নাস্তিক

লিখেছেনঃ শোভন কুমার

(প্রেম মৃত্যুকে দেয় মহিমা, জীবনকে দেয় গৌরব, আর প্রবঞ্চিতকে দেয় কি? প্রবঞ্চিতকে দেয় দাহ, যে আগুন আলো জ্বালে না, অথচ দহন করে। সেই দীপ্তিহীন অগ্নির নির্দয় দাহনে পলে পলে দগ্ধ হল কাণ্ডজ্ঞানহীন হতভাগ্য চারুদত্ত আধারকার। – এইটি যাযাবরের ‘দৃষ্টিপাত’ উপন্যাসের একটি বিশেষ লাইন। এই লাইনটি আমার গল্পের নায়ক ঋত্বিকের সাথে অনেক মিলে গেছে –তাই উল্লেখ করলাম।)

নাস্তিক। এই শব্দটা অনেকের কাছে খুব আপত্তিকর। আশে পাশের কেউ নাস্তিক শুনলেই আমরা অনেকেই নাক সিটকাই, ভাবি – এ হল সকল আদি পাপের আঁধার। তাই নাস্তিকদের আমরা ঘৃণার চোখে দেখি। কিন্তু এ কথাটা যে ভুল তা রবীন্দ্রনাথ তার ‘চার অধ্যায়’ গল্পে জ্যাঠামশায় ও ভাইপো সতিশ চরিত্র দিয়ে বুঝিয়েছেন। তাঁদের আদর্শ ছিল আমরা নীতিবিরুদ্ধ কোনও কাজ করবো না পাছে লোকজন আমাদের নাস্তিকতা ধর্মটাকে গালি দেয়।জ্যাঠামশায় আরও বলতেন, আস্তিকরা যত খুশি নীতিহীন কাজ করুক না কেন, আমরা বিবেকের বাইরে কিছু করবনা।

বন্ধুরা, আপনাদের এখন যেই গল্পটি বলব তা আমার এক নাস্তিক বন্ধুর। তার নাম ঋত্বিক। আমার দেখা পৃথিবীর একজন খাঁটি মানুষ। উপরের যে জ্যাঠা মশায়ের কথা বললাম, সে তার অনুসারী। তার প্রথম ধর্ম, কাউকে কোনও কথা দিলে তা জীবন দিয়ে হলেও রাখতে হবে।তারপর ন্যায়-অন্যায়ের স্পষ্ট সীমারেখা দিয়ে চালিত ঋত্বিক খুবই বিবেকবান ও বোধবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ। এরকম আরও কত কি? তার গুণের কথা বলে শেষ করা যাবে না। তার এত গুণের জন্য আমাদের সকল বন্ধু তাকে ভীষণ ভালোবাসে। তাই নাস্তিক জেনেও আমরা তাকে মাথায় করে রেখেছি।আমরা বলি, এটা তোর ব্যক্তিগত ব্যপার। তবু কিছু বন্ধু তার দারা এমন ভাবে প্রভাবিত হয়েছে যে তাকে গুরু মেনে নাস্তিকতায় দীক্ষা নিয়েছে।বলে রাখা ভাল, ঋত্বিকের সকলের সাথে মিশলেও আমাকে শুধু তার মনের গোপন কথাগুলো বলত। যদিও আমি আস্তিক, তবুও আমার উপর ছিল তার রাজ্যের বিশ্বাস। সদা হাসিখুশি, প্রাণচঞ্চল, অত্যন্ত রোমান্টিক, মিশুক ছেলেটি যে ভিতরে ভিতরে ভীষণ একা তা কেবল আমি জানতাম, পৃথিবীর আর কেউ তা জানত না।

আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়ছি। সামনে মাস্টার্স পরীক্ষা।পড়ার ভীষণ চাপ। এর মধ্যে আমার প্রেমিকা মৌ–এর সাথেও প্রতিদিন দেখা করতে হয়। তবু রাতে হলে ফিরে ওর সাথে ঘাটে বসে আলাপ করতে হয়। সকল বন্ধুরা চলে যাবার পরও ও আমাকে আরও ঘণ্টা খানেক বসিয়ে ওর ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে বলত, আমিও আমার কথা বলতাম। বেশ কিছুদিন ওর সাথে তেমন কথা হয় না। বলেছিল, ওর মামা কানাডা গেছে, তাই মামী ও মামাতো ভাইবোনের জন্য মামার বাসায় থাকছে। গতকাল ওকে হল গেটে পেয়ে ভীষণ খুশি হলাম, কিন্তু ওর গম্ভীর মুখ আমার হৃদয়কে নাড়িয়ে দিল। প্রশ্ন করলাম, বিষয়টা কি? সে যে বিষয়টা আমাকে বলল তার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। যাকে আমি কোনদিন হতাশ হতে দেখিনি, তাকে মনে হল যন্ত্রণা ওকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে।ওকে নিয়ে শহিদুল্লাহ হলের পুকুর ঘাটে এসে বসলাম। ও ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না কীভাবে কথাটা বলবে। আমি বার বার অভয় দেয়ার পর, সে আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললো। সে যা বলল তা অনেকটা এরকম।

গত কিছুদিন ধরে অর্ক নামে একজন ৩০ ঊর্ধ্ব লোকের সাথে আমার ফেসবুকে ও মোবাইলে কথা হচ্ছিল।কথা বলতে বলতে আমার মনে হচ্ছিল আমি লোকটির প্রেমে পড়ে গেছি। এমন একটা ঘোরের জগতে আমাকে নিয়ে গিয়েছিলো, আমি রীতিমত মোহগ্রস্ত ছিলাম।

যেহেতু আমি জানতাম সে সমপ্রেমি, তাই আমি আঁতকে উঠিনি। বলে রাখা ভাল, আমি আস্তিক হলেও অনেকটা যুক্তিবাদী, দুনিয়াদারির খবর রাখি।আমি জানতাম, ছেলে-মেয়ে যেমন প্রেম হয়, তেমনি মেয়ে-মেয়ে বা ছেলে-ছেলেও প্রেম হতে পারে। তাকে আরও উৎসাহ জাগিয়ে বিষয়টা খুলে বলতে বললাম।


সে বলল,তুই তো জানিস আমি কোনও মেয়েকে কোনদিন ভালবাসতে পারবোনা। নাস্তিক হয়েছিলাম ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে নয়, মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে। অভি যেদিন আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলো, তখন থেকে আমি আর কারো সাথে কোনও সম্পর্ক করিনি। তোদের সবাইকে নিয়ে আনন্দ–ফুর্তিতে দিন কাটাচ্ছিলাম।

বললাম, এখন কি হল তাই বল, খুলে বল?
-আমি যেদিন অর্কের সাথে দেখা করতে ওর বাসায় যাই, সে আমাকে পাগলের মতো আদর করেছিল। সারারাত এত কথা ও এত গল্প করেছিলাম যে, আমার মনে হল, আমি সব পেয়ে গেছি। আমি যাকে খুঁজছি এই সেই।আমার প্রতিজ্ঞা ভেঙে আমি মনে মনে আস্তিক হয়ে গেছিলাম।শুরু হল আমাদের আনন্দ-যাত্রা। প্রতিদিন তার বাসায় যাওয়া। সে আমাকে চুম্বকের মতো টানতে লাগলো। বিকেলে অফিস থেকে ফেরার পথে সে আমাকে গাড়ীতে করে বাসায় নিয়ে যেত। অন্য রকম সুখ সাগরে আমি ভাসতে লাগলাম। সে আমাকে অনেক আদর করে খাওয়াই দিত,স্নান করিয়ে দিত। আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত এমনভাবে সে চেটে দিত মনে হতো আমার মতো এমন সৌভাগ্যবান পৃথিবীতে আর কেউ নেই। সে পাগলের মতো আমায় চুম্বনে চুম্বনে সিক্ত করত। এর মধ্যে সে আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। আমিতো আনন্দে আত্মহারা। মনে মনে ওকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করি। আমাকে নিয়ে থাইল্যান্ডের পাতাইয়াতে মধুচন্দ্রিমাও করে আসে। এখানে একটা কথা বলা হয়নি, ওর অন্য এক বয়ফ্রেন্ড ছিল যে চট্টগ্রামে থাকতো। সে ফ্রেন্ডের কথা আমাকে যখন জানালো, আমার মনে হল,থাক না, আমি যা চাই তাতো পাচ্ছি, ওর ফ্রেন্ড নিয়ে মাথা ঘামিয়ে আমি আমার সুখের সংসার ভাঙবো কেন? আমার সামনে সে ওই ফ্রেন্ডের সাথে বিভিন্ন কথা বলত, আমি কিছুই মনে করতাম না।

এভাবে চললে কি ক্ষতি হতো? হঠাৎ সেদিন সে জানালো যে, তার ওই বয়ফ্রেন্ড একবারেই ঢাকা চলে আসছে।তাকে সে কষ্ট দিতে পারবে না। কারণ তাঁদের দীর্ঘ ২ বছরের সম্পর্ক। আমি যেন সরে যাই তার জীবন থেকে –এই অনুরোধ। আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। আমি এখন কি করবো? অর্কের কথায় সামান্য একটু অনুশোচনা ছিল মাত্র। তাও মনে হল অভিনয়।তার আবার প্রচণ্ড ধর্মবিশ্বাস। আমার মাথা কেবলই ঘুরতে লাগলো। একবার মনে হল, সে হয়তো আমাকে পরীক্ষা করছে। কিন্তু না, আমি ভুল। কারণ সে আমাকে তার বাসায় যেতে সম্পূর্ণ নিষেধ করে দিয়েছে, এমনকি ওর সাথে কোনও ধরনের যোগাযোগ করতেও বারণ করেছে।তার বন্ধুটি এখন বাসায়।

এখানে আমার কি অপরাধ? আমি তার কি ক্ষতি করেছিলাম।কেন আমাকে নিয়ে এই নিষ্ঠুর খেলা খেলল? কেন সে আমার সাথে এমন করলো? আমিতো নিজের মনে নিজের কর্মকাণ্ড নিয়ে বন্ধু বান্ধবসহ ভালোই দিন পার করছিলাম। অভির প্রসঙ্গ তুলে তাকে মাঝে মাঝে আমি মান্না দের ওই গানটা শোনাতাম, ও তখন হাসত, বলত – আমি তোমাকে নিয়ে কখনও খেলবো না।
‘যে ক্ষতি আমি নিয়েছিলাম মেনে
সেই ক্ষতি পূরণ করতে কেন এলে
কি খেলা তুমি খেলে যাবে নতুন করে’

ঋত্বিককে আমি কি সান্ত্বনা দিব? আমার যেন ভাষা নেই। আমার ইচ্ছে করছিল, ওই অর্ককে খুন করতে।মনে মনে গালি দিয়ে বলছি, তোর মজা নেয়ার যদি জায়গা না থাকে, তুমি অন্য সমকামী ছেলেদের ব্যবহার করতি। এমন একটি ভাল মনের মানুষকে কষ্ট দেয়ার কি দরকার ছিল?

মানুষ যা ভাবে, অনেক ক্ষেত্রে তার উল্টাটাই ঘটে, আবার মাঝে মাঝে তাও ঘটে যাঁদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন। আমি ঋত্বিককে বুঝাতে লাগলাম বিভিন্ন দৃষ্টান্ত দিয়ে। অবশেষে বললাম, অর্ক আসলে একটা বোকা। এমন হীরের টুকরো কেউ পায়ে ঠেলে। তোকে পাওয়া যেকোনো সমপ্রেমি মানুষের জন্য পরম ভাগ্যের। ও মনে হয় তোকে ভালোবাসতো না?
-ভালো না বাসলে এভাবে অনুভূতি প্রকাশ করা যায় না। আমি যুক্তি দিয়ে চলি, আমার সকল যুক্তি প্রমাণ করেছিল ও আমাকে ভালোবাসে।
–তার পরম দুর্ভাগ্য। সে এমন একজনকে হারাল যে তাকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসতো। আর তুই এদিক থেকে সৌভাগ্যবান তুই এমন একজনকে হারালি যে তোকে ভালবাসেনি, শুধু তোর সুন্দর দেহটা নিয়ে খেলেছে। তুই বেঁচে গেলি রে !
-তোর এই কথাটা ভীষণ ভালো লাগলো।সত্যি ও জানলো না যে সে কি হারাল।

এবার ওর মুখে একটু হাসি ফুটে উঠলো। দুজন কিছুক্ষণ হেসে ওকে কিছুটা সহজ করে দিলাম। বললাম, জীবন কেটে যাবে। কারো জন্য কারো কিছু থেমে থাকবে না। আমি জানি, শেষ হাসি তুই হাসবি। তোর আত্মবিশ্বাস নিয়ে তুই অটল থাক। অর্ক তোর ভালোবাসার কাছে ঠিকই ফিরে আসবে।তার সকল পথ যখন বন্ধ হয়ে যাবে,তখন তোর কাছে আসা ছাড়া ওর কোনও বিকল্প থাকবে না। খেলাটা তখন তুই খেলবি।
ঋত্বিক শুধু একটা কথাই বলল, তোর কথা যদি সত্যি হয়, তবে আমি পুরোপুরি আস্তিক হয়ে যাব, আর কোনদিন নাস্তিক্যবাদ প্রচার করবো না।

ওইদিনের কথাবার্তা ওখানেই শেষ হয়। রুমে ফিরে ঋত্বিক আকাশ-পাতাল অনেক কিছু ভাবতে লাগলো। যদি এমন হয়, অর্কর বন্ধুটা অন্য কারো সাথে চলে গেছে, তখন অর্ক ঠিকই তার কাছেই ফিরে আসবে। সে মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, যাই ঘটুক না কেন, সে অর্কের জন্য অপেক্ষা করবে। অর্ক ছাড়া কারো কাছে গিয়ে সে শান্তি পাবে না। অর্কের প্রতি তার সীমাহীন নির্ভরতার অনেক যুক্তি আছে। একটা একটা যুক্তি সে বিশ্লেষণ করে দেখল। অর্ক হয়তো তাকে দেয়া কথা ভুলে যেতে পারে, কিন্তু সে ভুলবেনা। ভুলে যাওয়া মানে তার পরাজয়। সে কিছুতেই হারতে পারে না। প্রচণ্ড এক জিদ ভর করলো তার দেহ-মনে। জীবন নিয়ে খেলার সিদ্ধান্ত তখনি নিয়ে ফেললো সে। তারপরই ভাবল, অর্ককে একটি মেইল করলে কেমন হয়? যা ভাবা তা করা। মেইলে লিখতে লাগলো সে –

প্রিয়,
তোমার বিরুদ্ধে আমার কোনও অভিযোগ নেই। তোমার প্রতি অভিমানও নেই, এমনকি তোমার কাছে চাওয়া-পাওয়াও নেই । শুধু এক বুক ভালোবাসা আছে। এই ভালোবাসা শত অপমানে, অসন্মানেও অটল। এই ভালোবাসায় কোনও নোংরামি বা অস্বচ্ছতা নেই। এই ভালোবাসা ভালোবাসার বিনিময়ে ভালবাসাও আশা করে না। শুধু তোমার কাছে থাকার, তোমার সকল প্রয়োজনে সাড়া দেবার, তোমাকে খুশি রাখার এক অনন্ত আকুলতা এ হৃদয়ের গভিরে প্রোথিত।

আমি যতটুকু জানি, তুমি ভুল করে আমার কাছে চলে এসেছ। তোমার ভুলটাই আমার জীবনের চরম সত্য। আমার সত্য নিয়ে আমি সারা জীবন বেঁচে থাকতে পারবো। কারণ, এই সত্যের পেছনে আমি আজীবন ছুটেছি। যেহেতু সত্য আমার জীবনে আলো হয়ে এসেছে, এই আলোই আমার জীবন পথের প্রেরণা হয়ে আমাকে শান্তির পারাবারে নিয়ে যাবে। আমি অনন্ত শান্তির বারিধারা পান করার জন্য আমার জীবনের বাকি দিনগুলো পার করে দিতে পারবো।

দুজন পথিক কথা বলতে বলতে যাচ্ছে, তাঁদের কথা শুনল পাশে দিয়ে যাওয়া এক পথচারী। এই পথচারী ওই দুই ব্যক্তির একজনের একটা কথা হৃদয়ে নিয়ে জীবন পার করে দিল, আর যারা কথা বলছিল তারা তা হয়তো ওইসময়ই ভুলে গিয়েছিলো। আমি সেই পথচারী যে তোমার কথা আমৃত্যু মনে রাখবে। কারণ, আমাকে তুমি যা দিয়েছ, তা পৃথিবীর কোনও মানুষ আমাকে দিতে পারে নাই, পারবেও না। আমি তা চাইও না। জীবনের অনেক সময় কেটে গেলো তোমার দেখা পেতে পেতে, বাকিটা কেটে যাবে তোমার তপস্যা করতে করতে। তোমার ধ্যান ভাঙুক, অথবা না ভাঙুক – আমি আমার সাধনা চালিয়ে যাব। আমি জানি, সাধনায় সিদ্ধি লাভ হয়।

তুমি হয়তো ভাবতে পার আমি আবেগপ্রবণ। মোটেই কিন্তু তা নয়। আবেগ খুবই ক্ষণিকের এক অনুভূতি যার স্থায়িত্ব অল্প সময়। আমার জীবনের আগা–গোঁড়া মনের মানুষের ধ্যানে কেটেছে যা কোনওভাবে আবেগ নয়, এটা নিরন্তর বাস্তবতা। আর সেই মনের মানুষ হয়ে তুমিই এলে আমার জীবনে।তোমার সাথে কাটানো দিনগুলো আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ দিন, সেই স্বপ্নের দিনগুলো বুকে নিয়ে আমার পক্ষে বাকি জীবন পার করে দেয়া সম্ভব।

আমার ভালোবাসা কি একতরফা ছিল? না, এটার ফুরসত তুমি আমাকে দাওনি। তোমার প্রবল জোয়ারে আমার দুকুল যখন একটু একটু করে ভাঙছিল, আমিতো সেই ভাঙনে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছি। আমি চেয়েছিলাম আরও ভাঙতে। কিন্তু তুমি হঠাৎ জোয়ার বন্ধ করে দিলে। একি আমার অপরাধে, নাকি তোমার সকল অভিপ্রায় পূরণ হয়ে যাবার কারণে? এখানেও আমার কোনও অভিযোগ নেই। আমি তোমার বিরুদ্ধে কোনও জিঘাংসা পোষণ করি না, কৈফিয়তের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতেও চাই না। কারণ, তোমার কোনও অপমান আমার নিজেরি অপমান। তোমাকে অশ্রদ্ধা করবো – এমন কথা আমি কখনও স্বপ্নেও ভাবিনি।

জান, প্রতি রাতের মতো কাল রাতেও তুমি আমার স্বপ্নে এসেছিলে। আমার স্বপ্নপুরুষ আমাকে নিয়ে কত রকমের খেলা খেলেছে, আমাকে সুখ সাগরে ভাসিয়েছে। হঠাৎ ঘুম ভেঙে দেখি, এটা আমার স্বপ্ন। মানুষ দিনে যা ভাবে, তা নাকি রাতে ঘুমের মাঝে আসে। কে জানে? নিজেকে বেশি প্রশ্ন করতে আজকাল ভয় লাগে। চলে যাক না দিন!

তুমি হয়তো ভাবতে পার, আমি তোমার শরীরকে ভালবেসেছি। নিজেকে বারবার প্রশ্ন করেও আমি এর উত্তর পাই নি। শরীরের প্রতি আমার তেমন মোহ নেই, আমি শুধু তোমার ডাকে সাড়া দিয়ে তোমার স্পর্শে অদ্ভুত ভাললাগায় কেঁপেছি, তোমার কঠিন আলিঙ্গনে চরমভাবে শিহরিত হয়েছি, তোমার সকল ইচ্ছেগুলোকে পূরণ করে দিয়েছি। কারণ তোমার ইচ্ছেকে না করবো, এতবড় দুঃসাহস আমার ছিল না। তুমি যখনি আমাকে বউ বলে ডেকেছ, আমার সমস্ত অন্তরাত্মা অন্যরকম এক ভাললাগার অনুভূতিতে ছেয়ে যেত।

এই দিনগুলো বুকে নিয়ে আমি বাঁচতে চাই।তুমি দূরে থাকো অথবা কাছে থাকো – আমার কাছে সবই সমান। আমি জানি, আমার সারা সকাল-দুপুর-বিকাল-সন্ধা-রাত, সকল বেলায় কেবল তোমারি উপস্থিতি।

‘তুমি সুখ যদি নাহি পাও, যাও সুখেরও সন্ধানে যাও
আমি তোমারে পেয়েছি হৃদয়ও মাঝে , আরও কিছু নাহি চাই গো’

তোমার চিরদিনের সঙ্গী
ঋত্বিক

মেইলটা পাঠিয়ে ক্লান্ত শরীরে সে ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুমের মাঝে সে স্বপ্ন দেখল, অর্ক এসে ডাকছে, আলিঙ্গন করছে।বলছে, বউ, তোমাকে ছেড়ে আমি থাকতে পারছি না। তাই তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছি। আমি তো কেবল তোমাকে পরীক্ষা করছিলাম। তুমি পাস করেছো। আমি শুধু তোমাকে ভালবাসি।চুম্বনে চুম্বনে সিক্ত করে তুলছে তার সমস্ত শরীর। হঠাৎ ঘুম ভেঙে দেখল, তার সমস্ত শরীর ঘামে চুপচুপে। বিছানা ছেড়ে উঠে বাথরুমে গিয়ে চোখে মুখে জল দিয়ে একটু ফ্রেস হয়ে সে ছাদে গেলো। আকাশের তারাগুলোকে আজ খুব অসহায় মনে হচ্ছে। অথচ একদিন কত পরিপূর্ণই না ছিল এই আকাশ। অর্কের বুকে মাথা রেখে কত পূর্ণিমার রাত কত জায়গায় কাটিয়েছে। ভাবতেই চোখে জল এসে গেলো।

একরকম নিরানন্দেই কেটে যাচ্ছিল ঋত্বিকের দিন। চেষ্টা করছি ওকে সঙ্গ দেবার। কিন্তু মনমরা ভাবটা সে কোনোভাবেই কাটিয়ে উঠতে পারছিল না। এর মধ্যেই একদিন দেখি, সে খুব স্বাভাবিক। আবার আগের মতো হাসিখুশি,প্রাণচঞ্চল। কারণ জিজ্ঞেস করতেই বলল – আজ সকালে অর্ক এসেছিল। সারাদিন একসাথে ঘুরেছি। বললাম, কীভাবে এটা হল?
সে বলল, তার ওই বন্ধুটা ভিতরে ভিতরে নাকি বহুগামি ছিল। সে যখন অফিসে থাকতো, তখন অন্য লোককে তার বাসায় নিয়ে আসতো। সেদিন কি কারণে সে খবর না দিয়ে বাসায় এসে দেখে, তার বন্ধুটি অন্য লোক নিয়ে ফুর্তি করছে।
ওই ঘটনা নাকি তার চোখ খুলে দিয়েছিলো। কয়েকদিন নিজের সাথে বোঝাপড়া করে অবশেষে আমার কাছেই ছুটে আসলো।
বললাম, তাহলে এখন থেকে তুই আর নাস্তিক নস?
সে বলল, অর্ক যতদিন আমার সাথে থাকবে ততদিন আস্তিক থাকবো।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.