প্রতি সর্বভূক

লিখেছেনঃ আনন্দধারা

প্রিয় সর্বভূক,

নামটা আমার দেয়া, মনে পড়ে?

পড়তেই হবে! এই নামটা যে তোমার আর আমার জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নাহ্‌ ভুল বললাম। তোমার নয়, আমার জীবনের সাথে অঙ্গাঅঙ্গীভাবে জড়িত। ছেলেদের ব্যাপারে তোমার কোন বাছবিচার ছিল না, এখনো নেই হয়তো। অনেকটা স্ট্রেইট ছেলেদের “লাইট অফ করলে সব মেয়েই এক” নীতির মত। ছেলে, বুড়ো, ফর্সা, কালো, স্মার্ট, গেঁয়ো, বিবাহিত, অবিবাহিত কোন পুরুষেই তোমার কোন আপত্তি ছিল না কখনো। তোমার ক্ষেত্রে নীতিটা ছিল “লাইট অফ করলে সব পুরুষই এক”। তাই তোমায় এ নাম দেয়া। যেদিন নামটা দেই, রাগ করার পরিবর্তে খুব হেসেছিলে তুমি। প্রতিউত্তরে কিছুই বলোনি আমায়। বাসায় ফিরে ফেইসবুকে লগ ইন করে দেখি ছোট্ট একটা কবিতা লিখে রেখেছো তোমার স্ট্যাটাস-এ। আমার কথার প্রতিউত্তর।

আমাকে উদ্দেশ্য করে সেটাই ছিল কারো লেখা প্রথম কবিতা। তাই সেদিনই কি তোমার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম? জানি না তো! হয়তো তারও আগে, নয়তো তার আরো অনেক পরে! আসলে ভালোবাসা কখনো দিনক্ষণ ঠিক করে, পাত্রী দেখার মত ঘটা করে হয় না। ব্যাস হয়ে যায়। আমারো হয়ে গিয়েছিল।
তোমার সাথে প্রথম যেদিন দেখা হয়, সেদিনটার কথা আজ বারবার মনে পড়ছে। সে জন্য অবশ্য জুকারবার্গকে ধন্যবাদ না দিয়ে পারি না। উষ্কখুষ্ক চুল নিয়ে, অনেকটা অবহেলা আর তাচ্ছিল্যময় পোশাকে আমার সামনে প্রথম এসেছিলে তুমি। আমাকে যে মোটেও পাত্তা দিতে চাও না, তা প্রথম দিনেই বুঝিয়ে দিয়েছিলে। দেবেই বা কেন? আমি কি আর তোমার পছন্দের রাজকুমারদের মত সুন্দর দেখতে! যে আমার জন্য নিজেকে সাজিয়ে আসবে? সত্যি বলতে কি প্রথম দেখায় আমারো তোমাকে মোটেও ভালো লাগেনি। কিন্তু দেখা করার জন্য এসে হুট করে চলে যাওয়াটা অভদ্রতা, আর আমরা কেউই অভদ্র নই। তাই ভদ্রতার পরিচয়টা বজায় রাখতেই গল্প করতে বসলাম একটা মাঠে। আসলে আজ মনে হচ্ছে, অতোটা ভদ্র সেদিন না হলেই হয়তো ভালো হতো!

এক বসাতে টানা তিন ঘন্টা মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনতে লাগলাম তোমার জীবনের কথা। তোমার কথায় কী যেন একটা যাদু ছিল। আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণই করতে পারছিলাম না। সত্যি, এতো সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলার গুন যে কারো থাকতে পারে, আমার জানা ছিল না। তোমার গানের গলা, তাই কথা তো সুমিষ্ট হবেই। কিন্তু ঐ চোখ জোড়া? এতো সুন্দর কেন? আমি আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে এমন আনকোরা চোখ আর ধনুকের মত বাঁকা ভ্রু কোথাও দেখিনি। ছেলেদের তো নয়ই, মেয়েদেরও নয়।
প্রথমদিনই কি তাহলে ভালোবাসার বীজ বুনে দিয়েছিলে আমার বুকে? জানি না। যাইহোক, ভদ্রতার কথোপকথন বন্ধুত্বে রূপ নিল আমাদের মাঝে। ঈদের পরদিন দাওয়াত দিলাম তোমাকে আমার বাসায়। সকাল ৯ টা ৩০ এ তুমি আমার বাসার মেইন রাস্তায় এসে হাজির। এদিকে তখন ঝুম বৃষ্টি। তুমি এক বিল্ডিং এর নিচে আশ্রয় নিয়ে আমাকে ফোন দিলে। হন্তদন্ত হয়ে ঘুম থেকে উঠে, কোনরকমে দাঁতের সাথে টুথব্রাশের কোলাকুলি করিয়েই ছুট দিলাম তোমাকে এগিয়ে নিয়ে আসার জন্য। সাথে নিলাম দুটো ছাতা আর একটা রেইনকোট। মেইন রোডে গিয়ে দেখি তুমি ভুবন ভোলানো এক হাসি দিয়ে তাকিয়ে আছো আমার দিকে। ঈদের মৌসুম ছিল, তাই ভদ্রতার খাতিরেই কোলাকুলি করার জন্য তোমাকে বুকে টেনে নিয়েছিলাম, তারপরই মনে পড়লো আরে, কি করছি? একদিনের পরিচয়েই মানুষটাকে বুকে জড়িয়ে নিলাম? অন্য কেউ হলে কিছু ভাবতো না, কিন্তু দুজনেই তো একি রোগের রোগী, তাই বন্ধুসুলভ বুকে জড়ানোটা অন্তত আমাদের মত রোগীদের ক্ষেত্রে ভিন্ন কিছুই প্রকাশ করে।

সারাদিন খুব বৃষ্টি থাকায় বাইরে বের হতে পারলাম না। আম্মু খিচুড়ি রেঁধেছিল, সাথে গরুর গোস্ত। খেয়ে দুজন আমার রুমে বসেই গল্প করছিলাম। কথা প্রসঙ্গে বললে তুমি নাকি ছেলেদের নাক বেশি পছন্দ করো। যার নাক সুন্দর, তার নাকি সব কিছুই সুন্দর। আমি বললাম, “আমার ভালো লাগে চোখ। যে চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে সারাটা জীবন পার করে দেয়া যায় অনায়াসেই।” এক ফাঁকে বললে, “আমার নাকটা নাকি খুব সুন্দর, একদম বাঁশির মত।” আমি কিছুই বললাম না। হয়তো তুমি ফাজলামি করছো এটা ভেবেই। সন্ধ্যা পর্যন্ত অনেক আড্ডা দিয়ে তুমি বিদায় নিলে।

পরের সপ্তাহে আবার এলে আমার এলাকায়, কি একটা কাজে। দেখা হলো। রানওয়েতে বসে বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত গল্প করে কাটালাম। আচ্ছা, ভালো লাগাটা কি শুধু আমার দিক থেকেই ছিল সর্বভূক? তাহলে তুমি কেন বারবার আসতে আমার সাথে দেখা করতে? কেন আমার ভালো লাগাকে প্রথম দিকেই গলা টিপে মেরে ফেললে না?

এক হাতে তালি বাজে না সর্বভূক। এরপর তুমি আমার ভার্সিটিতে আসতে থাকলে দেখা করতে। একবার বললে আমাকে কি একটা কথা নাকি বলবে, কিন্তু আমার পরীক্ষার পর। সে কথা আমার আজও শোনা হলো না। কোন কাজে এদিকে এলেই আমাকে ফোন দিতে, হয়তো তুমি এখন সেটাকে বন্ধুত্ব বলেই আখ্যা দেবে। কিন্তু আমার কাছে সেটা ছিল বন্ধুত্বের চেয়ে আরো বেশি কিছু।
আরেকদিনের কথা মনে পড়লো। একবার আমার একটা কাজে আমি তোমার এলাকায় গিয়েছিলাম। গল্প করতে করতে বুয়েট ক্যাম্পাসে এসে বসলাম। সেদিন আমি খুব সকালে বাসা থেকে বেরিয়েছিলাম। রাতে ঘুমও হয়নি ঠিক মত। বুয়েটের সিঁড়িতে বসে প্রচন্ড মাথা ব্যাথায় তোমার কাঁধে মাথা রেখেছিলাম। আচ্ছা, তুমি কেন সেদিন তোমার মাথাটা আমার মাথার উপরে হেলে দিয়েছিলে? তখন কি মনে হচ্ছিল জানো? সময়টা থমকে গেলেই হয়তো ভালো হতো।

কিন্তু সময় থমকে থাকে না। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। আমাদেরও উঠতে হলো। সেদিন আমার শরীরটা প্রচন্ড ব্যাথা করছিল। মাথা যেন ব্যথায় ছিঁড়ে যাচ্ছিল। তাই তোমার কাঁধের একটু পরশ পেয়ে অনেকটা বেপরোয়াভাবেই বেহায়াপনাটা দেখিয়ে দিলাম সেদিন। আবদার করে বসলাম একটা চুমুর। তুমি রীতিমত অপ্রস্তুত। আমিও লজ্জায় লাল। কি বললাম এটা আমি? ছি! নিজেকে নর্দমার কীট মনে হচ্ছিল তখন। আচ্ছা, আমাকে সরাসরি মানা না করে কেন বলেছিলে? “কী বলবো ঠিক বুঝতে পারছি না”

নাহ্‌ দোষ তোমার নয়। আমারই। আমিই অসম্ভব কল্পনার চাদরে নিজেকে ঢেকে নিয়ে দিন-দুপুরে দিবাস্বপ্ন দেখেছিলাম। একদিন ফোন করে খুব কাঁদলে তুমি। এই জীবন থেকে পরিত্রান পেতে চাও। শেষ করে দিতে চাও নিজেকে। আমি সান্ত্বনা দিলাম। সাহস করে বললাম, কেউ কেউ তো আছে যারা তোমাকে আজো ভালোবাসে, তাদের জন্য হলেও তোমাকে বেঁচে থাকতে হবে। কি বুঝলে জানি না। কি বুঝালাম তাও জানি না। কিন্তু তুমি শান্ত হলে। আচ্ছা, সমকামী জীবনে অতিষ্ট হয়ে আত্নহত্যার ইচ্ছাটা আমার কাছেই কেন প্রকাশ করেছিলে? আমার কথাতেই কেন শান্ত হয়েছিলে সেদিন?

আজ তোমাকে লিখতে বসে স্মৃতিগুলো সব ওলট পালোট হয়ে যাচ্ছে। মনে পড়ছে তোমার সাথে কাটানো প্রতিটি মুহুর্তের কথা। একবার প্রচন্ড রাগ করলাম আমি। তুমি কী একটা কারনে আমাকে অবিশ্বাস করলে, এ জন্য। আমি আর বন্ধুত্বটা চালিয়ে নিতে চাইলাম না কিছুতেই। বিশ্বাস ছাড়া কোন সম্পর্কই টেকে না। ভালোবাসার তো নয়ই, বন্ধুত্বেরও নয়। তাই তোমার সাথে সম্পর্কটা শেষ করতে চাইলাম, তোমার ভাষায় যেটা ছিল নিছক বন্ধুত্ব, আমার ভাষায় তার চেয়েও বেশি। আচ্ছা, তোমার তো সমকামী, বিসমকামী কোন প্রকার বন্ধুরই অভাব ছিল না, তাহলে কেন সেদিন রীতিমত চোখ ছলছল করে আমার রাগ ভাঙ্গিয়েছিলে? কেন বলেছিলে, “আমার মনে হচ্ছে আমি এক অমুল্য সম্পদ হারাতে যাচ্ছি” আমি কারণ জিজ্ঞেস করতেই কেন বলেছিলে “বোঝ না, কেন তোমার রাগ ভাঙ্গাতে চাই, কেন তোমাকে আমার দরকার?”
আমাকে তোমার দরকার কোনকালেই ছিল না সর্বভূক। সেটা সেদিন বুঝতে পারিনি। বুঝতে পেরেছিলাম অনেক অনেক দেরিতে, যখন তোমার থেকে পিছে ফেরার আর কোন সুযোগই আমার ছিল না। তুমি কার সাথে কি করতে সব আমাকে বলতে ফোনে। আর আমি হিংসায় জ্বলে পুড়ে খাক হতাম রীতিমত, কিন্তু তোমাকে বুঝতে দিতাম না কিছুতেই। কথা ঘুরাতে চেষ্টা করতাম যখন, তুমি ঠিকই বুঝে নিতে আমার মনের অবস্থা। একদিন তো জিজ্ঞেসই করে বসলে, “আচ্ছা তুমি আমার শোনানো রতিক্রিয়ার কাহিনি শুনে জেলাস ফিল করো?” ইজ্জত বাঁচাতে হবে তো! তাই অবাক হওয়ার ভান করে সরাসরি বলে দিয়েছিলাম “নাহ্‌, জেলাস কেন হবো?”
এক রাতে তুমি গান শুনতে এলে আর্মি স্টেডিয়ামে, বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের কি একটা প্রোগ্রাম। ফেইসবুকে তোমার স্ট্যাটাসটা দেখেই ফোন দিলাম খবর নেয়ার জন্য শীতের কাপড় এনেছো কিনা সাথে, খেয়েছো কিনা রাতে জানতে। জিজ্ঞেস করলে “ হঠাত আমার ব্যাপারে এত কেয়ারিং?” বলতে পারলাম না কেন। লামছাম একটা বুঝিয়ে দিলাম। বললাম রাতে বাসায় যেতে সমস্যা হলে আমার বাসায় চলে আসতে। বললে,“ কোন সমস্যা হলে শেষ আশ্রয় হিসেবে তুমি তো আছোই” বললাম, “আমি চাই তোমার কোন সমস্যা না হোক। আর আমি চাই না তুমি শুধু সমস্যায় পড়লেই আমার কাছে আসো।” কি বুঝাতে চাইলাম নিজেই বুঝলাম না, তুমিও কি কিছু বুঝলে? হয়তো না।

বৃষ্টিস্নাত সেই দুপুরের কথা মনে পড়ে? তুমি তোমার কাজিনদের নিয়ে এলে রানওয়ে দেখানোর জন্য। বিমান উঠানামা দেখতে এসে আটকা পড়লাম বৃষ্টির কবলে। আশ্রয় নিলাম এক মসজিদের বারান্দায়। দুপুরে কারো খাওয়া দাওয়া নেই। তোমার ছোট ছোট কাজিনরা বৃষ্টিতে নেমে লাফালাফি শুরু করে দিল। তুমি আর আমি বসে রইলাম গা ঘেঁসে, মসজিদের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে। ২ ঘন্টা পার করে দিলাম অবলীলায় গল্প করে করে। কই, একটুও তো বিরক্ত মনে হয়নি তোমাকে সেদিন? উলটা আমার ব্যাপারে খুব আগ্রহ দেখালে। আমি তো সাধারণ বন্ধুসুলভ কথাই বলছিলাম, তুমিই শুরু করলে ছেলেদের শরীর কার কেমন লাগে তা নিয়ে নানা কথাবার্তা। কথার এক ফাঁকে কেন সেদিন বলেছিলে যে আমার গায়ের রঙ, আমার মতো বডি স্ট্রাকচারই তোমার বেশি পছন্দ?

তার কয়েকদিন পর আবার ফোন দিলে তুমি। আমার এদিকে আসবে। একজনের সাথে দেখা করার কথা আছে নাকি, সাথে আমার সাথেও দেখা করে যাবে। এক ঢিলে দুই না, তিন চার পাখি মারার অভ্যাস তোমার অনেকদিনের। যাইহোক, আমার সাথে যে দেখা করতে চেয়েছো, আমি তাতেই খুশি।

দেখা হলো, আড্ডা দিলাম। মাথার উপর যেন বাজ পড়লো, যখন শুনলাম আর এক সপ্তাহ পরেই তুমি দেশের বাইরে চলে যাচ্ছো। চোখে পানি এসে পড়ছিল, খুব সাবধানে সামলালাম। বিদেশে পালিয়ে যাওয়া মানেই যে জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়, খুব করে বুঝাতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু তোমার কাছে দেশে কাটানো প্রতিটা মুহুর্তই নাকি অসহ্য লাগছে। তাই আর বাধ সাধলাম না। তুমি তো ভালো থাকবে! তাতেই আমি খুশি।

বিদায় দিলাম তোমাকে সেদিনের মত। আর নিজের বুকটাকে হালকা করার চেষ্টায় নিয়োজিত রাখতে চাইলাম নিজেকে। কিন্তু পারলাম কই? যাবার আগে আরো কয়েকবার দেখা করতে চাইলে তুমি। তোমাকে না করাটা আমার পক্ষে অসম্ভব ছিল, তাই অনেক ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও না করতে পারলাম না তোমাকে। একদিন জিজ্ঞেস করলাম, “কী যেন একটা বলবে বলেছিলে?” “ভুলে গেছি” বলে অপ্রস্তুত করে দিলে আমায়। ক’দিন পর আর থাকতে না পেরে ইশারার পথে আর গেলাম না। সরাসরিই জানালাম ভালোবাসি। বিশাল একটা মেসজ দিলাম। কোন উত্তর দিলে না।
দেখতে দেখতে তোমার চলে যাওয়ার দিনটা এসেই গেলো। হ্যাঁ, আজই চলে যাবে তুমি দেশ ছেড়ে। আমার জীবন ছেড়েও। তোমার সাথে শেষবার দেখা করে নিজের কষ্টের আগুনের হলকাটাকে আর উস্কে দিতে চাইলাম না। কিছুই তো নেই আমাদের মাঝে। তাহলে কেন যাবো এয়ারপোর্টে তোমাকে শেষ বিদায় জানাতে? কিন্তু কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিতে তুমি বরাবরই ওস্তাদ। আমার বারবার “না”-কে রীতিমত অগ্রাহ্য করে একটা মেসেজ দিলে সন্ধ্যায়। “please come to airport. I just started for airport. I want u to come; I’ve something to give back to u. come dear!” তোমার ঐ dear কথাটা আমার সমস্ত অনুভূতিকে ভোঁতা করে দিলো যেন। পারলাম না নিজেকে ধরে রাখতে। মনের মধ্যে আবারো আশার সঞ্চার হলো। যাবার আগে কি দিয়ে যাবে তুমি? এমন কোন প্রতিশ্রুতি? যা নিয়ে আমি তোমার অপেক্ষার প্রহর গুনে কাটাবো বাকিটা জীবন? ছুটে গেলাম এয়ারপোর্টে। সাথে নিলাম ছোট্ট একটা উপহার। যদি মাথা খাটাও, বুঝতে পারবে এতে লুকিয়ে আছে তোমার আর আমার মিলনের এক সুপ্ত বাসনা, বহুদিনের এক লালিত স্বপ্ন।

ঘন্টা দেড়েক দাঁড়িয়ে রইলাম এয়ারপোর্টে তোমার অপেক্ষায়। তুমি তখন ইমিগ্রেশনে ঢুকে গেছো। ফোন দিয়ে জানালে একটু পরেই আসবে। সেই একটু পর আসলো দেড় ঘন্টা পর। কিছু কিছু অপেক্ষা পীড়াদায়ক হয় না মোটেই। আমারটিও ছিল না। মনে মনে যে খুশির বন্যা বয়ে যাচ্ছিল, দেখা হলে তুমি আমাকে কিছু একটা দেবে। যেটা আগলে রেখে আমি আমাদের আগত ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিভোর হবো।
ডাকলে টারমিনাল ২ এর সামনে। গিয়ে দেখি পুরো পরিবার আর বন্ধুদের বিশাল ভিড়। সেখানে আমার সাথে কথা বলার কোন সুযোগই ছিল না তোমার। তারপরও এক পাশে ডেকে নিলে। হাতে ধরিয়ে দিলে কিছু কাগজ। আমিও হাতে তুলে দিলাম তোমার জন্য আনা ছোট্ট উপহারটা। ব্যাগে ভরেই বিদায় নিলে। আর কোন কথা বললে না। একটা কাকতালীয় ব্যাপার হয়তো তোমার নজরে পড়েনি সেদিন, কিন্তু আমার চোখ এড়ায়নি। হয়তো মিলটা আমি দেখতে চেয়েছি, তুমি চাওনি বলেই!
তোমার পরনে ছিল নীল জিন্স আর সাদা টি শার্ট। আর আমার পরনে সাদা পায়জামা আর নীল পাঞ্জাবী, তোমার প্রিয় পোশাকে নিজেকে সাজিয়ে এনেছিলাম। দুজনের পোশাকের কালার কম্বিনেশনের এই অভূতপূর্ব মিল ছুঁয়ে গেল আমার বুকটাকে।

হ্যাঁ। আজ ১১-১২-১৩। খুবই তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। পৃথিবীর বুকে এই দিনটা আর কোনদিনই আসবে না ফিরে। তাই সাড়োম্বরে পালিত হচ্ছে দিনটা পুরো পৃথিবীতে। আমারাও তো পৃথিবীর বাইরে নই, তাই না সর্বভূক? আজকের দিনটা আমাদের জন্যও খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা দিন হতে পারতো। কিন্তু না, হলো না। কিছুই বললে না তুমি আমায়। আজকের এই দিনটি যেমন আর কোনদিনও ফিরে আসবে না, তুমিও আর কোনদিনও ফিরে আসবে না আমার জীবনে। আর কোনদিন দেখবো না তোমার মায়াময় ঐ দুটি চোখ। এক পাক্ষিক ভালোবাসায় বুঁদ হয়ে থাকা এই আমি নিজের কল্পরাজ্যে একাই রয়ে গেলাম। সবার থেকে বিদায় নিয়ে ভেতরে ঢুকে গেলে তুমি। যাবার আগে একবার পিছে ফিরে তাকালে তোমার বাবা-মা’র দিকে। আরেকবার আমার দিকে। আমি একটা শুকনো হাসি উপহার দিলাম, সাথে ছিল আমার হৃদয় নিঙ্গড়ানো শুভকামনা। তুমিও পালটা হাসলে। কি হতো সর্বভুক, দ্বিতীয়বার পেছন ফিরে না তাকালে? কী এমন ক্ষতি হতো আমার দিকে তাকিয়ে শেষবারের মত না হাসলে? কীইবা এমন মহাভারত অশুদ্ধ হতো আজ আমাকে এয়ারপোর্টে না আসতে বললে? এসব প্রশ্নের উত্তর আমি বারবার খুঁজে বেড়িয়েছি তোমার মাঝে। কিন্তু কখনো সাহস হয়নি মুখ ফুটে জিজ্ঞেস করার। তোমার চোখের মাঝে উত্তর গুলো খোঁজার অনেক চেষ্টা করেছি সর্বভুক, কিন্তু কী যেন একটা আছে তার মাঝে, আমি জানি না। তাকালেই আমার যেন কী হয়ে যেত, সব কিছু ভুলে যেতাম আমি।

তোমাকে বিদায় দিয়ে ভারাক্রান্ত মনটা নিয়ে যখন বাসায় ফিরছি, তখন খুলে দেখলাম তোমার দেয়া কাগজগুলো। কি এমন জিনিস, যা দেয়ার জন্য এতো উতলা হয়েছিলে তুমি। কষ্টের মাঝেও হাসি পেলো। তোমার লেখা একটা নাটকের স্ক্রিপ্ট। আমি দেখতে চেয়েছিলাম অনেক আগে। আচ্ছা, এটা কী এতোই গুরুত্বপূর্ণ ছিল সর্বভূক? তুমি তো আমাকে মেইল করেও দিতে পারতে, বা না দিলেই বা কী হতো এমন? এটা কি এমন গুরুত্বপুর্ণ কিছু ছিল যা যাবার আগে আমাকে দিয়ে যেতে হবে? আবারো নিজের মনকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে ফেললাম। এক নিমেষে মনের পর্দায় ভেসে আসলো সবগুলো প্রশ্ন, যার উত্তর আমি কখনোই পাইনি, পাই না, আর কোনদিন হয়তো পাবোও না!

এখানেই শেষ হলে ভালো হতো। কিন্তু না, এখানেই তুমি সবকিছু শেষ করলে না। সবার থেকে বিদায় নিয়ে, ইমিগ্রেশনের কাজ শেষ করে তুমি যখন বিমানে ওঠার জন্য অপেক্ষমান, তখনো দেশি মোবাইলটা তোমার হাতে ছিল। বসে বসে টাইম পাস করার জন্য একে, তাকে হয়তো ফোন দিচ্ছিলে! আচ্ছা, তখন আমাকে ফোন দেয়ার কি দরকার ছিল সর্বভূক? কেন বিমানে ওঠার আধ ঘন্টা আগে আমাকে শেষবারের মতো ফোন দিয়েছিলে? কেন বলেছিলে “তুমি আসায় আমি খুব খুব খুশি হয়েছি, ভালো থেকো, ভালো রেখো” হ্যাঁ, এই কথাগুলোই বলেছিলে তুমি। আমার স্পষ্ট মনে আছে। প্রতি উত্তরে আমি কি বলেছিলাম মনে পড়ে সর্বভূক? বলেছিলাম, “কাকে ভালো রাখবো?” তুমি হঠাত যেন হকচকিয়ে গেলে আমার পালটা প্রশ্ন শুনে। একটু সময় নিয়ে বললে, “সবাইকে ভালো রাখবে”। আচ্ছা, চাইলেই কি সবাইকে ভালো রাখা যায় সর্বভুক? এই দেখ, আবারো প্রশ্ন করে বসলাম।

অবশ্য আজকের করা এই প্রশ্নগুলো তোমার কাছে কখনোই পৌঁছাবে না সর্বভুক, তোমাকে এর উত্তর দিতে গিয়ে বেগ পেতে হবে না কখনো, তুমি নিশ্চিন্ত থাকো। আমার এই চিঠি সেই আকাশের ঠিকানায় লেখা, যে আকাশে তুমি উড়ে গেলে আমার কাছ থেকে দূরে, বহু দূরে। আমার মতো উচ্ছিষ্টকে নিয়ে তোমার আর ভাবতে হবে না। অনেকদিন পর আজ আবারো কারো জন্য চোখের পানি গড়িয়ে পড়লো। যাবার আগে তুমি আজ বুঝিয়ে দিয়ে গেলে আমারও মন বলে এখনো একটা কিছু আছে, যেটা অন্যের জন্য এখনো চোখকে বাধ্য করে দু’ ফোটা অশ্রু বিসর্জন দিতে। দুনিয়ার যে প্রান্তেই থাকো, ভালো থেকো।

ইতি
তোমার কেউ না।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.