স্যালভিয়া

লেখকঃ জারিফ দিলশান

প্রচণ্ড জ্যামে বনানী তে বসে আছি।এত ফ্লাইওভার বানালো হলো তাও জ্যাম কমে না।গাড়ির গ্লাসটা নামিয়ে দিলাম।গাড়ির ভেতরের এসিতে কেমন দম বন্ধ লাগছিল।আষাঢ়ের মেট্রোপলিটনীয় উষ্ণতা ঝাঁ করে এসে ঝাঁপিয়ে পরল।টাইয়ের নট টা একটু ঢিলা করে দিয়ে রিলাক্স হয়ে বসলাম।জরুরি মিটিং ছিলো সকালে।শেষ হল একটু আগে।আর কোনো কাজ না থাকায় শহুরে ব্যস্ততা দেখতে গাড়ি নিয়ে বের হওয়া।বিকেলের সুখ মাখা সৌন্দর্য,কিংবা বর্ষার শ্যাওলাপরা শহরের মুগ্ধতায় অনেক ঘুরেছি।কিন্তু এমন ভরদুপুরে কাচামরিচের মত ঝালালাগানো গরমে বের হইনি এর আগে।চারপাশের ব্যস্ততা উপভোগ করছিলাম।মায়েরা স্কুল ফেরত বাচ্চাদের নিয়ে ছুটছে বাসার উদ্দেশ্যে।ক্লান্ত বাচ্চাগুলোর বাসায় ফেরার সীমাহীন আনন্দ।কিছু ভিখারি টাকা চেয়ে বেড়াচ্ছে।একগ্রুপ পিচ্চি প্রাভেট কারগুলার গ্লাস মুছে টাকা নিচ্ছে।এক পিচ্চি কই থেকে এক গাদা কাঠ গোলাপ এনে বিক্রি করছে।ভালোয় বিকোচ্ছে মনে হয়।ওর চোখে মুখে খুশির ঝলক তাই বলছে।

হঠাৎ ই ওদের দেখলাম।মুখে সস্তা পাউডার মাখানো।কড়া লাল লিপস্টিক।পলিস্টার ধরনের ঝকমারি কাপড় পরা।অজানা খুশিতে একজন আরেকজনের গায়ে ঢলে পরছে।এর ওর কাছ থেকে চাদা তুলছে।কেউ দিচ্ছে।কেউ দিচ্ছে না।ওরা কাউকে ভয় দেখাচ্ছে।কারো সাথে দুষ্টুমি করছে।আমি উপভোগ করছিলাম একরাশ ভালোলাগা নিয়ে।ক্ষণিকের জন্য মনে হল একজন কে চিনি।কতকাল আগে যেন হারিয়ে ফেলেছি।অবশ্য তা ক্ষণিকের জন্যই।যাই হোক ছুটছি ঢাকার বাইরে।গাজীপুরের কাপাসিয়া।ফিরছি প্রিয় কারো কাছে।প্রিয় স্যালভিয়ার কাছে।ভাবতেই আনন্দ লাগছে।বেশ কিছু দিন পর আবার গল্প করতে পারব।

কবরস্থানের কথা শুনলে আগে ভয় লাগত।যখন ছোটো ছিলাম তখন।এখন আর লাগে না।আমাদের পারিবারিক কবরস্থান।আমি বেশ গুছিয়ে দিয়েছি।চারপাশে কিছু কাঠের গাছ।মাঝে মৃতদের কবর।এই অংশে প্রচুর হাস্নাহেনা,রঙন,মুসান্ডার ঝোপ।আলাদা করে সবার কবরে মার্কিং করা।অন্যপাশে কাঠের লগকেবিন।অনেকটা ওয়েস্টার্ন ধাচের।দোতলা।পুরো এরিয়া দুবিঘা সম জায়গা হবে।এর সাথে আমাদের পুরোনো বাড়ি।কেয়ারটেকার দেখাশুনা করে।দেশে বলতে গেলে মা আর আমি থাকি।আমার ছোট বোন তার জামাই নিয়ে অস্ট্রেলিয়া, আর ভাইটা জার্মানি বউ সহ।আমি আইবুড়ো, বিধবা মায়ের সাথে বাবার রেখে যাওয়া ছোট বিজনেস টা দেখি।বাবার ভাই ছোট চাচা আমেরিকা ফ্যামিলি সহ।আমার ও নাগরিকত্ব আছে।কিন্তু ভালো লাগে না।মাঝে মাঝে তাও যেতে হয়।অফিশিয়াল কাজে।নিজেকে টিকে রাখতে।

এখন রাত দশটা।কিশোরী রাত।একটু আগে সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়েছে। চারপাশ চুপচাপ নিঃশব্দ।একটানা ঝিঝির ডাক আর মাঝে মাঝে দাদুপেচার হুম শব্দ ছাড়া।আমার অদূরেই স্যালভিয়া শুয়ে আছে।নানারঙের মালতীফুলের সাথে।মাথার উপরে আষাঢে পূরনিমা।আজ বেশ অবাক হলাম।আমাদের বাগানে বাঁশঝাড় নেই কোনো।খেয়াল ই করি নি কখোনো।মাঝেমাঝে শিরশিরে বাতাস।আমি কফি মগে চুমুক দিচ্ছি আর স্যালভিয়া কে দেখছি।মাঝে মাঝেই দেখি।খুব শান্তি পাই দেখে।ও অবশ্য আমাকে দেখে না।অভিমান। বড্ড অভিমান ওর।বরাবর ই অভিমানী ছিল।এই অভিমান ই ওর দেখার ক্ষমতাটুকু কেড়ে নিলো।হাস্নাহেনারা ফুটছে।রাতের রানী কিনা ওরা।তবে স্যালভিয়ার সুবাস যেকোনো ফুলের থেকে তীব্র।আজ আসার পর থেকে একবারো ওর সাথে কথা হয় নি।ও তো অভিমানী তাই বলে না।আমিও আজ অভিমান করেছি।তাই আমিও কথা বলছি না

আমি তখন এ লেভেলের ছাত্র।তখন ই নিষিদ্ধ এক অনুভূতির সাথে পরিচিত হয়।হাড়েহাড়ে বুঝি অনুভূতি কি।আমাকে অষ্টপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে অনুভূতি গুলো।স্যালভিয়া আমাদের স্কুলে এসে এডমিট হয়। ‘ও’লেভেল কমপ্লিট করে অন্য কোথাও থেকে।একহারা গড়নের ছিলো।কিছুটা ছেলেদের মত।ছোট ছোট স্তন,পুরুষালী ভয়েস অনেকটা।ঠিক মেয়েলী টাইপের ছেলেদের মত।কিন্তু ও ধনী কোনো পরিবারের ছিলো না।রিকশা তে যাতায়াত করত।কখনো হেটে হেটে।বাজারের সস্তা ধরনের হাতে বানানো সালোয়ার কামিজ পরত।বেশিরভাগ স্টুডেন্ট ওকে করুণার চোখে দেখত।দেখতে কিছুটা অদ্ভুত।নজরকাড়া চোখ।অন্যদিকে ওর কোনো আইফোন ছিলো না।ভালো ড্রেস।ব্যাগপ্যাক চেঞ্জ করত না।ও কোনো পার্টি এটেন্ড করত না।কোনোদিন পার্টিও দিত না।অদ্ভুত এক দূরত্ব সবার থেকে।সব কিছু থেকে।কখনো কেন্টিনে দেখা যেত না।লাইব্রেরি তে কাটাত।কিন্তু মিসরা খুব পছন্দ করত।আমার অবশ্য এসব নিয়ে কোনো মাথাব্যথা ছিল না।আমি ভলিবল,মুভি,ট্যুর,পোরফান্ড আর কোনো রকম পাশ করা নিয়েই ব্যস্ত থাকতাম।ক্লাশের কারো দিকে তাকাতাম ই না।ভলি খেলত এমন দুজন আমার ক্লাশের ছিলো।তাদের দু একজনের সাথে যা একটু সখ্যতা ছিল।আর মেয়েদের ন্যাকামো তো সহ্যই হত না।

আমরা পোরফান্ড থেকে বিভিন্ন মিশনারি,অরফানেজ ঘুরে ঘুরে স্টুডেন্ট দের সাহায্য করতাম।আমরাই সিলেক্ট করতাম।স্যালভিয়ার সাথে পরিচয় তার অরফানেজে।এক সিস্টারের কাছে সে থাকত।সে তার বাবা মা কাউকেই চেনে না।তেমন কোনো ইনফো নেই তাদের ব্যাপারে।জন্মের পর ওর মা বাবা ওকে গুলশানের এক চার্চ এ ফেলে রেখে যান।সেখানে প্রাথর্না করতে গিয়ে সিস্টার হেনলি ওকে নিয়ে আসেন।অনেক বাচ্চারাই এভাবে অরফানেজগুলোতে আসে।কিন্তু প্রচণ্ড মেধাবী হওয়াতেই সে ভালো প্রতিষ্ঠান গুলোতে পড়াশোনা করতে পারছে।আর আমাদের স্কুলেও এভাবে আসা তার।আমি খেয়াল না করলেও সে আমাকে করত।সেদিন অরফানেজের বারান্দায় বসে বসে অনেক কথা হয় আমাদের।পড়ন্ত বিকেলের ধুলোপড়া আলো আদরে মাখাচ্ছিল আমাদের।আমি এই প্রথম কোনো মানুষের প্রতি আমার অনুভূতির জন্মদেখলাম।ওর মিষ্টি হাসি,পুরুষালী আর মেয়েলী হাস্কি ভয়েসের মিশেল,মুখের এক পার্শ্বের রুক্ষতা সে রাতে আমাকে ঘুমুতে দেয় নি।আমি শুধু ওকেই ভেবেছি। কি অদ্ভুত একটা ব্যাপার যে আমি মেয়েদের প্রতি জিরো আর পুরুষদের প্রতি কিছুটা অদ্ভুত টান অনুভব করি।সে আমি আজ ওর মত একজন মানুষের প্রতি উথালপাতাল মাদকতায় মত্ত।কেমন নেশাঘোরে আচ্ছন্ন।আমি কি ওর অতীতের জন্য এত অনুভব করছি।কিন্তু ওর থেকেও ট্রাজিক কাহিনী আমি জানি।কই তাদের তো এভাবে ভাবি না।

এরপর নিয়মিত ওর সাথে সময় দিতে লাগি।স্কুল।বাইরে।কিন্তু ও সব সময় একটা এড়ানো ভাব বজায় রাখত।আমি ওর প্রেমে পরে যাই।সেটা বলিও।কিন্তু ও হ্যা না কিছুই বলে নি।অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে তাকাত।যার মিনিং আমি ধরতে পারতাম না।এভাবেই চলছিল।কিন্তু ঝামেলা পাকে জেনিফার কে নিয়ে।মেয়েটা আমাকে পছন্দ করত।আর আমি ওকে পাত্তা দিতাম না।ও আমার আর স্যালভিয়ার বিষয় জানার পর ওর পেছনে লাগে।স্কুলে টিজ থেকে নানাভাবে হেনস্তা করতে থাকে।এটলাস্ট সে স্যালভিয়ার অতীত টেনে বের করে এবং এক নোংরা খেলাতে মত্ত হয়।আমি অনেকবার জেনিফার কে বুঝাতে চেয়েছি।কিন্তু সে নাছোড়বান্দা। হয় আমার জেনিফার কে ভালবাসতে হবে না হলে সে স্যালভিয়ার পিছ ছাড়বে না।

সেদিন ছিল আমাদের জীবনের সবচেয়ে বাজেদিন।জেনিফার আর তার গ্রুপের মধ্যে ছিল উত্তেজনার বুদবুদ।আমরা লাইব্রেরি থেকে বের হতেই ওদের আক্রমণের শিকার হই।জেনিফার খুব শান্তভাবে কথাগুলো বলেছিল।আমি হতবাক হয়ে তাকিয়েছিলাম ওর দিকে।প্রচণ্ড রাগ হচ্ছিল ওর প্রতি কেনো সে আমাকে আগে বলে নি।আমার ভেতরে এক অভিমান জমছিল।আমি ওর দিকে তাকালাম। ওর কোনো অনুভূতির প্রকাশ দেখলাম না।এ যেনো পাথুরে মানব।

আমি জেনিফারের দিকে তাকালাম আর ধমক দিয়ে বললাম সামনে থেকে চলে যাও।ওর দিকে তাকালাম বললাম কেনো আগে বলে নি।ও শুধু বলল আমাকে ঘৃণা করবা তো করো।আমি বললাম ঘৃণা করার কি আছে।যাই হোক আজ পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালাম।আমার কাছে সব ক্লিয়ার হয়ে গেল।সেদিন ওকে অরফানজে নামিয়ে দিলাম।আবার বললাম ভালবাসি।ও শুধু চোখ দুটো নামিয়ে নিল।

এরপরে আমি আমাকে বুঝতে পারলাম। আমার অনুভূতিগুলো বুঝতে পারলাম। স্বপ্নগুলো সাজিয়ে নিলাম।মনে মনে ঠিক করলাম কি বলব ওকে।কিন্তু পরদিন ওকে পেলাম না।স্কুলে আসল না।অরফানজে ছুটলাম। না সেখানে নেই।আগের রাতেই নাকি সে চলে গেছে।কোথায় গেছে কেউ জানে না।সিস্টার হেনলীও ছিলেন না।কি আর করা ভাঙা মনে ফিরে আসলাম।এরপরে অনেক খুঁজেছি।পাই নি।শুধু ছোট টা একটা চিঠি পাই অচেনা ঠিকানা থেকে।

“ভালোবাসি তোমায়।বাসব মৃত্যুর পর পর্যন্ত।কিন্তু যে গল্পে শুধু কষ্ট,প্রশ্ন,অসম্মান,সমাজের মেনে না নেয়া সে গল্পের সমাপ্তি টেনে দিলাম।জেনিফার কে নিয়ে সুখি হও।আমি আমার জগতে ফিরে যাচ্ছি।যেখানে এত দিন থাকার কথা ছিল।আমাকে প্লিজ আর খুজো না।” ইতি স্যালি….
.
দেড়বছর পর আমি খুজে পাই তাকে।অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে।কিন্তু সে তার সমস্ত জৌলুস হারিয়ে ফেলেছিল।অন্ধকারে পাই তাকে।খুব নাম ডাক তার।ভালো নাচিয়ে হিসেবে।আসর জমাতে তার জুড়ি নেই।ইনকাম ভালো। সবচেয়ে চাহিদাময়ী সে।খোজ পেয়েছিলাম ডেভিডের মাধ্যমে।ডেভিড আমাদের বিজনেস পার্টনার। আমি এ লেভেল কমপ্লিট করে বাবার বিজনেসে বসি।তখন ই ডেভিড এর সাথে পরিচয়।যদিও সে ছিল সিনিয়র।ডেভিড ছিল উভকামী।অন্ধকার জগতে তার আনাগোনা বেশ।ও ইনসিস্ট করত আমাকে এ ব্যাপারে।ওর মোবাইল এ স্যালভিয়ার পিক্স দেখি আমি।ডেভিড কে সব খুলে বলি।ও অবাক হয়ে যায় সব শুনে।ও আমাকে একদিন নিয়ে যায় স্যালভিয়ার আসরে।আমি স্যালভিয়াকে দেখি।এ যেনো পূনজন্ম আমার।আমি যেন এতদিন বেচে ছিলাম ওর জন্য।আমি ওর পায়ে পরি ফিরে আসার জন্য।আমি ওর মালিকের সাথে কথা বলি।আমি ওর জন্য সব করতে রাজি ছিলাম।পারলে তখন ই নিয়ে আসি।

পরদিন যেতে বলে ও।পরদিন যাই আমি।নিয়ে আসি ওকে।আমার ভালবাসা কে।একেবারে আমার করে।সারাজীবন এর মত।কেউ বাধা দেয় নি।ও নিজেও না।দু জন আলতো করে ধরে ওকে আমার গাড়িতে শুয়ে দেয়।আমি নিয়ে আসি ওকে।
নেমে গেলাম সিলভিয়ার কাছে।শুয়ে আছে সে।কখনো তাকে সঙ দেয় বেলী, কখনো বা মালতীলতা, মাথার উপরে ঝুলে থাকে মাধবীলতা, অপরাজিতারা।সে নিশ্চুপ ঘুমিয়ে।আমি শুধু তার শ্বাসের শব্দ পাই।মাঝে মাঝে তার পাশে নরম ঘাসে শুয়ে থাকি আমি।সে ঘুমিয়ে পৃথিবীর প্রতি একবুক অভিযোগ নিয়ে।তার জন্মের জন্য সে দায়ী নয়।কিন্তু পৃথিবী তাতে বিন্দু মাত্র ছাড় দেয় নি।আমি মেনে নিয়েছি তাকে।আমি আজো পুরুষের প্রতি টান অনুভব করি।মাঝে মাঝে প্রয়োজনের তাগিদে পুরুষ শরীরে ডুব সাতার দেই।কিন্তু আমার সবকিছু তৃতীয়লিঙগ স্যালভিয়ার জন্য।আমি ভালবাসি তাকে।যখন সময় পাই ছুটে আসি ওর কাছে।নিভৃতে নিজেকে খুজে ফিরি তার মাঝে।জড়িয়ে আছি এক সম্পর্কহীন সম্পর্কে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.