ভালোবাসি হয়নি বলা

লিখেছেনঃ হোসেন মাহমুদ

শাহিন ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয় নাজিমের মাধ্যমে।
তখন আমি মোহাম্মদপুর হাউজিং লিমিটেডের চার নাম্বার রোডে থাকতাম। আর শাহিন ভাই পাঁচ নাম্বার রোডে। দুই রুমের ছিমছাম ছোট্ট একটা ফ্ল্যাট। কাজের ছেলে জাফর আর মিনিকে নিয়ে তার সংসার। মিনি হচ্ছে তার পোষা বিড়াল। মিনিকে বিড়াল বললে শাহিন ভাই দারুণ ক্ষেপে যেত। কারণ একাকী জীবনে তার সঙ্গ-দানের একমাত্র সঙ্গী হল এই মিনি।

রান্নাটা শাহিন ভাই দারুণ করত। হরহামেশাই জাফরকে ট্রে হাতে আমার বাসায় আসতে হত, শাহিন ভাইয়ের নিত্য নতুন রেসিপি নিয়ে। কখনো বিফ সিজলিং, কখনোবা স্টোবেরি কেক আবার কখনো কড়াই গোস্ত। খাওয়ার ব্যাপারে আমিও ছিলাম আপোষহীন। এই খাওয়ার লোভেই শাহিন ভাইয়ের ফ্ল্যাটে আমার আনাগোনা ছিল বেশি, আর শাহিন ভাইয়েরও দরকার ছিল কথা বলার সঙ্গী। আমাদের আড্ডা চলত নানান বিষয়ে। আমি চাইতাম আড্ডার চায়ের কাপে রবীন্দ্রনাথ কিংবা রৌদ্র মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ চুমুক দিক, কিন্তু শাহিন ভাই থাকত মিডিয়া নিয়ে। সাবিনা ইয়াসমিন নাকি শাদী মোহাম্মদকে বলেছিল, “আচ্ছা তোরা পাছায় এমন বাঁশ কি করে নিস” তার কথা শুনে আমি সাপের মত ফণা তুলতাম আর শাহিন ভাই হেসে কুটি কুটি হত। কথায় কথায় শাহিন ভাইয়ের অতীতে ফিরে যেতাম,

তিনি উড়তি বয়সের ছেলেপেলেদের মত দুনিয়া চষে বেড়িয়েছেন একটাসময়। নতুন নতুন বন্ধুদের নিয়ে ক্লাব, আড্ডাতেও মজে থাকতেন। স্বল্প পরিচিত এক বন্ধুর সাথে দেখা করার জন্য বিমানে যোগে রাতারাতি চট্টগ্রামে গিয়ে উঠেছিলেন একবার। তার কথায় একসময় পুলিইস্টপ পড়ত, সাথে একটা দীর্ঘশ্বাস। মানুষের সব দিন সমান যায় না। সেই সময় শাহিন ভাইয়ের রূপ-যৌবনের ঠ্যালায় পা মাটিতে পড়ত না, অবশ্য পা এখনো মাটিতে পড়ে না।

শাহিন ভাইয়ের দুনিয়া এখন হুইল চেয়ারের চাকায় সীমাবদ্ধ, কারণ শাহিন ভাই প্যারালাইজড।

কাজের ছেলে বাসায় না থাকলে তার দুনিয়া সম্পূর্ণ অচল। কোনমতে হাত দুটো চালাতে পারতেন কিন্তু হাত-দ্বয় দিয়ে বাথরুমটা পর্যন্ত সারতে পারতেন না। আর কাজের ছেলে জাফর ছিল তুখোড় আড্ডাবাজ আর খেলুড়ে। শাহিন ভাইয়ের চোখ দুটো নুয়ে আসলে সে পগার পার। একদিন বাসার কলিং বেল ছাপতে-ছাপতে হাতের আঙুল ক্ষয় করে ফেলেছিলাম, তারপরও কেউ দরজার খুলছিল না। ভীতর থেকে মিনি আর শাহিন ভাইয়ের কণ্ঠ শোনা যাচ্ছিল অবিরত, কিন্তু দরজা বন্ধ থাকায় আমি নিরুপায়। জাফর দরজায় তালা মেরে বোধহয় খেলতে চলে গিয়েছিল। এদিকে আমি উপায়ন্তর না দেখে, দ্বিতীয়-তলায় বাড়ীওয়ালার কাছ থেকে চাবি নিয়ে দরজা খুলে দেখি, শাহিন ভাই কমেড়ে মুখ আকটে পড়ে আছে। তার সারা গায়ে ময়লায় ছড়াছড়ি। সেই করুণ দৃশ্য জীবনে দ্বিতীয় বার আর দেখতে চাই না আমি। একজন প্রতিবন্ধী মানুষের কষ্ট সেইদিন মন দিয়ে অনুভব করেছিলাম। অথচ শাহিন ভাই একদম সুস্থ মানুষ ছিলেন একটা সময়। একদিন বাসায় সবার সাথে গল্প-করা অবস্থায় হঠাৎ মাথা ঘুরিয়ে সোফায় পড়ে যান। হসপিটালে নেয়ার পরে জানতে পারেন তিনি প্যারালাইজড। আমি বড় করে ধম নিয়ে চিন্তা করি, এই যে আমি এখন এত সুস্থ সবল একজন মানুষ, জানিনা কাল কি হতে পারে আমার জীবনে। হতে পারে শাহিন ভাইয়ের মত আমিও প্রতিবন্ধী হয়ে অমন জীবন অতিবাহিত করছি। বুঝলাম সৃষ্টিকর্তা অনেক ভাল রেখেছেন আমায়। মন থেকে শোকর আদায় করেছিলাম সেইদিন।

অবশ্য শাহিন ভাই চাইলে তার ভাই-ভাবীর সাথে বাবর রোডে গিয়ে থাকতে পারতেন। কিন্তু তিনি কারো করুণা নিয়ে বাঁচতে চান না। আমি অপশন ফেললাম, “নুরজাহান রোডে নিজের ফ্ল্যাটে গিয়ে থাকলেই পার” শাহিন ভাই উত্তর দেন, “ সেই ফ্ল্যাট ভাড়াতেই আমি টেনে-টুনে জীবন পার করছি” তখন আমি শব্দহীন হয়ে যেতাম তার আত্মসম্মান বোধ দেখে।

একটা পর্যায়ে বুঝতে পারতাম আমার সঙ্গ শাহিন ভাই খুব পছন্দ করতেন। আর কথায় বার্তায় আমার প্রতি তার দুর্বলতার ছাপটাও তখন আমি তাকে বন্ধু অথবা ভাই হিসাবেই দেখতাম। তবে তার সাথে মিশতে মিশতে এক পর্যায়ে আমি সত্যি শাহিন ভাইয়ের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম। যদিও আমি ভাল করেই জানি, শাহিন ভাই নিজের হাত চাড়া শরীরের কোন অংশ নাড়াতে পারতেন না। সুতরাং তার প্রতি সেক্সুয়াল কোন আকর্ষণ থাকার প্রশ্নই উঠে না।

দিনদিন শাহিন ভাইয়ের সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা বেড়েই চলছিল, কিন্তু মুখ ফুটিয়ে কোন দিন বলিনি শাহিন ভাই “তোমাকে ভালোবাসি”। কথাটা বলবো বলে অনেকদিন তার কাছে গিয়েছিলাম, মিনিকে একদিন বলেও ছিলাম। কিন্তু মিনিতো আর মুখ ফুটে তার মনিবকে বলতে পারবে না, তাই শাহিন ভাই তখনো অজানাতেই ছিল তার ভালোবাসা প্রাপ্তি থেকে।

২০০৮ সালের জুলাই মাসের দশ তারিখ সকালে সাড়ে আঁটটার দিকে একটা ফোন আসলো শাহিন ভাইয়ের ফোন থেকে। ফোনে ছিলেন শাহিন ভাইয়ের ভাবী। তিনি বলেলন, শাহিন অনেক অসুস্থ, তাকে ল্যাভএইডে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। যদি আমি যেতে চাই তাহলে যেন তাড়াতাড়ি শাহিনের বাসার সামনে চলে আসি। অবাক হলাম ভাবীর কণ্ঠে, কারণ ভদ্রমহিলার সাথে আমার পরিচয় ছিল না। তাহলে কি শাহিন ভাইয়ের অনুরোধে আমাকে ফোন করেছিলেন? এদিকে আমার আবার চলছে মিড়-ট্রাম পরীক্ষা। কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে সেইদিন শাহিন ভাইকে দেখেছিলাম তার বাসার সামনে। কি করুণ সেই চাউনি। এর আগেও শাহিন ভাইয়ের এমন হয়েছে, খুব বেশী অসুস্থ হয়ে গেলে তাকে হসপিটালাইজড হতে হত। তাই তার সাথে দেখা করে বেশি গুরুত্ব না দিয়ে আমি পরীক্ষা দিতে চলে গেলাম। ভেবেছিলাম আমিও তো ধানমণ্ডিতেই যাচ্ছি, পরীক্ষা শেষে ল্যাব-এইড হয়েই ফিরবো।

কিন্তু আপসোস আমি খুনাক্ষরেও ভাবিনী সেই দেখাই শাহিন ভাইয়ের সাথে আমার শেষ দেখা। পরীক্ষা শেষে শাহিন ভাইয়ের মোবাইলে ফোন দেই, কেউ ধরছিল না, শুধু রেজোয়ানা চৌধুরী বন্যার কণ্ঠে “ দিন গুলী মোর সোনার খাঁচায় রইলো না” বাজতে থাকলো। শাহিন ভাইয়ের ওয়েলকাম টিউনে ছিল রবিঠাকুরের এই গানটা। এই গানটা নিয়ে তার সাথে আমার কথা কাটাকাটি পর্যন্ত হয়েছিল, “ আলোচনার টেবিলে রবি ঠাকুর টানতে তোমার গায়ে চুলকানি লাগে অথচ তার গান মোবাইলে ঢুকিয়েছ কেন?” আমার কথাতে সে মুচকি আসতো, তার সেই হাসি আর রবীন্দ্রনাথের এই গান আমি এখনো ভুলিনি। আজও আমার প্রিয় রবীন্দ্র সঙ্গীতের এই গানটি আমার ল্যাপটপে রাখি না। কারণ এই গান শুনলে তার স্মৃতি আমাকে অক্টোপাসের মত ঘিরে ধরে।
আমি শুধু একটাই আপসোস করি, জীবনে একবারের জন্যও তাকে বলতে পারলাম না, শাহিন ভাই আমিও তোমাকে ভালোবাসি।

আজ এত গুলো বছর পরে একটা কথা বুঝলাম, ভালোবাসি শব্দটা বলতে কার্পণ্য করা উচিৎ নয়। কে জানে শাহিন ভাইয়ের মত কালকের দিনটা অনেকের জীবনে নাও আসতে পারে। তাই যাকে ভালোবাসি তাকে সঠিক সময়ে বলে দেয়া উচিৎ, বলার পরে পরিস্থিতি যা হবার হবে।

অন্তত আমার মত আজীবন আপসোস তো করতে হবে না।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.