বিউটিফুল লাই

লিখেছেনঃ পরাগ

দু’দিন আগে নীলির জন্মদিন ছিল । সারাদিন বিয়ে নিয়ে ব্যস্ততা, আর সেই সাথে মোবাইল ডেড হয়ে যাওয়ায় মনে করিয়ে দেওয়ার মতও কেউ ছিল না । অথচ মনে রাখা উচিৎ ছিল । হার্ডকোর প্রেমিকা না হলেও নীলি আমার পার্টটাইম অনুপ্রেরণাদায়ী প্রেমিকা । প্রেমিকাকে জন্মদিনে উইশ না করা রীতিমতো পাপের পর্যায়ে পড়ে ।

নীলির সাথে মোবাইলে কথা হয়েছে খুব কম । মোবাইল নম্বর দেওয়ার আগে সাবধান করেছে, ‘দেখ,খুব জরুরী কিছু না হলে কল করবা না । কি করছ? ভাত খেয়েছ? এইসব মেসেজের কোন দরকার নেই । ঠিকাছে? ‘
এমন জাঁদরেল একজনকে ফোন দিতে বেশ কয়েকবার চিন্তা করতে হয় । তবে জন্মদিনে উইশ করার কলটুকু নিশ্চয়ই জরুরী ।
তবু একটু দ্বিধা নিয়ে কল করলাম । ওপাশ থেকে গম্ভীর একটা গলা শোনার প্রস্তুতি নিলাম । তিনবার রিং হওয়ার পর বলল,”বল “

হ্যালো ট্যালো কোন কিছুর ধারেকাছে না গিয়ে এরকম সোজাসাপ্টা ‘বল’ বললে অপ্রস্তুত হব না তো কি ? অপ্রতিভভাবে বললাম, ‘কিছু বলার নেই । ‘
‘কিছুই বলার নেই ? তাহলে এমন সন্ধ্যা বেলা কল করেছ কেন ? ‘
‘ তোমার সাথে নীরবতার খেলা খেলবার জন্য । লিসেন টু দ্য সাইলেন্স । ‘
‘নীরবতা শোনার উপায় নেই । মোবাইল থেকে পোঁ পোঁ শব্দ আসছে । আর শোন,ফিলসফিক স্টাইলে কথা বলে ইম্প্রেশ করার চেষ্টা বাদ দিতে বলেছি না ? ‘
সাধারণ গানের কথা বললেও সেটা আজেবাজে ফিলসফিক কথা হয়ে যায় তার কাছে । তবু মার্গারেট থ্যাচারের মত এমন খাট্টাখোট্টা মেয়েটাই প্রবল আকর্ষণে বেঁধে রেখেছে এই কাঠিন্য দিয়েই । কাঠিন্যের মাঝে মসৃণতা খুঁজে বের করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ।

আয়রনিক থ্যাচারকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বার্থডে কেমন কাটলো? ‘
‘আমার কোন বার্থডেই স্পেশাল হয় না । মমম…ফ্যামিলির বাইরে দুজন মাত্র আসল বার্থডেট জানে আর তাদের কেউই —–‘
নীলি শেষ করার আগেই বললাম, ‘সেই দুজনের একজন আমি, আর একজনটা কে ? এষা নিশ্চয়ই? সেও কি উইশ করেনি? ‘

নীলি কোন উত্তর দিল না,খানিকক্ষণ নীরব থেকে বলল,’তোমার কাজিনের বিয়ে কেমন হচ্ছে? ‘
বুঝলাম, নীলি প্রসঙ্গ পাল্টাতে চাইছে । এষা তার জীবনের অন্য এক অধ্যায়, সেখানে আমার প্রবেশাধিকার নেই । জন্মদিনের কথা জানিয়েই অনেকটুকু জানিয়েছে,এর বেশি জানাতে চায় না এই গুপ্তচারিণী বাদামী নয়না ।

বিয়েতে এসে বিরক্তির শেষসীমা দেখছি আমি । তাই বললাম, ‘এ্যই কোনরকম হচ্ছে আর কি… ‘…তোমার কথা খুব মনে হচ্ছে ‘ এটা বলতে গিয়েও বললাম না । মেয়েটা এটাকেও সস্তা কথা বলে উড়িয়ে দেবে । বাহিরে বাহিরে এত দৃঢ় মেয়েটা কতটুকু একা,কতটুকু বিষন্ন তা কয়েকদিনেই টের পেয়েছি । অথচ সে কখনো স্বীকার করবে না । ফোনের ওপ্রান্তের ডোমিনেটিং করা মেয়েটা বাস্তবে কত কেয়ারিং হয়ে যায় । মানুষ জীবনের অনেকগুলো ক্ষেত্রে প্রবলভাবে দ্বিচারিণী হয় ।

‘এষা উইশ না করলেও আমি কিন্তু উইশ করেছিলাম । তুমি পাওনি ? ‘
‘দেখো,আমার কাছে উইশ করা বিশেষ কিছু না । উইশ পাওয়াটা জরুর হলে আমি দুনিয়াজুড়ে সবাইকে বলতে পারতাম আজকে আমার বার্থডে—আমায় শুভেচ্ছা জানাও । আমার এসব ভাললাগেনা । তবে তোমার উইশ পাইনি, এটা সত্যি । ‘
‘আমি কিন্তু উইশ করেছিলাম, আল্লাহর কসম ! ট্যালিপ্যাথিকভাবে কতবার উইশ করেছি । বুঝতে পারছি, তোমার সৌলের সাথে আমার সৌল কানেক্টেড নাহ । ‘

এই প্রথম নীলি একটু হাসল, ‘তোমার মত মানুষ করবে ট্যালিপ্যাথিক কানেকশন ? তা ট্যালিপ্যাথিক বাবু,বলতো আমি আজ কি রঙ্গের কাপড় পড়ে আছি ? ‘

আমি চোখ বন্ধ করে একটু কল্পনা করার চেষ্টা করলাম । অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখলাম না । দেখার কথাও না,চোখ বন্ধ করলে অন্ধকারই দেখা যায় । তবু বললাম, ‘তুমি কালো শাড়ি পড়ে আছ । ‘

ওপাশ থেকে নীলি চুপ হয়ে গেল । আমার অনুমান ঠিক হয়ে গেল নাকি ?
যে নীরবতা শোনার জন্য কল করেছিলাম সে নীরবতা অসহ্য মনে হল । শীতের শুরুতে বাতাসের জ্বালায় বাইরে একটা হাস মুরগীও নেই । সন্ধ্যার ঠিক শুরুর সময়টাতে ঝিঁঝিঁ পোকারাও দ্বিধাগ্রস্ত, ডাকা শুরু করবে কি করবে না ?
অন্যসময় গ্রামে এলে এমন ঠাণ্ডা চুপচাপ সন্ধ্যার জন্য অপেক্ষায় থাকি,আজ সেটা যন্ত্রণাদায়ক মনে হল । কেন হঠাৎ এই নীরবতা সেটাও বুঝা যাচ্ছে না । শাড়ির রঙ হয়ে গেলেই বা কি এমন হাতি ঘোড়া হয়ে যাবে ? নীরবতা ভাঙ্গার জন্য বললাম, ‘আচ্ছা তোমার তো এবার একুশ পূর্ণ হল । কি গিফট দেবে আমায় ? একুশটা কিস দাও ব্যাবি । ‘ বলে দুষ্টুমির একটা হাসি দিলাম ।
‘ইশরে ! বাচ্চা ছেলের কত কিস খাওয়ার শখ ! মাথা খারাপ? ‘
‘কিস পাওয়ার জন্য কি মাথা খারাপ হতে হয়? তাহলে যাও, আমার মাথা খারাপই । ‘
‘ব্যাবি,য়্যু নো আই এ্যাম…আই এ্যাম…’
‘নীলি, তুমি কিন্তু কয়েকদিন আগেই কিস করেছ । ‘
‘আরে ধ্যাত,ওটা ছিল এক্সপেরিমেন্ট । ‘
‘তাহলে চল আরও একুশ বার এক্সপেরিমেন্ট করি । হাহা । ‘
‘থাপ্পড় খাবা একুশটা? ‘
‘ভালবেসে থাপ্পড় দিলেও আপত্তি নেই । সাথে কিসও দিতে হবে । ‘
‘ঠিক আছে এই নাও আমার প্রথম প্রেমময় থাপ্পড় ।ইয়ে ল মেরি পেহলা প্যায়ার কা থাপ্পড । ‘
মোবাইলে ঠুকা দেওয়ার মত শব্দ হল । বললাম, ‘এ্যাই দাঁড়াও দাঁড়াও । এবার আর কিস দিতে হবেনা । আমার ভার্চুয়াল কিস চাইনা,বাস্তবে নিব । ‘

নীলি এবার তার খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে । হাসতে হাসতে বলল, ‘ থাপ্পড় ভার্চুয়াল, আর কিস রিয়েল লাইফে ? হবে হবে না,হবে না! ‘
‘আই লাভ য়্যু বেইবি । ‘
‘লাভ ? হিহি । কিন্তু তুমি জান,আই এ্যাম অলরেডি ইন রিলেশন । ‘
‘তবুও ভালবাসি । স্টিল লাভ য়্যু । ‘
‘ডোন্ট বি ক্রেজি । য়্যু নো…য়্যু নো আই এ্যাম… ‘
‘তুমি কি আমি জানি । তবু ভালবাসি । সমস্যা কোথায় ? আমি তো কিছু চাইছি না,রেসপন্সিলিটি লেস লাভ । আমাদের ভালবাসা হল প্ল্যাটোনিক ভালবাসা । মাঝে মাঝে কিস করতে দিলেই চলবে । ‘
‘কেন হাঙ্গামা করছো, পরাগ? তুমি জানো য়্যু নো… আই এ্যাম আ ব্লাডি লেসবো ! ‘

এই প্রথম আমি গম্ভীর হয়ে গেলাম, শান্তভাবে বললাম,’ব্লাডি হবে কেন ? তুমি যা তুমি তা-ই । নিজেকে নিয়ে হীনতায় ভুগবে কেন? তারচেয়ে বরং বল,য়্যু আর আ প্রাউড লেসবো । আমি তাতেও ভালবাসি তোমায় । ভালবাসি, ভালবাসি । ‘

‘ থ্যাংকু য়্যুঁ । জু ভু অ্যামাঁত । ‘
নীলি হাসল,তার ভুবনমোহিনী হাসি । আমি মনে মনে বললাম, ‘Your smile is a beautiful lie! ‘

ইথারে হাসি ভাসিয়ে দেওয়া মানুষটি নীরবে কাঁদছে । আমি জানি,সে সুন্দর হাসিটির আড়ালে কাঁদছে । ভালবাসতে না পারার কষ্টে কাঁদছে ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.