আত্নহত্যা

লেখকঃ অনির্বাণ আহমেদ

কয়েকমাস আগের একটা ঘটনা বলি, হিমু নামে একজন যিনি একজন প্রাণী অধিকারকর্মী ছিলেন, রানা প্লাজা ট্রাজিডিতে একজন সক্রিয় সেচ্ছাসেবী হিসেব কাজ করেছেন (বলা ভালো যে তিনি রানা প্লাজার ট্রাজেডির বর্ষপূর্তির দিনেই আত্নহত্যা করেন।) এই লোক আত্নহত্যা করার অন্তত দশদিন আগে থেকে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে জানাই দিচ্ছেন তিনি আত্নহত্যা করতে যাচ্ছেন, এমনকি গায়ে আগুন দিয়ে আত্নহত্যা করবে সেটাও ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে জানাই গেছে৷ আমি অবাক হচ্ছি এটা ভেবে যে লোকটা এত আগে থেকে সব কিছু জানানোর পরে,কেও তার পাশে দাড়ালো না! মৃত্যুর পরপরই তার ফেসবুক জুড়ে নানা কথাবার্তা, সে নাকি অনেকদিন থেকে ডিপ্রেশনে ভুগতেছিলো। তা তখন তার পাশে দাড়ানোর মতো কেও কী ছিলো না?

হয়ত ছিলো, কিন্তু গুরুত্ব দেয়নি। ভাবছে হয়ত ফেসবুকে ঘোষানা দিয়ে কেও সুইসাইড করে নাকি!

আবার আজকে দুপুরে আরেকটা সুইসাইডের ঘটনা দেখলাম, সেটা অবশ্য আমাদের কমিউনিটিরই। Adnan Abid নামের একটা ছেলে সেও প্রাণী প্রেমী ছিলো।৷ না সে তার ফেসবুকে কিছু লিখে যায়নি। তার ফেসবুক ওয়াল দেখলে বোঝা যাবে না এই হাসিখুশি ছেলেটা কখনো আত্নহত্যা করতে পারে!

আমরা দুইটা আলাদা ঘটনা দেখলাম। প্রত্যেকটি মানুষের প্রকাশ ভঙ্গী ভিন্ন।এটাই চিন্তার বিষয়। আত্নহত্যা প্রবণ মানুষদেরকে আলাদা ভাবে চিহ্নিত করা যায়না। কিন্তু আমরা চাইলে সম্ভাব্য সুইসাইডের হাত থেকে আমাদের আশে পাশের মানুষদের রক্ষা করতে পারি। কীভাবে? সেটাই বলছি।

একবারে সত্য বলতে আমাদের মাঝে এমপ্যাথির খুবই অভাব। সিমপ্যাথির কোন অভাব নেই, সিমপ্যাথি দোখানোতে আমরা পৃথিবীর সেরা জাতি এটা বলাই বাহুল্য। আমাদের উচিত সিমপ্যাথির চাইতে এমপ্যাথি বেশি চর্চা করা। যেসব মানুষ আত্নহত্যা করতে চায়, তারা আসলে মারা যাওয়ার জন্য আত্নহত্যা করতে চায় না। তারা চায় তাদের কষ্টগুলো বিষন্নতাগুলো শেষ করতে । যদি এমন দেখেন যে কেউ একজন ডিপ্রেশনে ভুগছে, তাহলে তার সাথে খোলাখুলি কথা বলুন, তাদের চিন্তাকে গুরুত্বদিন, তাকে বুঝতে চেষ্টা করুন, তাদের হালকা হতে সাহায্য করুন।

তবে প্রায়সই দেখা যায় একজন ডিপ্রেসড মানুষের প্রতি আমাদের আচরণ অন্যরকম হয়। আমরা নিজেকে খুব জ্ঞানী বলে জাহির করি, ডিপ্রেসড বন্ধুটির কথা না শুনে অনর্গল কথা বলতে থাকি। সহজ ভাবে বললে হুদাই মোটিভেশন স্পিচ দিতে থাকি। মনে রাখবেন অতিরিক্ত মোটিভিশনাল স্পিচ ভালো কিছু বয়ে আনেনা। নিজে বেশি বুঝেন, সে কিছু বোঝেনা এই ধরনের ভঙ্গি করলে সে কথাগুলো শেয়ার করার সুজগ পায় না। সে যে কষ্ট আছে সেটা কেও বুঝতে পারছেনা বলে ডিপ্রেসন আরো বেড়ে যায়।

আমাদের উচিত তার কথা মন দিয়ে শোনা, এতে করে সে মানসিকভাবে হালকা হয়। ডিপ্রেশন কাটাতে সাহায্য করে।

আবার অনেকের মাঝে সূক্ষ পরিবর্তন দেখা যায়। কেউ হয়ত মানুষজন এড়িয়ে চলে, কারো খাবারের প্রতি অনীহা, উৎসবের প্রতি অনীহা দেখা যায়। আবার কারো মাঝে সবকিছুকেি নেতিবাচক ভাবে নেয়, হাল ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। এমন আরো অনেক লক্ষণই দেখা যায়।

এগুলো অনেক সময় না থাকলে বোঝা যায়না। এই মূহুর্তে তাকে জানা এবং বোঝার খুবই প্রয়োজন। সেটি যখন কেউ করেনা, সেই ব্যাক্তি আরো বেশি ভেঙে পরে যে তাকে কেউ গুরুত্ব দিচ্ছেনা।

বাংলাদেশে প্রায় ৬৫লাখ মানুষ আত্নহত্যা প্রবণ এবং প্রতি বছর ১লক্ষ মানুষের মাঝে ১৩০জন মানুষ আত্নহত্যা করে থাকে। নিজের প্রিয় মানুষদের এই করুণ পরিণতি থেকে বাঁচাতে আমাদেরকে বেশি করে তার পাশে থাকতে হবে। তাই আসুন আজকে আমরা নিজেই নিজের কাছে একটা প্রতিজ্ঞা করি যে, আমরা আমাদের কাছের পরিচিত -পাশের মানুষদের মুখে কখনো আত্নহত্যা নিয়ে কোন কথা বা ইংগিত -চিন্তা শুনলে তা নিয়ে সরাসরি কথা বলব, তার কথা হেসে উড়িয়ে না দিয়ে তাকে বুঝতে চেষ্টা করব, তাকে এই ভরসা দিব যে, ‘you matter’

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.