প্রমিতা

লিখেছেনঃ Divuninun kites

-কাল তো ক্যাম্পাসেই দেখা হতো। এখন ডাকলে কেনো?
-দেখো নীলা, এই ৪ বছরে আমি তোমাকে একটুকুও বুঝতে পারি নি।
-মানে কি অন্তু!
-আমাদের সামনে না এগুনোই ভালো।
-আমি তোমাকে ভালোবাসি। এতগুলো দিন এমনিই চলে যায় নি! তুমি কি বুঝতে পারো না!
-আমি আর বুঝতে চাই না। ভালো থেকো নীলা।

এই বিকেল বেলায় এই কথাগুলো শোনা হয়ত জরুরি ছিলো। হুম অনেক পাগলামি হয়ত করতাম। কিন্তু আমার ভালোবাসা কখনই দেখলে না অন্তু।দেখলে না। আমার কিছু ভাবতে ইচ্ছে করছে না। সন্ধার আকাশে চাঁদ উঠেছে, আমি দেখতে পারছি না।তবুও ছাদে বসে চাদের দিকে তাকিয়ে আছি। চাঁদকে এতো মানুষ ভালোবাসে তবু চাঁদের কলঙ্ক ঘোঁচে না কেনো!আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে।
আমি নীলিমা ভট্টাচার্য। একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়ছি। অনেক বন্ধু আমার। কিন্তু প্রমিতাকে কখনই বন্ধু হিসেবে ভাবতে পারিনি। কিন্তু…
কাল এসাইনমেন্ট। এখনো পেন্সিল ধরতে পারছি না। মা বকে যাচ্ছেন, ভাত খাই নি।
-কেমাপ্সে আমাদের গ্রুপে সবচেয়ে পপুলার ছিলাম আমি আর অন্তু। কিভাবে ভালোবাসা হয়ে গেলো জানা নেই। হাসি ঠাট্টা, ঝগড়া ভালোবাসা, সব কিছুই একজন নতুন বন্ধুর মতো জায়গা করে নিলো জিবনে।
ক্যাম্পাসে বসে আছি। কিছুই ভালো লাগছে না। আমার পাশে জিতু বসে বক বক করেই যাচ্ছে।
-এসাইনমেন্ট এনেছিস!
-না দোস্ত হয়নি।
-তুই কি প্রমিতা হয়ে গেলি নাকি!আমাদের একজন প্রমিতাই যথেষ্ট।
হাসি আসছে না। তবুও কষ্ট করে হেসে দিলাম।
-কিন্তু প্রমি কোথায়!ক্লাস করবে না!
-আছে ওর বন্ধুদের সাথে।
-আবার গাঁজা!
-হুম, চল, ক্লাসে চল।

আমাদের বন্ধুদের মাঝে প্রমিতাই ই একটু আলাদা। ছোট বেলায় ওর মা মারা যায়। পাহাড় ধসে ওর বাবাও মারা যায়। একটা বোন ছিলো ওর, দুরবিত্তরা ওদের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়। বোনটা মারা যায়। ও ঢাকায় চলে আসে। এক দূর সম্পর্কের ফুপা-ফুপুর কাছে থাকে। ও ওর মতো চলে আমরা কেও কিছু বলি না। আমাদের সাথেই চলে, আড্ডা দেয়। বৃষ্টির দিনের পাহারের গল্প শোনায়। আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনি।
দিন চলছে, অন্তুর সাথে আমার কথা হয় না… আমি তবুও চেষ্টা করে যাচ্ছি।ভালোবাসি তো কি করব! নিজেকে খুব ছোট মনে হয়।
সেদিন আমিই প্রমিকে দেখে এগিয়ে গেলাম…
-হাই প্রমিতা!
-হাই! প্রমিতা না বল প্রোমদবালা!!
-ভালো বলেছিস। কেমন আছিস?
-ভালো।
-চোখ লাল কেনো? আজকেও।
-আরে না! বাদ দে!
আড্ডায় আমি মাথা নিচু করে বসে আছি।সবাই গল্প করে যাচ্ছে। আমার দীর্ঘ নিশ্বাসটা কারো চোখে পরল কিনা জানি না। প্রমিতা সৈকতের দিকে তাকিয়ে বলল,আমি একটু নিউ মার্কেট যাবো। সৈকত, একটু যাবি আমার সাথে?
-আরে না! আমার কাজ আছে।
-ওকে! কারো যেতে হবে না। আমি উঠলাম।
প্রমিতাকে যেতে দেখে আমি উঠে দাঁড়ালাম,
-প্রমি দাড়া!আমি আসছি, এই মেয়েটার মতি গতির ঠিক নেই কথায় কথায় রাগ করে।


রিকশা নিলাম। প্রমিই আগে উঠল। এই মেয়েটা পারেও।
রিক্সায় মুখটা বাদরের মতো করে আছিস কেন। কি হয়েছে বল তো?
কিছু না, তুই না মার্কেটে যাবি চল।
আমি মার্কেটে যাবো না। কদিন ধরেই দেখছি তুই অন্য রকম হয়ে গেছিস।তাই তোর মুখে শুনতে চাই কি হয়েছে!
আমার কি হলো জানি না প্রমিতাকে বলে দিলাম অন্তু আমাকে ছেড়ে চলে গেছে।
-বলিস কি !তোদের এতো দিনের সম্পর্ক। আচ্ছা বাদ দে লাইফ ইজ লাইফ।
কথাটা বলেই সে সিগেরেট ধরালো। আমি কাশি আটকে রাখার চেষ্টা করলাম। পারলাম না। আমার কাশি দেখে সে সিগেরেটটা ফেলে দিলো।
পরিবেশটা হালকা করার জন্যই কি না জানি না প্রমিতা বলে উঠল কাল প্রেক্টিক্যাল জমা দিতে হবে লিখেছিস?
-না। ইচ্ছে করছে না।
-না দিলে তোর প্রব্লেম, আমার কিছু না। তবুও আমি তোর হেল্প করব। বাসায় চল।
আমি সোফায় বসে আছি। প্রমিতা আমার টেবিলে বসে প্রেক্তিকাল লিখছে।
এর মধ্য মা দুবার এসে জিজ্ঞেস করেছে মেয়েটা কে রে!
-বন্ধু মা।
কিন্তু হাবভাব অমন ছেলেদের মতো কেনো ?
মার অভ্যাস হচ্ছে আমার প্রত্যেক বন্ধুর সম্বন্ধে কিছু না কিছু বলা এবং তা প্রতিবারই আমার শুনতে খারাপ লাগে।

প্রমি এখন প্রায়ই এটা ওটার জন্য এখন প্রায়ই বাসায় আসে। মার সঙ্গেও খুব ভাব জমিয়ে ফেলেছে। তবে আজকে এসেছে অন্য একটা কারনে। প্রমিতাকে কে খুব সুন্দর লাগছে আজ।
-আজ কি জানিস!
-না।
-বৈশাখী পূর্ণিমা।
-আজ সারাদিন তোকে নিয়ে ঘুরব। তুই তো ঘর থেকে বেরই হোস না!
-বের হই তো। রোজ ভাসিটিতে যাই।
-মাইর খাবি! জলদি রেডি হয়ে নে!
আমি জলদি জামা বদলে বের হলাম প্রমির সাথে। অদ্ভুত আনন্দ লাগছে, অনেকদিন এভাবে ঘোরা হয়নি। আগে অন্তুকে নিয়ে বের হতাম। সারাদিন ঘরাঘুরি, আড্ডা চলত।
এই কয়দিনে আমার জীবন সত্যিই বদলে গেছে। ভালো আছি আমি।সন্ধ্যা হয়ে গেছে।
প্রমি বলল,জানিস বৈশাখী পূর্ণিমায় তুই যদি কিছু চাস বা প্রিয় জনের জন্য কিছু চাস তবে তা পাওয়া যায়।
-আচ্ছা চাবো নে।
-না! এখুনি চা। আমার সামনে!
-আচ্ছা তুই ও।
-ওকে, একসাথে।
আমি চাদের দিকে পবিত্র দৃষ্টি নিয়ে প্রমির এর দেখা দেখি চোখ বন্ধ করলাম। তবে কি চাইলাম তা এখন বলব না।
গল্প করতে করতেই অনেক রাত হয়ে গেলো।প্রমি বলল আজ রাতে আমার বাসায় চল। সারারাত দুজন মিলে ইচ্ছে মতো গল্প করব। আমি রাজি হয়ে গেলাম।
নিলি, চা খাবি?
বানা!
চা খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা তোর কি কখনো কোনো বয়ফ্রেন্ড ছিলো?
আরে ধুর!
আহা বল না?
নারে ছিলো না। তবে একজন কে খুব ভালোবাসতাম।
কাকে রে?
তোর জেনে কাজ নেই! চল ঘুমিয়ে পরি।

আমরা শুয়ে পরলাম। মাঝ রাতের দিকে টের পেলাম প্রমিতা আমাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে। ওর উত্তপ্ত নিশ্বাস আমার গলায় পরছে। আমার কেমন যেন
লাগতে শুরু করলো। আমি কিছু না ভেবেই জড়িয়ে ধরলাম প্রমিতা কে। একটু পর ওর হাতের স্পর্শ টের পেলাম আমার সারা শরীর জুড়ে। আমি প্রমিতার ঠোঁটের উপর ঝুকে পরলাম। পরদিন সকালে ঘুম ভাঙ্গার পর খুব খারাপ লাগতে লাগল। আমি প্রমিতাকে কিছু না বলেই চলে আসলাম।

তারপর থেকে ক্যাম্পাসে আর প্রমিতার সাথে কথা বলি না। ও আড্ডায় আসলে আমি উঠে চলে আসি। ও অনেকবার আমার সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছে কিন্তু আমি ওকে সেই সুযোগ দেই নি।
একদিন আড্ডা শেষে খুব রাতে বাসায় ফিরলাম।পরদিন খুব ভোঁরে আমার ঘুম ভাঙল। এতো সকালে আমার ঘুম ভাঙ্গে না,হতাথ খেয়াল করলাম মোবাইলের মেসেজ বক্সে অন্তুর সংক্ষিপ্ত চিঠি।কি হতে পারে। এতদিন পর হতাথ! আমার মেসেজ খুলতে ইচ্ছে করছে না। তবুও খুললাম।
_meet me,11 am.same place
-Ontu.
দুপুর ১১ টা বাজে। আমার সামনে অন্তু দারিয়ে আছে।
-আই ওয়াজ রং নীলা। প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দাও। তোমাকে ছেড়ে থাকাটা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
আমি অন্য দিকে তাকিয়ে আছি।
-আই লাভ ইউ
আমি ওর চোখে চোখ রেখে ধিরে ধিরে জবাব দিলাম আমিও, সবসময়।
আমি অন্তুর কাধে মাথা রেখে ওর হাতটা ধরলাম।অন্তু আমার চুলে বিলি কেটে দিলো।শেষ বিকেলের আলোয় আমরা হাঁটছি, কেনো জানি না প্রমির কথা খুব মনে হচ্ছে। এর চেয়ে বেশি কিছু আর চাই না। প্রমিতাকে একটা সংক্ষিপ্ত চিঠি লিখলাম, আমি ভালো আছি।
হয়ত আমাদের মাঝে আর বন্ধুত্ব হয়ে ওঠে নি!
কিন্তু আমি তোমাকে কখনো ঘৃণা করি নি।
ভালো থেকো, শুভ কামনা রইল…
-নিলি

আমার গল্পের এখানেই সমাপ্তি।
বিকেল বেলায় প্রমিতার চুল বাতাসে উড়ছে, সে হাঁটছে, কোথায় যাচ্ছে গন্তব্য নেই। সে চেয়েছিল নীলিমার জীবন আবার সেই আগের মতো হয়ে যাক, সেই সদা হাস্যজ্বল নীলিমা। সবসময় হাসি খুশি থাকা সেই মেয়েটি।কিন্তু নিজের দ্বারাই এমন একটা ভুল হয়ে যাবে ভাবেনি সে।সেদিন বৈশাখী পূর্ণিমায় চাঁদের কাছে সে নীলিমার জন্য অন্তুকেই চেয়েছিলো।এই মাত্র নীলিমার মেসেজ আসল প্রমিতার মুঠোফোনে।তার কি মনে পরল কে জানে, হেসে দিয়ে হাতের জ্বলন্ত সিগারেটটা ছুড়ে ফেলে দিলো।
সেদিন কিন্তু নীলিমা চাঁদের কাছে চেয়েছিলো প্রমিতার জীবনটা যেন ভালো হয়ে যায়, প্রমিতার সব দুঃখ,কষ্ট যেন দূর হয়ে যায়।
হাঁটছে মিখিং, দূরে কোথাও থেকে ভেসে আসছে রবিন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত গান, “সখি ভাবনা কাহারে বলে, সখি যাতনা কাহারে বলে” সন্ধ্যা হয়ে আসছে।
প্রমিতা কেনো যেন হাতব্যাগ হতে সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটারটা বের করে দূরে ছুরে মারলো।কেনো যেন ভীষণ আনন্দ লাগছে তার। আবার হাঁটতে শুরু করল প্রমিতা।
এটাই হয়ত দুজনের ভালোবাসা, দু’রকম।পৃথিবীতে দীর্ঘজীবী হোক ভালোবাসা কিংবা, নিছক বন্ধুত্ব।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.