ফ্যামিলি

লেখকঃ হায়াসিন্থ

রুমভর্তি নীরবতার মাঝে ডাক্তার টেবিলের উপর হালকা একটু শব্দ করে কলম রাখলেন । এমন হালকা শব্দে সচরাচর কান সাড়া দেয়না । কিন্তু রুম অতিরিক্ত নীরব বলে সেই শব্দ রাজীব সাহেবের কানে খট করে বাজলো । উপরের দিকে মুখ তুলে তিনি স্থির চোখে কতক্ষণ কলমের দিকে তাকিয়ে থাকলেন । তারপর ধীরে ধীরে ডাক্তারের দিকে দৃষ্টি নিয়ে বললেন, ‘ উড য়্যু প্লিজ…আপনি একটা বার দেখুন চেষ্টা করে ?’
ডাক্তার একটা ছোট নিশ্বাস গোপন করলেন । বললেন , ‘সী…দেখুন , পেশেন্ট আপনার সাথে কথা বলতে চাইছে না । দেখাও করতে চাইছে না ।’
রাজীব সাহেবের মুখে অসহায়ত্ব ফুটে ওঠে , ‘আমি পেশেন্টের বাবা । প্লিজ , তার সাথে একবার কথা বলিয়ে দেওয়া যায়না , প্লিজ ? ‘
ডাক্তার শ্যারন তার গাম্ভীর্য ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন । অসহায় এই মানুষটিকে তিনি প্রফেশনাল দিক থেকে না দেখে বাবা হিসেবে দেখলে চেষ্টা করলেন । পঁয়তাল্লিশ ঊর্ধ্ব মি. রাহম্যান কেমন অসহায় কাঁচুমাচু হয়ে বসে আছেন ছেলের সাথে দেখা করার জন্য । অথচ তার ড্রাগ এডিক্টেড ছেলে তার সাথে দেখা তো করতে চায়ই না,সেই সাথে প্রচন্ড পরিমাণ ঘৃণা করে ।
মি. রাহম্যানের জন্য তিনি কেমন করুণামাখা মায়া অনুভব করেন । প্রফেশনাল কোড ভেঙ্গে তিনি রাজীব সাহেবের কাঁধে হাত রাখলেন । বললেন , ‘মি. রাহম্যান, আমি জানি আপনি পেশেন্টের বাবা । কিন্তু প্লিজ,বুঝতে চেষ্টা করুন , আপনার ছেলে একটা শকের মধ্যে আছে । এখন পেশেন্টের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করতে গেলে খারাপ কিছু হতে পারে । ভাল হয়ে ওঠুক,তখন তো বাড়িতেই নিয়ে যাবেন… ‘
রাজীব সাহেব ভেতরকার আবেগ শান্ত করতে চেষ্টা করলেন । খানিকটা ধাতস্থ হলে তার চোখে কৃতজ্ঞতা দেখা গেলো , ‘ওকে । থ্যাংকস ডক । কিন্তু এট লিস্ট একটা কাজ করতে পারবেন ? রেকর্ড করে জার্জিসের মুখ থেকে ‘বাবা’ ডাকটা আনতে পারবেন ? ‘
রাজীব সাহেবের মনে হল তিনি ডাক্তার কে ঠিক বুঝাতে পারছেন না ছোট এই শব্দটা শোনার জন্য তিনি কেমন কাতর হয়ে আছেন, কতটুকু ব্যাকুল হয়ে আছেন । বুঝাতে পারলে ডাক্তার অবশ্যই এনে দিত ।
শ্যারন জানে এরকম অবস্থায় এসব করা যাবেনা । পেশেন্ট কে পছন্দের বাইরে কিছু করাতে গেলেই বিপত্তি । তবু আবেগটুকু ডাক্তারও বুঝতে পারলেন । তাই তিনি বললেন,’মি. রাহম্যান, আই’ল ট্রাই । ‘

হালকা নীল রংয়ে ভেসে যাওয়া একলা ঘরের মধ্যে রাজীব দাঁড়িয়ে আছে । একা । সম্পূর্ণ একা । তবু তার মনে হচ্ছে অশরীরী কিছু যেন তার সাথে দাঁড়িয়ে আছে । ঘরের নীল দেওয়ালের দিকে এগিয়ে গেলেন । নীল আলোর সাথে মিশে নীল আর কালোর মাঝে রং ধারণ করে আছে । তারমাঝে একটা ক্রেয়নে আঁকা পোট্রেট ঝুলে আছে । জার্জিসের কাঁচা হাতে আঁকা একটা ছবি —- দুজন মানুষের মাঝখানে হাত ধরে একটা বাচ্চা । নিচে লেখা “Family” । ঠিক যেমন করে এর আগেও হাজার হাজার শিশু তাদের ঘরের ছবি এঁকে রেখেছে,তেমনটাই জার্জিসও এঁকে রেখেছে তাদের ফ্যামিলির ছবি ।
পুরনো হতে থাকা কাগজে হাত দিয়ে সে জীবিত করতে চাইল ‘ফ্যামিলি’ কে । পারলে জীবন্ত করে ফেলতো তাদের সেইসব দিন । সে ক্ষমতা নেই,তাই স্পর্শে অনুভব করেই নিজেকে বুঝাতে চাইল এরাই ফ্যামিলি । এরাই সবসময় তার সাথে আছে । ঘর ভর্তি জার্সিসের খেলনা আর স্মৃতি । সমস্ত “ফ্যামিলি” আজ নিঃস্ব হয়ে গেছে, শুধু এই অকেজো কিছু খেলনা আর স্মৃতি ছাড়া কিছুই নেই ।
ঘরের এক কোণে পড়ে থাকা চুপসে যাওয়া ফুটবল টাও সে পরম ভালবাসায় স্পর্শ করে । স্পর্শে অনুভব করে জার্জিস কে, তার ছেলে জার্জিস কে আর সাজন কে । চোখ বন্ধ করে সে আগের দিনগুলোতে ফিরে যায়। বন্ধ চোখের অন্ধকারে ভাসতে থাকে সব ছবির মতন । সেই প্রথম দিনের পুটলি একটা বাচ্চাকে সে আবারো দেখে । নিজের শরীরের একটা অংশ থেজে প্রাণ পাওয়া পুটলি হাতে নিয়ে তার কেমন অপার্থিব মনে হচ্ছিল সব ।
বাচ্চাটাকে হাতে নিয়ে যখন ঘ্রাণ নিল,তখন মনে হয়েছিল,এই একটু ঘ্রাণের জন্য হলেও সে বেঁচে থাকবে । সব ছেড়েছুড়ে এই একটুখানি ঘ্রাণের জন্যও বাঁচা যায় ।
সবকিছু সে ছাড়তে প্রস্তুত ছিল,এবং ছেড়েছিল ও । দেশের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল অনেকদিন । যার সাথে ঘর করতে এখানে আসা,তাকেও একসময় ছাড়তে হল । বিশ্বাসঘাকতের মতন একসময় সে-ও চলে যায় । শুধু রাজীব এতদিন বেঁচে আছে সেই পুটলি বাচ্চাটার জন্য । জার্জিস । তাদের ছেলে । তাদের কিউপিড ।
সারোগেসি মম নেওয়ার ব্যাপারে সাজনের উৎসাহই বেশি ছিল । তাদের দুজনের স্বপ্নই ছিল একটা সুখী ফ্যামিলির —– যেখানে একটা বাচ্চা থাকবে । বাচ্চাটাকে দুজনে কাড়াকাড়ি করে ভালবাসবে,দুজন ঝগড়া করবে বাচ্চাকে আদর করা নিয়ে । বাচ্চার ভালবাসার প্রতিযোগিতায় মারামারি পর্যন্ত করবে । **
মারামারি করেছেও তারা অনেকবার । অফিস থেকে ফিরে সাজন যদি দেখতো রাজীব আগেই কিউপিডকে নিয়ে গোসল করে ফেলেছে,তবেই রীতিমতো মারামারি শুরু হয়ে যেত ।
সাজন ধরে কিউপিড কে নিয়ে বাথটাবে বসে পড়ে । রাজীব দৌঁড়ে এসে বলে, “আমি মাত্র গোসল করালাম তো ! “
– “তাতে কী ? আবার করাবো । “
-“মাথা খারাপ? সর্দি জ্বর হলে? “
-“মাথা তো তোমার খারাপ, রাজ ! তুমি গোসল করাতে গেলে কেন ? আর আমার বেবির জ্বর জারি হবেনা । এটা আমার হাসের বাচ্চা । তারপর কিউপিড কে জিজ্ঞেস করতো, কিরে হাসের বাচ্চা থৈ থৈ,তোর জ্বর হবে ?
থৈ থৈ শব্দে জার্জিস মজা পেয়ে দ্বিগুণ বেগে লাফানো শুরু করলে রাজীব আর সাজনের মধ্যে টানাটানি লেগে যেতো । টানাটানিতে কিউপিড যতক্ষণ না কাঁদে ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের হুঁশ হতো না । **
সারগোট মম ক্রিস্টিনের খোঁজ সাজনই এনেছিল । তারপর একদিন তাদের ঘরে এল একটা পুটলি । দুজন যুবক,যারা পরিবার থেকে বিতাড়িত হয়েছিল , তারা আবার পরিবারের বন্ধনে বাঁধা পড়ে । পারিবারিক ভালবাসায় অতৃপ্ত দুটি আত্মা আরও বেশি ভালবাসায় জড়িয়ে যায় । নিজেরা নিজেদের ভুলে যায় । তাদের মাঝে শুধু একটা বাচ্চা সত্যি হয়ে ওঠে । ভালবাসার প্রতিযোগিতা করতে করতে দুজন দুজনকে হিংসা করতে শুরু করে । রাতের ঘুম দুজনেই ভুলে যায় শুধু বেশিক্ষণ বাচ্চাকে দেখে রাখার জন্য । মাঝখানে শুইয়ে রেখেও শান্তি পায়না তারা , ইচ্ছে করে বুকের মাঝে রাখতে । দুজনে আরও নিবিড় হয়ে যায় পারিবারিক ভালবাসায় । রাজীব – সাজন , সাজন – রাজীব আর কিউপিড ।

সেই দিনগুলো যদি আটকে রাখা যেতো, তবে আটকেই রাখতো । জীবনে আর কিছু চাওয়ার ছিল না তাদের । কিন্তু এত সুখ দেখে সৃষ্টিকর্তারও কি সহ্য হয়নি ? নইলে হঠাৎ তাদের একজনকে কেড়ে নিলেন কেন ? কেন সাজন বিশ্বাসঘাতকের মত চলে গেল ?
ক্যান্সারে ধুঁকতে থাকা সাজনের মুখে হাসি লেগেই থাকতো সবসময় । সামান্য সময়ের মধ্যে জ্বলজ্যান্ত একজন মানুষ কঙ্কাল হয়ে গেল । যাওয়ার আগে খুব আফসোস করে বলেছিল,’যেতে ইচ্ছা করছে না রে রাজ । আমাদের দুজনের ভালবাসা তুমি একাই দিও । ‘
কিউপিড কে কোলে নিয়ে বলেছিল, ‘ মাই কিউপিড, বাই । ব্লেস মি । ‘
সাজন চলে যাওয়ার পর রাজীব উদ্দামতায় নিজেকে ভাসিয়ে দিতে পারতো , কিংবা প্রবল দুঃখবোধে নিজেকে শেষ করে দিতে পারতো । কিন্তু এসবের কিছু করেনি । মনের মধ্যে তীব্র অভিমান নিয়ে নিজেকে আরও ডুবিয়ে দেয় কাজ আর ছেলের মধ্যে । সব ভুলতে এ দুটোকে আশ্রয় হিসেবে নিয়েছিল । তবু কোন কোন মাঝরাতে জার্জিস হঠাৎ হঠাৎ যখন জিজ্ঞেস করতো , “হোয়ার ইজ মাই কিউপিড বাবা সাজ? “
উত্তর দিতে না পেরে রাজীব শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতো । সেই থেকে রাজীবের ইনসমনিয়ার শুরু । সারারাত চোখ একত্র না করে ক্লান্ত শরীরে অফিস করতো । অফিস থেকে মরার মতন ফিরে যখন শুনতো , “বাবা , সাজের মতন কোথায় গিয়েছিলে ? আই ওয়াজ এলোন ! ” তখন নিজেকে আবার জীবিত মনে হত ।মনে হতো , এর জন্যই বাঁচতে হবে ।
সাজনের মতন কোথাও চলে যাবেনা এমন প্রতিজ্ঞা কয়েক হাজার বার করতে হয়েছে । সে প্রতিজ্ঞা ভাঙ্গেনি । কিন্তু মাঝখানে কিউপিড কেমন বদলে গেল । তার আর সাজনের ভালবাসার কিউপিড । অথচ তার ভালবাসার তো কোন ঘাটতি ছিল না ! বাবা – মা দুজনের ভালবাসা একা সে দিয়েছে । ডায়াপার বদলানো থেকে খাইয়ে দেওয়া । ঘোড়া হয়ে খেলা থেকে রাতে রূপকথার গল্প শুনানো । সব । বিনিময়ে সে শুধু চেয়েছিল ছোট দুটো হাত ধরে রাখতে , ঘুমন্ত বাচ্চার মুখের দিকে তাকিয়ে তার ঘুমহীন রাত পাড়ি দিতে । সে একটু ভালবাসা চেয়েছে,চেয়েছে একটু বেঁচে থাকার অবলম্বন ।
কিন্তু আজকে বুঝতে পেরেছে,জন্ম থেকে যারা শরীরে সমকামিতা নিয়ে এসেছে,তাদের জন্য পৃথিবী খুব নিষ্ঠুর । পারিবারিক শান্তি তাদের কপালে নেই । নিজের বাবা – মা, ভাই বোনকে ছাড়তে হয়েছে অনেক আগে । তার গোঁড়া বাবা কখনো তাকে মেনে নিবেনা এটা সে জানতো । মানেও নি । তাই সাজনের হাত ধরে সে আজ অ্যামেরিকায় । ভেবেছিল , নিজের একটা পরিবার হলে সেটা নিজের মত করে গড়ে তুলবে । ধ্যান – ধারণায় আধুনিক করে তুলবে । পরিবার একটা পেয়েওছিল । কিন্তু নিজের বাবা – মা যা গ্রহণ করেনি সেই গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন সন্তানও তুলতে পারে সেটা মাথায় আসেনি । কখনো ভাবেইনি ।

পরিবর্তন শুরু হয়েছিল খুব ধীরে ধীরে । জার্জিসের মধ্যে কেমন ছন্নছাড়া খাপছাড়া ভাব দেখা দিল । ঠিক মত কথা বলেনা,স্কুল থেকে ফিরে রুটিন মত জড়িয়ে ধরেনা । সারাজীবন বাংলাদেশে থাকা রাজীবের চোখে সেসব বিশেষ দাগ কাটেনি । ভেবেছে,ছেলে কৈশোরে প্রবেশ করছে , তাই হয়তো দুর্ভেদ্য হয়ে যাচ্ছে । রাজীব চেষ্টা করতে লাগলো আরেকটু ফ্রেন্ডলি হতে । কিন্তু জার্জিস ততই দূরে যেতে লাগলো । এক টেবিলে খাবার খেতে ঢাকলে ‘ক্ষিধে নেই’ বলে নিজেকে বন্দী করে রাখতো । দিন দিন রুক্ষমূর্তি ধারণ করে শেষে একদিন বলেই দিলো , “You gay ! You not my daddy,you not my baba ! “

রাজীব সেদিন কিছু বলেনি, বলতে পারেনি । বলার মত কিছু ছিল না । সমকামী হওয়া যদি অপরাধ হয় তার ছেলের কাছে, তবে সে অপরাধীই হবে, তবু এটা নিয়ে ছেলের সাথে তর্ক করবে না । নিঃশব্দে সেদিন করবার নিজেকে খুন করেছে সেটা যদি জার্জিস জানতো, তবে জার্সিসও খুনের অপরাধে নিজেকে অপরাধী বলতো ।

ইলেকট্রিক শক থেরাপির ভয়াবহতার আগে জার্জিসের ইচ্ছা হয় বাবাকে আরও প্রবলভাবে আঁকড়ে ধরার । বাবার। বুকের মধ্যে নিজেকে লুকিয়ে ফেলার । কিন্তু সে তো আর বাবাকে ঘৃণা করে ! তার বাবা যে গে ! মিচেল বলেছে,গে রা শয়তান । নিজের বাবাকে শয়তান ভাবতে জার্জিসের কষ্ট হয় । তার বাবা সবার বাবার চেয়ে ভাল হয়েও কেন গে হতে গেল ? মায়ের ভালবাসা তার দরকার নেই,কিন্তু সবার মা থাকলে তারই বা কেন থাকবে না ?

স্কুলের বাচ্চারা যখন তার দিকে মুখ টিপে হাসে,তখন সে তার বাবাকে ঘৃণা করে ! হ্যাঁ,ঘৃণা করে !
সে জানে,তার বাবা সেরা বাবা । কিন্তু ইলিনায়া কে প্রপোজ করার পর ও যখন হেসে বললো , “You are a rainbow child. Rather find a gay mate “

সেদিন তার বাবাকে দোষী মনে হয়েছিল । তার বাবা যদি নিজের ভালবাসার জন্য দেশ ছেড়ে আসতে পারে,তবে ইলিনায়ার জন্যও সে তার বাবাকে ছাড়তে পারবে । তার পরিচয় সে মুছে দিবে । “আমি রেইনবো চাইল্ড হতে চাইনা… ” জার্জিস চেঁচিয়ে উঠালো ।

ইলেক্ট্রিক থেরাপির মাঝে জার্জিস বিড়বিড় করছিল , “I love you Baba.I. Love.
You…Baba,Baba. “

ডাক্তার শ্যারনের আফসোস হতে লাগলো তিনি কেন রেকর্ডার অন করেননি ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.