এক চিলতে শরত

লেখকঃ হ্যামিলনের হাসিওয়ালা

নাতাশার সব কিছুতেই বাড়াবাড়ি। নাছোড়বান্দা আর জেদীও। যেকোনো ঘটনা, তা ছোট হোক বা বড় সেটাকে এক্সট্রিম লেভেলে নিয়ে যাওয়াই হচ্ছে তার প্রধান কাজ। নাতাশার মতে সে অনেক গুণে গুণবতী হলেও মাফির দাবি তার গুণ একটাই। নাতাশা এতটাই সুন্দর যে নাওমি ওয়াটস কেও হার মানাবে। ২০১২ বর্ষের নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির “হটেস্ট চিক” নির্বাচিত হয়েছে নাতাশা। বন্ধুরা যখন বলে, ‘দোস্ত, সাইজ তো সেই! ক্যামনে পটাইলি?’ গর্বে তখন মোজাইক করা মেঝে ছাড়া মাফির পা মাটিতেই পড়ে না।

ওহ…মাফির পরিচয়ই তো দেয়া হয় নি।
মাফি হচ্ছে নাতাশার বয়ফ্রেন্ড, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে চতুর্থ বর্ষে পড়ছে। সিনেমার হিরো না হলেও দেখতে হিরোর থেকে কম কিছু না। যেমন লম্বা তেমনি গায়ের রঙ, তার চকচকে সিল্কি চুলগুলো দেখলে যে কেউ হেড এন্ড শোল্ডারের মডেল ভেবে বসবে। নাতাশার বাধ্য বয়ফ্রেন্ড ছাড়াও মাফির আরেকটি পরিচয় হচ্ছে সে সরকারী দলের ছাত্রসংগঠনের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। মাফির মতে তার ঢাবিতে ঢোকার মূল উদ্দেশ্যই হল রাজনীতি করা। সে যাই হোক, ক্যাম্পাসে মাফি আবার খুবই জনপ্রিয়। মেয়েরা তো মাফি ভাই বলতে ফিদা! যার দরুন প্রতিদিন নাতাশার তিন বেলা ঝাড়ি খাওয়া রুটিনের মধ্যে পড়ে গেছে। সাথে চলে নানান ধরনের বিধি নিষেধ জারি। গতকাল ছিল নেভী ব্লু টিশার্টের উপর, আজ পড়লো মাফির শখের রিষ্ট ব্যান্ডের উপর। বাধ্য হয়ে ব্যান্ডটাকে রাস্তার পাশে ঝোপের মধ্যে ছুঁড়ে ফেলতে হল।

সকাল থেকেই নাতাশার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে মাফি ভীষণ বিরক্ত। হরতালের দিন তাকে হাঁটাতে হাঁটাতে নিয়ে যাচ্ছে টিকাটুলীর এক জ্যোতিষীর কাছে। জ্যোতিষী নাকি মাফির হাত দেখে বলবে বিয়ের পর তাদের কয়টা ছেলে কয়টা মেয়ে হবে। ‘যত্তসব ফালতু’ মাফি মনে মনে বলল। অটো মোবাইলসের ওয়ার্কশপের পাশে ছোট্ট একটা নোংরা দরজা দেখিয়ে নাতাশা বলল, ‘বেবি, যেকোনো একজনকে যেতে হয়, তুমি যাও, আমি বাইরে দাঁড়াচ্ছি’। চরম অনিচ্ছা আর বিরক্তি নিয়ে ভেতরে ঢুকে কিছুটা অবাকই হল। বাইরে থেকে ঘরটা যতটা নোংরা মনে হয় ভেতরটা ততটাই পরিষ্কার আর গোছালো। কাশ্মিরী কার্পেটে মোড়া মেঝে, হালকা হলুদ রঙা দেয়ালে ঝোলানো বিভিন্ন পোট্রেট, আবছা আলোয় ভরা সারা ঘরে কেমন জানি একটা নেশা ধরানো গন্ধ। মাফি দেখতে পেল দুই সিটের একটা সোফায় পাগড়ী পরা এক লোক একটা গোবেচারা টাইপ ছেলের হাত দেখছে। মাফি গলা খাঁকাড়ি দিয়ে বলল,
-এই যে হ্যালো, আপনিই কি সেই জ্যোতিষী?
এতক্ষনে লোকটা মুখ তুলে তাকালো।
-কি চাচ্ছেন?
-আমার হাতটা একটু দেখে দিন তো।
-দেখছেনই তো আমি আরেকজনের হাত দেখছি।
সকাল থেকে নাতাশার উপর জমানো রাগ আরেকজনের উপর ঢালার সুযোগ পেয়ে গেল মাফি।
-আই ডোন্ট কেয়ার। আগে আমারটা দেখে দিন। আমার কাছে সময় নেই।
-না থাকলে অন্য একদিন আসুন।
-ঐ তুমি চেনো আমাকে? ক্যাম্পাসের পোলাপান ডেকে এনে তোমার এই ভন্ডামী এক্ষুনি বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দিব।
-আপনি যা ইচ্ছে করতে পারেন।
-ঠিক আছে, দেখছি তোমার কি করা যায়।
দরজাটা খুলে মাফি যখন বের হতে যাবে তখনই জ্যোতিষী বলল,
-শুনুন, হাত না দেখেই আপনার সম্পর্কে একটা ভবিষ্যতবাণী করতে পারি।
মাফি রাগী মুখে জিজ্ঞেস করলো, ‘কী’?
জ্যোতষী সোফায় বসে থাকা ছেলেটাকে দেখিয়ে বলল, “আগামী একমাসের মধ্যে আপনি উনার সাথে গভীর প্রণয়ে লিপ্ত হবেন।”

এই কথা শোনার পর মাফি দশ সেকেন্ড হতভম্ব হয়ে জ্যোতিষীর দিকে তাকিয়ে থাকলো। তারপর বলল, ‘তোর ভাগ্য ভালো যে আমাকে আমার গার্লফ্রেন্ড তোর কাছে পাঠিয়েছে। নয়তো আজ তোকে কেটে টুকরা টুকরা করে মিরপুর চিড়িয়াখানার বুড়া বাঘটাকে দুপুরের লাঞ্চ করিয়ে আসতাম।’
এই বলে মাফি ধড়াম করে দরজায় একটা লাথি দিয়ে বের হয়ে চলে এলো। এসেই নাতাশাকে ধমকানো শুরু,
-কোথায় নিয়ে আসছ তুমি? যত্তসব বালছাল।
-কেন হানি, কি হয়েছে? কি বলেছেন উনি?
সবশুনে নাতাশা খুব হতাশ হল। মন খারাপ করে বলল,
-কোথায় আমি ভাবলাম উনি বলবেন অন্তরার থেকে দূরে থাকবেন, ও একটা কালনাগিনী। কিসব ফালতু কথা শুনিয়ে দিল, ধ্যাত!

তখনই জ্যোতিষীর ঘর থেকে ঝাঁকড়া চুলো একটা শ্যমলা ছেলে বের হয়ে আসলো। নাতাশা জিজ্ঞেস করলো, ‘এটাই কি সেই ছেলে?’
মাফি বলল, ‘হ্যাঁ, তাই তো মনে হয়’।
‘দাঁড়াও, দেখছি’ বলে হনহন করে নাতাশা ছেলেটার দিকে ছুটছে। মাফি পেছনে অনেকবার ডেকে ফেরানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হল। নাতাশা ছেলেটার মুখোমুখি হয়েই ঠাস করে এক থাপ্পর বসিয়ে দিল গালে। ছেলেটা তো হতভম্ব!
-নাম কি? নাতাশা জিজ্ঞেস করলো।
-নিখিল।
-কোথায় পড়?
-ঢাকা ভার্সিটিতে।
-কোন ডিপার্টমেন্ট?
-বাংলা, ফার্স্ট ইয়ারে।
-কোন ইয়ারে আমি জিজ্ঞেস করেছি?
-না তবে পরের প্রশ্নটা এটাই হত। আর আমি জানি আপনি কি বলতে এসেছেন। আমি যেন আপনার বয়ফ্রেন্ডের ছায়াও না মাড়াই।
-বাহ, ভালোই তো বুদ্ধি, দেখতেও হিজড়ার মত না, তাহলে মন মানসিকতা এমন কেন, হ্যাঁ? যাও, যেদিকে যাচ্ছিলে সেদিকে যাও।

এতক্ষণ ধরে মাফি দূর থেকে পুরো ঘটনাটা দেখছিল। কাছে গিয়ে বলল, “শোনো, একটু আগে যা ঘটলো তার জন্য আমি নাতাশার হয়ে স্যরি বলছি’।
“আরে আরে তুমি স্যরি বলছো কেন?’ নাতাশা মাঝখানে থামিয়ে দিল মাফিকে।
-নাতাশা চুপ করো, এখানে ওর কোন দোষ নাই, যা বলেছে ঐ শালা জ্যোতিষী বলেছে।
নাতাশা গটমট করে রেগে উলটা দিকে হাঁটা দিলো। মাফিও পেছন পেছন ছুটলো তাকে মানানোর জন্য।
রাত বাজে এগারোটা। মাফি গোসলটা সেরেই ভেজা তোয়ালেটা কোমড়ে জড়িয়ে বারান্দার ইজি চেয়ারটায় গা এলিয়ে দিল। মাফি ভেবে কূল পাচ্ছেনা জ্যোতিষী কেনো এবং কোন যুক্তিতে এই কথাটা বলল। ছোটবেলায় একজনকে একটু ভালো লাগতো, ব্যস এতটুকুই। সেটার প্রভাব এখন পর্যন্ত তো থাকার কথা না!থাকলে কি নাতাশার সাথে শারীরিক সম্পর্ক পর্যন্ত যেতে পারত? ‘আচ্ছা মানলাম নাতাশা আমাকে ভালোবাসে না, শো-অফের জন্য আছে, কিন্তু আমি কেন আছি ওর সাথে?’ মাফি ভাবছে। তখনই নাতাশাকে তার বন্ধুদের করা কমেন্টগুলোর কথা মনে পড়লো। মনে পড়লো বন্ধুদের মাঝে তার অহঙ্কারী হয়ে পড়ার কথা। আর ভাবতে চাইছে না মাফি। নিজের মধ্যে কেমন জানি একটা অপরাধবোধ চলে আসছে।

কয়েকদিন পরের কথা। ক্যাম্পাসে কোন একটা অনুষ্ঠান চলছে। সাপ্তাহিক মিটিঙটা বোরিং হবে ভেবে অডিটরিয়ামের শেষের সারিতে চুপ করে বসে পড়লো মাফি। রেজোয়ানা চৌধুরী বন্যা গান গাইছেন। কিন্তু এতে তার মন নেই। মন পড়ে আছে জ্যোতিষীর কথায়। হঠাৎ কানে আসলো পুরুষ কন্ঠে ‘আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়েছিলে’ গানের লাইনটা। রেজোয়ানা চৌধুরীর আবার কি হল? তাকিয়ে দেখলো সেই ছেলেটা, হাতে মন্দিরা, মুখে মিষ্টি একটা হাসি নিয়ে রেজোয়ানা চৌধুরীর সাথে গান গাইছে। মাথায় কোঁকড়ানো ঝাঁকড়া চুলগুলোও বেখাপ্পা লাগছে না একদম। পরনে হালকা নীলের কাজ করা শুভ্র সাদা পাঞ্জাবি। এক মুহূর্তের জন্য মাফির কাছে মনে হচ্ছিলো শরত কালের আকাশের নিচে কোনো এক কাশফুল ভরা মাঠে গানটার সাথে সাথে সে হারিয়ে যাচ্ছে । তালির শব্দে মাফির সম্বিত ফিরে এলো। তৎক্ষনাত অডিটোরিয়াম থেকে বের হয়ে গেল সে।

নাতাশা কদিন হল তার পরিবারের সাথে ইন্ডিয়া গিয়েছে, কাজিনের বিয়েতে অংশ নিতে। মাফি মনে মনে শুকরিয়া আদায় করলো। সামনে তার দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, অনেক কাজ তার উপর। জুনিয়রদের নিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বসে সেটা নিয়েই আলাপ আলোচনা করছিলো। “রুম্মান হারামজাদাটা এখনো আসলো না। ইডিয়টটার আসার কথা ছিল সবার আগে” মনে মনে আরও দুই চারটা গালি দিয়ে ফোন দিল।
-হারামি তুই কই? সোজা উত্তর পাশে চলে আয়। ফোন কাটিস না, হাঁটতে থাক, একটু সামনে আসলেই আমাকে দেখতে পাবি।

মাফি দাঁড়িয়ে ঘাড় উঁচু করে সামনের দিকে তাকাচ্ছিলো রুম্মানকে দেখা যায় কিনা। কেউ একজন আসছে কিন্তু সেটা রুম্মান না, নিখিল। মাফি ফোন কানে নিয়েই নিখিলের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। নিখিলও সেই মিষ্টি মাখা হাসিটা নিয়ে মাফির দিকে হেঁটে আসছে। আশপাশটা কেমন জানি ঝাপসা হয়ে গেছে, মাফি শুধু নিখিলকেই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। মাফি বুকের মধ্যে কেমন জানি একটা চিনচিন ব্যথা অনুভব করলো, যা আগে কখনও করে নি। আচ্ছা ব্যথাটার নাম চিনচিন হল কেন? এটা কি চীনদেশ থেকে এসেছে? সে যাই হোক, আপাতত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দক্ষিণ দিক থেকেই আসছে। নিখিল যতই কাছে আসছে মাফির চিনচিন ব্যথা ততই বেড়ে যাচ্ছে।
-দোস্ত স্যরি দোস্ত, একটু দেরি হয়ে গেলো আসতে।
রুম্মানের খাটাশ গলাটা শুনে মাফির ঘোর কাটলো। দেখলো নিখিল একটু সামনেই এক চা ওয়ালা বৃদ্ধের সাথে বসে গল্প করছে। মাফির আলাপ আলোচনা রুম্মানদের সাথে হলেও মন পড়ে আছে নিখিল আর চাওয়ালার কথপোকথনে।
-চাচা, দুপুরে খেয়েছেন?
-খাইতাসি দেহ না?
-কই? কি খাচ্ছেন?
-বাতাস খাই।
-আপনার না ডায়বেটিস? কম করে খাবেন। আজকের বাতাসটা একটু বেশীই মিষ্টি কিন্তু!
-হুম, তয় গন্ধটা আইজ কেমুন জানি।
-চাচা এখন যে ঘ্রাণটা পাচ্ছেন সেটাই বিশুদ্ধ। আসন্ন বাতাস কিন্তু বিষণ্ণতায় ভরা, তেতো লাগবে তখন।
এই কথা বলেই নিখিল মাফির দিকে তাকালো। হঠাৎ চোখাচোখি হয়ে যাওয়ায় মাফি একটু ইতস্তত বোধ করলো। একটুও সন্দিহান না যে কথাটা তাকে উদ্দেশ্য করেই বলা হয়েছে। নাহ, এভাবে আর সহ্য করা যায় না। মিটিং শেষে মাফি বলল, ‘তোরা যা, আমি আসছি’।
-নিখিল শোনো।
-আপনি কি চান আপনার গার্লফ্রেন্ড এসে তার লিপ লাইনার দিয়ে আমার চোখ দুইটা গলিয়ে দিক?
-এত সুন্দর চোখদুটো কেউ পারবে অমন করতে?
-কাল সারাদিন রোদে রোদে ঘুরে আমাকে ফলো করেছেন। এসবের কোন মানে হয়?
-তোমার সাথে আমার খোলাখুলি কথা বলা প্রয়োজন।
-উচিত হবে না।
এই বলে নিখিল চলে গেলো মাফিকে উদ্যানে রেখে।

চাওয়ালা চাচা মাফির হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘মিয়া ভাই এইডা দিয়া গেলো, ক্যান দিল বুঝলাম না। আমি কি লিখতে পড়তে পারি! একটু কন তো বাজান কি লিহা এইখানে।’
এটাতেও সেই একই লিখা যেটা সে কাল টোকাইয়ের হাতের কাগজটায় দেখেছিল, পিঠা বিক্রেতা খালা, ওভার ব্রিজের ফুল নিয়ে বসা বৃদ্ধা, এমনকি নিখিলের বাসার দারোয়ানের কাছেও একই রকম চিরকুট দিয়েছে নিখিল। ‘নিখিলকে ভুলে যেও না তোমরা’, একটা বাক্য হাজারটা কৌতূহলের জন্ম দিচ্ছে। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত ১০টা বাজতে চলল। কাপের পর কাপ চা খেয়েও মাফির অস্থিরতা কমে না। বাসায় তার মন একদমই টিকছে না।
-আপনি?
-আমি মাফি। এই বিল্ডিঙের নিখিলের বন্ধু। কালও তো এসেছিলাম।
-ও আচ্ছা, স্যার আসুন। নিখিল মামা তিন তলায় থাকে। আপনি যান।
ওহ, তাই তো। দারোয়ান না বললে তো জানতেই পারত না নিখিল কোন ফ্লোরে থাকে।

দোতলা পর্যন্ত উঠেই শুনতে পেল তৃতীয় তলার দরজা খোলার শব্দ। দেখল নিখিল খুব দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে উপরে ছুটছে। মাফিও পেছন পেছন দৌঁড়াচ্ছে নিখিল কি করে দেখার জন্য। ছাদ পর্যন্ত গিয়ে মাফি হাঁপাতে লাগলো। তাকিয়ে দেখল নিখিল দূরে রেলিং ধরে অঝোরে কেঁদে যাচ্ছে। এ কোন নিখিল! মাফি তো কখনও নিখিলের এই রুপ দেখতে চায় নি। ‘নিখিল’ বলে ডাকতে যাবে তখনই মাফির পায়ে কি যেন একটা লাগলো। তুলে দেখল একটা ডায়েরি। শেষ পৃষ্ঠাটা উল্টানো, তাতে কিছু লিখা রয়েছে। মাফি আবছা আলোয় পড়তে চেষ্টা করলো। “স্বপ্নগুলো বেঁচে থাকুক অন্য কারো চোখে, আমি না হয় হারিয়ে গেলাম বাস্তবতার স্রোতে।” মাফির বুঝতে কষ্ট হল না নিখিল কি করতে যাচ্ছে। আরও নিশ্চিত হল ডায়েরির শেষের পাতাটার আগের পাতার লিখা পড়ে। “একটু পর আমার মায়ের মৃত্যু বার্ষিকী, আগামী বছর থেকে তা আমার মায়ের ছেলেরও হবে।”
মাফি তাকিয়ে দেখলো নিখিল তখনও কেঁদে যাচ্ছে। হয়তো অপেক্ষা করছে ১২টা বাজার। হুট করে কিছু করা যাবে না, এতে হিতে বিপরীত হতে পারে।
মাফির আর্তনাদে চমকে উঠলো নিখিল। পেছন ফিরে দেখলো মাফি ডান পা ধরে মেঝেতে বসে কাতরাচ্ছে।
-আপনি? এখানে?
নিখিল খেয়াল করলো মাফির পা টা রক্তে ভেজা।
-এসব কি করে? কিভাবে?
জিজ্ঞেস করতে করতে নিখিল রাজ্যের বিস্ময় আর অশ্রুভরা চোখ নিয়ে মাফির কাছে ছুটে গেল।
মাফি জাপটে ধরলো নিখিলকে, ‘কোথায় পালাবে সুন্দরী?’
-মানে কি এসবের, আর আপনার পা কাটল কি করে?
আঙুল দিয়ে একটা রঙের ডিব্বা দেখালো মাফি।
-রক্সি পেইন্ট কিন্তু সত্যি অনেক ভালো। কিন্তু ছাদটাকে লাল রঙ করবে কেন? বাড়ির মালিককে বকে দিও তো।
-ছাড়ুন আমাকে, এক্ষুনি ছাড়ুন।
নিখিল প্রচণ্ড রেগে গেলো। মাফি হেসে বলল,
-ভার্সিটির নেতার হাতে পড়েছ, একদম শক্তি খাটানোর চেষ্টা করবে না। মোচড়ামোচড়ি রেখে এখন বলবে কি হয়েছে?
রাত তখন ১২টা ৩০।
মাফি নিখিল মুখোমুখি হয়ে বসা। দুজনেই চুপ।

‘জন্মই আজন্মের পাপ। কথাটা মনে হয় আমাকে দেখেই সৃষ্টি হয়েছে।’ নিখিল বলতে শুরু করলো, ‘নানা ভাই আমার মায়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে তার পছন্দ করা ছেলের সাথে বিয়ে দেন। মা বাধ্য হয়ে বাবাকে মেনে নিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু মনে প্রাণে ভালবাসতেন অন্য একজনকে। তিন বছর পর আমার জন্ম হয়। বাবার ভালোবাসার প্রতিদানে মা বাবাকে ঠকাতে চায় নি। একদিন সব পাপ স্বীকার করে বলেন এই বাচ্চা তার না। স্বাভাবিকভাবেই তাদের ডিভোর্স হয়ে যায়। ডিভোর্সের কিছুদিন পর মা যাকে ভালবাসতেন তিনি একটা কার এক্সিডেন্টে মারা যান। মা তার পোড়া কপালের জন্য আমাকে দায়ী করতেন।আমার পাঁচ বছর বয়সের মধ্যেই মা আমাকে দুইবার কেরোসিন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলতে চেয়েছিলেন। তখন থেকে আমি আমার নানির কাছে বড় হই। একই বাড়িতে থেকেও মা কখনও আমার দিকে তাকাতো না। মৃত্যু শয্যায় একবার ডেকে বলেছিলো, “বাবা আমাকে অভিশাপ দিস না কখনো।” আমি বলেছিলাম, “মা তুমি অনেক বোকা। নাহলে কেউ নিজেকে নিজের আপন সন্তান থেকে দূরে সরিয়ে রাখে? আর এখন তুমি এই কথা বলছ?” মা মারা যাওয়ার একবছর পর নানিও মারা যান। আপন মা-ই যখন দেখতে পারে নি, সেখানে মামিরা কি দেখবে? ক্লাস এইটের বার্ষিক পরীক্ষা দেয়ার পর ছোট খালা ঢাকায় নিয়ে আসেন। মায়ের আদরের স্বাদ কেমন তা জানতে পেরেছি ছোট খালার কাছে এসে। ফাহাদ ফাহিম হয়ে উঠে আমার পৃথিবী, তাদের পৃথিবীও নিখিল ভাইয়াকে নিয়ে। কিন্তু কথায় আছে, অভাগা যেদিকে চায়, সাগর শুকিয়ে যায়। আমার খালা একজন আইনজীবী এবং সোশ্যালিস্টও আর খালু ব্যাংকার। প্রত্যেক শনিবার খালা ফাহিম ফাহাদকে আর্ট স্কুলে নামিয়ে তার হিউম্যান রাইটসের অফিসে চলে যেতেন। অফিস ছুটি, খালু বাসাতেই থাকতেন। একদিন সকালে উনার এক বন্ধু আসে বাসায়। দুজনের চাহনি আর কথা বলার ভাব দেখেই আন্দাজ করছিলাম আজ কিছু হতে চলেছে। হ্যাঁ, আপনি যা ভাবছেন তাই। আমার মুখ চেপে ধরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে তাদের পাশবিক নির্যাতন। খালামনি আমাকে তার সন্তানের মত ভালোবাসে। আমি জানি, শুরু থেকে খুলে বললে খালামনি সব বিশ্বাস করবে ঠিকই, কিন্তু আমার মায়ের মত তাঁরও সংসার ভাঙবে। তখন ফাহিম ফাহাদের কি হবে? প্রত্যেক শনিবার খালুর সাথে বিছানায় যাওয়াটা সাপ্তাহিক রুটিনের মধ্যে পড়ে গেলো। খালা বের হয়ে গেলেই তিনি আমাকে ক্লাসে যেতে দিতেন না। স্কুল লাইফ, কলেজ লাইফ পেরিয়ে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হয়েও যখন নির্যাতন থেকে মুক্তি পাই না, তখন নিজের কাছেই নিজেকে ছোট মনে হয়। মনে হয় নিজের ব্যক্তিসত্তা বলতে কিছুই নেই। মাঝে মাঝে ভাবি ছোট বেলায় মায়ের হাতেই যদি মরে যেতাম, তাহলেই ভালো হত, এত দুঃখ সহ্য করতে হত না। সাথে যোগ হলেন আপনিও। আর না পেরে ঠিক করলাম মায়ের মৃত্যুবার্ষিকীতেই মরব। কেন মরলাম কেউ জানবে না, খালাও জানল না খালুর কুকীর্তির কথা। সাপও মরল, লাঠিও ভাঙলো না।’

গাল বেয়ে মাফির চোখের পানি বুক ছুঁয়েছে। সাদা শার্টটা ভিজে একাকার। এতক্ষন সে অবাক হয়ে শুনছিল নিখিলের কথা। ‘তোমার হাসিমুখটার পেছনে যে এত দুঃখ লুকিয়ে, কল্পনাও করি নি।’ নাক ঝেড়ে চোখের পানি মুছে বলল, ‘কাল তো শনিবার। যাও এখন ঘরে যাও। আমি সকালে আসছি। কি হল? কি ভাবছো এত? তোমার মায়ের মৃত্যুবার্ষিকী কাল সারাদিনই থাকবে। ছাদের গেটও তো খোলাই থাকবে। আমি না আসলে দিনের বেলা মরে যেও।’
সকাল ১০টা। দুইবার বেল টেপার পরও দরজা খুলছে না কেউ। মাফির মেজাজ গেলো আরও গরম হয়ে। তৃতীয় বার টিপতে যাবে তখনই চল্লিশঊর্ধ্ব এক ভদ্রলোক চরম বিরক্তি মাখা মুখ নিয়ে দরজা খুলে বলল, কি চাই?
-স্লামালাইকুম, আপনি কি নিখিলের খালু?
-হ্যা, নিখিল বাসায় নেই। পরে এসো।
এই বলে দরজা লাগিয়ে দিতে যাচ্ছিলো।
-দাঁড়ান দাঁড়ান, আন্টি আছেন?
-না নেই।
-বাচ্চারা?
-না তারাও নেই। তুমি কে বলতো? প্রশ্নের উপর প্রশ্ন করে যাচ্ছ?
-তোর বাপ!
বলেই মাফি এক লাথি দিয়ে লোকটাকে সোফার উপরে ফেলল। সোফার হাতলে লেগে লোকটার কপাল কেটে গেছে। মাফি কলার ধরে টেনে বলল, ‘অনেকদিন ধরে গুন্ডামি দেখাই না কোথাও। আজ মিস করবো না’।
হৈ চৈ শুনে নিখিল দৌড়িয়ে ভেতরের ঘর থেকে বের হল। এসে দেখে মাফির হাত মুখ দুটোই ব্যস্ত। মুখ দিয়ে শুধু এর পোলা ওর পোলা বের হচ্ছে আর হাত দিয়ে ইচ্ছে মতন থাপড়াচ্ছে। নিখিল আপ্রাণ চেষ্টা করছে মাফিকে আটকানোর। কিছুতেই পারছে না। এক পর্যায়ে নিখিল মাফিকে এক ঝটকায় কাছে টেনে নিয়ে ঠোঁটে চুমু খেয়ে বলল,
-আমাকে অবাক করা ছাড়া তোমার কি আর কোন কাজ আছে?
-হ্যাঁ আছে তো, খালামনিকে ফিরতে দাও তারপর। আপাতত তুমি লাঞ্চের ব্যবস্থা করো। আর স্যাভলনটা দিয়ে যেয়ো। খালুজানের রক্তটা পরিষ্কার করে লাগিয়ে দেই।
বিকেলে কলিং বেলের শব্দ শুনে মাফিই দরজাটা খুলে দিল। “বাচ্চারা যাও, ভেতরে গিয়ে রেস্ট নাও’ বাচ্চাদের ভেতরে পাঠিয়ে মাফি সরাসরি নিখিলের খালার কৌতূহলী মুখটার দিকে তাকালো।
-এখন আপনি একটা টেন থাউজেন্ড ভোল্টের শক খেতে যাচ্ছেন। আমি মাফি, বাবা মার একমাত্র সন্তান। বাবা মা কানাডায় থাকে, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করছি। রাজনীতি করলেও মানুষ হিসেবে আমার যথেষ্ট সুনাম আছে। লোক দেখানো একটা গার্লফ্রেন্ড ছিল যে ইন্ডিয়াতে গিয়ে এক ছেলের সাথে ভেগে বিয়ে করে ফেলেছে। আর তার লোক দেখানো বয়ফ্রেন্ড মানে আমি মাফি আপনার ভাগ্নে নিখিলকে পাগলের মত ভালোবেসে ফেলেছি। যেহেতু এদেশে বিয়ে সম্ভব না পড়াশুনা শেষ করে কানাডা না যাওয়া অবধি আমরা লিভ টুগেদা্র করতে চাই। আমার বাবা মা আমার সিদ্ধান্তে খুবই খুশি, এখন আপনার মতামত জানতে চাই। এটা স্রেফ ফরমালিটি, অমত করলে আমার সুনামের দুর্নাম ঘটিয়ে গুন্ডামির চূড়ান্ত রূপ দেখাব। এখন বলুন, রাজী?

এক নিশ্বাসে সব কথা বলে মাফি হাঁপাতে লাগলো। ‘জানিস নিখিল’, এই প্রথম ঘরে ঢুকে নিখিলের খালা কথা বলল, ‘আজকে আমাদের হিউম্যান রাইটসের সেমিনারের মূল বিষয় ছিল সমকামীদের অধিকার। সেখানে তাদের অধিকারের পক্ষে আমি ১০ মিনিটের একটা স্পিচ দেই। তোদের কি মনে হয় আমি তোদের সিদ্ধান্তে অমত দিয়ে ধোঁকাবাজে পরিণত হবো? কি নাম বললে? মাফি? যাও আংটি কিনে নিয়ে এসো। বিয়ে তোমার মা বাবা করাবে, এনগেজমেন্টটা নাহয় আমিই করালাম।’
টেন থাউজেন্ড ভোল্টের শকটা এবার মাফি খেল। মাফির বোবা হয়ে যাওয়া মুখটা দেখে নিখিল আর তার খালা হেসে লুটিয়ে পড়ছে। খালু হঠাৎ ‘উহ’ করে উঠলো। ‘একি তোমার কি হয়েছে?? কপাল ঠোঁট এভাবে কাটলো কি করে??’
‘ও কিছু না আন্টি’, মাফি বলল, ‘আঙ্কেল সিঁড়ি বেয়ে নামতে গিয়ে স্লিপ খেয়ে পড়ে গেছিলো। সাবধান হয়ে গেছে, আর পড়বেনা।’
আজ শনিবার।
সকাল সকাল মাফি গাড়িতে বসে লাগাতার হর্ন বাজাতে লাগলো।
নিখিল হাতে একটা গিফট বক্স নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে গাড়িতে গিয়ে বসল।
-উফফ…কি শুরু করেছ? বন্ধ করবে?
-আজকে এনিভার্সারির দিনেও ওয়েট করালে, বিকেলে তোমার লাইভ শো মিস হলে আমাকেই দোষ দিবে।
-গিফটটা যে র্যারপিং করতে বলেছিলাম, না করে তো আমার জন্যই ফেলে রেখেছ।
-ওপস…
-ওপস ওয়ালা, এখন চলো।
মাফি কান্না কান্না স্বরে বলল,
-আমার না গেলে হয় না?
-কি??
-না মানে, যে লোককে এক বছর আগে বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দিতে চেয়েছিলাম, তার জন্য গিফট নিয়ে যাব কোন মুখে?
-হা হা হা , নিখিল হাসতে হাসতে মাফির ঠোঁটে চুমু খেল।
– মাফি বাবু, গাড়ি স্টার্ট দাও।

মাফি এতক্ষন পর খেয়াল করলো নিখিল আজ হালকা নীলের কাজ করা সেই সাদা পাঞ্জাবীটা পড়েছে। দেখেই মনটা ভালো হয়ে গেলো। সত্যিই তো! যার জন্য সে আজ এক চিলতে শরৎ পেল, তাকে একটা স্যরি বলতে কিসের লজ্জা? মাফি গাড়ি স্টার্ট দিলো। গন্তব্য, টিকাটুলীর মোড়

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.