বোধ

লেখকঃ নীল মেঘ

১ ২ ৩…
এরকম করে দিন গুণতে গুণতে অবশেষে আমার সেই কাঙ্ক্ষিত দিন ১৪এপ্রিল আসতে আর একদিন মাত্র বাকি।
অনেকদিন থেকেই এই দিনের জন্য পরিকল্পনা করে রেখেছি। কারণ এবারের পহেলা বৈশাখ আমার জন্য অন্যবারের থেকে আলাদা। এবারই প্রথম এই দিনটি আমি রায়ানের সাথে উদযাপন করব।

রায়ানের সাথে আমার পরিচয় প্রায় ১বছর হলেও ওর মুখ থেকে কাঙ্ক্ষিত সেই কথাটি শুনার আজ ১মাস ১২দিন হল। সেদিন থেকেই রায়ানের সাথে আমার নতুন পথচলা শুরু, আর নতুন পথচলার পর এই প্রথম আমরা কোন বিশেষ দিন পাচ্ছি। এই একটু আগেও ওর সাথে কথা হয়েছে, এখন ইচ্ছা করছে আবার কথা বলি। কিন্তু আমার ইচ্ছা করলেই কি হবে? তারও তো কথা বলার সুযোগ থাকতে হবে। কাল ছুটি তাই আজ ওর অফিসে কাজের চাপ বেশি তারপরও বেচারা ফাঁকফোকর পেলেই ফোন করছে। আমার মতো সেও এই দিন নিয়ে অনেক এক্সাইটেড।

জীবনের এই অধ্যায়টা যে এত মধুর হয় সেটা যদি আগে জানতাম তাহলে এতদিন রায়ানের প্রপোজের অপেক্ষায় না থেকে নিজেই করে ফেলতাম।
গত শুক্রবারে দুজন শপিং করলাম। তার নাকি অনেকদিনের শখ আমাকে লাল পাঞ্জাবীতে দেখবে তাই তার শখ-মতো একটা লাল পাঞ্জাবী কিনে দিল। আমার আবার তাকে লাল মিয়া বানানোর শখ নাই, আমার শখ তাকে আক্কাস মিয়া বানানোর তাই ওর জন্য একটা স্কাই ব্লু পাঞ্জাবী কিনলাম কিন্তু ওকে বললাম এটা অন্য একজনের জন্য কিনছি যাতে পরে একদিন ওর অফিসে গিয়ে পাঞ্জাবীটা ওর হাতে দিয়ে সারপ্রাইজ দিতে পারি।
ইদানীং আমি খেয়াল করছি আমার ভেতর এসব সিনেমা-টিক ব্যাপারস্যাপার গুলো কেমন করে জানি চলে আসছে যেগুলো আগে ছিলনা বললেই চলে। আহ্লাদে গদগদ হয়ে ন্যাকামো করে কথা বলা কিংবা একটুতেই অভিমান করে গাল ফুলিয়ে ফোন রিসিভ না করে মোবাইল সুইচড অফ করে রাখা এগুলো আমার মধ্যে নতুন লক্ষ করছি অথচ আগে কেউ এমন করছে শুনলে উল্টো তাকে নিয়ে হাসাহাসি করতাম।
প্রেম যে মানুষের দৈনন্দিন জীবনধারা এবং আচার ব্যবহারের মধ্যে বেশ খানিকটা পরিবর্তন ঘটায় সেটা ভালই বুঝতে পারছি।

বিকেল ৪টা বাজে।
রায়ানের অফিসে গেলাম ওর পাঞ্জাবী নিয়ে কারণ আজ ওটা না দিলে কাল বাসা থেকে সে অন্য জামা পরে আসবে।
আমাকে দেখেই সে বলে উঠল,কি এত লেট করলে যে?আমি সেই কখন থেকে অপেক্ষা করছি তোমার সাথে লাঞ্চ করব বলে।
-মানে কি?আমি যে আসব সেটাতো তোমাকে বলিনি।
-আমি জানতাম পাঞ্জাবীটা নিয়ে তুমি আজ আসবে।
-ওটা যে তোমার জন্য কিনছি তাতো বলিনি।
-না বললেও আমি বুঝতে পারছি ওইদিন তোমার মুখ দেখে।তাছাড়া আমি ছাড়া তোমার তোমার প্রিয় রঙয়ের পাঞ্জাবী আর কার জন্যই বা কিনবে।

ধুর শালা! মুড অফ হয়ে গেল।
ভাবছিলাম ওকে একটা সারপ্রাইজ দেব কিন্তু সেটা আর হলনা।

-কি হল?মুখ শুকনা হয়ে গেল কেন?
-আমি কি তোমার সাথে রাস্তায় বৃষ্টি-বিলাসে নেমেছি যে মুখ ভেজা থাকবে!
-আজব!এভাবে কথা বলছ কেন?তোমার মেজাজ মর্জি যে কখন কোনদিকে যায় বুঝিনা।
-তোমাকে বুঝতেও হবেনা।
-ঠিক বলেছ, আমি বুঝতে চাইও না। খুব ক্ষুধা লেগেছে তাড়াতাড়ি চল।

বাসায় এসে মায়ের কথা শুনে মেজাজটা একেবারে ফোরটি নাইন হয়ে গেল।
বাবা নাকি বলেছে পহেলা বৈশাখ উদযাপন এগুলো ইসলাম পরিপন্থী এবং আমাদেরকে মানাও করছেন এসবে যেতে।
বাবা কি করে এটা বলতে পারে ভেবে পাচ্ছিনা। বাবার সঙ্গে নিজে থেকে আগ বাড়িয়ে এব্যাপারে কথা বলারও সাহস হচ্ছেনা।

রাতে খাবার টেবিলে বাবার সাথে দেখা।
-তোমার মা কিছু বলছে?
আমি বাবার মুখে ‘তুমি’ সম্বোধন শুনে একটু ভড়কে গেলাম কারণ বাবা দুইটা সময় আমাদেরকে তুমি করে বলেন।
এক. সিরিয়াস কিছু বলার সময়।
দুই. যখন আমাদের উপর রাগ থাকেন।
আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, বাবা এ ব্যাপারে আমি কিছু বলতে চাই।
-কি বলতে চাও বল।
-বাবা আমরা প্রতি বছর নববর্ষ উদযাপন করেছি, মেলায় গিয়েছি তুমি কিছু বলনি। ছোটবেলায় যখন ছোট চাচার সাথে বৈশাখী মেলায় যেতাম তখনও তো কিছু বলতে না। আজ কেন একথা বলছ?
-তখন বুঝিনি, এখন বুঝছি তাই বলছি।
-বাবা তুমি ভুল বুঝেছ কিংবা যিনি তোমাকে বুঝিয়েছেন তিনি ভুল বুঝিয়েছেন।
-কি বলতে চাও তুমি?
-দেখো বাবা যে কোন বিষয় নিয়ে সবার ভাবনা বা দৃষ্টিভঙ্গি এক হবেনা। কেউ ভুল বলবে কেউ শুদ্ধ বলবে কিন্তু আমরা আমাদের বিচারবুদ্ধি দিয়ে সেটা যাচাই করে তারপর ভুলটা রেখে শুদ্ধটা নেব।
কথাটা বলে বাবার দিকে এক পলক তাকিয়ে তার প্রতিক্রিয়া বুঝার চেষ্টা করলাম কিন্তু প্রতিক্রিয়া ইতিবাচক না নেতিবাচক কিছুই বুঝলাম না। তারপরও সাহস করে আবার বলা শুরু করলাম।

-পৃথিবীর সব মুসলমানের ধর্ম ইসলাম কিন্তু সবার জীবনযাপন এক না। তার মানে ধর্মীয় রীতিনীতি এক হলেও একেকটা জাতির জীবনধারা, সংস্কৃতি কিন্তু আলাদা। আমরা সবসময় যে ভুলটা করি সেটা হচ্ছে ধর্মীয় রীতিনীতির সাথে জাতীয় সংস্কৃতি গুলিয়ে ফেলি। মহরম মাস এলে আরবরা তাদের মত করে নতুন বর্ষ উদযাপন করে, ইরানিরা তাদের নতুন বর্ষ নওরোজ উদযাপন করে তাদের সংস্কৃতির ধারা মোতাবেক তাইলে আমরা কেন আমাদের নতুন বর্ষ আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি মোতাবেক উদযাপন করতে পারবনা?
-কিন্তু এদিন তো অন্য ধর্মালম্বিরা…
-হ্যাঁ আমি জানি এইদিন হিন্দুরা গণেশপূজা করে, আগের দিন করে চৈত্র সংক্রান্তি কিন্তু এগুলা তারা তাদের মত করে করে এতে তো আমরা অংশ নিচ্ছি না। নামাজ রোজা যেমন আমাদের ধর্মের একটা অংশ, পহেলা বৈশাখও আমাদের বাঙালিয়ানার একটা অংশ। এটাকে আমরা কোনভাবেই অস্বীকার করতে পারিনা। আর পহেলা বৈশাখ উদযাপনের প্রবর্তক সম্রাট আকবর কিন্তু একজন মুসলিম শাসক ছিলেন তাই এটাকে হিন্দুয়ানী বলার কোন যুক্তি দেখিনা। তবে আকবর এটার প্রবর্তক বলে এটা কিন্তু মুসলিম-পন্থী কোন উৎসবও না। পহেলা বৈশাখ হচ্ছে বাঙালী জাতির একমাত্র উৎসব যেটাতে জাতি, ধর্মবর্ণ সবাই একসাথে অংশগ্রহণ করে।

-আচ্ছা মানলাম পহেলা বৈশাখ ধর্মীয় কোন উৎসব না কিন্তু উৎসব উদযাপনের নামে যে ছেলেমেয়েরা রাস্তাঘাটে বেলেল্লাপনা করে সেটা কিভাবে মানব?
-সব ভালর মধ্যেই খারাপ আছে। এটার মধ্যেও থাকবে এটাই স্বাভাবিক আর রাস্তাঘাটে এসব নোংরামি সবাই করেনা, গুটিকয়েক লোক করে। আমরা সবাই যদি সচেতন হয়ে বিষয়টা দেখি তাহলে এটা প্রতিহত করা কোন ব্যাপার না। কিছু অবাঞ্ছিতদের জন্য কেন উৎসবটা নষ্ট হবে? তারপরও যদি তোমার মনেহয় আমার যাওয়া ঠিক হবে না তাহলে আমি যাব না।

খাবার টেবিলে এই ছিল বাবার সাথে আমার কথোপকথন। এরপর বাবা আর কিছু বলেননি আর আমিও এইবিষয় নিয়ে এগুতে সাহস করিনি।

খাওয়াদাওয়ার পর মন খারাপ করে শুয়ে আছি আর ভাবছি রায়ানকে ফোন করে কালকের প্রোগ্রাম ক্যান্সেল করে দিব। জানি বেচারা কষ্ট পাবে কিন্তু বাবার অবাধ্য হবার সাহস কিংবা মানসিকতা কোনটাই এখন পর্যন্ত হয়নি আমার। আসলে আমার ভাগ্যটাই এরকম, বেশিরভাগ চাওয়াগুলোই পূর্ণতা পাবার আগেই মুখ থুবড়ে পরে যায়।
মোবাইলটা হাতে নিয়ে ডায়াল অপশনে প্রেস করব এমন সময় ছোটবোন নায়লা এসে বলল, ভাইয়া বাবা তোকে ডাকে।
রায়ানকে এসে ফোন দিব ভেবে বাবার ঘরে গেলাম।

বাবা বালিশে হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে বিছানায় বসে সকালের কাগজ পড়ছিলেন। আমি বললাম,বাবা আমাকে ডেকেছো?
-হ্যাঁ,বসো।
আমি বিছানার শেষ মাথায় বাবার পায়ের কাছে বসলাম।
বাবা বললেন, তোমার কথাগুলো নিয়ে ভাবলাম। ভেবে মনে হল তুমি আর সেই ছোট্টটি নেই, দেখতে দেখতে কখন যে এত বড় হয়ে গেছ তা যেন টেরই পাইনি।
-বাবা আমি…
‘আহ আমার কথা শেষ করতে দাও’ বলে বাবা আমাকে থামিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন, বাবা-মা যখন কোন সিদ্ধান্ত নেয় তখন সেটা সন্তানের ভালর জন্যই নেয় কিন্তু সন্তান যখন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় সেই সিদ্ধান্তটা ভুল তখন যে কেমন লাগে তা আজকে বুঝতে পারলাম।
-বাবা আমি স্যরি,আমি তোমাকে কষ্ট দেয়ার জন্য কথাগুলো বলিনি।
তার উত্তরে বাবা যেটা বললেন সেটা শুনার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না।
বাবা বললেন, না রে বাপ। আমি কোন কষ্ট পাইনি বরং নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি যে আমার সন্তান আমার কোন ভুল ভাঙ্গিয়ে দিয়েছে। এরকম ভাগ্য সব বাবা-মার হয়না। দোয়া করি তোমার বিবেক বুদ্ধি যেন তোমাকে কখনও ভুল পথে যেতে না দেয়।

বাবার কাঠিন্যভরা চেহারায় আমি তখন অন্যরকম এক আনন্দ দেখেছিলাম।
ভাগ্যিস রায়ানের কিছু বোরিং লেকচার অনিচ্ছা সত্ত্বেও মাথায় ঢুকে গেছিল নইলে বাবাকে এত সহজভাবে বুঝানো আমার পক্ষে কখনো সম্ভব হত না।

বাবার ঘর থেকে বের হয়ে ফুরফুরে মেজাজ নিয়ে রুমে শুয়ে শুয়ে কালকের ভবিতব্য দিনের কথা ভাবছিলাম। এমন সময় মা এসে মেজাজটা দিলেন আবার বিগড়ে।
-কাল যাবার সময় ইফতিকে নিয়ে যাস।
-ইফতিকে নিয়ে যাব মানে! নায়লাকে বলো ওদের কলেজ প্রোগ্রামে ওকে নিয়ে যেতে।
-বলছিলাম কিন্তু ইফতি তোর সাথে যেতে চায়। মেয়েদের কলেজে নাকি সে যাবেনা।
-সাড়ে পাঁচ বছরের একটা বাচ্চা ছেলে, তার আবার ছেলে মেয়ে কি? ওকে বলো ওখানে ওর মত আরো ছোট ছোট ছেলে আসবে তাদের বোনদের সাথে। সে ওদের সাথে খেলতে পারবে।
-তোর সাথে নিয়ে যেতে সমস্যা কি?
-মা শুনো, আমি বাচ্চা একটাকে লেজে বাইন্ধা ঘুরতে পারবনা।
মা আর কিছু না বলে চলে গেলেন।
ধুর শালা! একটার পর একটা ঝামেলা। কাল কি হয় কে জানে!

১৪ই এপ্রিল।
আমার সেই কাঙ্ক্ষিত দিন আজ।
মুঠোফোনে রায়ানের শুভেচ্ছা বার্তা দিয়ে সকালটা ভালভাবেই শুরু হয়েছে। মাও মেজাজ খারাপ করা কোন নিউজ নিয়ে হাজির হননি।
আজকের দিনের একটাই প্ল্যান আর সেটা হল সারাদিন শুধু আমি আর রায়ান।
রৌদ্রের মধ্যে আনন্দ র‍্যালিতে যোগ দেয়া আমার পক্ষে কখনই সম্ভব হয় না কারণ রোদে হাঁটাহাঁটি করলেই আমার মাইগ্রেনের পেইন শুরু হয় তাই বাসা থেকে বের হয়েই ভার্সিটি ক্যাম্পাসে চলে গেলাম। রায়ানের সেখানেই আসার কথা, যতক্ষণ না আসে ততক্ষণ বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে কাটানো যাবে।

দুপুর ১.৩০ এর দিকে রায়ান এলো।
ভালবাসার চোখে তাকালে কালোকেও আলো মনে হয় আর সে যদি হয় নিজের ভালবাসার মানুষ তাহলে তো বলার কিছুই থাকেনা। মনে হচ্ছে আকাশের রঙয়ের পাঞ্জাবী পরা এক যুবা আকাশ থেকে নেমে এসে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। নিজের পছন্দের পোশাকে পছন্দের মানুষকে দেখার মধ্যে যে এত সুখ সেটা প্রথম অনুভব করলাম।
বন্ধুদের সাথে ওকে পরিচয় করিয়ে দিলাম খালাতো ভাই বলে।
ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রায়ান আর আমি বেরিয়ে পরলাম।

খুব ইচ্ছা করছে ওর হাত ধরে হাঁটতে কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ এখন আর আগের মত নেই। ইন্টারনেট, সামাজিক ওয়েবসাইট এসবের কল্যাণে সমকামী সম্পর্ক এখন আর কারো অজানা নেই তাই কে কি মনে করবে সেই সঙ্কোচে হাতটা ধরতে পারছিনা।
যার যা খুশি ভাবুক, আমি আমার ভালবাসার মানুষটির হাত ধরেই হাঁটব বলে যখন ঠিক করলাম হাতটা ধরেই ফেলি তখনই রায়ান বলল, এই তোমার অমূল্য হাতটা কি একটু ধরা যাবে?

একেই বোধহয় টেলিপ্যাথিক ক্ষমতা বলে। দুটি মন যখন এক হয়ে যায় তখন এই ক্ষমতা বলে একজনের মনের খবর অন্যজন বুঝতে পারে।
আমি অবাক হয়ে শুধু হাতটা বাড়িয়ে দিলাম, মুখে কোন কথা ফুটলো না।
পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে সব রেস্টুরেন্টেই পান্তা ইলিশের আয়োজন করেছে। আমরা এরকম একটা ভালমানের রেস্টুরেন্টে গিয়ে পান্তা ইলিশ দিয়ে লাঞ্চ করে বৈশাখ উদযাপন করলাম। ওর নিষেধ স্বত্বেও খাবারের বিল আমি পে করলাম।
রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে রায়ান বলল, ‘হাতে তো অনেক সময় আছে, চল আলুর-তল ইকো পার্ক থেকে ঘুরে আসি।’
আমার না করার কোন কারণ নাই তাই আমরা চললাম সিলেট শহরের অদূরে আলুর-তল ইকো পার্কের উদ্দেশ্যে।

ইকো পার্কে অন্যদিনগুলোতে সাধারণত তেমন মানুষ থাকেনা কিন্তু আজকের কথা ভিন্ন। নিরিবিলি একটা জায়গা খুঁজতে খুঁজতে আমরা চা বাগানের ভেতর একটা টিলার মত জায়গা পেলাম যেখানে মানুষ একটু কম আছে।
দুজনে চুপচাপ বসে আছি।
কাছাকাছি কোথাও ভুল-শুদ্ধের মিশেলে মাইকে ছেলেরা গান গাইতেছে। অন্যসময় হলে শুনে বিরক্ত লাগত কিন্তু আজকে সবকিছুই ভাল লাগছে। হয়ত ভাললাগার মানুষটা কাছে বলেই ভাল লাগছে।

ভাললাগায় ছেঁদ পড়লো ছেঁড়া গেঞ্জি জিপার খোলা হাফ প্যান্ট পরা ৮/৯বছরের একটা বালক-কণ্ঠ শুনে।
‘ভাই দুইডা টেকা দেননা’
-উফ এইসব ছোটলোকদের যন্ত্রণায় কোথাও শান্তিতে বসার উপায় নাই।
আমার এই কথাটা শুনে রায়ানকে কেমন আহত মনে হল। সে ওই ছেলেকে ৫টাকার একটা কয়েন দিয়ে বিদায় করল।

-ওকে টাকা দিয়ে কিন্তু তুমি ভিক্ষাবৃত্তিতে তাকে উৎসাহিত করলে রায়ান।
সে আমার ওই কথার উপর কোন কথা না বলে বলল, আচ্ছা তুমি কি আমাকে ভালবাসো?
-এটা কোন ধরণের প্রশ্ন?
-আহা বল না বাসো কিনা?
-হ্যাঁ বাসি।
-আমিও যে তোমাকে অনেক ভালবাসি সেটা তুমি বুঝতে পার?
-হ্যাঁ পারি।
-এবার তোমাকে কিছু কথা বলব মন দিয়ে শুনো, কথাগুলো তোমাকে অন্য একদিনও বলতে পারতাম কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আজকে বলাই ভাল হবে কারণ বছরের নতুন দিনে আমাদের অঙ্গীকার হবে সকল মানসিক জরাজীর্ণতা দূরে ঠেলে সামনে এগিয়ে যাবার।
-আমি সত্যিই কিছু বুঝতে পারছিনা, তুমি কি বলতে চাচ্ছ?
-বুঝিয়ে বলছি, তুমি একটু মন দিয়ে শুনো প্লিজ। তুমিতো জানো পহেলা বৈশাখ হচ্ছে হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি, চেতনা, ঐতিহ্যের অন্যতম অংশ। অন্যদিনে না হলেও এই দিনে আমরা আমাদের শেকড়কে উপলব্ধি করি বা করার চেষ্টা করি কিন্তু শেকড়কে উপলব্ধি বা স্মরণ করতে গিয়ে আমরা যে নিজের অজান্তেই সেইসব শেকড়ের মানুষগুলোকে অপমান করে যাচ্ছি সেটা জানো?
-সেটা কিরকম?
-এই যে আজকে আমরা পান্তা ইলিশ আর কয়েক পদের ভর্তা দিয়ে লাঞ্চ করে একদিনের জন্য আমাদের বাঙালিয়ানা জাহির করলাম মোটা অংকের বিল পে’র মাধ্যমে সেটা কি রোজ রোজ পান্তা খাওয়া সেইসব খেটে খাওয়া মানুষদের উপহাস করা নয় যাদের একজনের পুরো সপ্তাহের খাবার খরচ হবে আমাদের আজকের একবেলার বাঙালিয়ানার সাজে।
-বুঝলাম কিন্তু মোটা অংকের বিল কিংবা এই একদিনের জন্য স্মরণ করাটাতো তাদের প্রতি সম্মান দেখানোও হতে পারে।
-তুমি একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারবে এটা সম্মান দেখানো কিনা। যেখানে তারা রোদে পোড়ে মাঠের মধ্যে পেঁয়াজ মরিচ ঢলে আগের রাতের বাসি পান্তা খাচ্ছে সেখানে আমরা খাচ্ছি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে। যদি সম্মান দেখাতে হয় তাহলে তাদের মতই খেতে হবে, এত আরামে বসে মুখরোচক খাবারের সাথে পান্তা দিয়ে নয়।

আমি এরকম করে কখনও ভাবিনি কিন্তু এটাও ঠিক যে তার কথাগুলো যুক্তিহীন না। কি বলব ভেবে পাচ্ছিলাম না দেখে চুপচাপ বসে আছি। রায়ান আমাকে জিজ্ঞেস করছে, ওর কথাগুলো শুনে আমি রাগ করছি কিনা?
-না রায়ান, আমি রাগ করিনি। তুমি এত সুন্দর করে জিনিসটা বুঝিয়ে দিয়ে আমার চোখের পর্দা সরিয়ে দিয়েছ।
-আচ্ছা শিমুল, খাবারের বিলের খুচরো টাকাগুলোতো তুমি নাওনি না?
-না।
-তোমার কি মনে হয়না ওই খুচরো টাকাগুলো রেস্টুরেন্টের ওয়েটারের চেয়ে ছেঁড়া গেঞ্জি পরা একটু আগে তোমার কাছে আসা ছেলেটার বেশি দরকার?
-কিন্তু ওকে টাকা দেয়া মানে তো ভিক্ষাবৃত্তিতে তাকে সাহায্য করা।
-সেটা তাকে তুমি পরে বুঝিয়েও বলতে পারতে কিন্তু ওইসময় সে হয়ত সত্যি ক্ষুধার্ত ছিল। কেউ টাকা না দিলে ক্ষুধা মেটাতে সে চুরি ছিনতাইও করতে পারে এবং এরকম করে করে একদিন হয়ত সে হয়ে যাবে এই শহরের মোস্ট ওয়ান্টেড কোন টপ টেরর। ভেবে দেখো তার এই অধঃপতনের দায়ভার কিন্তু পরোক্ষভাবে আমাদের উপরও পরে। আমি চাই আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটা হোক জাগ্রত বিবেকসম্পন্ন শুদ্ধতম এক মানুষ। আমার চাওয়াটা কি অন্যায় শিমুল?

আমি কিছুই বললাম না।
সন্ধ্যার আধো আলো আধো অন্ধকারে রায়ানের কাঁধে মাথা রেখে নিজেকে ভাগ্যবানদের একজন মনে হচ্ছিলো এরকম একজন ভালবাসার মানুষ পেয়ে। রায়ান পরম মমতায় তার কাঁধে রাখা আমার মাথায় তার নিজের মাথাটি ঠেকিয়ে আলতো করে আমার কোমর জড়িয়ে রাখল।
নিজের মধ্যে তখন আমার একটাই ‘বোধ’ উপলব্ধি হচ্ছিলো।
ঘুমন্ত বিবেক জাগ্রত হবার ‘বোধ’।

পুনশ্চঃ আমার এই গল্পটা যদি কারো মতাদর্শ বা অনুভূতিতে আঘাত হানে তাহলে আমি(নীল মেঘ) আন্তরিকভাবে ক্ষমা-প্রার্থী।

(সমাপ্ত)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.