অযাচিত ভালোবাসা

লেখকঃ সন্নিহিত রেনেসাঁস

১.

শাওনকে বাসায় বেড়াতে এনেছে মমিন। অফিস ছুটির পর বাইকে করে শাওনকে ওর বাসার সামনে থেকে তুলে নিয়েছে।আধ ঘন্টার পথে একটা কথাও বলেনি কেউ। অথচ কারো স্বভাবে এটা নেই। দুজনেই প্রচুর কথা বলে। থমথমে ভাবটা কারোই ভালো লাগছে না। তবু দুজনেই নির্লিপ্ত। মমিন অবাক হয়। আগে কতকথাই না বলত শাওন। চঞ্চল পাখির মতো বুলি আওড়াত। সময় সব বদলে দিয়েছে। কিন্তু কিছু আকর্ষণ, কিছু সম্পর্ক সময় বদলাতে পারে না। এসব ভাবতে ভাবতে ওরা বাসায় এসে পৌছেছে।

~ইশ! কি বিচ্ছিরি রুম ! তুই এই রুমে থাকিস কি করে? টেবিলের উপর এলোমেলো বই, কলম, খাতা, পেন্সিল, ঘড়ি, চায়ের কাপ। সব দেখছি এখানে। চেয়ারটা দেখ! একগাদা জামাকাপড়। সব অগোছালো। ফ্লোরটা ! ছ্যা ছ্যা ! কয়েক ইঞ্চি ময়লা জমেছে। সিগারেটের ছাই, ফিল্টার, কাগজ, চিপসের খোসা। কয়মাসে ঝাড়ুর বাড়ি পড়েনি কে জানে! এভাবে থাকিস তুই? এভাবে? এটা রুম না ডাস্টবিন? একনাগাড়ে কথাগুলো বলে খাটের উপর বসে পড়ল শাওন। মমিনের দিকে মেকি রাগান্বিত দৃষ্টিপাত করলো। মিটমিট হাসছে ও।

আর এই হাসির জন্য শাওন নিজের প্রাণও বাজি রাখতে পারে। মমিন বোধহয় জানে তার এই হাসির রহস্য। যেটা সে বহুবার ব্যবহার করেছে। ~খবরদার! দাঁত কেলিয়ে হাসবি না। ~দেখ, আমি তোর মতো ফুলবাবু না। আটটা~পাঁচটা অফিস করে আমি ঘর গোছাতে পারব না। ~তা পারবি ক্যান। তুই তো যেখানে খাস সেখানে হাগস। ~হা হা! তুই গুছিয়ে দে। ~কেন? আমি গোছাতে যাব কেন? একটা বিয়ে করে নে! ~সেটাই তো সমস্যা রে। কোন মেয়েই মনে ধরে না। তারা প্রেম করবে পয়সাওয়ালার সাথে, আর বিয়ে করবে সাধু টাইপ ছেলে। ধুর!

~ওকে বাবা! আমিই গুছিয়ে দিচ্ছি। বলে শাওন ঘর গোছাতে লেগে গেল। মমিন গেল শাওয়ার নিতে। এই দুই অন্তরঙ্গ বন্ধু। প্রত্যেকে প্রত্যেকের হাড়ির খবর জানে। নিজেদের সুখ~দুঃখের ভাগিদার। মমিনের কাছে এটা স্রেফ বন্ধুত্ব। কিন্তু শাওন! ওর দুর্বলতা অন্যখানে। সেটা কখনো বলতে পারবে না মমিন কে।

২.

শাওয়ার নিতে গিয়ে মমিন ডাকল শাওনকে। ~শাওন! আমার শ্যম্পুটা দিয়ে যা ! ~দিচ্ছি। শ্যম্পু নিয়ে গেলে মমিন বলল, তুইও আয়, একসাথে ঝর্ণার নিচে গোসল করি। তোর মনে আছে, ছোটবেলায় একসাথে কত গোসল করেছি? ~না! না! থাক। ~কেন? পরে পানি পাবি না, আয় তো। তুই তো আর মেয়ে না। বলে ওকে টেনে বাথরুমে ঢোকালো। ঝর্ণার পানি পড়ছে।মোমিন বক্সার পড়ে। ওর পশমি বুক, চওড়া কাঁধ, পেশীবহুল বাহু। যে বাহুডোরে প্রায়ই আবদ্ধ হয় শাওন। কিন্তু যেভাবে চায় সেভাবে না।

শাওন মমিনকে জড়িয়ে ধরে। ~কিরে? ~খুব ঠান্ডা পানি। ~তাহলে তাড়াতাড়ি গোসল করে বের হ। তার আগে আমারে গোসল করায় দে! শাওনের হাত কাঁপে। তার পরেও সে পরম মমতায় মমিনের মাথায় শ্যম্পু করে দেয়। গোসল করিয়ে দেয়। ঝর্ণার পানির সাথে শাওনের চোখের পানি মিশে যায়। মমিন তার খবর জানে না। শাওয়ার সেরে দুজনে বাইরে থেকে আনা খাবার খায়। কিন্তু শাওনের জ্বর আসে। টকটকে লাল চোখ নিয়ে তাকায় মমিনের দিকে।

মমিন যে অনুভূতিহীন, তা কিন্তু নয়। শাওনের প্রতি সেও যথেষ্ট কেয়ারিং। তাই এই প্রিয় বন্ধুটির সামান্যতম অসুখ, কষ্ট, বিপদে সে ই সবার আগে ঝাপিয়ে পড়ে। অদ্ভুত একটা সম্পর্ক। ওর বক্তব্য হলো~ যাকে আমি ভালোবাসব, সে এম্নিতেই বুঝবে। সত্য এটাই যে,প্রকৃত ভালোবাসা প্রকাশের প্রয়োজন হয় না। নিখাদ প্রেম তো এমন ই হয়। তাতে প্রকাশের আনুষ্ঠানিকতা কম, গভীরতা বেশি।

৩.

শাওনের মাথায় জলপট্টি দিচ্ছে মমিন। শাওন ব্যস্ত হয়ে যায়। কিছুতে জ্বর কমছে না। প্রচন্ত মাথাব্যথায় কাতর। ওর অসহ্য যন্ত্রণা দেখে চিন্তিত হয়ে পড়ে মমিন। কিন্তু এই মফস্বলে এত রাতে ফার্মেসি খোলা নেই। ওর কষ্টে নিজেই কষ্ট পাচ্ছে। ~খুব বেশি কষ্ট হচ্ছে রে? ~না। তুই শুধু পাশে থাক।~আছি। কিচ্ছু হবে না। একটু ঘুমাতে চেষ্টা কর। আমি তোর গা মুছে দিচ্ছি। ~তুই ব্যস্ত হোস না। জ্বর এমনিতেই ছেড়ে দেবে। আমার ঠান্ডা লাগছে। একটা চাদর দে।

একটাও চাদর খুঁজে পেল না ও। সব নোংরা। তার প্রিয় বন্ধুকে বেড়াতে এনেছে। কিন্তু এসেই একটা অসুখে পড়ল। কি করবে বুঝতে না পেরে নিজেই ওকে বুকের সাথে চেপে ধরে রাখল। এই যে ভালোবাসা, মায়া, এর কি কোন নাম আছে? না আছে এর কোন বাহুল্যতা? রক্তের সম্পর্ক নেই। নেই সঙ্গায়িত কিংবা প্রকাশিত কোন ভাব। ছোটবেলার বন্ধু। মাঝে প্রায় পাঁচ বছর কোনো সংযোগ ছিল না। তবু কতটা আত্নিকতা।

নিষ্পাপ শিশুর মতো মুখে শাওন নির্বাক হয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। ও ভেবেই পায় না, এই ছেলেটাকে ওর এত আপন মনে হয় কেন। ও পাশে থাকলে অন্যরকম একটা প্রশান্তি খুঁজে পায় মমিন। শাওন ঘুমিয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে বালিশে শুইয়ে দিয়ে ওর মাথার কাছে বসে চিন্তা মগ্ন হয়ে পড়ে মমিন। ইচ্ছে করে পাঁচটি বছর শাওনের সাথে কোনোরকম যোগাযোগ রাখেনি ও। কিন্তু ওর থেকে পালাতে পারল না। সেই পুরনো মায়ায় আবার জড়িয়ে যাচ্ছে।

৪.

পাঁচ বছর অতীতে ফিরে কিছু স্মৃতি হাতড়ে বেড়ায় মমিন। তখন সবে মাত্র কলেজের গন্ডি পার হবার দ্বার প্রান্তে। মনের মাঝে উচ্ছ্বলতা, দুরন্তপনা, আবেগতাড়িত রিপু। পৃথিবীর সবকিছুই চঞ্চল লাগার বয়স। এই বয়সে বাছুর প্রেমে উদ্বেলিত হয়ে মমিনের প্রতি নিজের আবেগ প্রকাশে মরিয়া শাওন। সে সময় বোঝে না, পরিবেশও না। অন্ধের মতো একই দিকে ধাবমান। মমিন কাঁঠাল গাছে বসা। দূর থেকে শাওনকে আসতে দেখা যাচ্ছে। এসেই গাছে উঠে বলল~ দোস্ত, আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। ~কেন? ~তোর জন্য। ~মানে কি?

~ঐ যে তোকে না দেখে থাকে পারি না। তাই মনে হল! ~ধুর ! এটা কিছু না। তোর সবকিছুতে বাড়াবাড়ি! ~হবে হয়তো। কিন্তু মমিন টের পায় শাওনের দুর্বলতা। শাওনের আবেগ অন্য বন্ধুদের মতো না। ওর কিছু কর্মকান্ডে বোঝা যায়। কিন্তু ওর কোনো রকম ফিলিংস নেই। তাই একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নেয় ও। মার্চের ১৭ তারিখে মমিনরা ঢাকা চলে যায় খুলনা থেকে। কোনো যোগাযোগের মাধ্যম না রেখেই। এদিকে শাওন পাগল প্রায় হয়ে যায়। নাওয়া খাওয়া বন্ধ। অঝোর ধারায় অশ্রুপাত একমাত্র কাজ।

কি কারনে মমিন এমন করে সেটাই বুঝে উঠতে পারে না শাওন। আরো অনেক বন্ধু নানা সময়ে এলাকা থেকে বিদায় নিয়েছে। কই, তাদের জন্য তো প্রাণ কাঁদে নি! তাদের জন্য তো বুকের মাঝে বিশাল শূন্যতা ভর করে নি! অথচ মমিনের সাথে কাটানো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রতিটা মুহুর্ত নক্ষত্রের মতো উজ্জ্বল। কিন্তু সময় বলে একটা ধ্রুব সত্য আছে। সে মানুষকে নিজের মতো বেগবান করে। সময়ের বেগে বেগবান হয়ে মানুষ জীবনের নতুন নতুন মানে খুঁজে পায়। শাওন ও তেমনটা পায়।

৫.

শাওন ঘুমাচ্ছে। জানালার কাছে গিয়ে সিগারেট ধরিয়ে একটা হিসেব কষতে বসে মমিন। তার জীবনটা একরকম ছন্নছাড়া। মা বাবা নেই। একমাত্র ভাই প্রবাসী। ওর কোনো নাড়ীর টান নেই। নেই কোনো পিছুটান। তবু কি যেন একটা আজ খুব করে টানছে ওকে। অদ্ভুত অনুভূতি। শূন্যতা নয়, পূর্নতা নয়। হাহাকার নয়, দুঃখ নয়। গলার কাছে অব্যক্ত একটা আবেগ বিধে আছে। না তাকে পারছে বের করতে, না পারছে ভেতর নিতে। কিন্তু এভাবে দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকার অভ্যেস নেই ওর।

বসন্তের স্নিগ্ধ হাওয়া বইছে। বাতাসের মৃদু মদির গন্ধে সিগারেটের গন্ধটা বেশ কটু লাগছে। ওকে ছুড়ে ফেলে দেয় মমিন। এই গন্ধটা পছন্দ করত না শাওন। কিন্তু এখন সে চেইন স্মোকার। কারনটা মমিন। একটা নিষ্পাপ ছেলে। যে আত্নার দিক থেকে অনেক পবিত্র। সে ওর জন্য কতটা কষ্ট করেছে! পাঁচটা বছর অপেক্ষা করেছে। ভেবে নিজের চোখে নোনা জলের অস্তিত্ব খুঁজে পায়। খুব অবাক হয় ও।

তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় শাওনের দিকে। যেটা অনেক আগেই পারত কিংবা প্রয়োজন ছিলো। শাওন ওর কপালে উষ্ণ ঠোটের স্পর্শ অনুভব করে চোখ মেলে তাকায়। অপার বিস্ময়, আকস্মিকতায় নির্বাক হয় ও। ~মমিন? ~হ্যা। আমি। তোর মন।মমিনকে মন বলে ডাকতিস না? দুইজোড়া চোখের আনন্দ অশ্রুতে সিক্ত আবেগ আর শাওনের অযাচিত প্রেম।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.