আজ নেই কোন কাজ

সারাটা দিন কিভাবে যে কেটে গেলো তা নিয়ে চিন্তা করছি। ১২ টা ঘন্টা কেটে গেলো অথচ সে বারো ঘন্টার কোন স্মৃতি মনে করতে পারছি না। হয়তোবা সে বারো ঘন্টার কোনো প্রয়োজনই ছিলো না। শুধু এ বারোটা ঘন্টা না, আরো কতো সময় কেটে গেলো অামার জীবনে। সে হিসাব রাখেনি আমার বেহিসেবি মন।

এখন বিকেল নেমেছে এ শহরে। বেশ জাঁকজমক পড়ন্ত বিকেল বলা চলে। শুক্রবারের অালস্যতা যেন সবাই আড়মোড়া দিয়ে ভাঙছে চায়ের দোকানগুলোতে। সাথে পুরি সিঙারার দোকানে আবালবৃদ্ধবনিতারা সুখের দামে পণ্য কিনে সুখ মেটাবার জন্য। অ-সুখ নিয়ে বেঁচে থাকা আমি তাদের দেখে সুখ মেটাই, যেন “আমার মুক্তি সর্বজনের মনের মাঝে।” ব্যালকনি থেকে সরে গিয়ে ড্রয়ার খুললাম। অল্প আলোতেও ঝিকমিক করে উঠলো সদ্য কেনা গাড়ির চাবিটা। মুষ্টিবদ্ধ তালুতে চাবিটা তখন মালিকের অানুগত্য পালন করেছে। গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।

পেছনে ফেলে এসেছি সেসব ব্যস্ত শহর, নগর ও নাগরিক বিষয়াবলি তে সিদ্ধ কর্মজীবনের তালিকানামা। উইন্ডশীট খুলে দিতেই একঝলক ঠান্ডা হাওয়া এসে জায়গা করে নিয়েছে আমার গাড়িতে। আকাশে তখন গুঁড়ো গুঁড়ো নীল। বাতাসে ভাসে ২ মাসের শিশুর মতো নিষ্পাপ অকারন হাসি, যা সবার মন ভালো করে দেয়। নিরন্তর গতিতে বাতাসের সাথে পাল্লা দিতে দিতে এসে পড়লাম ব্রহ্মার মানসপুত্রের তটে।

গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালাম ব্রহ্মপুত্রের বাঁকে। সেখানে গোড়ালি পরিমান জল নিয়ে বেঁচে থেকেও ব্রহ্মপুত্র তার হাসি ভুলেনি। শুধু সামান্য কিছু কষ্ট নিয়ে হাসি মুখে গেছে আমার। চিরতরের মতো হয়তোবা। জুতো খুলে প্যান্ট হাঁটু পর্যন্ত গুঁটিয়ে পা ভেজালাম তার জলে। মাতাল হাওয়ায় দূর থেকে ভেসে আসে কিছু পথভ্রষ্ট মৌমাছির গুঞ্জন।

হঠাৎ নীরবতা ভেঙে মস্ত অপরাধ করলো আমার ফোন। পকেটে হাত চালান করে দিয়ে ফোনটা কানে ঠেকালাম। জানি না কে কল দিতে পারে। ওপাশ হতে ভেসে অাসলো পুরুষালী কন্ঠে অভিযোগ

-তুমি কেন অামায় নিয়ে বিকেলে বের হলে না?
-একা থাকার ইচ্ছে হচ্ছিলো তাই।
-জানতে চাইবে না, কিভাবে আমি জানলাম তুমি বের হয়েছো?
-নাহ্। প্রয়োজনবোধ করি নাহ…..।
-তুমি সবসময় কেন আমায় এড়িয়ে চলো?
-কারন তুমি যে সবসময় আমায় কাছে টানতে চাও, তাই…….
ওপাশ হতে কিছুটা সময় নীরব থাকার পর বললো
-আমি কি তোমার পাশে বসে একটা রাত কাটাতে পারি?
আমি কিছু বলি নি। ফোনটা কেটে দিলাম। যেন এ জীবনে তার ভালোবাসা ছাড়াও আমার জীবন চলে যাবে। অথচ আমিই হৃদয়ের গহীনে তার জন্য পুষে রেখেছি অগণন ভালোবাসা। ভালোবাসি তারে, আবার বাসিও না। আর বেসেই বা কি হবে। আগামী সপ্তাহে আমার ঘরে আমার সহধর্মিণীকে বরণ করার জন্য এখন থেকেই চলছে আয়োজন। তারে আর পেলাম না এ জীবনে……..

তখন গোধূলী লগ্ন।
ফালি রোদ যেন কালের গন্ধ মেখে নির্বিশেষে আছড়ে পড়ে অন্য পৃথিবীর মানুষের উপর। ফেরারী পাখিরা নীড়ের ঠিকানায় ডানা মেলে সে রোদ্দুরের ভাঁজে। তখনো কিছু গুঁড়ো নীল অবশিষ্ট আছে আকাশে। আমায় তখন মনে হয় পৃথিবীর বিচ্ছিন্ন কোন খন্ডাংশে দাঁড়িয়ে আছি সাময়িকের জন্য। দুপাশ তাকিয়ে দেখলাম জনসংখ্যা শূণ্যের কোঠায়। আমি পাখিদের মতো দুহাত দুদিকে ছড়িয়ে দিলাম, যেন বাতাসে ভেসে যাবো সে নদীর জনপদহীন অববাহিকায়। প্রবল বাতাস যেন আমায় সঙ্গী করে নিয়ে যাবে অচেনা কোনো গ্রামীন জনপদে, শুধু আজকের জন্য। কারন “আজ নেই কোন কাজ…”

-চিন্ময়ের ইতিকথা
৩ ফেব্রুয়ারি, ২১ শে মাঘ, শনিবার

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.