কিছু একটা ছিল

লেখকঃ আবির মাহমুদ

২০০৬ সালের কথা। প্রথমবার exam দিয়েই chance পেলাম applied physics এ। বাসার সবাই তবুও কেমন যেন unsatisfied ছিল, সবার expectation ছিল যে আমি মেডিকেলে পড়ব। anyway অনেক কান্না-কাটির পর্ব শেষ করে টই-টোপলা নিয়ে ঢাকায় এলাম।excitement তখন তুঙ্গে ছিল। লাফ দিয়ে উঠে পড়লাম হলে। allotment ছিল মীর মোশারফ হোসেন হলে। অনেক শুনেছিলাম এই হলের কথা তাই এখানে finally থাকার সুযোগ পেয়ে নিজেকে knight knight মনে হচ্ছিলো যাকেgrandcastle এ থাকার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। প্রজাপতি shape এর প্রকাণ্ড দালানের সামনে দেখলাম অনেক গুলো confused face যারা একে একে একটা list এ sign করে সামনে এগুচ্ছিল। আমিও পিপড়ার সারিতে যোগ দিলাম। ১৫ কি তার একটু বেশি সময় যাওয়ার পর খুবই ছোট একটা দাগ এর মাঝে নিজের নাম কোনভাবেলিখলাম।

অরিন। নাম লিখেই আমার আগে যাওয়া পিঁপড়াদের পিছু নিলাম। তারা অগোছালোভাবে একটা বড় রুমের ভিতর ঢুকছিল। রুমের দরজা দূর থেকে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল রুমটা অনেক বড়। কিন্তু রুমের ভিতরে মানুষের গিজগিজ দেখার পর কেমন যেন রুমটাকে আর আগের মত বড় মনে হচ্ছিল নাহ। রুমের ভিতর ঢোকার কিছুক্ষনের মধ্যেই ঘেমে উঠলাম। বেশ কয়েকটা ফ্যান ছিল ঠিকই কিন্তু ভিতরে মানুষের গরমটা একটু বেশিই ছিল। কি করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম নাহ। সব কেমন যেন অগোছালো লাগছিল। ছোট্ট একটা রুমের ভিতর বিরাট লম্বা তোশকের সারি। ওগুলো থেকে ভিজে পচে যাওয়া পুরানো বইয়ের ঘ্রাণ বের হচ্ছিল। নতুন আস্তানা গাড়ার মত কোন জায়গাই আর অবশিষ্ট ছিল না। উপায় না দেখে সামনের ছেলেটার কাছে এগিয়ে গেলাম যে তার তোশকে ধবধবে সাদা চাদর পাতছিল। আমি খুব খেয়াল করেই দেখছিলাম ওকে। অনেক বেশি cycle চালালে শরীর যেমনটা হয় ঠিক তেমন একটা শরীর। উদ্দাল পেশী নেই তবে একটা manny-king এর structure আছে। চুল গুলো এলোমেলো ছিল, হয়ত ঘুমাচ্ছিল।

– এত্ত ময়লার ভিতর তোমার সাদা চাদর টিকবে তো? (কথা শুরু করার মত আর কিছু খুজে পাচ্ছিলাম না)
– কি?! ওঁ! কি আর করার, আমার ২টা চাদরই সাদা। বুঝিনি এখানের অবস্থা এমন হবে।
– ব্যাপার নাহ। এ অবস্থা বেশিদিন থাকবে নাহ। ২ মাসের ভিতরই seat পেয়ে যাবো সবাই।
– আমিও তাই জানতাম but আসার পর এক senior friendএর কাছে শুনলাম ১ বছরের আগে কেওই seat পাবে নাহ।
– Holly shit! ততদিনে তোহ তোমার চাদর museum এ জায়াগা পাবে।
কথাটার ভিতর কি ছিল জানি না কিন্তু কথাটা শুনে ছেলেটা একটা প্রাণখোলা হাসি দিল। কেমন যেন মনে হচ্ছিল সে অনেক দিন পর হাসছে।
– পেলে তোহ ভালই। আমার নামটা বহন করার মত কেও না কেও থেকে যাবে।নিজেকে আর শিশির মনে হবে নাহ। (আমি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম কিন্তু তার আগেই আমায় জিজ্ঞাসা করল) কোন জায়গা পেয়েছ?
– ওর question টা শুনে মনে মনে খুশিই হয়েছিলাম। আমায় আর নিজ থেকে problem এর কথা বলতে হল নাহ।…… না, সবই blocked হয়ে গিয়েছে। খুব বেশি দেরি করে ফেলেছি maybe. কি করবো বুঝতে পারছি না।
– Seat না পাবারই কথা। অনেকেই কাল রাতে উঠেছে। ভাইয়ারা কাল instruction দিয়ে গিয়েছে। যারা যারা জায়গা পাবে না তাদের অন্যদের সাথে bed শেয়ার করতে বলেছেন।

কথাটা শোনার সাথে সাথে চিন্তা মাথা থেকে চলে গেল এবং তার সাথে জায়গাবদল করল দ্বিধা। এখানে কাওকেই চিনি না, কার কাছে গিয়ে bed শেয়ার করার আবদার করি!
– তুমি চাইলে আমার সাথে bed শেয়ার করতে পার। কিন্তু বালিশ আমারটা use করতে পারবে নাহ।
– চলবে। (এই বলেই আমার ব্যাগটা নামিয়ে ওর বিছানার শেষ প্রান্তে রাখলাম আর আমি ঠিক ওর পাশে বসে পরলাম) আমি অরিন, applied physics, খুলনা। তু ……
– আমিও applied physics এ। তোমার সাথে আগেও কথা হয়েছিল ভর্তির সময়। maybe ভুলে গিয়েছ।
ওর এমন অভিযোগে খুবই লজ্জা লাগল আমার কিন্তু এটা মিথ্যা না। আমি মানুষের চেহারা ভুলে যাই।
– তোমার নাম কি শিশির?? (সম্পূর্ণ আন্দাজের উপর ঢিল ছুড়লাম)
– তোমার মনে আছে?!
– নাহ। আন্দাজে বললাম লেগে গেল।
– I see. হিমু ইন ব্লু শার্ট।
– মোটেই নাহ। I hate হিমু।

কথাটা বলে হয়ত ভুল করে ফেললাম। ও তখন আমার দিকে এতোটা রাগ নিয়ে তাকিয়ে ছিল যেন মনে হচ্ছিল এখনই ও আমায় একটা চড় বসিয়ে দিবে। আমিও risk না নিয়ে একটু দূরে সরে বসলাম। আর তখন থেকেই মজার আলাপচারিতায় একটা বিষময় নিরাবতা নেমে এল। আমার খুবই ইচ্ছা করছিল ওর সাথে আরও কথা বলি, বাইরে গিয়ে কিছু খেয়ে আসার প্রস্তাব করি, ব্যাগ থেকে ধুসর চাদরটা বের করে ওর সাদা চাদরের জীবনটা রক্ষা করি। কিন্তু ego problem হোক আর যাই হোক না কেন যেন first step টা নিতে ইচ্ছা করছিল নাহ। তাই দুজনই জড় পদার্থের মত বসে রইলাম যে যার জায়গায়।

বেশ ৪ ঘণ্টা এভাবে কেটে গেল। ও একটা বই বের করে পরছিল আর আমি আমার মোবাইল বের করে snake গেমটার high score ব্রেক করার চেষ্টা করছিলাম। হঠাৎ ও উঠে বাইরে বেরিয়ে গেল কিছু না বলে। এখন ওর উপর খুবই রাগ হচ্ছিল। কি এমন হয়েছে যে শালার এতক্ষন চুপচাপ থাকতে হবে। কত্ত ভাব! নাহ, এর সাথে বনবে নাহ…… অন্যকারো সাথে bed শেয়ার করতে হবে। এসব হাবিজাবি ভাবছিলাম এমন সময় ঝড়ের বেগে রুমে ঢুকল শিশির। আমার সামনে এসে অনেক শান্ত কণ্ঠে বলল, “খেতে যাচ্ছি, তুমি যাবে?”। এমন একটা গতিতে ঢোকার পর ওর কণ্ঠ এতটা শান্ত থাকবে তা মোটেও expect করিনি। আমি কোন কথা না বলে simply উঠে পরলাম।

হল থেকে বের হয়ে দুজন একই গতিতে পাশাপাশি হাটতে থাকলাম। উদ্দেশ্য জাহাঙ্গীরনগরের বিখ্যাত বটতলা। কেউ কোন কথা বলছি না এখনো। এই নিরবতার ভিতর একটা খামখেয়ালি কাজ করছিল। আর সহ্য হচ্ছিল না এই নিরবতা।
– Sorry. (নিজের অজান্তেই বলে ফেললাম) আমি জানতাম না যে হিমু তোমার better half. (কথাটা শেষ করে নিজের উপর আবার খুব রাগ হচ্ছিল, কি দরকার ছিল খোঁচা মেরে কথাটা বলার ……)
কিন্তু না, আমায় অবাক করে দিয়ে ও বাচ্চাদের মত হাসতে লাগল। গাছের পাতায় তৈরি হওয়া আনন্দের অন্ধকারে ওর হাসি যেন আলো ছড়াচ্ছিল। আমি অবাক হয়ে ওকে দেখছিলাম, এত অল্পতে একটা মানুষ কিভাবে এত সুন্দর করে হাসে?? কিছু কিছু সময় একটা হাসি-ই আমাদের বলে দেয় don’t worry, it’s okay, তখন শিশিরের হাসিটা অনেকটা তেমন ছিল।
এরপর আর চুপ করে থাকা চলে না। সারাদিন যত কথা বলতে পারিনি সেসব কথা মনে করার চেষ্টা করছিলাম কিন্তু একটাও মনে পরছিল না। ঝগড়ার কারণটাই শুধু মনে ছিল তাই একটু risk নিয়েই ওকে ask করলাম “ হিমুর কি সবগুলো পার্টই পড়েছ??” … তারপর থেকে যে শুরু হল আমাদের বকবকানি তা আর থামার নামই নিল না। নিরবতা আমাদের উপর রাগ করে চলে গেল নতুন শিকার খুঁজতে। কখন যে বটতলাতে চলে এলাম কে জানে।

‘জান্নাতুল হোটেল’ নামের একটা হোটেলে ঢুকলাম দুজন। বেশ ফাকাই ছিল হোটেলটা। কোনার এক টেবিলে এক বড়ভাই এক আপুকে ভাত খায়িয়ে দিচ্ছিলেন। বিষয়টা কেমন যেন ভাল লাগছিল নাহ, কোথাই যেন একটু অনিচ্ছা ছিল ব্যাপারটাতে। anyway, আমরা দুজনেই রাতে হাল্কা খাবার পছন্দ করি তাই রাতে পরটা আর ডিমভাজি দিয়ে খাওয়া শেষ করলাম। হাত ধোওয়ার আয়জন ছিল একদম শেষ প্রান্তে। বড় আকারের একটা ঘটি ছিল আর cosco সাবান ছিল। আমি ঘটিটা ভরে পানি তুললাম আর শিশির ততক্ষণে নিজের হাতে সাবান মাখছিল। আমি ঘটিটা উঁচু করে পানি ঢালছিলাম যাতে ও হাত ধুয়ে নিতে পারে। ও দ্রুত হাত ধুয়ে নেবার পর হয়ত অভ্যাসবশতই হাত ঝাড়া দিল। আর পানির ঝাপ্টাটা আমার মুখে এসে লাগল। আমি একদমই অপ্রস্তুত ছিলাম তাই পানি নাকে ঢুকে গেল আর আমি জোরে একটা হাঁচি দিলাম। জিনিসটা বুঝতে পেরেই ও হাসতে হাসতে আমায় ছোট করে একটা sorry বললআর আমার হাত থেকে ঘটিটা নিয়ে নিজে পানি ঢালা শুরু করল। এবার আমি হাতে পানি নিয়ে ইচ্ছা করেই ওর দিকে ছুড়ে মারলাম (যে কাজটার জন্য আমি আজও নিজেকে দোষারোপ করি) … ও হয়ত ready ই ছিল আমার এই কাজের জন্য তাই আমি পানি ছোড়ার আগেই ও লাফ দিয়ে একটু পাশে সরে গেলআর সাথে সাথে ও গিয়ে পড়লো ঐ বড়ভাইটার গায়ের উপর যে আপুটাকে খাওয়ানো শেষ করে এখন হাত ধুতে এসেছিল। তার হাতের ঘটিটা তার গায়ের উপর ধাক্কা খেল আর সে পুরোপুরি ভিজে গেল। এটা দেখে টেবিলে বসা আপুটা একটা তাচ্ছিল্লের হাসি দিলেন। ভাইয়ার চোখ থেকে তখন গরম উল্কা ঝরছিল। মুহূর্তটা আমার জন্য কেমন জানি slow হয়ে গেল। ভীষণ রকম ভয় করতে লাগল কিন্তু পরমুহূর্তেই সেই ভয় চিন্তায় রুপ নিল, শিশিরের জন্য চিন্তা। আমি এখন ওর পিছনের পাশটাই শুধু দেখতে পাচ্ছিলাম, ওর হাতটা দেখে মনে হল ও কাঁপছে আর ওর চোখদুটো ভাইয়ার চোখে fixed ছিল এটা ওর মাথা দেখেই বঝা যাচ্ছিল। নিরবতার এই নতুন রূপটাকে আরও বেশি অসহ্য লাগছিল।

– Sorry ভাইয়া। দেখতে পাইনি। (কাপাকাপা গলায় বলল ও)
– 35TH BATCH?
– জী ভাইয়া।
– নাম কি?
– শিশির ভাইয়া।
– তোমার নাম শিশির ভাইয়া? (কথাটার ভিতর একটা রসিকভাব থাকার কথা ছিল কিন্তু তিনি কথাটা বললেন চরম বিরক্তি আর রাগ নিয়ে।)
– শুধু শিশির।
– কোন হল?
– মীর মোশারফ হোসেন হল।
– হলে উঠস না??
– জী ভাইয়া।
– আচ্ছা যাও।
– আসসালামুওয়ালাইকুম ভাইয়া।

আমিও মাথা নিচু করে একটা সালাম দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে পরলাম। আমার কিছুক্ষন আগে শিশির বেরিয়ে গিয়েছিল আমার bill টা দিতে একটু সময় লাগলো। বের হয়ে আর শিশিরকে দেখলাম নাহ। খুব চিন্তার ভিতর পরে গেলাম। কাওকে ভরকে না দিয়ে যত দ্রুত পা চালানো সম্ভব আমি তত দ্রুত পা চালিয়ে হলের দিকে রওনা দিলাম। দূরে সাদা রঙের একটা অবয়ব দেখতে পেয়ে মনটা সাথে সাথে হাল্কা হয়ে গেল। এবার আর থাকতে পারলাম নাহ, ছোটখাটো একটা দৌড় দিয়ে ওর পাশে এসে থামলাম।
– চাদরটাকে এতই মিস করছ তুমি! আমার জন্য বাইরে একটু wait ও করবে না?? (হাপিয়ে হাপিয়ে বললাম, পরিস্থিতিটাকে স্বাভাবিক করার জন্য তখন মাথায় এর থেকে ফানি কোন কথা আসছিল না)
– ভাইয়াটা surely হলে এসে আমায় বকাঝকা করবে, তাই না? (কিছুটা অস্থিরভাবে প্রশ্নটা করল ও)

ওর প্রশ্নটা শোনার পর নিজেকে কেমন যেন অসহায় মনে হতে লাগলো। ওর কাঁপা কণ্ঠ আমার কাছে একটা নিশ্চয়তা চাচ্ছিল কিন্তু আমার কিছুই করার ছিল না। আমি যে এখানে নতুন, কিছুই জানি না, কাওকেই চিনি না! নিজের উপর খুব রাগ হতে লাগলো। বলার মতও কিছু পাচ্ছিলাম নাহ কারন আমার ভয় হচ্ছিল যদি কোন মিথ্যা সান্ত্বনা দেই তাহলে ও ঠিক ধরে ফেলবে। আমি কিছু না বলে ওর ডানহাতটা আমার হাতের ভিতর নিয়ে জোরে একটা চাপ দিলাম। ও কিছুক্ষন অবাক হয়ে চেয়েছিল, তারপর এক ঝাটকা দিয়ে আমার হাতের থেকে তার হাতটা সরিয়ে নিল। এরপর আর কেউ কোন কথা বললাম নাহ। দুজনেই চুপচাপ হলে ফিরে এলাম।

হলে ঢুকে দেখলাম যে যার মত শুয়ে-বসে আছে। বেশির ভাগই হয়ত হলে টোকেন কেটে খেয়েছে। আমরা আমাদের বিছানার সামনে আসার পর ও নিজের ব্যাগ খুলে একটা গামছা বের করে বাইরে চলে গেল।ও যাওয়ার পর আমি আমার ব্যাগ খুলে ধূসর চাদরটা বের করে বিছানায় বিছিয়ে দিলাম। আমি কোণাগুলো ঠিক করছিলাম আর এর ভিতর ও চলে এলো। আমি ব্যাগ থেকে একটা mosquito repellent cream ওর হাতে দিলাম।
– এটা use কর নাহলে রাতে ঠিক মত ঘুমাতে পারবে না।
ও কোন কথা না বলে আমার হাত থেকে ক্রিমটা নিল আর ধন্যবাদ টাইপের একটা হাসি দিল। আমার ও গোসল করার দরকার ছিল কিন্তু আমি গামছা আনতে ভুলে গিয়েছি। এবার কোন ভনিতা না করে ওকে সোজাসুজি বললাম
– তোমার গামছা শেয়ার করতে প্রবলেম আছে?
ও কোন কথা না বলে গামছাটা আমার দিকে এগিয়ে দিল। আমিও আর কোন কথা না বলে বাইরে বেরিয়ে পরলাম, একটু fresh হওয়ার দরকার ছিল। গণরুমের বাথরুমটা একদম পাশেই ছিল। আমি ছোটখাটো একটা গোসল করে নিলাম। গোসল শেষে গামছা দিয়ে মুখ মুছতে গেলাম ঠিক তখনই heartbeat টা বেড়ে গেল। গামছা থেকে ওর শরীরের মিষ্টি ঘ্রাণ বের হচ্ছিল। জানিনা সেটা আবেগ ছিল নাকি কোন কাম বাসনা ছিল, আমি গামছাটা কিছুক্ষণ মুখের সাথে চেপে রাখলাম। আমার শরীরের প্রতিটা লোমে একটা কাঁপুনি বয়ে গেল। নিজেকে কোনভাবে সংযত করে গণরুমে ফিরে এলাম।

ফিরে দেখলাম দরজার এপ্রান্তে বেশ কয়েকটা চেয়ারে কয়েকজন সিনিয়র ভাইরা বসে আছে আর তাদের পিছনে আরও কয়েকজন ভাই দাড়িয়ে আছে। তাদের সামনে 35thব্যাচের ছেলেরা লাইন করে দাড়িয়ে আছে। সবাই একদম আর্মিদের মত সোজা হয়ে দাড়িয়ে আছে, হাতদুটো একদম সোজা, মাথা একদম সামনের দিকে সোজা করা, দু পায়ের মাঝে সামান্য ফাক … দেখে বুঝলাম ওদের ওভাবে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর instruction দেওয়া হয়েছে আর আমাকেও ওভাবেই দাড়াতে হবে। এক বড়ভাই পিছনে ফিরে আমায় দেখলেন
– আসসালামুওয়ালাইকুম ভাইয়া।
– কোথায় গেসিলি?
– ভাইয়া, গোসল করতে।
– তাড়াতাড়ি ঢুক।
আমি বাধ্য ছেলের মত ভিতরে ঢুকলাম আর কোণার একটা সারিতে জায়গা করে নিলাম। প্রথমে চলল পরিচয় শেখানোর পালা। একটা structured format এ পরিচয় বলতে হবে। আগে সালাম দিতে হবে তারপর নাম, ডিপার্টমেন্ট, ব্যাচ, হল, জেলা, স্কুল, কলেজ। অনেক জোরে বলতে হবে, clearly বলতে হবে, কোথাও ভুল গেলে বা থেমে গেলে আবার প্রথম থেকে বলতে হবে আর বলার সময় একটুও নড়াচড়া করা যাবে না। লাইন ধরে একেএকে সবার পরিচয় নেওয়া হোল। হাতে গোনা কয়েকজন বিনা বাধায় সম্পূর্ণটা বলে গেল কিন্তু আর সবাই কোথাও না কোথাও আটকাল। এদের জন্য উপহার ছিল অকথ্য সব গালি। তার ভিতর সবচেয়ে ভদ্র গালিটা ছিল এমন ‘অই মাগির জামাই, গলা দিয়া স্বর বের হয় না কেন? প্রতিবন্ধী কোঠাই ভর্তি হইসিশ নাকি?’। আমার আর শিশির দুজনেরই problem হয়েছিল পরিচয় দিতে। আমি চুপচাপ ভাইয়াদের বকা খেলাম কিন্তু শিশিরের চোখ লাল হয়ে গেল। রাগে না লজ্জায় এটা বোঝা গেল না। খুব ইচ্ছা করছিল ওর পাশে গিয়ে ওর হাত ধরে ওকে বলি এত অল্পতে ভেঙ্গে না পরতে। কিন্তু statue হয়েই দাড়িয়ে থাকলাম নিজ জায়গায়।

Anyway, সব excitement প্রথম রাতেই চলে গেল। রাত ১২ টায় এক বড় ভাই এসে যে শুরু করল প্যাড়া তা চলল প্রায় ২টা পর্যন্ত। মাঝে তো এক ভাই এসে কবিতা শেখাল যা শুনে আমার varsity তে পরার ইচ্ছা চলে যেতে লাগল। সবটা মনে নেয় কিন্তু শুরু টা অনেক এমনটা ছিল ……
ক তে কমলা বিবির ঘরে
খ তে খড়ম আলী ঢোকে
গ তে গড়াগড়ি করে
ঘ তে ঘষাঘষি করে
বল ন ন ন
যাইহোক, অনেক প্যাঁড়া এর একেএকে ভাইয়ারা চলে যেতে লাগল। 35th ব্যাচ এর সবার চোখে একই সাথে ঘুম আর প্যাঁড়া মুক্তির আনন্দ ছলছল করতে থাকল। রুমে থাকা শেষ বড়ভাইটা একসাথে থাকার উপদেশ দিয়ে যখন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন তখন আমি আশায় আশায় পিছন থেকে উঁকি দিয়ে দরজার দিকে তাকালাম আর সাথে সাথে আমার দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়ে গেল। ভাইয়াটা আবার ফিরে এসেছে আর তার পিছন পিছন হোটেলে যার গায়ে পানি পরেছিল ঐ ভাইয়াটা ঢুকল রুমে। আমি সাথে সাথে শিশিরের দিকে তাকালাম। ওর মুখ অসম্ভব রকম সাদা লাগছিল যেন সে কোন ভূত দেখেছে। সবাই একটু আগে শিখিয়ে দেওয়া নিয়ম মোতাবেক একসাথে চিৎকার করে উঠলো ‘আসসালামুওালাইকুম ভাইয়া’। ও প্রান্ত থেকে কোন জবাব এল কিনা টা বোঝা গেল না। দুজন দুটি চেয়ার নিয়ে বসে পরল।
– এখানে ‘শুধু শিশির’ কে? (হোটেলের ঐ ভাইয়াটা একদমই শীতল কণ্ঠে ask করল।)

তার এমন ডাক শুনে আমি নিজেও confusion এ পরলাম। কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই শিশির তার লাইন ছেড়ে তার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। রুমের প্রতিটা চোখই ছিল শিশিরের উপরে কিন্তু আমার চোখ ছিল ঐ ভাইটার দিকে যে একটা মিছকি হাসি দিয়ে শিশিরের দিকে তাকাল। শিশির ঠিক চেয়ার দুটির মাঝ সোজাসুজি গিয়ে দাঁড়ালো।
– আমায় ডেকেছেন ভা ……
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই ঐ ভাইয়াটা শিশিরের মুখে ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিলেন। কেউ কোন কিছু বুঝে ওঠার সুযোগ পেল না। চড়ের শব্দটা রুম জুড়ে বাজতে লাগল। রাগে আমার দাতের সাথে দাত লেগে গেল। মনে হচ্ছিল এখনই দম বন্ধ হয়ে মারা যাব। খুব পিছনে ছিলাম বলে তেমন কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না। পিছনের ভাইয়ারা একে অন্যের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছিল। যেন তারাও ঘটে যাওয়া কাজটা approve করছে না। শিশিরের কোনো পরিবর্তন দেখলাম না। এটা ঠিকই বুঝতে পারছিলাম যে শিশির নিজেকে খুবই শক্ত করে আছে।
– কথা কওয়ার আগে সালাম দিতে কইসে না তোরে সিনিয়ররা? এর মধ্যেই ভুলে গেসিস??
– ভাইয়া, সালাম দিয়েছিলাম আপনি রুমে ঢোকার সাথে সাথেই।
– আবার দিবি। যতবার কথা হবে ততবার দিবি। সালাম দিতে লজ্জা লাগে?
– না ভাইয়া। (একরকম কান্না চেপে রেখে কথাটা বলল শিশির)
– মাগি মানুষের মত আস্তে কথা বলিস কেনরে? গলায় জোর নাই? জোরে বল যাতে লাস্ট মাথার ঐ ছেলেটাও শুনতে পায়। কি সালাম দিতে লজ্জা লাগে?
– নাআআআ ভাইয়া। (ওর কথাটা রুমে echo হতে লাগল)
– আবার বল।
– নাআআআ ভাইয়া।

এই পর্যায়ে নিজেকে খুবই সামান্য মনে হতে লাগল। নিজের এলাকায় অনেক দাদাগিরি করতাম, ছোট ছোট ভুল করাতে একে ওকে গিয়ে পিটিয়ে আসতাম আর এখানে খুব কাছের কারো সাথে এভাবে খারাপ ব্যবহার করা হচ্ছে আর আমি সামান্য প্রতিবাদও করতে পারছি না। নিজের উপরও এক ধরনের রাগ কাজ করতে লাগল। যাইহোক, সবার নজর সামনের দিকে ছিল তাই আমি একটু সামনের দিকে এগোলাম এই আশায় যে শিশির আমায় দেখে হয়ত একটু সাহস পাবে।
– Campus এ আইসিস দুই দিনও হয়নাই এর ভিতরই ডানা গজাই গেসে তোর? হ্যাঁ? কথা বলিস না ক্যান?
– নাআআআ ভাইয়া।
– না মানে?? আমি তো তাই দেখতেসি। উঁচু বটে খাইতে যাস, বর ভাইদের গায়ে পানি ছুড়ে মারিস, পাশ দিয়ে যাইতে গেলে সাইড দিশ না। কি? অনেক বড় ধোন মনে করিস নিজে্রে?
– ভাইয়া আমি খেয়াল করি নি।

ভাইয়াটা কিছুক্ষন চুপচাপ বসে রইলেন। এরপর হুট করে চেয়ার থেকে উঠে শিশিরকে আবার একটা চড় বসিয়ে দিলেন। শিশির নিজেকে control করতে না পরে ঘুরে পরে গেল। আমার ভিতরটা তখন দুমড়ে গেল। আমি সামনের ছেলেগুলকে অনেকটা ধাক্কা দিয়ে সামনে এগুনোর চেষ্টা করলাম কিন্তু কেউ একজন আমার ডানহাতটা শক্ত করে ধরে রাখল। কয়েকটা ছেলে মিলে ওকে তুলে ধরল। আমি চেয়ে দেখলাম ওর ঠোটের থেকে রক্ত পড়ছে। নিজের অজান্তেই কেঁদে ফেললাম এটা দেখে। এক ভাই ঐ জানোয়ারটাকে বলল “মানিক ভাই, থাক। বাদ দেন।” কিন্তু মানিক ঐ ভাইয়াটাকে আঙ্গুলের ইশারায় চুপ করতে বলল। শিশির আবার আগের জায়গায় গিয়ে দাঁড়াল।
– খেয়াল করিস নাই মানে কি? খেয়াল কার ভোদার ভিতর দিয়া রাখসিশ? হ্যাঁ? আবার মাগি মানুষের মত কান্দিশ ক্যান? কান্না থামা!
কিন্তু শিশির তখনও ফুফাতে লাগল। বেশ বড় বড় নিঃশ্বাস নিয়ে কান্না থামানোর চেষ্টা করছিল কিন্তু চোখ দিয়ে অনবরত পানি পরছিল।
– কি রে মাদারচোদ, কান্না থামাইতে বললাম না!

মানিক আবার চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। সাথেসাথে আমার মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিল। আমি একটান দিয়ে আমার হাত ঝাড়া দিয়ে ছাড়িয়ে নিলাম আর ঠিক শিশির আর মানিকের মাঝে গিয়ে দাড়িয়ে পড়লাম। সব চোখগুলো এখন আমায় ঘুরে দেখছিল অবাক হয়ে কিন্তু শুধু মানিকের চোখগুলোই আমায় বিধছিল।
– বাইনচোদের কলজে দেখসিশ? তরেও দেখতেসি size করতে হবে আজকে।(উনি কথা শেষে অন্যান্য সিনিয়রদের approval এর জন্য তাদের দিকে তাকাল কিন্তু কেউই তার কথায় বিন্দুমাত্র উৎসাহ দেখাল নাহ। আমি এই সুযোগটাকে কাজে লাগালাম।)
– আপনার কি মনে হয় আপনি একের পর এক জুনিয়রদের গায়ে হাত দিবেন আর 35th batch এর student রা তা মুখ বন্ধ করে দেখবে? আপনি বড় ভাই হয়ে শাসন করতে পারেন কিন্তু আর একবার 35th batch এর কার গায়ে হাত দিলে আপনাকে আর ছেড়ে কথা বলা হবে না। (নিজ এলাকায় একটু আধটু রাজনীতি করায় আমার জানা আছে যে কিভাবে একটা personal আঘাতকে দলগত আঘাত হিসেবে interpret করতে হয়।)

কথা শেষ হওয়ার সাথেসাথে উনি আমার নাকের উপর একটা ঘুষি বসিয়ে দিলেন। আমি মনেমনে এটাই চাচ্ছিলাম। ঘুষি খেয়ে আমি মেঝেতে পরে গেলাম আর নিজ থেকেই পরে রইলাম। শিশির নিচু হয়ে আমি তোলার চেষ্টা করছিলো আর আমার batchmate রা সবাই এগিয়ে এল আমায় তোলার জন্য। আমি ওঠার পর সবাই দেখল যে আমার নাক থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরছে। পুরো 35th batch তখন জ্বলে উঠল আর মানিককে একপর্যায়ে ঘিরে ধরল। অন্য সিনিয়র ভাইয়ারা তখন অনেক কষ্টে মানিককে ঘেরাও থেকে বের করল কিন্তু তার আগেই বেশ কয়েকটা মার পরল জানোয়ারটার গায়ে। আমি অনেকটা senseless অবস্থাতেই ব্যাপারটা উপভোগ করলাম।

ঘুষি খেয়ে আমার অবস্থা সত্যিই খারাপ ছিল। আমাকে আর শিশিরকে কিছুক্ষনের ভিতরেই মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হল। শিশিরকে pain killer দেওয়া হল আর ওর ঠোটের কাটা জায়গায় একটা তুলা চেপে দেওয়া হল। আর আমার ভারিরকম treatment করা হল। গায়ের জামা পুরোপুরি রক্তে ভিজে গিয়েছিল বলে জামা খুলে ফেলা হল। নাকে বিশাল size এর একটা পট্টি মারা হল। তারপর বেশ কয়েক পদের ওষুধ খাওয়ানো হল। রাত অনেক হয়ে গিয়েছিল বিধায় আমাদের মেডিকেলেই ঘুমানোর ব্যবস্থা করা হল। আমি আর শিশির এক বিছানায়(আর কি চাই?) আর দেখাশুনা করার জন্য আমাদের সাথে থেকে গেল যে ৩জন তারা এক বিছানায়। ওরা ৩জন অনেকক্ষণ উত্তেজনাময় গল্পের বর্ণনা দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল কিন্তু আমার মোটেও ঘুম আসছিলো না। আসলে আমি ইচ্ছা করেই জেগে ছিলাম।

শিশির বেশ খানেকটা কুঁকড়ে শুয়েছিল তাই ওর চুলগুলো ঠিক আমার নাক বরাবর ছিল। এসময় খুবই আফসোস হতে লাগল। নাকটা ঠিক থাকলে ওর চুলের ঘ্রান নিতে পারতাম। এভাবে যে কতক্ষণ ছিলাম তা মনে নেই কিন্তু একসময় ও আর কাছে চেপে এল। একদম আমার বুকের সাথে ওর নাক চেপে ধরল। আমি কি করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। হঠাৎ বুকের উপর বেশ গরম অনুভূত হল। বুঝতে দেরি হল না যে এটা ওর চোখের পানি। আমি সাথেসাথে ওর গায়ের উপর একটা হাত তুলে ওকে জড়িয়ে ধরলাম আর মুখ নামিয়ে ওর চুলে একটা চুমু খেলাম। ও মুখটা একটু উঁচু করে একবার আমার দিকে তাকাল। তখন শুধুই ভাবছিলাম অনন্তকাল ওভাবে থাকতে পারলে মন্দ হত না। ঐ মুহূর্তটাতে আমাদের ভিতর কিছু একটা ছিল যা অসঙ্গায়িত।

Next দিন থেকেই department এর পোলাপাইন এর মাঝে হল ছেড়ে বাসা নেবার গুঞ্জন শোনা যেতে লাগল। আমরাও এটাই ভাবছিলাম তাই আমরা ওদের সাথে এটা নিয়ে কথায় যোগ দিলাম। কিছুক্ষণ এর মধ্যেই পরিচয় হল আবীর এর সাথে। আবীরকে দেখতে অনেকটা মুন্নি সাহা এর male version এর মত লাগছিল। কথাবার্তাও তার মতই সাবলীল। ও maybe আগেও আলাদা বাসা নিয়ে থেকেছে কারণ ওর কথা শুনে এমনটাই মনে হচ্ছিলো। বাসার ভাড়া কেমন হবে, কি কি জিনিস কেনা লাগবে, আগে চুলা এর ব্যবস্থাকরতে হবে নাকি আগে ফ্যান কিনতে হবে এরকম সব বিষয়েই তার অঘাত জ্ঞান। আমরা তিনজন নেক্সট ২-৩ দিনেই move out করার সিদ্ধান্ত নিলাম so ২য় দিন class ছেড়েই আমরা তিনজন বেরিয়ে পরলাম ঘর খুঁজতে আর ৩ ঘণ্টার ভিতরেই সাভারের কাছেই পেয়ে গেলাম ২ room এর একটা ঘর। so আমরা দেরি না করে বাসাটা নিয়ে নিলাম। আবীর সপ্তাহে ৩দিন থাকত বাসায় + ওর রুম আলাদা ছিল so আমার আর শিশিরের কোন problemই হত না। মনের সব রং-ঢং মিশিয়ে সংসার করেছি আমরা দুজন সবার চোখের আড়ালে। চুটিয়ে romance করেছি দুজন আবার অনেক ঝগড়াও হয়েছে কিন্তু কখনো ছাড়িনি প্রানের মানুষটাকে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.