্যাপারটা ঠিক সে ভাবে এগোচ্ছিল না, যেভাবে একটি আদর্শ যুগলের বেলায় হওয়া উচিত। হয়ত তারা সিদ্ধান্ত নিতেই ভুল করেছিল। ভালবাসার আগেই হয়ত বোঝা উচিৎ ছিল, এটা কি ভালবাসা? নাকি ভালোলাগা!

** ১৪ই ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহর **

সায়েদাবাদ থেকে এস. আলমের ঢাকা টু কক্সবাজার টিকেট নিয়ে বসেছে তানভীর ও রাকিব। দুজনের চোখে মুখেই প্রাপ্তি ও তৃপ্তির পরিপূর্ণতা। কিছুক্ষণের মধ্যেই ইঞ্জিনের আড়মোড়া ভেঙে বাস রওয়ানা হল সমুদ্রের টানে। একটি হেড-ফোনের দুটি স্পীকার দুজনের কানে। চলছে ভালবাসার মায়াঘেরা কোন রোম্যান্টিক প্লে-লিষ্ট। শহরের কোলাহল ছেড়ে দুরন্ত হাইওয়েতে পৌঁছেই নিভিয়ে দেয়া হল গাড়ির ভেতরের সমস্ত বাতি। অন্ধকার বাসের ভেতর সকল যাত্রীই প্রায় বিশ্রাম নিতে ব্যস্ত। আর এরই মাঝে দুজোড়া হাত দুষ্টু মিষ্টি খুনসুটি করে চলেছে একে অপরের সাথে। হঠাৎ যখন সবার অলক্ষে একে অপরের গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে কানে কানে বলে, হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন’স ডে সুইট-হার্ট। তখন যেন সৃষ্টি জগতের সকল পূর্ণতা আর ভালবাসা এসে ভর করে সেই যুগলের মনে প্রাণে। আদি অন্তের সমস্ত সুখ বেড়িয়ে ধরে তাদের। কিন্তু এরই মাঝে আড়ালে পড়ে যায় তাদের ঠিক কয়েক ফুট পেছনে বসে থাকা এক নিঃসঙ্গ যুবক। যে তার সমস্ত দৃষ্টি মিলিয়ে দিয়েছে শো শো শব্দে পেরিয়ে যাওয়া অন্ধকার প্রকৃতির পানে। একটিবারও পাশের খালি সিটটার দিকে ফিরে তাকাবার সাহস হয়না তার।

সামান্য দূরত্বে বসে কেউ যাচ্ছে সমুদ্রকে সাক্ষী রেখে ভালবাসার ষোলকলা পূর্ণ করতে, আর কেউ যাচ্ছে নিজের নোনা ব্যথাগুলো সমুদ্রের নোনা জলে ভাসিয়ে দিতে। দুজনের মাঝে পার্থক্য একটাই, একজন তার ভালবাসার লকার খুলে সমস্ত সুখের ঐশ্বর্যকে উপভোগ করছে। আর আরেকজন হাজার চেষ্টা করেও সেই লকারের কম্বিনেশন মেলাতে ব্যর্থ হয়েছে। আর এই কম্বিনেশনই আজ একই পথে তাদের ভিন্ন উদ্দেশ্যের জন্ম দিয়েছে…

(সমাপ্ত)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.