তেহারি,পান এবং আমি

লিখেছেনঃ নিবিড় আহমেদ 

তুমি যেদিন জব পাবে সেদিন আমায় একটা গীটার কিনে দেবে ?
আমি অমির দিকে তাকালাম ।
ও বরাবরই বড্ড ছেলেমানুষ । আর ওর সব আবদার আমার কাছে ।
-কয়টা গীটার লাগবে তোমার ?
-একটা ।
অমির মুখে বিশ্ব জয়ের হাসি ।
আমার বুকের ভেতরটা কুঁকড়ে উঠে ।
একটা জব খুব দরকার আমার ।
আজকাল মনে মনে ভীষণ ভেঙ্গে পড়ছি । আমি অমিকে বুঝতে দেই না কিছু । আমি চাইনা আমার কষ্ট ওকেও ছুঁয়ে যাক ।
অমি আমার হাত ধরে ।
সামনে লেকের পানি টলমল করছে সন্ধ্যার লাল নীল আলোয় ।
অমি আর আমার সম্পর্ক টানা ২ বছর ধরে ।
আমার ভেতর বাহির সব জুড়ে সে ।
আমি অনেক কিছু না বলতেই ও এক নিমেষেই বুঝে যায় ।
সত্যিকারের ভালবাসা বোধহয় এমনই হয় ।
-চল । আজ রিকশায় ঘুরব ।
-আমার পকেটে টাকা নেই ।
-তোমাকে কে দিতে বলেছে ? আমি দেব ।
-আমার ভালো লাগে না ।
-কি ভালো লাগে না ।
-এই যে প্রতিদিন তোমার টাকায় ঘুরি । তোমার টাকায় খাই ।
-বোকা বোকা কথা বোল নাতো ! আমার সবকিছুকি তোমার নয় ?
-আমি জানি অমি, তুমি আমার সব । কিন্তু আমি এসব মেনে নিতে পারি না ।
-প্লিজ সোনা । মন খারাপ কর না । যেদিন তোমার জব হবে তখন সব কিছুই তোমার কাছ থেকে নেব । কি খুশি তো ?
আমি অমির দিকে চেয়ে একটা শুকনো হাসি দিলাম ।

রিকশাওয়ালা হাওয়ার বেগে রিকশা চালাচ্ছে ।
অমির মাথার চুলগুলো খুব সুন্দর । আর মাথায় চুল নেই বললেই চলে । কয়দিনের মধ্যেই টাক হয়ে যাবে বোধহয় । ওর চুল হাওয়ার সাথে পাল্লা দিয়ে দুলছে ।
আমি ওর দিকে তাকাই । ওর নিস্পাপ মুখটা দেখি ।
পরম করুনাময় আমার জন্য এমন একজনকে পাঠিয়েছেন এটা ভাবতে গেলে বুকের ভেতরটা আনন্দে ভরে যায় ।
-কি ভাবছ ইমন ?
-ভাবছি তোমাকে যেদিন আমার বুকে জড়িয়ে ধরেছিলাম আমার মেসে সে দিনটার কথা ।
-ইস ! কি দারুন ছিল না দিনটা ? ১০ আগস্ট । আমিতো চোখ বুজলে এখনও দেখতে পাই ।
-হুম । তুমি সাদা ধবধবে একটা টি শার্ট পরে আমার মেসে এসেছিলে । আমি যখন দরজা খুললাম । দেখি তুমি ! আমিতো অবাক ! আমার আদুল গা । লুঙ্গি পরা ।
-হা হা হা । আমিতো রুমে ঢুকেই তোমায় জড়িয়ে ধরলাম । তোমার সে কি লজ্জা !
-তুমিত জানই আমি একটু লজ্জা বেশি পাই । তার উপর হথাত করে ওই অবস্থায় তোমার সামনে ।
-আমি তোমায় লুঙ্গি বাবা বলে ডেকেছিলাম , মনে আছে ?
-খুব মনে আছে । এরপরত তোমার প্রেমেই পরে গেলাম । এমন প্রেমেই পরলাম যে হাবুডুবু অবস্থা !
-তুমিত ক্লাস ফাকি দিয়ে আমার কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে । হাবা বাবার মত । আমার অবশ্য বেশ লাগত ! রোদের মধ্যে একটা ফর্সা ছেলে আমার জন্য দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘামছে । হা হা হা ।
-এই হাসবা না । আর তুমি নিজে কি ? বাসা থেকে নুডলস রান্না করে আমার জন্য অপেক্ষায় থাক নি ।
-কারো কারো জন্য অপেক্ষা করতেও ভালো লাগে ।
-যাক । এটা তাহলে বুঝতে পেরেছ ।
-আমি সব বুঝি ।
– আমি জানি সেটা ।
আজ বোধহয় পূর্ণিমা । আকাশে থালার মত চাঁদ ।
মাঝে মাঝে কথা বলতে ইচ্ছে হয় না ।
অমি আর আমি এখন দুজনই নিসচুপ ।
ওর ডান হাত আমার বাম হাতে ।
আমার কাঁধে তার মাথা ।
আমি আবারও লজ্জা পাচ্ছি ।
ইস । আশেপাশের মানুষজন দেখলে কি ভাববে ? একটা ছেলে আরেকটা ছেলের কাঁধে মাথা দিয়ে রিক্সায় বসে যাচ্ছে ।
আমি জানি অমিকে মানা করলে ও এখন আরও ভয়ানক কাণ্ড করবে । হয়ত চুমুই খাওয়া শুরু করবে । ও এসব পাগলামি করতে মহা ওস্তাদ । অবশ্য ওর এসব পাগলামি যে আমার খারাপ লাগে সেটা না । আমি যেসব পারি না । সেসব সে করে । আমার অপূর্ণতাকে পূর্ণতা দেয় অমি । পৃথিবীতে সব কিছুরই ব্যালেন্স থাকাটা জরুরি ।
-এই রিকশা থামাও ।
-কি হল হথাত ? আমি অবাক হয়ে অমির দিকে তাকালাম ।
-কিছু না । আমার এখন তেহারি খেতে ইচ্ছে করছে ।
-একটু আগে না কাবাব খেলাম ! আমি অমির দিকে হা হয়ে তাকিয়ে আছি ।
-আমার ইচ্ছা হইসে আমি খামু ।
অমি রিকশা থেকে নেমে ভাড়া দেয় ।
আমিও নামি ।
ওর পিছু পিছু তেহারি হাউজে ঢুকি ।
এই দোকানের সামনে আসলেই অমির তেহারি খেতে হয় । কি যে নেশা ! বুঝি না । বড়লোকের পোলাপাইনের মাথায় ছিট থাকে ।
এই সময়টায় দোকানে জায়গা পাওয়াটা খুব কষ্টের ।
তাই আমি আর অমি দোকানের এক কোনায় দাঁড়িয়ে আছি ।
মানুষের খাওয়া দেখছি ।
একটা বিশাল দেহি লোক মনিত খানেকের মাঝে ৩ প্লেট তেহারি সাবার করে দিল ।
অমি আমার কানে ফিসফিস করে বলল,
-মানুষ এতো খায় কেমনে ?
-ও বোধহয় তোমার খালাতো ভাই ।
অমি আমার হাতে চিমটি কাটে ।
-আজকে তোমারে মজা বুঝাব । আমার সাথে মজা কর ? অমি আমার দিকে চোখ বড় বড় করে বলে ।
-আরে না না । আমিতো এমনিতেই দুস্তামি করলাম ।
সামনের একটা টেবিল ফাঁকা হতেই অমি দুপ করে বসে পড়ল ।
আমাকে ইশারায় বসতে বলল ।
-ওয়েটার দুই প্লেট তেহারি ।
-আমি খাব না ।
-কেন খাবা না ?
-মোটা হয়ে যাচ্ছি ।
-মোটা হও আমার সমস্যা নাই ।
-মানে কি ? পোলায় কি পাগল হইল নাকি ?
-আমি ভালো ছিলাম কোন কালে ?
অমি ওয়েটারকে ২ প্লেট তেহারি আনতে বলল ।
২ মিনিটের মাথায় তেহারি হাজির ।
অমি আহ করে তেহারির গন্ধ নিল ।
-দেখছ ! কেমন সুন্দর ঘ্রান !
-আমার সর্দি লাগছে । নাক বন্ধ । তাই গন্ধ পাই না ।
-হইসে আর গন্ধ পাওয়া লাগব না । খাও এবার ।
আমি আর কথা না বাড়িয়ে খাওয়া শুরু করলাম । আমার এমনিতেই পেট ভর্তি । তাই আমার প্লেট থেকে কিছু তেহারি নিয়ে অমির প্লেটে দিলাম ।
অমি মহা খুশি ।
-বাহ বাহ । কি আদর করে আমায় আমার টুনুমুনুটা !
-এই আস্তে কও । কেউ শুনে ফেলবে ।
-আস্তে কমু কেন ? তোমার নাম যে টুনুমুনু এটা কি কেউ জানে নাকি ?
আমি খেয়াল করলাম ওপাশের টেবিলে বসা একজোড়া প্রেমিক প্রেমিকা আমাদের দিকে তাকাল ।
আমি আবার মাথা নিচু করে খাওয়া শুরু করলাম ।
-অমি আমি আর খেতে পারছি না ।
-তোমারে নিয়ে আর পারি না । না খেলে কাম কাজ করবা কেমন করে ?
-ছি ছি ছি ! কিসব অশ্লীল কথা যে তুমি বল !
-বা রে ! যা সত্যি তাই বলছি । আজ রাতেত আমি তোমার মেসে থাকব । বাসায় বলে আসছি আজ ফিরব না ।
-আজ না । আজ রুবেল ভাইয়া রুমে আছে ।
-রুবেল ভাইয়া না কাল বারিতে গেছে ? তুমি না বল্লা ?
-ইয়ে মানে !
-শুন , আমার সাথে একদম মিথ্যা কথা বলবা না । নাহলে এই তেহারির প্লেট তোমার মাথায় ভাঙ্গুম ।
আমি চুপ মেরে যাই ।
তেহারির দোকান থেকে বের হয়ে দুজন রাস্তায় হাঁটি ।
-এই পান খাবা ?
-এসব কি কথা বল অমি ? পান ! !!!
-আমিতো তোমায় বিষ খেতে বলি নাই । তাই না ।
অমি আমার দিকে না তাকিয়ে রাস্তার পাশে পান দোকানে যায় ।
আমি রাগের চোটে কিছু বলি না ।
ঠায় দাঁড়িয়ে থাকি ।
অমি পান মুখে দিয়ে আমার সামনে দাঁড়ায় ।
-একটা রিকশা নাও ।
রিকশায় উঠে বসতেই অমি আমার কাঁধে মাথা দেয় ।
-এই আমার মাথা ঘুরাচ্ছে । কেমন যেন লাগছে !
-পানের সাথে কি জর্দা খাইস নাকি ?
-হুম । জর্দা খাইসি । বাবা জর্দা । এই আমার না কেমন জানি নেশা নেশা লাগছে ।
-চুপ করে আমার কাঁধে মাথা দিয়ে রাখ ।
অমি চুপ করে আমার কাঁধে মাথা দিয়ে রাখে ।
মেসের সামনে পৌঁছে আমি রিকশা ভাড়া মিটিয়ে আমি অমিকে নিয়ে তিন তলায় উঠি ।
দরজা খুলে রুমে ঢুকতেই ও টলমল পায়ে বিছানায় পরে যায় ।
আমি দৌড়ে যাই অমির দিকে ।
অমি হা হা হা করে হাসে ।
-বাহ । পান খেয়েত ভালোই নেশা নেশা লাগছে ? এর আগে আমি কখনোই জর্দা খাই নাই । হা হা হা ।
-এই পানি খাবে একটু ?
-না । আমি চুমু খাব । টুনুমুনু আমায় অনেক চুমু দাও ।
অমি আমার ঠোঁট কামড়ে ধরে ।
জীবনের এই প্রথম পান খাওয়া কারো ঠোঁটে চুমু দিলাম ।
আমি বুঝতে পারছি আমার শরীর জাগছে ।
জাগুক শরীর ।
মাঝে মাঝে শরীরকে জাগতে দিতে হয় ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.