অবনমিত বাসনা

লেখকঃ অরিয়ন

দমকা বাতাসে দুপুরবেলার অলস ধুলা ঝাপটা মেরে ঠোঁট শুকনো করে দেয়। জিভ সামনে এনে ঠোঁটগুলো আলতো করে দুইবার ভিজিয়ে নেয় আতিক। কুড়াল ছেড়ে কোমড়ে হাত দিয়ে দাঁড়ায়। লম্বা একটা দম নেয়, মুখ থেকে আড়মোড়া ভাঙ্গার তৃপ্তিকর শব্দ বের হয় — আ-আঊ ! তারপর আবার ঠোঁট দুটো একটু চেটে নেয় । বুঝতে পারে,মুখের লালা কেমন ঘন ঘন লাগছে। জিভ আর ঠোঁট একসাথে লাগার সময় মনে হয় পোড়া বিড়ি কেউ ঠোঁটে চেপে ধরেছে। আতিক টের পায় , তার অস্বস্তি লাগছে । মুখে জমা থুতু ফেলে সামনে তাকায় । গুনগুন করে গান ভাঁজে —– আমার শ্যাম যদি হইতো মাথার কেশ…গানের এইটুকুই বারেবারে ঘুরিয়ে ফিরিরে গায় । আর চোখ ফিরিয়ে করে রাখে মাজেদের দিকে । মাজেদকে দেখে । মাজেদের শরীরের দ্রুত ওঠানামা দেখতে তার বড় ভাল লাগে ।

একমনে কাঠ কেটে চলেছে মাজেদ । দম ফেলার সময় নেই তার ; অবশ্য শক্ত এই গুড়ি টাকে শেষ না করার আগে দম ফেলার কোন ইচ্ছাও নেই । পেটানো ধাতব কালো শরীর ঘামে ভিজে জবজব করছে । খালি গায়ের এমন ধাতব কালো চিকচিকে চামড়ায় রোদ ঝিলমিলিয়ে ওঠে । কপাল থেকে বারকয়েক-বার ঘাম মুছে সে, পিচ্ছিল হাত দেখে তার বিরক্তির সীমা থাকে না । বেজার মুখে আকাশের দিকে তাকায় , ক্লান্ত মুখ থেকে স্বতঃস্ফূর্ত গালি বের হয় —– চুতমারানির রইদ রে ! জানডা কয়লা কইরা দিলো !
বিড়বিড় করতে করতে হাত মুছার ঝামেলাটুকু শেষ করে ফেলে , শক্ত হাতে কুড়াল ধরে আবার কাজে মন দেয় । এই শক্ত গুঁড়ি শেষ করার আগে কোন থামাথামি নেই ।
মাজেদের নিষ্ঠুর হাতের অত্যাচারে ফালা – ফালা হতে থাকে হলদে -বাদামী রং-এর শক্ত গাছের গুড়ি । পুরাতন গাছের গুড়ি । কুড়ালের সাথে লেগে গির্জার ঘন্টার মত শব্দে চারপাশ আলোড়িত করে । শুনলে মনে হয়, কাঠ না —- লোহা । গ্যাশ-ড্যাশ-গ্যাশ-ট্­­­­­­যাশ ! মাজেদ কাঠ কেটে চলে ।

আতিক সেদিকে তন্ময় হয়ে থাকিয়ে থাকে । কাঠ কাটার শব্দের ছন্দের সাথে সাথে তার শরীরে কেমন অদ্ভুত ঝমঝমানি সৃষ্টি হয় । মাজেদের শরীর থেকে সে চোখ ফেরাতে পারেনা, অথচ বুঝতেও পারেনা এমন তাকিয়ে থাকা কেন । কেন সে অযথা তাকিয়ে থাকে? শুধু তাকিয়ে থাকা না, মাঝে মাঝে আবার আতিকের খুব খারাপ ধরণের ইচ্ছা হয় ; ইচ্ছা হয় মাজেদের ওই কালো পিঠ জড়িয়ে ধরতে , বুকের সাথে বুক লাগিয়ে রাখত। ঘাম মুছে দিয়ে একটু বাতাস করে দিতে পারলে মাজেদের মুখখানা কেমন দেখাত সে ভাবে । মাজেদের কালো মুখের হাসিটা খুব সুন্দর — রঙিলা বাজারের সাদা সাদা আইসক্রিমগুলো যেমন । আতিকের হঠাৎ মনে হয় এমন গরম দুপুরে দুইজন মমিলে নারিকেলের আইসক্রিম খেতে পারলে… সে মাজেদের ঘামাচিগুলো একটা একটা মেরে দিতো আর তার সাথে দুটা-চারটা সুখ-দুঃখের কথা বলতো । এই পরিচিত সমাজ সংসারের পরিচিত সুখ-দুঃখ না । অন্য এক সংসারের কথা যেখানে আর কেউ থাকবে না,শুধু সে আর মাজেদ,মাজেদ আর সে ।
কিন্তু সেই সংসারের চিত্রও তার কাছে ঠিক স্পষ্ট নয়…। সত্যিই কি এমন কোন ঘর সংসার….

আতিক আর কিছু ভাবতে পারেনা ।তার ছোট মাথা এসব কুলাতে পারেনা। মুখে জমা থুতু আবার ফেলে খানিকটা মিষ্টি সুরে ডাক দেয়,”মাজেদ মিয়া “
মাজেদের কোন সাড়া পাওয়া যায়না ।
সে একমনে কাঠ কেটে চলে। আতিক আবার একটু অনুনয় মিশিয়ে বলে,”ও মাজেদ মিয়া ” কাজ করার সময় মাজেদের কোন হুঁশ থাকেনা । আতিকের ডাক তার কানে পৌঁছায় না ।

এবার তাই আতিক গলা চড়ায়,অন্যদিনের মত স্বাভাবিকভাবে ডাক দেয়,”অই মাজেইদ্যা । “
মাজেদ গলা উঁচু করে তাকায় । কুড়ালের মাথা কাঠের ভেতর ধরে রেখে কুঁজো হয়ে থাকে । চোখে -মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট ।
নিচু স্তরের সমাজের সহজ সরল মানুষের সুবিধা এই যে তাদেরকে ভদ্রতার মুখোশ পড়ে সবকিছু সহ্য করার অভিনয় করতে হয়না । অন্তত মিথ্যা অভিনয়ের ঝামেলা থেকে তারা মুক্ত । তাদের জীবনটাই রূঢ় বাস্তব , সেখানে মিথ্যা দিয়ে আরও রূঢ় করার প্রয়োজন নেই ।
তাই বিরক্তি না লুকিয়ে দাঁত খিচিয়ে মাজেদ জিজ্ঞেস করে, “কি অইছে? ” তার ক্লান্ত শরীরের গরম মেজাজ কথার সাথে ছড়িয়ে পড়ে ।
মাজেদের বিরক্তিতে অবশ্য আতিকের কিছু এসে যায়না ।
কিন্তু হঠাৎ করে কোন কথা খুঁজে পায়না । মাজেদকে সে কেন ডেকেছে ? সাথে সাথে অবশ্য বুদ্ধি খাটিয়ে বলে , “চউক্ষে গুতা খাইছি । ” নিজের বুদ্ধিতে খানিকটা গর্ববোধ হয় তার,কিন্তু আবার বুঝতে পারে চোখে গুঁতা লাগলে চোখে পানি থাকার কথা, তখন আবার ভেতরে ভেতরে চুপসে যায় ।

মাজেদের ভেতর কোন ভাবান্তর হয়না,তবে মুখের বিরক্তি রেখাগুলো মুছে যায় । আতিকের ঝামেলায় সে না গেলে কে যাবে? সেই ছোটবেলা থেকে দোস্তি ।
কালো শরীর সোজা করে দাঁড়ায় সে । কোমড় থেকে গামছা খুলে মুখ মুছে নেয়, বলে, ” গুঁতা খাইছোস ক্যামনে? আর আমারে কস ক্যান? চউক্ষে পানি দিয়া আয় । “
-” পানি ম্যালা দুরে । তুই চউক্ষে ভাপ দিয়া দে । “
এবার মাজেদ এগিয়ে আসে । লুঙ্গির গিঁট খুলে সারা শরীরে বাতাস লাগায় । তারপর জিজ্ঞেস করে,”কোন চউখ? “
-“ডাইন টা । “
-“পানি পড়ে না তো । “
-“অনেক আগে গুতা খাইছি । পানি পড়া বন্ধ অইছে , কিন্তু ভিতরে জ্বলতাছে । “
মাজেদ সরল মনে বিশ্বাস করে । আতিককে চোখ বন্ধ করতে বলে চোখের উপর গামছা রাখে ।

ছোটবেলায় চোখে গুঁতা লাগলে তার আম্মা চোখ আঁচল দিয়ে ঢেকে মুখ লাগিয়ে গরম দম দিতো । তেলেসমাতি ব্যাপার ! চোখ ভালোও হয়ে যেত ! মাজেদ মনে মনে তার মৃত মায়ের কথা স্মরণ করে —- আল্লাগো, আম্মারে তুমি বেহেস্তো নিইয়ো ! তারপর আতিকের চোখে গরম দম দিতে অগ্রসর হয়। আতিকের চোখের উপর গামছা রেখে মাজেদ তার মুখ বসায় । গামছা ভিজে জবজবে হয়ে আছে । এক কোণায় কষ্ট করে একটু শুকনো জায়গা পাওয়া গেছে । ভেজা গামছা দেখে আতিক অনুযোগ জানিয়েছিল , “তুই এত কাম করছ ক্যান ? ” মাজেদ এসব কানে তুলে না । আতিকের চোখের উপর অত্যন্ত নিপুণতায় গামছার শুকনো জায়গা স্থাপন করে,তারপর লম্বা দম নিয়ে চোখের উপর মুখ রাখে । ভাপ দেয় ।

আতিকের শরীর শিরশিরিয়ে ওঠে । মাজেদের মুখ তার মুখের সাথে লাগানো , মাঝে মাঝে ছোট ছোট দাড়ির খোঁচা লাগছে গালের মধ্যে , আর গামছা থেকে মাজেদের গন্ধ আসছে। অপরিচিত একটা অনুভূতি আতিকের মাথা থেকে মেরুদণ্ড বেয়ে নিচে চলে যায় । তার ইচ্ছা হয় শরীরটাকে বাইম মাছের মত বাঁকিয়ে ফেলতে । কিন্তু মাজেদ শক্ত হাতে তার মাথা ধরে রেখেছে ।

আতিক ভেবে পায়না এমন আচানক লাগতেছে ক্যান ? নিজেকে নিজে প্রশ্ন করে । কই,রাতের বেলা রোকেয়া রে জড়াইয়া ধরলেও এমন শান্তি লাগেনা ! রোকেয়ার মুখের সাথে মুখ লাগালেও তার শরীর বাইম মাছের মতন বাঁক মারতে মন চায় না ! অথচ এই মাজেদটার কাছে আসলেই শরীর কী জাহেলী শুরু করে ! তবে আতিক নিশ্চিত জানে,ব্যাপারটার শুরু আজকে থেকে না। সেই সেলিম চাচার সাথে যখন কাজ করতো , তখন মাঝে মাঝে এমন লাগতো।

মহা বজ্জাত ওই সেলিম চাচা । সারাটা দিন তাকে খাটিয়ে মারতো , একদিন পয়সা দিলে তিনদিন দেওয়ার নাম নাই । তবু সে সেলিম চাচার সাথেই লেগে থাকতো । সারাদিন বকা-বাদ্যির পর একবার যদি খালি আদর করে কথা বলতো,কানের পাশে ধরে কানদুটো হালকা করে মুছড়ে দিয়ে হাতটা ধীরে ধীরে আতিকের পিঠে চালাতো,তবেই সে সব ভুলে যেত । মনে হত এরচেয়ে সুখের কিছু নেই । শুধু এইটুকু পাওয়ার জন্য সে সারাদিন খাটতে রাজি ছিল । এবং খাটতোও
সেই সময়টায় হঠাৎ হঠাৎ শরীরের ভেতরে বাইম মাছ নাড়া দিয়ে উঠতো , সারা শরীরে ঝিমঝিম একটা আবেশ ছড়িয়ে যেত আর আতিকের খুব ইচ্ছা করত সেলিম চাচার বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকতে ।
মাঝখানে আতিক এসব ভুলেই গিয়েছিল । মনে করার মত সময় ছিল না । ঘরে বয়স্ক মা,বিয়ে , ঘর -সংসার , নতুন মুখ —— এদের খাওয়া জোটানো নিয়ে এত পেরেশানির মধ্যে থাকতে হয়েছে যে এসব মনেই আসেনি ।

শরীরের ব্যাপার স্যাপার নিয়ে মাথা ঘামানো এদের মত মানুষের কাছে বিলাসিতা । আগে পেট ভরে দু-তিনবেলা খাবার চাই,তারপর শান্তি মত ঘুমানোর কোন জায়গা পেলে অন্য কিছু ভাবা যাবে । তবু শরীর কে তো আর পুরোপুরি অস্বীকার করা যায়না ! কোন কোন সময় শরীর বেশি তাগদ দিলে রাতের বেলা বউ আছেই ।বারকয়েক ঝাপটাঝাপটি করলেই শেষ ।
তবু মাঝে মাঝে আতিকের কী যে হয় ! রোকেয়ার উদ্ধত শরীর দেখে বস্তির অনেকের চোখের ঘুম হারাম এই খবর আতিক জানে । অথচ পাশে শুয়ে থাকলেও আতিকের ভাবান্তর হয়না বিশেষ । অথচ মাজেদের পেটানো শরীর দেখলেই জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা হয় । শরীরে শরীর লাগিয়ে রাখতে মন চায়—–ঠিক যেমন করে রোকেয়া তাকে জড়িয়ে ধরে… ।
কয়েকবার দম দেওয়ার পর মাজেদ থামে —- “অই,ভালা অইছে? “
-“অ “
-“আরও লাগবো? “
-“দে,তোর ইচ্ছা । “
.
চোখের ঝামেলা মিটে যাওয়ার পর মাজেদ কে খানিকটা বিশ্রাম নিতে বলে ।
মাজেদ একটা আস্ত গোঁয়ার । এই গুড়িটাকে সাইজ না করে সে বসতে চায় না ।
এবার আতিক খানিকটা কৌশলী হয়,”আরে জিরা না একটু ! ম্যালা কাটছোস ! বিড়ি আছে , খাইবি? “
বিড়ির কথা শুনে মাজেদ ভাবে , কানের ভেতর আঙ্গুল দিয়ে চুলকাতে চুলকাতে বলে , “বিড়ি আছে ? তাইলে জিরানো যায় । দে । “
বিড়ির নেশা বড় নেশা । সেই নেশার লোভে মাজেদ তার প্রতিজ্ঞা ভুলে বসে যায় । শক্ত গুড়ি ফালাফালা করার প্রতিজ্ঞা ।
লুঙ্গির গিঁটে যত্ন করে রাখা বিড়ি বের করে আনে আতিক । যেন তেন মানুষকে বিড়ি দেয়না সে । বাজারে বিড়ি মাগনা পায়না । কিন্তু এই মানুষটার সাথে বিড়ি ভাগ করতে কোন সমস্যা নেই তার ।
বিড়ি ভাগাভাগির মাধ্যমে চারটা ঠোঁট পরস্পরের স্বাদ পায় ।

রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে রোকেয়া আতিককে জড়িয়ে ধরে । অন্ধকারে আতিকও তাকে জড়িয়ে ধরে । ভাঙ্গা খাট মটমট করে ওঠে । পাশে শুয়ে থাকা বাচ্চা নড়ে উঠে। দুজনেই খানিকক্ষণ চুপ থাকার পর সাবধানে আতিক তার হাত চালায় রোকেয়ার শরীরে—–বুক,পেট, কোমড় আর তারপর আরও নিচে । নিচে । ভেতরে ।
বাঁশের বেড়ার ফুটো দিয়ে রাস্তা থেকে খানিকটা লাইট আসে । সেই আবছা আলোয় আতিক রোকেয়ার মুখ দেখে । আবছা আলোতে রোকেয়ার মুখ অপরিচিত লাগে । অপরিচিত সেই চোখে সে মাজেদের চোখ খুঁজতে চেষ্টা করে ।
রোকেয়ার হাড্ডিসার শরীর তার কাছে মাজেদের পেটানো শরীর মনে হয় । আতিকের শরীরে যৌবনের জোয়ার আসে।
সুখে আতিক শিস দিয়ে ওঠে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.