জীবনের অপেক্ষা

লেখক: কথ্য বর্ন

রুম থেকে বারান্দার গ্লাসটা ধাক্কা দিয়ে এক গ্লাস কফি নিয়ে বারান্দায় রেলিং এর পাশে দাঁড়ালাম। ঘড়ি দেখা হয়নি, তবে সকাল সাড়ে ১০ এর মতই হবে হবে। আজ রবিবার, অফিস আর ক্লাস বন্ধ। ছুটির আমেজ ঠিকই গায়ে লাগাচ্ছি ভাল করে। রুমে বাজছে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এর গাওয়া_

এই মেঘলা দিনে একলা ঘরে থাকে নাক মন…

গানটা ইচ্ছে করেই ছেড়ে রেখেছি এমন দিনে। গানের এই দুই লাইন শুনতেই অজান্তেই ঠোঁটে হাসি চলে আসল, আর সাথে ঠাণ্ডা দমকা হাওয়া যে সামনের চুলগুলো একটু নাড়ীয়ে দিয়ে গেল তা ঠিকই আঁচ করতে পারলাম। এপ্রিল মাসের এই সময়টা প্যারিসের আবহাওয়াটা দারুণ থাকে। রৌদ্রজ্জল ঝকঝকে চারপাশ কেমন স্বর্ণালী আভায় ছুঁয়ে যায় এই মন। প্রায় দেড় বছর হয়ে গেল এখানে আছি। আজকের এমন সকাল দেশের বসন্ত আর বর্ষার ভাললাগা সময় স্মৃতি মনে করিয়ে দিল, সাথে আমার প্রিয় মানুষ গুলোকেও। আজকের সকালটা অন্যান্য দিনের চেয়ে আরও বেশি সুন্দর লাগছে। রৌদ্র স্বর্ণালী আভার মৃদু সুপ্ত পরশ একপাশে আর সাথে আকাশের অন্য এক প্রান্তে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। কেমন অদ্ভুদ অজানা ভাললাগা কাজ করছে ভিতরে। মনে আচমকা কৌতুহল এল রংধনু উঠেছে কি? দেখার জন্য বারান্দা থেকে মাথা বের করে আকাশের দিকে উঁকি দিলাম, কিন্তু নিরাশ হতে হল। তখনি নিচের দিকে চোখ পড়তেই দেখি এক কিশোরী ফ্রেঞ্চ মেয়ে কিছু বেগুনী রঙের অর্কিড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটি সাদা রঙের টপস আর কাল জিন্‌স পরেছে। সাদা রঙ আর মেয়েটিকে দেখেই নীলার কথা মনে পড়ে গেল। নীলার শুভ্র-রঙ খুব পছন্দের ছিল, আর শ্যামলা মায়াবী গড়ণে দেখতেও ওকে দারুণ লাগত। সেই নীলা, আমার নীলা।

-নীলা তোমায় আমি কতটা ভালবাসি তুমি জান না?

আমি তখন রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি আর সে এই বৃষ্টির মাঝে রিক্সার হুট নামাতে নামাতে তার ভুবন ডাঙ্গা মুগ্ধ হাসি দিতে দিতে বলে…

-জানি বলেই এত জ্বালা, যখন দেখি তুমি আমার জন্য অস্থির হয়ে যাও তখন আমার মাঝে কেমন অদ্ভুত ভাল লাগা কাজ করে। যার কোন ভাষা, ধ্বনি বা বর্ণ নেই। যা শুধুই অনুভব করার। কেন তুমি হুমায়ুন আহমেদ এর ঐ কথা শোননি? মানুষ তাদের নিজেদের লুকীয়ে রাখতে পছন্দ করে যাতে তাদের প্রিয় মানুষ তাদেরকে নতুন করে আবিষ্কার করতে পারে।

আমি জানি এই মেয়ে আমায় ঢের ঢের বেশি চায়, পছন্দ করে আর ভালবাসে যার ধারে কাছে যাওয়া আমার সম্ভব না। সত্যিই তারা অনেক অভাগা হয় যারা কোন মানুষের প্রচণ্ড বাধ ভাঙ্গা ভালবাসায় সিক্ত হয় কিন্ত ঐ সমপরিমাণে তাদের ভিজাতে পারেনা। কারন হৃদয় নিংড়িত ভালবাসতে পারা যে অনেক পবিত্র আর মুল্যবান, যা সবার ক্ষমতার মাঝে থাকে না। আমিও যে ঐ কাতারেরই একজন তা জানতাম না। মাঝে মাঝে নিজেকে খুব শূন্য লাগত, আর এই শূন্যতার মাঝে যাই আসত সবি যেন শূন্য হয়ে যেত। যার কাছে আমি সব বলি, যে আমার সব বুঝে, আমায় বুঝে তার সামনেও মাঝে মাঝে কেমন নির্বাক হয়ে যেতাম, তখন নীলার চোখে যে কিছুই এড়াচ্ছে না সেটাও আমি খুব ভাল করেই বুঝতে পারতাম। ও শুধু নিরব থেকে যেত, আর ঐ নিরবতার মাঝেই আমার হাত ধরে আমার পাশে আছে তার জানান দিত তার নির্বাকতায়। ও জানত আমি ছেলেদের প্রতি দুর্বলতা অনুভব করি এমনকি আমাদের সম্পর্কের শুরুতেই আমি ওকে সব বলি। তাতে ওর কোন আপত্তি ছিল না, কারন ওর বিশ্বাস ছিল আমাদের ভালবাসায়, সব একদিন পূর্ন হয়ে যাবে, পূর্ন হব আমারা। তখন ওর ঐ বিশ্বাস আর ভালবাসায় আমার শ্রদ্ধা জাগত। ভাবতাম তখন এই আমার প্রকৃত ভালবাসা, ঠিকই নীলা ছিলও তাই। তখন আমার ভিতরের আরেক আমি আমায় প্রতিনিয়ত প্রশ্ন করত… ‘রিয়াদ তুই কি নিজের কাছে নিজে মিথ্যে বলছিস, শুধু এমন ভালবাসা পেয়েছিস বলে?’ উত্তরে শুধুই এটাই বলতাম… ‘ভালবাসার চেয়ে আর দামি কি’ই বা আছে? যেখানে আমার সব স্বপ্ন শুধুই নীলাকে ঘিরে, সামাজিকতার জন্য নয়, আত্মার টানে। পরক্ষনেই নিজেকে নিজে জিগ্যেস করতাম … উত্তর কি আসলেই তাই?’

-এই কি হয়েছে? কি ভাবছ?

নীলার কথাই তখন আমার হুস ফিরে এল। একটু মুচকি হেসে উত্তর দিলাম…

-না কিছু না। চলো তোমায় বাসায় পৌছিয়ে দেই, না হলে আবার তোমার ঠাণ্ডা লেগে যাবে। নীলাও তখন শান্ত মেয়ের মত কথা মেনে নিল।

এভাবেই নিজের ভিতর সব দ্বিধা দ্বন্দ্ব নিয়ে নিজের মনের বিরদ্ধে কোন এক অজানা মোহে আর আকর্ষণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমার সিলেট থাকা অবস্থাতেই একটি ছেলের সাথে পরিচয় হয়। আমার কোন ফেইক আইডি ছিল না। কিন্তু তবু কখনও আমার বা নীলার কোন ছবিই আপলোড করিনি আমার আইডিতে। ঐ ছেলের ও কোন ছবি ছিল না তার আইডিতে। আমরা কেউ কাউকে কোনদিন দেখিউনি। আমার সাথে ঐ ছেলের সাধারণ দৈনন্দিন দিনের সব কথা হত। খুব ভাল বন্ধু আর বড়ভাই হয়ে উঠেছিল ও আমার। আমার সুবাদেই ওর নীলার সাথে খুব ভাল সখ্যতা গড়ে উঠে। ঐ ছেলে আমার থেকে ৪ বছর বড় ছিল। নীলা জানত আমরা ছিলাম শুধুই বড়ভাই-ছোটভাই এর মত। হয়ত এই কারনে একদম পরিষ্কার হয়ে ওর চোখে কিছু ধরা পরেনি। আমার বি.এসসি শেষ করার পর আমি ঢাকা শিফট করি একটা জব নিয়ে। নীলা তখন সিলেট এই থাকত। তখন ঐ ছেলের সাথে প্রচণ্ড দেখা করতে ইচ্ছে করত। কিন্তু নিজেকে বারবার সবসময় দমিয়ে রেখেছি, আর বলেছি না থাক কি দরকার দেখা করার, যেমন আছি তেমনই ঢের ভাল। ঐ ছেলেএকদিন বলে ফেলে চল আমরা দেখা করি। সেদিন আর নিজেকে আটকাতে পারিনি, নীলাকে বলে যে আজ আমি ঐ ছেলের সাথে দেখা করতে যাচ্ছি এমনি। নীলাও খুব স্বাভাবিক নেয় ব্যাপারটা। এভাবে ঐ দিন ঐ ছেলের সাথে কথা বলার পর আর দেখা হবার পর কেন জানি আমি ওকে খুব মিস করতে থাকি। ওর কথায় কেমন যেন একটি টান আর ভাললাগা অনুভব করতাম। সেটা আদও টান ছিল, না মোহ তা তখনও আজানা ছিল। দেখা করার পর বারবার মনে হচ্ছিল কেন দেখা করলাম। আনমনা হয়ে যেতাম, একা একা ভাবতাম কেন এমন অনুভুতি আসছে আমার ভিতর? কেন এতটা জটিল আমি? সব প্রশ্নের উত্তর ছিল অজানা আর সেটা থাকতও অজানা। এই সবকিছু আমাকে, আর আমার আর নীলাকে নিয়ে ঘেরা সব স্বপ্নকে দুমড়ে মূচড়ে ফেলছিল। তখন দিনে দিনে অজান্তেই আমি নীলার কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছিলাম আর ভাবতাম আছেই তো ভালবাসা, কি দরকার এত কথার? আছেইত আমার ভাবনায়। কিন্ত আমি যে নীলার উপর অন্যায় করছি তার বোধগম্যতা হয় আমার আরও অনেক পরে। সব মানুষ একসাথে সব সামলাতে পারেনা, আমিও পারিনি। আমি যখন ঐ ছেলের প্রতি ক্রমে ক্রমে দুর্বল হয়ে এগুচ্ছিলাম তেমনি করে নীলা থেকে দূরে সরছিলাম। আমি তখন বুঝিনি কিন্তু নীলা ঠিকই বুঝতেছিল, শুধু সঠিক কারণটাই জানতোনা। তবুও সে তার সব উজাড় করে আমায় ভালবাসে, তার ভালবাসায় আমায় শুভাসিত করার জন্য, যেভাবে ধূপ নিজে জ্বলে আর তার সব পূড়িয়ে ঘরকে তার ধোঁয়ায় সুভাসিত, আর পবিত্র করে ঠিক তেমনি। আর বিপরীতে আমার বুকে তিক্ততার ঝড় উঠে আমাকে নিয়ে আমার নিজের কাছে। নিজের ভালবাসার উপর প্রশ্ন জাগে। প্রতিমুহূর্তে যেন আমি মরতে থাকি হাজারও বিষের তিক্ততায়। না পারি গিলতে আর না পারি উগ্রিয়ে দিতে। এক পর্যায়ে নীলাও আমার অবস্থা বুঝে সিলেট থেকে ঢাকা চলে আসে , কিন্তু তাতেও কোন লাভ হয় না। এভাবে আর না পেরে অনেক অনেক ধাক্কা খেয়ে অসম্ভব যন্ত্রনায় একদিন সিদ্ধান্ত নেই নীলার কাছে সবব জেড়ে কাশবো। ঠিক তাই ই, একদিন সিলেট ফিরে বিকেলে সুরমা নদীর পাড়ে গিয়ে বসি। তখন বর্ষা আকাশ। নদী দিয়ে কলকল শব্দে পানি বহমান সাগরপানে, আর আমি আমার গন্তব্যই জানি না, হয়ত জেনেও মানিনা। জানলে কেন এত বিভ্রান্ত হব, আর হতাম? তখন নদীর পানির উপর খুব হিংসে হতে থাকে, এই ভেবে যে সে যা চাই তাই পেতেই ছুটে যাচ্ছে আর আমি যেন অথর। নদী থেকে আকাশে তাকাতেই দেখি এক পাশে কাল সাঁঝ আর পশ্চিম আকাশে সূর্যের রক্তিম আলো উঁকি দিচ্ছে, যেন ঠিক আমার মন। ব্যাথাক্রান্ত হয়ে যেন অস্রু হয়ে ঝরার অপেক্ষায়, আর সূর্যের রক্তিম আভা যেন আশার বাণীর কথা জানান দিচ্ছিল। সব মিলিয়ে পরিবেশ ও যেন কেমন মন খারাপ অদ্ভুত মায়াবি ভাললাগার ছন্দে দূদুল্ল্যমান ছিল। আকাশ থেকে চোখ সরিয়ে সামনে তাকাতেই দেখি নীলা রিক্সা থেকে নামছে। লাল শাড়িতে ওকে দারুণ লাগছিল। প্রকৃতির সব আয়োজন যেন নীলার জন্যই। আচ্ছা সব কিছুই কি ধ্বংসের আগে এমন সুন্দর হয়ে সাজে? পরক্ষনেই মাথায় আসে আচ্ছা আমি ধ্বংসের কথা কেন ভাবছি, তাহলে কি আসলেই ধ্বংস হবে? না না এমন হতে পারে না। আমার পূর্ণ বিশ্বাস আছে এতে। নীলা আমার সামনে চেয়ার টান দিয়ে বসে বলে…

-দেখত কেমন লাগছে আমায়?

-আজ তোমায় অস্মভব সুন্দর লাগছে, চোখ ফেরাতে পারছিনা। তবে কাজলটা আরও একটু টেনে পরলে আরও মায়াবি লাগত। মায়াবি শব্দটা বলতেই কেন যেন রবীন্দ্রনাথ এর ‘মায়াবন বিহারিণী হরিণী, গহন স্বপন সঞ্চারিণী’ গানটি মনে পড়ল। পরক্ষনেই নীলার মুখের দিকে তাকিয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমাকে সব আজ ই বলতে হবে, না হলে এত সাহস আর আমি জোগাতে পারবনা।

সব কিছু নীলা চুপ করে শুনে। কিছুই বলেনা, যেন বর্ষার সব কাল মেঘ এই অল্পক্ষনেই ওর সব হাসি আর আনন্দ গ্রাস করে ওর চোখে ভর করছে। থমথমে ভাব, যেকোন সময় ঝরে পড়বে কিন্তু পরছে না। ও অসম্ভব অভিমান আর রাগ করে, তাতে যেন আমিও নির্বাক আর স্তব্ধ সব বলার পরে, কিছু আর বলারও যেন আমার সাধ্য নেই। কিছুক্ষন চুপ করে থেকে ওএখান থেকে উঠে একটি রিক্সা নিয়ে চলে যায়। আমি জানতাম ও আমায় ঘৃণা করতে পারে না, এটা ছিল ওর শুধুই অভিমান। হয়তো ও চাচ্ছিল আমি গিয়ে ওর রাগ আর অভিমান ভাঙ্গায় কিন্ত কি মুখে যাব সেই সাহস ই পাচ্ছিলাম না। শুধু চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছিল। চুপ করে বসে ছিলাম আর ভাবছিলাম আচ্ছা এই অশ্রু ঝড়ানুর অধিকার কি আছে আমার? নাকি এই জল আমার স্পর্শে এসে অপবিত্র হয়ে যাচ্ছে? আর কোনদিন আমি নীলার রাগ আর অভিমান ভাঙ্গাতে পারিনি। হ্যাঁ, কোনদিন না। কারন ও একবুক অভিমান, কষ্ট আর অপরিসীম ভালবাসা নিয়ে ঐ দিনই পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়। প্রথমে নীলার ছোট বোনের কাছে ওর মৃত্যুর সংবাদ শুনে ভেবেছিলাম নীলা আত্যহত্যা করেছে, কিন্তু না, মনে এই বিশ্বাস ছিল আমি যতটাই স্বার্থপর হই না কেন নীলা একদম স্বার্থপর নই, ও হতে পারে না। আমাকে এমন একা ফেলে সে যেতে পারেনা, আমার অনুভুতি যাই ছিল কিন্তু তখন ও আমার মনে হচ্ছিল আমার ভিতর নীলার জন্য বিন্দু হলেউ সুদ্ধ ভালবাসা ছিল। ঐ দিন এক নিয়ন্ত্রনহীন মাইক্রোবাস নীলার রিক্সাকে প্রচণ্ড বেগে ধাক্কা দেয় আর নীলা রাস্তায় পরে মাথায় মারাত্মক আঘাত পায় যাতে ওর ব্রেন এর কিছ অংশ চরম ক্ষতিগ্রস্থ হয়। হাসপাতালে কিছু সময় লড়ে পরে সে সবার কাছ থেকে দূর ঠিকানায় চলে যায়, যেখান থেকে আর কেউ ফিরে আসে না। আমি চির ছোট হয়ে যাই, নিজের কাছে। এভাবে এমনভাবে শাস্তির যে কি তীব্র যন্ত্রনা তা যে ভোগ করে শুধু সেই জানে। শেষ একবার খুব জানতে ইচ্ছে হচ্ছিল যে, শেষ একবার আমার নামটা নীলার মুখে এসে আমার নামটা কি ধন্য হয়েছিল? কিন্তু সেই জানার ইচ্ছা শেষ অব্ধি অপূর্ণ ই থেকে গেল। শেষবার যখন আমি নীলাকে দেখতে যায় ওকে তখন প্রাণভরে খুব দেখতে আর জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে হচ্ছিল। কিন্তু পারিনি শুধু পাহাড় সমান কষ্ট বুকে আটকিয়ে ঝর্ণা করে চোখ দিয়ে অশ্রু বয়ে দেয়া ছাড়া আর কিছুই পারিনি। ভেবেছিলাম নীলার সাথে আমিউ চলে যাব, কিন্তু না নীলা কি তা চাইত? না, মোটেও না, কাপুরুষ অনেক হয়েছি আর না, এখন আমি নীলার ভালবাসায় বাঁচব, ওর ভালবাসাকে ভালবেসে বাসব যাই করব নিজের সব আত্মা আর স্বত্যা একত্র করেই বাঁচব। জানি এতে আমার নীলা দূর থেকে আমায় দেখে একটু হলেও শান্তি পাবে।

কদম গাছের নিচে বৃষ্টিতে ঝরে পড়া কদম ফুলের পাপড়িতে খালি পায়ে আলতো করে হাঁটছি আর পাতা থেকে যে বৃষ্টির পানি টুপটাপ করে নিচে পরছিল তা গায়ে মাখছি। বৃষ্টি মাত্রই থেমেছে, তবুও ঝিরিঝিরি করে তার রেশ ঠিক ই জানান দিচ্ছে, মন্দ লাগছে না মোটেও। সকাল বেলার বৃষ্টি প্রকৃতিকে যেন নব বধূ অথবা নব বর এর মত স্নিগ্ধ পবিত্র রূপে সাজাই, আর প্রকৃতি তার এই স্নিগ্ধ সোভা দিয়ে সবাইকে বিমোহিত করে। খালি পায়ে হাটার সময় আবার এদিক সেদিক তাকাচ্ছি যেন এত বড় একটা ছেলে খালি পায়ে এমন হাঁটছে তা দেখে কে আবার কি মনে করে। মোহাম্মদপুরের ঈদগাহ মাঠের পাশের এই রাস্তাটা অনেক ব্যাস্ত হলেও আজ তেমন কাউকে চোখে পরছেনা। বৃষ্টি দেখেই কিনা নাকি অন্য কারনে, যাক আমার জন্য ভালই হয়েছে। কদম ফুল দেখে একটা গান খুব গাইতে ইচ্ছে হল আর গুনগুন করে সুর ও ধরে ফেললাম… ‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল করেছি দান’। তখন ই ভাবলাম কিছু ফুল পেড়ে কি নিয়ে যাব দীপ্তর জন্য, পরে ভাবলাম থাক, এখন একে তো আষাঢ়ের শেষের দিক আবার এসব ন্যাকামি দীপ্ত একদম পছন্দ করেনা। এসব ওর কাছে ন্যাকামি ই, তবে ভিতরে ভিতরে যে ও অনেক খুশি হয় এটাও আমি জানি। তবে এখনকার মত এই চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেললাম, দীপ্ত এখন বিছানায় ঘুমাচ্ছে। একটু আগেই ওকে খুঁচিয়ে রেখে এসেছিলাম। আমার অনেক আগেই সকালে ঘুম ভেঙ্গে যায়। আর আগে ঘুম ভাঙ্গায় ঐ সময় টায় আমার দীপ্তকে জ্বালাতে আর ওর ঘুম ভাঙ্গাতে খুব ভাল লাগে। বিশেষ করে দীপ্তর ঘুম ভাঙানোর পর এই আহ্লাদী কথা…

-রিয়াদ! প্লীজ না! এই ছেলেটা এত রাত জেগে কাজ করে সকালে একটু ঘুমায় আর তাকে খুঁচাতে বুঝি তোমার একটুও মায়া লাগে না?

-না লাগে না! তুমি ল্যাপটপে কাজ করে আসই এত রাতে আর আমি এত অপেক্ষা আর অভিমান করে ঘুমিয়ে যায়, আর তুমি সকালে এত আরাম করে ঘুমাবে, আর তা দেখে আমার হিংসে হবে না, তা কি করে হয় বল…? হুম! আর হ্যা যতদিন থাকব আমি রাতে তোমার সাথে ততদিন আমি খোঁচাবই।

-আচ্ছা বাবা আচ্ছা যাও…!

বলেই যখন ও আবার ঘুমাতে যাবে তখন ওর মাথা টেনে ঠোঁটে জোর করে চুমো দিয়ে দেই আর দীপ্ত কোন রকমে ঠোঁট ছাড়িয়েই চিৎকার দিয়ে বলে … রি…য়া……দ…! আমি তখন ওকে ঘুমাতে দিয়ে বাইরে চলে আসি। দীপ্ত ই সেই ছেলে যার সাথে প্রথমে আমার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিচয় হয়। প্রথমে সাধারণ সব কুশলাদি বিনিময় হলেও পরে কথার যেন ফুলঝুরি ফুটে। দীপ্ত দেখতে অনেক লম্বা ছিল প্রায় ৬ ফুট এর মত, আর একদম সাদা ফর্সা গায়ের রঙ ছিল ওর। সাস্থ্য বলতে ওর তেমন কিছুই ছিল না, একদম শুকনা একটা ছেলে ছিল ও। তবে ওর চোখ জোড়া ছিল অসম্ভব মায়াবী আর অনেক যাদুকরি, যা যেকোন মানুষকেই যেন আচ্ছাদনে ফেলে দেই। তীর্যক নাক, আর তার নিচেই মোটা মোটা ছোট দুটি গোলাপের পাপড়ির মত ঠোঁট। আমি এটা ভেবে অবাক হতাম যে, দীপ্ত এত ধূমপান করত তবুও ওর ঠোঁটে ছিল গোলাপিভাব। দীপ্তর গার্লফ্রেন্ড ভিয়েতনাম থাকত। একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে জব করত। দীপ্ত ছিল অসাধারণ মনের একজন মানুষ। সুয়ানার প্রতি ওর কেয়ারিং, কথা, ভালবাসা আমায় সব সময় মুগ্ধ করত। সুয়ানা ছিল দীপ্তর গার্লফ্রেন্ড এর নাম।তখন নিজেই ভাবতাম নীলাকেউ আমার এভাবেই কেয়ার করা উচিত, কিন্তু তখন দীপ্তকে দেখে আর ওর সবকিছু কখন যে আমার ভাল লাগতে শুরু করে আমি নিজেই বুঝিনি। একদিন রবীন্দ্র সরোবরে বসে ছিলাম আমি আর দীপ্ত সন্ধ্যা বেলায়, তখন আচমকায় কেন জানি ও ওর জীবনের অতীত অধ্যায় গুলো আমার সামনে তুলে ধরে। আনমনা হয়ে সে তার জীবন যেন আমার সামনে তুলে ধরছিল, কিন্তু কেন আচানক এমন ভাবে সে তার আপন কথা গুলো আমায় বলছিল বুঝতে পারিনি। তাহলে কি সেউ আমায় অনেক আপন ভাবা শুরু করেছিল যা আমি অনুভব করি। আমায় দীপ্তর কথা গুলো এমন ভাবে ছুঁয়েছিল যে কখন চোখ দিয়ে পানি পরছিল আর হাত দিয়ে তা মুছতেছিলাম খেয়াল ই করিনি। কি অনুভুতি আমার ভিতর কাজ করতেছিল জানি না, শুধু মনে হচ্ছিল এই মানুষকে আমি দুঃখী দেখতে পারিনা, আর সেই অনুভুতিও কি ছিল আমার সেটাও জানি না। সে তার আগের প্রেমিকের কথা, তার ভালবাসার কথা বলছিল, হ্যা তখন আমি জানলাম সে সমপ্রেমী। কি করে সে এত সুন্দর অবলীলায় তার কথা আমার কাছে স্বীকার করল কোন দ্বিধা ছারায়? তাহলে কি সেউ বুঝতে পেরেছিল যে আমার ভিতরেও এই একিই অনুভুতি কাজ করছে আর সেটা তাকে নিয়েই। যখন সে দেখল আমি কাঁদছি তখন সে দু হাত দিয়ে আমায় জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদতে শুরু করে আর নিজের বাধন ভেঙ্গে বলতে থাকে ‘কেন এমন হল? জীবন কেন আমায় এত কষ্ট দিল…কেন? আমি যে মাঝে মাঝে হাড়িয়ে যায়, কেন এমন হয় , আমি যে আর পারিনা’। আমি তখন ওর সাথে যেন মিলিয়ে যাই আর সব কষ্ট ভাগ করে নেবার পণ নিয়ে বলতে থাকি তোমার এই সব কষ্ট তুমি আমায় দিয়ে দাউ , দয়াকরে কেদনা এভাবে, আমি তোমার কান্না সহ্য করতে পারিনা। আর বলতে থাকি আমি তোমায় কখনই আর কষ্ট বইতে দিবনা, না ছুঁতে, সত্যিই না, সব কষ্টকে তোমায় ছোঁয়ার আগে আমার মাঝ দিয়ে যেতে হবে। এভাবে কখন যে অশ্রু নিরবতায় আমাদের দুজনের ঠোঁট একে অপরের ঠোঁটে স্পর্শ করে কেউ ই বুঝতে পারিনি। এরপর দুজন দুজনার কাছে অন্য এক সম্পর্কে আবদ্ধ হয়ে যায়, সে সম্পর্ক কি ছিল তার সঠিক কোন সংজ্ঞা আমাদের কারোরই জানা ছিলনা তখন, আর এই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ, শুধু জানতাম আমাদের একে অন্যের সাথে, কাছে থাকতে আর সময় কাটাতে অনেক ভাল লাগে। দুজন যেন দুজনার কাছে আসলে মুক্ত হই আর দুজন দুজনার কাছে মহা মূল্যবান।

সুযোগ পেলেই আমারা দুজন এভাবে দেখা করতাম। পাগল হয়ে থাকতাম যে আমাদের কখন দেখা হবে। একদিন দেখা না হলে অস্থির হয়ে যেতাম। নিজেকে তখন নীলার কথা বলে বারবার বুঝাতাম যে আমার এসব বন্ধ করা উচিত, কিন্তু ততদিনে যে আমি দীপ্ততে ডুবে নিজের বাঁধন ছেড়ে বের হয়ে গেছি। আমি আর দীপ্ত তখন দুজন দুজনাকে চুম্বকের মত টানতাম। ওর রঙ্গে নিজেকে রাঙ্গাতে আমার খুব ইচ্ছে করত। ওর মত কিছু করতে গেলেই দীপ্ত বলত রিয়াদ তুমি যা তা এমনিতেই অনেক ভাল আর সুন্দর, আমার মত তোমায় হতে হবে না, আমি তোমায় তোমার মতই পছন্দ করি। ওর এমন সব কথা ওঁকে আমার কাছে আরও অনেক আপন করে তুলছিল। কিন্তু এসবের মাঝেই নীলাকে নিয়ে দেখা সব স্বপ্ন চরমভাবে আমায় আষ্টেপৃষ্টে ধরত, নিজের কাছে তখন নিজেকে খুব ছোট মনে হত আর স্বার্থপর,এক পাশে। না পারতাম তখন সব বাঁধন মুক্ত করে নিজেকে মেলে ধরতে আবার না পারতাম বন্দী করে রাখতে। নিজের ভিতর তখন এই সব কিছুর স্তূপ কুড়েকুড়ে জড় করে কষ্ট আর কান্না নামক অনুভুতিকে মেরে রাখতাম। আমি যেন তখন নীলার কাছ থেকে ক্রমেই বহুদূর চলে গেছি। নীলা ঠিকই বুঝত কোন সমস্যা অবশ্যই আছে কিন্তু কি তা হয়ত বুঝেনি নির্দিষ্টকরে, আর দীপ্তকে নিয়ে তো নাই ই, কি জানি হয়ত ও বুঝতেও পারত, আর বুঝতে পেরে চুপ ছিল কিন্তু আমিই বুঝিনি। আমি আর দীপ্ত যখন অনেক ভাল সময় কাটাচ্ছি তখন যে আমি নীলার প্রতি কত নিষ্ঠুর অবিচার করছিলাম তা আমি নিজেও বুঝিনি। দীপ্ত যেভাবে সুয়ানার সাথে সব ঠিক রেখে আমার সাথে থাকত আমি তা পারতাম না। দীপ্তর সবকিছু সুন্দর করে গুছিয়ে, সবাইকে সুন্দর সময় আর যথাযোগ্য সময় আর সম্মান দেবার অসম্ভব ভাল গুন ছিল যা আমার মাঝে ছিল না একদম। নীলার সাথে অবিচারের শোধ তার কিছুদিন পর থেকেই আমি পেতে শুরু করি। দীপ্ত কেমন বদলে যেতে থাকে, সে তখন তার উপর আমার অধিকার, আমার ঘনঘন তার বাসায় যাওয়া, কথা বলা এসবে বিরক্ত হতে থাকে। তখন খুব মেপে মেপে কথা বলতাম, কল দিতাম, আর দেখা করতে চাইতাম। কিন্তু সে তখন আমার সবকিছুতেই বিরক্ত হত। এত ভাবে তার মন রক্ষা করে চলতে চাইতাম কিন্তু পারতাম না। কল দিলেই সে বলত কি কথা, জরুরী কি কিছু না হলে যেন কল না দেই। সে যে কি কষ্ট যে অনুভব না করেছে সে ছাড়া যেন এটা আর কারো বুঝার কথা না। এই কষ্ট আর যন্ত্রনার এক বিন্দু আগুনে যেন সাগরের সব পানিও পুড়ে বাষ্প হয়ে যেত। কিন্তু না পারতাম বলতে আর না পারতাম সইতে, নিজের ভিতর শুধু চেপে এই দহনে কয়লা হতাম আর অশ্রু ঝরাতাম, যা শুধু ঝরেই যেত কিন্ত আমার হৃদয় কে ঠাণ্ডা করতে পারত না বরং আরও তাপদাহ বাড়িয়ে দিত বহুগুন। যখন ই মনে হত দীপ্তকে আমি আর কোনদিন তার কষ্ট থেকে আগলিয়ে রাখতে পারবো না আর একবার হয়ত জড়িয়ে ধরলেউ সে আর আগের মত তাকে আমার মাঝে বিলিয়ে দিবে না তখন যেন আমি দুনিয়ায় থেকেও নরকের শাস্তি ভোগ করতাম। হ্যা, তখন এটা ভেবেই নিজেকে শান্তনা দিতাম এসব আমার প্রাপ্য, যা আমি নীলার প্রতি করেছি আর করছি। ওঁকে ঠকানোর কোন অধিকার ই আমার ছিলনা, কিন্তু কেন যে আমি ঠকালাম তা আমি নিজেউ বুঝতে পারিনি শুধু এটা বুঝেছিলাম দীপ্তকে আমি অনেক ভালবেসে ফেলেছি। একদিন দীপ্ত আমার সাথে দেখা করে সরাসরি জানিয়ে দিল যে এটা আর সামনে তার পক্ষে এগিয়ে নেয়া সম্ভব না, আর সে ভিয়েতনাম চলে যাচ্ছে। আমি তখন খুব যে ধাক্কা খেয়েছি তা নয়, কারন ঠিক ই আন্দাজ করতে পেরেছিলাম এমন ই কিছু হবে তবে এত জলদি হবে তা ভাবিনি। তবে এই কথা শুনার পর আমার সব বাধ ভেঙ্গে য়ায় , চোখে শুধু জল ঝরতে থাকে, তখন আমি কিছুক্ষন কিছু না বলে অল্প সময় সেখানে থেকে চুপ করে উঠে চলে আসতে থাকি, কারন আমার চোখের পানি আর আমার দূর্বলতা আমি দীপ্তকে দেখাতে চাচ্ছিলাম না। দীপ্ত ও চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল আর আমি যখন বের হবার জন্য দরজার কাছাকাছি তখন শুধু সে আমায় একটি কথায় বলে ‘পারলে আমায় মাফ করে দিও’। আমি শুনে নিজের মনে নিজেই মুচকি হেসে আর চোখ মুছে মনে মনে বলতে থাকি ‘তোমায় আর আমি কি মাফ করব যেখানে আমি নিজেই এত বড় অপরাধী, তোমায় মাফ না দীপ্ত ধন্যবাদ দেয়া উচিত যেখানে আমি আমার সঠিক প্রাপ্যতা বুঝে পেয়েছি। তবে দীপ্ত তোমার প্রতি যে আমার অনুভুতি তা ছিল সত্যিই নিষ্পাপ আর পবিত্র আর তাতে আমার বিন্দু মাত্র সন্দেহ নেই। তাই তোমায় কি করে আমি মাফ করব যেখানে আমি তোমায় অপরাধীর কাঠগড়াতেই দাঁড়া করাতে পারিনি’।

আমি তখন আমার কাছে, আমার বিবেকের কাছে আর নীলার কাছে যেন সর্বনিম্ন চূড়ায়। কিছু বলা বা কারো কাছে দাঁড়ানোর ভাষাও নেই। আমি তখন সবচেয়ে জঘন্য আর যেন পরাজিত একজন মানুষ। আমি নীলার কাছে তখন স্বাভাবিক ভাবে নিজেকে উপস্থিত করতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু তা যে ছিল আমার শুধুই আনুষ্ঠীকতা তা আমি নিজেই বুঝতেছিলাম আর তা নীলার বুঝতেও বিন্দুমাত্র ও সময় লাগেনি। আমি আর পারছিলাম না, নিজের কাছ থেকে আর নীলার কাছ থেকে ভাগতে। তবে নীলার অগাধ বিশ্বাস ছিল সব ই ঠিক হয়ে যাবে। এসবের পরেই আমার এমন বিধ্বস্ত অবস্থা বুঝে ও সিলেট থেকে ঢাকা চলে আসে শুধু আমায় দেখার জন্য আর আমার শক্তি হবার জন্য। ওর সাথে ঢাকা দেখা করার পর আমি ওর চোখে চোখ রাখতে পারিনি। এক পর্যায়ে আমি ওঁকে জড়িয়ে গুম্রে কাঁদতে শুরু করি আর বেধে রাখতে না পেরে নিজেকে। আর নীলা বলতে থাকে ‘দয়া করে বন্ধ কর , আমি তোমার কান্না আর কষ্ট একদম সহ্য করতে পারিনা, এসব আমার মাঝে শূল হয়ে বিধে। আমি পারছিনা তোমায় এভাবে দেখতে, দয়াকরে বন্ধ কর, আমি শুধু তোমার হাসিমুখ দেখতে চায়, কান্নার না’। ওর কথা যেন আমাকে আমার নিজের কাছে আরও অপমানিত আর ছোট করছিল। আমি শুধু তখন ওঁকে এই কথা বলি আমি এখন তোমায় কিছু বলবনা, সব বলব সিলেট গিয়ে।

পরদিন আমরা একসাথে সিলেট যাই আর তার পরদিন নীলাকে বিকেল বেলা দেখা করতে বলি। ও সব আবার নতুন করে শুরু করবে বলে আবার জীবনে নতুন অধ্যায় শুরু হবে এই প্রত্যাসায় ছিল ঠিক আমারও তাই। ও সবকিছু তাই অনেক হাসিখুশি রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি আর সব ভিতরে রাখতে না পেরে ওঁকে বলে ফেলি। সব শুনার পর নীলা কিছু না বলে অভিমান আর সব ভালবাসা নিয়ে যে এভাবে চলে যাবে তা কখনও ভাবিনি। আমিও ভেবেছি, অনেক ভেবেছি, এভাবে আমি আর বাঁচতে পারবনা,আমিউ চলে যাব নীলার কাছে ওর অভিমান ভাঙ্গাতে। কিন্তু পরক্ষনেই ভেবেছি না, আমি নীলার ভালবাসা আর আমি তার ঐ ভালবাসাকে সম্মান করে বেঁচে থাকব সবসময়। তাতেই হয়ত নীলার ভালবাসা বেঁচে থাকবে আর নীলাকে হারানোর ব্যাথা হবে আমার শাস্তি, যা আমার জন্য অতি আবশ্যক।

প্রায় ৬ মাস পর, তখন আমি বাসায় কোন একটা কাজ করছিলাম তখন কলিংবেল বেজে উঠে। দরজা খুলে দেখি দীপ্ত। ওঁকে দেখে কেমন মিশ্র অনুভুতি হচ্ছিল, খুব ভাল লাগার পাশাপাশি খুব বিষাদ লাগছিল, এ যেন ভাললাগার কোন বিষাধ অনুভুতি। কিন্তু তার প্রতি আমার যে ভালবাসা ছিল তা যে ছিটেফোঁটাও অবশিষ্ট ছিল না তা আমি নিশ্চিত ছিলাম। অনেকটা অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করলাম…

-একি দীপ্ত তুমি!? এখানে? ঢাকায় কবে আসছ?

-এইত গতকালি ল্যান্ড করেছি। এরপর তোমার সাথে দেখা করতে এলাম।

-হ্যা আস ভিতরে আস।

-হুম এইত, তা তুমি কেমন আছ রিয়াদ?

-এইত আছি যেমন থাকার কথা আর কি, তা তুমি কেমন আছ? একটু স্বাস্থ্য ভাল হয়েছে মনে হই, তা সুয়ানা কেমন আছে?

-হুম সুয়ানা ভাল আছে, আমিও আছি আর কি।

-কেন? আছি আর কি কেন?

-দাড়া করিয়েই রাখবে, নাকি বসতেও বলবে? বলেই মুচকি হাসল দীপ্ত।

-ও হ্যা! সরি! সরি! বস বস, তা বল কি খাবে চা নাকি কফি?

-না আমি কিছু খাব না, তুমি বস সামনে কথা বলি।

-দাড়াও আমি আগে কিছু নিয়ে আসি। এরপর দুই কাপ কফি নিয়ে এসে টি-টেবিলে রাখতে রাখতে বললাম…

-তারপর বল, কি অবস্থা তোমার?

-এইত ভালই’ বলে দীপ্ত কেমন চুপ হয়ে গেল তারপর বলতে শুরু করল.. আমি নীলার কথা তখন দেশে থাকতেই শুনেছিলাম কিন্তু কোন মুখ নিয়ে দাঁড়াতাম তোমার সামনে রিয়াদ আমি বুঝতে পারিনি, সেই সাহস আমার ছিল না। জানো আমি তোমায় তখন যতটা ভালবাসতাম এখনও বাসি। আমি ঐ দিনের পর একটি দিনও শান্তি পাইনি।

-প্লীজ বাদ দাও এসব কথা, এসব বলে এখন আর কি লাভ? আমি শুনতে চাই না।

-প্লীজ রিয়াদ! আমায় বলতে দাও, আমি যে একদম শান্তি পাইনা। তপ্ত তুষের আগুনে যে সব সময় ই জ্বলে পুড়ে অঙ্গার হচ্ছি। আমি তোমার সাথে অনেক অন্যায় করেছি, তুমি হয়ত ভেবেছ আমি কিছু সময়ের জন্য শুধু তোমায় ব্যবহার করেছি।

-না দীপ্ত! আমি এমন কিছুই মনে করিনি।

-আমি জানিনা রিয়াদ শুধু এটা জানি যাকে অসম্ভব ভালবাসি আর বেসেছি সে শুধুই আমায় ঘৃণা করে। আর এতে যে কি অসহ্য যন্ত্রনা তা তুমি বুঝবে না। তুমি আমার কারনে এত কষ্ট পেয়েছ এমনকি নীলাকেউ হাড়িয়েছ, আর আমি তোমায় ভালবাসা সত্যেও এত কষ্ট দিয়েছি আর ইচ্ছে থাকা স্বত্বেও জড়িয়ে ধরতে পারিনি, কাছে আসতে পারিনি। আসতাম ই বা কোন সাহসে।

দীপ্ত যখন কথাগুলো বলছিল তখন ওর চোখে তাকিয়ে দেখি ওর চোখ লাল হয়ে গিয়েছিল যেন রক্ত বের হবে অশ্রুর বদলে।

-দীপ্ত তুমি যদি আমায় এতই ভালবাসতে আর কষ্ট দিয়ে এতই কষ্ট পেয়েছ তাহলে কেন আমায় ঐ সময় এমন দূরদূর করে তাড়িয়ে দিয়েছিলে? যাক অবশ্য ভালই হয়েছিল, আমি তার জন্য কোনদিন ই তোমায় দোষ দেইনি। সবসময় ই নিজেকে দোষেছি। কারন অন্যকে দোষ দিয়ে প্রকৃত শান্তি না পাওয়া গেলেও নিজেকে দিয়ে যায়। আর তোমাকে এর জন্য ধন্যবাদ যে তোমার জন্য আমি আমার সঠিক প্রাপ্যতা বোঝে পেয়েছি। এটাই শান্তনা, শাস্তি পাবার যোগ্যতা আর সুযোগ তো আর সবার হয় না, সেই দিক থেকে আমি না হয় একটু ভাগ্যবান ই হলাম।

-আসলেই তুমি ভাগ্যবান রিয়াদ! আর হ্যা কি কারন ছিল সেটা না হই নাই জানলে।

-কেন? এত কিছু বলেছ আর যেহেতু কথা বলতেই এসেছ তাহলে ঐ কারণও বল শুনি।

-জানো রিয়াদ! ভালবাসা যতটুকু না সুখ দেই তারও বেশি অনেক বেশি দেই কষ্ট। আমি তোমায় তখনও ভালবাসতাম। কিন্তু তোমার প্রতি নীলার যে ভালবাসা ছিল আর তুমি সব ভুলে ক্রমেই আমার প্রতি ডুবে যাচ্ছিলে তা আমার ঠিক ই বোধদ্বয় হয়েছিল। আমি নীলার সাথে যখন ই কথা বলতাম তখন ই তোমার প্রতি নীলার ভালবাসা দেখে মুগ্ধ হতাম। নীলাও যে আমার সাথে তোমার ব্যাপারে অনেক কিছু আঁচ করতে পেরেছিল আমি সেটাও বুঝতাম। নীলা অনেক বুদ্ধিমতী একটি মেয়ে ছিল। ও খুব সাধারণভাবে ওর দুঃখ এমনভাবে লোকাত যে কারো চোখেই পরত না। আমার মাঝেমাঝেই মনে হত আমি তোমাকে নীলার কাছ থেকে কেড়ে নিচ্ছি। নিজেকে খুব ছোট লাগত তখন। অনুভব করতাম নিজের সেই অসহায় অবস্থা নীলার মাঝে, যা আমি আগে অনুভব করেছিলাম। আমি চাইনি নীলা আমার জন্য আর তা অনুভব করুক। তাই একদিন সিদ্ধান্ত নিলাম তোমার কাছ থেকে দূরে সড়ে যাব। আর তার জন্য না হই হলাম ই ঘৃণার পাত্র। কিন্তু এই অনুভুতি যে এত কষ্টের হবে তা ভাবতে আর কল্পনাও করতে পারিনি।

বলতে বলতে দীপ্ত তার চোখ মুছে আবার বলতে থাকে… কিন্তু ওর কন্ঠ কেমন ধরে আসছিল কথা বলার সময়…

-মানুষ জীবনে শুধু এটাই চাই যে তাকে সবাই ভাল হিসেবে মনে রাখুক খারাপ ভাবে নয়, আর পারলে ভালবেসে মনে রাখুক। কেউ খারাপ ভাবে এটা ভাবলেই যেন নিজের উপর আর নিজের জীবনের উপর কেমন ধীক্কার চলে আসে, আর তা যদি হই কোন ভালবাসার মানুষের কাছ থেকে তাহলে আর তো কোন কথাই নেই।

দীপ্তর কথা শুনে আমার চোখে তখন একবিন্দুও জল নেই, কিন্তু অন্তর হাহাকার করছিল । এমন সময় একবিন্দু জল আমাকে ফাঁকি দিয়ে চোখ দিয়ে অবাধ্য হয়ে ঝরে পরে। খুব জলদি চোখ সরিয়ে জল মোছার চেষ্টা করি যাতে দীপ্তর চোখে না পরে, কিন্তু বুঝলাম দীপ্তর চোখ এড়াইনি। তখন জড়তা কণ্ঠেই জিজ্ঞেস করলাম দীপ্তকে…

-এত কিছুই যেহেতু ভেবেছ পরে তাহলে জড়ানোর আগে আমার সাথে কেন ভাবলে না?

-আমি আগে ভাবিনি কিছু রিয়াদ! আমি তখন তোমার মাঝে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়েছিলাম, কি করে, কিভাবে, কি হয়েছে আমি কিছুই বুঝতে পারিনি। যা তোমার মাঝেও কাজ করেছিল। হয়ত এভাবে থাকায় ভাল ছিল, অন্তত এত কষ্ট সহ্য করতে হত না আর হাড়াতে হত না এত কিছু।

-হুম! বাদ দাও, যা হবার হয়েছে, এসব ভেবে আর কি? আর যাই হক সুয়ানাকে কষ্ট দিও না।

-হুম, আমি জানি! শুধু তুমি আমায় ঘৃণা করোনা দয়া করে। এ যে আমার কাছে কি বিভীষিকাময় তা শুধু আমি জানি।

-দীপ্ত আমি তোমায় কখনও ঘৃণা করিনি এটাই সত্য, তবে অনেক কষ্ট পেয়েছি এটাও তেমন ই সত্য। তবে তা আমার পাওনা ছিল।

-রিয়াদ আমি তোমায় এখনও অনেক ভালবাসি ঠিক আগে যেমন বাসতাম, আমি জানি এই শব্দ আমাদের ক্ষেত্রে আর খাটে না আর আমাদের মিলও সম্ভব নয়। এখন শুধু এটাই চাই তুমি ভাল থাক, এতেই আমার শান্তি।

নকল হাসিতে নিজেকে আবৃত করে বললাম…

-হ্যা আমি ভালই আছি, হ্যা আর ভালবাসা এই শব্দটা আমাদের জন্য না হয়ত।

-হুম আমিও জানি, ঐ শব্দ না আসুক কিন্তু আমরা বন্ধু তো হতে পারি , নাকি আমার সেই অধিকারও নেই?

-হ্যা হতে পারি, আমার আপত্তি নেই, অনেক ভেঙ্গে নিজেকে গড়েছি তো তাই আর তেমন ভয় ও নেইভাঙ্গার।

-হুম!

এরপর আমার সাথে দীপ্তর মাঝে মাঝে কথা হত আর হইও, ও ওর জীবনের নিয়মে চলছিল আর আমি আমার, কিন্তু আমাদের মাঝে যে অজানা বিস্তর তফাৎ ছিল তা বুঝি আর ভাঙ্গার নয়, আর আমাদের এক হউয়াও নয়। হয়ত বন্ধু নামক সম্পর্কের আনুষ্ঠিকতায় রেললাইনের মত সমন্তরাল ভাবে বয়ে চলা কিন্তু মিলিত না হউয়া কখনও এটাই নিয়তি। এ ব্যবধান কিছু না পাবার, এ ব্যবধান হৃদয় পুড়ানো কিছু মঙ্গলযাত্রার।

১০

এসব না পাবার ব্যাথা আর কষ্ট নামক অনুভুতি অশ্রু হয়ে হাতে ঝড়ে পরতেই কল্পনা থেকে বাস্তবে ফিরে এলাম। এত ক্ষণে যেন সমস্ত জীবন দেখে এলাম আমার একটুক্ষণে। কিন্তু তা যে কি অনুভুতির, সেটা আছে শুধু আমার উপলব্ধিতায়। বাইরে রোদ উঠে গেছে…আর আমার কফিও ঠাণ্ডা। খেয়াল করলাম ঘরে তখনও গান বাজছে, তবে এখন বাপ্পা মজুমদারের কন্ঠে রবীন্দ্রসংগীত…

মনে কি দ্বিধা রেখে গেলে চলে… সেদিন, ভরা সাঁঝে, যেতে যেতে দূয়ার হতে, কি ভেবে ফিরালে মুখখানি…?

কি কথা ছিল যে মনে.., মনে……? মনে, কি দ্বিধা রেখে গেলে চলে…

বিধাতা যেন আমার মন জেনেই আমার জীবন উপলক্ষ্যেই বাজিয়েছে এই গান এখন। এখন আমার কাছে জীবনের অর্থ যেন ভাল রাখা আর ভাল থাকা। একটি ছাড়া আরেকটি সম্ভব নয়। একটি কেন্দ্র হলে আরেকটি পরিধি। যা একে অন্যকে নিয়ে তৈরি করে বৃত্ত, এদের মিলন ছাড়া যেন বৃত্তের পূর্ণতা নেই তেমন ই জীবনের ও। জীবন কখনও আমার হিসাবে চলেনি, তার হিসাবে আমাকে চালিয়েছে। আগে যা হবে সেটাই হবে আমার অজানা জীবন, ঠিক অতীতের মতই,হে জীবন তোমায় স্বাগতম… আমি তোমার ই অপেক্ষায়! সাথে কিছু না পাওয়া আর অসীম আচ্ছাদনের দীবাশ্বাস!

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.