ক্রিকেট-প্রেমী হিমু

লিখেছেনঃ হোসেন মাহমুদ

আজকাল ঢাকা শহরের রাস্তায় খালিপায়ে হাঁটাও বিরাট মুশকিলের ব্যাপার। সস্তায় কাঁচের বোতল পেয়ে আজমল আলি কিংবা ইয়্যু ইয়্যু বল্টু মিয়া হরতাল-অবরোধের নাম করে খালি পেট্রল বোমা ফুটায়। আর গাড়ীর ভাঙ্গা কাঁচ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকে রাস্তায়। ইতোমধ্যে দুইটা কাঁচের টুকরো ঢুকে গেছে হিমুর পায়ে। কাঁচের টুকরো বের করতে গিয়ে হিমু লক্ষ্য করল, একটা সাদা রঙের কুকুর তাকে অনুসরণ করে হেঁটে আসছে। হিমু কিছুটা অবাক হয়, কুকুরটাকে দেখে বিদেশী কুকুর মনে হচ্ছে। হুমায়ূন স্যার তো তার পিছনে সব সময় দেশী কুকুর লেলিয়ে দিতেন, তার মানে এতদিন পর কোন গাঁজাখোর লেখক তাকে এই হরতাল-অবরোধের রাতে ঢাকা শহরের রাস্তায় নামিয়েছে! হিমু কাঁচের টুকরো বের করতে করতে কুকুরকে বলে,
-কি রে বড়লোকের আরাম-আয়েস আর ভালো লাগে না? এই মাঝ রাতে তোকে ঘর ছাড়া করল কে?
কুকুর হিমুর কথা শুনে ঘেঁউ ঘেঁউ করে উঠলো, যেন হিমুর কথা সে দাঁড়ি-কমা সহ বুঝতে পারছে।
-আচ্ছা, তাহলে এই কথা? চিন্তা করিস না, আজ রাতেই তুই আরেক বড় লোকের বিছানায় গিয়ে ঘুমোবি।
-ঘেঁউ, ঘেঁউ।
-আরে টেনশন নিস না, তাদেরও খায়-খাদ্যর অভাব নাই।

হিমু আর বিলেতি কুকুর পাশাপাশি হেঁটে চলছে। হিমুর যদিও তেমন ক্ষুধা নাই কিন্তু কুকুরটা বেজায় ক্ষুধার্ত। তাই হিমুর গন্তব্য এখন কুকুরের অন্ন অনুসন্ধানে। কিছু দূর হাঁটার পর কুকুরটা থেমে গিয়ে জিহ্বা বাহির করে হাঁপাতে লাগলো। হিমু বুঝতে পারছে এই সব বিদেশী জিনিষ হল ননির-পুতুল, এদের সাথে দেশী কুকুরের তফাৎ রাত- দিনের। এরা আলালের ঘরে দুলালের মত বড় লোকের কোলে-কোলে মানুষ হয়, এইজন্যই এইটুকু হেঁটে ক্লান্ত হয়ে গেল, অথচ আমাদের দেশী কুকুর মাইলের পর মাইল দৌড়াতে পারে। হিমু কুকুরটা নিয়ে কাশেম আলীর টং দোকানে গিয়ে উপস্থিত হয়।
কাশেমঃ আরে, এ আমি কারে দেখতাছি? হিমু ভাইজান নাহ? কি গো ভাইজান এই গরীবরে বুঝি এত দিনে মনে পড়ল?
হিমুঃ কি ভাবে আসবো রে ভাই, হুমায়ূন স্যার তো আর বেঁচে নেই যে, প্রতি বই মেলার আগে ঢাকা শহরের অলি-গলিতে হাঁটিয়ে আপনাদের সাথে দেখা করিয়ে দিবে।
কাশেমঃ হেইটা একটা কতা, আহারে মানুষটা বড় ভালা আছিল। কেমনে যে এত কম বয়সে ডেড হইয়া গেল। তা ভাইজান, গরম-গরম চা আর বন-রুটি লন।
হিমুঃ না কাশেম ভাই, আমার ক্ষুধা নাই তবে আমার এই বিদেশী কুকুরটার পেটে ভেজায় ক্ষুধা হয়েছে, তার জন্য কিছু করা যাবে?
কাশেমঃ বড়ই চিন্তার বিষয় হিমু ভাই, এই বিদেশী জিনিষ কি তক্তা বিসকুট আর বন রুটি খাইব?
হিমুঃ মনে তো হয় না। তুমি একবার চেষ্টা নিয়ে দেখতে পার।

কাশেম মিয়া অনেক চেষ্টা চরিত্র করেও বিলেতি কুকুরের পেটে কিছু ঢুকাতে পারেনি। কুকুর কিছু মুখে দেয় না শুধু ঘেঁউ ঘেঁউ করে দেখে কাশেম মিয়া আপসোসের সুরে বলে,
কাশেমঃ হিমু ভাইজান এই জিনিষ আপনার লগে কি করে? এইসব বিলেতি কুত্তা আমগো দেশের খাবারের কি বুঝবো, হেরো খায়-খাদ্য হইল গিয়া সাহেব-গো মতন। মনডায় চায় পিডাইয়া সব বিলেতি জিনিষ দেশ থেইক্যা খেদাইয়া দেই।
হিমু কাশেম মিয়ার কথায় মাথা গলিয়ে বলে,
হিমুঃ কাশেম ভাই আপনার ছেলেকে নিয়ে বোধহয় ক্যাচালে আছেন?
কাশেমঃ হ, ভাইজান। আফনে ক্যামনে বুঝলেন?
কথাটা বলেই কাশেম জিব্বাহ কামড় দিয়ে বলে, সরি হিমু ভাইজান, আফনে জানেন না এমন কোন বিষয় দুনিয়ায় পয়েদা হয়নাই। ভাইজান আমার পোলাডায় ক’দিন ধইরা কান্নাকাটি করতাছে, একখান রঙ্গিন টিভির লাইগ্যা। হে রঙ্গিন টিভিতে টাইগার ভাইজান গো খেলা দেখবো। এইবার আফনে কন ভাইজান, আমারার কি এত সামর্থ্য আছে?

হিমু কাশেম মিয়ার থেকে বিদায় বলে বিলেতি কুকুর নিয়ে আবার রাস্তায় নেমে পড়ে। রাসেল স্কোয়ারের মোড়ে আসতেই একটা পুলিশের জিপ এসে থামে হিমুদের সামনে। জিপের মধ্যে বসে আছে ধানমণ্ডি থানার ওসি আফসার সাহেব আর তার সাত বছরের মেয়ে এশা। আফসার সাহেব হিমুর কাছে এসে বলে,
আফসার সাহেবঃ হিমু, বিরাট ক্যাচালে পড়ছি, সব চেষ্টা করে দেখছি কিছুই হয়নি, এখন তুমি একমাত্র ভরসা।
হিমুঃ এত রাতে মেয়েকে নিয়ে রাস্তায় কেন?
আফসার সাহেবঃ ভাই এই মেয়েকে নিয়েই তো ঝামেলা।
হিমুঃ সমস্যা কি?
আফসার সাহেবঃ আর কি বলবো ভাই লজ্জার কথা, এই রাত-দুপুরে মেয়েরে নিয়া কুত্তা খুঁজি। মেয়ের বান্ধবীর নাকি তার কুত্তীর নাম রাখছে “মিসেস ধনি” মানে এম,এস ধনি। তাই কাল বাংলাদেশের খেলা শুরু হবার আগেই তাকেও একটা কুত্তা এনে দিতে হবে, যার নাম রাখবে সে “বি, কুহেলী” মানে বিরাট কুহেলী। এইবার বুঝলে তো, কি মহা বিপদে পড়ছি? কাঁটাবনের সব কুত্তার দোকান গেছে বন্ধ হইয়া। এখন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছি কারো বাড়ীতে কুত্তা থাকলে এক দিনের জন্য ধার পাওয়া যায় কিনা। আবার দেশী কুত্তা হলে চলবে না, বিলেতি কুত্তা চাই তার।

হিমু আফসার সাহেবের কথা শুনে মুচকি হেসে তার পিছনে কুকুরটার দিকে তাকায়। হিমু হাঁটু গেঁড়ে কুকুরকে বলে,
-কি রে বিরাট কুহেলী হবি নাকি?
-ঘেঁউ, ঘেঁউ
হিমু দাঁড়িয়ে আফসার সাহেবকে বলে, ভাই আপনার সমস্যা সমাধান হয়ে গেছে। আমার বিলেতি কুকুর আপনার সাথে যেতে রাজি হয়েছে। তবে তাকে যা খাওয়ানোর দরকার আজ রাতেই খাইয়ে নিবেন। কাল খেলার রেজাল্ট কি হয় কে জানে? শেষে দেখবেন দুঃখে ধনির মত তারও খাওয়া উঠবে না মুখে।

হিমু কুকুরটা আফসার সাহেবের হাতে দিয়ে হাঁটা ধরে, আফসার সাহেব পিছন থেকে হিমু ডাকে,
আফসার সাহেবঃ আমার স্ত্রী তোমার সাথে দেখা করতে চায়। সে বলছে, সে নাকি অতি শীঘ্রই মারা যাবে। মরণের আগে তোমাকে এক বেলা ভালো-মন্দ খাওয়াতে চায়।
হিমুঃ নাদিয়া আপুকে বলবেন, সে এত তাড়াতাড়ি মরবে না। তার একটা ফুটফুটে বাচ্চা হবে। সেই বাচ্চার নাম রাখবেন “ম” দিয়ে। মাহমুদুল্লাহ কিংবা মর্তুজা
হিমুর কথা শুনে আফসার সাহেবের চোখে পানি চলে আসে। এই রকম সুঠাম দেহের এক জাঁদরেল পুলিশ অফিসার অন্যর সামনে কাঁদলে খুব বেমানান লাগে। আফসার সাহেব চোখের পানি লুকানোর চেষ্টা করে বলে,
আফসার সাহেবঃ তুমি যেহেতু বলেছ তোমার ভাগ্নের নাম “ম” দিয়েই হবে। এই খবরটা যদি নিজের মুখে তার মায়েরে বলতে সে খুশিতে পাগল হয়ে যেত। গত কয়দিন ধরে শুধু মরার ভয়ে আছে। তোমার কথা সে বিশ্বাস করবে। হিমু, এক রাইতের মধ্যে তুমি আমার দুইটা উপকার করলে। এখন বল, তোমার জন্য আমি কি করতে পারি?
হিমুঃ আপনি শংকর প্লাজার দিকে গেলে দেখবেন এক লোক টং দোকানে চা বিক্রি করছে। যদি পারেন কাল সকালে খেলা শুরু হবার আগে একটা রঙ্গিন টিভি কিনে দিবেন তাকে। কি পারবেন নাহ?
আফসার সাহেবঃ অবশ্যই পারবো, এইটা কোন ব্যাপার হইল? আমার নিজের ঘরেই দুইটা প্লাজমা আছে। আচ্ছা ৩২” দিলে তার চলবে তো?

কাশেম আলির টি,ভির ব্যবস্থা করতে পেরে হিমু ভিতর-ভিতর আনন্দিত। কিন্তু সে আনন্দ প্রকাশ করতে চায় না। তার বাবার উপদেশ-নামা অনুসারে “মহাপুরুষদের হতে হয় মাটির মত গম্ভীর, অতি আনন্দে নিজেকে ভাসানো যাবে না, আবার অতি দুঃখে চোখের জলে হাবুডুবু খাওয়াও যাবে না। হিমু আফসার সাহেব থেকে বিদায় নিয়ে ধানমণ্ডি ৩২ এর মাথায় এল। এমন সময় ব্লু রঙের প্রাইভেট কার এসে থামে হিমুর সামনে। সে মুখে বিরক্তি ছাপ ধরে গাড়ীর দিকে তাকিয়ে চিনতে পারে, এইটা মাজেদা খালার গাড়ী। মাজেদা খালা গাড়ী থেকে নেমে হিমুর দিকে আসছে। হিমু মাজেদা খালার দিকে তাকিয়ে কিছুটা অবাক হয়, রাত-দুপুরে কেউ সান গ্লাস পড়ে রাস্তায় বেরুতে পারে, এই ব্যাপারটা তার জানা ছিল না। আবার মাথায় পড়েছে কালো স্ক্যাফ, মনে হচ্ছে মাত্র সৌদি থেকে হজ্জ করে রাস্তায় নেমেছেন।
মাজেদা খালাঃ এই তুই এমন কোন প্রেসিডেন্ট হয়ে গেছিস, তোরে খোঁজার জন্য শার্লক হোমস ভাড়া করে আনতে হবে নাকি?
হিমুঃ কি হয়েছে খালা? আমাকে খুঁজছ কেন?
মাজেদা খালাঃ তোকে নিয়ে বেসরকারি টিভি চ্যানেলে গোল টেবিল আলোচনার কফি খাওয়াবো। এই জন্য খুঁজি!
হিমুঃ খালা ঐ কফি মগে তো কিছুই থাকে না। তাহলে কফি খাওয়াবে কি ভাবে। অবশ্য আমার নিজেরও কফি খাইতে ইচ্ছা করছে। চল যাই তাহলে।
মাজেদা খালাঃ ফাজিল! বেশী কথা বলবি না। বেশি কথা আমার একদম পছন্দ না। সোজা গাড়ীতে গিয়ে বস।
হিমুঃ এই রাতে কোথায় নিয়ে যাবে খালা? অনেকদিন পর ঢাকা শহরে ঘুরতে আসছি। তাতেও তোমার আপত্তি? আর রাতের বেলায় কালো চশমা? নূতন ফ্যাশন নাকি খালা?
মাজেদা খালাঃ আর বলিস না, সাধে কি আর রাতে সান গ্লাস পড়ে তোকে খুঁজি, শোন হিমু, আমার পরিবার বিরাট বিপদে আছে। তুই ছাড়া গতি নাই।
হিমুঃ বাদল কি আবার পাগলামি শুরু করেছে?
মাজেদা খালাঃ শুধু বাদল করলে-তো সহ্য করা যেত, তার সাথে যোগ হয়েছে তোর খালু সাহেব। আচ্ছা তুই এত প্রশ্ন করছিস কেন? যা গাড়ীতে উঠ।

মাজেদা খালা হিমুকে গাড়ীতে বসিয়ে তার দুখের বয়ান খুলে বসে,

মাজেদা খালাঃ তুই তো বন জঙ্গলে ঘুরাঘুরি করিস, ভূত, পেত্নীর লগে বোধহয় ভালই জানা-শোনা আছে। আচ্ছা, ক্রিকেট ভুত নামে কোন ভূত কি দুনিয়া আছে?
হিমুঃ খালা আমি ভূত নামাবার ওঝা নই, ভূতের সাথে জানাশোনারও আমার প্রয়োজন নাই। আমি কোন ভূত দেখিও নাই জীবনে।
মাজেদা খালাঃ কেন! তোর বান্ধবী রূপা না টুপা তারে দেখস নাই। সে দেখতে-তো পেত্নীর নানীর মত।
হিমুঃ খালা তুমি কি প্রেশারের বড়ি নিয়েছ?
মাজেদা খালাঃ এই প্রেশার ঔষধে কমবে না রে হিমু। আমার বাড়ীতে ক্রিকেট ভূতে হানা দিয়েছে, একবার চিন্তা কর, তোর খালু তাস খেলা ছাড়া অন্য কোন খেলা খেলেছে জীবনে? আর এখন সে ঘুমানোর মধ্যে ছক্কা বলে চিৎকার করে উঠে। কাল ঘুমের মধ্যেও স্বপ্ন দেখছে, মাহমুদুল্লাহ নাকি আবার সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছে। তাই লাফাইতে গিয়ে লাথি মেরে আমার মাজা ভেঙ্গে দিয়েছে। আবার আমাদের প্রতিবেশী সামাদ সাহেবের পরিবারের সাথে ক্রিকেট ম্যাচ বাজি ধরেছে। আমাদের পরিবার আর তার পরিবারের খেলা হবে আগামী কাল বাংলাদেশের খেলার পরে।
হিমুঃ এইতো দেখছি বিরাট সমস্যা।
মাজেদা খালাঃ আরে সমস্যার কি দেখছিস? গতকাল দুপুরে এই রোদের মধ্যে ছাঁদের উপর তোর খালু সবাইকে নিয়ে প্র্যাকটিস ম্যাচের আয়োজন করে। প্লেয়ার কে কে শুনবি? তোর খালু, বাদল, আমি, কাজের বুয়া জরিনা, ড্রাইভার, মালী ছয় জনে ক্রিকেট টিম। কালকে আরও পাঁচজন গ্রাম থেকে হায়ার করবে বলেছে। প্রথমে আম্পায়ার দেয়া হয় জরিনাকে। আমি ব্যাট হাতে দাঁড়ানোর আগেই সেই আঙুল তুলে আমাকে আউট দিয়ে দেয়! আরে বান্দি তুই ক্রিকেটের কি বুঝিস? তুই বুঝবি ডালে লবণ, খেসারীর সাথে শিং মাছ না কৈ মাছ। তারে ধরে বানিয়েছে আম্পায়ার। বদমাইশ মাইয়া। আপসোস, বলটারে একটা বাড়ি পর্যন্ত দিতে পারলাম না। আবার ঐ বান্দি ব্যাট করার সময় বোলিং করছিলাম আমি। রুবেলের মত এমন জোরে বল মারছি, বান্দি বল দেখেই ভয়ে মুইতা ভাসাইয়া দিছে। ফাজিল মেয়ে! এই মুত-নেওয়ালিরে দিয়া তোর খালু কেমনে ম্যাচ জিতবো তুই বল? আবার তোর খালু বল মেরে আমার চোখ ফাটিয়ে দিয়েছে। এইজন্যই এই রাতের বেলায় সান গ্লাস।
হিমুঃ খালা একটু ধম নাও, গাড়ীর মধ্যে পানি থাকলে পানিও খেয়ে নিতে পারো।
মাজেদা খালাঃ হিমু আমাকে জ্ঞান দিতে আসবি না। সবাইকে তোর যাদু-ফাদু দিয়ে কাবু করলেও আমাকে পারবি না। ঐ ড্রাইভার পানির বোতল দাও না কেন?

পনেরো মিনিট মাজেদা খালা বকবক করে হিমুর মাথা ধরিয়ে দিয়েছে। এখন আবার খালু সাহেবের খপ্পরে পড়েছে হিমু।
খালু সাহেবঃ হিমু বাবা তুই কই চিলি এত দিন? তোর উপরওয়ালারে অশেষ ধন্যবাদ তুই আজ রাতে এসে হাজির হয়েছিস।
হিমুঃ খালু আমাকে খালা রাস্তা থেকে ধরে এনেছেন।
খালু সাহেবঃ হোয়াট! মাজেদা? যাই হোক তোর খালাকে আসলে আমি যতোটা বজ্জাত মহিলা হিসাবে জানি, সে ততটা না বোধহয়।
হিমুঃ আমি কিন্তু খালাকে বলে দিবো আপনি বজ্জাৎ বলেছেন।
খালু সাহেবঃ অ্যাই ডোন্ট কেয়ার। আমি তাকে ডরাই নাকি? হিমু ভাবছি আরেকটা বিয়ে করবো। তোর খালাকে দিয়ে পোষাচ্ছে না। তালাক, তালাক, তালাক!
হিমুঃ খালু কয় পেগ মেরেছেন?
খালু সাহেবঃ বেশি না রে মাত্র পাঁচ।
হিমুঃ শুনলাম সামাদ সাহেবের পরিবারের সাথে ফ্যামিলি ক্রিকেট খেলার বাজি ধরেছেন? তা এত পেগ মেরে খেলবেন কি ভাবে?
খালু সাহেবঃ আরে সেই খেলায় তো আমরাই জিতবো। গ্রাম থেকে রহমত ভাই ছয়টা তুখোড় প্লেয়ার পাঠাচ্ছে। শোন হিমু, আমি আছি অন্য ক্যাচালে।
হিমুঃ আপনের আবার কি ক্যাচাল?
খালু সাহেবঃ কাল বাংলাদেশ যদি হেরে যায় তাহলে, আমার সব শেষ হয়ে যাবে রে হিমু।
হিমুঃ কেন আপনার ব্যবসা বাণিজ্য বাজিতে ফেলেননি তো?
খালু সাহেবঃ আরে না, আমি দিনে মাতাল থাকি না। শোন, বাদলের সাথে দেখা হয়েছে তোর?
হিমুঃ না। কেন? বাদলকে নিয়ে কোন সমস্যা নয় তো?
খালু সাহেবঃ এত প্রশ্ন করিস কেন? ভাল লাগে না। যা বাদলের ঘরে যা।

আজ তো খালুর পেগ মারার রাত নয়, তবুও খালু মাতাল হয়ে আছেন। সত্যি চিন্তার বিষয়। অতিরিক্ত টেনশনে থাকলে খালু পেগের উপর পেগ মারেন। দোতলা উঠার সিঁড়ির মুখেই জরিনা মাথায় ঘোমটা ফেলে হিমুর পায়ে ধরে সালাম করতে লাগলো,
হিমুঃ কি করছ, কেউ আমাকে সালাম করলে আমার ভাল লাগে না।
জরিনাঃ ভাইজান গো, আফনের দোয়া আমার বিশেষ প্রয়োজন। আফনে ছাড়া আমার গতি নাই। আমিতো শেষ হইয়া গেলাম গো।
হিমুঃ জরিনা কান্না থামিয়ে কথা বল, কান্না-কাটি আমার পছন্দ না।
জরিনাঃ সরি, ভাইজান মিস্টেক হইয়া গেছে। আর কান্দুম না। আফনে চইল্লা আইছেন। অক্ষন সব মামলা ডিসমিস।
হিমুঃ জরিনা কথা না পেঁচিয়ে সরাসরি সমস্যায় যাও।
জরিনাঃ হিমু ভাইজান আফনে এইডা কি কইলেন? আমি পেঁচী! আমি কতা পেঁচাই হু্–হু–হু–
হিমুঃ তুমি যদি কান্না-কাটির বন্ধ করে কথা বলতে পারো, তাহলে কথা বলতে এসো। এখন আমি বাদলের ঘরে যাবো।
জরিনাঃ এই দেখেন, কান্দা বন্ধ। ভাইজান শুনেন, আফনার মতন ভালা মানুষ জগতে আর নাই। আমি হেইডা জানি, আফনি যদি আল্লাহ্রে একবার বইলা দিতেন, তা হইলে বাংলাদেশ জিতা যাইত।
হিমুঃ বাংলাদেশ জিতার সাথে তোমার আবার কি সম্পর্ক?
জরিনাঃ ভাইজান, আফনে এইটা কি কইলেন? বান্দি বইলা কি আমারা বাংলাদেশের নাগরিক নাহ? আমরা কি খেলা বুঝি নাহ? হু-হু-হু
হিমুঃ আবার কান্না!!
জরিনাঃ আচ্ছা শুনেন ভাইজান, বাংলাদেশ হারলেও কি জিতলেও কি? তাতে আমার কি যায় আসে? আমার সমস্যা অন্য যায়গা, দারোয়ান জ্যইল্লা রে তো আফনে ছিনেন? হেয় আমার স্বর্ণের দুই গাছি ছুড়ির বাজি ধরছে। যদি বাংলাদেশ জিতে তা হইলে সে আমারে বিয়া করবো, নয়লে আমার এক ভরি স্বর্ণের বালাও শেষ, বিবাহও শেষ। এইবার দেহেন, কোন মহা যন্ত্রণায় আছি।

এমন সময় মাজেদা খালা চিৎকার দিয়ে বলে, জরিনা হিমুকে গরম পানি করে দে। আর ফ্রিজ থেকে খাওয়ার নামিয়ে গরম করে দে। মাজেদা খালার ভয়ে জরিনা কিচেন রুমের দিকে চলে যায়। জরিনার স্থানে আসে মাজেদা খালা।
মাজেদা খালাঃ কি রে হিমু বাদলের সাথে দেখা হয়েছে?
হিমুঃ বাদলের রুমেই যাচ্ছিলাম।
মাজেদা খালাঃ শোন হিমু, আসল সমস্যাটা বাঁধিয়েছে ঐ বাদলটাই।
হিমুঃ সে আবার কি করছে?
মাজেদা খালাঃ রমনা পার্ক থেকে এক জিনিষ এনে ঘরে ঢুকিয়েছে। যদি মেয়ে হত আলাদা কথা, ছেলে কি মেয়ে কিছুই বুঝতে পারছি না রে হিমু। জিনিষটা গেস্ট রুমে আছে। একবার দেখে আয়।
হিমুঃ খালা জিনিষ বলতে কি বোঝাচ্ছ?
মাজেদা খালাঃ আমি কেমনে কমু, তুই বাদল রে গিয়ে জিজ্ঞাস কর, এই জিনিষ কি? ফাজিল, আজকালকার পোলাপান মুরুব্বী চিনে না। তুই এক্ষনি আমার চক্ষের সামনে থেকে দূর হউ।

হিমুকে দেখেই বাদল বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে
বাদলঃ হিমু ভাই!! আমি জানতাম আমাদের এই বিপদে তুমি আসবেই।
হিমুঃ বিপদের আপদ নাকি তুই ঢুকিয়েছিস বাসায়? ঘটনা কি?
বাদলঃ আরে হিমু ভাই, আমি আপদ বাসায় ঢোকাবো কেন? বাবা আর মা মিলে তাকে আপদ বানিয়েছে।
হিমুঃ কাকে?
বাদলঃ মা তোমাকে ইফতির ব্যাপারে কিছু বলেনি!
হিমুঃ না। কোন ইফতি?
বাদলঃ আচ্ছা তাহলে আমিই বলছি…
হিমুঃ দাঁড়া, তোর কাহিনী গোসল সেরে আর খেয়েদেয়ে শুনবো।

হিমু এখন বাদলদের ছাঁদের উপর গরম কফির মগ হাতে দাঁড়িয়ে আছে। বাদলের সাথে কথা বলে জানতে পারে, কালকে সে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় উনিসেফের এক কর্মী, এইডস সম্পর্কে সচেতন করার জন্য তাদের বাড়ীতে আসে। সে আবার পাঞ্জাবি পড়া মেয়েলী ধরনের। দেখতে পুরুষের মত মনে হলেও চালচলনে মেয়েলী ভাব। তাকে নিয়ে ডয়িং রুমে যখন আসে, তখন খালা-খালু ক্রিকেট নিয়ে জগড়া বাঁধিয়ে বসে আছে। খালা বলেছে বাংলাদেশ কোয়াটার ফাইনালে হেরে যাবে, খালু বলেছে বাংলাদেশে সেমিফাইনালে যাবেই, যাবে। মাঝখানে বাদল ইফতিকে নিয়ে হাজির। তখন খালার রাগ সপ্ত আসমানে উঠে যায়। ইফতির সামনেই বলে, বাদল তুই এই জিনিষ কোথায় থেকে ধরে এনেছিস? হের সাথে তোর কিসের সম্পর্ক? এদিকে খালু রেগে আছে খালার উপর, খালু খালাকে রাগানোর জন্য বলে, বাদল যাকে ইচ্ছা তাকে বাড়ীতে আনতেই পারে। খালুর কথায় মাজেদা খালা তেলে বেগুনে রেগে যায়। খালু খালাকে আরও রাগিয়ে দিতে বলে, যদি বাংলাদেশ খেলায় হেরে যায় তাহলে এই জিনিষের সাথেই বাদলকে বিবাহ দিয়ে দিবো। খালা-খালুর জগড়ার মধ্যেও পড়ে বাদল আর ইফতি। তাই বিপক্ষ দল মাজেদা খালাও চায় যাতে বাংলাদেশ আজকের খেলায় জিতে, আর ইফতি যেন বাড়ী ছেড়ে যায়।

হিমু বাদলদের পারিবারিক ক্রিকেটীয় জগড়ার কথা ভুলে যায়, যখন আজকের রাতের ঢাকা শহরের চার দিকে তাকায়। ঈদ নাহলেও কেন যেন পুরো শহরে খুশির আমেজ লুটোপুটি খাচ্ছে। অনেক বাড়ীর ছাঁদে পর্দা টাঙিয়ে প্যান্ড্যাল বানানো হয়েছে খেলা দেখার জন্য। ছেলে-বুড়ো সবাইর মুখে আনন্দ আর উত্তেজনা। শুধু ঢাকা শহরে নয়, বোধহয় সারা বাংলাদেশের ষোল কোটি মানুষের বত্রিশ কোটি চোখ আজ এগারো জনের দিকে তাকিয়ে। হিমু মহাপুরুষ, তাকে আবেগী হলে চলবে কেন? কিন্তু তারপরও আজ সে ভিতর ভিতর আবেগ আর উত্তেজনা অনুভব করছে। মহাপুরুষরা কারো কাছে সাহায্য কামনা করে না। কিন্তু আজ হিমুর ইচ্ছা করছে সৃষ্টিকর্তার কাছে সাহায্য চাইতে, বাংলার ষোল কোটি মানুষের এত আনন্দ আজ উপরওয়ালার উপর নির্ভর করছে। তিনি ইচ্ছা করলেই পারেন এত গুলো মানুষের মনের আশা পূর্ণ করতে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.