তারা এবং আমি

লেখকঃ সন্নিহিত রেনেসাঁস

১.

মধ্যরাতে মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙে যায়।তারপর ভোর হবার আগ পর্যন্ত আর দুই চোখের পাতা এক হয় না। এটা কি ইনসমনিয়া? অনেক চিন্তা ডালপালা ছড়িয়ে বটগাছ হয়ে মাথায় ভর করে।এলোমেলো ভাবনারা চারিদিক থেকে ঘিরে ধরে, খুব ছটফটে একটা অস্বস্তি হয়।একা একা রাত জাগা সহজ কাজ না। সেই অসহজ কাজটা প্রায়ই আমাকে করতে হয়। রাতের গন্ধের সাথে সিগারেটের ধোঁয়ার গন্ধ সহবাস করে।আমার নেশার মতো লাগে। সব রাতের গন্ধ এক না। চাঁদনী রাত আর অমাবস্যার রাতের গন্ধের মধ্যে তফাত আছে।

২.

“এত পিচ্চি একটা ছেলের গা থেকে এত রক্ত বের হচ্ছে কেন?” চিন্তায় পড়ে যায় টিটু নামের লোকটা। ছেলেটা অনেকক্ষণ চেঁচিয়ে এখন চুপ হয়ে গেছে।ও ধারণাই করে নিয়েছে,মারা যাচ্ছে। ও চিন্তা করে পায়না এই লোকগুলোকে মানুষ বলে? আবার জ্ঞান হারিয়ে যায় ওর। ওরা চারজন।এর মধ্যে ছেলেটার মেজো চাচাও আছে।আপন চাচা।সে একটু চিন্তায় পড়ে যায়, অত্যাচারটা বেশি হয়ে গেছে।একটা খোলা ফসলি জমির এক কোণার নিজস্ব নির্মানাধীন ভবনে ডেকে নিয়ে রাতভর নিজেদের যৌন লালসার শিকার করে সিক্সে পড়া ইকরামকে।ছেলেটা ছোটোখাটো।ইচ্ছেমতো যে যতবার চেয়েছে ততবার ভোগ করেছে। চাচা জামাল সমকামি।তার বন্ধুদের নতুন আনন্দ দেবার জন্য ইকরামকেই এনেছে।চাচার হুমকি ছিলো, যদি অন্য কেউকে বলিস তবে মেরে ফেলব। এর আগে ওর চাচা ওকে দুবার ভোগ করেছে।কিন্তু আজ এই অমানবিক নির্যাতনের কথা ইকরাম স্বপ্নেও ভাবেনি।কুকুরের মতো ওর দেহটা ছিড়ে রক্তাক্ত করেছে পিশাচগুলো।ওর হাহাকার, আর্তনাদ তারা শোনেনি।

সকালবেলা জ্ঞান ফেরে ইকরামের।চাচা পাশের চেয়ারে বসা।ওর উঠে বসার শক্তিটুকুও কেড়ে নিয়েছে এই লোকটা।সমস্ত শরীরে প্রচন্ড ব্যথা। ওর কাছে এসে চা,পরোটা আর দুইটা ঔষধ দিয়ে চলে গেল চাচা।বাকি লোকগুলো আগেই চলে গেছে। বিস্ময়,আবেগ আর কষ্টে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে ইকরাম।নিষ্ঠুর! পৃথিবীর মানুষগুলো এত নিষ্ঠুর? খিধের জন্য খাবারগুলো গলাধকরণ করে ঔষধ খেয়ে আবার ঘুমিয়ে যায় ও।দুপুরে উঠে টের পায় ব্যথা অনেকটা কম। বহুকষ্টে হেঁটে বাসায় ফেরে।

প্রায় এক সপ্তাহ প্রচন্ড দেহকষ্ট এবং মনোকষ্টে জীবন কাটিয়ে ভালো হয়ে ওঠে ইকরাম।ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যায়। কিন্তু প্রচন্ড ঘৃণা আর প্রতিশোধের ইচ্ছা ভরা মন নিয়ে পথ চলা শুরু করে।ইকরাম থেকে হয়ে ওঠে ইকু।

৩.

রাত ১টা। আবার ঘুম ভেঙে যায় আমার।ফ্রীজ থেকে কেক বের করে খাচ্ছি আর পর্ন দেখছি।এমন সময় আবিরের ফোন এল~ আবির: কি রে?এখনো জেগে আছিস? আমি: হ্যা।ঘুম আসছেনা। আবির: রের হ.কিছুক্ষণ তোর সাথে হাঁটি। আমি: এত রাতে?(অথচ আমি এক পায়ে প্রস্তুত,একটা অনিচ্ছা প্রকাশ করেও রাজি হয়ে গেলাম।) আবির,আমার সহপাঠি,বন্ধু,ভালোবাসা। মন খারাপের ভাগিদার,সুখের ফিফটি ফিফটি শেয়ারের মালিক। আমার রক্তে, মস্তিস্কে একটাই নাম, আবির। আমার সবকিছুতে অদ্ভুত ভাবে আমি ওকে জড়িয়ে রাখতে চাই।আমাকে ছাড়া যদিও বা ওর দিন কেটে যায়,ওকে ছাড়া আমার এক প্রহর কাটতে চায় না।

তখন মাত্র বাতাসের কাঁধে ভর করে শীতের আগমনী বার্তা জানান দিচ্ছিলো প্রকৃতি।হালকা কুয়াশার মখমলের মতো চাদরে পৃথিবী আচ্ছন্ন।আর আমি আচ্ছন্ন আবিরের চোখের মায়াতে। ভরা পূর্নিমার কাধে কাধ মিলিয়ে বাতাসের মৃদূ গন্ধের সাথে সাথে ওর শরীরের হালকা সুবাসিত গন্ধে নাক ডুবিয়ে শহরের রাজপথে হেটেছি নীরবে। একজন প্রেমিকের কাছে এর চেয়ে সুন্দর মুহুর্ত আর কি হতে পারে? সেই রাতে আমরা স্বপ্ন সাজিয়েছি তারার সাথে। নিজেদের অব্যক্ত অনুভূতিগুলো দিয়ে সুখদুঃখের ভেলা বানিয়ে ভাসিয়ে দিয়েছি মাতাল হাওয়ায়।

অবশেষে আবার ফেরা। নিঃশব্দের রাতে গভীর প্রেমালিঙ্গনে মধুর বিদায়। আমাদের বাসা কাছাকাছি থাকায় প্রতিদিন ই দেখা হতো।একসাথেই আমাদের যাত্রা।একসাথে যাত্রাশেষ। সময়গুলো আঙুলের ফাঁক গলা পানির মতো ফুরিয়ে যাচ্ছিলো।আমি তার খবর রাখি নি। মায়ার মোহে জীবনের সরলগতিকে জটিলের রাস্তায় নিজের অজান্তেই টেনে নিয়েছিলাম।তাই হয়তো সুখের যাত্রাশেষের পরিণতিটা দুঃখের পথে ধাবিত হয়েছে।

৪.

আমার অতি ঘনিষ্ঠ সহপাঠি কিছু বন্ধু আছে যাদের কয়েকজন সমকামি।একেকজন একেক ভাবে এই অন্ধকার জগতের কন্টকময় পথে প্রবেশ করেছে।ওরা হয়তো জানত না একবার এই দুর্গম পথে প্রবেশ করলে এর প্রবেশদ্বার রুদ্ধ হয়ে যায়। যাক সে কথা,ওদের মধ্যে ওসমান আমার সবচে কাছের।ওকে আমিই বহুগামিতা শিখিয়েছি। সেই সুবাদে কিছু লোকের সাথে ওর পরিচয় ছিলো। হঠাৎ একদিন এসে নতুন এক নামের অবতারণা করে।আমাদের এলাকার স্বঘোষিত সমকামি।

সম্পূর্ন নতুন আঙ্গিকে আমি তার পরিচয় পাই।তার চপলতা,তার পারদর্শিতা,তার ব্যপ্তি সবকিছুর বর্ণনা আমাকে অবাক এবং আকর্ষিত করে।তাকে দেখবার একটা সূক্ষ ইচ্ছা জাগে মনে। তার নানাবিধ আর বহুবিধ অভিজ্ঞতার জন্য আমরা তার নামকরণ করি “ইকু, দ্যা গ্রেট”। কিন্তু তাকে দেখার পর আমি বিস্ময়ে হতবাক এবং নির্বাক হয়ে যাই। কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং এ পড়া বিশালদেহী মেয়েলী একটা ভাইয়াকে দেখার অভিপ্রায় ছিলো।কিন্তু দেখলাম মাত্র পাঁচ ফুটের হাড্ডিসার একটা পিচ্চি ছেলেকে।

দেখে মনে হচ্ছিলো, এ তো সিক্সে পড়া একটা ছেলে। যে সিক্স স্তব্ধ করে দিয়েছিলো তার স্বাভাবিক জীবন।তাই বলে যে, তার বৃদ্ধিকেও থামিয়ে দেবে তা আমি ভাবি নি। হঠাৎ তার প্রতি একটা শ্রদ্ধা তৈরি হয়।একটা মানুষ কতটা নির্যাতিত হলে এরকম বদলে যেতে পারে? কতটা অভিমান আর ঘৃণা থাকলে বলতে পারে~আমি সব ছেলেকে সমকামি বানিয়ে ফেলব! জীবনের কি ভয়ংকর নির্মমতা! সেই সাথে আমি নিজেকে ধিক্কার দেই। ছিঃ! আমিও তো এরকম! বহুগামিতার লালসা আর অভ্যাস আমাকেও করে দিতে পারে সেই পশুদের মতো।

৫.

মাঝ দুপুরে মাথার ওপর তপ্ত সূর্যের তাপকে বসতে দিয়ে আমি রাস্তায় হাটছি।রাস্তার পিচ গলে আমার জুতায় লেগে যায় কিনা সেটাই পরীক্ষা করে দেখছি।কিন্তু প্রায় মাইলখানেক হেঁটেও গলা পিচের রাস্তা পাইনি। অগ্যতা আবার হেঁটেই ফিরতি পথ ধরেছি। ভাবছি হিমুর কথা।সে নাকি নির্লিপ্ত।আসলে না। যার জন্য তার মায়ের মৃত্যু,সে চাচ্ছে সেই উদ্দেশ্যটা সফল করতে। আসলে চেষ্টা করে মহাপুরুষ হওয়া সম্ভব না। তাই লেখকের হিমুকে মহাপুরুষ করা হয়ে ওঠে না। সে মায়ায় জড়িয়ে পড়ে।আমিও পড়ি।কারনে অকারনে।

এককেন্দ্রিক কোনো ভালোবাসা আছে? তার পরিণতি কি? পরস্পরের প্রতি আবেগ, শ্রদ্ধা, ত্যাগ না থাকলে তাকে ভালোবাসা বলা যায় না। এসব না ভেবেই আমি ভালোবেসেছি।নিজের প্রতি একটা আত্নবিশ্বাস ছিলো,যে ভালোবাসা কিছু বিনিময়ের অপেক্ষায় থাকে না এবং এর জয় নিশ্চিত। আমরা সেক্স করেছি,অন্তরঙ্গ মুহুর্ত কাটিয়েছি। কিন্তু তাতে আবেগ ছিলো না,জৈবিকতার প্রাধান্য ছিলো। এটা যখন বুঝেছি তখন ভালোবাসা গ্যাস বেলুনের মতো উড়িয়ে দিয়েছি। তাই আবির এখন আমার কেবলমাত্র বন্ধু। সম্পর্ক চুকিয়ে দেয়া কোনো সমাধান না।

এইসব আবেগ,ভালোবাসাবাসি ক্ষনিকের।আমি ভালোবাসি, আবির ভালোবাসে,ইকরাম,ওসমান সবাই ভালোবাসে। কিন্তু আমাদের কারো ভালোবাসার কোনো পরিণতি নেই।বৃহৎ জীবনের নানা মহৎ উদ্দেশ্য আছে।আমাদের উচিত নিজেদের উদ্দেশ্যকে লক্ষ্য বানিয়ে তার দিকে মনস্থির করা। ভাগ্যকে দোষ দিতে ইচ্ছে করে, তারা এবং আমি সমকামি না হলেও পারতাম।

(এই লেখাটাকে গল্প বলা চলে না।আমার জীবন থেকে নেয়া কিছু গল্পমাত্র। ইকরাম এবং আমি বাদে বাকি দুটো ছদ্মনাম।)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.