কুড়িয়ে পাওয়া সুখ

লিখেছেন অরণ্য যুবরাজ 


সকাল থেকেই অভির মোবাইলে ফোন দিচ্ছে পুলক ।
আজ বিকেলে ওদের দেখা করার কথা ।
পাবলিক লাইব্রেরীতে ।
কিন্তু অভির মোবাইল অফ । সকাল থেকেই অফ ।
হালকা একটা টেনশন কাজ করছে পুলকের বুকের ভেতর ।
ওর কোন সমস্যা হল না তো !
কাল রাতে ওর সাথে একটু কথা কাটাকাটি হয়েছিল । সেটা অবশ্য এই কয়েক মাসে বেশ কয়েকবার হয়েছে । যতবারই কথা কাটাকাটি হয়েছে অভি রাগ করে মোবাইল বন্ধ করে রেখেছে । কিংবা ফোন রিসিভ করে নি ।
প্রত্যেক বারই পুলক হার মেনে ক্ষমা চেয়ে মেসেজ দিয়েছে ।
আজও কি তাহলে অভি রাগ করেই ফোন বন্ধ রেখেছে ?
কিন্তু আজ তো ওদের দেখা করার কথা ! এমনকি আজ একটা জরুরী মিটিং ও নাকি আছে ।
তাহলে কি মিটিং এর জন্য ও ফোন অফ করে রেখেছে ?
পুলকের কপাল জুড়ে বিন্দু বিন্দু ঘাম । ওর টেনশন হলে এমন হয় ।
ধেত্তেরি ! কিছুই ভালো লাগছে না ।
অফিসের কাজে মন দেয়ার চেষ্টা করল পুলক ।

অভি আর পুলকের বন্ধুত্ব ফেসবুকের ফেইক আইডি তে ।
ধীরে ধীরে চ্যাট, স্ট্যাটাসে কমেন্ট আদান প্রদান ।
এরপর ফোন নম্বর বিনিময় ।
দুজনের মনের সুতো কখন যে সমান্তরালে চলতে শুরু করেছে সেটা কেউই প্রথমে টের পায় নি ।
টের পেল তখন যখন অভি সপ্তাহ খানেকের জন্য দেশের বাইরে যাচ্ছিল ।
অফিসের কাজে ।
সেবার টানা ৭ দিন কথা হয়নি পুলকের সাথে ।
দেশে এসেই অভির প্রথম কল ছিল পুলকের মোবাইলে ।
আবেগে অভি কথাই বলতে পারছিল না ।
– হ্যালো । পুলক ।
– জি বলছি । কখন ল্যান্ড করলে ?
– এই মাত্র ।
– আমি এই কটা দিন কোন একজন বিশেষ মানুষের কণ্ঠ শুনার জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করেছি এটা কি কেউ জানে ?
– কেউ জানে বলেই দেশের মাটিতে পা ছুঁয়ার সাথে সাথেই আপনার মোবাইলে কল গিয়েছে । বুঝছেন ভাইয়া ?
– আমার কেমন জানি আনন্দ হচ্ছে । পুলক জড়ানো গলায় বলল।
– কেন বলতো ?
– এই যে এতদিন তুমি ছিলে না দেশে । কথা বলতে পারতাম না তোমার সাথে । মনে হত কি জানি নেই, কি জানি নেই ।
– আসলে তুমি ঝগড়া করতে পারো নি কারো সাথে । তাই । হা হ হা ।
– মানে কি অভি ? আমি কি খালি ঝগড়াই করি !
– না ইয়ে মানে । ঠিক সেটা না । আমি আসলে তোমাকে রাগানোর জন্য বললাম ।
– তুমিও না ! পারও দুষ্টামি করতে ।
– একজনকে তো দুষ্টু হতেই হয় । তাই না ! দুজনই যদি চুপচাপ হয় তাহলে কি খেলা জমে ?
-এসেই অসভ্য কথা শুরু করলে । এখন বাসায় যাও । রেস্ট নাও । রাতে কথা হবে ।

পুলক অফিসের কাজ করবে নাকি অভির কথা ভাববে ?
আজ বড্ড পুরনো কথা মনে হচ্ছে তার ।
বার বার চোখ ভিজে যাচ্ছে । অভির কথা ভেবে । এতো দুষ্টমি জানে অভি !
পৃথিবীর কেউ কেউ জন্ম নেয় জীবনটাকে রাঙ্গানোর জন্য । ওরা আসেই চারপাশের মানুষকে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখানোর জন্য । অভিও ঠিক তেমন একজন মানুষ । পুলকের মনের মানুষ ।

এইতো মাস কয়েক আগের ঘটনা । পুলকের ফেসবুক ফেইক আইডিটা হঠাৎ ব্লক হয়ে গেল । মন খারাপ করে পুলক অভিকে ফোন দিয়ে বলল,

– হ্যালো অভি ! আমার ফেইক আইডি টা না আজ ব্লক হয়ে গেছে ? পুলকের কণ্ঠে করুন একটা রেশ ।
– হা হা হা । তাই নাকি ? কেন বলতো ?
– কি জানি ! বুঝলাম না ! প্রোফাইল পিকচারে একটা মডেল ছবি দিছিলাম । এরপর থেকেই ১০০ টা ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাইসি । একদিনে । হয়ত এই কারণে ব্লক খাইসি ।
– সমস্যা নাই বোকা । নতুন একটা আইডি খুলে নিও । তাহলেই হবে ।
– থাক । আর আইডি লাগবে না । আমিতো তোমাকে পেয়েছি । তাই না !
– আচ্ছা পুলক, আমাকে দেখতে ইচ্ছে করে না তোমার ?
– করে । খুব করে ।
– তাহলে এতদিন কোন ছবি চাইলে না যে ফেসবুকে ? একবারও তো জানতে চাওনি আমি কেমন ?
– সবাই কি এক হয় অভি ! আমি না হয় একটু আলাদা করে ভালবাসলাম তোমায় । তুমিও তো কোনদিন আমার ছবি দেখতে চাও নি ।
– আমিও বোধ হয় তোমার মত সেকেলে পুলক । তাই চাই নি । না দেখাই ভালো । একটা মোহ, একটা কল্পনা কাজ করে । আমি তো চোখ বুঝলেই তোমায় দেখতে পাই ।
– তাই ! কেমন করে ?
– এই যে যখন তোমার সাথে কথা বলি তখন চোখ বুজে থাকি । তখনই একটা শ্যামলা বালক আমার সামনে আসে ।
– তাই ! আর কি দেখ ? পুলক ছোট বাচ্চাদের মত জিজ্ঞেস করে ।
– দেখি ছেলেটার চোখ । বড় বড় চোখ । কেমন জানি মায়া মায়া । একটা কালো ফ্রেমের চশমা ।
– আর ! আর কি দেখ ?
– দেখি ছেলেটার কোঁকড়া চুল । কয়েকটা কপালে এসে পরেছে ।
– আর !
– ছেলেটার পরনে সাদা টি শার্ট ।
– আর !
– আর ছেলেটা নিচে কিছুই পরে নাই । হা হা হা ।
– তোমারে ধইরা অভি ! দাঁড়াও । যেদিন দেখা হইব বুঝবে তখন । এমন কিল দিমু !
– সত্যি দেবে পুলক ! আমি তো রাজি । কতদিন কেউ আদর করে পিঠ চাপড়ে দেয় না ।
– আচ্ছা অভি । আমাদের পরিচয়টা কেমন অদ্ভুত না ! ঠিক যেন গল্পের মত ।
– সেইজন্যই মাঝে মাঝে ভয় লাগে পুলক । যদি সত্যি গল্পের মতই হয়ে যায় !
– অভি, আমি রাখি ।
– এই বোকা ছেলে । কি হইছে ! আরে বাবা ! আমি তো মজা করলাম !
– আমার এসব মজা ভালো লাগে না । তুমি সেটা ভালো করেই জান ।
– ওকে । এই কানে ধরছি । আর বলব না । এখন কি মাফ করা যায় ?
– না । যায় না । যেদিন আমাদের প্রথম দেখা হবে সেদিন তুমি আমার সামনে দশ বার কানে ধরে উঠবস করবে ।
– আমি রাজি এক শর্তে ! অভির গলায় হালকা দুষ্টুমি ।
– কি শর্ত ?
– প্রতিবার কান ধরে বসে উঠার পর একটা করে চুমু দিব তোমার ঠোঁটে । হা হা হা ।
– তোরে নিয়ে আমি কি করুম । আল্লাহ । এতো শয়তানি বুদ্ধি কেমন করে কারো মাথায় আসে ।
পুলক হাসতে হাসতে বলে উঠে ।
– এখনো ভেবে দেখ । সারাজীবন পারবে ? সামলে রাখতে ? এখনও সুযোগ আছে পালিয়ে যাবার ।
– অভি । ভালবাসা কি হিসেব করে অংক কষে হয় । তুমি যেমন তেমনই আমার । সবটুকু আমার ।

ঘড়িতে এখন বিকেল ৪ টা ।
অভি এখন অফিসে । কি যে করবে ভেবে পাচ্ছে না সে ।
আজ সকালে অফিস আসার সময় বাসে ওর মোবাইল টা চুরি হয়ে গেছে ।
অথচ আজ ওর সাথে পুলকের দেখা হবার কথা !
কি যে হবে ?
বেচারা এসে নিশ্চয়ই দাঁড়িয়ে থাকবে ?
অভির মনে এখন আসল টেনশন কাজ করছে ।
তার এই মাত্র মনে হল পুলকের কোন ঠিকানা বা ফোন নম্বর ওর কাছে নেই ।
যাও একটা ফেইক আইডি ছিল পলকের সেটাও কবেই ব্লক হয়ে গেছে ।
ও গড ।
মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছা করছে অভির ।
পুলক কে কখনও দেখেওনি অভি ।
কেমন করে খুঁজে পাবে সে ।
আজ যে আরও কি আছে কপালে !!
একটু আগেই বসের কাছে একটা বড়সড় ঝাড়িও খেয়ে এসেছে সে ।
অফিসের ফাইলে ভুল জায়গায় সই করার জন্য ।
আসলে আজ সব উলট পালট লাগছে !

ঘড়িতে এখন বিকেল ৫ টা ৩০ ।
পুলকের অফিস শাহবাগেই ।
তাই সে এখন বের হয়ে পাবলিক লাইব্রেরীতে যাবে ।
অভির সাথে দেখা করতে ।
সেল হাতে নিয়ে রিং করল সে ।
নাহ । মোবাইল এখনও বন্ধ ।
অভির কোন বিপদ হল না তো ?
অফিস থেকে বের হয়ে জাদুঘরের সামনে দিয়ে এসে সে দাঁড়িয়ে রইল পাবলিক লাইব্রেরির গেটে।
ওর কপালে ঘাম জমছে ।
পুলক বার বার তার রুমাল বের করে ঘাম মুছছে ।
বার বার কল দিচ্ছে অভির নম্বরে ।
কিন্তু নাহ ।
মোবাইল এখনও অফ ।
পুলক বুঝতে পারছে না ।
ও কি থাকবে ? নাকি চলে যাবে । অভি এমন কেন করল ?
ও দেখা করতে চায় না এটা সরাসরি বললেই পারত !
মানুষ এমন কেন ?
পুলকের খুব খারাপ লাগছে ।
ও হেঁটে হেঁটে পাবলিক লাইব্রেরির ভেতরে গেল ।
সিঁড়িতে গিয়ে বসল ।
একা ।
চারপাশে সবাই এখানে জোড়ায় জোড়ায় বসে আছে ।
নিজেকে এলিয়েন এলিয়েন লাগছে ।
ওর খুব কান্না পাচ্ছে কেন জানি ?
ভাগ্যিস । এখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে । নাহলে ওর চোখের জল কেউ না কেউ হয়ত দেখে ফেলত !

অভি ঠিক করল আজ সে পাবলিক লাইব্রেরীতে গিয়ে সবাইকে জনে জনে জিজ্ঞেস করবে , ভাইয়া আপনি কি পুলক ।
যে কোন ভাবেই হোক । ওকে খুঁজে বের করতেই হবে ।
কারণ আজ হারালে সে পুলককে সারা জীবনের জন্য হয়ত হারাবে !
রাস্তায় আজ প্রচণ্ড জ্যাম ।
গুলশান থেকে শাহবাগ আসতে আজ কতক্ষন লাগবে কে জানে ?
হাত ঘড়ির দিকে নজর যেতেই নিজের চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে অভির ।
আজ সব ঝামেলা একবারে শুরু হয়েছে ।


অভি সি এন জি থেকে নেমেই ভাড়া মিটিয়ে দৌড় দিল ।
পাবলিক লাইব্রেরির ভেতরে ।
ওখানে এখন শত শত মানুষ ।
ও শিট !
ভেতরে যে পিঠা মেলা চলছে এটা সে আগে জানত না ।
এতো মানুষের মাঝে কোথায় খুঁজবে সে পুলক কে ।
দুনিয়ার সব পরীক্ষা কি শুধু ওকেই দিতে হবে ?
কেন এমন হল আজ !
এতো কাছে থেকেও আজ দুজন দুজনকে পাবে না ? হারিয়ে ফেলবে ?

এখন রাত ৯ টা বাজে ।
মেলা শেষ হয়ে গেছে ।
সবাই আস্তে আস্তে বের হচ্ছে ।
অভি এখনও পাবলিক লাইব্রেরির সিঁড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে ।
কোন একলা ছেলে দেখলেই জিজ্ঞেস করছে, ভাইয়া আপনি কি পুলক ?
এই পর্যন্ত অনেকের কাছেই হাসির পাত্র হয়েছে সে । অনেকেই ঠাট্টা করে বলেছে না ভাইয়া, আমি ঝলক ।
অভি মাথা নিচু করে রেখেছে লজ্জায় ।
ও খেয়াল করল একটা ছেলে চুপ চাপ বসে আছে ।
পাবলিক লাইব্রেরির সিঁড়ির গোঁড়ায় ।
একবার ভাবল, ওকে গিয়ে কি জিজ্ঞেস করব ?
ও যদি আবার হাসে ?
না । থাক । অনেক চেষ্টা তো হয়েছে ।
আসলে অভির কপালটাই এমন ।
সবকিছু পেয়েও হারাতে হয় ।

পাবলিক লাইব্রেরির গেইট এখন বন্ধ করে দেবে ।
অভি ধীর পায়ে এগুচ্ছে গেইটের দিকে ।
আসলে ফাটা কপাল কখনও জোড়া লাগে না সেটা আবারও প্রমাণ পেল অভি ।
– এক্সকিউজ মি ভাইয়া ।
পেছন থেকে কেউ একজন বলে উঠল ।
অভি পেছন ফিরে বলল, জি আমাকে বলেছেন ?
– জি । আপনাকে বলছি । যদি কিছু মনে না করেন একটা কথা জিজ্ঞেস করব ?
– জি বলুন ।
– আপনাকে অনেকক্ষণ ধরে দেখছি একা একা দাড়িয়ে আছেন । কয়েকজনের সাথে কথা বলতেও দেখলাম । আপনি কি কাউকে খুঁজছেন ?
– হুম । আমার এক বন্ধুকে ।
– ও । তা তাকে পেলেন না ?
– না । আসলে আমার মোবাইল টা আজ চুরি হয়ে গেছে । তাই যে একটা ফোন করে ওকে খুজব সে পথটাও খোলা নেই ।
– ও সো সেড । খুব খারাপ লাগল জেনে । আপনার নামটা কি ভাইয়া ?
– জি । আমি অভি ।
– ওকে অভি ভাইয়া ভালো থাকবেন । আশা করছি আপনি উনাকে খুঁজে পাবেন ।


১০
অভি এখন একটা সি এন জি ভাড়া করছে ।
মনটা এতো খারাপ লাগছে । মনে হচ্ছে ওর জীবনের সব চাইতে দামি কিছু সে হারিয়েছে ।
সি এন জির দরজা খুলে সে এক পা দিতেই পেছন থেকে কেউ একজন বলল,
– গাধা ভাই । আমি কি আপনার সাথে যেতে পারি ?
অভি মাথা ঘুরিয়েই দেখল সেই ছেলেটা যে একটু আগে অভির সাথে গেইটের কাছে কথা বলেছে ।
– ভাইয়া, আমাকে গাধা বলছেন যে ? অভি বিরক্তি নিয়ে বলল ।
– গাধাকে গাধা বলব না তো কি বলব । তোমার সাথে এখন ঝগড়া করব আমি । বুঝলে ?
অভি আনন্দে ঝাঁপিয়ে পড়ল পুলকের গায়ে ।
আরেকটু হলেই রাস্তায় পড়ে যেত দুজন !
– ও মাই গড । তুমি ? আই কান্ট ইমাজিন আমি তোমাকে পাব ? অভির চোখে জল।
– সত্যিকারের ভালবাসা কখনও হারিয়ে যায় না অভি ।
পুলক অভিকে আরও জড়িয়ে ধরল জোরে ।

১১

হাওয়ার বেগে সি এন জি ছুটে চলেছে ।
অভির বাসার দিকে ।
সি এন জির ভেতরে এখন আবছা আলো ছায়ার খেলা ।
আর অভি এখন জড়িয়ে ধরে বসে আছে পুলক কে ।
ওর মনে এখনও ভয়, যদি সে আবার পুলক কে হারিয়ে ফেলে ?

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.