মনা ভাই

লেখকঃ হ্যামিলনের হাসিওয়ালা

(প্রথম খন্ড)

১.
বিশিষ্ট ব্যবসায়ী জনাব আনিসুর রহমান এবং তাঁর স্ত্রী ডোনা রহমান ধানমন্ডি পুলিশ স্টেশনে বসা। এত রাতে এই গরমেও আনিসুর রহমান সুট টাই পড়ে আছেন। সেজন্য না হলেও টেনশনে মৃদু ঘামছেন। তাঁর স্ত্রী মুখে আঁচল চেপে নিঃশব্দে কাঁদছেন।
-পুরো নাম কি?
এসি শাফকাত দুজনের দিকে তাকিয়েই জিজ্ঞেস করলেন।
-পুরো নাম জানা নেই। মনা নামেই সবাই চিনত।
আনিসুর রহমান উত্তর দিলেন।
-সবাই বলতে?
-ও যেখানে থাকত, রায়ের বাজার বস্তির লোকজন।
-বয়স আনুমানিক কত হতে পারে?
-২৫/২৬।
এসি খাতায় টুকে নিলেন।
-দেখতে কেমন?
-কালো, লম্বা, কুৎসিত।
মিসেস রহমান শাড়ির আঁচল মুখ থেকে সরিয়ে তাড়াতাড়ি কিন্তু যথেষ্ট নীচু স্বরে বলে চললেন।
: বিশ্বাস করুন আমি বারবার মানা করেছিলাম ওকে বাসায় রাখতে। আমি শুরু থেকেই ঐ লোকটাকে ভরসা করতে পারি নি। কিন্তু আনিস আমার কথার কোনো দামই দেয় নি। হি অলওয়েজ আন্ডারএস্টিমেটস মাই এভরি অপিনিয়ন।
:আহা…তখন কি আর এটা বোঝা গিয়েছিল যে সাধারন এক মালীর এত বড় দুঃসাহস হবে?
আনিসুর রহমান খানিকটা বিরক্তির সুরে বললেন।
:যাইহোক, আপনাদের ছেলের নাম কি যেন বললেন?
:ফাহমিদুর রহমান। ডাকনাম পুতুল।
:পুতুল? ছেলেদের নামও পুতুল হয় নাকি?
:ছেলেটা আমার দেখতে খুব সুন্দর। তাই ওর দাদী ছোটবেলা নাম রেখেছিল পুতুল।
:আচ্ছা যাইহোক, চিন্তা করবেন না। রায়ের বাজার ফোর্স পাঠাচ্ছি। ওর সব তথ্য অতি দ্রুত বের করার চেষ্টা করছি। ডিআইজি স্যারের অর্ডার মোতাবেক ঢাকার ভেতরের প্রত্যেকটি থানায় অলরেডি জানানো হয়েছে। খুব শীঘ্রই সে ধরা পড়বে। আপনারা আপাতত বাড়ি যান। ওহ্ হ্যাঁ, আপনাদের ছেলের একটা ছবি দিয়ে যান।
মিসেস রহমান ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে পুতুলের একটা ছবি বের করে এসির ডেস্কে রাখলেন। তারা চলে যাওয়ার পর টেলিফোনের ডায়ালে নাম্বার চাপতে চাপতে শাফকাতের ছবিটার দিকে চোখ পড়ল। কিছুক্ষন অবাক হয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল।
…”সত্যিই তো! দেখতে ঠিক পুতুলের মত! কি নিষ্পাপ চেহারা! সদ্য দাড়ি গোঁফ উঠছিল ছেলেটার। দেখেই বোঝা যাচ্ছে কত আদর যত্নে বড় হয়েছে। কি মায়াভরা মুখ! আহারে! না জানি ছেলেটাকে জীবিত উদ্ধার করা যাবে কিনা! “
২.
ভোঁওওও…
লঞ্চের সাইরেনের শব্দে পুতুলের ঘুম ভাঙলো। চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে বসল। চক্কর দিয়ে উঠল মাথাটা হঠাৎ। বহু কষ্টে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল সে আসলে কোথায় আছে। চারকোণা একটা ছোট্ট ঘর। ছোট একটা খাট, একটা টেবিল আর একটা চেয়ার রাখা। পুতুল খাটের উপর থেকে দেখল কেউ একজন নিচে শুয়ে ঘুমুচ্ছে।
-মনা ভাই? মনা ভাই?
পুতুলের ডাকে আস্তে আস্তে মনা নামের লোকটার ঘুম ভাঙল। তারপর লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে “এহ্ ” “উহ্ ” শব্দ করতে করতে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করতে লাগল। তাকে ভীত সন্ত্রস্ত দেখাচ্ছে। পুতুল কিছুই বুঝতে পারছে না।
:মনা ভাই আমি এখানে কেন? আমরা কোথায়? আমাদের না সন্ধ্যের আগে বাসায় ফেরার কথা? মা ফিরে যদি দেখে আমি বাইরে, প্রচন্ড রাগ করবেন। কি হল? আপনি কি খুঁজছেন?
মনা এদিক ওদিক খুঁজে একটা পুটলী থেকে নাইলনের দড়ি বের করল। পুতুলের দিকে এগিয়ে গিয়ে শক্ত করে ওর দুই হাত দুই পা বেঁধে ফেলতে লাগল।
:কি করছেন আপনি? আমাকে বাঁধছেন কেন? আমি কি করেছি? মনা ভাই আমার লাগছে! মনা ভাই!
শেষমেষ মোটা স্কচটেপ দিয়ে পুতুলের মুখেও লাগিয়ে দিল। পুতুল বিছানায় পড়ে গোঙাচ্ছে। মনা বাইরে থেকে রুম তালা মেরে লঞ্চের রেলিং ধরে দাঁড়াল।
-যা করতেসস ভাইবা চিন্তা করতেসস তো মনা?
পেছন থেকে মনার বয়সীই এক লোক জিজ্ঞেস করল।
-“নাহ্,” মনা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “ভাইবা করি নাই। কি করতাসি না করতাসি তাও জানি না। তয় একবার বাইর কইরা ফালাইসি, আমি আর ওরে বাড়িত যাইতে দিমু না। “
-বড় লোকের পোলা। ধইরা আনলি কিন্তু টাকা চাইবি নে। তো খালি খালি কেন ধরলি? কিছু জিজ্ঞেস করলেও কইতে চাইস না। ওয় তো মাইয়াও না যে তুই বিয়া করবি।
মনা চুপ করে আছে। লঞ্চ চলছে পদ্মার বুক চিরে। সাঁই সাঁই করে কিছু শঙ্খচিল উড়ে যাচ্ছে। মনার দৃষ্টি সেই পাখিদের দিকে। সাঁই সাঁই শব্দটা যে তার বুকের মধ্যেও হচ্ছে। রফিকের প্রশ্নগুলো কানে বাজছে। তার চেহারায়ও মনা অনেকখানি চিন্তা ফুটে উঠতে দেখেছে। এটা কি বন্ধুর উদ্বেগ দেখে নাকি তার মালিকের লঞ্চে উটকো ঝামেলা নিয়ে আসায় মনা বুঝতে পারছে না।
লঞ্চের হোটেল থেকে রুটি আর সব্জি কিনল। অনেক বেলা হয়ে গেছে। ছেলেটা রাতে সদরঘাট এসে বাখরখানি দিয়ে দুধসর খেয়েছিল। দুধে ছিল ঘুমের ওষুধ মেশানো। সেই থেকে বেঘোরে ঘুমিয়েছে। মনা কেবিনের দরজার লক খুলতে গিয়ে থেমে গেল।
‘খাইতে দিতে গেলেই তো আবার জিগাইব আমি ক্যান এইহানে। তারে ক্যান বানছি। উত্তর দিতে পারুম না। তখন মনা ভাই মনা ভাই কইয়া আবার ডাকব। আমি কেমনে সহ্য করুম? “
শরতের আকাশের কালো মেঘের মত তার চেহারাটাও কালো হয়ে গেল । রুটি সব্জির ঠোঙাটা হাতে সে ধপ্ করে মেঝেতে বসে পড়ল।
৩.
:স্যার, খবর নিসি স্যার। মনা নামের লোকটা কুখ্যাত এক সন্ত্রাসী। মাদক ব্যবসা থেকে শুরু করে খুন, ডাকাতি, চাঁদাবাজি হেন কোন কাম নাই যে সে করে নাই স্যার। এই শালা চাঁদাবাজি কইরা হাজারীবাগে ৬তলা বিল্ডিং তুলছে স্যার। দুইটা মাইয়ারে বিয়া দিসে স্যার। দুইজনই মাশাল্লাহ্ খুব সুন্দর। একজনের ব্যবহার খুবই চমৎকার। দরজা ধাক্কাতেই খুলে বলল, “কাকে চাই “। স্যার এত মিষ্টি গলা আমি জীবনেও শুনি নাই। স্যার কৌশলে মাইয়ার নামও জানতে পারছি। নাম হইল গিয়া …”
:”মতিন আলী”, এসি শাফকাত কঠিন গলায় ডাকলেন। “আপনি যে একজন কঠিন বেয়াদব তা কি জানেন? “
:স্যার আমি বেয়াদব? আমি? ওসি মতিন হারামী, ঘুষখোর, বদ হইতে পারে। কিন্তু বেয়াদব না স্যার।
তার চেহারা দেখে মনে হল এসির কথায় মনে কিছুটা আঘাত পেয়েছে।
:আপনি ভবিষ্যতে আর আমার সামনে আসবেন না। একান্তই কোনো দরকারে যদি আসতে হয় ব্যবহার মার্জিত করে আসবেন। মনে থাকবে?
:জ্বী স্যার।
:আর প্রত্যেকটা কথায় স্যার স্যার করাও কি আপনার আদবের মধ্যে পড়ে? ভবিষ্যতে এই অভ্যেসটাও ছাড়বেন। এখন যান, গিয়ে হাবিবকে পাঠান।
“জ্বী স্যার” বলে ওসি মতিন বেরিয়ে গেল।
শাফকাত ভাবছেন একটা মানুষ কতটা ডিসগাস্টিং আর ছোটলোক হতে পারে!
:স্যার আমাকে ডেকেছেন?
:হ্যাঁ আসো। আচ্ছা মনা মিয়া কি তাহলে সত্যিই কোনো প্রফেশনাল ক্রিমিনাল?
:না স্যার। মতিন আলী অন্য মনা মিয়ার কথা বলছে। আসল মনা মিয়ার খোঁজ নিতে গিয়ে আরেক মনা মিয়ার বাড়িতে গিয়ে চা -টা খেয়ে এসেছে। ঐ মনা মিয়ার খবর পরে আমরা কয়েকজন বের করার চেষ্টা করেছি।
:থার্ডক্লাস কোথাকার! এর একটা ব্যবস্থা নিতে হবে। যাইহোক, কি পেলে পরে?
:স্যার এই মনা মিয়া রায়ের বাজারে আছে প্রায় ১০/১৫বছর হল। ১ বছর আগে ওর বৃদ্ধ মা মারা গেছে, আত্নীয় স্বজন কেউ নেই। পৈতৃক বাড়ি কোথায় কেউ নির্দিষ্ট করে বলতে পারছে না। কেউ বলছে বরিশাল, কেউ বলছে বরগুনা বা পটুয়াখালী।
:আর কিছু জানতে পেরেছেন?
:স্যার এই লোক কিছুটা অদ্ভুত রকমের। লোক মুখে শুনলাম সে একদমই সামাজিক না। খুব প্রয়োজন ছাড়া কারো সাথে কথা বলত না। আড্ডা, বন্ধু নিয়ে চলা এসব কেউ কখনও দেখে নি। প্রতিদিন সকালে কাজে বের হত, সন্ধ্যায় চুপচাপ ঘরে ফিরত। বাড়তি কোনো ঝামেলায় সে থাকত না।
:হুমম…এই ধরনের মানুষের কেস নিয়ে ইনভেস্টিগেশন করা খুব কঠিন।
:আমারও তাই মনে হচ্ছে স্যার।
:কেন জানি মনে হচ্ছে সে মুক্তিপণ চাইবে না। নয়ত চব্বিশ ঘন্টা পার হয়ে গেছে, কিডন্যাপারের কোনো ফোন নেই কেন? তোমরা সার্চ চালু রাখো। পাওয়া যাক আর না যাক, ডিআইজি স্যারকে দেখাতে তো হবে আমরা চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখছি না।
:ওকে স্যার।
৪.
পুতুল কাত হয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে আছে। হাত পা আগের মতই বাঁধা। টেপও লাগানো আছে মুখে। প্রচন্ড কান্নাকাটি করায় তার ফর্সা মুখ লালচে হয়ে আছে। মনা আস্তে আস্তে দড়ির গিঁটগুলো খুলে দিচ্ছে। সম্পূর্ণ খোলার পর সে খেয়াল করল পুতুলের শরীরে দড়ির মোটা মোটা ছাপ পড়ে গেছে। সে খেয়ালই করে নি বাঁধনটা এত শক্ত হয়ে যাবে। রক্তবর্ণের দাগগুলো দেখে মনা হকচকিয়ে গেল। যে ছেলের গায়ে একটা তিলও নেই, তার শরীরে এত দাগ! অনেক কষ্টে নিজের কান্না আটকালো সে। নিজের দোষের জন্য প্রচন্ড অনুতপ্ত বোধ করতে লাগল। মুখের স্কচটেপটা খুলতে গিয়ে পুতুল জেগে গেল। ঘুম ভাঙতেই ‘মা মা’ করে কাঁদতে লাগল। তার কান্নার শব্দেই বোঝা যাচ্ছে কতটা ক্লান্ত আর অসহায় হয়ে পড়েছে সে।
:আমাকে ছেড়ে দাও প্লিজ। আমি মার কাছে যাব। আমাকে মার কাছে নিয়ে চল।
:লও, এইগুলান খাইয়া লও।
:না আমি খাব না। আমার খাওয়ার দরকার নেই। আপনি আমাকে বাসায় নিয়ে চলুন।
পুতুল অঝোরে কেঁদে চলেছে।
:আগে রুটিগুলান খাও।
:না আমি খাব না। আমি থাকব না এখানে। আমাকে ছাড়, আমি বাসায় যাব।
পুতুল এবার চিৎকার করে কান্না করছে। মনা বোঝানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হল।
:প্লীজ আমাকে ছেড়ে দাও। আমি বাসায় যাব। আমি মা বাবার কাছে যাব।
হঠাৎ মনা পুতুলের গালে ঠাস্ একটা চড় মারল।
:কোন মা বাবার কাছে যাবি? যে মা বাবা খালি টেকা টেকা করে? যে মা বাবা ভুইলা যায় তাগো একটা সন্তান আছে? কামের লোকের হাতে তুইলা দিয়া নিজেরা চিন্তামুক্ত হইয়া যায়। সারারাইত পার্টি কইরা বেরায়, ফোন দিয়া পোলার একটা খবর নেয় না। এর সাথে ওর সাথে ঘুইরা বেড়ায় তয় পোলারে টাইম দেওন যায় না! বিদেশী মেহমান কি খাইব না খাইব সেটা নিয়া অস্থির হইয়া যায়, কিন্তু তার পোলা কি খাইছে সেই খবর রাখে না ঐ মা বাবার কাছে যাইতে চাস? ঐ সব মা বাবা জন্ম দিয়াই খালাস। বাকী বড়লোকদের সাথে তাল মেলানোরই টাইম নাই, সন্তান কখন লালন পালন করব? হাহ্, মা বাবা!
মনা উঠে হনহন কর চলে গেল। এতক্ষণ পুতুল অপলক তাকিয়েছিল মনার দিকে, বিস্ময়ে চোখভরা। এটা কি সেই অদ্ভুত মনা ভাই, যে কিনা এদিক সেদিক না তাকিয়ে সারাদিন এক মনে বাড়ির কাজ করত? যাকে উত্তরের আশা ছেড়ে প্রশ্ন করা হত? সে তাকে এইভাবে লক্ষ্য করেছে! পুতুল কখনো বুঝতেই পারে নি।
৫.
খেতে খেতে পুতুল ভাবছে মনার কথাগুলো কতটা বাস্তব। সত্যিই সে তার মা বাবার অবহেলিত সন্তান। ছোট থেকেই মা বাবার সন্তান পালনে ছিল অনীহা। কে জানে পুতুল হয়ত তাদের ভালবাসার না, নিয়মের ফসল! তবে মা বাবার আদরের অভাব খানিকটা পূরণ করতে পেরেছিল তার দাদী। বড় একটা আঘাত পায় যখন দাদী পুতুলের আট বছর বয়সে মারা যায়। মা বাবা বাইরে বাইরে ঘুরত। কখনো ব্যবসার কাজে, কখনো বা পার্টি এটেন্ড করতে। পুতুল এটাও ভুলে গেছে তার মা শেষ কবে স্কুলের দেরী হচ্ছে বলে তাকে বকা দিয়েছে কিংবা তার বাবা শেষ কবে তাকে স্কুলে পৌঁছে দিয়েছে। পুতুলের যেদিন জেএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট বের হল, এ প্লাস পাওয়ার খবর দিতে খুশিতে ছুটতে ছুটতে এসে দেখল বাসায় কেউ নেই। সেই দিন সারাক্ষণ পুতুল কেঁদেছে আর ভেবেছে পৃথিবীতে মনে হয় সেই একমাত্র ব্যক্তি যে ভাল রেজাল্ট করেও দুঃখ পেয়েছে কারণ তার এই আনন্দ ভাগাভাগি করার মানুষ নেই। যদিও তার মা বাবা তাদের সন্তানের দেখাশুনা করার জন্য একজন আয়া আর একজন ড্রাইভার রেখে দিয়েছে, কিন্তু বন্ধু বান্ধবহীন পুতুলের নিঃসঙ্গতাই ছিল একমাত্র সঙ্গী।
মনা যখন চাকরী নিয়ে প্রথম তাদের বাড়িতে আসে তখন পুতুল ক্লাস ফাইভে পড়ে। গ্যারেজের পাশে ছোট সার্ভেন্ট রুমে ড্রাইভারের সাথে তার থাকার জায়গা হল। তার কাজ ছিল বাগানের পরিচর্যা করা আর মাঝে মধ্যে রান্নার লোকের সাথে বাজারে যাওয়া। প্রত্যেক সপ্তাহে একদিন ছুটিতে সে রায়েরবাজার তার মাকে দেখতে যেত। পুতুল খেতে খেতে সেই দিনগুলো মনে করার চেষ্টা করল। কাজের প্রথমদিনই মনা খুব বকা খেয়েছিল মার কাছে তাঁর শখের অর্কিড গাছটা কেটে ফেলেছিল বলে। কিন্তু পুতুল জানতো গাছটা কেটেছে ভালোর জন্যই। পোকা ধরাতে গাছটা এমনিতেই মরে যেত। পাছে অন্য গাছগুলোতেও ছড়াতো। মা অনেকদিন বাগানে আসে নি বলে জানতো না। মনা কথা কম বলত বলে পুতুল কারণে অকারণে মনাকে জ্বালাতো। একদিন স্কুল থেকে ফিরে পুতুল মনাকে ডাকতে লাগল,
:”মনা ভাই, ও মনা ভাই? ” স্বভাবতই মনা উত্তর দিল না। সে তার কাজ নিয়ে ব্যস্ত।
:জানেন, আজ স্কুলে একটা বাগধারা শিখেছি। কানে খাটো। মানে যারা কানে কম শুনে। আপনিও কি কানে খাটো?
মনা গম্ভীর গলায় বলল, “না আমি কানে খাটো না। আমি সব শুনি। “
:আরে বাস্! আপনি তো হেব্বি কথা বলতে পারেন। যাক পারলাম তাহলে আপনার মুখ থেকে কথা বের করতে।
পুতুল হাসতে লাগল। এরপর একদিন সে মনার কাছে আবদার করল তাকে বাসায় না জানিয়ে সদরঘাট ঘুরিয়ে আনতে। ঘ্যানঘ্যান করার এক পর্যায়ে যে মনা রাজী হয়ে যাবে সে ভাবে নি। কিন্তু সদরঘাট এসে পুতুল যে পরিমাণ আশ্চর্য হয়েছে, তা কোনোদিন কল্পনাও করতে পারে নি।
৬.
“সবাই তো নেমে গেল, আমরা নামব না? ” মনার পাশে লঞ্চের রেলিং ধরে দাঁড়াল পুতুল।
:হুম নামব।
:কোথায় যাব এখন আমরা?
:কেশবপুর। আমার বাড়ি ঐহানে।
:একটা কথা বলব? আপনি বাইরে যতটা শক্ত, ভেতরে ততটাই নরম। আমাকে এভাবে আপনার খেয়ালে খেয়ালে রেখেও কোনোদিন বুঝতে দেন নি। আমার সাথে খুব একটা কথাও বলতেন না। কেন বলেন তো?
মনা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে চলে গেল। পুতুল আগের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। রাত বাজে ১০টা। লঞ্চ দাঁড়িয়ে আছে বরগুনার নৌঘাটে। ব্যস্ত মানুষজন কোথায় যেন মিলিয়ে যাচ্ছে। দূর থেকে পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দ পুতুলের বিষন্নতা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। এলেমেলো ভাবনাগুলো এখন আর কাজ করছে না। বিষন্নতার কারণ নিয়েও মাথা ঘামাচ্ছে না। এতে কিছুটা হলেও স্বস্তি পাচ্ছে।
রফিক রাতের খাবার খেয়ে বাকী কর্মচারীদের সাথে সিগারেট টানছিল। একজন একটা থলে থেকে কয়েকটা বাংলা মদের বোতল বের করল। মনা মিয়া আসল তখন রফিককে খুঁজতে।
:রফিক, একটু হুইনা যাবি?
:এহনি আইতে হইব?
:হুম, আয় একটু।
রফিক কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বেড়িয়ে মনার সাথে লঞ্চের ছাদে গেল।
:আমি ওরে নিয়া চইলা যাইতাছি।
:এহন যাবি? এত রাইতে?
:হুম। সদরে গিয়া দেখি তালতলীর কোনো গাড়ি পাই কিনা। রাতটা ওইহানে কাটাইয়া সকালে কেশবপুর যামু।
:তুই হইলি একরোখা। এখন যতই কই তুই থাকবি নে। ঠিক আছে যা।
:রাগ করিস না বন্ধু। তুই আমার জন্য যা করলি আমি জীবনেও ভুলতে পারুম না।
:শোন, তোর খাতায় আমার নাম্বারটা লিইখা দিছি। কোনো ঝামেলায় পড়লে ফোন করবি কোথাও গিয়া। মনে থাকব?
: ঠিক আছে, করুম। তুই ছাড়া আমার আর কে আছে বল?
:আরেকটা কথা। পোলাডারে ধইরা আনলি কাজে লাগা। খালি খালি ক্যান ঝামেলা পুষবি? ওর বাপেরে ফোন দিয়া টাকা আদায় কর। প্রয়োজন হইলে তোরে আমি সাহায্য করুম।
মনা রফিককে ক্ষিপ্তস্বরে কিছু কথা বলতে পারত। কিন্তু বন্ধুর সাহায্যের কথা ভেবে কথাগুলো বের হল না।
:হুম দেখি। এখন যাই।
মনা পুতুলকে নিয়ে নেমে গেল। পুতুল হাঁটছে ওর পেছন পেছন। বরগুনা শহর তখন নিঃস্তব্ধ। মনে হচ্ছে তারা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করছে, “একি করলি মনা? কেন আনলি একে? “
বাসস্ট্যান্ডে বাস সব দাঁড়িয়েই আছে। মনা নিজেও জানে এত রাতে কোনো বাস ছাড়বে না। ওর টয়লেট পেয়েছে। পুতুলকে একটা বন্ধ কাউন্টারের পাশে দাঁড় করিয়ে টয়লেটে গেল। রাত তখন ১২টা ছুঁই ছুঁই। পুতুল দেখল, দূরে কয়েকটা উচ্ছৃঙ্খল লোক তিন চারটা হিজড়াকে নিয়ে নাচ গান করতে করতে এদিকে আসছে। মাঝেমধ্যে হিজড়াদের সাথে লোকগুলো আজে বাজে অঙ্গভঙ্গিও করছে। পুতুল ভয় পেয়ে মনাকে খুঁজতে এদিক ওদিক তাকালো। খেয়াল করল দুই একজন তাকে নিয়ে কথা বলছে।
:কি ঠোঁটরে তোর!
পুতুল চমকে পেছনে তাকালো। মাঝবয়সী এক লোক তার দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে চেয়ে আছে।
:টকটকা ডালিমের মত শরীর। খাইতে হেব্বি লাগব।
লোকটার শরীরের গন্ধে পুতুলের গা গুলাচ্ছে। ভয়ে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার পালা। অসহায়ের মতন মনাকে খুঁজে যাচ্ছে সে।
:ধইরা দেখ কি নরম শরীর!
আরেকজন এসে পুতুলের হাত চেপে ধরল। পুতুলের চোখ বেয়ে পানি পড়ছে।
:হ, আইজকা তাইলে ওরেই লাগা, আমাগো তো কাম নাই। আমরা বইয়া বইয়া দেহি।
এই কথা বলে হিজড়া দুইটা হাসতে লাগল।
হঠাৎ কে যেন পুতুলকে হেঁচকা টান দিয়ে পেছনে নিয়ে গেল।
:যেইদিকে আইছিলি ঐদিকে যা।
দাঁতে দাঁত চেপে মনা লোকগুলোর উদ্দেশ্যে বলল। তার বলার ভঙ্গি আর রক্তচক্ষু চাহনি দেখে লোকগুলো ঘাবড়ে গেল। যেতে যেতে অশ্লীল কিছু গালি দিল মনাকে। পুতুল একটা বেঞ্চে বসে অঝোরে কেঁদে যাচ্ছে। মনা কি বলবে বুঝতে পারছে না।
:তোমারে এইভাবে রাইখা যাওয়াটা ঠিক হয় নাই। মাফ কইরা দিও।
মাটিতে চোখ রেখে অপরাধীর মত চুপ করে আছে সে। একটুপর পুতুলের কান্না আস্তে আস্তে কমল।
:বিজু ময়রার সন্দেশ।
মনা একটা ঠোঙা এগিয়ে দিতে দিতে বলল।
পুতুল ঠোঙার দিকে না তাকিয়ে অভিমানী চোখে মনার দিকে তাকালো।
:বাথরুমে যাইতে গিয়া দেখি বিজুর দোকান তখনও খোলা। ভাবলাম তোমার ভাল লাগবে তাই নিয়া আইলাম।

(২য় খন্ড)

৭.
“ছোটো ছোটো ঢেউ উঠে আর পড়ে,
রবির কিরণে ঝিকিমিকি করে,
আকাশেতে পাখি চলে যায় ডাকি,
বায়ু বহে ধীরে ধীরে ।
গগনের তলে মেঘ ভাসে কত
আমারি সে ছোটো নৌকার মতো –
কে ভাসালে তায়, কোথা ভেসে যায়,
কোন দেশে গিয়ে লাগে।
ঐ মেঘ আর তরণী আমার
কে যাবে কাহার আগে।”
নৌকায় উঠে পুতুলের রবীন্দ্রনাথের কবিতাটা মনে পড়ে গেল। ছইওয়ালা নৌকাটায় ইঞ্জিন নেই, দাঁড় বাইছে বয়স্ক এক মাঝি। পুুতুল আর মনা ছাড়া বাচ্চা একটা ছেলে আছে নৌকায়। বসে বসে ক্ষীরা (শসাজাতীয়) খাচ্ছে। বাচ্চাটার খাওয়া দেখে পুতুলের মনে হচ্ছে ক্ষীরা হচ্ছে পৃথিবীর বেহেস্তি খাবার! তারও একটা খেতে ইচ্ছা করল। মনা নৌকার গলুইয়ে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। বর্ষাকাল চলছে। কালো মেঘে ঢেকে আছে সারা আকাশ। দেখতে দেখতেই বৃষ্টি চলে এল। বৃষ্টির তীব্রতা বাড়তে লাগল। দূরের গ্রামগুলো এখন ঝাপসা দেখা যাচ্ছে। পুতুলের মুগ্ধতার সীমা রইল না। কখনো হাত দিয়ে বৃষ্টি ছুঁয়ে দেখছে, কখনো বা নদীর পানি। ছইয়ের নীচে যেতে যেতে মনা খানিকটা ভিজে গেল। পানি মুছতে মুছতে সে পুতুলকে দেখছে। বৃষ্টিতে মুগ্ধ হচ্ছে পুতুল, আর মনা মুগ্ধ হচ্ছে পুতুলের মুগ্ধতায়।
কেশবপুুর গ্রামটা ছোট খাট একটা দ্বীপের মতই বলা যায়। চারদিকে নদী, মাঝখানে ছোট্ট একটা গ্রাম। এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যেতে এখানকার মানুষের নৌকাই একমাত্র বাহন। জালা ধান ক্ষেতের আল বেয়ে হাঁটতে পুতুলের হিমশিম খেতে হচ্ছে। একে তো সরু, তার উপর বৃষ্টি হয়ে যাওয়ায় আল হয়ে আছে পিচ্ছিল। ছপাৎ করে একটা শব্দ হল। পুতুল সামনে তাকিয়ে দেখল মনা পিছলে চিৎ হয়ে পড়ে আছে, কোনো নড়াচড়া করছে না। হাসতে হাসতে পুতুলের দম বন্ধ হবার পালা। তার হাসি দেখে রাগী দৃষ্টিতে মনা পুতুলের দিকে তাকিয়ে আছে। খানিক পরে সে নিজেও হেসে ফেলল। তাকে টেনে তুলতে তুলতে পুতুল খেয়াল করল হাসলে এই কালো মানুষটিকেও অসম্ভব সুন্দর লাগে! আর এদিকে মনা ভাবছে সে তাহলে এখনো হাসতে ভুলে নি।
মনার বাড়িটা পুতুলের খুব পছন্দ হয়েছে। জীবনে প্রথম সে মাটির ঘর দেখছে। ঘরে আসবাব পত্র বলতে একটা তোষকহীন চৌকি আর একটা ট্রাঙ্ক। চৌকির নিচে পড়ে আছে কিছু হাড়ি পাতিল। আর উপরে একটা মাত্র বালিশ! তারপরও পুতুলের ভাল লাগছে। কারণ বাড়ির চারদিকে প্রচুর গাছগাছালি। ঘরের ছোট্ট এবং একমাত্র জানলাটি খুলে পুতুল অবাক! বিশাল নদীর পুরোটাই দেখা যাচ্ছে জানালাটি দিয়ে। মনে হচ্ছে যেন টিভি দেখছে। মনাদের বাড়ির বাকী ঘরগুলো একটু দূরে দূরে। তারা মনার দূর সম্পর্কের আত্নীয় স্বজন। মনার আসার খবর পেয়ে সবাই এসে কুশলাদি জিজ্ঞেস করল। পুুতুলকে দেখে সবার চোখে বিস্ময়। দামী পোশাক আশাকে এত সুন্দর একটা ছেলে মনার সাথে কেন কেউ বুঝতে পারছে না। পুতুল দেখল মনা তাদের কি যেন বলে বোঝাচ্ছে। তারা কেউ কেউ “ওওও…”, আবার কেউ কেউ “ভাল তো ” বলে হাসছে।
৮.
:দশটা না পাঁচটা না, এক মাত্র ছেলে আমার। কত অবিচারই না করেছি তার উপর। নিজেকে তার মা দাবি করতেও এখন লজ্জা লাগছে।
বলতে বলতে মিসেস রহমান কেঁদে ফেললেন।
:মনে আছে আনিস, পুতুল প্রথম কোন কথাটা বলতে শিখেছিল? বামা! বাবা মা একসাথে বলতে গিয়ে হয়ত বলত বামা। কিন্তু আফসোসের কথা হচ্ছে, সে বড় হয়েছে অধিকাংশ সময় বাবা মাকে একসাথে না দেখে।
:এখন কেঁদে কি হবে ডোরা? আফসোস করলে কি আর আবার সেই সময়টুকু ফিরে আসবে? কি দরকার ছিল তোমারও বিজনেসে নামার? আমার টাকা পয়সা কম ছিল? তুমি কি পারতে না বাসায় থেকে ছেলেটাকে মানুষ করতে? যাইহোক, দোষ শুধু তোমার না, আমারও। ছেলের প্রতি গাফিলতি আমারও কোনো অংশে কম ছিল না।
:আনিস আমার ছেলেকে এনে দাও। আমার ছেলেকে এনে দাও আনিস। আমার পুতুলকে এনে দাও। আমি কথা দিচ্ছি, এক মুহূর্তও আমি তাকে আর চোখের আড়াল হতে দিব না।
ডোনা রহমান তার স্বামীর হাত ধরে চিৎকার করে কাঁদছেন। কয়েকটা ফোঁটা আনিসুর রহমানের চোখ বেয়েও গড়িয়ে পড়ল। হয়ত তিনিও মনে মনে কিছু প্রতিজ্ঞা করলেন।
:শাফকাত আমি তোমার উপর খুবই অসন্তুষ্ট। তোমার উপর ভরসা রেখেই কিন্তু কেসটা অন্য কারো হাতে দেই নি। তিন দিন হয়ে গেল ছেলেটার কোনো হদিস বের করতে পারো নি? হোয়াই?
ডিআইজি মাহাদী চৌধুরী কিছুটা ক্ষিপ্তস্বরেই জিজ্ঞেস করলেন।
:আনিসের ফোন ধরে আমার আমতা আমতা করতে হচ্ছে। নির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারছি না। তোমাদের জন্য আমার ইমেজ খারাপ হচ্ছে এটা কি বুঝতে পারছ?
‘স্যরি স্যার’, এসি শাফকাত এতক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে সব কথা হজম করছিলেন। “কেসটা খুবই জটিল। ক্রিমিনাল মোবাইল ইউজ করত না বলে ট্র্যাক করতে পারছি না। কোনো বন্ধু বান্ধব, আত্নীয় স্বজন না থাকায় সেটা আরো কঠিন হয়ে গেছে। তারপরও আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছি। বরিশাল, বরগুনা, পটুয়াখালীর পুলিশ সুপারদের ইতোমধ্যেই জানানো হয়েছে। এছাড়াও ঢাকায় সন্দেহজনক সব জায়গায় সার্চ করা হচ্ছে।”
অতি শীঘ্রই অপরাধী ধরা পড়বে বলে শাফকাত ডিআইজিকে আশ্বস্ত করে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন।
৯.
গ্রামে এসে শান্ত শিষ্ট পুতুলের চঞ্চলতা যেন বেড়ে গেল। সারা গ্রাম সে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সঙ্গী হয়েছে একদল ছেলেমেয়ে। দুই একটা তার বয়েসী, বাকীসবই বাচ্চা কাচ্চা। সে যেখানেই যায়, তারাও পেছন পেছন যাবে দলবেঁধে। এতে মনা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে। তার হয়ে ওরা পুতুলকে দেখে শুনে রাখতে পারবে। তার এদিকে প্রচুর কাজ। ঘর দোর পরিষ্কার করা, এটা ওটা কেনা কাটা করা, বাজার করে রান্না করা ইত্যাদি। পুতুল বড় মাছ খেতে পছন্দ করে বলে মনা ইয়া বড় এক বোয়াল মাছ কিনে নিয়ে এল। পাশের বাড়ির তার এক ফুপুকে দিয়ে কাটিয়ে এনে রান্না করতে বসে গেল। দুইদিন ধরে পুতুলের পেটে তেমন কিছু পড়ে নি। তার মাথায় এখন একটাই চিন্তা। মাছটা যেন ভালভাবে রান্না হয়। পুতুলের যেন ভাল লাগে।
:মনা ভাই! মনা ভাই!
তাকিয়ে দেখল একটা ছেলে দৌড়াতে দৌড়াতে এদিকে আসছে।
:কিরে হারু? দৌড়াইতেসস ক্যান?
হাপাঁতে হাঁপাতে বলল, “হারামনের বাগানে পুতুল…”
হারুর কথা শেষ হতে না হতেই মনা উঠে দৌড়াতে লাগল। উদ্বেগে তার পা এলোমেলো চলছে।
: কই? পুতুল কই?
হারামনের বাগানে এসেই মনা চেঁচাতে লাগল।
ছেলেমেয়েগুলো মনার চেঁচানো দেখে ভয় পেয়ে চুপসে গেল।
:কি ব্যাপার? তোরা কেউ কথা কস না কেন? পুতুল কই?
মনার চেঁচানোর মাত্রা আরো বেড়ে গেল। হঠাৎ কে যেন মনার নাম ধরে ডাকল।
:মনা ভাই, এই মনা ভাই।
মনা পুতুলের আওয়াজ শুনে এদিক ওদিক খুঁজতে লাগল।
:আমি এখানে…আরে উপরে তাকান।
মনা উপরে তাকিয়ে দেখল পুতুল একটা কাঁঠাল গাছের মগডালে উঠে বসে আছে।
:পুতুল! এত উপরে কেমনে উঠলা!
মনা পুরোই অবাক!
:নিজে নিজেই উঠেছিলাম। এখন নামতে ভয় লাগছে। যেভাবেই হোক, তাড়াতাড়ি নামান আমাকে।
: কেন, উঠার সময় যার ভয় লাগে নাই, তার নামতে গিয়া কেন ভয় লাগব? নিজে নিজে উঠছো, এহন নিজে নিজে নামো।
:আ..আ..আ প্লীজ?
পুতুল কান্না কান্না ভঙ্গিতে স্রেফ ঢঙ করে বলল।
:পারুম না। ওই পোলাপান, তোরা যা সব। আর হারু কই? আইজকা ওর একদিন কি আমার একদিন! এমনভাবে গিয়া কইসে, কলিজায় পানি নাই আমার। কি ব্যাপার খাঁড়ায়া আছস কেন এহনও? যা তোরা।
পুতুল গাছের উপর থেকে কান্না কান্নাভাব নিয়ে মনা আর বাকী ছেলে মেয়েদের চলে যাওয়া দেখছে। অভিমানস্বরে ঠোঁট উল্টে নিজেই নিজেকে বলল, “যাক চলে, আমি আজকে এখানেই থাকব।”
পাঁচ মিনিট পর পুতুল তাকিয়ে দেখল মনা তার দলবল নিয়ে বিশাল এক মই নিয়ে আসছে। পুতুল মুখের হাসি লুকোতে গিয়ে ব্যর্থ হল।
সন্ধ্যে প্রায় হয়ে এল। ফেরার পথে দুইজনেই মিটমিট করে হাসছে। কেউ কথা বলছে না। বাড়ির কাছে আসতেই মনা দেখল রান্না ঘরে কি যেন নড়াচড়া করছে। দৌড়ে গিয়ে দেখল দুটো বিড়াল মিলে বোয়াল মাছ অর্ধেকটা খেয়ে বাকী অর্ধেকটা মাটিতে ফেলে রেখেছে। মনা কিছুক্ষন হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর বাচ্চাদের মত কেঁদে ফেলল। মনাকে এভাবে কাঁদতে দেখে পুতুলের খুব খারাপ লাগল। সে জানে মাছটা তার জন্যই কিনে এনেছিল মনা। আস্তে আস্তে মনার কাছে গিয়ে তার হাতটা ধরল।
:স্যরি মনা ভাই। আমার জন্যই এটা ঘটল। আপনি প্লিজ কাঁদবেন না।
১০.
রাত অনেক হয়েছে। ঝিঁ ঝিঁ পোকারা বিরামহীন ডেকে যাচ্ছে। দূর থেকে ভেসে আসছে মাছ ধরার কোনো ট্রলারের শব্দ। কুপি জ্বালিয়ে মনা নিচে পাটি বিছালো। দুটো প্লেট নিয়ে খেতে বসল দুজন। খাবার আলু ভর্তা আর ডাল। পুতুল এমনভাবে খাচ্ছে দেখে মনে হচ্ছে তার একদমই খারাপ লাগছে না। বারবার হেঁচকি তোলা দেখে মনাও বুঝতে পারছে তার কেমন ভাল লাগছে!
খাওয়া শেষে মনা নতুন একটা লুঙ্গি দিল পুতুলকে পড়ার জন্য।
:আমি তো লুঙ্গি পড়তে পারি না।
:একটু কষ্ট করে পড়। বাজারে গেছিলাম। তিনদিন ধইরা এক কাপড়ে আছ দেইখা এইটা নিয়া আইলাম। এইটা পড়ে ঘুমাও, দেখবা আরাম লাগব।
:কিন্তু আমি তো পড়তে পারি না, আপনি পড়িয়ে দিন।
মনা কিছুটা ইতস্তত বোধ করল। পুতুল লুঙ্গি পড়ে প্যান্ট খুলল। কিন্তু বাঁধতে পারল না। মনা এগিয়ে গেল বাঁধার জন্য। গেঞ্জিটা উপরে তুলতেই তার গলা শুকিয়ে গেল। পুতুলের ফর্সা পেট থেকে যেন দ্যুতি ছড়াচ্ছে। কুপি বাতির মায়াবী আলোয় নাভীটা দেখতে অপূর্ব লাগছে। মনার নিঃশ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছে। বাঁধবে কি বাঁধবে না, এটা নিয়ে দ্বিধায় পড়ে গেল। পুতুল যেন মনার চেহারা পড়তে পারল। আলতো করে মনার হাতটা নিয়ে তার পেটে এনে ছোঁয়ালো। নরম পেটের ছোঁয়া পেতেই তার সারা শরীর শিহরিত হল। কাঁপা কাঁপা হাত নিয়ে কোনো রকমে গিঁট দিয়ে দূরে সরে গেল।
:তুমি উপরে শুইয়া পড়।
মনা অন্যদিকে ফিরে বলল।
:আর আপনি?
:আমি নিচে ঘুমামু।
:কেন? উপরে তো অনেক জায়গা আছে।
:থাকুক।
এই কথা বলে মনা শুয়ে পড়ল। সারারাত দুচোখের পাতা এক হল না ওর।
পরদিন সকাল সকাল উঠে পুতুলকে ঘুমে রেখেই মনা বাজারে চলে গেল। বাজার করে ফেরার সময় দেখল কয়েকটা কিশোরী মেয়ে তার ঘরের জানলা দিয়ে কি যেন দেখে হাসাহাসি করছে। ফিসফিস করে নিজেদের মধ্যে কি বলে আবার হেসে গড়িয়ে পড়ছে। মনাকে আসতে দেখে সবাই লজ্জায় পড়ে গেল। তাড়াতাড়ি করে যে যেদিকে পারে সরে পড়ল। মনা উৎসুক হয়ে দেখতে গেল জানলায় আসলে তারা কি দেখছিল। গিয়ে দেখে পুতুল উপুড় হয়ে ঘুমুচ্ছে, কিন্তু তার লুঙ্গিটা উরু থেকেও খানিকটা উপরে সরে এসেছে। সাদা উরু দুটো দেখে যে কারোরই লোভ লেগে যাবে। খেয়াল করল শুধু উরু না, তার নিচে পুরুষাঙ্গটাও বেরিয়ে আছে। মনা তাড়াহুড়া করে ঘরে ঢুকে লুঙ্গিটা টেনে ঠিক করে দিল।
মেয়েগুলোর প্রতি তার রাগ লাগছে এখন। ঘুমন্ত একটা ছেলে, নগ্ন হয়ে থাকলেও এভাবে কেন দেখবে? নির্লজ্জ মেয়েছেলে!
খেয়াল করল তার এই ধরণের ভাবনাতে কিঞ্চিৎ হিংসা প্রকাশ পেয়েছে। মনা অজান্তেই হেসে ফেলল।
১১.
ওসি মতিন আলী আর হাবিব সদরঘাট টার্মিনালে বসে আছে। হাবিবের বিরক্ত লাগছে। সেই কখন থেকে বসে আছে। মতিন আলী নিজেও বসে আছে, তাকেও বসিয়ে রেখেছে।
:বুঝলা হাবিব, পুলিশের চাকরীতে আইসা জীবনডা পাপের সমুদ্র হইয়া গেছে।
:কেন?
: এই যে দেখ না, ঘুষ খাই, চাদাঁবাজি করি, মানুষরে হেনস্তা করি, কাজে ফাঁকি দেই।
:এখনো কিন্তু দিচ্ছেন।
:হ, আসলে এসব ঠিক না।
:এতই যখন বোঝেন তাহলে ছেড়ে দিচ্ছেন না কেন?
:ছাইড়া দিমু। যাও আইজ থাইকাই ছাড়লাম। এই যে তোমারে ছুঁইয়া কথা দিলাম।
:তাহলে চলেন, যে কাজে আসলাম সেটা করি। ছেলেটার খোঁজ করি।
:হ চল। তুমি ডাইনে যাও, আমি যাই বাঁয়ে।
:ছবি নিয়ে যান একটা।
হাবিব চলে যাওয়ার পর মতিন আলী আরো কিছুক্ষণ ঐ জায়গাতেই বসে থাকলো। তারপর আড়মোড়া দিতে দিতে একটা চায়ের দোকানে গেল। ইউনিফর্ম পরা দেখে একজন একটু সরে গিয়ে বেঞ্চ খালি করে দিল বসার জন্যে। মতিন আলী না বসে চায়ের দোকানে রাখা উঁচু একটা টুলে ভর করে কুঁজো হয়ে দাঁড়ালো।
:দুধ বেশী করে এক কাপ চা বানাও। চিনি কম দিও। আমার আবার ডায়াবেটিস আছে।
চাওয়ালা অর্ডার শুনেই বানাতে লেগে গেল।
:স্যার, বাখরখানি খান। এইমাত্র বানাইলাম।
:বলতেছ যখন দেও খাই।
:দুধ দিয়া খান স্যার, ভাল লাগব।
:তা ফুটপাত দখল কইরা বাখরখানি বানাও ভাল কথা, আমরা তো খালি বাখরখানি খামু না। আমাদের পেট না ভরাইতে পারলে, তোমাদের কেমনে ভরব কও?
:স্যার কি নতুন আইছেন?
:হ, বরিশাল থাইকা বদলি কইরা এইহানে নিয়া আইছে। কেমন লাগে কও!
মতিন আলীর এটা পুরোনো স্বভাব। সে যে এলাকায় যাবে সে এলাকার থানার ওসি পরিচয় দিয়ে চাঁদাবাজি করবে। আজকেও কামাই ভাল হয়েছে।
:স্যার এই নেন চা।
কাপ এগিয়ে দিতে দিতে মতিন আলীর হাতের দিকে চাওয়ালার চোখ আটকে গেল।
:স্যার, এই পোলাডা কিডা?
মতিন আলীর চোখ ঝিলিক দিয়ে উঠল।
:কিছুদিন আগে কালো কইরা এক লোক এই পোলাডারে লইয়া আমার দোকানে দুধ দিয়া বাখরখানি খাইছে। একটু পর দেখলাম পোলাডা আস্তে আস্তে ঘুমাইয়া পড়ল। দেইখা বড় লোকের পোলা মনে হইল। কিছু জিগাইতে যাওয়ার আগেই লোকটা ওরে লইয়া লঞ্চে উইঠা পড়ল।
:কোন লঞ্চে?
মতিন আলী ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করল।
:বরগুনার একটা লঞ্চে।
১২.
দুপুরের খাবার সময় হয়ে গেছে। পুতুলের কোনো খবর নেই। সেই সকাল থেকে টই টই করে বাইরে বাইরে ঘুরছে। অ্যাকুরিয়ামের মাছকে পুকুুরে ছেড়ে দিলে যেমন, পুতুলের অবস্থা এখন সেরকম।এরমধ্যেই মনার কাছে চার পাঁচজনের বিচার চলে এসেছে। একজনের আম গাছ সাবাড় করে শুধু পাতাগুলো রেখে গেছে, গুলতি দিয়ে পাখি না মারতে পেরে মুরগী মেরে ফেলেছে, চোঙা ভরা মাছ নদীতে ছেড়ে দিয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি। সর্বশেষ যে খবর পাওয়া গেছে তাতে জানা গেছে, কার যেন একটা গরুর গাড়ি নিয়ে সে এবং তার দলবল নদী পাড়ে চলে এসেছে। মনা খুঁজতে খুঁজতে ঘাটে আসল।
:ঐ তোরা পুতুলরে দেখছস?
সারা মুখে ফেনা মাখানো একটা ছেলে উঠে বলল, “না তো! আমরা দেখি নি। আপনি বাগানে খোঁজ নিয়ে দেখুন। ওখানে থাকতে পারে। “
:ও..ও..ও, আইচ্ছা ঠিক আছে। ঐহানেই দেখতাছি। ঘাটে আইছি যখন, হাত মুখটা ধুইয়া যাই।
এই বলে মুখে ফেনা মাখানো ছেলেটার কাছে গিয়ে তাকে জাপটে ধরল মনা। পুতুল গেল চমকে।
:এইহানে নাই! বাগানে যান! হাহ্। আমি তোমারে চিনি না? ফেনা কেন, সিমেন্ট মাখানো থাকলেও তোমা চিনতে আমার কষ্ট হইব না।
পুতুল হাসতে যাওয়ার আগেই মনা তাকে নিয়ে ধপাস্ করে পানিতে পড়ল। সাঁতরাতে সাঁতরাতে খেয়াল করল পুতুল তার হাতে নেই। হঠাৎ মনার চিন্তায় আসল ও কি সাঁতার জানত? ভয়ে মনার কলিজা শুকিয়ে গেল।
‘পুতুল পুতুল’ করে চিৎকার করতে লাগল। এদিক ওদিক ডুব দিয়েও খুঁজে পেল না। পানিতেই অসহায়ের মতন কাঁদতে লাগল মনা। তারপরও ডুব দিয়ে যাচ্ছে অনবরত।
:মনা ভাই! আমি এখানে।
মনা পানিতে থেকেই দেখল পুতুল পাড়ে দাঁড়িয়ে হাসছে।
:আপনার কি মনে হয়, আমি সাঁতার জানি না? আমি আমাদের স্কুলের সুইমিং চ্যাম্পিয়ন। আপনি মজা করেছিলেন, তাই আমিও একটু করলাম। কেমন লাগল?
পুতুল আবার হাসছে।
মনা উপরে উঠে কিছু বলল না। চুপচাপ বাড়ি চলে গেল। পুতুল বুঝতে পারল মনা রেগে গেছে।
:স্যরি, এই যে কানে ধরে স্যরি। আর হবে না।
কানে ধরার ভঙ্গিতে পুতুল মনার সামনে এসে দাঁড়াল। এরপর যা ঘটল পুতুল মোটেও এর জন্য প্রস্তুত ছিল না। মনা পুতুলকে জাপটে ধরে কাঁদতে লাগল।
:কেন এমন কর পুতুল? কেন এমন মজা কর? তুমি জান না আমি তোমারে নিয়া কত দুশ্চিন্তায় থাকি? তোমার কিছু হয়া গেলে আমার কি হইব?
পুতুল কিছু বলল না। সান্তনা দিয়ে পিঠ চাপড়েও দিল না। সেও দুই হাত দিয়ে মনাকে জড়িয়ে ধরল আর মনে মনে বলল, “আমার কিছু হবে না। কারণ আমার কাছে আমার মনা ভাই আছে, সে কিচ্ছু হতে দিবে না। “
১৩.
বিকেলে তারা পাশের গ্রামের মেলায় গেল। পুতুল সারা মেলা চষে বেড়িয়েছে। এক টাকা দিয়ে ডিমের লটারীতে সে দুইবারে দুইটা ডিম জিতেছে। এরপর মেলায় যতক্ষন ছিল খুশিতে ডিম দুটো হাতে নিয়ে সারাক্ষণ ঘুরেছে। শেষমেষ নাগরদোলায় উঠে ভয় পেয়ে যেই না হাত মুঠ করল, সাথে সাথে ডিম ফেটে কুসুম বেরিয়ে এল।
বাড়ি ফেরার পথে দুজনেই এটা নিয়ে খুব হাসাহাসি করল। ঘুটঘুটে অন্ধকারে রাস্তা কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ছোট একটা টর্চ, তারও ব্যাটারী যাই যাই অবস্থা। কোনো রকমে দেখে দেখে সাবধানে হাঁটছে দুজন। হঠাৎ মনা থমকে দাঁড়ালো।
:কি হল?
পুতুল জিজ্ঞেস করল।
: রা রা রায়বাড়ির তালগাছটা!
:তো কি হয়েছে? তোতলাচ্ছেন কেন?
:ওখানে ওইসব আছে।
মনে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল।
:ওইসব আবার কিসব?
:যা যা যাদের নাম নিতে নাই।
:আরে ধ্যাত। ভূত বলে কিছু নেই। ভয় ঝেড়ে ফেলুন তো।
:নাম নিয়ো না নাম নিয়ো না। ক্ষতি করবে তোমার। ছোটবেলায় একবার আমারে ভুল পথে নিয়া গেছিল। পরদিন নাকি আমারে ঘাটে পাওয়া গেছিল। রায়বাড়ির তালগাছটা এখনও আছে জানলে এদিকে পা মাড়াইতাম না।
:যত্তসব আবোল তাবোল কথা। চলুন তো।
:না না, চল আমরা হারামনের বাগান দিয়া যাই।
:মানে? এখন আবার এতটা পথ ঘুরব? ইম্পসিবল। আপনি আসুন আমার সাথে।
মনার মানা অগ্রাহ্য করে পুতুল আগে আগে হাঁটতে লাগল। তালগাছের কাছাকাছি যাওয়ার পর টের পেল কিছু একটা নড়ছে। কিন্তু সেটা তালগাছে নয়, তার পাশে সুপারী গাছে। মনা ভয়ে রীতিমত কাঁপছে। পুতুলেরও কিছুটা ভয় লাগছে এখন।
:তাহলে কি এসে ভুল করলাম?
তখনই সুপারী গাছ থেকে মানুষের মত কি যেন একটা ধুমম করে পড়ল! ওদের দুজনের আত্মা বেরিয়ে আসার পালা। এতটা ভয় পেয়েছে যে চিৎকার করার শক্তিটুকুও নেই।
:ওরে বাবারে মরে গেলাম রে! ঠ্যাংটা মনে হয় শেষ।
মনা আর পুতুল দুজনেই দুজনার দিকে চাওয়া চাওয়ি করছে। আরে! ভূতের গলার স্বর এত চেনা মনে হচ্ছে কেন? পুতুল লাইট ধরল ভূতের উপর। ভূতের চেহারা দেখে মনা রেগেমেগে আগুন!
:হারু তুই?? হারামজাদা, তুই এত রাইতে সুপারী চুরি করতে গাছে উঠছস? আমি ভাবলাম ভূত!
:আমিও তো তাই ভাবসি।
হারু কান্না কান্না স্বরে বলল। “উপরে উইঠা দেহি দুইটা ছায়া এদিকেই আইতাসে। হাতে আবার আগুনও আছে।
:ওটা আগুন না, টর্চের আলো।
পুতুল ভুলটা সংশোধন করে দিল।
:হালার পো হালা, তোর লাইগা আমার জান দুইবার বাইর হইয়া যাইবার লাগছিল। তোরে আইজ আমি খুন কইরা ফালামু।
মনা এগিয়ে যেতেই হারু খোঁড়া পা নিয়ে দে দৌড়।
:কি, আপনার ভূত তো দৌড়াচ্ছে আপনাকে দেখে।
পুতুল খোঁচাটা দিয়ে বেশ মজা পেয়েছে। টর্চ ধরে মনার চেহারাটা দেখে মুচকি মুচকি হাসছে।
পুতুল ঘুমুচ্ছে। নিচে মনা শুয়ে ভাবছে এভাবে আর কতদিন পুতুলকে নিজের কাছে রাখতে পারবে? সে তো তার বাবা মার সম্পত্তি। যতই খারাপ হউক, পুতুল তাদের নিজেদের সন্তান। আবেগের বশে নিয়ে তো এসেছে, কিন্তু তাদের কি অবস্থা হবে সেটা কি চিন্তা করেছে?
আর কয়টা দিন থাকুক। এরপর তারে তার বাড়িতে রাইখা আসুম। আমার কষ্ট হয় হউক। হয়ত বাকী জীবনে তারে দেখতে পারুম না, কিন্তু সে ভাল আছে এইটা ভাইবা তো একটু শান্তি পামু।
ভাবতেই মনার চোখে পানি চলে এল। না মুছেই আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে পড়ল।

(শেষ খন্ড)

১৪.
:মনা মিয়া ঘরে আছো?
:আছি চাচাজী, আসেন ঘরে আসেন।
ষাটোর্ধ্ব এক লোক ঘরে ঢুকে চৌকিতে বসল।
:শহুইরা পোলাডা কই? যারে গেরাম দেখাইতে নিয়া আইছো, তারে যে দেখতেছি না।
:চাচা ও খেলতে বের হইছে হারু গো লগে।
“ও”, বলে লোকটি মাটিতে তাকিয়ে থাকলো। তারপর সরাসরি মনার দিকে চেয়ে বলল,
:দেখ মনা, তোমার সাথে ঐ পোলার সম্পর্ক কি জানি না, জানতে চাই ও না। কিন্তু তারে ধইরা আইনা তুমি মিয়া খুব ভুল করছ।
:চাচাজী…
মনাকে হাতে ইশারা করে থামিয়ে দিল।
:মিথ্যা বলবা না মনা। আমি সব জানি। আইজ সদরে গিয়া লোকমুখে হইনা আইলাম। পুলিশ পইপই কইরা খুঁজতাছে তোমারে। যদি বাচঁতে চাও, যত তাড়াতাড়ি পারো ওরে ঢাকায় রাইখা আস। যেমনেই হউক।
মনা চিন্তায় পড়ে গেল। কিভাবে পুতুলকে নিয়ে ঢাকায় যাওয়া যায়। সদরে গেলেই তো ধরা পড়ে যাবে। কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। হঠাৎ রফিকের কথা মনে পড়ল। দুর্দিনে তার একমাত্র সঙ্গী।
:হ্যালো রফিক?
:কে, জয়নাল মামু? আরে মামু আলকাতরা লাগব আরো। ঝন্টুরে দিয়া তাড়াতাড়ি পাঠাও।
ঝন্টু কে মনা চেনে। রফিকের সহকারী বলা যায়। পুতুলের বয়েসী হবে । খুবই ভাল ছেলে।
:রফিক আমি মনা।
:মনা তুই? ধরা পড়স নাই তাইলে এহনও? আছস কই তুই?
:কেশবপুরেই।
:তোর কি মাথা খারাপ? এহনও তুই কেশবপুরে? তুই জানস এদিকে কি হইছে? পুলিশ আমগো লঞ্চসহ বরগুনার প্রত্যেকটা লঞ্চের লোকজনরে নিয়া ধইরা ধইরা জিগাইতাছে! একটা ট্রলার কিনছি নতুন, তাই এহন আমি পটুয়াখালী। তয় সব খবরই কানে আইতাছে।
:ওহন আমি কি করুম ক তো?
:তুই এক কাম কর, তাড়াতাড়ি ঐ পোলারে লইয়া পটুয়াখালী চইলা আয়। তালতলীতে আইসা কাজলারচরের যেকোনো একটা ট্রলারে উইঠা পড়। আমি আছি ঐহানেই।
মনা বাজার থেকে ফোন করে তড়িঘড়ি করে বাড়িতে আসল। তার ও পুতুলের কাপড় চোপড় পুটলীতে ভরতে দেখে পুতুল অবাক ।
:আমরা কি কোথাও যাচ্ছি?
মনা যেন তার প্রশ্ন শুনতেই পায় নি। সে তার কাজ নিয়ে ব্যস্ত।
:কি ব্যাপার? কথা বলছেন না কেন? কোথায় যাচ্ছি আমরা?
:তোমারে ঢাকায় দিয়ে আসব।
:মানে?
:হুম, তাড়াতাড়ি কাপড় বদলাও। আমরা এহনই রওনা দিমু।
:বললেই হল? আমি কোথাও যাচ্ছি না।
:কথা কইলেই দেরী হইবো পুতুল। সময় নষ্ট কইরো না।
:একশো বার করব। আপনি কি ভেবেছেন? যখন খুশী ধরে নিয়ে আসবেন আবার যখন খুশী দিয়ে আসবেন? আমার কোনো মত থাকতে পারে না? সাবধান করে দিচ্ছি, আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যদি কিছু করতে যান, তুলকালাম বাঁধিয়ে ফেলব।
পুতুলের চোখে দৃঢ়তা দেখে মনা হেসে ফেলল। হাত ধরে তাকে চৌকিতে নিয়ে বসিয়ে নিজে নীচে বসল। তার চোখে চোখ রেখে বলল ,
:যেদিন তোমারে প্রথম দেখি, বুকের ভেতর কেমন জানি একটা টান অনুভব করলাম। এই টান কিসের তা আমি জানি না। হয়ত স্নেহের হয়ত মায়ার। তোমারে যত দেখতাম, মায়া যেন আরো বাড়তে লাগল। একটা দিন তোমারে না দেখলে আমার শান্তি লাগত না। এইজন্য আরো ভাল বেতনের চাকরী পাইয়াও আমি তোমাগো বাড়িতেই থাইকা গেছি। গত তিন বছর ধইরা তুমি যে কি জাদু টোনা কইরা বাইন্ধা রাখস আমি জানি না। খালি তোমারে কাছে পাইতে ইচ্ছা করত। খালি ইচ্ছা করত ইশ্ আমি যদি তোমার সব দুঃখ কষ্ট দূর কইরা দিতে পারতাম! সেই লোভে পইরা মাথা নষ্ট হইয়া গেল। সাত পাঁচ না ভাইবা তোমারে নিয়া আইলাম। কিন্তু হুঁশ ফেরার পর মনে হইল, এইডা কি করলাম আমি? কি কইরা পারলাম তোমারে তোমার বাড়িছাড়া করতে? কি কইরা সাহস করলাম তোমারে তোমার বাবা মা থাইকা দূরে রাখতে? আমি এতটা স্বার্থপর কেমনে হইতে পারলাম?
মনার চোখ বেয়ে অনবরত পানি ঝরছে। পুতুল নিজের চোখ মুছে বলল, “আমি আপনাকে ছেড়ে কোথাও যাব না। আমি এখানে থাকব, আপনার সাথে। সারাজীবন। “
:তা হয় না পুতুল, তোমারে পড়াশুনা করতে হইব, মানুষের মতন মানুষ হইতে হইব। সেটা আমার মত গরীব মানুষের কাছে থাকলে কি কইরা হইব কও?
:আমার এসব কিচ্ছুর প্রয়োজন নেই। আমার শুধু আপনি হলেই চলবে। প্লিজ, আমাকে থাকতে দিন, প্লিজ।
মনা পুতুলের কপালে একটা চুমু দিয়ে চোখ মুছে আবার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
১৫.
কাজলারচর পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত হয়ে গেল। রফিক সেখানেই উপস্থিত ছিল। তারপর তাদেরকে নিয়ে বিশাল এক মালবাহী নৌকায় উঠল। রাতে খাবার দাবার পর রফিক বলল,
:মনা, তুই আইজ রাইতেই পটুয়াখালী সদরে যা। লঞ্চের টিকিট কাইটা নিয়া আয়। কাল গিয়া তো নাও পাইতে পারস, তখন?
মনা ভেবে দেখল রফিক কথাটা ভুল বলে নি। টিকিট পাওয়া অতি জরুরী। যে করেই হউক কালই রওনা দিতে হবে।
:কালুর ট্রাকটা একটু পরেই ছাড়ব। তুই উইঠা পড় তাড়াতাড়ি।
:কিন্তু পুতুল এত রাইতে আবার গাড়িতে উঠব? ওর তো কষ্ট হইব।
:তুই কি ওরে সাথে লইয়া যাওয়ার কথা ভাবতেসস? ভুলেও না। ডাইরেক্ট ধরা খাবি। কাল সকালে একটা ব্যবস্থা কইরা দিমু, তয় এহন না।
:আমার কোনো সমস্যা হবে না। আমি মনা ভাইয়ের সাথেই যাব।
পুতুল ওদের কথার মাঝখানে বলল।
:আরে মিয়া তুমি বুঝতেছ না। গিয়া তুমি মনারেও মারবা আমাগোরেও মারবা।
:হ, রফিক ঠিকই কইসে। তুমি থাক। আমি রাইতের মধ্যেই আইয়া পড়ুম, মনা বলল।
ট্রাকে উঠে মনার মন খারাপ হয়ে গেল প্রচন্ড। অনেক কষ্টে তাকে রাজী করিয়ে রেখে এসেছে। ভাবছে, ট্রাকটা যদি উড়তে পারত! মুহূর্তেই রাস্তাটা শেষ হয়ে যেত।
পুতুল মন খারাপ করে এক কোণায় বসেছিল। হঠাৎ রফিক তাকে বের হতে বলল। বাইরে এসে দেখল রফিক আরো দুই তিনজনকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
:চল, ঐ স্টীমারটায় চল।
:কেন? পুতুল জিজ্ঞেস করল।
:এই ট্রলারটা নিরাপদ না। যেকোনো সময় ঝামেলা হইতে পারে।
:আমি এখানেই থাকব। মনা ভাই এসে নয়ত খুঁজবে।
:আরে স্টীমার কি বেশী দূরে নাকি? ঐ তো দেখা যাইতেছে। মনা আইসা ডাক দিলেই হুনা যাইব। তাছাড়া ঐহানে ঘুমানোর মত জায়গা আছে। সারাদিন ধকল গেছে, একটু ঘুমাইয়া নিবা।
প্রচন্ড অনিচ্ছা নিয়া পুতুল রফিকদের সাথে স্টীমারটায় গেল। গেঞ্জিটায় গা চুলকাচ্ছে। পুতুল রুমে ঢুকে গেঞ্জি খুলে ফেলে চুলকাতে লাগল। একটু পর খেয়াল করল রফিক লোলুপ চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। তাড়াতাড়ি গেঞ্জিটা আবার পড়ে ফেলল। কিছুক্ষন পর পুতুল শুনতে পেল রফিক কাকে যেন মনার নাম ধরে কি বলছে। পুতুল দরজার কাছে গিয়ে কান পাতল।
:আমরা কিন্তু আইজ না, কাল সকালে রওনা দিমু। ঝন্টু তুই ঐ নৌকায় যা । তোর কাজ হইল মনা আসলে তারে কবি এইহানে পুলিশ আসার খবর পাইয়া রফিক ভাই পুতুলরে নিয়া বরগুনা গেছে। তারপর মনা বরগুনা গিয়া পুলিশের হাতে ধরা খাইব। আর আমরা এদিকে আমাগো সোনার ডিমওয়ালা হাঁস নিয়া কুতুবদিয়া চইলা যামু। ওহন চল, ভেতরে গিয়া একটু মজা করি।
পুতুল সব শুনে আতংকে নীল হয়ে গেল। দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে ভয় ভয় চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছে দরজার দিকে। হঠাৎ রফিক আরো দুইজনকে নিয়ে রুমে ঢুকলো। সবার চোখে এক বিভৎস হাসি দেখতে পেল সে। পুতুল তখনও বিশ্বাস করে আছে মনা হয়ত এখনই আসবে। সেই বাসস্ট্যান্ডে লোকগুলোকে চোখ রাঙিয়ে ভয় দেখিয়েছিল যেভাবে, সেভাবে এসে বলবে “যেদিকে আইছিলি, সেদিকে যা। “
কিন্তু না, মনা আসে নি। পুতুলের আর্তনাদ মনার কানে পৌঁছায় নি। পুতুলের প্রতিটি চিৎকার নদীর পানি ভেদ করে পাতাল পর্যন্ত চলে গেল, কিন্তু মনার কাছে যায় নি।
টানা দেড় ঘন্টা নির্যাতনের পর একে একে সবাই ঠান্ডা হল। আর রক্তাক্ত শরীরটা নিয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ে রইল পুতুল। কে জানি হঠাৎ এসে চিৎকার করে বলতে লাগল, “রফিক পালা, পুলিশ আইতাছে। “
শোনার পর যে যেদিকে পারে পালিয়ে গেল। পুতুল বেহুঁশ হয়ে আগের জায়গাতেই পড়ে আছে।
১৬.
মনার টিকেট নিয়ে ফিরতে ফিরতে প্রায় ভোর হয়ে গেল। নদী ঘাটে নামার আগেই ঝন্টু হেঁচকা টান দিয়ে একটা দোকানের পেছনে নিয়ে গেল।
:মনা ভাই, ওদিকে পা মাড়াইয়ো না। পুলিশ আসছে। তোমারে হায়েনার মত খুঁজতাছে। সেই তালতলী থাইকা তোমার উপর নজর রাখছিল।
:পুতুল? পুতুল কই?
মনার চেহারায় উদ্বেগ।
:ওরে পুলিশ এ্যাম্বুলেন্স আনাইয়া নিয়া গেছে।
এই কথা বলে ঝন্টু নিচে তাকিয়ে রইল।
:এ্যাম্বুলেন্স? এ্যাম্বুলেন্স ক্যান?
মনা চিৎকার করছে।
:ঝন্টু খুইলা বল কি হইছে। কি হইছে আমার পুতুলের? আমার পুতুল ঠিক আছে তো?
ঝন্টু কেঁদে ফেলল।
:মনা ভাই, পোলাডারে রাইখা যাওন তোমার ঠিক হয় নাই। তুমি চইলা যাইতেই ওরা….মনা ভাই, পোলাডারে ওরা শেষ কইরা দিছে। দূরে থাইকাও ওর কান ফাটা চিল্লান গুলা শুনছি। সাহসের অভাবে কিচ্ছু করতে পারি নাই।
মনা বাকরুদ্ধ হয়ে মাটিতে বসে পড়ল। পলকহীন চোখ বেয়ে পানি পড়ছে। কিন্তু মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না।গ্রেনেডের মত তার কান্নাও হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়ে বেরিয়ে এল। চিৎকার করে বলছে, “পুতুল! আমার পুতুল! আমি আইছি পুতুল। তোমার মনা ভাই তোমার কাছে ফিইরা আইছে পুতুল। তুমি ফিইরা আস আমার কাছে।”
”মনা ভাই আমিও যাব তোমার সাথে” পুতুলের কথাটা মনে হতেই মনার বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। কেঁদে কেঁদে মনা এখন একটা কথাই বলছে, “কেন, আমি কেন রাইখা গেছিলাম ওরে?”
কিছুক্ষণ পর ‘পুতুল, পুতুল’ করতে করতে মনা নৌকার দিকে এগুতে লাগল। বারবার আটকাতে গিয়ে ঝন্টু ব্যর্থ হল।
১৭.
ঢাকার একটি অভিজাত হাসপাতালে পুতুলকে নিয়ে আসা হয়েছে। জ্ঞান ফেরেনি, অবস্থা এখনো আশংকাজনক। পুতুলের মা বাবা ছুটতে ছুটতে হসপিটালে এসে দেখল ছেলে আইসিইউতে। ডোনা চৌধুরি ডাক্তারকে কাকুতি মিনতি করছে যেন একবারের জন্য দেখার অনুমতি দেয়।
:আপনারা বোঝার চেষ্টা করছেন না কেন? রোগীর অবস্থা খুবই খারাপ। চারজন ডাক্তারের পর্যবেক্ষণে আছে। আপনি প্লিজ আমাদের কাজে ডিস্টার্ব করবেন না।
ডাক্তার তড়িঘড়ি করে চলে গেল। ডোনা আনিসুর রহমানের কাঁধে পড়ে কাঁদছে। তখনই ডিআইজি মাহাদী এসি শাফকাতকে সাথে নিয়ে এল।
:কি হয়েছে আমার ছেলের? ওরা কি করেছে আমার পুতুলকে?
আনিসুর রহমানের কন্ঠ বরফের মত ঠান্ডা।
:কাম ডাউন আনিস, সব ঠিক হয়ে যাবে।
:মাহাদী বল কি হয়েছে ওর।
আনিসুরের চোখে মুখে হিংস্রতা।
:ইট্স এ রেইপ কেইস।
এ কথা বলতেই আনিসুর আঁৎকে উঠল। ডোনা রহমানের কান্নার শব্দ বেড়ে গেল আরো।
: ক্রিমিনাল তাকে রেপ করে ফেলে রেখে গেছিল। ফোর্স তাকে উদ্ধার করে। আমি আইজির কাছ থেকে পারমিশান নিয়ে হেলিকপ্টার পাঠিয়ে নিয়ে এসেছি। আমরা ক্রিমিনালকেও ধরতে পেরেছি। কাল ঢাকায় নিয়ে আসা হবে।
:আচ্ছা ধর্ষণের শাস্তি কি?
:যাবজ্জীবন কিংবা মৃত্যুদন্ড।
:তোরা আসামীকে ধরে আনবি। কোর্টে চালান করবি। আমরা গিয়ে মামলা করব। তারপর চার্জশীট হবে। শুনানী হবে স্বাক্ষী হবে। পুরো কোর্টের সামনে আমার ছেলেকে ল’ইয়াররা ভিক্টিম/ধর্ষিত বলে পরিচয় দিবে? দুনিয়ার লোকের সামনে তাকে বর্ণনা করতে হবে তার সাথে কি হয়েছে? দুই তিন বছর পর আসামী দোষী প্রমাণিত হবে। জাজ রায় দিবে। ফাঁসি হবে। তারপর সেই খবর নিউজপেপারে বড় বড় হেডলাইনে আসবে, “বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আনিসুর রহমানের ছেলেকে ধর্ষনের দায়ে এক আসামীর মৃত্যুদন্ড। ” লিসেন টু মি মাহাদী, তুই আমার যে উপকার করেছিস, তা আমি সারাজীবন মনে রাখব। শেষবারের মত আরেকটা উপকার কর। ক্রিমিনালটাকে মেরে ফেল।
আনিসুর রহমান চোখ সরু করে আস্তে আস্তে বলল।
:আমি জানি এটা সম্ভব, তোদের ক্রসফায়ারে এসব অহরহ হয়। প্লিজ মাহাদী, ড্যু ইট। প্লিজ।
মাহাদী চৌধুরী শাফকাতের দিকে তাকালো।
:ইউ নো হোয়াট ইউ হেভ টু ড্যু।
:কিন্তু স্যার…
:কোনো কিন্তু না।
শাফকাত বোঝাতে ব্যর্থ হয়ে মতিন আলীকে ফোন দিল। যার দ্বারা যা সম্ভব।
১৮.
প্রায় বিশ দিন পর পুতুল সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরল। তারপরও আনিসুর রহমান একজন নার্স রাখতে চেয়েছিলেন। ডোনা রহমান মানা করে দিলেন। তিনি নিজেই সারাক্ষণ পুতুলকে দেখে রাখছেন। রাতে ঘুমানোর সময়েও পুতুলকে ছাড়ছেন না। আনিসুর রহমান ফ্যামিলি ট্রিপে মালয়েশিয়া যাওয়ার কথা ভাবছেন। পুতুলের মানসিক অবস্থার উন্নতির প্রয়োজন।
সকাল সকাল ডোনার চেঁচামেচিতে পুতুলের ঘুম ভেঙে গেল। রান্না ঘরে গিয়ে দেখল সব কিছু এলোমেলো হয়ে আছে। তার মার সারা গায়ে নাড়কেল গুঁড়ো আর চিনি। বাবুর্চি একটু সাহায্য করতে গেলেই ধমকে সারা বাড়ি মাথায় তুলে ফেলছেন।
:আপনি এত বেশী বোঝেন কেন? কি মনে হয় আপনার, আমি কখনো নাড়কেলের নাড়ু বানাইনি? আপনাকে যতটুকু বলেছি ততটুকু করুন। আমার ছেলের জন্য আমি নিজেই বানাব।
পুতুল মায়ের কান্ডকারখানা দেখে হেসে ফেলল।
:পুতুল, র্যা ক থেকে কয়েকটা খবরের কাগজ এনে দে তো, নাড়ুগুলো রাখি।
মায়ের কথামত পুতুল পেপার আনতে গেল। র্যাকক থেকে পুরোনো নিউজপেপার কয়েকটা টান দিয়ে বের করে একটাতে চোখ আটকে গেল পুতুলের। বড় বড় হরফের একটা শিরোনাম পড়তেই হাত থেকে কফির মগটা পড়ে গেল। মনার রক্তাক্ত একটা ছবি ছাপানো। তার উপরে লিখা, “রায়েরবাজারের কুখ্যাত সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও মাদক ব্যবসায়ী মনা মিয়া পুলিশের ক্রসফায়ারে নিহত। “
পুতুল চিৎকার করে বলতে লাগল,
“না, না এটা মিথ্যে। আমার মনা ভাই সন্ত্রাসী না। আমার মনা ভাই চাঁদাবাজ না। তোমরা মিথ্যে অপবাদ দিয়ে তাকে মেরে ফেলেছ। মিথ্যে, সব মিথ্যে। “
পুতুলের কান্না শুনে ডোনা কিচেন থেকে ছুটে আসল। দেখল পুতুল মেঝেতে পড়ে চিৎকার করে কাঁদছে।
:মা মনা ভাইকে কেন মারল ওরা? কি করেছিল সে? কেন গুলি করল ওরা?
:বাবা কেন কাঁদছিস ওর জন্য? ও তোর কত বড় সর্বনাশ করেছে আর তুই কিনা এই ক্রিমিনালটার জন্য কাঁদছিস?
:ও কিছু করে নি মা, ও কিচ্ছু করে নি। তোমরা ওকে ভুল বুঝে মেরে ফেলেছ। তোমরা আমার মনা ভাইকে মেরে ফেলেছ।
পুতুল মনার ছবিটা বুকে চেপে ধরে অনবরত চিৎকার করে কেঁদে যাচ্ছে। মনার লাশ মিথ্যে পরিচয় বহন করছে, এটা সে কিছুতেই মানতে পারছে না।
১৯.
প্রায় ১২বছর পরের কথা।
পুতুল এখন ২৬ বছরের যুবক।
দুইটা দিন তার খুব ব্যস্ততায় কেটেছে। ঢাকার কাজগুলো শেষ করে আজ কেশবপুরে এসেছে। একটু আগেই কেশবপুরের চেয়ারম্যানের সাথে আলাপ আলোচনা করে এল। আগামী মাসেই কাজগুলো শুরু করে দেওয়ার কথা দিলেন তিনি। “মনা বিদ্যানিকেতন ” ও “মনা অরফানেজ হাউজ “-এর সার্বিক কাজ পরিচালনা করবে চেয়ারম্যান ও হারু।
স্যুট টাই খুলে ফেলে ভর দুপুরে পুতুল কেশবপুরের রাস্তা দিয়ে হাঁটছে। ১২ বছরের পরিবর্তনগুলো মন দিয়ে দেখছে। নদীর ঘাটটা এখন শান বাঁধানো। হারামনের বাগান কেটে পরিষ্কার করে ফেলা হয়েছে, তাতে তৈরী হয়েছে চার পাঁচটা ছোট ছোট ঘর। রায়বাড়ির বিশাল তালগাছটাও আর নেই। মনার ছোট বাড়িটা আরো অনেক আগেই নদী ভাঙনে তলিয়ে গেছে। বাড়ি থেকে অদূরে পাকা করে গড়ে উঠেছে মনার কবরটি। পুতুল কবরের দেয়াল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। শক্ত করে চেপে ধরে আছে। মনে মনে বলছে, “মনা ভাই দেখো, মানুষের মন থেকে তোমার মিথ্যা অপবাদ দূর করেই ছাড়ব আমি। শুধু তুমি পাশে থেকো। দূর থেকেই লক্ষ্য রেখো যেমনটি তুমি আমার বাড়িতে থেকে রাখতে। “

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.