হৃদিতা

লিখেছেনঃ হোসেন মাহমুদ

উৎসর্গ: সুলেখক সমমাত্রিক প্রেমকে। যার বিয়ের স্ট্যাটাসে দম আটকে যাওয়ার মত অবস্থা হয়েছিল।

-ইমতিহান আপনি পুরুষের দেহ নিয়ে পদার্থের মত স্থান দখল করে থাকলেও আপনি যে পুরুষত্বহীন একজন মানুষ সেইটা বিশ্বাস করেন?
-অবজেকশন ইয়ুরঅনার, উকিল সাহেব বোধহয় জানেন না যে পুরুষের সান্নিধ্যে নারী গর্ভবতী হয় এবং তার এগারো বছরের সন্তান এই বিচারালয়ে বর্তমান থাকে, তাকে পুরুষত্বহীন বলা মানে নিজেকে মস্ত উন্মাদ প্রমাণ করা সমান কথা।
-ইয়ুরঅনার, তরল পদার্থের মিশ্রণ ঘটিয়ে টেস্ট টিউব আর বিজ্ঞানের কল্যাণে আজকাল অনেক নিঃসন্তান জননীও গর্ভবতী হয়, কিন্তু সেই সন্তান জানেনা তার পৈতৃক ডি,এন,এ’র আসল মালিক মানে তার বাবা কে? তেমনি বিবাহিত দম্পতির সন্তান হলেই যে পিতার পুরুষত্বের সার্টিফিকেট মিলে যায় তা ভাবাও বোকামি।
-এই সন্তান যদি মিঃ ইমতিহানের পুরুষত্ব প্রমাণের দলিল না হয়ে থাকে তাহলে এই মামালার বাদী রীতা অ্যাই,মিন ইমতিহানের স্ত্রীর চারিত্রিক সনদ নিয়ে আমি সন্দিহান!
-অবজেকশন ইয়ুরঅনার, একজন সম্ভ্রান্ত পরিবারের নারীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলার মত কুৎসিত মানসিকতার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
-কিছুক্ষণ আগে আপনি একজন পুরুষ হয়ে অন্য পুরুষের চরিত্র ঘেঁটে রোঁদে বিছিয়ে দিয়েছিলেন তখন কেন এই মানসিকতার গোঁড়ায় শালীনতার পানি ঢালার প্রয়োজন অনুভব করেননি?

ইমতিহানের উকিল রীতার চরিত্র শ্রাদ্ধ করার উদ্দেশ্য আরও কিছু বলার আগেই ইমতিহান কাঠগড়া থেকে গলা ছেড়ে তার উকিলের উদ্দেশ্য বলে, রীতার চরিত্র নিয়ে আমার কোন সন্দেহ বা প্রশ্নবোধক কোন কালেও ছিল না আর এখনো নেই উকিল সাহেব। তাই দয়া করে মুল বিষয় ছেড়ে চরিত্র ঘাটাঘাটি বন্ধ করুন”

ইমতিহানের কথা শুনে নেতানো চোখে কৃতজ্ঞতা জানায় বিচার কক্ষে সাধারণ মানুষের সাথে বসে থাকা রীতা। ইমতিহানও চোখের পলক ফেলে স্ত্রীর কৃতজ্ঞতা গ্রহণ করে। তার এই চোখের পলকের গভীরতা রীতার ভীষণ চেনা। রীতা জানে ইমতিহানের বুক এখন ধড়পড় করছে। দুই উকিলের জেরায় ইমতিহান প্রায় নাজেহাল। এই রকম পরিস্থিতিতে পড়লে তার কপালে বিন্দু-বিন্দু ঘাম জমে। গত এক যুগ সংসার জীবনে ইমতিহানকে এই পরিস্থিতিতে পড়া অবস্থায় বহুবার দেখেছে সে। শ্বশুর দিকের কোন আত্মীয় বাড়ীতে বেড়াতে গিয়ে অপরিচিত মেয়েদের চ্যটাং-চ্যটাং প্রশ্নে ইমতিহান বেশী নার্ভাস হয়ে যেত। তখন রীতা এগিয়ে এসে ইমতিহানকে উদ্ধার করত। এই যুগের আধুনিক বউ হয়েও নিজের কাপড়ের আঁচল দিয়ে ঘাম মুছে দিত। ইমতিহান তখন ‘থাক না পকেটে রুমাল আছে’তো’ বলে পকেট হাতড়িয়ে মুখে আক্কেলসেলামি দেয়ার মত শুকনো হাসি দিত। রীতা তখন নকল হাতে ছাত্র ধরা শিক্ষিকার ভারী কণ্ঠে বলত, ‘জানি ওটা ও্যয়ারড্রপের ড্রয়ারে ঘুম পাড়িয়ে এসেছ’ স্ত্রীর কাছে ধরা খেয়ে নারীর অভিমানের মত পাতলা ছায়া তার মুখে ভাসত। রীতা তখন মুখ টিপে হাসত, ইমতিহানের অসহায় চেহারা দেখলে তার ভীষণ মায়া হত। এখন যেমন হচ্ছে। কিন্তু এখন সেই মায়ার দৃষ্টি সংযত করে নেয় রীতা। এই মানুষটার কাছে কোনদিন সে চাহিদার ফর্দ পেতে লোভী স্ত্রী হয়নি। রাতে বিছানার ভাঁজ সযত্নে থেকে গেলেও কামুকতার দাবী তুলে তাকে অযত্ন-অবহেলা করেনি। প্রায় রাতে শরীর রসে তার পেটিকোট ভিজে যেত, নিজের হাত দিয়ে ব্লাউজের উপর আলতো স্পর্শ করে শরীর শিহরণে ভাঁটা ফেলার চেষ্টা করত, তাতেও শরীরের উষ্ণতা না কমলে ফ্রিজের হিমশীতল পানি গিলে রাত পার করত। সে ভাবত, সব পুরুষ সমান হয় না। অনেক পুরুষের শরীর চাহিদার পরিধি সীমিত। অনেক পুরুষই’তো স্ত্রীকে ঘুম পাড়িয়ে পরস্ত্রী নিয়ে রাত জাগে। ইমতিহানের অনন্ত সেই অভ্যেস নেই। কিন্তু রীতা শেষতক সেই পুরুষের চিরচায়িত রূপ দেখল ইমতিহানের মাঝেও। তার এত ত্যাগ সপ্তপর্ণে অস্বীকার করে তাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দিল সে!

উকিল যেন রীতার মনের কথা বুঝতে পেরেই প্রশ্ন ছুড়ল ইমতিহানের দিকে,
-আপনি সমাজস্বীকৃত বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ থেকেও কেন অবৈধ-অসামাজিক সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন? দিনের পর দিন ভুলভাল পদ্য পড়িয়ে স্ত্রীকে ঠকিয়েছেন। রাতের পর রাত মেয়ের মাথায় হাত রেখে মিথ্যা ছড়া পড়িয়েছেন। আপনি জানেন তো? আপনার মেয়ের সুপার হিরো কিন্তু আপনি। আপনাকে সে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বাবা হিসাবেই জানে। কিন্তু আজকে যখন তার সামনেই আপনার আসল চরিত্রের মোড়ক উন্মোচিত হবে, তখন আপনার অবস্থান কোথায় গিয়ে ঠেকবে একবার ভাবতে পারেন মিঃ ইমতিহান?

মায়ের পাশে জড়সড় হয়ে বাবার বিরুদ্ধে মায়ের দায়ের করা মামালার শুনানি শুনছিল হৃদিতা। কালো বোরখা পড়া মানুষ দুইটা তার বাবা-মাকে নিয়ে যা বলছিল তাতে সে দারুণ বিরক্ত। কাঠগড়ায় যে মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে তার জন্য ভীষণ কষ্ট হচ্ছে হৃদিতার। মেয়েরা বাপ ঘেঁষা হয় সেটা জানা কথা, কিন্তু হৃদিতা আর ইমতিহানের সম্পর্ক যেন তার থেকেও এক কাঠি উপরে। দাদা-দীদা আর মা এই নিয়ে মনে ক্ষোভ পুষে রাখত। বাপ মেয়ে এমন ভাবে একে অপরের উপর নির্ভরশীল যেন ঘরের অন্য সবাই চেয়ার, টেবিলের মত জড়বস্তু। এই বয়সেই হৃদিতা বাবার দেখাশুনা করে মায়ের চেয়ে বেশী। আর বাবাও কম যায় না। বাহীরে থেকে দুনিয়ার জিনিষ মেয়ের হাতে ধরিয়েও তৃপ্তি পেত না। সারাক্ষণই ব্যস্ত হয়ে থাকত মেয়েকে কি দিয়ে খুশি করা যায়। প্রতি জন্মদিনে মেয়ের পছন্দের বাদামের ক্ষীর নিজ হাতে রান্না করত। বাবার এইসব আদিখ্যেতা দেখে মেয়ে মাঝে-মাঝে প্রশ্ন করত, ‘আচ্ছা বাবা, আমি কি সত্যি তোমার মেয়ে? নাকি এতিমখানা থেকে উঠিয়ে এনেছ?’ মেয়ের কথায় ইমতিহান সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত হয়ে যেত। কপালের উপর ভাঁজ আর নাকের উপর চিকন ঘাম জমে উঠত। গলা খাদে ফেলে সে উত্তর দিত, ‘এই কথা কেন বলছিস রে মা? তুই আমারই মেয়ে’। মেয়েও এই এগারো বছর বয়সেই যেন পাকা বুড়ী। মেয়েরা এমনিতেই বয়সের চেয়ে তাড়াতাড়ি বেড়ে উঠে। তবে হৃদিতা যেন বয়সের চেয়ে একটু বেশীই পাকা। বাবার উদ্দেশ্যে আবার যুক্তি ফেলে, ‘কিছু মনে কর না বাবা। আসলে হয়েছে কি, নিজের জিনিষের উপর অধিকার খাটানোর জন্য আদিখ্যেতা দেখাতে হয় না। যেটা নিজের না তাতে মানুষ অতিরিক্ত আগ্রহ দেখায়’ মেয়ের কথায় বাবার গর্ববোধ আর দুঃচিন্তা দুই’ই কপালে বলিরেখা ফুটে উঠত। অজানা এক ভয়ে ইমতিহানের চোখের মনি ছোট হয়ে আসত। হৃদিতা যেন বাবার চোখের ভাষা পড়তে পারত। এখন যেমন বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে ঐ চোখের গভীরে লুকিয়ে থাকা কষ্ট গুলো এই ছোট্ট হৃদয় দিয়ে অনুভব করে কষ্ট পাচ্ছে। ইমতিহান মেয়ের চোখে চোখ পড়ায় চোখ নুয়ে নিলেও উকিলের কথায় পুনরায় সামনে তাকাতে বাধ্য হয়।

-ইয়ুরঅনার, প্রতিপক্ষের উকিল সাহেব ‘ল’ না পড়ে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়লেই পারতেন। তার প্রমাণ সাইজের ভারী-ভারী শব্দে আমার ক্লাইন্ডের মাথা ব্যথা উঠেছে কিনা জানি না তবে আমার দিব্যি মাথা ধরেছে। মশাই, কাব্য আর কথার মারপ্যাঁচ ছেড়ে কি বলতে চান ঝেড়ে ফেলুন নাহ!
-ধীরে বন্ধু ধীরে। কথায় আছে নাহ, খাওয়া-দাওয়ায় সময় নিতে হয় না তবে প্রাণ করতে হয় ধীরে-সুস্থে। না, প্রাণ বলতে আমি নেশার কথা বোঝাচ্ছি না। আমার আবার নেশার বদ-অভ্যাস নেই। তবে কাঠগড়ায় দাঁড়ানো এই মানুষটার লোক ঠকানো আর যৌনতায় দারুণ নেশা। তিনি তার স্ত্রীকে রেখে অন্য অনেকের সাথে দৈহিক, মানসিক ও মিথ্যা প্রেমের সম্পর্ক চালিয়ে যেতে পারেন। মিথ্যাচার তার কাছে নেশার মতন।

-ইয়ুরঅনার, দয়া করে উনাকে আমার ক্লাইন্ডের উপর আরোপিত দায় নিয়ে আলোচনাতে নামতে বলুন।
উপরে বসা বিচারক আসামী পক্ষের উকিলের সাথে সহমত দিয়ে প্রতিপক্ষকে মুল বিষয়ে আসার জন্য আদেশ দিলেন।
পক্ষের উকিল আবার বলল,
-ইউয়ুরঅনার, কেন নয় আমরা বাদীর কণ্ঠেই শুনি তার অভিযোগ?

বিচারকের আদেশে রীতা অপরদিকের কাঠগড়ায় এসে দাঁড়াল। উকিলের প্রশ্নের অপেক্ষা পুরো বিচারলয়ে নিস্তব্ধ পরিবেশ। শুধু একজনের নাক টানা আর কান্নার আওয়াজ ছাড়া। গত জন্মদিনে বাবার উপহার দেয়া সাদা টেডিবিয়ারটা বুকে চেপে হৃদিতা মুখ নিচু করে কাঁদছে। বাবা এতক্ষণ দূরে থাকলেও মায়ের হাত ধরে শক্ত করে বসে ছিল সে। এখন মাও চলে যাওয়াতে অপরিচিত মানুষের মাঝে নিজেকে অসহায় ভাবতেই কান্নাটা উগড়ে বেরিয়ে এল। সে ভাবছে, বিচারের রায়ে যদি বাবা মা আলাদা হয়ে যায় তাহলে তাকে নিশ্চয় দুইজনেই এরকম একা ফেলে চলে যাবে। মেয়ের কান্না দেখে ইমতিহান অনেক চেষ্টা করেও নিজেকে সামলাতে পারল না, চোখের জল আর ঘামের সন্ধিতে সাদা শার্টে অসহায়ত্বের মানচিত্র ফুটে উঠল। বাবা-মেয়ের কান্না দেখে দুই অপরিচিত মহিলাও নারী অভ্যাসে সমঝোতা ঘোষণা দিয়ে চোখে আঁচল ছোঁয়াল। এতক্ষণ নাতনীর সাথে পরিবারের সম্মান নিলামে তোলার নায়িকা ছিল বিধায় ইমতিহানের মা পিছনের সারির মনযোগী শ্রোতা হয়ে ছিলেন। এখন নাতনীর অসহায়ত্বের কান্না মুছতে হৃদিতার পাশে গিয়ে বসলেন। নাতনীকে কোমল গলায় সান্ত্বনা দিলেও অশান্ত হয়ে উঠলেন ছেলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে কাঠগড়ায় উঠা বউকে দেখে।

-রীতা, আপনার উকিল সাহেবের ভাষ্য অনুযায়ী গত এক যুগ সংসার জীবনে আপনার স্বামী আপনার ভরণপোষণে গাফেলতি করেছে। আপনাকে আপনার প্রাপ্য অধিকার দেয়নি। কথা গুলো কি সত্যি?
-না সত্যি নয়। সে পরিবার, মা-বাবা আর সন্তানের মৌলিক চাহিদা পূরণ করে এসেছে। আমিও তার বাহীরে ছিলাম না।
-তাহলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে ডিভোর্স পেপার চাইছেন শেডারে কাটবেন বলে? আবার একমালিকা সম্পত্তি করতে চাইছেন মেয়ে হৃদিতাকেও!
-বিয়ের পর থেকেই ঘরে বাস করেও ইমতিহান যেন ভাসমান যাযাবর। সারাক্ষণই মনে হত মুখে আমলকী ঢুকিয়ে গণেশ সেজে আছে। দু’তিন দিনেও ঘরের খাওয়ার পিত্তে পড়ত না। তার অনশন দেখে মনে হত গান্ধীজী এখনো বেঁচে আছেন। মাঝ রাতে বিছানা হাতড়িয়ে দেখতাম কোলবালিশটা আরামচে ঘুমিয়ে আছে। বাহীরে তাকিয়ে দেখতাম সিগারেটের ধোঁয়ায় পুরো বারান্দা শ্মশান। প্রায় সময় টেলিফোনে কার সাথে যেন কথা বলতে শুনতাম। মনে প্রশ্ন জাগত, তার কি কারো সাথে সম্পর্ক আছে? সেই জন্যই কি সে আমাকে স্ত্রী হিসাবে মেনে নিতে নারাজ? কথার ছলে শাশুড়ি আগ বাড়িয়ে ছেলের ‘স্বভাবটাই এমন’ বলে সান্ত্বনা দিত। বাঙালি মেয়েদের বিয়ে একবার, ‘স্বামী আর তার ঘরই সব’ মায়ের পড়িয়ে দেয়া বচন মগজে গেঁথে দিন পার করে আসছিলাম। তারপর একবছরের মাথায় ঘরে এল হৃদিতা। মেয়ে আসতেই তার আমূল পরিবর্তন। আমার সাথে যেন তার পূর্বজন্মের শত্রুতা কিন্তু মেয়ের সাথে এক গলা খাতির আর বন্ধুতা। ভাবতাম, সন্তানের জন্য হয়তো বেচারা এতদিন ঘর-বউ মুখো হয়নি, এবার কিছুটা হলেও তার কাছে গ্রহণীয়তা পাব। নাহ, তাতেও কিছু হল না। আমার হিসাব তার কাছে অনাদায়ী পাওনাই থেকে গেল। আমিও নারীর নিয়তি ভেবে মেয়ের দেখাশুনা আর পরিবারের মাঝে নিজেকে ডুবিয়ে দিলাম। কিন্তু সেদিন আড়াল থেকে তার বন্ধুর সাথে মোবাইল কথোপকথন শুনে বুঝতে পারলাম, সে আমাকে বিয়ে করেছে তার মতের বিরুদ্ধে। মা-বাবা আর সমাজের কথা চিন্তা করে নাকি সে আমার গলায় অনিচ্ছার মালা ঠেকিয়েছে। আর বিয়ের আগে সে যাকে ভালবাসত এখনো তাকেই ভালোবাসে। আমি কোন দিনও তার মাঝে যায়গা পাইনি আর এজন্মেও পাবো না। এবার আপনারাই বলেন, এ কথা শোনার পর শো’পিচের মত কেন তার ঘরের শোভা বাড়াবো? তাই এই প্রতারক মানুষটাকে ছেড়ে আমার মেয়ে নিয়ে একা থাকতে চাই। এছাড়াও আরেকটা কারণ আমি অভিযোগ নামায় উল্লেখ করেছিলাম সেইটা এখন মেয়ের সামনে বলতে চাচ্ছি না।

রীতার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে তার নিযুক্ত উকিল বলে, আমি বলছি ইয়ুরঅনার- একজন নারী বিছানা সঙ্গী হিসাবে যেরকম পুরুষ প্রত্যাশা করে ইমতিহান সে রকম পুরুষ কোন কালেও ছিল না।
-ইয়ুরঅনার, ইমতিহান যদি রীতার প্রত্যাশিত বিছানা সঙ্গী না’ই হতে পারত, তবে গত এক যুগ কোন কর্মে তার বিছানায় পড়ে ছিলেন? তার এই অভিযোগ বার বছর আগে উঠল কেন?
প্রতিপক্ষের উকিলের প্রশ্নে রীতা কণ্ঠে স্থিরতা টেনে জবাব দেয়,
-কারণ আমার দুর্বলতা আমার মেয়ে হৃদিতা। তার কথা চিন্তা করে আমি নিজের সুখ জলাঞ্জলি দিয়েছি। মেয়ের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে পরিবারের অসুখের কারণ হতে যাইনি।
তার উকিল সাথে কণ্ঠ মেলালেন,
-ইয়ুরঅনার, আমার ক্লাইন্ড শুধু ঐটাই বলেছে যা তিনি শুনেছেন কিংবা দেখেছেন। কিন্তু কাঠগড়ায় দাঁড়ানো এই মিথ্যাবাদী লোকটা শুধু যে রীতাকে ঠকিয়ে এসেছেন তা না এর চেয়ে জঘন্য তার চরিত্র…।
-অবজেকশন ইয়ুরঅনার, দোষ প্রমাণের আগে দোষী বিবেচিত করাটা অযৌক্তিক নয় কি?
-যৌক্তিক প্রমাণ খুঁজছেন? দাঁড়ান আমি তার চরিত্রের নাড়ি নক্ষত্র সব প্রমাণসহ নিয়ে এসেছি। ইয়ুরঅনার, আমার ক্লাইন্ড রীতা শুধু জানত ইমতিহান সাহেব তাকে স্ত্রী হিসাবে চাইত না। তার প্রধান কারণ তিনি আসলে একজন অসুস্থ মানসিকতার সমকামী। তারই বাল্য বন্ধু অলির সাথে তার প্রণয়ের সম্পর্ক সেই বাল্যকাল থেকেই। কি মিঃ চরিত্রবান আমি ঠিক বলেছি তো?

অলির নাম শুনেই ইমতিহানের কপালের ঘাম দানা বাঁধতে লাগলো। পুরো বিচারলয়ে পিন পড়া নীরবতা। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে ইমতিহান। তার সামনে কাঠগড়ায় দাঁড়ানো রীতা ঘৃণার বিষাক্ত তীর ছুড়ছে ইমতিহানের দিকে। সে ইতিমধ্যে মুখ দিয়ে দুইবার ছি,ছি যপে ফেলেছে। নিজের প্রতি নিজের ঘেন্না হচ্ছে, এতদিন একজন সমকামীর সাথে একই বিছানায় শুয়ে এসেছে? ছি,ছি… হৃদিতার চোখ তখনো দীঘির জলের মত শান্ত। বাবার দিকে চেয়ে আছে প্রাণপ্রিয় সন্তান, আর বাবা আত্মসম্মান খুইয়ে চোখ লুকচ্ছে। একজন পিতার জন্য এর চেয়ে কঠিন-তম পরিস্থিতি কি হতে পারে তা ইমতিহানের জানা নেই।

উকিলের প্রশ্নে সে সম্বিত ফিরে পায়,
-কি ইমতিহান, আমি কি ভুল কিছু বললাম? জানতে চান কি প্রমাণের ভিত্তিতে আপনাকে জনসম্মুখে সমকামী বলছি? মজার বিষয় হচ্ছে, অফিসে আপনি সম্মানিত চরিত্রবান কলিগ, বন্ধুদের আড্ডায় নিবেদিত বন্ধু, বাবা-মায়ের কাছে আদর্শ সন্তান, আর আপনার সন্তানের কাছে দেবতা! তাহলে কি করে আপনার স্ত্রী আপনার নামে অপবাদ দেয়? আপনার পিছনে লোক লাগিয়ে দেখলাম গত দুই মাসেও আপনি কোন মেয়েকে নিয়ে সূর্যের স্পর্শ গায়ে লাগাননি, কারো বাসার চৌকাঠ মাড়াননি। তাহলে আপনার স্ত্রী কোন কলিজার জোরে বলে, অন্য মেয়ের সাথে আপনার গভীর প্রণয়!! তখন পুরো মামলাকে অন্য ভাবে নিতে চেষ্টা করলাম। আপনার স্কুল কলেজের মাঠে পা ফেলতেই বেরিয়ে আসে আসল খবর। ক্লাস নাইনে আপনাকে একবার টি,সি দিয়ে তাড়াতে চেয়েছিল প্রিন্সিপ্যাল। তার কারণটা ছিল আপনার বন্ধু অলির সাথে চুম্বনরত অবস্থায় অন্য সহপাঠীরা দেখে ফেলে। এই খবরকে পুঁজি করে আগাতে গিয়ে দেখলাম কেঁচো খুড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে এল। আপনার আর অলির সম্পর্ক, আরও ক’জনের সাথে কোথায় কি ঘটেছে সব তথ্যই কব্জা করলাম। কিন্তু সবচেয়ে অবাক লাগল, আপনার মা বোধহয় স্কুল জীবন থেকেই পরিচিতা ছিলেন আপনার সমকামী স্বত্বার সাথে!

এতক্ষণ এক হাতে হৃদিতা অন্য হাতে আঁচলে মুখ খুঁজে কান্নারত ছিলেন ইমতিহানের মা। এরকম মুখে আঁচল গোঁজা কান্নারত মাকে বার বছর আগেও একবার দেখেছিল। মায়ের মুখের উপর নিজের সমকামী পরিচয় সেদিন না দিতে পারলেও মা’তো ছোটবেলা থেকেই জানত তার ছেলের কেন মেয়ে বন্ধু নেই? কেন বিয়ের কথা শুনলে তার কপাল বেয়ে ঘাম ঝরত? স্কুলের বাথরুমে অলিকে চুমু খেতে গিয়ে ধরা পড়ায় প্রিন্সিপ্যাল মাকে ডেকে নালিস করেছিল। মা হয়তো ঠিকই বুঝতেন, মায়েদের চোখের দৃষ্টি হয় চিলের মত তীক্ষ্ণ। মায়ের বোধহয় নিজেকে সমকামী ছেলের মা হিসাবে পরিচয় দিতে আপত্তি ছিল। কিংবা সমাজ তার মাথার উপর হিমালয়ের মত ঝুঁকে ছিল বলে সেদিন মমতাময়ী হয়েও মমতার সওদা করেছিলেন ছেলের সাথে।

মা মুখ থেকে আঁচল হটিয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। আজ নিজেকে বড্ড বেশি অপরাধী মনে হচ্ছে তার। এমনটা কি তিনিও চেয়েছিলেন? তিনি ভেবেছিলেন, বয়ঃসন্ধিকালে যৌনতা নিয়ে ছেলেপুলের নামে দু’একটা অপবাদ হরহামেশাই উঠে। বিয়ে করে সন্তানাদি হয়ে গেলে সব চুকে যাবে। কিন্তু আজ আদালতে বসে বুঝতে পারলেন, হিরোশিমার পর যেমনি কিচ্ছু আগের মত নেই তেমনি আজকের প্রলয়ের পর ছেলের জীবনটাও ঠিক থাকবে না। ছেলের সুখে থাকা নিশ্চিত করতে বিয়েথাকেই একমাত্র পথ্য ভেবে তারই অমতে তার ঘাড়ে জন্মান্তরের বোঝা ছাপালেন। অথচ সেদিন ছেলের চোখের ভাষায় সুনিশ্চিত ধ্বংসের আগ্নেয়গিরিতে পুড়ে যাওয়ার ভয় বুঝতে পেরেও তিনি মমতার দোহাই দিয়ে মা না হয়ে সামাজিক নারী হয়ে থাকতেই পছন্দ করলেন। সন্তানের মা আর হতে পারলেন না। আজ আবার তার সামনেই তার সন্তান পাবে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের টিকেট। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে তিনি টের ফেলেন না কখন হৃদিতা তার পাশ থেকে উঠে বাবার কাঠগড়ার সামনে নিঃশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

-যে পুরুষ, পুরুষ নয় তার কাছে স্ত্রীর প্রয়োজন ঘরের আসবাবের মত সাজিয়ে রাখা বৈ কি? তাই রীতাকে তার আবেদন অনুযায়ী ডিভোর্স দেয়ার অনুরোধ করছি। আর রইল তাদের মেয়ে হৃদিতা। একজন সন্তান সুষ্ঠ ও নিরাপদে বেড়ে ওঠার জন্য একজন পিতার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করছি না। কিন্তু যে পিতার মানসিক ভাবে অসুস্থ তার কাছে সন্তান কি রকম সুস্থ পরিবেশ পাবে? তাই হৃদিতার দায়িত্ব তার মায়ের হাতে দেয়ার আবেদন করছি ইয়ুরঅনার।
রীতার উকিল তার বক্তব্য শেষ করে রায়ের জন্য তার আসনে গিয়ে বসলেন।

বিচারক তার রায় দেয়ার আগে ইমতিহানের কিছু বলার আছে কিনা জানতে চাইল। ইমতিহান শব্দহীন হয়ে দু’দিকে মাথা নেড়ে না জানালো। বলে কি লাভ? তার বার বছরের অতিষ্ঠ জীবন ফুঁ দিয়ে কেউ’তো আর ফুলেল করে দিতে পারবেনা। কিছু না বললেও তার ভিতরটা আর্তনাদ করছে নিজের অব্যক্ত অনুভূতি জানান দেয়ার। তার বলতে ইচ্ছে করছে, কেন স্বাভাবিক মানুষ হয়েও আমি এখন মানসিক রোগী? কেন অনিচ্ছার সত্ত্বে বিয়ে নামক যুদ্ধে নামিয়ে দিয়ে আমাকে অস্তিত্বের লড়াই করে বাঁচতে হচ্ছে? মায়ের স্নেহ ভালবাসার দাম দিতে গিয়ে নিজের সমকামী স্বত্বার কবর দিয়েছিলাম বার বছর আগে। এত সব করেও কি পেরেছিলাম সংসারী হতে? পারলাম কি বিয়েটা টিকিয়ে রাখতে? একজন মানুষ কতদিন শরীর আর অনুভূতির উপর বুল্ডজার চালাতে পারে? একদিন না একদিন ভীতরে চেপে রাখা অনুভূতি গুলো নিজস্ব নাম নিয়ে গর্জে উঠবেই আর এটাই অনিবার্য ছিল। হয়েছেও তা, কিন্তু সমাজ আর পরিবারের সম্মান রক্ষার্থে যে বিয়ে করেছিলাম তার বলি কেন হবে আমার ছোট মেয়েটা? তার কি দোষ বলতে পারেন ইয়ুরঅনার?
স্যার আমার কিছু বলার আছে। মেয়ের কণ্ঠে ইমতিহানের চিন্তার সুতো কাটে।

জজ সাহেব হাতের কলম থামিয়ে কিশোরী মেয়ের আবদার রাখলেন। হৃদিতাকে কাঠগড়ায় না পাঠিয়ে ওখানে দাঁড়িয়েই বলার অনুমতি দিলেন। হৃদিতা চোখে কান্নাজড়ানো কণ্ঠে মুখ খুলে,

স্যার, আমি ছোট একটা মেয়ে। ছোট্ট একটা বেষ্টনীতে আবদ্ধ আমার পৃথিবী। আমার জানার পরিধি সীমিত। আমি লসাগু-গসাগু আর সরল মেলাতে পারলেও আপনাদের গরল জীবনের হিসাব-নিকাশ আমার অজানা। সম-কাম কি তা জানিনা। আপনাদের ভাষ্যমতে আমার বাবা সমকামী।
আচ্ছা স্যার সমকামীরা কি খুব খারাপ মানুষ?
কই, আমার বাবা’তো খারাপ নই! তাহলে কেন তাকে শাস্তি পেতে হবে? সমকামীরা যদি খারাপ মানুষই হয় তাহলে কেন তাদের জন্মের-পর আলাদা করে দেয়া হয় না? আপনাদের কথায় বুঝতে পারলাম সমকামীরা স্ত্রী-সন্তান নিয়ে এক সাথে থাকতে পারেনা, তাহলে জন্মানোর পর কেন পরিবারে সাথে থাকতে পারে? আর তাদের বিয়ে কেন দেয়া হয়? নাকি বিয়ের উৎসবে সামিল হতে আপনারা আনন্দ পান বলে। স্যার, কখনো খেয়াল করেছেন কি? আপনাদের সেই দুইদিনের আনন্দ দু’টো মানুষের সারা জীবনের দুঃখের দামে কেনা। শুধু যে বিয়ে খেয়ে আপনাদের পেট ভরে তাতো নয়, সাথে দাওয়াত দিয়ে আনতে হয় আমার মত নতুন অতিথি। সেই দুজনের সাথে এইবার আরেকজনকে নামিয়ে দিলেন কষ্টের যুদ্ধে। স্যার তিনটা মানুষের লাগামহীন কষ্টের চেয়ে সামাজিক আনন্দটাই কি বেশী? আপনার কলম ঘুরানো দেখে বুঝলাম আমাকে ছোট মাছের ভাগার মত সাজিয়ে বাটতে বসেছেন। আচ্ছা স্যার আমি কি আপনার সরকারী খাতার রিলিফের সস্তা পণ্য, যেমন ইচ্ছা বেটে বুটে দিয়েই খালাস।
স্যার আমাকে ভাগ করে বাবা কিংবা মা যার সদাইয়ের থলিতে ফেলেন না কেন সাথে আপনাকে আরও একটা জিনিষ ভাগ করে দিতে হবে। বাব-মায়ের প্রতি আমার যে ভালবাসার তা আপনাকে সমান ভাবে ভাগ করে দু’জনকেই দিতে হবে। মায়ের হাতের স্পর্শ আর বাবার মুখের ছড়া শোনা ছাড়া আমার ঘুম আসে না। আমাকে তাদের একজনের কাছে পাঠালে কি ভাবে ঘুমবো বলতে পারেন? মায়ের মমতার হাতে খেয়ে আঁচল টেনে মুখ মুছা আর বাবাকে ঘোড়া বানিয়ে তার কাঁধে চড়া দুই’ই আমার চাই। পারবেন আমাকে তা দিতে?
আপনাদের বড়দের ঝামেলার দায়ভার আমার ঘাড়ে কেন ছাপাবেন স্যার? আমি তো নিজের ইচ্ছায় দুনিয়াতে আসিনি। কারো আমন্ত্রণে আমার ভূমিষ্ঠ হওয়া তাহলে আমি কেন তাদের কৃতকর্মের শাস্তি পাবো বলতে পারেন?
স্যার বিচারের রায় দেয়ার আগে আপনাকে অবশ্যই বলতে হবে, আমার এই অনাগত অন্ধকার ভবিষ্যতে ঠেলে দেয়ার দায়ভার কার? যাদের আমন্ত্রণে পৃথিবীতে পদার্পণ তাদের, যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন তার নাকি এই দায় আপনাদের সবার?

কথা গুলো বলে হৃদিতা বড় করে দম নিয়ে বাবার দিকে তাকায়। বাবার চোখের দৃষ্টি সে পড়তে পারে। বাবা যেন তার কথায় গর্বে ফুলে উঠেছে। সে মনে মনে বলল, বাবা তোমায় অনেক ভালোবাসি। তারপর সে মায়ের দিকে তাকায়, মায়ের ছলছল দৃষ্টি তার অজানা হলেও মনে মনে সে মাকেও বলল, মা তোমাকে ছেড়েও থাকতে পারবো না।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.