সম্পর্ক

লেখকঃ হোমান

মিউজিক প্লেয়ারে চলছে “আমার বেলা যে যায় সাঁজ বেলাতে, তোমার সুরে সুরে সুর মেলাতে”। ঘরের চার কোণে চারটা স্পিকার আর প্লেয়ারের গা ঘেঁষে আরও বড় দুটো। জয় গত মাসে বসুন্ধরা সিটি থেকে ফাইভ পয়েন্ট ওয়ানের হোম থিয়েটারটা কিনেছে। ফাটাফাটি সাউন্ড। হোম থিয়েটারে শুনতে হয় পিটবুল কিংবা জেনিফা লোফেজ মার্কা গান; রবি ঠাকুরের গান শোনার জন্য কেউ হোম থিয়েটার কিনে? অবশ্য জয়ের ইচ্ছা ছিল টু পয়েন্ট ওয়ান ক্রিয়েটিভের সস্তা দুইটা স্পিকার নেয়ার কিন্তু মুরাদের সব কিছুতেই বাড়াবাড়ি। এই যেমন চল্লিশ ইঞ্চি এল,ই,ডি টিভিটা বসার ঘরে ধুলো-ময়লা গায়ে চড়িয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখার কোন মানে হয়? জয় একা মানুষ। একজনের জন্য বিশ ইঞ্চিই যথেষ্ট। তারপরও মুরাদ তাকে সবচেয়ে দামী জিনিষটা কিনে দিবেই-দিবে।

রান্নাও যে একটা আর্ট সেইটা মুরাদ কিছুতেই বিশ্বাস করতে চায় না। তার কাছে রান্নাটা হল, পাতিলে পানি ঢেলে হলুদ, মরিচ, মসলা ছিটিয়ে সেদ্ধ করে নেয়াটাই রান্না। কিন্তু জয় রান্না করে রন্ধন শিল্পীর মত। ধীরে-সুস্থে, সময় নিয়ে নানান পদের রান্না, আর তাতে এক বুক ভালোবাসা মিশিয়ে অপেক্ষা করে মুরাদের জন্য। পরিবার আর অফিসের কাজ-কর্ম সেরে মুরাদটা তেমন একটা সময় বের করতে পারে না। তারপরও জয় হাসি মুখে তা মেনে নেয়, প্ল্যাস্টিকে জালিতে ঢেকে রাখা খাবার গুলো জয় আবার সাজিয়ে ফ্রিজে তুলে রাখে। ওহ, ফ্রিজের কথা তো বলা হয়নি, জয় চেয়েছিল ওয়ালটনের ছোট্ট-খাট্ট একটা ফ্রিজ আর মুরাদ ডাবল ডোরের এক বিশাল ফ্রিজ এনে তুলে দেয় জয়ের বাসায়। জয় ওতে এত খাওয়ার রাখার পরও অনেকখানি খালি যায়গা পড়ে থাকে। যেমন জয়ের এত কিছু থাকার পরও দুই রুমের বাসাটা মাঝে মাঝে বড্ড খালি লাগে।

অবশ্য রান্নাটা জয় নিজের হাতে করলেও মতিনের মা সব কিছু রেডি করে দেয়। যে ভালো রাঁধে সে ভালো চুলও বাঁধে কথাটা জয়ের ক্ষেত্রে সত্যি নয়। সে মাছ-তরকারি কুটতে পারে না। আর বাসায় একা থাকে বলে মুরাদ মতিনের মাকে এই বাসায় ফিক্সড করে দিয়েছে। গত দুই বছরে শুধু মতিনের মা না আরও অনেকে বুয়া এ বাসায় গুজারে গেছে, কেউই বেশী দিন খাপ খাইয়ে চলতে পারে না জয়ের সঙ্গে। সব বুয়াদের একই অভিযোগ, বাসায় মহিলা না থাকলে থাকা যায়? আর এই বাসার ব্যাটা ছেলেটা মহিলাদের চেয়ে খারাপ, সারাক্ষণ ঘ্যানঘ্যান করে, নিজে নিজে কথা বলে, ঘরের জিনিষ পত্রের সাথে নিজের সম্পর্ক পাতায় আর সারাক্ষণ ইংরেজিতে বুয়াদের সাথে জগড়া করে।

সোফায় বসে গান শুনা অবস্থায় জয়ের চোখ পড়ে বুক শেলফের উপর। “শাপ মোচন” বইটা ম্যারাথন দৌড় দেয়ার আগ মুহূর্তের মত এক পা বাডিয়ে আছে। ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়ের এই বই সে অনেকবার পড়েছে। তারপরও হঠাৎ চোখ পড়ায় সোফা থেকে উঠে বইটা পাড়ে। বই নামাতে গিয়ে “গীতাঞ্জলী”তে থাকা রবীন্দ্রনাথ ফ্লোরে পড়ে মূর্ছা খায়। বুড়ো রবীন্দ্রনাথকে উঠাতে গিয়ে দেখতে পায় ঘোরের কোণায় লাল পিঁপড়া লাইন ধরে স্কুল-বাচ্চাদের মত এসেম্বলি করছে। জয় ফ্লোরে বসে তাদের খেলা দেখছিল। বইয়ের আওয়াজে রান্না ঘরে মাছ কুটা রেখে মতিনের মা পিছনে দাঁড়িয়ে জয় আর পিঁপড়ার খেলা দেখল কিছুক্ষণ। তারপর ঝাড়ু হাতে ছুটে এল।
জয় বলল,’বুয়া, উল্টো হয়ে যেটা পড়ে আছে- তাকে মারবে না প্লিজ। মতিনের মা মোটা গলায় বলে,’আইজ খাইছি তোগো।’ জয় তার ঝিয়ের পোকানিধন দেখছিল। সে আবার বলে, ‘বুয়া, বাজে কথা বল কেন?’ মতিনের মা চট করে কথাটির মানে বুঝতে পারল না, জয়কে খুশী করার ইচ্ছে ছিল তার, সে সবেগে মেঝেতে বাড়ি দিতে দিতে বলল, ‘এক্কেরে পাড়ায়া মারা উচিত।’ জয় নাক চেপে চিৎকার করে উঠল, ‘দূর হও!’ মতিনের মা ‘দূর হও’- কথাটির সাথে বেশ পরিচিত। এই বাড়ীর মামাটা খুব রেগে গেল তাকে দূর হয়ে যেতে বলে। শুরুতে মতিনের মা ভয় পেত; ভাবত এই বুঝি চাকরীর পাট চুকল, সন্ধ্যায় গাবতলি থেকে বাড়ী ফেরার বাস ধরতে হবে তার! এখন আর ভয় পায়না, দিনে বার কয়েক কথাটি তাকে শুনতে হয়।
– ‘তোমার নোংরা হাত দিয়ে কোনো খাবার ছুঁবে না, মনে থাকবে?’
– ‘আইচ্ছা।’
– ‘ইউ আর সো ডিসগাস্টিং বুয়া!’
– ‘পিঁপড়া মারা সোয়াবের কাম।’
– ‘পিঁপড়া মারলে কী হয়? ইউ ক্যান নট এলিমিনেট দেম, ক্যান ইউ? বুয়া, ইউ আর সো মিন। ইউ আর সো-’
– ‘ঠিক আছে।’
– ‘বুয়া, ইউ আর সো ব্যাড। ইউ আর সো-
জয় মতিনের মায়ের জন্য উপযুক্ত কোনো বিশেষণ খুঁজে না পেয়ে ‘ইউ আর সো’তে এসে আটকে গেল। মতিনের মা ভাবল, ইংরেজীর মতো ব্যারা-চ্যারা কিছু একটা জানলে আজ খুব ভাল হতো, এই বাড়ীর মামার এত কষ্ট হতো না। জয়কে ‘ইউ আর সো’ বাক্যটি শেষ করার সুযোগ দিতেই মতিনের মা মাছ কুটতে বসে গেল। তা দেখে জয়ের মাথায় রক্ত উঠে গেল। রাগী গলায় বলল, ‘বুয়া, সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নাও।’মতিনের মা বলল, ‘ধুইছি, মামা। পিঁপড়া মারার পর- সবসময় আমি হাত কচলায়ে ধোই।’জয় অবিশ্বাস নিয়ে মতিনের মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল; কাউকেই বিশ্বাস করে না সে। জয় কড়া গলায় আবার বলে, ‘বুয়া কাপড় ঠিক করে বসো।’ মতিনের মা সবকিছু সহ্য করতে পারে, কিন্তু তার শালীনতা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুললেই মেজাজ খারাপ হয়। মুনকার নাকিরকে হাজির-নাজির জেনেই সে আব্রু করে, ইংরেজী জানা কোনো মামার জন্য নয়। জয়ের কথা শেষ না হতেই- বুয়া বলে, ‘এই রইল আপনের ভেটকি মাছ, বলে উঠে দাঁড়াল এবং আঁশটে মাখানো হাতে কোমরে আঁচল গুঁজতে গুঁজতে বলল, ‘পাগলের সংসারে আমি আর নাই।’জয় বলল, ‘আগে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নাও।’
– ‘রাখেন আপনের সাবান! যেই ঘরে ইজ্জত নাই, সেইখানে আমিও নাই। লাখ টাকা দিলেও নাই।’
– ‘সেদিন ঘর মোছার সময় তোমার বুকের কাপড় কোথায় ছিল, জানতে পারি?’
– ‘বুকের কাপড় আমি আসমানে শুকাইতে দিছিলাম।’
– ‘বাজে কথা বলবে না!’
– ‘আমি বুইড়া মানুষ; আমার নাতী-নাতনীর বিয়ার বয়স হইছে-’
– ‘বুয়া, শালীনতার জন্য বয়স কোনো অজুহাত নয়। সেদিন মুরাদ আর আমি ঐ ঘরে বসে পেপার পড়ছিলাম। ইউ ডিড ইট ইন্টেনশনালি; ডিডিন্ট ইউ?’
– ‘ছিঃ ছিঃ, বয়সকালে মানুষ আমারে যে অপবাদ দেয় নাই- আইজ আপনি সেইটাই দিলেন।
– ‘ঠিক আছে, এরপর থেকে মুরাদের সামনে যাবে না, মনে থাকবে?’
– ‘মনে থাকব না আর! পাগলের সংসারে আমি আর নাই! আমার সাধ মিটা গেছে! ছিঃ! ছিঃ!’
– ‘বুয়া, সাবান দিয়ে ভাল করে হাত ধুয়ে নাও; তোমার হাতে ভেটকিমাছের আঁশ লেগে আছে। ছিঃ ছিঃ করলেই নোংরা পরিষ্কার হয়ে যায়না।’
– ‘মাথায় বেইজ্জতি নিয়া হাতে সাবান ঘষলে কোনো ফয়দা নাই। ইয়া মাবুদ! তুমার কাছে বিচার থুইলাম।’

মতিনের মা না খেয়ে মরে যাবে, তবুও চরিত্র নিয়ে খোঁটা সহ্য করবে না। সে ‘ছিঃ! ছিঃ!’ করতে করতে ব্যাগ গোছাতে লাগল। জয় বলল, ‘কোথায় যাচ্ছ?’ মতিনের মা এ কথার কোনো জবাব দিল না। পাগলের সব কথার উত্তর দিতে নাই। জয় অধৈর্য গলায় বলল, ‘তাহলে মাছ কুটবে কে?’ মতিনের মা বলল, ‘সৌদি থেইক্কা একখান পর্দানশীন আইনা লন!’ জয় বলে, ‘বাজে কথা বলবে না।’

মতিনের মা আরো বার কয়েক ছিঃছিঃ বলে বাড়ী থেকে বেড়িয়ে গেল। রান্না ঘরে আঁশ ছাড়ানো একটি ভেটকিমাছ, তার পাশে কাত হয়ে পড়ে থাকা বটি এবং মাথার ওপর সিলিংফ্যানের একটানা ঘড়ঘড় শব্দ নিয়ে জয় চুপ করে বসে রইল। তার একবার মনে হল, মতিনের মাকে কথাটি না বললেই ভাল হতো। আবার ভাবল, কাউকে বিশ্বাস নেই।

কিছুক্ষণ পর জয় মুরাদের মোবাইলে ফোন দেয়। এক বাজে কণ্ঠের মহিলা শুধু সংযোগ না দিতে পারার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে। শেষমেশ অফিসের ল্যান্ড-লাইনে কল দেয় জয়। ওপাশ থেকে কেউ একজন জানালো, স্যার এখন মিটিংয়ে আছেন। সারাদিন কিসের এত মিটিং থাকে মুরাদের, জয় ভেবে পায়না। মুরাদের ওপর তার খুব রাগ হল, ‘আই হেইট ইউ মুরাদ, !’ বারান্দায় দাঁড়াতেই দেখল দু’টি ছেলে রিক্সার খোঁজে দাঁড়িয়ে আছে। জয় বারান্দা থেকে তাদের দেখেই রেগে গেল। সে বিড়বিড় করে বলল, ‘আই ডোন্ট বিলিভ ইউ বিচ। ছেলে দু’টো চলে গেলে- তার রাগ মতিনের মায়ের ওপর জমল, সে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল, “মুরাদকে দেখলেই বুকের আঁচল আসমানে শুকাতে দাও বুড়ি?’ জয়ের চিৎকার শুনে সানশেডে রোদ পোহাতে থাকা কয়েকটা পাখি ভয় পেয়ে উড়াল দিল। সে মনে মনে বলল, ‘তোরা যাসনে পাখি। প্লিজ।’

মুরাদ দুপুরের পর জয়কে ফোন করে, ‘কী ব্যাপার বলতো, তুমি নাকি বেশ ক’বার কল করেছ?’ জয় চুপ করে রইল। ওপাশ থেকে মুরাদ বলল, ‘হ্যালো, শুনতে পাচ্ছো?’ জয় তখনো চুপ।
– ‘কী হয়েছে? কিছু বলার না থাকলে অফিসে ফোন কর কেন?’
– ‘একা একা ভাল লাগেনা।’
– ‘ওষুধ খেয়েছো?’
– ‘কী এত কাজ তোমার!’
– ‘আমার কী কাজ তুমি জাননা? শোন, ওষুধ খেয়ে নাও, মাথা ঠাণ্ডা হবে।’
– ‘বুয়া চলে গেছে!’
– ‘কোথায় চলে গেছে?’
– ‘জানিনা!’
– ‘আবার কী বলেছ তাকে?’
– ‘তুমি আজ রাতের জন্য এই বাসায় এসে থাকো।’
– ‘জলিলকে বলে দিচ্ছি বুয়াকে খুঁজে আনতে।’
– ‘তুমি গত সাপ্তাহেও আসনি, প্লিজ আজ আস না!’
– ‘বুয়া খোঁজার সময় নেই আমার। আই অ্যাম ইন দ্য মিডল অব অ্যা মিটিং।’
– ‘আমার একা একা ভয় করে।’
– ‘বললাম তো, পারব না! আর ভয়ের কী আছে?’
– ‘ইজ দ্যাট উইথ ইউর ওয়াইফ নাও?’
– ‘জয়, বাজে কথা বল না!’
– ‘আর ইয়উ কিসিং হার নাউ?

জয়ের কথা শেষ হওয়ার আগেই মুরাদ ফোন নামিয়ে রাখল।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হল; সন্ধ্যা ঝুলে রইল রাতের গায়ে। আর জয় বসে রইল আঁশ ছাড়ানো একটা মৃত মাছের পাশে। দু’টো আরশোলাও ঘুরে বেড়ালো মিটসেফের গায়ে। জয় পোকাগুলোর সাথে কথা বলল, ‘তোদের ছানাপোনা আছেরে? আরশোলাদের সাথে কথা শেষ করে জয় খুব ব্যস্ত হয়ে পড়ল। অনেক কাজ তার। সে ডাইনিং টেবিলের ছ’খানা চেয়ারকে প্রেম করার অনুমতি দিয়ে দিল। যাকে বলে গনপ্রেম। খুব উপদেশ দিল চেয়ারদের, গার্লফেন্ড কিংবা বয়ফেন্ড যাকেই নির্বাচন কর না কেন, সারা জীবন এক সাথে থাকবা। আর একজনকেই নির্বাচন করবা। খবরদার ভুলেও বাই-সেক্স্যুয়ালদের মত দুই নৌকার মাঝি হবা না। কেউ কাউকে অবহেলা করবা না। লোক দেখানোর জন্য মুখে হাসি, বুকে দুঃখ ছেপে রাখবে না আমার মত। যার সাথেই থাকো না কেন এক সাথে থাকবে সবসময়। তারপর কী একটা অশ্লীল রসিকতা মনে পড়ায়- একটা চেয়ারের গায়ে চিমটি কেটে হাসতে লাগল। হাসতে হাসতে জয়ের গলার কাছে কান্না জমে উঠল। সে চেয়ারগুলোকে একদিকে টেনে আনল, তারপর ওদের গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, ‘তোরা পারবি না, শুধু একজনের সাথে জীবন পার করতে?’ চেয়ারগুলোকে ডেটিং করার জন্য পার্কে পাঠিয়ে সে আবার কাঁদল। মতিনের মা যেমন মৃত সন্তানদের কথা মনে করে বিলাপ করে, জয়ও তেমন করে কাঁদতে চাইল।

রান্নাঘরের মিটসেফের সাথে মতিনের মায়ের চৌকির বিয়ের ঝামেলা শেষ হয় রাত আটটা নাগাদ। এরপর জয় চোখের ঈশারায় কথা বলতে লাগল সোফা-কুশনের সাথে, ‘বিয়েটা কেমন হলো? একটু বেমানান, কিন্তু সব ঠিক হয়ে যাবে। ওরা সুখী হলেই হল, তাই না!’ তারপর সোফা-কুশনদের জন্য প্রেমিকের খোঁজে বেরুল জয়। অনেক বলে-কয়ে বালিশদের রাজি করাল সে। জয় বালিশগুলোকে নানান কিছু বোঝাল; আবার বকলোও একবার, ‘এত খারাপ তোরা! দেখে কিন্তু ভদ্রলোকই মনে হয়, আসলে তো লোভী! এত লোভ নিয়ে সুখী হওয়া যায় নারে!’ অনেক কথা খরচের পর বালিশ আর সোফা-কুশনের প্রেমের সম্পর্কও ফিক্সড হয়ে যায়। সে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘যে কোন প্রেম-ভালোবাসার সম্পর্ক গড়তে গেলে এরকম একটু-আধটু হয়ই! এই যে আমি আর মুরাদের প্রেম কি এমনি এমনি হল? কত ঝামেলার পর আজ আমরা এক সাথে আছি। কথা বলতেই জয়ের কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। একসাথে আছে কথাটা কি ঠিক?

মুরাদ থাকে বনানীতে তার বউ বাচ্চার সাথে। আর জয় থাকে ধানমণ্ডিতে একা একটি ফ্ল্যাটে। যদিও ফ্লাট ভাড়া থেকে শুরু করে যাবতীয় ক্ষয়-খরচ সব মুরাদই চালায়। ঢাকায় আসার আগে সে জানত না ফ্ল্যাটের বন্ধী জীবন কেমন, কিংবা এত আরাম আয়েশে কাটেওনি তার জীবন। মফস্বলে স্থানীয় কলেজ থেকে ডিগ্রী শেষে মুরাদের অফিসে চাকরি নিয়েছিল জয়। সেখানেই বস মুরাদ আর জুনিয়র অফিসার জয়ের সম্পর্কের শুরু। একদিন হঠাত করেই মুরাদ তাকে চাকরী ছেড়ে দিতে বলে। আর এই ধানমন্ডির ফ্লাট দেখিয়ে বলল, এইটা তোমার জন্য। এখন থেকে তোমার কাজ করার দরকার নাই। খাট কণ্ঠে জয় একবার আপত্তি তুলেছিল বটে, তবে সাথে লোভও হচ্ছিল মনে। জয়ের এক বন্ধু আছে, তার স্বপ্নটা ঠিক এমন, বয় ফেন্ড বানাবে, তার টাকায় মাস্তি করে জীবন কাটাবে। বন্ধুর কথা মনে পড়তেই জয় রাজি হয়ে যায়। প্রথম-প্রথম মুরাদ তাকে সময় দিত, দুই দিন বউ বাচ্চার আর সপ্তাহের বাকীদিন গুলো জয়ের। কিন্তু ইদানীং মুরাদ আগের মত আর নাই। জয়ের নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদা মেটালেও কেন যেন অবহেলা করে জয়কে। মুরাদ চায় না জয় বাহিরের জগতের সাথে কোন সম্পর্ক থাকুক। যেন এই একবিংশ শতাব্দীতে থেকেও সে চার দেয়ালে আবদ্ধ মধ্যযুগীয় রক্ষিতা।

রাত তিনটার দিকে জয় ওয়ারড্রব থেকে জামা কাপড় বের করে ট্রাভেল ব্যাগে ঢুকায়। তারপর হ্যাংগারে ঝুলানো মুরাদের ব্লেজারটা জড়িয়ে ধরে জয় মনে মনে বলে, “মুরাদ আমি পারলাম না তোমাকে আকড়ে ধরে থাকতে। তোমার উপহার দেয়া ঘরের দামী-দামী আসবাবপত্র পেয়ে ভেবেছিলাম আয়েশে কেটে যাবে বাকীটা জীবন। কিন্তু সুখে থাকার যে অলিক স্বপ্ন বুকে বেধে তোমার চার দেয়ালে নিজেকে আবদ্ধ করেছিলাম, এখন সেই সুখই আমার অসুখের কারণ। ভালো থেকো, পারলে ক্ষমা কর”

জয় কাঁধে ব্যাগ ঝুলালেও মাথায় ক্যাপ নেই। তবুও এই মাঝরাতে রাস্তায় নেমে তার গাইতে ইচ্ছা করছে, “মাথায় পরেছি সাদা ক্যাপ, হাতে আছে অচেনা এক শহরেরও ম্যাপ” মাথার উপর হুমায়ুনের রূপার থালার মতন চাঁদ চারদিক আলো ছড়িয়ে একা একা বসে আছে। জয় এখন নিজেকে ঐ একাকীত্ব চাঁদের মত মনে করছে। প্রথম দিকটায় মুরাদের দামী-দামী জিনিষ পত্রের উপর জয়ের লোভ থাকলেও পরবর্তীতে সে লোভাতুর দৃষ্টি অচিরেই কেটে যায় যখন মুরাদকে সত্যিকার ভালবাসতে চাইল সে। কিন্তু মুরাদ নিজেই তাকে ভালবাসতে দিল না। এখন প্রশ্ন হল, যে মানুষটা ফ্ল্যাট, দামী আসবাবপত্র আর বউ বাচ্চা রেখে মুরাদের পিছনে সময় দিত সে কেন জয়কে ভালবাসতে দিবে না? আসলে যখনই জয় মুরাদকে জড়িয়ে ধরতে গিয়ে নিজের ভালবাসার উপস্থিতি জানান দিত, তখনই মুরাদকে জড়িয়ে রাখা তার বউয়ের মেয়েলী গন্ধ তাকে দূরে সরিয়ে দিত। শুধু এইটুকুন না, মুরাদের শার্টের বোতামে লেগে থাকা স্ত্রীর লম্বা চুল, অসতর্কে কিস খাওয়া স্ত্রীর লিপস্টিকের রঙ, পরম মমতায় বাচ্চাকে আদর করা মুহূর্তের মুরাদের গায়ে লেপ্টে থাকা সামান্য দুধের ফোঁটা জয়কে মনে করিয়ে দিত তার পরিমিত ভালোবাসার পরিধি। হ্যাঁ জয় মুরাদের সাথে সম্পর্কে আছে কিন্তু সেই সম্পর্ক স্বামী-স্ত্রী কিংবা বাবা-ছেলের লাইসেন্সধারী সম্পর্কের চেয়ে বেশী পোক্ত নয়। সেই সম্পর্কের একটা নাম আছে কিন্তু জয়ের সম্পর্কের? নাহ সে স্বার্থ-লোভী হলেও আত্মসম্মানহীন নর্দমার কীট নয়। তাই নিজের এই নামহীন তথাকথিত সম্পর্কের ইতি টানার সিদ্ধান্ত নিল জয়।

এই দুই নৌকা সম্পর্কের একজন অংশীদার হিসাবে থেকে জয় একটা কথা উপলদ্ধি করতে পেরেছে। সমকামীরা যত দুঃখ, কষ্ট, একাকীত্ব কিংবা লাঞ্ছিত জীবন বয়ে বেড়িয়ে অসুখী হোক না কেন, বাইসেক্সটুয়ালদের মত এতটা অসুখী তারা নয়। এরা নিজেরা যেমন সুখী হতে পারে না, তেমনি সমাজে নাম দেয়া সম্পর্ক কিংবা নামহীন সম্পর্কে জড়িয়ে থাকা একটাকেও সুখী করতে পারে না। তাই এখন জয়ের পণ, আর যাই হোক দুই নৌকার যাত্রী কখনো সে হবে না। কারণ এতে পাড়ে উঠার কোন অপশন নেই, আছে শুধুই ডুবে যাওয়ার নিশ্চয়তা।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.