ত্রিলোক

লেখকঃ ঝরা পাতা

১.

– রাহাত, তাড়াতাড়ি রেডী হও বাবা। স্কুলের দেরি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু।
– দুই মিনিট বাবা।
-সকাল থেকে দুই মিনিট, দুই মিনিট শুনছি
-প্লিজ বাবা, একটু ওয়েট করো।
-আমি জানি তুমি এখন পানি নিয়ে খেলা করছো । এক মিনিটের ভেতরে বের হবে তুমি না হলে আমি কিন্তু অফিসে চলে যাবো।
ভেতর থেকে শুধু হাসির শব্দ ছাড়া আর কিছুই শুনতে পেলো না নাইম।

ছয় বছর বয়স রাহাতের। তবে বয়সের তুলনায় দুষ্টুমির পরিমানটা অনেক বেশি। রাহাতের সব থেকে প্রিয় খেলা হলো প্রতিদিন সকালে শাওয়ারের নিচে বসে পানি নিয়ে খেলা। এখনও সেটাই চলছে।
নাঈম হলো রাহাতের বাবা। বয়স সামনের ডিসেম্বরে ২৮ হবে। বয়সের তুলনায় ব্যাস্ততার পরিমানটা বেশি। বাবা মায়ের কথা রাখতে কলেজ লাইফেই বিয়ে করে আখির সাথে সংসার শুরু করতে হয়। যখন বন্ধুরা সবাই প্রেমিকাকে নিয়ে গল্প করে তখন নাঈম আস্তে করে পাশ কেটে চলে আসতো। নাঈম আর আখির মাঝে শারীরীক সম্পর্ক ছাড়া মানসিক কোন সম্পর্ক তৈরি হতে পারে নি আর তারই ধারাবাহিকতায় বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বাবা হয়ে গেল নাইম। তবে বেশি দিন তাদের এই ভালোবাসাহীন লোকদেখানো সম্পর্কটা টিকলো না। রাহাতের জন্মের পর থেকে নাঈম মনে হয় একটু একটু করে আখিকে ভালোবাসতে শুরু করেছিলো কিন্তু আখি দিন দিন চুপচাপ হয়ে যাচ্ছিলো। নাঈম অনেকবার জীঙ্গাসা করেছিলো তবে আখি কিছু বলে নি। এদিকে আখির অবস্থার অবনতি হওয়ার কারনে নাঈম জোর করে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলো তবে ততদিনে সময় শেষ। ক্যান্সারে আক্রান্ত আখি নিজের দেড় বছরের ছেলে আর সংসার ছেড়ে পাড়ি জমালো না ফেরার দেশে।
আখি মারা যাবার পর নাঈম আখির অনুপস্থিতিটা প্রতি মুহূর্তে অনুভব করতে পারছিলো। পরের ২ বছর ছিলো নাঈমের জীবনের সব থেকে চ্যালেন্জিং সময়। ছেলের দেখা-শোনা, নিজের গ্রাজুয়েশন, নতুন জব সব কিছু নিয়ে নাঈম অনেকটা কোনঠাসা হয়ে পড়েছিলো। বাসা থেকে অনেকবার বলেছিলো আবার বিয়ে করতে কিন্তু নাঈম রাজি হয় নি কিছুতেই। রাহাতের বয়স যখন চার হলো তখন কম্পানি থেকেই নাঈমকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো ইংল্যান্ডে। সেখানেই শুরু হলো বাবা ছেলের নতুন সংসার। ……
-আমি রেডী বাবা
নাঈম শুকনা মুখে তাকিয়ে দেখলো রাহাত শুধু টাওয়েল পেচিয়ে দাড়িয়ে আছে। এই হলো রেডীর নমুনা। মনে মনে গড কে যা খুশি তাই বলে রাহাত কে ড্রেস পরিয়ে, ব্রেকফাস্ট করিয়ে গাড়িতে ওঠালো। গাড়িতে উঠেই রাহাতের প্রশ্ন
-বাবা, আজ তুমি আমাকে কি কিনে দেবে??
-তুমি কি চাও
-উমমমমম চকলেট
-না, চকলেট না। দাত নষ্ট হবে।
-তাহলে আইসক্রিম
-না, ঠান্ডা লাগবে
-পিৎজা
-ওকে
রাহাত লাফ দিয়ে বাবাকে চুমু দিয়ে নিজের সিটে ফিরে এলো। নাঈম গাড়ি স্টার্ট করলো। আর দুই মিনিট দেরি হলে নিজের অফিস আর ছেলের ক্লাস দুইটাই মিস হবে। ছেলেকে স্কুলে নামিয়ে অফিসে পৌছাতে পুরো দশ মিনিট লেট। লিফটে ঢুকে নিজেকে ঠিকঠাক করে নিলো আর সাদাচামড়ার ওই খচ্চর বসের কাছে ঝাড়ি খাওয়ার জন্য প্রস্তুত নিচ্ছে। লিফটের দরজা খুলতেই রিসেপশানের মেয়েটা বললো
– মি. নাঈম, বস আপনাকে রুমে ডেকেছে।
-এখনই
-হ্যা এখনই
মনে মনে যা ভাবছিলো তাই হলো। ভয়ে ভয়ে বসের রুমের দরজায় নক করতেই ভেতর থেকে ঢুকতে বললো। দেরি করে আসার জন্য সরি বলার আগেই বসের মুখের ভুবন ভোলানো হাসি দেখে কিছুটা ভড়কে গেল নাঈম। কাহীনি কি তাহলে।
-আরে নাঈম, এসো এসো বসো, তোমাকেই খুজছিলাম সকাল থেকে।
-আসলে স্যার আপনি তো জানেন আমার ছেলের দেখাশোনা আমাকেই করতে হয়, তাই দেরি হয়ে গেল।
-ঠিক আছে। ঠিক আছে।
নাঈমের মনে হলো সে ভুল শুনছে। আজ হলো টা কি। বসের সুর যে পুরাই নতুন।
নাঈম বসতে বসতে বললো
-স্যার কিছু বলবেন??
– হ্যা হ্যা, বসো। বলছি
নাঈমের বস ফোনে কাকে যেন রুমে আসতে বললো। নাঈমের কেমন যেন অসস্তি লাগছে। বুঝতে পারছে না যে কি হচ্ছে।
কিছুহ্মন পর রুমে ২৪ কি২৫ বছর বয়সের একটা ছেলে ঢুকলো। ছেলটাকে দেখেই নাঈম বুঝতে পারলো স্বদেশী।
-নাঈম, এ হলো আমাদের নতুন এমপ্লয়ি। অর্ক। আর অর্ক এ হলো নাঈম আমাদের মার্কেটিং ম্যানেজার।
নাঈম আর অর্ক দুজন দুজনের সাথে পরিচিত হয়ে নিলো। বসের সাথে আলোচনা শেষ করে নাঈম বুঝতে পারলো অর্ক নাঈমের আন্ডারে কাজ করবে আর অর্ককে সব কিছু তাকেই বোঝাতে হবে। নিজের কাজই শেষ হয় না আবার উটকো ঝামেলা কাধে চাপলো। যাই হোক করার কিছু নেই। এসব ভাবতে ভাবতে নাঈম নিজের রুমে চলে এলো। ইন্টারকমে অর্ক কে ডেকে বললো রুমে আসতে।
– স্যার, আসবো
– হ্যা এসো। আর আমাকে স্যার বলার দরকার নেই। নাঈম ভাই বলে ডাকলেই হবে
-থ্যাংকস ভাই
– আচ্ছা কাজের কথা পরে বলি। তোমার সাথে তো আগে ভালোকরে পরিচিত হয়ে নেই। বাংলাদেশে কোথায় বাসা তোমার??
– খুলনা তে ভাইয়া। পড়াশুনাও করেছি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারপর আপনাদের কম্পানিতে জবটা পেয়ে গেলাম।
-এখানে কি রিলেটিভস আছে তোমার?
-না ভাইয়া।
-উঠেছো কোথায় তাহলে??
-আপাতত একটা হোটেলে আছি। ফ্লাট খুজছি, পেলেই উঠে পড়বো।
নাঈম মনে মনে ভাবলো, অর্ককে নিজের ফ্লাটে উঠালেও তো হয়, সাবলেট হিসাবে, দুইটা রুম তো এমনিতেই ফাকা থাকে।
কিছু ইনকামও হবে ।
– অর্ক তুমি চাইলে আমার সাথে ফ্লাট শেয়ার করতে পারো। আমি আর আমার ছয় বছরের একটা ছেলে থাকি বাসায়। আশা করি তোমার অসুবিধা হবে না।
-Thank you soo much…. এত সহজে যে থাকার জায়গা পেয়ে যাবো ভাবতেও পারি নি।
-তাহলে সেই কথায় রইলো। আজ অফিস শেষ করে আমার সঙ্গে গিয়ে ফ্লাট টা দেখে এসো। এখন এসো কাজ গুলো বুঝিয়ে দিচ্ছি ।

২.

রাহাতের ক্লাস শেষ হয়েছে অনেকক্ষণ, সবার বাবা-মা এসে সবাইকে নিয়ে যাচ্ছে আর রাহাত একা একা পার্কিং এর সামনে দাড়িয়ে আছে। এখনও বাবার দেখা নেই। এত দেরি তো আগে করে নি। মন খারাপ করে বসে পড়লো পাশের বেঞ্চ টাতে। রিহানের মা ওকে নিতে এলো, ডেভিডের বাবা এলো, জেনিফারও চলে গেল।
রাহাতের কান্না পাচ্ছে। চোখ থেকে দুফোটা পানিও গড়িয়ে পড়লো। চারপাশে ঝুরঝুর করে বরফ পড়ছে। চুপচাপ বসে আছে রাহাত।
নাঈমের কালো অডি টা থামলো গেটের সামনে। অনেকটা দৌড়াতে দৌড়াতে রাহাতের কাছে এলো। এসে দুহাতে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে নিজের দেরি হওয়ার জন্য সরি বলতে লাগলো। রাহাত বাবার বুকে মুখ লুকিয়ে কাদতে লাগলো। আর অর্ক দূরে দাড়িয়ে বাবা-ছেলের এই ভালোবাসা দেখে নিজের চোখের দুফোটা অশ্রু ফেলে নিজেকে সৌভাগ্যবান বলে মনে করতে লাগলো।
নাঈমের হাত ধরে ছোট্ট রাহাত হেটে আসছে গাড়ির দিকে। অর্কর চোখে দেখা সব থেকে সুন্দর দৃশ্য গুলোর ভেতরে এটা একটা জায়গা করে নিলো। কাছে এসে রাহাত অবাক চোখে একবার অর্ককে আর একবার নাঈমের দিকে তাকাচ্ছে। নাঈম ব্যাপারটা বুঝতে পারলো…
– রাহাত, ইনি হলেন তোমার নতুন আঙ্কেল। আঙ্কেলকে হাই বলো
রাহাত মুখটাকে হাসি হাসি করে অর্ককে বললো
-Hi Uncle…How are you. ??
-Fine…You are soo sweet…
-Thank you uncle…..
-welcome…
এই অল্প একটু আলাপেই রাহাতকে অর্ক পছন্দ করে ফেললো। এত কিউট বাচ্চা অর্ক আগে কখনও দেখেনি। হাটু গেড়ে অর্ক রাহাতের সামনে বসে বললো..
-if i hold you… Do you mind…??
রাহাত বাবার দিকে তাকাতেই নাঈম মাথা নেড়ে সায় দিলো।
রাহাত হাসিমুখে অর্কের গলা জড়িয়ে ধরলো। অর্কও রাহাতকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে নিলো। অন্য রকম একটা শান্তি লাগছিলো অর্কের কাছে। রাহাত অর্ককে ছেড়ে দিয়ে অর্কের গালে মিষ্টি একটা চুমু দিলো। অর্ক রাহাত কে এত সহজে আপন করে নিয়েছে এটা দেখে নাঈম মনে মনে খুশিই হলো।
গাড়িতে পেছনের সিটে রাহাত, আর সামনে নাঈম আর অর্ক। অফিসের বিষয়ে কথা বলতে বলতে অ্যাপার্টমেন্ট এর সামনে চলে এলো। নাঈম অর্কের হাতে বাসার চাবি দিয়ে বললো
-প্লিজ তুমি একটু রাহাতকে নিয়ে উপরে যাও। Floor 32… Flat C…আমি গাড়িটা পার্কিং এ রেখে আসি..
-oh..sure….
অর্ক রাহাত কে কোলে তুলে নিয়ে দুজনে গল্প করতে করতে লিফটের দিকে এগিয়ে গেল।
রুমের দরজা খুলেই বেশ অবাক হলো অর্ক। বাসার ভেতরের অবস্থা দেখে মনে হলো যেন বাসার ভেতরে টর্নেডো হইছে। লিভিং রুমের মাঝখানে একগাদা কাপড় রাখা। সেন্টার টেবিলের উপর পপকর্নের প্যাকেট, বিয়ারের বোতল। একটু ভেতরে ঢুকতেই কিচেনটা সামনে পড়লো। এখানের অবস্থা আরো খারাপ, সিংকের ভেতরে নোংরা প্লেট, ফ্রাইপ্যানে সবজী ভাজি, এমনকি ফ্রিজের ডোরটা পর্যন্ত খোলা। ভয়ে ভয়ে বেডরুমের দিকে আগানোর আগেই নাঈম চলে এলো। অর্কের মুখ দেখেই বুঝতে পারলো নাঈম….
-আসলে আমি সারাদিন অফিসে থাকি, রাহাত ও সারাদিন স্কুলে থাকে তাই বাসার এই অবস্থা।
-তাই বলে এই অবস্থা।
-আসলে রাহাতের আম্মু বেচে থাকলে হয়তো এটা হতো না। একা আমি আর কতদিক সামলাবো
অর্ক জানতো না যে রাহাতের মা বেচে নেই। মনে মনে নিজেকে অপরাধী ভাবতে লাগলো সে
-I am extremely sorry…..
– its ok…আর তুমি তো জানতে না। তুমি এখানে শিফট হওয়ার আগেই আমি একটা হাউসকিপার খুজে নেব। তোমার কোন প্রবলেম হবে না তখন।
রাহাতকে নিজের রুমে যেতে বলে নাঈম অর্ককে ওর রুম দেখাতে লাগলো। রুমটা অর্কের বেশ পছন্দ হয়েছে। একপাশে বিশাল জানালা, ওয়াশরুমটাও বেশ বড়। নাঈমকে সে জানালো যে রুমটা তার পছন্দ হয়েছে। তারপর জানতে চাইলো যে কবে উঠতে পারবে সে…
-তুমি চাইলে আজই উঠতে পারো।
-আচ্ছা ঠিক আছে। কালতো সানডে, ছুটির দিন, অফিস নেই। আমি তাহলে কাল আমার সব কিছু নিয়ে আসি।
-ok..no problem…
-আজ তাহলে আসি। রাহাত কোথায়…
-ও রুমে, ডাকছি দাড়াও
নাঈমের ডাকে রাহাত বের হয়ে এলো।
– আঙ্কেল তুমি চলে যাবে কেন,,??
-এখন আসি, কাল সকালে আবার চলে আসবো।
-আচ্ছা ঠিক আছে।
-Bye..
রাহাত ও bye বলে রুমে চলে গেল।

অর্ক নাঈমের থেকে বিদায় নিয়ে সোজা হোটেলে চলে এলো। মাথা থেকে ঘর খোজার ঝামেলাটা অন্তত নামলো। তবে ঘরের থেকে ঘরের মানুষ দুটোকে বেশি পছন্দ হয়েছে অর্কের। বিশেষ করে রাহাতের মত পিচ্চিদের এমনি তেই অর্কের অনেক পছন্দ। মনে মনে ভাবলো সময় টা ওখানে খারাপ কাটবে না তাহলে। তবে বাসাটাকে কাল গোছাতে হবে। দুই বাবা ছেলে বাসার যে অবস্থা করে রেখেছে সেটা মানুষের থাকার উপযোগী না।
রাতের ভেতরে নিজের সব কিছু ব্যাগে গুছিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো অর্ক।

৩.

ডোর বেলের শব্দে ঘুম ভাঙলো নাঈমের। ঘুম জড়ানো চোখে দরজা খুলতেই দেখলো অর্ক দাড়িয়ে ….
-Good morning
-Good morning
– বেশি সকাল সকাল চলে এলাম মনে হচ্ছে।
নাঈম ঘুম জড়ানো গলায় বললো
– তা একটু মনে হচ্ছে।
অর্কের হাতে বাসার চাবি ধরিয়ে দিয়ে, আবারও ঘুমাতে গেল নাঈম।
অর্কের বেশ অবাক লাগলো। লোকটা বাইরে একরকম আর ভেতরে অন্য রকম। যাই হোক অর্ক নিজের রুমটা গুছিয়ে ফেললো কিছুহ্মনের ভেতরে। এবার গেল পুরো বাসাটা গুছাতে। প্রথমে লিভিং রুম থেকে সব কাপড় গুছিয়ে কেবিনেটে ঢুকিয়ে রাখলো। তারপর কিচেনের সব প্লেট আর বাকি সব কিছু পরিষ্কার করে ভ্যাকুয়াম ক্লিনারটা হাতে নিয়ে ফ্লোরের সব কিছু সাফ করতে লাগলো।
ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের শব্দে রাহাত আর নাঈম দুজনেই রুম থেকে বেরিয়ে আসলো। রুমের বাইরে এসে দুজনেই অবাক। পুরো বাসার চেহারা পাল্টে গেছে। কিচেনটা ঝকঝক করছে, লিভিংরুমে একফোটা ময়লা নেই। ফ্রিজের উপরের স্টিকার গুলো উধাও। কাপড়ের পাহাড়টাও নজরে পড়লো না। কে করলো এত কাজ। নাঈম এসব ভাবতে ভাবতেই অর্কে দেখতে পেলো কিচেন কেবিনেটের নিচে। নাঈম এগিয়ে গেল সেদিকে। পিছু পিছু রাহাত ও গেল…. অর্কের পেছনে দাড়িয়ে নাঈম অবাক হয়ে জীঙ্গাসা করলো
-আরে, তুমি এগুলো কি করছো…
-কেন, বাসা পরিষ্কার করছি।
-হ্যা, সেটা তো দেখতেই পারছি, তবে তুমি কেন এসব করছো।
-বাসাটা যে অবস্থায় ছিলো তাতে আমার কাছে কেমন যেন লাগছিলো তাই আর কি।
-আচ্ছা অনেক হয়েছে, এবার এটার নিচ থেকে বের হও।
অর্ক বের হতে গিয়ে বুঝতে পারলো সে আটকে গেছে। চেষ্টা করে যখন পারলো না তখন বাধ্য হয়ে নাঈম কে ডাকলো
-Excuse me….Can anyone help me please…I an stuck here..
নাঈম হাসতে হাসতে এগিয়ে এলো। তারপর অর্কের কোমরের কাছে হাত রেখে জোড়ে টানতে লাগলো। কোমড়ে হাত পড়তেই অর্ক হো হো করে হেসে দিলো। অর্কের সারা গায়ে সুড়সুড়ি। অবশেষে অনেক কষ্টে নাঈম অর্ক কে বের করলো। অর্ক উঠে দাড়াতেই নাঈম আর রাহাত দুজনেই হাসতে লাগলো।
-কি হলো, তোমরা হাসছো কেন??
-বাসা তো ক্লিন করেছো তবে নিজের অবস্থা কি হয়েছে আয়নার সামনে দাড়িয়ে দেখে এসো।
অর্ক রুমে এসে আয়নার সামনে দাড়াতেই ভুত দেখার মত চমকে উঠলো। পুরো মুখে ময়লাতে নিজের চেহারাই বদলে গেছে। ঘড়ির দিকে তাকাতেই দেখলো লাঞ্চ টাইম হয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি শাওয়ার শেষ করে বাইরে বের হতেই দেখলো রাহাত চুপচাপ জানালার সামনে দাড়িয়ে আছে অর্কের রুমে। অর্ক বেশ অবাক হলো…
-কি ব্যাপার রাহাত। কিছু বলবে??
-বাবা, লাঞ্চের জন্য ডাকছে।
-ওহ আচ্ছা, তোমরা বসো আমি আসছি….
এভাবেই কেটে যাচ্ছে রাহাত, অর্ক আর নাঈমের সময়। রাহাতের এখন আর একা একা ভিডিও গেমস খেলতে হয় না, নতুন আঙ্কেল সব সময় রাহাতকে নিজের কাছে রাখে। প্রতি উইকেন্ডে রাহাতকে নিয়ে বাইরে ঘুরতে যায়। স্কুল শেষে এখন আর রাহাতকে বসে থাকতে হয় না, আগেই অর্ক এসে দাড়িয়ে থাকে। এখন বেশিরভাগ সময় অর্কের সাথেই কাটায় রাহাত।
নাইমের সাথে অর্কের সম্পর্কটা আপনি থেকে তুমিকে নেমেছে।
আর নাঈমকে এখন আগের মত সারাদিন টেনশানে থাকতে হয় না। অর্ক আসার পর থেকে ওই অনেকটা বটের মত নাঈম আর রাহাতকে আগলে রেখেছে। প্রতিদিন সকালে নাঈম রাহাতকে স্কুলে দিয়ে আসে আর বিকালে অর্ক অফিস থেকে ফেরার পথে রাহাতকে নিয়ে যায়। এদিকে অর্ক আস্তে আস্তে নাঈম কে ভালোবাসতে শুরু করেছে তবে ভয়ে বলতে পারছে যদি নাঈম ওকে বাসা থেকে বের করে দেয়। এর থেকে যেভাবে আছে সেটাই বা কম কিসের। কেটে গেল সাতটা মাস।

৪.

আজ অফিসে অনেক কাজ। নাঈম কে আজ অফিস শেষে দুইটা মিটিং এ জয়েন করে তারপর আরো একটা ক্লায়েন্টের সাথে দেখা করতে হবে। এদিকে শরীরটাও ভালো লাগছে না। অর্ক কে রুমে ডাকলো…
-একটু আমার কেবিনে আসো তো
-আসছি
কিছুহ্মনের ভেতরেই অর্ক হাজির
-কি বলবে বলো
-আজ অনেক গুলো কাজ আছে… তুমি রাহাতকে নিয়ে ডিনার করে ঘুমিয়ে পড়ো। আমার জন্য ওয়েট করার দরকার নেই।
-ঠিক আছে। কিন্তু বাসায় ফিরবে তো?
-ঠিক বলতে পারছি না।
-আচ্ছা। চেষ্টা করো বাসায় ফেরার…
-ঠিক আছে।
অর্ক রাহাতকে নিয়ে বাসায় ফিরলো। হাতের কিছু কাজ শেষ করে রাহাত কে নিয়ে বাইরে ঘুরতে গেল। ডিনারের আগে অর্ককে ফোন করলো কিন্তু সুইচড অফ। কি আর করবে রাহাতকে নিয়ে ডিনার শেষ করে রাহাতকে নিয়ে নিজের রুমে ঘুমুতে গেল। কিছুহ্মনের মাঝে রাহাত ঘুমিয়ে পড়লো। রাহাতকে নিজের কাছেই নিয়ে ঘুম হীন চোখে শুয়ে রইলো অর্ক।
অবশেষে রাত দেড়টার দিকে ইন্টারকমটা বেজে উঠলো। অর্ক রিসিভ করতেই নিচ থেকে কেয়ারটেকার টা তাড়াতাড়ি নিচে নামতে বললো। অর্ক বুঝতে পারলো নিশ্চয় কোনো ঝামেলা হয়েছে। নিচে নামতেই দেখলো নাঈমকে দুটো লোক ধরে রেখেছে। দেখে মনে হচ্ছে সেন্স নেই। অর্ক তাড়াতাড়ি নাঈমকে ধরলো। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে নাঈমের। কোন রকমে নাঈমকে রুমে এনে গা থেকে কাপড় গুলো খুলে বিছিনায় শুইয়ে দিলো। গায়ে জ্বর তার উপর আবার ড্রিংকস করেছে। নাঈম আবোলতাবল বকতে শুরু করেছে।

অর্ক টাওয়েলটা ভিজিয়ে নাঈমের পুরো গা মুছে দিতে লাগলো। ঘন্টা খানেক পর নাঈমের জ্বরটা কমে এলো। অলরেডী রাত তিনটা বেজে গেছে। অর্কের আর একটুও এনার্জী নেই। অর্ক নাঈমের বুক পর্যন্ত কম্বলটা টেনে দিয়ে বের হওয়ার জন্য ঘুরে দাড়াতেই নাঈম অর্ককে ডাকলো।
– অর্ক?? চলে যাচ্ছো?
– হ্যা, তোমার কিছু লাগবে?
-আমার পাশে একটু বসো
অর্ক নাঈমের মুখমুখি বসলো।
নাঈম অর্কের হাতটা ধরে, সোজাসুজি অর্কের চোখের দিকে তাকিয়ে বললো
– আমি অনেক একা, আমার ছেলেটাও অনেক একা। থাকবে না আমাদের পাশে।
নাঈমের কথাটা শুনে অর্ক আর নিজেকে বেধে রাখতে পারলো না। কিছুহ্মন একভাবে দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে রইলো। কখন যে দুজনের ঠোট এক হয়ে গেল সেটা কারও খেয়ালে রইলো না। অর্ক যেমন এতদিনের চেপে রাখা ভালোবাসাকে নিজের করে পেলো তেমনই নাঈমের এই ভালোবাসাহীন সঙ্গীহীন জীবনে নতুন করে কাউকে পেল। অর্ক নাঈমের কপালে আলতো কর চুমু দিয়ে বললো
-তুমি ঘুমাও। রাহাত একা একা ঘুমাচ্ছে। আমি এখন যাই। সকালে আবার অফিস আছে।
নাঈম হালকা হেসে অর্কের হাতে চুমু দিলো। ….

৫.

নাঈমের সকালে ঘুম ভাঙলো এগারোটার দিকে। ফ্রেশ হওয়ার জন্য বেসিনের সামনে দাড়াতেই দেখলো অর্কের লেখা চিরকুট।

” টেবিলে ব্রেকফাস্ট রেডী করা আছে। হিটারে লিকারও করা আছে। কষ্ট করে একটু গরম করে খেয়ে নিও। আর দয়া করে আজ অফিসে এসো না। রেস্ট নাও “
ফ্রেশ হয়ে নাস্তাটা শেষ করলো। আজ অনেক দিন পর আখির কথা মনে পড়লো নাঈমের। আজ আখি থাকলেও নিশ্চয় এটাই করতো। তারপর নিজের এখনকার জীবনের সাথে সাত মাস আগের জীবনকে তুলনা করলেই বোঝা যায় কতটা চেন্জ এসেছে নিজের মাঝে। নাঈম এখন অনেকটা অর্কের উপর নির্ভর করে। সব কিছুতে অর্কের পরামর্শ নেয়।
অর্ক যে গে আর নাঈমকে পছন্দ করতো সেটা নাঈম আগেই বুঝতে পেরেছিলো কিন্তু লোকলজ্জার কারনে কিছু না বলে এড়িয়ে গিয়েছিলো কিন্তু সত্যিকারের ভালোবাসা নাকি উপেহ্মা করা যায় না সেটা বুঝতে পেরেছে নাঈম।
নিজের জীবনটাকে নতুন করে সাজানোর জন্য প্রস্তুতি নিতে লাগলো নাঈম। রাহাত ও এখন অর্ককে ছাড়া কিছুই বোঝে না আর অর্ক তো নাঈম আর রাহাত বলতে পাগল।
সামনে অর্কের জন্মদিন। নাঈম আর রাহাত দুজনে মিলে অনেক প্লান করে রেখেছে। জন্ম দিনের দিনই অর্ককে বড় একটা সারপ্রাইজ দেবে নাঈম। দেখতে দেখতে চলে এলো অর্কের জন্ম দিন। পার্টির শেষে অর্কের ফোনে একটা কল এলো দেশ থেকে। অর্ক কথা বলতে বলতে ছাদের দিকে গেল। এই সুযোগে রাহাতকে পাঠালো ছাদে। পিছু পিছু নাঈমও এলো। অর্ক ছাদের রেলিং ধরে দাড়িয়ে আছে। রাহাত ডাকলো…..

-আঙ্কেল?
-অর্ক অনেকটা চমকে গিয়ে ঘুরে দাড়ালো। রাহাত কে দেখে বললো
-বলো
-একটা জিনিস চাইবো, দেবে?
-হুমম বলো, কি লাগবে?
-দিতেই হবে কিন্তু
-আচ্ছা বাবা বলো
-তুমি আমার বাবা হবে??
রাহাতের মুখে এটা শুনে অর্ক কয়েকসেকেন্ডেরর জন্য নড়তে পারলো না। কোন উত্তর না দিয়ে অর্ক রাহাতকে জড়িয়ে ধরে কেদে উঠলো হুহু করে। রাহাত কিছু না বুঝে অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো নাঈমের দিকে। নাঈম বুঝতে পারলো কিছু একটা হয়েছে। অর্কের কাধে হাত রেখে বললো
-কি হয়েছে..
-বাসা থেকে মা কল করেছে, বাবা নাকি খুবই অসুস্থ। আমাকে দেখতে চাচ্ছে বারবার।
-ওহ গড। ওকে তুমি টেনশান নিও না। আমি যাবার ব্যাস্ততা করছি। আর আমি আর রাহাত ও তোমার সাথে যাবো।
-প্লিজ যা করবে তাড়াতাড়ি করো।
নাঈম নিচে নেমে গেল। রাহাত এখনও অর্ককে জড়িয়ে ধরে রেখেছে । ছোট্ট হাত দুটি দিয়ে অর্কের চোখ মুছে দিলো রাহাত।
-আঙ্কেল। তুমি কাদছো কেন,?
-বাবাকে কেউ আঙ্কেল বলে ডাকে নাকি পাগল ছেলে।
-সত্যি তুমি আমার বাবা হবে!!!
-হ্যা, এখন থেকে আমি তোমার ছোট আব্বু। আমাকে ছোট বাবা বলে ডাকবে
-ঠিক আছে।
– চল নিচে যাই।
-আচ্ছা ছোট বাবা তুমি কাকে বেশি ভালোবাসো আমাকে নাকি বড় পাপাকে?
– কঠিন প্রশ্ন। পরে উত্তরটা দেই।
-না এখনই বলো
-দুজনকেই সমান সমান।

রাহাত অর্কের কপালে চুমু দিয়ে বললো আমিও তোমাদেরকে সমান সমান ভালোবাসি। অর্কও রাহাতের দুইগালে চুমু দিয়ে নিচে নেমে এলো।
অনেক দৌড়াদৌড়ি করে নাঈম টিকিট ম্যানেজ করলো, সাথে বসের সাথে কথা বলে এক সপ্তাহের ছুটি নিয়ে নিলো । পরের দিনই ফ্লাইট। সব কিছু গোছাতে গোছাতে সময় শেষ। অবশেষে প্রায় ১৭ ঘন্টার জার্নি শেষ করে সন্ধ্যার সময় দেশে পৌছালো ওরা। ঢাকা থেকে খুলনা পৌছাতে আরো আট ঘন্টার বাস জার্নি করতে হলো। ভোরে অর্কের বাসায় এসে পৌছালো। বাড়িটা অনেকটা পুরোনো জমিদার বাড়ির মত। উচু লোহার গেট পেরোতেই যেন বাড়িতে লোকজনের আনাগোনা বেড়ে গেল। রাহাত অর্কের কাধে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে তখনও। অর্কের মা ভেতর থেকে দৌড়ে বের হলো। অর্কের কাছ থেকে রাহাতকে নিজের কোলে তুল নিলো। নাঈম অর্কের মাকে পা ছুয়ে সালাম করলো।
তারপর অর্কের মা অর্ক আর নাঈমকে নিয়ে গেল অর্কের বাবার রুমে। পৌঢ় লোকটা বিছানার পাশে হেলান দিয়ে বসে আছে। অর্ক এগিয়ে গিয়ে জীঙ্গাসা করলো
-কেমন আছো বাবা?
-তোকে দেখার পর এখন ভালো লাগছে।
-এত করে বলি যে নিজের খেয়াল রাখবা। কে শোনে কার কথা।
-তুইও তো আমার কোন কথা শুনিস না।
-কে বলেছে আমি তোমার কথা শুনি না, তুমি যা বলো আমি তো তাই করি।
-তাহলে বাবা একটা কথা বলি, বাবা হিসাবে তোর কাছে আমার শেষ চাওয়া। আমি তোর বিয়ের জন্য মেয়ে দেখেছি। পাকা কথাও দিয়ে এসেছি। এখন তুই দেশে। এবার বিয়েটা করে ফেল।
এটুকু শুনেই অর্কের পায়ের নিচের মাটি সরে গেল। এটা কি করেছে বাবা। অর্কের পহ্মে কখনই কোন মেয়েকে বিয়ে করা সম্ভব না। নাঈমের দিকে তাকাতেই নাঈম মুখ ফিরিয়ে অন্য দিকে তাকালো। এখন কি করবে অর্ক।
-বাবা তুমি তো আমাকে আগে কিছু বলনি। আর আমাকে কিছু না জানিয়ে তুমি সব কিছু ঠিক করে ফেলেছো কেন??
-এত কিছু বুঝি না। আগেই বলেছি এটা তোর কাছে আমার শেষ চাওয়া। তবে তোর যদি কোন পছন্দের মেয়ে থাকে তাহলে বলতে পারিস। এখন যা। তোকে ভাবার জন্য দুই দিন সময় দিলাম।
নাঈম আগেই ওই ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। তার মানে অর্ককে বিয়ে দেওয়ার জন্য দেশে আনা হয়েছে। মনে মনে নিজেকে এই বলে সান্তনা দিতে লাগলো যে আসলে ভালোবাসা বলে কিছু ওর কপালে নেই। পেছনে পায়ের শব্দ কানে আসতেই ঘুরে দেখলো অর্ক মাথা নিচু করে এদিকেই আসছে। নাঈমের সামনে এসে বলল…
-এখন আমি কি করবো??
-তুমি যথেষ্ট ম্যাচুয়ার্ড। তোমার কাছে যেটা ভালো মনে হয় সেটাই করো…
কথাগুলো অনেকটা রাগের স্বরে বলল নাঈম। যেটা অর্কের কাছে মোটেও ভালো লাগলো না
-তুমি এভাবে বলছো কেন?, আমি তোমাকে ভালোবাসি, রাহাতকে ছাড়া আমার একটা দিনও চলে না। আমি এ বিয়ে করতে পারবো না।
-এসব কথা আমাকে বলছো কেন??
-তো কাকে বলবো??
-তোমার যাকে খুশি তাকে বলো। আর শোনো আমি এখানে থাকতে পারবো না। আমি রাহাতকে নিয়ে ঢাকায় গিয়ে থাকবো। তোমার জন্য অপেক্ষা করবো। যদি তুমি আমাদের সাথে ফিরতে চাও তাহলে ফ্লাইটের টাইমে চলে এসো।
এটুকু বলেই নাঈম পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই অর্ক নাঈমের হাতটা চেপে ধরলো।
-কোথায় যাচ্ছ তুমি?
-বললাম তো ঢাকায় যাবো
-তুমি মাত্র দুই ঘন্টা আগে এখানে এসেছো আর এখনই যদি ফিরে যাও তাহলে বাড়ির সবার কাছে আমি কি বলবো। আর তুমি কি মনে করো যে রাহাত আমাকে ছাড়া এক মুহূর্ত থাকবে। সব থেকে বড় কথা আমি তোমাকে ভালোবাসি, তাই এই সিচুয়েশানে তোমাকে আমার দরকার।
-ভালোবাসো বলেই তো আমাকে কিছু না বলেই বিয়ে করতে নাচতে নাচতে চলে এসেছো।
-তুমি নিজের কানে সব শোনার পরও এটা বলতে পারলে!!!
-যেটা সত্যি সেটাই বলেছি। তুমি যেমন আমাকে ঠকালে তেমনি রাহাতকেও কষ্ট দিলে।
-প্লিজ নাঈম, ফর গড সেক তুমি থামো। তোমার মুখে এসব শোনার আগে আমার মরে যাওয়া উচিত ছিলো।
– ন্যাকামো কোরো না তো। হাত ছাড়ো
নিজের কানকে অর্ক বিশ্বাস করতে পারলো না। হতবাক হয়ে নাঈমের হাত ছেড়ে পাথরের মূর্তির মত দাড়িয়ে রইলো। নাঈম হনহন করে সামনে থেকে চলে গেল।

৬.

নাঈম অনেক চিন্তাভাবনা করে দেখলো এখন চলে গেলে অর্ককে অনেক কথা শুনতে হবে। আর অর্ক ছাড়া এখন রাহাতকে সামলানোও কঠিন হবে। সকালে অর্কের সাথে ওভাবে কথা বলাও উচিত হয় নি। কিন্তু কি করবে নাঈম, এমন একটা পরিস্থিতি এখানে যেটা না পারছে উপেহ্মা করতে আর না পারছে সহ্য করতে। সকালের পর অর্ক একবারও নাঈমের সামনে আসে নি। রাহাতের ঘুম ভাঙার পর সেই যে নিয়ে গেল আর দেখা নেই।
দুপুরের খাবারের সময় সবাই একসাথে ডাইনিং এ বসেছে। অর্কের বাবা নাঈমের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে গল্প করছে। ঠিক উল্টা পাশে অর্ক রাহাতকে খাইয়ে দিচ্ছে। অর্কের মা প্রথম থেকেই খেয়াল করেছে যে নাঈমের ছেলেটা সবসময় অর্কের কাছেই থাকে। বাচ্চাটা নিজের বাবার ধারও ধারে না। এমনকি অর্ককে ছোটবাবা বলে ডাকে। আস্তে করে ছেলেকে প্রশ্ন করলো…
-হ্যারে, রাহাত কি তোর কাছেই থাকে??
-হু…বাসায় যতক্ষণ থাকি ততহ্মন আমার কাছেই থাকে।
-ও আচ্ছা। আর তোকে ছোটবাবা বলে ডাকে কেন??
-মা, রাহাত মাত্র ছয় বছরের একটা বাচ্চা। ও আমাকে পছন্দ করে তাই ডাকে।
-না মানে, ছেলেটা তো ওর নিজের বাবার থেকে তোর কাছেই বেশি থাকে তাই বললাম আরকি।
-ঠিক আছে।
খাওয়া শেষ করে অর্ক রাহাত কে নিয়ে নিজের রুমে চলে গেল। নাঈম আরো কিছুহ্মন গল্প করে অর্কের বাবার সাথে বাজারের দিকে গেল। অর্ক ভেতরে ভেতরে প্রচন্ড রেগে আছে। অর্ক সব কিছু সহ্য করতে পারে কিন্তু নাঈমের উপেহ্মা সহ্য করতে পারে না।
তাড়াতাড়ি ডিনার শেষ করে রাহাত কে ঘুম পাড়িয়ে নিজেও ঘুমিয়ে পড়লো অর্ক। মাঝ রাতের দিকে মনে হলো পাশে কে যেন বসে আছে। ঘুরতেই বুঝতে পারলো নাঈম… সারাদিনের রাগ এবার মাথায় চেপে বসলো অর্কের। সাপের মত হিস হিস করে বললো
-কি আবার নতুন করে আমার ন্যাকামো দেখতে আসছো
-রাগছো কেন? সিচুয়েশানটা বোঝার চেষ্টা করো
-ওহ রিয়েলি, নিজেও একটু ট্রাই করো
-প্লিজ, রাগ কোরো না। আই অ্যাম সরি। আসলে আমার উচিত হয় নি সকালে তোমার সাথে ওভাবে বিহেভ করা।
অর্কের সব রাগ মিলিয়ে গেল। নাঈমের কথাতে না, নাঈমের চোখে পানি দেখে
-আরে আরে পাগল, তুমি কাদছো কেন?
নাঈম অর্ককে জড়িয়ে ধরে কাদতে লাগলো। নাঈমকে এর আগে কোনদিনও কাদতে দেখে নি অর্ক। নাঈমে নিজের বুকে চেপে ধরে রাখলো অর্ক।

অর্ক ভালোভাবেই বুঝতে পারছে যে এই ভালোবাসাকে উপেহ্মা করার মত হ্মমতা তার নেই। মনে মনে নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো। সকালেই বাবাকে বলবে সব কিছু। তারপর যা হবার হবে।
ঘুম ভাঙলো অনেক ভোরে। নাঈম অর্ককে এখনও জড়িয়ে ধরেই ঘুমাচ্ছে। হালকা ঠান্ডা লাগলেও নাঈমের উষ্ণ স্পর্শটা খুবই ভালো লাগছিলো অর্কের। নাঈমের ঠোটে হালকা করে চুমু দিয়ে বেড থেকে নেমে মায়ের রুমের দিকে গেল।
মায়ের রুমে ঢুকতেই দেখলো অর্কের মা জায়নামাজে বসে তাজবীহ পড়ছে। অর্ক ছোটবেলার মত সোজা মায়ের কোলে মাথা রেখে ফ্লোরে শুয়ে পড়লো। অর্কের মা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে কপালে একটা চুমু দিলো…
-এত সকালে ঘুম ভেঙে গেল যে তোর
-হুমম…
-কিছু বলবি বাবা?
-হ্যা মা বলবো তবে কি ভাবে বলবো সেটা বুঝতে পারছি না।
-বলে ফেল। আমি তো তোর মা। মায়ের কাছে সংকোচ কিসের।
-মা আমি বিয়ে করতে পারবো না।
-সেটা আমি কালই বুঝেছি। কিন্তু কারনটা ঠিক এখন ধরতে পারি নি।
-মা আমি নাঈমকে ভালোবাসি
অর্ক মায়ের দিকে তাকিয়ে ছিলো অন্য রকম কিছু দেখার জন্য তবে মায়ের মুখের কোন পরিবর্তন হলো না দেখে অবাক হলো
কিছুহ্মন দুজনেই চুপ। তারপর অর্কের মা বলল
-দেখ বাবা, আমাদের এই সমাজে চলতে হয়, বিভিন্ন লোকেদের সাথে মিশতে হয়। এই সমাজের চোখে যেটা অন্যায়, পাপ সেটা আমাদেরকেও ওভাবেই দেখতে হয়। আমি এই দুই দিনেই বুঝেছি যে তোদের তিনজনের মাঝে অন্যরকম একটা সম্পর্ক আছে।
-মা আমি যেমন তোমাকে আর বাবাকে ছাড়া থাকতে পারবো না, তেমনই রাহাত আর নাঈমকে ছাড়াও থাকতে পারবো না। তুমি তো দেখছই যে রাহাত আমাকে ওর নিজের বাবার থেকেও বেশি ভালোবাসে। আর নাঈমের কথা আমি নিজ মুখে কিছু বলবো না।
-কিন্তু তোর বাবা যদি জানতে পারে তখন কিন্তু বড় ঝামেলা হবে।
-মা,, আমি যদি নিজে সুখি না থাকি তবে কি তোমরা সুখি থাকবে?
– আমার কোন আপত্তি নেই, ছোট থেকেই তুই যা চেয়েছিস আমি তাই তোকে দিয়েছি। আজও দিচ্ছি। তবে একটা শর্ত আছে। তুই কথা দে যে তুই এই শর্তটা সারাজীবন মেনে চলবি।
-আচ্ছা মা, কথা দিলাম মেনে চলবো। বলো কি শর্ত
-তুই আর কোন দিন দেশে ফিরবি না।
-এটা তুমি কি বললে মা?? এটা কি করে সম্ভব।
-তোকে এটা করতে হবে কারন তুই কথা দিয়েছিস…নাঈম আর রাহাতের সাথে থাকার জন্য এটা সব থেকে ভালো সিদ্ধান্ত বলে আমার মনে হয়। কারন এটা জানার পর তোর বাবা তোকে মেরে ফেলতেও দ্বিধা করবে না। জানি কষ্ট হবে তবে তুই পারবি।
অর্ক কিছুহ্মন স্তব্ধ হয়ে গেল। অবশেষে মায়ের কথাই মেনে নিলো।

৭.

আজ নাঈম, রাহাত আর অর্ক লন্ডন ফিরে যাবে। বাড়ি থেকে বের হবার আগে সবার থেকে বিদায় নিলো ওরা। বিয়েটা ভেঙে যাওয়াতে পুরো বাড়িটা চুপচাপ। অর্কের বাবা ঘর থেকেই বের হন নি। মায়ের থেকে বিদায় নেবার সময় অর্ক হু হু করে কেদে ফেললো, কারন এই মানুষটার সাথে আর কোন দিন দেখা হবে না। রাহাতকে কোলে নিয়ে কিছুহ্মন বুকের সাথে জড়িয়ে রাখলো অর্কের মা। সব শেষে নাঈমকে বলল ” সব কিছু তোমার হাতে। ভুলে যেও না যাকে নিয়ে যাচ্ছ সে কিন্তু সব কিছু ফেলে তোমার পেছনে যাচ্ছে “
নাঈম মুখে কিছু বলে নি। শুধু অর্কের মায়ের হাতটা কাছে টেনে নিজের মুখের সাথে কিছুহ্মন চেপে ধরে রেখেছিলো।
সব শেষে ঘুরে দাড়ালো তিনটা মানুষ। ছুটে চললো আপন গন্তব্যের দিকে। যেখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে ” ত্রিলোক” এর সংসার।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.