নন্দন বন হতে

লিখেছেনঃ আধাঁরের কাব্য

আমি বুঝতে পারছি না কোথা থেকে শুরু করবো।জীবনে কিছু কিছু বিষয় থাকে যা একান্তই নিজের।কারো কাছে সেসব অল্পসময়ের জন্য আবেগের,কিন্তু,যার বিষয়,তার কাছে অত্যন্ত মূল্যবান।
আমার জীবনের সব থেকে মূল্যবান কিছু যে দান করেছে,তাকে কিছুই দিতে পারিনি কখনো।
আর দশজনের মতো আবেগপ্রবণ ছিলেন না কমলদা।একটু চাপা স্বভাবের।শ্যামলা গায়ের রঙ।একটু বেশিই লম্বা।বলিষ্ঠ শরীর।বিশেষ করে হাত দেখলেই উনার কঠোরতা বুঝা যেত। মুখভর্তি খোঁচা খোঁচা দাড়িগোঁফ।কিন্তু,মানুষকে জয় করতে পারতেন সহজেই।অমন সুন্দর করে কেউ হাসতে পারে নাকি?
আমার সাথে প্রথম পরিচয় ১৯৬৯ এ।তখন,গ্রাম থেকে সবে এসেছি।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ পড়ার জন্য। সবে ভর্তি হয়েছি।এলাকার একটা বড়ভাই ছিলেন।হলে সিটের ব্যবস্থা হলো।তখন হলগুলো অনেক ভালো ছিলো।ভালোছাত্রের সাথে থাকার ব্যবস্থা হলো।বাড়ি থেকে আসার সময় মা ছলছল চোখে বারবার সাবধানে থাকতে বলেছে।

এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই ভাইয়ার সাথে আমার নতুন ঘরে আসলাম।তখনই উনার সাথে পরিচয় হলো।আমার রুমমেট কমলদা।কমলকৃষ্ণ চক্রবর্তী।চক্রবর্তী হলে কি হবে?পরে জেনেছিলাম ধর্মের ছিঁটেফোঁটা নেই।নাস্তিক।রাজনীতি করেন।আমার একবছরের সিনিয়র।তবে,শরীরটা একটু বেশিই বাড়ন্ত।আমি কখনো বাইরে থাকিনি মাকে ছেড়ে।এই প্রথম।রুমমেটটাও বেশি কথা বলেনি।অস্বস্তি কাটছিলো না।প্রথম রাতের কথা আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে।রাতে বিছানায় শুয়ে চুপিচুপি কাঁদছি।মায়ের কথা মনে পড়ছে।হঠাৎ,দাদা আমার বিছানায় এসে বসলো।আমি খানিকটা অপ্রস্তুত।উনি বললেন,’চল্।বাইরে যাই।’
আমি তখন নতুন।ভয়ে কিছু না বলে ওভাবেই যাচ্ছিলাম।’কাপড়টাতো বদলে ফেল্!’ কমলদা হাসতে হাসতে বললেন।আমিও এবার হাসলাম।
সেরাতে অনেক জোৎস্না ছিলো।আমরা হলের সামনে এলাম।তারপর হাঁটতে থাকলাম।দাদা অনেক কিছু বললেন।সান্তনা দিলেন,যেন বাড়ির কথা ভেবে মন খারাপ না করি।এসব।
আমার সব কথাই সে রাতে জেনে নিলেন।আমরা অনেক ধনী।আগে জমিদার ছিলাম।বাবা ইন্ডিয়া যায়নি। কখনো যাবেনা।সব বললাম।
উনি বললেন,’তোর বাবার সাথে দেখা করবো।স্যালুট করবো।এটা তো আমাদেরও দেশ।তাই না?কেন চলে যাবো আমরা।’
দাদা বলতে থাকলেন আরও অনেক কথা।উনার কেউ নেই।শুধু পিসি ছিলেন একটা।তাঁর ছেলেরা তাকেও ভারতে নিয়ে গেছে।দাদাকেও যেতে বলেছিলো।যায়নি।বললেন,’তুই বল্!এটা আমার দেশ না?দেখিস!একদিন আমরা সেকেন্ডক্লাস সিটিজেন আর থাকবো না!সবাই সমান হবে!’
-সত্যি কি তেমন হবে,দাদা?
উনি উৎসাহে আমার হাত চেপে ধরলেন।
-তুই আমাকে বিশ্বাস কর্!একদিন সত্যি হবে।কিভাবে জানি না।

উনার চোখে অন্যরকম আত্মবিশ্বাস ছিলো।আজও মনে পড়ে তেমনিভাবে।
সেদিন থেকেই আমি দাদাকে আমার অনেক কাছের ভাবতে থাকলাম।
কয়েকদিন যাওয়ার পর এখানকার সব হালচাল বুঝলাম।
কমলদা সারাদিন ব্যস্ত থাকেন। ঘরে আসেন অনেক রাতে।

এসেই অনেক গল্প করতে শুরু করেন।আমিও আগ্রহ নিয়ে শুনি।উনার উৎসাহ আরো বেড়ে যায়।আমার দেশ নিয়ে মোটেও মাথাব্যাথা নেই।উনার কথাবলা এত ভালো লাগে দেখতে!
-কিরে?হা করে কি দেখছিস?নেতাদের কি মুক্তি দেবে?আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলা তুলে নেবে?তোর কি মনে হয়?
আমি অপ্রস্তুত হয়ে বলি-বারে!আমি কি করে বলবো?তুমি মিছিল করো।তুমি জানো!আমি কি জানি!
-এতক্ষণ তবে কি বললাম?
-জানিনা!আমার ভয়ে গা কাঁপে!কবে তোমার কি হয়!
-আমার কিছু হলে তোর কি?
উনি হাসতে হাসতে বলেন!
সে জবাব কখনো দিতে পারিনি।নীরবতা কেড়ে নেয় আমাকে তখন!
উনি আবার বলেন সিরিয়াস মুডে,’সকালে উঠেই ঢংঢং করে ঘন্টা বাজিয় পূজা করবি না প্রতিদিন!উফ্।কি এত দরকার!আমার কাছে চাস্।দিয়ে দেবো!’
এবার ভয়ে গা শিউরে উঠে আমার!ঠাকুর দেবতাদের নিয়ে এসব কিরকম কথা!তখনই মনে মনে বলি,’ঠাকুর! উনি অবুঝ!রাগ করোনা!হাজার বার নাসজপ করবো!’
-মনে মনে কি বলছিস আবার!একে নিয়ে তো মহা যন্ত্রনা।এত অল্পে মেয়েদের মতো চোখে জল আসে কেন?
-তোমার দেখতে হবে না। ঘুমাও!সারাদিন ঘোড়ার মতো দৌড়ে তবু রাতে ঘুম নেই।

এভাবেই চলছিল দিনগুলি।বাবা দেখতে এলেন আমাকে।কমলদার সাথে অনেক কথা বললেন!দুজনে দারুন ভাব হলো দেখলাম।যাওয়ার আগে বাবা বললেন,’আমার আর তোকে নিয়ে চিন্তা নেই।ছেলেটা ভালো।ওই দেখে রাখবে এখানে!’

এটা নিয়ে পরে দাদা যা মজা করলেন।’তোর সব দায়িত্ব কিন্তু আমার!কাকুকে কথা দিয়েছি!’
খুব ভালোই যাচ্ছিলো দিনগুলি।এরমধ্যে পুলিশ ধরে নিয়ে গেল দাদাকে।মিছিল থেকে।আমি জানলাম সন্ধ্যায়।কি করবো।কিছু বুঝছিলাম না!ঢাকায় বাবার বন্ধু এক ব্যরিস্টার আছেন। আমাদের ফরিদপুরের বাড়িতে অনেক গেছেন।উনার ঠিকানা আছে। কখনো যাই নি আগে।কি করব?কিছু বুঝতে পারছিলাম না।অনেক খুঁজে উনাকে পেলাম।একবার বলতেই উনি গাড়ি নিয়ে আমার সাথে এলেন।অনেক দৌড়াদৌড়ির পর রাত এগারোটায় ছাড়া পেলেন দাদা।কাকু বললেন,’কয়েকদিন ঢাকায় না থাকুক।ঝামেলা শেষ হলে আসবে!’
আমি সারাপথ একটি কথাও বলিনি দাদার সাথে।ঘরে এসে দরজা বন্ধ করার পর উনাকে জড়িয়ে ধরে অনেক কেঁদেছিলাম।ঠাকুরের কাছে কতবার বলেছি!উনি একটু অপ্রস্তুত মনে হলো!বললেন,’কি করছিস?কাঁদছিস কেন?’
কিছু বলতে পারিনি।ছেড়ে দিয়ে নিজেও লজ্জা পেলাম।চোখ মুছে খেয়ে নিতে বললাম।উনি হাসতে হাসতে বললেন,’কিভাবে?এই হাতে?’
আমি এতক্ষণে দেখলাম, দুটো হাতের তালুই কেটে কেটে গেছে।না জানি কত কষ্ট পেয়েছেন।
বললেন,’অত্যাচার করাটা ভালোই শিখেছে।নে!আর না কেঁদে তুলে খাওয়া!না হলে,না খেয়েই থাকতে হবে!’
এটা আমি ভাবিনি।ঈশ্বর এতটাও দান করবেন!
আমি খাওয়াতে খাওয়াতে বললাম,’একটা কথা রাখবেন?’
-কি?তোদের বাড়ি যাওয়ার কথা বলবি তো?আমি জেল,পুলিশ ভয় পাই না!
-আমি পাই।তোমাকে নিয়ে কাল চলে যাবো!
-তোর কথা শুনবো কেন?তুই কে আমার?
এই কথাটা বড় বুকে লাগলো!তাই তো!আমি কে?নিজেই তো জানি না কেন এসব করছি।তাও,একটা ছেলের জন্য!বড় ভাই ভেবে?এরকম কত বড় ভাই ই আছে!তবে?
আমি আর কিছু বলতে পারি নি।

উনি গেলেন না।কদিন পর সেই উত্তাল দিনগুলি শেষ হলো।গণঅভ্যূথান এর পর মোটামুটি শান্তই ছিলো।
এরমধ্যে কমলদার সাথে আমার সম্পর্ক আরো গভীর হয়েছে।তুমি করে বলি এখন।আরো একবার ইন্ডিয়া যাওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন।দেশ নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেন উনি।আর,সব কিছুতে সমর্থন দিয়ে যাই আমি।সবভাবে।শুধু পুজো করতে বসে ঠাকুরকে বলি উনাকে যেন ভালো রাখেন উনি।তখন,বাবা মা কিছু মনে থাকে না।
সব ঠিকঠাক চলছিলো।এরমধ্যেই একদিন অদিতি দিদির সাথে কমলদা পরিচয় করাতে নিয়ে গেলেন।তখন,বাইরে দেখাসাক্ষাৎ করা খুব শোভনীয় ছিলো না।তবুও,দেখা হলো।অসম্ভব সুন্দর।পুতুল পুতুল।দুজন কে একসাথে দেখে খুব ভালো লাগলো।কিন্তু,বুকের কোথায় একটা চিনচিনে ব্যথা।জানতাম না কেন?এখন এ বয়সে এসে জানি।কোন অনুভূতিতে অমন হয়েছিলো। তখন পাত্তা দিইনি।দুজনকে পাশাপাশি দেখে আলোর মাঝে আরেকটা আলো,এমন মনে হচ্ছিলো।যদিও কমলদা শ্যামলা ছিলো। উনারা অনেক গল্প করলেন।কিভাবে উনাদের দেখা সব।দিদির বাড়ির সবাই রাজি।দাদার পড়া শেষ হলেই বিয়ে।তারপর,দুজনকেই আমেরিকা পাঠাবে।যদিও,দাদা যেতে চায় না!
দুজন দুজনকে নাকি খুব ভালোবাসে।শুনে ভালোই লাগলো।
সেদিনের পর থেকে আমিও বোধহয় একটু বদলে গেলাম।একটুখানি।দাদার সাথে আর বেশি মজা করতাম না।সবসময় পড়তাম!
সত্তরের নির্বাচন,আরও কত কি হয়ে গেলো।সাতই মার্চ।হরতাল।আমি তবুও বাড়িতে যাইনি।বাবা বারবার বলতেন।তবুও যাইনি।কখনো কাকুর বাসায় থেকেছি।একটাই কারণ,কমলদাকে কে দেখে রাখবে।কাকে দিয়ে যাবো?উনি যাই বলুন,আমাকে উনার দরকার।উনি জানেন না হয়তো!
দাদা সবসময় ব্যস্ত থাকতেন।এরমধ্যেই একদিন রাতে বললেন,’তোর সাথে তো বেশি কথাই বলতে পারিনা।আমার জিনিসপত্রেও কি আজকাল হাত দেয়া যায় না?তোর জন্য ফিরোজা বেগমের রেকর্ড এনেছিলাম।খুলেও দেখিসনি!এখন প্লে কর।’
আমি কিছু না বলে রেকর্ড নিলাম।প্লে করলাম। উনি লাইট অফ করে শুয়ে পড়লেন।আমি বসে থাকলাম রেকর্ডের পাশে।মিষ্টি গান হচ্ছিলো,’রে পাগল,একি দুরাশা,
জলে তুই বাঁধিবি বাসা,
মেটে না হেথায় পিয়াসা,
হেথা নাই তৃষা দরিয়া।।’

আমি কাঁদছিলাম অঝোর নয়নে।ভাগ্যিস লাইট অফ ছিলো।সেটা ২৩ মার্চ।১৯৭১।
হঠাৎ,কেউ আসার সামনে এলো।আমাকে উঠালো।কমলদা!জড়িয়ে ধরে বলল,’তোর কিসের এত কষ্ট!কেন কাঁদছিস?ঠাকুর বুঝি কথা শুনেনি?’
আমি ভাবলাম উনি মজা করছেন।
কিন্তু,না!বললেন,’আমার কাছে চাইতে বলেছিলাম।চেয়ে দেখ একবার!’
আমি কিছু চাইতে পারিনি।
যদি চাইতাম!দিতেন কি উনি?
আমি শুধু উনার বুকে মাথা রেখে কাঁদছিলাম।
পরদিন সকাল থেকেই দাদা আবার উধাও।তার পরদিন কাকু এলেন।বললেন,’কিছু শুনতে চাইনা।তুমি আর কমল।কালই ফরিদপুর চলে যাবে!ওখান থেকে ভারতে।তোমার বাবার এটাই আদেশ।আর,আজ আমার বাসায় থাকবে।কাল সবাই একসাথে যাবো।’
কমলদা তখন এলেন।কাকু প্রায় জোর করেই আমাদের দুজনকে নিয়ে গেলেন। বুঝলাম না কেন যেন বাবার কথা শুনেই এককথাতেই কমলদা রাজি।

সেরাতে আমরা কাকুর বাসাতেই ছিলাম।মাঝরাতে সেই নারকীয় ঘটনা।আমরা কিছু ভাবিই নি।চমকে উঠলাম ঘুম থেকে।তারপর,সবাই একঘরে।অন্যরকম এক আতঙ্ক।রাস্তায় ট্যাংকের ঘরঘর শব্দ।সবাই চুপিচুপি কাঁদছি লাইট বন্ধ অবস্থায়।শুধু কমলদা দেখি আমাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে।আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,’জানতাম আমি এমনটাই হবে।তুই দেখিস।এবার সব ঠিক হবে।আমরা এমনিতে ছেড়ে দেবো না।সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন আর থাকবো না।’
আমি অবাক হয়ে তাকালাম।এ কে?মানুষ?না কি?সবাই এখন নিজের জীবনের কথা ভাবছে।আর উনি!এখনো দেশ!
আমাকে আরো শক্ত করে ধরলেন।হয়তো উনি শক্তি চাইছেন আমাকে ধরে!কিন্তু,আমার আর ভয় লাগছিলো না!শুধু বাবা মার জন্য চিন্তা হচ্ছিলো।
সেই নারকীয় রাতও একসময় ভোর হলো!আমার সে সকালে পুজা করা হলো না!
বাইরে রাস্তায় গাড়ি নেই।কি করে ফরিদপুর যাওয়া হবে। রাস্তায় কুকুর ঘুরছে।কাকীমা একটু ঘুমিয়েছেন।কমলদাও ঘুমুচ্ছে।কাকু বাইরে!আমি দাদার মুখের দিকে তাকিয়ে আছি।কেন এমন হলো?নিজেদের মতো স্বাধীনভাবে বাঁচতে চাওয়াই অপরাধ?এটা আবার কেমন?এই প্রথম দেশ নিয়ে অমন করে ভাবছি।আর,এই মানুষটা?মনে হয় অদিতিদির চিন্তা করছেন?কেমন আছেন দিদি?মা বাবা কি করছে?ঢাকার খবর এতক্ষণে ফরিদপুর যাওয়ার কথা।না জানি কত চিন্তা করছে সবাই।
কমলদা ঘুম থেকে উঠেই বাইরে গেলেন।
আমি জানি অদিতিদির বাসায়!যাক।ভালোবাসার মানুষ।সবচে আপন।যাবেই তো!অদিতিদিও হয়তো ওঁর কথাই ভাবছেন।
বিকেলে কাকু এলেন।বললেন,’রাতে যাওয়া যাবে না। কাল সকালের ব্যবস্থা করলাম।অবস্থা খুব খারাপ!লাশ আর লাশ রাস্তায়!’
একটু পরে ই কমলদা আসলেন।এসেই বাথরুমে গিয়ে বমি করলেন।
বললেন,’কাকু!হিন্দু হওয়া কি অপরাধ?’
-কেন বাবা?ওরা সবাইকে মেরেছে।হিন্দু,মুসলমান কেউ বাদ যায়নি। তুমি শুয়ে থাকো।কাল সকালেই ফরিদপুর চলে যাবো।এদেশে থাকবো না।’
আমি কমলদার সাথে ঘরে গেলাম।
উনি আমাকে জড়িয়ে ধরে বাচ্চাদের মতো কাঁদতে লাগলেন।এই প্রথম উনাকে এমন করে দেখলাম।
বললাম-অদিতিদি ঠিক আছেন?
-ওরা গতকালই চলে গেছে গ্রামের বাড়িতে।আমাকে বলেনি পর্যন্ত।
-সময় পায়নি হয়তো।
-তুই তো আমাকে ছেড়ে চলে যাসনি।কবেই তো যেতে পারতি। ক্লাস,পরীক্ষা কিছু নেই।
উনি বললেন,’গোটা ঢাকা লাশে ভরে গেছে।অমল,তমাল,কবির আর সবাইকে মেরেছে কাল রাতে।যাদের পেয়েছে সামনে।’
আমি কি বলবো।দেখি উনি চোখ বন্ধ করলেন।ঘুমিয়ে পড়েছেন।আমাকে শক্ত করে ধরে আছেন।আহারে!ঘুমাক্।না জানি মা কি করছে!
রাত থেকেই কমলদার জ্বর এলো।বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে।ডাক্তার কোথায় পাওয়া যাবে।কাকুর কথা কখনো ভুলব না।এত ভালো মানুষ।রক্তের সম্পর্ক নেই।তবুও কত গভীর।উনি নিজে উনার বন্ধু ডাক্তার নিয়ে এলেন।অবাক ব্যপার কমলদাকে চিনলেন ডাক্তার সাহেব।’এ ছেলেকে চিনি তো।কে হয় তোমার?এত ভালো ছেলে।জুয়েল!দেশের গর্ব।’
-ডাক্তার।ওকে ঠিক করে দাও।আমার বন্ধুর ছেলে।এদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে।আমরা তো বুড়ো!
পরপর দুরাত প্রায় জেগে ছিলাম।কি আতঙ্ক।যারা সেসময়ের তারা জানে। এই বুঝি বাড়িতে মিলিটারি ঢুকল!
পরদিন সকালে অর্ধচেতন অবস্থায় কমলদিকে নিয়ে বের হলাম আমরা।নিজেদের গাড়ি রেখে ট্যাক্সিতে।আমি উনাকে ধরেছিলাম।গোসল করেনি।গা থেকে কেমন গন্ধ আসছে।তবুও ঘৃণা লাগছে না।
এরপর ট্যাক্সি থেকে নেমে যা দেখলাম!আমার জীবনের সবচে জঘন্য দৃশ্য!একটা ১৭ বছরের মেয়ে।রাস্তায় উলঙ্গ হয়ে পড়ে আছে।স্তন কেটে নেয়া।মুখের চারপাশে মাছি ঘুরছে।চোখ খোলা।আমি বমি করে ফেললাম।কমলদা প্রায় সুস্থ।এত নিষ্ঠুর হতে পারে মানুষ?হোক না পাকিস্তানের।মানুষ তো!আমরা নৌকাতে ছিলাম।তখনো কাঁদছি।কমলদা ফিসফিস করে বললো,’প্রথম তোদের বাড়ি যাচ্ছি।এরকম পাগলের মতো!ঢুকতে দেবে তো!আর,আমাকে জড়িয়ে ছিলি কিভাবে।বমি আসেনি?’
-যাও!এখন হাসানোর চেষ্টা করোনা।
উনি আবার বললেন,’সব ঠিক হয়ে যাবে একদিন।আমি বলছি।আমরা ঠিক করবো।তোকে ছুঁয়ে বললাম।তোর ঠাকুরও বলবে!’
-সত্যি?বলো?আবার আমরা ফিরোজা বেগমের গান শুনবো রাতে?তুমি আর আমি রাতে আবার বৃষ্টিতে ভিজবো?
-হুম।সত্যি।তোকে বললাম তো!সব ফিরিয়ে দেবো।

বেগে গিয়ে সবাইকে ঠিক দেখে একটু স্বস্তি।কিন্তু,দেরী না করেই আবার যাত্রা শুরু।এবার ভীনদেশে।গ্রামের দিকে এখনও যুদ্ধ পৌঁছেনি।লোকজন অবাক হচ্ছে আমাদের কথা শুনে।আমরা অনেকটা আগেই যাই।তখনো শরণার্থীদের স্রোত তৈরী হয়নি।আমরা ওখানে এক আত্মীয়ের বাসায় উঠলাম।আমার বাবা বরাবরই চতুর মানুষ।সব ব্যবস্থা করেই এসেছেন।ছোট ভাই বোন দুটিও কেমন চুপ করে ছিলো।কমলদা এমন ভাব দেখাচ্ছে যেন পিকনিক করতে এসেছে।আমার ভাইবোন দুটি আর মা সবসময় কমলদার সাথেই!যেন কত আপন!ভালোই লাগছিলো। প্রথমকয়েকদিন একটু অগোছালোই কাটলো।তারপর,সম্ভবত এপ্রিলের শেষে।
কমলদা আমাকে বললেন,’তোকে আগে বলিনি।আমি আজই চলে যাবো।তোকে কথা দিয়েছিলাম না!সব ঠিক করে দেবো।আমি যুদ্ধে যাচ্ছি।আর কি বলবো।যুদ্ধ শেষে তোর কাকুর বাড়ি যাবো।আমার না ফিরলেও ক্ষতি নেই।কোনও পিছুটান নেই।কিন্তু,ভালো করে ভেবে দেখলাম।আমার একমাত্র পিছুটান তুই।তোর জন্যই ফিরে আসবো।একসাথে ফিরোজা বেগমের গান শুনবো।আমি বিদ্রোহী কবিতা আবৃত্তি করবো,তুই গালে হাত দিয়ে শুনবি।তুই হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাইবি,আমি বিরক্ত করবো।গভীররাতে বৃষ্টিতে ভিজবো হাত ধরে।তুই আবার আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদবি।ওকি!কাঁদছিস কেন?আমার জীবনে কোনও ভালোবাসা,পিছুটান কিছু ছিলো না।তুই একাই সবটা পূর্ণ করে দিয়েছিস।এতটা দিয়েছিস উপচে গেছে।কিন্তু,আমি আরও চাই।আমি চিরকালই গোঁয়ার!অবাধ্য।তোর সাথে আরও অমন করে রাগিয়ে দিতে চাই। আমি সবকিছুর স্বাধীনতা নিয়ে ফিরে আসবো। অপেক্ষা করিস।’
আমি কাঁদছিলাম।বললাম,’যদি পারতাম বাধা দিতাম।চাইনা আমার স্বাধীনতা।দেশ চাইনা।কিচ্ছুটি চাইনা।কিন্তু,বাধা দেবনা।মায়ের ডাকে সাড়া দিচ্ছ।আমার সময় হলে আমিও সাড়া দেবো।মা ডাকছে দাদা!আমরা সবাই মায়ের অপমানের বদলা নেবো।মুক্ত করবো।তুমি শুধু তোমার খেয়াল রেখো।ঠাকুর আছেন।আমি অপেক্ষা করবো তোমার জন্য।’
এরপর উনি মুচকি হেসে প্রথমবারের মতো আমার কপালে চুমু দিলেন।তারপর, চলে গেলেন। আমার বুক ভেঙে যাচ্ছিলো।আমার একান্ত নিজের মানুষ,সম্পূর্ণ আমার।সে চলে যাচ্ছে।যাক্।আগে দেশ।আমার গর্ব হচ্ছে উনার জন্য।বীরপুরুষ।দেশের জন্য সব করতে পারে!
কমলদা যাওয়ার একমাস পর্যন্ত আমি কেমন অন্যরকম হয়ে যাই।সারাক্ষণ পূজার ঘরে থাকি।
কাকু আর বাবা একদিন বললেন,ওপার বাংলা থেকে কিছু শিল্পী একটা দল করেছে।এরা গান গেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস যোগাচ্ছে।ফান্ড রেইজ করছে।আমি তাদের সাথে যেতে পারি।বাবা বাধা দেবে না।আমি মহানন্দে রাজি হই। যদি কমলদার দেখা পাই!দেশের জন্যও তো কিছু করতে পারবো।উনার সামনে বলতে পারবো,’আমি তোমার অযোগ্য নই। আমিও দেশের জন্য সব করতে পারি!’
ঘুরে ঘুরে গান করতাম আমরা।স্বপ্ন দেখাতাম।কিন্তু,দাদার দেখা পেতাম না!
যখন বিজয়ের খবর আসতো তখন সবাই আনন্দে উল্লসিত হতাম।কেউ ভাই হারিয়েছে।কেউ বাবা,মা।কত কষ্টের দিন!আমরা কখনো একবেলা খেতাম!তখনও,আমার মনে হতো উনি কি খাচ্ছেন।
সব কষ্টের শেষ হলো। আমরা স্বাধীনতা পেলাম।ফিরে এলাম সরাসরি ঢাকায়।একবুক আশা নিয়ে।এতক্ষণে বোধহয় দাদা ফিরে এসেছে।আমাকে না দেখে রেগে আছেন।
কিন্তু,কাকুর সাথে গিয়ে দেখলাম কেউ নেই!দাদা আসেনি।ভাবলাম,পরদিন আসবেন।পরদিনও এলেন না!আমি ঠাকুরের সামনে লুটিয়ে পড়ে কাঁদলাম।তবুও, কোনও ফল হলো না।দাদা এলেন না!চারদিকে সবাই আনন্দ করছে।কত স্বজন হারিয়েছে সবাই।কেউ একমাত্র ছেলেকে।কারো চোখের সামনে মেয়েকে ধর্ষণ করেছে।কত কষ্ট এক জীবনে!স্বাধীনতা এলো।আমরা আর সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন না।দাদা আমার জন্য সব ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন।কই!তিনি স্বাধীনতা দিলেন।নিজে ফিরে এলেন না তো!কার সাথে বৃষ্টিতে ভিজব!
দিন দিন আমার হতাশা বাড়তে থাকলো। সবাই ফিরে আসলো।উনি তো এলেন না!আমি প্রায়ই খোঁজ নিতাম কাকুর বাসায়!দাদা এসেছেন কি না!
আসেন নি!না জানি কোন নির্জন বনে হয়তো শুয়ে আছেন।জোৎস্না চুঁয়ে চুঁয়ে পড়ে উনার শরীরে।পরম মমতায় এদেশের মাটি বুকে ধরে আছে শ্রেষ্ঠ সন্তানকে।
তবুও,এ বুড়োবয়সে এসেও আমি অপেক্ষা করি।ভাবি।এই বুঝি উনি আসলেন!ঘুমের মাঝে আবছা ভাবে কে যেন দেখা দিয়ে মিলিয়ে আছে।জেগে উঠি।সমস্ত রাত আর ঘুমুতে পারি না।ও হ্যা।যুদ্ধের পরে অদিতিদির বিয়ে হয়েছে।
শুধু আমিই বদলাইনি।আজও অপেক্ষা করছি।ঝাপসা দৃষ্টি নিয়ে। বেশি দেরী নেই।উনি না আসলেও,আমিই যাবো উনাকে খুঁজতে।ঠিক পেয়ে যাবো!

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.